• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৮৭ | জুলাই ২০২২ | উপন্যাস
    Share
  • পরীবাগান ও এক গল্পের মেয়ে (১১) : অঞ্জলি দাশ



    ।।১৯।।

    চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ইজি চেয়ারটায় বসে ছিলেন আম্মা। খবরের কাগজে চোখ। আমাকে ঢুকতে দেখে কাগজটা ভাঁজ করে পাশে রাখলেন। সকালবেলায় আম্মার গায়ে ভারি সুন্দর একটা গন্ধ জড়িয়ে থাকে। মন ভালো করে দেয়া গন্ধ। একটা মোড়া নিয়ে আম্মার গা ঘেঁসে বসলাম। আমার একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে একটুক্ষণ চুপ করে বসে থাকলেন আম্মা। তারপর আমার মুখের দিকে দেখে নিলেন একবার।

    --পড়াশুনাটা কেন বন্ধ করলি? আবার শুরু কর মন দিয়ে।

    গ্রাজুয়েশানের রেজাল্ট মোটামুটি ভালো হলেও, এম এ-তে ভর্তি হওয়ার পর পড়াশুনায় ঢিলেমি এসে গিয়েছিল। আমার কোনোদিন নিজেকে নিয়ে কোনো উচ্চাশা ছিল না। মনে হতো আর বেশি পড়াশুনা করে কী হবে? সোমনাথ নামক মোক্ষটি তো লাভ করেই ফেলেছি। ক্লাস করতে ইচ্ছে করতো না। বইএর পাতায় মন দেওয়ার চেয়ে দিবাস্বপ্ন দেখে সময় কাটাতে বেশি ভালো লাগতো। তারই মধ্যে একটা গোপন টেনশান চলছিল ভেতরে ভেতরে। সোমনাথ তখন চাকরিতে জয়েন করেছে বাঙালোরে।ও একটু একটু করে পালটে যাচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু তা নিয়ে আমার টেনশান ছিল না। কারণ আমার কাছে এলে উষ্ণতার অভাব টের পাইনি তখনও। আমার অস্থিরতা যা ছিল, তা বিরহজনিত। পড়াশু্না করতে পারছিলাম না। প্রস্তুতি ভালো না হওয়ায় পার্ট ওয়ান পরীক্ষায়ও বসা হয়নি।

    এতদিন পর নতুন করে আম্মার প্রস্তাবে প্রমাদ গুনলাম। এখন তো পড়াশুনার ব্যাপারটাকে মনে হয় বিগত জন্মের স্মৃতি।

    --আর হবে না। আমার দ্বারা আর কিচ্ছু হবে না।

    --কেন রে!

    --পড়তে ইচ্ছে করে না। নিয়ে বসলেও মন বসাতে পারি না।

    --ইচ্ছেটা অমনি অমনি হয়না, প্রথমে তাকে জোর করে জাগিয়ে দিতে হয়। আর সেজন্যে নিজেকে জাগতে হয় আগে। চারপাশের আলো নিবিয়ে দিয়ে সারাক্ষণ অমন ঝিম মেরে বসে থাকলে সব ইচ্ছেই মরে যায়। নিজেই যদি নিজেকে তুচ্ছ ভাবিস,পৃথিবীর সবাই তোকে ধুলোর মতো পায়ে মাড়িয়ে চলে যাবে।

    জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন আম্মা, দৃষ্টি অনেক দূরে। মাথাটা ইজিচেয়ারের পিছনে হেলিয়ে দিলেন। তারপর কিছুটা স্বগতোক্তির মতো নিজের কথার জের টেনে বললেন, নিজেকে ভালোবাস। নিজের ওপর ভরসা রাখ। দেখবি চারপাশের সবগুলো আলো আপনা থেকে জ্বলে উঠেছে। ছোট ছোট ইচ্ছের হাত ধরে অনেক বড় ইচ্ছে জেগে উঠছে। নিজেকে অপচয় করতে নেই।

    আম্মা নিজের চারপাশে সব আলো জ্বালিয়ে রাখতে পেরেছিলেন। আর পেরেছিলেন বলেই এই পরিবারটা অন্ধকারে তলিয়ে যায়নি। আম্মার দূরদর্শিতা আর বাস্তব বুদ্ধিতে তা দিনকে দিন সমৃদ্ধ হয়েছে। প্রবল ঝড় ঝাপটা সামলে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে মহীরুহের মতো।

    আম্মা বলেছিলেন, একটা অসফল ঘটনাকে সারাজীবন ধরে বয়ে বেড়াতে নেই, জীবন বদ্ধ জলার মতো থেমে যায়। নিজেকে নিজের পছন্দের একটা গল্পের মতো লিখে নিতে হয়। যে গল্পের শুরুটা হয়তো অন্য কারো লিখে দেওয়া। বাকিটা নিজের মনের মতো করে সাজিয়ে নিতে হয়। প্রয়োজনে দু’চারটে পংক্তি, দু’একটা শব্দ পালটে দিলে যদি জীবন ছন্দে ফেরে সেটাই করা উচিত। এটা মনে রাখিস একটা ব্যর্থতার ভাঙা ভিতের ওপর অন্য হাজারটা সাফল্যের পথ তৈরি হয়।

    আম্মার জীবনে হয়েছে। আম্মা পেরেছেন নিজেকে নতুন করে লিখে নিতে। প্রয়োজন মতো কোনো পরিচ্ছেদ বাদও দিয়েছেন।

    আমি তখনও বুঝিনি আম্মার কথানুযায়ী কী করে লিখে নিতে হয় নিজেকে, নিজের জীবনকে। কী করেই বা নতুন একটা শুরুতে পা রাখতে হয় কারো সাহয্য ছাড়া। সবকিছুই কেমন অবিশ্বাস্য লাগছিল। এমন একটা ঘটনা যে আমার জীবনে কখনো ঘটতে পারে স্বপ্নেরও অতীত ছিল। শুধু আমি কেন, বাড়ির কেউই ভাবতে পারেনি।

    ছবিটা একেবারে শেষমুহূর্তে এমন আকস্মিকভাবে ছিঁড়ে গেল যে আমি একবার ওর মুখোমুখি দাঁড়ানোর কথা ভাবারও সুযোগ পেলাম না। যেন বিররামহীন বৃষ্টির আড়ালে গা ঢাকা দিয়ে পালিয়ে গেল।ওরা স্পষ্ট করে কিছু না বলেও অনেক কিছু বুঝিয়ে দিয়ে গেল।

    আমার চোখ থেকে সেই জলের দেয়াল যদি বা সরলো, কুয়াশা যেন আর কাটতে চায় না। সামনের দিকে সবই ঝাপসা। আমার গন্তব্য যেন ওখানেই শেষ। আরও কিছুদিন যেতে কুয়াশা যদি বা কাটলো - ভাঙাচোরা কথা, ছেঁড়াখোঁড়া ছবির স্তুপে তলিয়ে যেতে যেতে মনে হলো, আমার শরীর, মন, প্রত্যেকটা অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আলগা হয়ে গেছে। যে কোনো মুহূর্তে ছিটকে বেরিয়ে যাবে চতুর্দিকে আর অবয়বহীন একটা গল্প হয়ে পরীবাগানের গাছগাছালির সঙ্গে আটকে থাকবে শুধু একটা নাম – রূপু – রূপাঞ্জনা।

    গাঢ় বিষাদের মধ্যে ডুবে থাকতে থাকতে আমি কেমন যেন কথা ভুলে যাচ্ছিলা। সবসময় সবার চোখের আড়ালে নিজের মতো থাকতে ইচ্ছে করে।ভাবনাচিন্তা গুলো অদ্ভুত জট পাকিয়ে গেল। সবকিছু থেকেই মনোযোগ আলগা হয়ে গেল।পড়াশুনার কথা তো মাথায়ই আনতে পারি না।

    আম্মা সারাদিন আমাকে বাড়ির ছোট ছোট দায়িত্ব দিয়ে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করেন। আমি সেসব নিখুঁত পালন করি। সুযোগ পেলে ছুটে যাই রাঙা দিদার কাছে। ওইটুকুই তখন আমার খোলা আকাশ।

    রাঙাদিদার মনটা এতটাই উর্বর ছিল যে একটা কথার বীজ পড়লেই সেখানে হাজার কথার ফুল ফোটে। সেই শ্রাবণ মাসের পর রাঙাদিদাও কিছুদিন যেন কথা ভুলে গেলেন। আমি কাছে গেলে উন্মুখ হয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। যেন কিছু শুনতে চান। কিন্তু আমার সমস্ত কথা তখন জমে টুকরো টুকরো নুড়ি পাথরের মতো একে অন্যকে আঘাত করে বাজে ভেতরে ভেতরে।

    রাঙাদিদা আঙুল দিয়ে আমার চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলেন – অমন গুম মেরে থাকবি না, কথা বলবি। কথায় ব্যথা কমে। শোনার কেউ না থাকলে নিজের সঙ্গে বলবি। কষ্টগুলো আপনমনে উচ্চারণ করবি, তাতে বুকের ভার কমে যায়।

    আমি পারিনি উচ্চারন করতে। নিজের কাছেও না। যে সব কথা ভেতরে নড়াচড়া করলেই রক্ত চুঁয়ে পড়ে, তাকে উচ্চারণ করি কী করে। আর আম্মা যতই বলুন না কেন কিছু শব্দ কিছু পরিচ্ছেদ মুছে দিয়ে নতুন করে সব লিখে নিতে, মুছে দেয়া কি সত্যিই সম্ভব? নতুন করে লিখে নেওয়া হয়তো যায়, কিন্তু তার নিচে পুরোনো দাগগুলো তো ঝাপসা হয়ে লেগে থাকে। তা ছাড়া যে অপমান আর অসম্মানের সঙ্গে কিছু প্রিয় স্পর্শ গিঁট বেঁধে আছে তাকে যে মুছতেও ইচ্ছে হয় না।

    আম্মা মুখে যাই বলুন নিজে কি সবকিছু মুছে ফেলতে পেরেছেন? সেই না পারার ওপরেই আসলে নিজের সাফল্যের, নতুন জীবনের ভিত গড়েছেন। অপমানটা বুকের মধ্যে কেটে বসেছিল বলেই তাকে উপড়ে ফেলার তাগিদ ছিল। কিন্তু সেই তখন আমার তো কোনো অপমানের অনুভূতি হয়নি। শুধু স্বপ্নের ঘোর ভেঙে জেগে উঠে এক সীমাহীন শূন্যতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি নিজেকে। তারপর দিনের কাজের ভিড়ে যেমন মিলিয়ে যায় সেই স্বপ্ন ও শূন্যতা, সেভাবেই সব ফিকে হতে হতে একসময় মুছেও গেছে। কোথাও ঝাপসা দাগ থাকলেও সেটা এখন আর আমার চোখে ধরা দেয় না সহসা। আমার পরিবার আমাকে চারপাশ থেকে এমন আগলে রাখে যে নিজের কথা ভাবারও অবকাশ আসে না।

    এই বাড়িটাই ওইরকম। ছোট ছোট গ্লানি, অল্পসল্প ভাঙা বিশ্বাস নিয়ে কিছু দাম্পত্য সম্পর্ক দাঁড়িয়েছিল ঠিকই। কিন্তু সেই আবহের মধ্যে থেকেও একটা আশ্চর্য বন্ধনের উত্তাপ টের পেয়েছি বরাবর, সকলেই পেয়েছে। বিভিন্ন সময়ে আম্মা, মা, মেজকাকিমা বা তোতার বউ পৌলমী প্রত্যেকেই নিজেদের দাম্পত্যের অসঙ্গতিগুলোকে অতিক্রম করার জন্যে এমন চমৎকারভাবে একে অন্যের পাশে দাঁড়িয়েছে, কেউ কখনো একা কষ্ট পায়নি। আর এ ব্যাপারে আম্মা কখনও নিজের ছেলেদের সাপোর্ট করেননি। নিজে মেয়ে বলেই অন্য একটি মেয়ের কষ্টকে অনুভব করতে পেরেছেন। অন্যদের সঙ্গে আম্মার পার্থক্য একটাই যে আম্মা নিজের কষ্ট আর অপমান কোনোদিনই কারো সঙ্গে শেয়ার করেননি। নিজের মতো করে তাকে অতিক্রম করেছেন। পাশে ছিল না কেউ। নিঃশব্দে চোখের জল গিলে নিয়ে, নিজের সব বঞ্চনাকে উপেক্ষা করে পরিবারের মধ্যে একটা উষ্ণ বন্ধন রক্ষা করে চলার চেষ্টা করেছেন।

    সবসময় যে সে চেষ্টা সবটুকু সফল হয়েছে বলা যাবে না। পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়নি, শুধু ছোটকার সংসার আলাদা হয়েছে, গ্রন্থিটা অবশ্য আজও তেমনি উষ্ণ।

    ।।২০।।

    পরপর তিন প্রজন্মের মধ্যে আমিই একমাত্র কন্যাসন্তান। হয়তো সেই কারণে আমাকে সবাই চোখে হারাতো। সারা বাড়িতেই আমার আহ্লাদ আর আব্দার ছিল লাগামছাড়া। আমি না হাসলে গোটা বাড়ির মুখ ভার থাকতো। যে কোনো ব্যাপারে আমার অগ্রাধিকার ছিল। দুজনে কাছাকাছি বয়সের বলেই সেটা হাড়ে হাড়ে বুঝতো তোতা। সোমনাথরা চলে যাওয়ার পর সেই আমি একধরণের অপরাধবোধে ভুগতাম। মনে হতো, এই যে আমার পরিবার অপমানিত বোধ করছে, তার কারণ আমি।

    সারাক্ষণ বুকের মধ্যে একটা আশঙ্কা আর অস্বস্তি নিয়ে থাকতাম। বাড়ির দু’তিনজনকে এক জায়গায় জড়ো হয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে দেখলেই দূর থেকে ভাবতাম ওরা আমাকে নিয়ে আলোচনা করছে। সোমনাথ যে আমাকে অবজ্ঞা করে চলে গেছে সেটাই ওদের আলোচ্য বিষয়। লজ্জায় অপমানে সিঁটিয়ে থাকতে থাকতে আমি বন্ধ ঘরের দেয়ালের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিলাম। মনে মনে নিজেকে তুচ্ছ ভাবতে ভাবতে পুরোনো চেহারাটাই মুছে যাচ্ছিল নিজেরই চোখে। দম ফুরিয়ে যাওয়া একটা কলের পুতুলের মতো সারাদিন চুপ করে বসে থাকতাম ঘরের কোণে।

    আমাদের দীর্ঘদিনের পুরোনো কাজের লোক গৌরীদি আর পবনদা। ওরা দুজনেই আমাদের পরিবারের অঙ্গ। আগে গৌরীদির মা সারদাপিসি কাজ করতো। স্বামী পরিত্যক্তা হয়ে তিন বছরের মেয়ের হাত ধরে আম্মার আশ্রয়ে এসে উঠেছিল। সারদাপিসি মারা যাওয়ার পর গৌরীদি আমাদের সংসারের হাল ধরেছে। গৌরীদি পবনদা দুজনেই আমাকে জন্মাতে দেখেছে। আমাকে নিয়ে ওরাও ওদের মতো করে দুর্ভাবনা করতো। পবনদা খুব বুদ্ধিমান আর গৌরীদি খুব সাদাসিধে সরল। ও খুব অদ্ভুত কথাবার্তা বলে। সারাদিন পবনদার কাছে ধমক খায়। আমি নিজের কানে শুনেছি গৌরীদি পবনদাকে বলছে,

    - আমি রূপুদিদিকে কতবার বলেছি অমন যখন তখন পরীবাগানে যেওনা, বাতাস লাগবে। আমার কথা কেমন মিলে গেল। ওর বুকের মধ্যে অন্ধকার ঢুকে গেছে, তাইতো সারাদিন অমন মুখ কালো করে থাকে। দেখোনি পরীবাগানে কেমন সবুজ সবুজ অন্ধকার। যেখানে সূর্যের আলো ঢোকে না সেখানে সব অপদেবতা আর জিন পরীদের যাওয়া আসা। তাদের গায়ের বাতাস তো ভালো না।

    - তোর যেমন কথা, ওসব জিন পরী টরী সব গপ্পোকথা। এখন কেউ মানেনা ওসব।

    - মানে না বলেই তো রূপুদিদির আজ এমন অবস্থা। অমন হাসিখুশি জ্যান্ত মানুষটা কেমন ধারা হয়ে গেছে। ওকি আর আগের মতো হবে?

    - ও আবার কী কথা! সোমদাদারা চলে গেছে বলে মন খারাপ। ক’দিন বাদে আবার ঠিক হয়ে যাবে।

    পবনদা লেখাপড়া জানে, ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়েছে। ওর ভাবনা গৌরীদির চেয়ে আলাদা। তবে আমার কথা ভেবে দুজনেরই মনখারাপ। এটাও আমার আর এক অস্বস্তির কারণ। এই যে আমাকে ঘিরে ওদেরও জল্পনা কল্পনা, এতে আরো সিঁটিয়ে থাকাতাম। কারো সামনে যেতে ইচ্ছে করতো না। প্রতি মুহূর্তে অনুভব করতাম আমার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির সবার জীবন থেকেও আনন্দ উধাও। এতে আমার আরো দমবন্ধ লাগছিল। আপ্রাণ চেষ্টা করছিলাম নিজেকে স্বাভাবিক করতে, পারছিলাম না।



    প্রায় আট ন’মাস মেজকা একদিন গম্ভীর মুখে বাড়ি ফিরলেন। আম্মাকে আলাদা করে ডেকে নিলেন। আমাদের পারিবারিক ব্যবসা সংক্রান্ত কথাবার্তা মেজকা একা আম্মার সঙ্গেই বলেন। জানি, তবু কেউ কাউকে আলাদা ডেকে কথা বলছে দেখলেই আমি উৎকর্ণ হয়ে থাকি। বুক ধুকপুক করে, ভাবি খবরটা সোমনাথ সম্পর্কিত হতেও তো পারে। প্রত্যেকবারই হতাশ হই। কিন্তু এদিন মেজকার মুখ থমথমে দেখে আমার ভয় করছিল, হাতপা ঠান্ডা হয়ে আসছিল। মেজকা ক্ষুব্ধ গলায় জানালেন,

    --সোমনাথ ওর কেরিলিয়ান বসের বোনকে বিয়ে করে ওখানে একটা ফ্ল্যাট বগিয়েছে।

    মেজকাকে কখনও এই রকম ভাষায় কথা বলতে শুনিনি। ভেতরে কতটা ঘৃণা থকলে মেজকার মুখ থেকে এই রকম একটা বাক্য বেরিয়ে আসতে পারে আন্দাজ করতে পারছিলাম। আমি ঘৃণার সঙ্গে মৃদু হাহাকারও শুনতে পেলাম যেন।

    --তোকে কে বললো?

    --বরুনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। ওর কথাবার্তায় মনে হলো ওরাও সোমনাথের ওপর খুব অসন্তুষ্ট ।

    আম্মা চুপ করে গেলেন। কিন্তু হঠাৎ আমার ভেতর কিছু একটা হয়ে গেল। সেই প্রথম সোমনাথকে আমার খুব ঝাপসা, খুব তুচ্ছ মনে হলো। এতটাই তুচ্ছ যেন রঙ জ্বলে যাওয়া পোশাকের মতো গা থেকে খুলে খুব সহজে ছুঁড়ে ফেলে দিতে ইচ্ছে করে, এবং খুলে ফেললামও। হাঁস যেমন ডানা ঝেড়ে গা থেকে জলের দাগ মুছে ফেলে, তেমনি করে সেই জলপ্লাবনের সমস্ত চিহ্ণ ঝেড়ে ফেললাম।

    এতদিন যে আমি কখনো নিজের কোনো ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাইনি, পরিবারের অন্যদের মতো নিজের সব ভাবনা আম্মার ওপর ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে হাওয়ায় গা ভাসিয়ে উড়ে বেড়াতাম, হঠাৎ করে পা ঠেকলো কঠিন মাটিতে। মনে হলো এবার আমাকে নিজেকেই ভেবে নিতে হবে। এবারের সমস্যাটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত। এখানে আম্মার আর কিছু করার নেই। এটা আম্মার অধিকার সীমার বাইরে। এর সমাধান ও সিদ্ধান্ত দুটোই আমার হাতে।

    দীর্ঘ শীতঘুম থেকে জেগে উঠে প্রথমে নিজের দিকেই তাকালাম বহুদিন পর। কিছু বিহ্বলতা, একটা ফাঁকা অনুভূতি, চারপাশে যেন একটা অপরিচিত পৃথিবী। তারপরই মনে হলো – এই পৃথিবীটাই আমার, আমার নিজের পৃথিবী, নিজেকেই শোনালাম বারবার।অন্যের ছকে দেওয়া জীবনচিত্রকে ঘসে ঘসে তুলে ফেলে নিজেকে এবার নতুন করে এঁকে নিতে পারবো। ভেতরে সেই ইচ্ছেটা জেগে উঠতে দেখলাম। নিজেকে রচনা করে নেওয়ার একটা তাগিদ। সঙ্গে একটা অদ্ভুত জোর। মনে হলো এ যেন একটা গল্পের চরিত্রের রূপান্তর ঘটানোর মতো সহজ কোনো কাজ।

    আম্মার মুঠো থেকে তাঁর ইচ্ছের আকৃতি ও রঙে গড়ে ওঠা রূপাঞ্জনাকে মুক্ত করার জন্যে এবার আম্মার কথামতো আমি কলম তুলে নিলাম হাতে। আমি যা চাই, ঠিক যেমন করে চাই, এবার থেকে তেমনটাই হবে। তীব্র জেদ আমার মধ্যে সেই শক্তির সঞ্চার করছিল। আর এখান থেকেই শুরু হলো আমার নিজেকে রচনা করা।

    সেই রচনার সঙ্গে মিশে থাকলো আমার পরিচিত জনের জীবনযাপনের খন্ডচিত্র, যার সবটা হয়তো সত্যি নয়। কিছুটা বাস্তব, কিছুটা আমার ইচ্ছের স্বঃতস্ফূর্ততায় রচনা করা স্বপ্ন সম্ভার। সেই স্বপ্নে শুধু একটি মানুষের কোনো ছবি আর আঁকা গেল না। তার জন্যে একটি শব্দও লিখতে চাইল না আমার জেদি কলম। কারণ মানুষটা তখন সুদূর থেকে আরো সুদূর হতে হতে অর্থহীন একটা নাম হয়ে গেছে শধু।

    লেখার ভাঁজে ভাঁজে জড়িয়ে গেল, ছড়িয়ে গেল সে গগনবাবু লেনের পথঘাট, মানুষ, ষোলো নম্বর বাড়ির স্বপ্ন আর সতেরোর দীর্ঘশ্বাস। মনে হলো আমাদের এই বাড়িটাকে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে উঠেছে যে অনেক গল্প, তারই ভেতর থেকে অঙ্কুরিত হলো আরও এক গল্পের। নতুন এক গল্পের মেয়ের। শুধু তার প্রাণভোমারাটি বাঁধা রইলো পরীবাগানের শিকড়ে।



    অলংকরণ (Artwork) : রাহুল মজুমদার
  • পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | পর্ব ৪ | পর্ব ৫ | পর্ব ৬ | পর্ব ৭ | পর্ব ৮ | পর্ব ৯ | পর্ব ১০ | পর্ব ১১
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)