




প্রথম মুখোমুখি হয়েছিলাম বাঘাযতীন কলোনির আই ব্লকের মোড়ে। তখনও তিনি পঞ্চাশে পা দেননি, আর আমি গোটা তিরিশ। এখন মনে হচ্ছে রাস্তায় দেখা হওয়াটা বেশ প্রতীকী ছিল। তবে সে-সন্ধের রাস্তায় উল্লাস ছিল বেশি— কলকাতার তলপেটে এইসব পাড়ার হদিশ যারা রাখেন, তারা জানবেন যে এখানে বারোভূতের মেলা একটা সামাজিক হুল্লোড়ের জায়গা। নাগরদোলা, গাদা বন্দুকে বেলুন ফাটানো, কাচের চুড়ি, চায়ের কাপ-ডিশ, কাচের গেলাস, খাজা গজা খই মুড়ি বাদাম চানাচুর আইসক্রিমে জমজমাট কয়েকটা দিন। তিনি সেই মেলা থেকে আসছিলেন না। আবার মেলাটার পাশ দিয়ে হেঁটে আসার বাধ্যতাও ছিল না কোনো। রাস্তায় একটু গাদাগাদি হলেও সরকার বাহাদুরের বিচক্ষণতায় দিব্য অটোরিকশা চলে। আমি যাচ্ছিলাম আমার শিশুকন্যাটিকে কোলে নিয়ে কিঞ্চিৎ আমোদ দিতে। কিন্তু তিনি হাঁটছিলেন যেন অরণ্যজঠর থেকে উঠে আসা সটান যুবক, যার চুলে-দাড়িতে কিঞ্চিৎ পাক ধরেছে ততদিনে— তবে সাদা রং কবেই আর মনের খবর রাখে! সেদিন কথা এগোয়নি বেশি। তবে তাঁর ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের যে-হাসিটা লেগে থাকত সব সময়— তা দেখতে ভুল করিনি আমি। পরে ভেবে দেখেছি ওই রাস্তা, ওই রাস্তার ধারে ধারে শহিদ বেদি— যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গণবিস্মৃতির অঙ্গ হয়ে গেছে, দুয়েকটা বাড়ি— যার গায়ে পঞ্চাশ বছরেও উন্নয়নের গত্তি লাগেনি, কোন জায়গায় একটা ছোটো ডোবা ছিল, কোথায় ফুটবল ম্যাচ খেলেছেন, রাস্তার কোনো জারুল কিংবা কৃষ্ণচূড়ার গাছ— তাঁকে হাত ধরে টেনে নিয়ে যেত তিন-চারটে দশক আগের দিনগুলোতে। যখন তিনিও ওই এলাকার আশেপাশে বড়ো হচ্ছেন। আমি নিশ্চিত সেদিন তিনি নেহাত দায়ে পড়ে ওই রাস্তায় হাঁটছিলেন না। বরং মেলা, ধুলো, লোকজনের উত্তাপ মেখে বাড়ি ফিরছিলেন। জীবন তাঁর কাছে ছিল ‘মুগ্ধতা, সন্তাপ, উল্লাস, দ্রবণ’।
তারপরের মোলাকাত সোজা আমাদের বাড়িতে। এক রাতে একসঙ্গে খেলাম আমরা। আমি নৈকষ্য ঘটি— (বন্ধু সংসর্গে যদিও হাফ-বাঙাল) কিন্তু সেদিন কী দুর্মতি হয়েছিল জানি না বাজার থেকে কচুর লতি কিনে এনেছিলাম, সেই সঙ্গে আনুষঙ্গিক আর যা কিছু। খেতে বসার আগে তিনি অনেকক্ষণ ধরে পরখ করলেন আমার আদর্শের গতি-প্রকৃতি, বইপত্রে মতিগতি। খেতে বসে কচুর লতি কেন এমন প্রশ্নও করলেন— যেমন আলগা প্রশ্ন করা তাঁর স্বভাব ছিল। কিন্তু মফস্সলে বড়ো হয়ে, পেটের দায়ে কলকাতায় অলিতে-গলিতে বহুকাল ফ্যা-ফ্যা করে ঘুরে বেড়ানো আমি কিছু একটা লাগসই জবাবও দিয়ে ফেলেছিলাম— তারপর তাঁর উচ্চকিত হাসি আর বাকিটা সম্পূর্ণ বন্ধুত্ব।
সুনন্দন চক্রবর্তীর নাম কিন্তু আমি বহুকাল আগে থেকেই জানি। বাংলা বইয়ের পড়ুয়ারা তাঁর কিশোপাঠ্য জীবনী ‘চে’র কথা জানেন। আমি সে বই পড়িনি। গত বইমেলাতেও তিনটে কপি তাঁকে কিনে এনে দিয়েছিলাম, কিন্তু সে-বইটা আমার আজও পড়া হয়ে উঠল না। আমি মাত হয়েছিলাম তাঁর অনুবাদ করা একটা গল্প পড়ে। আরও বেশি করে সে-গল্পে থাকা এক স্তবক পদ্য পড়ে—
‘সজনী, একবারও মিছে কথা বলিসনে,
তোকে যে খোদার কাছে যেতে হবে—
হাতি নয়, ঘোড়া নয়, গাড়ি নয়,
পায়ে হেঁটে যেতে হবে গো, সজনী...’
সিনেমার দৌলতে গানটা সবার চেনা। কিন্তু ফণীশ্বর নাথ ‘রেণু’-র ‘তিসরি কসম অথবা মরে গেল গুলফাম’ সুনন্দনদার জীবনে একটা বড়ো দিকচিহ্ন। গল্পটা অনুবাদ করার কুড়ি বছর পর আমি যখন বলেছি, যথারীতি উজ্জ্বল হয়েছে তাঁর মুখ, কিন্তু নিজের লেখালিখি নিয়ে এতটাই অনাসক্ত ছিলেন যে মুখের চামড়ায় একটা ভাঁজও পড়তে দেননি। শুধু তিসরি কসম কেন— আনন্দ যাদব, শঙ্কর রাও খারাট, বাবুরাও বাগুল, যশপাল অনেকের গল্পই অনুবাদ করেছেন তিনি। এখন তো ইশকুলের বাচ্চারা তো তাঁর অনুবাদে শঙ্কর রাও খারাটের ‘পোটরাজ’ গল্পটা সিলেবাসেও পড়ে। এই তথ্যটা যেদিন তাঁকে ওয়টসঅ্যাপে প্রথম জানালাম— সেদিন পালটা ফোন করে এতটাই বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন যে আমি বইয়ের পাতা থেকে ছবি তুলে তাঁকে আশ্বস্ত করলাম— তথ্যটা ভুল না। বলে রাখি, তারপর থেকে ওই ক্লাসের প্রশ্নপত্রে একবারও এমন হয়নি যখন আমি ‘সুনন্দন চক্রবর্তী’ কথাটা লিখিনি।
সুনন্দনদার পদ্যে প্রবল আসক্তি ভদকার চেয়ে কম নয়— এ আমি নানা সময় কথা বলতে বলতে বুঝেছিলাম। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত তিনি মুখস্ত বলতেন, জীবনানন্দের স্পন্দন তাঁর নাড়িতে ছিল— কিন্তু একসময় প্রায় নিয়ম করে কবিতা লিখতেন সেকথা বেমালুম চেপে গিয়েছিলেন আমার কাছে— তাঁর মুখের কথায় সেসব কবিতা ছিল ‘গুলিবন্দুকের আর প্রেমের’ কবিতা। একদিন বইপাড়ার ফুটপাতে পুরোনো পত্রিকা ঘাঁটতে গিয়ে ১৯৮২-র শারদীয় ‘বারোমাস’-এর সূচিতে চোখ রেখে দেখলাম তাঁর নাম ছাপা আছে কবিতা বিভাগে। দ্রুত হাতে একশো সাতচল্লিশ পাতায় গিয়ে কবিতাটা দু-বার পড়ে ফোন লাগালাম তাঁর আগের বিএসএনএল নম্বরটায়। দুপুরে ঘুমনোর কথা মুখে স্বীকার করতেন না। তবে মাঝে মাঝে তন্দ্রাচ্ছন্ন হতে দেখেছি। সেদিনও গলাটা একটু ভারী ঠেকেছিল। আমি খানিক রঙ্গ করে বললাম— একটা কবিতা পড়ছি কার বুঝতে পারছি না, একটু শুনে দেখুন তো চিনতে পারেন কি না? কবিতাটা পড়ছি আর ফোনের ওপারে তার ফিকফিক করে হাসিটা ভুলিনি। কবিতাটা ছিল ‘তোমার উচ্চারণ’—
‘তোমার যে উচ্চারণকে আমি চুম্বনের মধ্যে নিষ্পেষণ করেছি
তোমার যে উচ্চারণকে আমি আলিঙ্গনে দিয়েছি বন্ধন
তোমার যে উচ্চারণকে আমি প্রতিশ্রুতি প্রতিজ্ঞায় ভরেছি
তোমার যে উচ্চারণকে আমি জিজ্ঞাসায় অনুমানে করেছি সন্ধান
তোমার যে উচ্চারণকে আমি উত্তোলিত হাতে করেছি পতাকা
তোমার যে উচ্চারণকে আমি বাগানে বীজের মতো করেছি রোপণ
তোমার যে উচ্চারণকে আমি উৎসর্গ করেছি রোজ কবিতা-শতক
তোমার যে উচ্চারণকে আমি পঞ্জরের অস্থি থেকে দিয়েছি সোপান
তোমার যে উচ্চারণকে আমি সঙ্গোপনে দিয়েছি অভিসার
তোমার যে উচ্চারণকে আমি কাঁটার মতো করে বিঁধেছি মর্মে
তোমার যে উচ্চারণকে আমি জবরদখলের দিয়েছি অধিকার
তোমার যে উচ্চারণকে আমি হৃৎপিণ্ডকে ঘিরে করেছি বর্ম
সে সহসা তর্জনী তোলে : “তুই না জেনে ভাবিস
নারীকে মন্থন করলেই উঠে আসে অমৃত বা বিষ”।’
এরপর খুলে গেল তাঁর সঙ্গে আমার কবিতার আলাপ। শঙ্খ ঘোষ তাঁর মাস্টারমশাই, প্রিয় কবি তো বটেই। তাঁকে বাদ দিলে আমাদের সময়ের কবিদের মধ্যে জয়দেব বসুকে নিয়ে তিনি উচ্ছ্বসিত ছিলেন। আমি একে একে জুগিয়েছি তাঁকে নানা বই— বলা হয়নি, ততদিনে আমি হয়ে গেছি তাঁর বইয়ের ভলান্টিয়ার। কোনো পুরোনো, তস্য পুরোনো বই প্রয়োজন হলে ফোন করে বলতেন— দেখো তো কোথাও পাও কি না। বইমেলায় ধরিয়ে দিতেন লিস্ট। আর আমার পছন্দের একটা খেলায় উশকে দিতেন মাঝে মাঝে— কোনো কবিতার মাঝের, শুরুর বা শেষের কোনো একটা লাইন বা শব্দ মনে পড়লে কবিতাটা খুঁজে বের করার খেলা। ব্যাপারটা এতদূর গড়িয়ে গিয়েছিল যে তাঁর নিকট বন্ধুদের মধ্যেও কেউ কেউ আমাকে এই খেলায় মত্ত করেছেন। আমি সব কাজ ফেলে খুঁজেছি কবিতা। কখনো দশ মিনিটে চেক মেট। কখনো দু-দিন তিন দিন পাগল-পাগল দশা।
২০০৯-এর সেপ্টেম্বরে আমাদের ‘কোমল গান্ধার’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যা বেরুনোর পর তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা সমতলে আসে। মানে, তিনিই আমাকে এক ধাপ ওপরে উঠতে দেন। পত্রিকাটা তাঁর পছন্দ হয়েছিল। ঋত্বিক ঘটকের ‘কোমল গান্ধার’ উপন্যাসটা ছাপার পর যে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়েছিল তাতে এসে চমকে গিয়েছিলেন ‘কোমল গান্ধার’ ছবির ‘ভৃগু’ অবনীশ বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখে। টালিগঞ্জে ওয়্যারলেস মাঠের পিছনের এক গলিঘুঁজির বাড়ি থেকে হাজারও অনিচ্ছা সত্ত্বেও অবনীশবাবুকে সেদিন অবনীন্দ্র সভাগৃহে নিয়ে এসেছিলাম। ছাত্রদশায় যে-ছাত্র সংগঠনটির সঙ্গে আমি আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিলাম (তিনিও আমার দু-দশক আগে সেই একই ছাত্র রাজনীতি করেছেন) তার নাম করে বলেছিলেন— তোমার সেই দিনগুলো একেবারেই নষ্ট হয়নি দেখছি। না নষ্ট হয়নি। তাঁরও না, আমার না। তাঁর যেমন সেই দিনগুলো নিয়ে কোনো অনুশোচনা ছিল না, আমারও নেই। বরং একান্তে আমরা সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কথা ধার করে বলতে চাইতাম সেই রাজনৈতিক দর্শন আমাদের ‘তন্ন তন্ন করে দেখার চোখ দিয়েছে, অন্ধকারে ঝাঁপ দেবার সাহস জুগিয়েছে, লাগসই শব্দ দিয়ে ... মুখে সচিত্র বোল ফুটিয়েছে। এক জীবনে ... এই ঢের।’
অবনীশ বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে তিনি এতটাই আবিষ্ট হয়ে পড়েছিলেন যে একদিন আমাকে তাঁর সঙ্গে যেতে হল অবনীশবাবুর বাড়ি। সেই প্রথম কি তাঁর বাইকের পিলিয়ন সিটে আমার বসা? আজ আর মনে নেই। কিন্তু পরের কয়েক বছরে এই বাইকের পিছনের সিটে বসে আমার প্রায় ব্রহ্মজ্ঞান হয়েছে। আমি জেনেছি পায়ে ভালো জুতো পরলে, ব্র্যান্ডেড পাঞ্জাবি পরলে, এমনকী কাঁধের কাছ থেকে মৃদু পারফিউমের গন্ধ এলেও কেউ প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে যায় না। তবে তাঁর সঙ্গে বেরুলে একটা সমস্যা হত— আমি কেন জানি না তাঁর সামনে প্যাকেট বের করে সিগারেট ধরাতে পারতাম না। সেটা কেটেছিল শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি গিয়ে। ওই যে বললাম, তাঁর বাইকের পিছনে সওয়ারি হয়ে আমি এ-তল্লাট ও-তল্লাট ঘুরেছি কম নয়। কারুর কাছে তিনি এমনিই নিয়ে গেছেন আমাকে, কারুর কাছে হয়তো কোনো জরুরি কাজ ছিল আমাদের। এক কথায় তিনি আমার জন্য কলকাতার মানচিত্রটাকে একটানে বাড়িয়ে দিয়েছিলেন অনেকটাই।
তার মানে এই নয় যে আমরা পাশাপাশি রাস্তায় হাঁটিনি কখনো। বরং উলটোটাই সত্যি। হেঁটেছি অনেকটা পথ। কিলোমিটারের হিসেব থই পাবে না সেসব যাত্রার দূরত্ব। কেননা আমরা হাঁটিনি শুধু, আমাদের কথা গড়িয়েছে সাতের দশক পর্যন্ত। তিনিও একসময় মেতেছিলেন বাংলার ছয়-সাতের দশক নিয়ে একটা উপন্যাস লেখার পরিকল্পনায়। ভাবছিলেন স্বেচ্ছাবসরের পর হাত দেবেন লেখায়। তার জন্য বইপত্তর জোগাড়ও করছিলাম আমি। তিনি ভাবছিলেন ন্যাশনাল লাইব্রেরি গিয়ে পুরোনো খবরের কাগজ দেখবেন। কোন কোন মহাফেজখানায় গেলে প্রাচীন দস্তাবেজ পাওয়া সম্ভব সেসব নিয়েও কথা বলতাম আমরা। আমাদের রাস্তায় চলার সময় কথাবার্তায় সবচেয়ে বেশি উঠে আসত ইমার্জেন্সির সময়ে যাদবপুরের রাজনৈতিক স্থানাঙ্ক— ঢাকুরিয়া, যাদবপুর, কামারপাড়া, বাঘাযতীন, বিজয়গড়, বিদ্যাসাগর, রামগড়, নেতাজি নগর, টালিগঞ্জ, পুঁটিয়ারি, কুঁদঘাট, ব্রহ্মপুরের কথা। খোকা দাসের কথা উঠত, আশু মজুমদারেরও। সব মিলিয়ে তাঁর ঝালিয়ে নেওয়া আর আমার টাইম ট্রাভেল।
তবে এর আগেই, ২০১৩ সালে কলকাতা থেকে বেরুতে শুরু করল নতুন পত্রিকা ‘আরেক রকম’। আমরাও ঝাঁপিয়ে পড়লাম এই কাগজে লিখতে। তখন থেকেই সুনন্দনদা লিখবেন বলে ঠিক হল ‘আমাদের যাদবপুর, যাদবপুরের আমরা’— এক-দু কিস্তি লেখা হল, সে লেখা হারিয়েও গেল। পরে ফের শুরু করলেন কিন্তু শেষ হল না। তবে তার মধ্যে আমরা একটা কেলেঙ্কারি করেছিলাম কবিতা নিয়ে। কেলেঙ্কারি কেননা এমন কবিতা আমি তার আগে পড়িনি, আর সেরকম কবিতাও তিনি তার আগে লেখেননি।
শুরুটা হয়েছিল এলেবেলে কথাবার্তার মধ্যে দিয়ে। আমাকে এক সন্ধেয় বললেন— কীসব কবিতা ছাপছ তোমরা আজকাল ও আমি ইচ্ছে করলেই একগোছা লিখতে পারি। আমি খানিক খোঁচাতে সেদিন রাতে পাঠালেন একটা—
‘চিরন্তনের বদ্ধদ্বারে
গচ্ছিত থাক নীবিবন্ধ
আতিথ্য আর আমন্ত্রণে
শিউরে উঠুক উরুসন্ধি।
তিমির কি তোর অবগুণ্ঠন
অঙ্গনে যদি একলা তুই
বরষাসিক্ত অশনিপাতে
রাগমোচনের মন্ত্র, সই,
জপতে জপতে সপ্তপাকে
এক দিভিনা কোম্মেদিয়া
পারাদিসো-র অন্তে যাবে,
কী হবে আর ধর্ম নিয়ে?’
এ-লেখা পেয়ে বুঝেছিলাম এবার প্রপাতের মতো কবিতা ঝরে পড়বে। হলও তাই, প্রথমে দিন দুয়েকে গোটা দশ-বারো, তারপর এক এক করে সবগুলো— যা থেকে শেষমেশ ঝাড়াই-বাছাই করে বানানো গেল ‘পরকীয়ার ইস্তাহার’। এই বইটাকে আমি তাঁর আত্মজীবনীর অংশ হিসেবেই দেখতে চাই। পাণ্ডুলিপি আয়োজন সম্পূর্ণ হলে আমি ঝুলে পড়লাম অমিতাভ মালাকারকে দিয়ে ইলাস্ট্রেশন করাব বলে। যাঁরা অমিতাভ মালাকারকে চেনেন, তাঁরা বিলক্ষণ জানেন তাঁকে দিয়ে কাজ করানো সহজ নয়। সুনন্দনদা প্রথমেই আমাকে সাবধান করেছিলেন। তবে এক্ষেত্রে কী জানি কী ছিল বিধাতার মনে, অমিতাভদাও কাজটায় ঝাঁপিয়ে পড়ল— শুধু তাই নয়, একদিন আমার সঙ্গে সেই গড়পার রোডের প্রেস অব্দিও চলে গেল। বাড়তি পাওনা হল বইটির জন্য আব্বাসের আঁকা প্রচ্ছদটা। একটা ভূমিকা লেখার কথা বলেছিলাম— নইলে কবিতাগুলোর রসগ্রহণে অসুবিধে হতে পারে ভেবে। সে-ভূমিকাও লেখা হল—
‘দেওয়াল টপকে পালাবার সময় ইটের গায়ে রেখে গেছে নখের আঁচড় সমেত থাবার দাগ। পাশে প্রেমিক-প্রেমিকার হেলান দিয়ে আলাপের ছায়াটি স্পষ্ট— তার চুন-খসা শরীরে কান ঠেকালে শোনা যাবে যৌনকর্মীদের মিছিল-ফেরত হল্লা, স্লোগানের প্রতিধ্বনি। বুলেটের খোঁদলে তাজা রক্তের প্রলেপ লাগায় কেউ রোজ— ছেলেবেলায় পুলিশের নজর এড়িয়ে বাড়িতে আত্মগোপন করতে দেখেছিল যাকে, যাদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিশ্চিন্ত চত্বরে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ঠাট্টা-তামাসার নিশান ওড়ানো, তাদের কারুর হাতে সে রক্ত দেখেনি। দেওয়ালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অক্ষরমালা কিছু অস্পষ্ট, কিছু অর্ধসমাপ্ত। আরও অস্পষ্ট অক্ষরে, হাওয়ায় দাগ কেটে শিকল কাটার অতিরিক্ত দাবি, পাওনা আদায়ের খসড়া দলিল শরীর ফুঁড়ে বেরুচ্ছে রোজ। বহু যুগ আগে ধ্বসে পড়া, এখনও তৈরি না হওয়া দেওয়ালে যেন সেসব বালতি-ভর্তি কালিতে বুরুশ চুবিয়ে লিখে দিয়ে গেল অচেনা হরফে। সে সবই লেখা হয়ে রইল।’অবিশ্যি বলে রাখি— বই বেরুনোর আগেই কবি পাড়ি দিলেন কোনো নাম-না-জানা পাহাড়ি উপত্যকায়, যেমন দিতেন মাঝে মাঝেই। আমাকে হয়তো আচমকা ফোন করতেন উত্তর পূর্ব ভারতের কোনো আধা-শহর থেকে— এভাবেই জড়িয়ে যাচ্ছিলাম আমরা। আমি তাঁকে চিরকাল ‘আপনি’ বলেই ডেকেছি, খুব ইচ্ছে হয়েছে তুমি বলতে। পারিনি। কখনো জড়িয়ে ধরিনি। জুতো পরার সময় টাল সামলাতে গিয়ে দুয়েকবার আমার হাতটা ধরেছেন হয়তো।
মুখে উচ্ছ্বাস প্রকাশ না-করাটাই তাঁর ধরন ছিল। কিন্তু লেখায়, চকিত মন্তব্যে কখনো উচ্ছ্বসিত হতে দেখিনি এমনটাও নয়। তবে ওই যে শুরুতে বললাম— তাঁর ঠোঁটের ফাঁকে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ছিল। খুব অপছন্দ করতেন ন্যাকামি মিশ্রিত গদ্য— মুখে বলতেন বাংলা অনার্স মার্কা! আর তাঁর কথা বলার মধ্যে যে বিশ্বাসের জোর ছিল
তাতে কথাগুলো একেবারে বাতিল করাও যেত না। তবে আমার ছিল সাতখুন মাফ। আমি ততদিনে তাঁর লেখার রেজিস্টার্ড সম্পাদক। যে-কোনো লেখা একবার আমাকে পাঠিয়ে অত্যধিক বিনয়ে বলতেন একবার দেখে দেবে? আর সম্পাদক যদি আমাদের দু-জনের চেনা কেউ হত তাহলে এডিট করার পর আর পড়তেও চাইতেন না। আমিই পাঠিয়ে দিতাম সম্পাদকের কাছে। এই তো সেদিন ফিদেল কাস্ত্রোকে নিয়ে একটা লেখা পাঠিয়ে বললেন— দেখে দাও। সে-লেখা ছাপা হয়েছে ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এর
এবারের পুজোসংখ্যায়। নাদান ডিজিটাল দুনিয়া বোঝে না পুরোনো কথার মর্ম, তাই ওয়টসঅ্যাপে অনেক কিছু মুছে গেছে। তবে শেষের দিকের কথাগুলো এখনও আছে দেখছি। আমার কম্পিউটারে একটা ফোল্ডার রয়ে গেছে ‘SUNANDANda’ নামে। তাতে ‘বাঙাল চক্কর’ বইটার টুকরো লেখা থেকে প্রেস কপি সবই রাখা আছে। আর ই-মেলে আছে অনেকটা, বিশেষ করে ‘পরকীয়ার ইস্তাহার’ সময় প্রায় নিয়মিত। সেগুলো দেখতে গিয়ে দেখছি বইয়ের ১৭ নম্বর কবিতাটা এসেছিল ১৭ সালের ৩ মার্চ। আমার ধারণায় সবচেয়ে ভালো কবিতা যেটা এই বইয়ের—
‘ভ্রূভঙ্গে তির্যকভাবে
একবার ইশারা আসে যদি
অকাতরে দিয়ে দেব
তিনশো ছেষট্টিটি চতুর্দশপদী।
অষ্টক শেষ হলে কিন্তু
ভিন্নমুখে যাওয়া শাস্ত্রসম্মত
কঠোর শৃঙ্খলার ছিদ্রে
কৌতুক ভরেছে মন্মথ।
তাই কোনো নেহাত কিশোর
কিংবা কোনো তামসচারিণী
যথেচ্ছ গমন করি
নিয়মের ধারও ধারিনি।’
নিয়মের ধার তিনি ধারতেন না— তোয়াক্কা করতেন না অন্যে কী ভাবল তা নিয়ে। তবে আমার সামনে একদিন তাঁর মনের আগলটা খুলে গিয়েছিল। সেদিন আমি তাঁর সঙ্গে যাচ্ছিলাম কল্যাণী, উপলক্ষ্য— তীর্থঙ্কর চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে বক্তৃতা। এক্সপ্রেসওয়েতে উঠতেই তাঁর মনে পড়ে যেতে লাগল পুরোনো কথা। সেই আশির দশকে— যখন এক্সপ্রেসওয়ে নাম থাকলেও রাস্তাটা ছিল নেহাতই একটা পাকা সড়ক। সরু, দু-পাশে জলা-জংলা জায়গা, কোথাও চাষের জমি— প্রান্তসীমায় একধরনের গ্রামীণ সহবাস। সুনন্দনদা তখন হাওড়ার আমতায় রামসদয় কলেজে ইংরেজির নবীন অধ্যাপক। আর সর্বাণীদি কল্যাণীতে। এমনভাবে সেসব দিনের কথা বলছিলেন— আমি দেখছিলাম সানগ্লাস চোখে মোটরবাইকে সে-রাস্তায় তিনি যাচ্ছেন সঙ্কেতকুঞ্জে। সানগ্লাসটা আসলে সেদিন আমার পাশে গাড়িতে বসেও চোখ থেকে খোলেননি। বাইরে প্রখর রোদ্দুর, তাঁর চোখের পাতা কি ভিজে নরম হয়ে আসছিল? মাঝরাস্তায় একবার চা খেলাম আমরা। কল্যাণীতে ঢুকে হঠাৎ বললেন সেন্ট্রাল পার্কের কাছে একবার ভূষণের মিষ্টির দোকানে যাওয়া যাক। ভূষণচন্দ্র দে-র সেই মিষ্টির দোকান তাঁর অল্প বয়সে ছিল কল্যাণীর কফি হাউস। কল্যাণী গেলে সেসময় তাঁরা এই দোকানেই অনেকটা সময় কাটাতেন। এইসব ভেতরের কথা অবশ্য ঘণ্টাখানেকের বেশি চলতে দেননি।
প্রেম আর বিপ্লব তাঁকে টেনেছিল— কিন্তু জীবনানন্দের মতো বলতে পারছি না দু-দিক থেকে। কেননা প্রথম যৌবনে যাঁর বিশ্বাস ছিল ‘বিপ্লব অথবা মৃত্যু’, তাঁর কাছে বিপ্লব প্রেমেরই সমার্থক। তবে মৃত্যুর ওপারের তালাটা তিনি একটু তাড়াতাড়িই খুলে ফেললেন।
সেদিন বিকেলে দক্ষিণ কলকাতায় এক পশলা বৃষ্টি হয়েছিল। সেদিন তাঁর বাড়ির সামনের রাস্তায় উড়ে এসে পড়ছিল নাছোড় রাধাচূড়ার রেণু। আমার চেনা সেই তাচ্ছিল্যের হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে তিনি যখন গাড়িতে উঠে পড়লেন— আর ফিরে দেখিনি।