• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৮৬ | এপ্রিল ২০২২ | উপন্যাস
    Share
  • ফাল্গুনের গান (৫) : যশোধরা রায়চৌধুরী

    ১৩

    অজিত আজ বাড়িতে ঢুকেই দেখল বাড়ি থমথমে। আপিস থেকে তার ফিরতে রোজই সাতটা আটটা হয়। এখন আন্দাজ সাড়ে সাতটা হবে। শহরের সব বাতি জ্বলে গেছে। কর্পোরেশনের লোক এসে জ্বেলে দিয়ে গেছে।

    তাদের বাড়ির নীচের বৈঠকখানা ঘরে ষাট পাওয়ারের আলো জ্বলছে। নিজের পড়ার টেবিলে বাবা অন্ধকার মুখ করে বসে আছেন। বজ্রাহতের মত। বাবার এ টেবিলখানা বড় সেক্রেটারিয়েট টেবিল। ওপরে বাদামি রেক্সিন মোড়া। কাঠের মার্জিনে কালের আঁচড়। বাবার সামনে ব্লটিং পেপারের একটা তাড়া চামড়ার ব্র্যাকেটে বাঁধাই। সামনে দোয়াত আর কলম। কলমটি কাঠের সরু এক দণ্ডে যুক্ত অতি উৎকৃষ্ট ধাতব নিব। ইংরেজি দোকানের নিব। কালিতে ডুবিয়ে লেখার সময়ে ওই একবার ঝেড়ে অতিরিক্ত কালি ঝরানো হয় ব্লটিং পেপারের ওপরে। পেপারটি কালির ছোপে ছোপে পূর্ণ। কালিমালিপ্ত। ওই কালির ভেতরে অজানা জন্তুদের মুখাবয়ব আবিষ্কার করা যে কোন কল্পনাপ্রবণ বালক বালিকার পক্ষে সম্ভব।

    বহুবছরের ব্যবহার, সবই জীর্ণ।

    তবু এই ভারিক্কি টেবিলটি অধ্যাপকের অলংকার। সামনের কালো কাঠের চেয়ারগুলি রোজ এই সময়ে ভরা থাকে। একাধিক পণ্ডিত মানুষ আসেন। বাবার সঙ্গে দেখা করতে, কথা বলতে আসেন উত্তর কলকাতার কোন না কোন অধ্যাপক, শিক্ষক। পড়ুয়ারাও মাঝে মাঝে। সুদূর দক্ষিণ কলকাতা থেকেও ক্বচিৎ কদাচিৎ। জোর আলোচনা চলে রাজনীতি নিয়ে, সমাজ নিয়ে। শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে।

    আজ কেউ নেই। হয়ত বিপদের আঁচ বুঝেই নেই। এসেছিলেন, বসেছিলেন। গলা খাঁকারি দিয়ে সসম্ভ্রমে বিদায় নিয়েছেন। কী হয়েছে জিজ্ঞাসা করার সাহস হল না অজিতের। ওপরে মায়ের সঙ্গে দেখা করতেই মায়ের থমথমে মুখ, চোখের কোলে জমাট বাঁধা অশ্রু দেখে ভয়ে তার প্রাণ উড়ে গেল। যা শুনল তাতে সারাবাড়ি তোলপাড় হবার কারণ বোঝা গেল।

    কী হয়েছে, মা?

    দেখ না, নীপু বাড়ি ফেরেনি এখনো।

    সে কী!

    তোর বাবা বলছেন লালবাজারে ফোন করতে। আমি ভাবছি আর একটু দেখি!

    কী হবে রে অজু! অজিতকে ভেঙে সবটা বলতে বলতেই টপ টপ করে অশ্রুর ফোঁটা গড়িয়ে পড়ল স্নেহলতার চোখ থেকে।

    সন্ধে সাড়ে সাতটা তার মত চাকুরের পক্ষে স্বাভাবিক ঘরে ফেরবার সময় হলেও, নীপু দীপুর জন্য নয়। একে তো মেয়েসন্তান, তায় দিনকাল ভাল নয়। অন্ধকার হয়ে যাবার পর বাড়ি ফেরা চলবে না। এটাই অলিখিত নির্দেশ। সব মেয়ে এটাই মেনে চলে। ছটা বাজলেই অনেক রাত তাদের জন্য। কলেজ ইশকুল চলে চারটে, বড়জোর পাঁচটা অব্দি। যত দ্রুত পারো, ফিরে আসবে তার পর। ট্রামে চেপে। বাসে চেপে, কাছে হলে পদব্রজে। প্রেসিডেন্সিতে পড়তে যায় দীপু। সে হেঁটেই আসে।

    এত দেরি অব্দি এ বাড়ির বড় মেয়ের বাড়ি না ফেরা এক গুরুতর ব্যাপার। এসপ্ল্যানেডের আর্ট কলেজে ওকে পড়তে পাঠানোই ভুল হয়েছিল। আঁকার কাজে ওদের অনেক সময়েই এদিক-ওদিক যেতে হয়।

    কতরকম বিপদ-আপদের কথাই তো মাথায় আসে এই সময়ে। অজিতের স্ত্রী ডলি, মানে সুরঙ্গমাও চোখ দুটি ছলছলিয়ে শ্বশ্রুমাতার পাশটিতে দাঁড়ানো। কারো মুখে কথা নেই। ডলির মুখ এমনিতে সর্বদা হাসিতে ভরা। আজ সে হাসি মুছে গেছে।

    চিন্তা হবেই বা না কেন। মেয়েরা এখনো সেভাবে স্বাধীন চলাফেরা করে না কলকাতায়। চারিদিকে উদ্‌বাস্তুর ঢল নেমেছে, নানা ধরনের অপরাধ খুব বেড়েছে। মেয়েদের পক্ষে এ শহর তেমন নিরাপদ নয় আর। বিশেষত যে মেয়ে একাকী। যার বয়স মাত্র কুড়ি। যদিও তেল দেওয়া চুলে টাইট করে দু বিনুনি বেঁধে শক্তপোক্ত চেহারার নীপু ঘুরে বেড়ায়। সাজে না, সংযত পোশাক। ব্লাউজের কাপড় খদ্দরের। কাঁধ হাত ঢাকা। শাড়ি বলতে শৌখিন কিচ্ছু তার পছন্দ না। সে পরে শুধু সাদা খোলের মিহি ডুরে দেওয়া ধনেখালির শাড়ি। পোক্ত হ্যান্ডলুম। এভাবেই নীপু গটমট করে আর্ট কলেজে যায়। কাঁধের ঝোলায় থাকে তুলি রং, আর রোল করা কাগজ।

    সাড়ে সাতটা বাজতে বাজতেই তুমুল কান্নাকাটি শুরু করে দিল দীপু। মাত্র কয়েক বছরের ছোট নীপুর চেয়ে এই মেয়ে। অজিতের ছোটবোন। তার নিচের অন্য ভাইদুটির মুখ শুকনো।

    এমন সময়ে সদরে আওয়াজ হল, আর তারপরই সরু গলায় নীপুর কৈফিয়তের ঢঙে কথা। সঙ্গে আরো একটি মেয়ে। বোধহয় সীমা। অ্যান্টনিবাগান লেনে থাকে। এই তো পাশের রাস্তা। নীপুর সহপাঠিনী। সেই সীমাও নীপুর সঙ্গেই ছিল।

    অন্যদিন হলে সীমা আর নীপু একই সাথে বাড়িতে ঢুকত, সীমা তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় চলে আসত। মাসিমা আর বৌদির সঙ্গে গল্প করত। চা আর মুড়ি না খাইয়ে ছাড়া হত না তাকে। আজ দেরি হয়েছে। আজ সীমা দরজা থেকেই চলে গেছে নিজের বাড়ি। সীমা আসায় নীপু বকুনির হাত থেকে খানিকটা বেঁচে যাবে। সীমা আবার একলা বাড়ি ফিরে বকুনি খায় কিনা কে জানে। তবে ওর বাড়িতে গুরুজন বলতে শুধুই বিধবা মা। মা-মেয়ের সংসার। মা চোখের জলে একাকার হলেও মুখ ফুটে মেয়েকে কিছু বলবেন না।

    থমথমে নীরবতা তারপর দু মুহূর্ত। সবাই ওপরে অপেক্ষায় তটস্থ, নিচে এখুনি একটা বিস্ফোরণ হবে। কিন্তু বেদপ্রসাদ কি কিছুই বললেন না নীপুকে? হঠাৎ শোনা গেল বেদপ্রসাদের বাঘের মত গর্জন, যেটা বর্ষিত হল ছোকরা চাকর গোবিন্দর ওপর। শিগগিরি দিদিকে গরম জল করে দে হাত-পা ধোবার।

    অজিতের ভুরু কুঁচকে গেল। সব রাগ বেদপ্রসাদ এ বাড়ির পুরুষ সদস্যদের জন্য জমিয়ে রাখেন। অজিতরা তো ঠ্যাঙানি খেয়ে খেয়ে গায়ের চামড়া গন্ডারের মত করে ফেলেইছিল। মেয়েকে তিনি কিছুই বললেন না। বরং গলা নামিয়ে, প্রশ্ন করলেন, এত দেরি করে ফিরলি কেন, নীপু মা! তোর মা চিন্তায় আধখানা হয়ে গেছেন। যা যা হাত পা ধুয়ে নে। ওপরে যা শিগগির।

    ওপর থেকে দ্রুতপদে নেমে এলেন অজিত। বাবার প্রশ্রয়েই এত স্বাধীনতা পেয়েছে নীপু। আর্ট কলেজে গিয়ে পা বেড়েছে আরো। তিনিই নাহয় দু কথা শুনিয়ে দেবেন নীপুকে, এই ভেবে নেমে এসে দেখলেন নীপু নিজের মুখ কালো করে সিঁড়ি দিয়ে উঠছে। ঘর্মাক্ত চেহারা এই নভেম্বরেও। কী ডানপিটেমি করেছে এত সন্ধে অব্দি সেটাই এখন জানতে হবে।

    গোবিন্দ একটা লোহার বালতিতে করে গরম জল দিল ওপরের কলঘরে। কলঘরগুলোতে তোলা জলে কাজ হয়। নিচে থেকে ভারি ভারি বালতি টেনে জল ভরে দেয় গোবিন্দ। এখন গরম জল দিল ফাঁকা উনুনে চাপানো হাঁড়ি ভর্তি জল থেকে সন্তর্পণে ঢেলে। এরপর সে নিভু আঁচে চা করবে। তারপর আঁচ বাড়ানো হবে। রান্না হবে সন্ধের। এখন মশলা বাটা চলছে, কুটনো কোটাও।

    গরম জলের বালতি নিয়ে, আর এক সেট সাফসুতরো কাপড় নিয়ে নীপু কলঘরে ঢুকে দোর দিল। তার এখনো গা হাত পা কাঁপছে। শরীরের পবিত্রতা। একটি মেয়ের কাছে, বিশেষত সে যদি হয় হিঁদু ভদ্রঘরের মেয়ে, তার কাছে এই দুটি শব্দ কীরকম ভয়ানক গুরুত্বের। অপরিচিত পুরুষের অযাচিত করস্পর্শও যেন সাপের মত শরীরকে ঘিনঘিনিয়ে তোলে। সমস্ত দেহ অপবিত্র মনে হয়। যুগ যুগ ধরে জমা হয়ে চলা এই সংস্কার, মেয়েদের শরীরের, একেবারে কচি বয়স থেকেই ভেতরে বদ্ধমূল। আর সেখানে কোন বিপদের সম্ভাবনা এলেই সমস্ত সত্তা বিদ্রোহ করে। ভেতরটা কুঁকড়ে যায়।

    খুব তেতো লাগে তার। ধনীর ঘরে জন্ম নিল না কেন? ধনীকন্যা না হলে এইসব আর্টিস্ট হবার সাধনা বড় অর্থহীন। নীপুর মত মেয়ে, যারা মধ্যবিত্ত, তার ওপর পুব বাংলা থেকে এসেছে, বাসাবাড়িতে থাকে, যার বাবা অধ্যাপক, বিদ্যাগৌরব থাকলেও ধনগৌরব নেই, তার ওপর মা মুখে রক্ত তুলে চালাচ্ছেন ছ সাতটি ভাইবোন নিয়ে টানাটানির সংসার, ছোটবেলা থেকে সে জেনেছে নিজের জন্য কিছু চাইতে নেই, দাবি করতে নেই। অথচ তারই সহপাঠিনী বিভা বা চন্দ্রা, বাবা মায়ের আদরে লালিত একটি সন্তান, আঁকাটা শখের ব্যাপার, অভিজাত পাড়া থেকে শোফার ড্রিভেন মোটরকারে চেপে লোকেশনে আঁকতে যেতে পারে। নীপুদের থাকে এগারো নম্বর মানে পদব্রজ আর ঝরঝরে স্টেট বাস। যা দু ঘন্টায় একটা আসে হেলেদুলে।

    ধ্যাদ্ধেড়ে গোবিন্দপুর বলতে যা বোঝায় তাই। আজ মনে জোর এনে নীপু আর সীমা একসঙ্গে কলেজ থেকে বেরিয়ে চলে গিয়েছিল সেখানে। সেই বেলেঘাটা! বেলেঘাটা পেরিয়ে আরো দূরে, ভেড়ির ধারে।

    ওরা স্কেচ করতে গিয়েছিল। সেই বেলেঘাটা, যা নাকি কলকাতার শহরতলি। সেখানে বাস তাদের উগরে দিল। তারপর খালপাড় দিয়ে হাঁটা। তারপর বড় একটা আধা পাকা রাস্তা পেরুলে ওদিকে শুধু মাছের ভেড়ি, এত এত জলাজমি, যা কোনদিন চোখে দেখেনি নীপু।

    লোকে বলে যার নেই পুঁজিপাটা সে যায় বেলেঘাটা। বেলেঘাটা জায়গাটা ভাল নয়। এ হল কলকাতার সীমারেখা। নোংরা তলপেট। মশামাছি, কাঁচা ড্রেন। শহরের সব ময়লা আর আবর্জনা ঠেলে ঠেলে ওদিকেই পাঠানো হচ্ছে। লোকে বলে ইতর মাতালের জায়গা, সন্ধেবেলা রাহাজানি ছোরাছুরি, গুন্ডাদের ঘুরঘুর। মেয়েমানুষ হয়ে ওখানে যাবার কথা কোন ভদ্দর ঘরের লোক ভাবে নাকি? ওখান থেকে আরেকটু গেলেই ধাপার মাঠ। শহর বলতে তারা যে পরিশীলিত সীমানাচিহ্নিত সুপরিসর সভ্যতাকে আজন্ম চিনেছে, হঠাৎ যেন তা থেকে বেরিয়ে গেছিল নীপুরা। কেন গিয়েছিল? কেবলই আঁকার টানে। সেদিন গোপাল ঘোষ ওদের জায়গাটার কথা বলেছিলেন। কলকাতার কান ঘেঁষে একেবারে গ্রামের চিত্রপট যদি চায়, ছবিতে যদি তুলে আনতে চায় হেলেপড়া দেওয়াল, মাটির লেপাপোঁছা ঘরদোর, খড়ের ছাতে লতিয়ে ওঠা চালকুমড়োর ডগা অথবা কুয়োপাড়, চাঁচারিবেড়া বা বাঁশবাগান...এর চেয়ে ভাল নেই। চাই কি দু একটা উল্টে রাখা ঢেঁকির মত গরুর গাড়িও পেয়ে যেতে পারে তারা।

    এও একরকম মুক্তির স্বাদ বটে। তবে শেষমেশ যা দাঁড়াল তা কহতব্য না। ভাবতেও এখনো গা শিরশির করে। এ যদি ছেলেরা হত, কোন ভয় থাকত না। বড়জোর পকেটের চার আনা পয়সা রাহাজানি বা পকেটমারির ভয়ই তো শুধু।

    কয়েকটা মাটির ঘর নিয়ে একটা বেশ জনবসতিতে ঢুকে নিজেদের স্কেচের খাতা খুলে বসে গেছিল নীপুরা। অনেকগুলো চমৎকার কম্পোজিশন পেয়ে গেছিল। মেটে দেওয়ালের পাশে ঝুলন্ত দড়িতে শাড়ি গামছা। নাদাপেট, ঘুনশি পরা বাচ্চা। মাথায় পুঁটে। এসব আঁকতে দিব্যি লাগে নীপুর। সবাই বলে আর্ট কলেজে ওকে, তুই নিজেও ডুরে শাড়ি আর তোর ডুরে শাড়ি পরা মেয়েগুলোকেও দেখলে চেনা যায়। মাথায় বেড়াবিনুনি, খালিগায়ে জড়ানো লাল নীল ডুরে শাড়ি।

    হঠাৎ ওরা দেখল সূর্য হেলে গেছে। হেমন্তের বেলা, ঝুপ করে অন্ধকার নামে। সময়ের জ্ঞান হারিয়েছিল ওরা, স্মরণে আসতেই দেখে কী কাণ্ড। বোধ হয় পাঁচটা পেরিয়ে গেছে ঘড়ির কাঁটা। ওদের কারো হাতঘড়ি নেই। আকাশের চেহারা দেখেই ভড়কে গেছে। ভেড়ির দিক থেকে রাস্তা পার হয়ে বেলেঘাটায় ঢুকল। আরো মাইলটাক হেঁটে তবে বাসের র‍্যুট পাবে। আসবার সময়ে ধর্মতলায় আর্ট কলেজ থেকে বাসেই এসেছিল। এখন ভাবছিল এই তো বেলেঘাটা পেরুলেই শেয়ালদা আর তারপরই আমাদের পাড়া। কিন্তু বেলেঘাটার এই নির্জন গা ছমছমে খালপাড় দিয়ে হেঁটে চলেছে তো চলেইছে দুই মেয়ে। দুজনেরই বয়স কুড়ির আশেপাশে..। পথটুকু যেন অনন্ত হয়ে গেল। আর পেছনে, অল্প দূরত্বে একটা ছায়া ছায়া মূর্তি লুঙ্গি পরে তাদের পেছু নিয়েছে দেখে আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয়ে গিয়েছিল নীপু সীমার।

    পথ আর শেষ হয় না। এক একটা মুহূর্ত যেন এক এক ঘন্টার মত দীর্ঘ মনে হচ্ছিল। হাঁটার সময়ে পায়ে শাড়ি জড়াচ্ছিল বার বার। শরীর বয়ে নেমে যাচ্ছে ভয়ের শীতল স্রোত। সমস্ত সময়টা দাঁত চেপে মাথা নামিয়ে চলেছে তারা, কখন যেন মনে হচ্ছিল এই পথটা যেন সে দুঃস্বপ্নে দেখছে। দুঃস্বপ্নে যেমন খুব দ্রুত দৌড়বার চেষ্টা করলেও পা সরে না, ভারি পাথরের মত অনড় মনে হয় শরীরটা, তেমনি।

    এ পথে আলো নেই তেমন। কলকাতার উল্টোপিঠ। মা যখন কার্পেট সেলাই করেন, সোজা পিঠে ফুটে ওঠে উলের ফুল লতা পাতা আর উল্টোপিঠ গিঁটে গিঁটে ভরে যায়। মেয়ে দেখতে এসে নাকি হবু শাশুড়ি আগে মেয়ের সূচিকর্মের উল্টোপিঠই পরখ করেন। মেয়ে কেমন গুছুনি, লক্ষ্মীমন্ত তা উল্টোপিঠেই লেখা থাকে। কিন্তু কলকাতা যারা বানিয়েছিল তারা তো সব অলক্ষ্মীর বরপুত্র। এদিকে কোঁচার পত্তন তো উল্টোদিকে ছুঁচোর কেত্তন। ফলে এ পথে কোন পথবাতি নেই কর্পোরেশনের। ঐ শেয়ালদা অব্দি এসে থমকে গেছে নীপুর বড়দার লালবাড়ির জারিজুরি। এ জায়গাটা বাপে খেদানো মায়ে তাড়ানো মত। প্রায়ই মৃতদেহ মেলে এখানে। কখনো বা চটের বস্তায় মেয়েমানুষের শক্ত হয়ে যাওয়া শরীর। খুবলে খাওয়া মুখ চোখ, কাটা স্তন। পচে ঢোল মড়া, খাল থেকে উঠে আসে। পুলিস দুদিন ধড়পাকড় করে, তৃতীয় দিন যে কে সেই।

    শেষ পর্যন্ত দুঃস্বপ্ন শেষ হয়, বড় রাস্তায় উঠে পড়ে ওরা। এখানে কাঁচা ড্রেন ফুরিয়েছে। লোকটা পেছন পেছন বহুদূর অব্দি এসেছিল। ওরা ঠিক করেছিল কেউ ছুঁতে এলেও গায়ে হাত দিতে পারবে না। তার আগেই ওরা আত্মরক্ষা করবে উল্টো আক্রমণ করে। হুঁ হুঁ বাবা কলেজে পড়া রাজাবাজারের মেয়ে ওরা। ব্রতচারী করেছে ভিক্টোরিয়া ইনস্টিটিউশনে। মনে জোর আনছিল এইসব ভেবেই।

    ওদের কাঁধে তো বড় ঝোলাব্যাগ। রোলকরা কাগজ, এইচ বি পেনসিল, প্যাস্টেল, কন্টি স্কেচ পেন্সিল, একেকটা চারকোলের, লোহার মত শক্ত। তুলি আর রঙ-এর টিউব। ভীষণ ভারি সে ব্যাগ। সে ব্যাগ তুলে এখন বুকের কাছে চেপে বর্মের মত করে ধরে হাঁটছে ওরা। লোকটা যদি বেশি কাছে আসে, ব্যাগটা ঘুরিয়ে দেবে এক ধাক্কা।

    সীমার চটির স্ট্র্যাপ ইতিমধ্যে ঢলঢল করছিল। কী বিপদ। এই বুঝি ছিঁড়ে গিয়ে জবাব দেবে। শেষমেশ এসে পড়ল বাস স্টপ। একটা টিমটিমে বাতি এখানে আছে বটে। তারপর বহুক্ষণ দাঁড়িয়ে বাস পাওয়া। বাড়ি ফেরা। আবার শহরের ছিমছাম রাস্তা, নিরাপত্তা। তখন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল এই ভেবে, যে, বাবা মা কী ভাবছেন! কী প্রচণ্ড তিরষ্কারটাই না আছে কপালে।

    বুকের ধড়ফড়ানি যায় না নীপার। কিন্তু মুখে সে শক্ত থাকতে জানে। বাথরুম থেকে পরিষ্কার সায়া সেমিজে বেরিয়ে মাথার লম্বা সাপের মত বিনুনি পেছনে ছুঁড়ে দিয়ে ঘরে গেল, শাড়ি পরল পাটপাট করে। মায়ের জিজ্ঞাসু চোখের সামনে সপাটে মাথা হেলিয়ে বলল, মাস্টারমশাইরা বলেছেন আউটডোরে গিয়ে ছবি না আঁকলে হাত পরিষ্কার হবে না। তাই যেতেই হবে। আর গেলে তো দেরি হবেই।

    স্নেহলতা্র গম্ভীর মুখে চিলতে হাসি দেখা যায়। যাক বাবা কোন বিপদআপদ হয়নি, মেয়ে সন্তান, তোদের জন্য কি কম চিন্তা হয়! ঈশ্বর রক্ষা করেছেন, গেছিলি কদ্দুর।

    পুরোটা ভেঙে বলে না। ওই বাসেই গেছিলাম। জেলেদের পাড়া। ওখানে স্কেচ করলাম। তোমাকে দেখাচ্ছি।

    স্নেহলতা হাঁপ ছাড়েন। মেয়ে তাঁর কী বেদম সাহসী।

    অজিত শুধু বোঝেন। ছবি দেখতে দেখতে মুখ টিপে বলেন, খুব জাঁহাবাজ হয়েছিস যাহোক। করে নে যা করার। এর পর বিয়ে হয়ে গেলে তো আর এভাবে আদাড়ে বাদাড়ে ঘুরতে পারবি না!

    বৌদি ঝুঁকে ওর স্কেচ দেখে বলে, কী সুন্দর রে নীপু! ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড় যেন।

    ১৪

    ১৯৫৮

    স্টিফেন স্পেন্ডার ও মেলভিন লাস্কির সম্পাদনায় প্রকাশ পাচ্ছে এনকাউন্টার পত্রিকা। লন্ডনের হে মার্কেটের ঠিকানা থেকে প্রকাশিত পত্রিকাটি লিবারাল কিন্তু বামপন্থী নয়। কলকাতায় বারো টাকায় বাৎসরিক সাবস্ক্রিপশন মেলে। গ্রাহক হয়েছেন সূর্যশেখর।

    আমেরিকা থেকে আসার সময় মনের জগতে যে যে আলোড়ন বয়ে নিয়ে এসেছিল, তাকে ঝড়ের মুখে দীপশিখার মত রক্ষা করাই একটা কাজ। এইসব পত্রিকাই সে আগুনে ইন্ধন দেয়। অতি সন্তর্পণে রক্ষা করতে হয় সে আগুনকে। এবার স্থিতু হয়ে বসে কিছু একটা করতে হবে। কাজ।

    কবিতা দর্শন বিজ্ঞান সংস্কৃতি রাজনীতি সব মিলিয়ে সূর্য এত উত্তেজিত থাকে, বা বলা ভাল থাকত ছাত্রজীবনে। এখন এই স্থিতু হবার প্রক্রিয়ায় বারে বারে মনে হয়, একটা কিছু করা দরকার। দিনগত পাপক্ষয়ে কলুর বলদের জীবনে ভুলে গেলে চলবে না তো।

    এই পত্রিকার সংস্কৃতি সিনেমা বই রিভিউ ইত্যাদি অংশগুলির লেখা থেকে শুরু করে তাত্ত্বিক প্রবন্ধ, সবটাই অন্যভাবে অনুপ্রাণিত করে ওকে।

    যেমন এবারের সংখ্যায় ওপেনহাইমার লিখেছেন বিজ্ঞানের সঙ্গে সংস্কৃতির যোগ ও পার্থক্য নিয়ে। ওপেনহাইমার সেই বিজ্ঞানী যিনি অ্যাটম বোমের গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। লেখাটা শুরু করেছেন এইভাবে:

    আমরা এখন আছি এক বিরল সময়ে। এই সময় চিহ্নিত হচ্ছে নানা বিশাল অনপনেয় পরিবর্তনের মাধ্যমে--একজন মানুষের জীবিতকালেই এত বিশাল বিশাল পরিবর্তন কেউ ভাবেনি। এক অতুলনীয় গতিতে মানুষ প্রকৃতির জগৎকে বুঝতে পারছে ক্রমশ গভীরতর ও ব্যাপ্ততরভাবে। আমাদের অনতি অতীতে এর কোন তুলনা নেই – যে হারে আমাদের প্রয়োজন ও আশার সঙ্গে সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই জ্ঞানকে কাজে লাগানোর চেষ্টা হচ্ছে।

    এমতাবস্থায় প্রাচীন সমাজে সংস্কৃতি স্থিতাবস্থা বজায় রাখে, - শান্ত রাখে আমাদের। ঐতিহ্যই আমাদের এক যুগের সঙ্গে অন্য যুগকে যুক্ত রাখে, আঠার কাজ করে। সংস্কৃতিই অর্থপূর্ণ করে তোলে আমাদের জীবন – মানুষের অপরিবর্তনীয় বা পৌনঃপুনিক বৈশিষ্ট্যগুলোর দিকে চোখ টেনে।

    ঠিকই তো। নিজে বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করছে সূর্য কিন্তু ঐতিহ্যকে মানে।

    সূর্য বারান্দা থেকে পত্রিকাটা হাতে করে ঘরে ফিরে আসে।

    তাকে বিয়ে করতে হবে। দাদু মা শমন জারি করেছে বলে নয়। মানবের স্বপ্নার সঙ্গে সম্পর্ক আছে। মানবের পাশে সূর্যই দাঁড়িয়েছে, বলেছে, মানবকে নিজের পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করার অধিকার দিতেই হবে। শিক্ষিত যুবক সে। অপরিচিত মেয়েকে ঘরে তুলবে না কিছুতেই।

    মানবের জন্য গলা ফাটিয়ে, তারপর নিজে মানবের আগের ভাই হয়ে পথ আটকে দাঁড়ায় কী করে সে। অথচ বিয়ে করতে হলে পছন্দসই পাত্রী চাই। পরিবারের এক পুরনো ঘটকমশাই এসে কিছু কিছু পাত্রীর খবর দিয়ে গেছেন। সে যা যা কুলীন কায়স্থ পাত্রীর নাম বলে তাদের বয়স কম, পড়াশুনোও কম, এক একটি ধোপার পুঁটুলি হবে তারা। জবুথবু জরদ্গব শাড়ি গয়নার দলা। ম্যাট্রিক পাশে চলবে না, বয়সের অত তফাত না-মঞ্জুর সূর্যর। শিক্ষিতা মেয়ে ছাড়া বিয়ে করবে না, বলেই দিয়েছেন সোজাসুজি, দাদু মাকে।

    শিক্ষিত মেয়ে কেন চাই? শিক্ষিত মানে কতটা শিক্ষিত? আসলে নিজের মনের মত। সেটাই বড় কথা। নিজের মেধা মনন স্বপ্ন চিন্তার ভাগ যাকে দেওয়া যায় না তার সঙ্গে জীবন ভাগ করে নেওয়া চলে না।

    ভাবতেও শিউরে উঠল সূর্য, কুন্দ বৈদ্য বা স্কারলেট জোহানসেন... এই সব ভয়ানক বুদ্ধিমতী মেয়ের পর, কোন সদ্য স্কুল ছাড়া, ফিউচারকে ফুটুরি বলা মেয়েকে দাদু বা মা যদি কেবল কুষ্ঠীতে মিলছে বলে তার বিছানায় ঠেলে দেয়, আর তার সঙ্গে বাকি জীবন কাটাতে হয়!

    কৃষ্ণার সঙ্গে সেই ঘটনাটার পর, কিছুদিন সত্যি ভেবেছিল, বিয়ে না করাই ভাল। বুকের ভেতরে আমূল ক্ষত নিয়ে মনে করেছিল, নারীভাগ্যটাই খারাপ।

    প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাঙালি যেরকম শান্ত সুস্থির সামাজিক জীবন কাটাচ্ছে তার অন্যতম ইনস্টিটিউশন, বিবাহ। তাই সংস্কৃতির ভূমিকা সম্বন্ধে ওপেনহাইমারের মত বিজ্ঞানী যে থিওরি দিয়েছেন সেটা একদম ঠিক। জীবনে একটা স্থিতুভাব দরকার। শিজিলমিছিল যেটাকে বলে বাঙালরা।

    তপেনের খুড়িমার কাছে ‘শিজিল মিছিল’ শব্দযুগল শুনে থেকে কানে বেঁধে আছে।

    কেমিস্ট্রির জন্য জান লড়িয়ে ছ-সাত বছর রিসার্চের কাজ করার পর, সারা পৃথিবীর বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ডের একজন শরিক নিজেকে মনে করার পর – এই যে বিংশ শতকের ঠিক মধ্যবিন্দুতে দাঁড়িয়ে সূর্যশেখর অনুভব করল, এই চলমান জ্ঞানবিশ্বের এক শরিক তিনি, এ থেকে তো তাঁর মাথাটাও খারাপ হয়ে যেতে পারত। সে গল্প সিনেমার সেই খ্যাপা বৈজ্ঞানিক হয়ে যেতে পারত। জীবনের স্থিতি নড়ে যেতে পারত তো তার।

    গেল না শুধু এই পরিবারটির জন্য, তার দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের জন্যই। এ বেশ ভাল করে বুঝতে পারে এখন সে।

    ভাগ্যিস আমরা স্বাভাবিক ও সাধারণ। জিনিয়াস নই। ভাগ্যিস আমরা সুস্থিত। শান্ত। মধ্যবিত্ত।

    শব্দগুলো মনে মনে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল সূর্য।

    মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকালমাঝে, আমি মানব একাকী ভ্রমি বিস্ময়ে ভ্রমি বিস্ময়ে। রবি ঠাকুরের এই গানটা খুব প্রিয় তো সূর্যশেখরের। একা একা দরাজ গলায় গাইতে ভালবাসে। কখন যে বাথরুম সিঙ্গার থেকে ও দেশেও সব রকমের সামাজিক ফাংশনে বাংলা গান গাওয়ার ডাক পেতে শুরু করল, তাও মনে নেই।

    তো সেই ‘ভ্রমি বিস্ময়ে’-ই তো এক বৈজ্ঞানিকের ট্রু স্পিরিট! তাই না?

    সূর্যও তাই চেয়েছে। তবু কক্ষচ্যুত হয়নি। সেন্ট্রিফিউগাল ফোর্সে তার বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবনের পিছুটান ছিঁড়ে ফেলেনি। ফেলতে চাইলে মার্কিন মেয়ে স্কারলেট জোহানসনকে ফেরাত না।

    ও দেশে সেটেল ডাউন করার অনেক হাতছানিও ছিল। সেগুলোকেও উপেক্ষা করেছে।

    বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ ডিগ্রি, সর্বোচ্চ অনুসন্ধানের আগ্রহ সত্ত্বেও সে উদ্ভ্রান্ত পাগল বৈজ্ঞানিক হবে না--আর হ্যাঁ, মানুষের জন্য মঙ্গলদায়ক নয় যে বিজ্ঞান তার পূজাও করবে না।

    আর হ্যাঁ, একজন কেমিস্ট হিসেবে, লক্ষ ডলারের বরাত পেলেও বানাবে না কোন মারণ ওষুধ, বা বিষাক্ত গ্যাস।

    দুপুরে পরিপাটি করে ভাত খেয়ে উঠে দাদুর বড় আরামকেদারায় গা এলাতেই ঘুম নেমে আসে চোখে। বুকের ওপর এনকাউন্টারের পাতা ফড়ফড় করে ওড়ে। সে বড় সাধারণ মানুষ হয়ে থাকতে চায়। অসামান্য, জিনিয়াস, পাগল হতে চায় না।

    মায়ের খাওয়া হয় ঘন্টাখানেক পরে। রান্নাঘর সামলে এসে মা বড় পানের বাটা থেকে একটা পান নিয়ে সাজেন। পানপাতাগুলো সব পাতলা ভিজে ন্যাকড়ায় মুড়ে রাখা।

    দেবযানী নামের এই মহিলার বয়স পয়ঁষট্টির আশপাশে। পাতলা ছিপছিপে ফর্সা চেহারা। কর্মঠ শক্তপোক্ত। কে বলবে ইনি সূর্যর দিদিমা। ঘরোয়াভাবে সাদাতে চওড়া লাল-গোলাপি সুতোর কাজ করা ফুলতোলা পাড় শাড়ি পরে আছেন। সাদা ব্লাউজ। অনেকটা ভিজে চুল পিঠের উপর মেলে দেওয়া।

    মা তুমি আবার চুল ভিজিয়ে স্নান করেছ এত বেলায়? এই সেদিন না সর্দি কাশিতে ভুগলে?

    বড় ঘড়িতে আড়চোখে আড়াইটে বাজে দেখে সূর্য অনুযোগ করল।

    তুই থাম। পানের পাতায় সব মশলা একটু একটু দিলেন, সুপুরি কুচিয়ে নিলেন জাঁতি দিয়ে। মুখে পান ঠুসে, পানের বোঁটায় অল্প চুণ লাগিয়ে জিভের ডগায় দিলেন।

    কী বলি... সুজ্জি, বিএ পাশ মেয়ে হলেই তো বয়স অনেক হয়ে যাচ্ছে রে। ধাড়ি মেয়ে কেউ বাড়িতে রেখে দেয় ? সেরকম মেয়ে হলে তো অন্য কোন খুঁত আছে বলেই থাকে। বাইশ-তেইশ বছরের মেয়ে... না বাপু আমার এটা ভাল লাগছে না।

    এভাবে পাত্রীর পর পাত্রী তুই বরখাস্ত করে দিচ্ছিস এটা কি ঠিক? কতগুলো পাল্টি ঘর কায়স্থ কুলীন মেয়ে পেলাম। তোর মনে ধরল না। আমি তো পাশ দিইনি, যদিও দাদুর ইশকুলে পড়েছি। তোর দাদু কি আমাকে নিয়ে অসুখী হয়েছেন? আমি কি নির্বুদ্ধি?

    এই এক দোষ মায়ের। সবকিছুতেই নিজেকে টেনে আনা, নিজের গায়ে মেখে নেওয়া। কী যে মুশকিল।

    উঠে বসল সূর্য। নাঃ ভাতঘুম আর দেওয়া গেল না দেখা যাচ্ছে।

    মা, তোমার কথা উঠছে কীসে? আর, কবে তোমার বিয়ে হয়েছে বলো তো? পঞ্চাশ বছর আগেকার কথা। তখন তোমার বয়স চোদ্দ। তোমার ষোল বছর বয়সে মা হয়েছে। তারপর এত এতদিনে পৃথিবীটাই তো বদলে গেছে। তাই না?

    তা অবিশ্যি ঠিকই। তোমাদের যুগ বাপু, তোমরাই তো এখন যা ভাল বুঝবে করবে।

    চাকা একবার সামনের দিকে ঘুরে গেলে আর ফেরানো যায় না। এখন তোমার ঘটকমশাইএর দেখা ওই পুতুল পুতুল ট্যাঁপানাক খুকিকে আমার বিয়ে করা চলে না, বুঝেছো?

    হুঁ! তা আর চলবে কেন। তোমরা অনেক পাশ দিয়েছো, তাই পাশ করা বউ চাই। উফ বাবা।

    মা, বলো তো, বিজ্ঞানের যে প্রগতির কথা শোন, কাগজে পড়, তার গতি একমুখী কেন বলে বলো তো? ধরো মানুষ কোন বিষয়ে যে জ্ঞানটা অর্জন করল, পরে তো সে জ্ঞানটা ভুলে যেতে পারবে না। যাবার উপায় নেই, প্রাকৃতিক সত্যগুলো অজানা যদ্দিন ছিল, ছিল! একবার জানা হলে তো তার উপরেই পা রেখে ধাপে ধাপে আরো অনেক জানা শুরু হয়ে গেল। তাই এই পথ কখনো পেছনের দিকে হাঁটে না।

    তা তো বুঝলুম, কিন্তু তার সঙ্গে তোর বিয়ের কী সম্বন্ধ রে বাবা?

    মায়ের মুখে প্রশ্রয়ের হাসি। ছেলে, থুড়ি নাতিকে এমন করে বুঝিয়ে বুঝিয়ে জ্ঞানের কথা বলতে শুনলে কী ভাল যে তাঁর লাগে। উজ্জ্বল চোখে, সুন্দর তরুণ মাথার চুল আঙুলে চেপে ধরে ধরে বোঝাচ্ছে, এ দৃশ্য এমনই নয়নমনোহর কোন মায়ের কাছে বা মাতৃস্বভাবীর কাছে।

    আরে, সম্বন্ধ আছে, আছে মা! ধরো, যদ্দিন ম্যালেরিয়ার ওষুধ বেরোয়নি, বেরোয়নি। লোকে মরত। সাবু বার্লি খেত। কুইনাইন বেরিয়ে যাবার পর কি তুমি আমায় ম্যালেরিয়া হলে জলপড়ার মন্তর দেবে? না কুইনাইন দেবে?

    কুইনাইনই তো দেব।

    তাহলে, তোমাদের সময় থেকে আমাদের সময় এই যে আমরা বিজ্ঞানে জ্ঞানে প্রগতিতে এতটা এগিয়ে এলুম, তোমার বিয়ের সময়ে যা যা খুঁজে দাদুর পাত্রী দেখা হয়েছিল, সে সব কি আর আমার বিয়েতে খাটবে? এখন বিএ পাশ মেয়ে ছাড়া তোমার পিএইচ ডি করা ছেলের বিয়ে হবে না, ব্যাস, এইটে ধরে রাখো।

    তোর সঙ্গে কথায় পেরে উঠব না বাপু। যা খুশি কর গে যা। যাই দেখি কাপড়গুলো শুকুলো কিনা।

    বলে পিঠটান দিলেন দিদিমা। দৌড় দিলেন ছাতের দিকে।

    ওপেনহাইমারের পরের কথাটা পড়ে বেশ ভুরু কুঁচকে গেল সূর্যশেখরের। তিনি লিখেছেন, উদাহরণ স্বরূপ নেওয়া যাক অ্যাটম বোমকে। অ্যাটম বোম কী করে তৈরি করতে হয় সেটা একবার অধিগত হয়েছে মানবজাতির। এ সত্য তো আর অস্বীকার করা যাবে না। এই জ্ঞানটাকে তো মানব ইতিহাস থেকে কোন মন্ত্রবলে মুছেও ফেলা যাবে না। সুতরাং ভবিষ্যৎ কালে কোন না কোন দেশের পক্ষে আবার অ্যাটম বোম বানানো সম্ভব, এটা মেনে নিয়েই চলতে হবে। বিজ্ঞান পেছনে ফেরে না, যা একবার আবিষ্কৃত হয় তা অবিনশ্বর। তাই অ্যাটম বোম পরবর্তী পৃথিবী পাল্টে গেছে চিরতরে। রাজনীতি পাল্টে গেছে। এটা ধ্রুব সত্য, এর ভাল খারাপ নেই।

    গভীর ভাবনায় ডুবে যায় সূর্য। আজকের পৃথিবীতে রাশিয়া–মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে বিপুল টক্কর চলছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে কোল্ড ওয়ার...তার ভেতরকার কথা তো অ্যাটম বোম। সবাই জেনে গেছে এর বিধ্বংসী পরিণাম। তাই হট ওয়ার হলেই সমগ্র মানবজাতি সমূলে বিনষ্ট হবে। এখন সুতরাং শুধু হট ওয়ারের ভয়কে সম্বল করে পরস্পরের দিকে আড়চোখে চেয়ে থাকা।

    অ্যাটম বোম তো বিজ্ঞানের ফসল। আজকাল তাই ইশকুলে রচনা লিখতে দেয়, বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ।

    ১৫

    ১৯৫৮

    বেদপ্রসাদের স্মৃতিভ্রংশ হয়েছিল বটে, কিন্তু তা বর্তমানের সম্বন্ধে ঔদাসিন্যেরই নামান্তর। অতীত স্মৃতি ঝকঝকে স্পষ্ট। মনে মনে তিনি উনিশশো বিশের কলকাতাতেই বিচরণ করেন। যখন তাঁর বয়স পঁচিশ থেকে ত্রিশের কোঠায়। সেসব উত্তেজনাকর দিন। হেঁটে রাজাবাজার অঞ্চল থেকে ময়দানে চলে যাওয়া। ময়দানের একটি আড্ডা তাঁকে টানে। সে আড্ডার মধ্যমণি ছিলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়।

    বেদপ্রসাদের বৈঠকখানায় একটা নাতিদীর্ঘ সাক্ষাৎকারই নিয়ে নিলেন তিনি এই নবাগত যুবকটির। স্নেহলতা ঠারে ঠোরে বলেছেন অজিতের চেনা, তাছাড়া দূর সম্পর্কের আত্মীয়তাও বেরিয়েছে... সূর্যের মাসি প্রিয়ংবদা স্নেহলতার কীরকম যেন কুটুম্ব। পাল্টি ঘর, কাজেই বিয়ে সম্ভব। সম্ভাব্য জামাতাটিকে প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করে করে বেদপ্রসাদ তার বিদ্যাশিক্ষার সম্যক পরিচয় নিলেন। সে বিষয়ে তিনি এখনো করিৎকর্মা।

    বেদপ্রসাদ এখনো খড়ম পায়ে নিচে নামেন নিয়মিত, বৈঠক খানায় বসেন দু ঘন্টা। খবরের কাগজ পড়েন খুঁটিয়ে। একটি প্রশস্ত সেক্রেটারিয়েট টেবিলের এক প্রান্তে খান কয়েক চেয়ার আছে অভ্যাগতদের জন্য। অন্যদিকে বেদপ্রসাদের হাতলওয়ালা কালচে হয়ে আসা কাঠের বিশাল চেয়ার। সামনে চতুষ্কোণ আকৃতির একটি ব্লটিং পেপারের খণ্ড থাকে, তার পাশে দোয়াত ও কলম। কলমটি এখনো প্রাচীন যুগের। অর্থাৎ ফাউন্টেন পেন নয়। কাঠের সুদৃশ্য কলম, নিবটি বিলিতি স্টিলের। দোয়াতে ডুবিয়ে লিখতে হয়। লেখার শুরুতে বাড়তি কালি ঝেড়ে নেবার রীতি আছে। সেজন্যেই ঐ ব্লটিং প্যাডের অস্তিত্ব।

    সূর্যের কাজের বিবরণ শুনেই বেদপ্রসাদ মুগ্ধ হলেন আর আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের গুণ কীর্তনে মেতে উঠলেন। স্মৃতিচারণের সময় তুচ্ছতম তথ্যটিও তিনি অবলীলায় মনে করতে পারছেন...। আশ্চর্য হয় সূর্য। কানাঘুষোয় শুনেছল ঋষিকল্প পণ্ডিত এই মানুষটির কথা। আগে তাঁর ব্যক্তিত্বে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খেলেও এখন বালকের মত। স্মৃতিভ্রংশ হয়েছে নাকি। কই, তিনি তো পরিষ্কার কথা বললেন।

    আশ্চর্য সমাপতন বটে। রাজাবাজারে যে রাস্তাটির ওপর বেদপ্রসাদের এই ভাড়া করা বাসাটি, সেটি আপার সার্কুলার রোড থেকে এখন আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রোড হয়েছে।

    জানো তো, এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি এসসি উপাধির জন্যে জমা দেওয়া তাঁর থিসিসের শিরোনামটি ছিল “অন পিরিয়ডিক ক্ল্যাসিফিকেশন অফ এলিমেন্টস”। মৌলের ধর্মের পর্যাবৃত্তি। সাল ১৮৮৭। ডি এসসি উপাধি পেলেন। ডি এসসি-র সঙ্গে তাঁর থিসিসটি সে বছর শ্রেষ্ঠ নির্বাচিত হল এবং হোপ পুরস্কার সহ আরও দুটি স্কলারশিপ পেলেন।

    হ্যাঁ, এই মানুষটি না থাকলে বোধ হয় বাঙালির বিজ্ঞানচর্চা এখনো প্রাগৈতিহাসিক স্তরেই থাকত।

    এত বড় একজন মৌলিক গবেষক, কোথায় পাবে আর? তাছাড়া তিনি তো শুধু বিজ্ঞানী না, আমাদের ফ্রেন্ড গাইড অ্যান্ড ফিলজফারও ছিলেন। মনের মধ্যে বুনে দিয়েছেন গভীর দেশপ্রেম আর জাতীয়তাবোধ। তাঁর সব কিছু উদ্যোগের পেছনে ছিল মানুষের কল্যাণ ভাবনা। অথচ, রসায়নের ছাত্রদের কাছে তাঁর পরিচয়, শুধু মারকিউরাস নাইট্রাইটের আবিষ্কর্তা হিসেবে। এর বাইরে তাঁর সম্পর্কে কিছু জানে না ওরা!

    গোপালকৃষ্ণ গোখলে গান্ধীজিকে প্রফুল্লচন্দ্রের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ইনি হলেন অধ্যাপক রায়। ইনি মাসে আটশ টাকা মাইনে পান, কিন্তু মাত্র চল্লিশ টাকা নিজের জন্যে রেখে, বাকিটা তিনি জনস্বার্থে, বিশেষ করে গরীব ছাত্রদের জন্যে ব্যয় করে থাকেন।

    ঠিক। মাথা নিচু হয়ে আসে ভাবলে।

    তাই তো, তাই তো, বেশ বেশ। তুমিও কেমিস্ট শুনে খুবই ভাল লাগছে। কত নতুন আবিষ্কার করবে তোমরা। দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে।

    আমরা তো কিছুই না। পরের গোলামি করে জীবন কাটবে। প্রফুল্লচন্দ্র তো শুধু রসায়ন শিক্ষক ছিলেন না, প্রযুক্তি বিজ্ঞানের প্রবক্তা আর শিল্পোদ্যোগীও ছিলেন। বেঙ্গল কেমিক্যালের মত এত বড় একটা প্রতিষ্ঠান তৈরি করলেন।

    প্রফুল্লচন্দ্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি হল – রসায়নের ইতিহাস প্রণয়ন। রসায়নচর্চায় ভারতবর্ষের অতীত গৌরবের কথা তুলে ধরেছেন তাঁর দুই খণ্ডে প্রকাশিত ‘এ হিস্ট্রি অফ হিন্দু কেমিস্ট্রি’ নামের প্রামাণ্য গ্রন্থে। বহু বিরল ও দুষ্প্রাপ্য পুঁথি ঘেঁটে কী অপরিসীম পরিশ্রম আর নিষ্ঠার সঙ্গে দীর্ঘ পনেরো বছর ধরে রসায়নচর্চার এই ইতিহাস লিখেছেন তিনি, তা এই বইটি পড়লেই বোঝা যায়। ইচ্ছে করেই এই বই তিনি ইংরেজিতে লেখেন, যাতে করে পাশ্চাত্যের রসায়ন-ইতিহাস প্রণেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়।

    রাজাবাজার অঞ্চলটা সত্যি তো, তাঁর স্মৃতিধন্য। কত নম্বর যেন? ঐ যে সায়েন্স কলেজের একটা ছোট্ট ঘরে...

    হ্যাঁ, ৯২ নম্বর আপার সার্কুলার রোড।

    শীর্ণকায়, অতি সাধারণ পোশাকের এই মানুষটিকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না তাঁর ক্ষুরধার পাণ্ডিত্যের কথা। কোনোদিন বাহ্যিক আড়ম্বর বা জাঁকজমকের বালাই ছিল না। মুখময় কাঁচা-পাকা দাড়ি। ওই ঘরে একটি ছোট দড়ির খাটিয়ায় শুতেন। কাঠের দুটো আলমারিতে থাকত সারা সপ্তাহের খাদ্য। চিঁড়ে, মুড়ি, গুড়, নারকেল সন্দেশ ইত্যাদি। আর থাকত ওষুধপত্র, এমনকি কাপড় জামা সেলাই করার ছুঁচ সুতোও। বাস্তবিক-ই এ যেন একজন ঋষির জীবন।

    সূর্য রোমাঞ্চিত বোধ করল এই শুনে, যে, বেঙ্গল কেমিক্যালের ফিনাইল আর জোয়ানের আরক বেদপ্রসাদরাও ব্যবহার করেন... সেও করে। দাদু তো বেশি খাওয়া হয়ে গেলে রাতের দিকে আইঢাই ভাব হলেই এক চামচ অ্যাকোয়া টাইকোটিস জলে গুলে দিতে বলেন। জোয়ানের মিষ্ট তীব্র গন্ধটি কী যে ভাল লাগে।

    আজ সূর্যের রোমাঞ্চিত হবারই দিন বটে। এর খানিক পরেই তার দেখা হবে সেই মেয়েটির সঙ্গে। সাধারণ পোশাকে, যেমন আছে তেমনি করে, সাজবিহীন। ঘামতেলের চাকচিক্যে মাখান মুখ। এক চিত্রশিল্পী, যে তার তার্পিনের গন্ধমাখা, তেল রং মাখা তুলি মুছে এসেছে ময়লা ন্যাকড়ায়। সারা ঘরে তার ছড়ানো ক্যানভাস আর রঙের টিউব আর তুলি। যেন কিছুই না, এমনিভাবে তাদের আলাপ হয়ে যাবে। নীপমঞ্জরীর সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধার স্বপ্নটাও সে সেদিন থেকেই দেখতে শুরু করবে, মারাত্মক আকুলতার সঙ্গে।



    অলংকরণ (Artwork) : অনন্যা দাশ
  • পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | পর্ব ৪ | পর্ব ৫
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)