• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৮৫ | জানুয়ারি ২০২২ | উপন্যাস
    Share
  • ফাল্গুনের গান (২) : যশোধরা রায়চৌধুরী






    ভবানীপুর। এই পাড়ার একটা চৌকোমত বাড়ি কিনেছেন সূর্যর দাদু। সূর্য, যে নাকি দাদুকে দাদু আর দিদিমাকে মা বলে, সারাদিন সারাক্ষণ এইসব নিয়ে বিপর্যস্ত থাকে। বয়স হয়েছে দাদুর। একদা ডাকসাইটে সিভিল সার্ভেন্ট এখন যেন কোন দিক কুলিয়ে গুছিয়ে সংসার করে উঠতে পারেন না। পেনশনে কটাই বা টাকা পান তিনি। সঞ্চিত ধন দিয়ে বাড়ি কিনে আপাতত ফাঁপরে। প্রথমে কলকাতায় ভাড়াবাড়িতে চাকরি, তারপর বহরমপুরে গিয়ে বিশাল হাতাওয়ালা একটা বাংলোবাড়িতে থেকে চাকরি। শেষটা রিটায়ার্ড জীবন টাকিতে কাটাবেন ভেবে দেশের বাড়িতে ফেরত যাওয়া। গৃহিণীর বাপের বাড়ি ওই টাকি। দেশের বাড়িতে বাগান আছে, জমিজমা আছে। আম জাম কাঁঠালের গাছ। কাছেই ইছামতী। ভারি সুন্দর পরিবেশ। কিন্তু লেখাপড়া, কর্ম ধর্মের টানে কলকাতায় বার বার আসতে হচ্ছে সূর্যকে। সূর্যর কথা মাথাতে রেখেই কলকাতায় নিজেদের একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই করতে গিয়ে প্রায় সর্বস্বান্ত হয়ে গেলেন দাদু। দোতলা বাড়ি। সুন্দর পেটানো ছাত, কংক্রিটের না কী বলে আজকাল। আগেকার কড়িবরগার ছাত নয়।

    এ বাড়ির খরচ উঠিয়ে নিতে হবে বলে নিচের তলায় ভাড়া বসিয়েছেন দাদু। তারপর কয়েক বছর যেতে না যেতেই মর্কটটা ভাড়া দেওয়া বন্ধ করল, জবরদখল করল দাদুর এক চিলতে বারান্দা ও উঠোন যা তাদের ভাড়াতে দেওয়াই হয়নি। তারপর সেই শুরু হল এক মামলার চক্কর। অনন্তকাল চলছে।

    সূর্য এসব কাজে দাদুকে সাহায্য করবে ভেবেও থই পায় না কিছু। এ বয়সে এত দায়িত্ব, এদিকে পড়াশুনো। নিজের কাজের ধারা অনুযায়ী সুযোগ সে পাচ্ছে না তেমন। হিজলিতে বেশ কিছুদিন ছোটাছুটি করল। তার প্রিয় স্যার শংকরবাবু অরগ্যানিক অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রির হেড। এক কালের জেলখানার চত্বরে ভারত সরকার বিশাল কাণ্ডকারখানা বসিয়েছেন। স্বাধীনতার রাতে নেহেরুজির বলা সেই ভবিষ্যৎবাণী ! আমাদের নতুন মন্দির হবে বড় কারখানা, বড় বড় প্রযুক্তির প্রতিষ্ঠান। সে স্বপ্নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ইঞ্জিনিয়ার ও নানা কর্মের প্রযুক্তিবিদদের গড়ে তোলার মন্দির হবে বলে বদ্ধপরিকর হিজলি। সে মহাযজ্ঞের ভেতরে, সূর্য, ভাবে, ঠাঁই হবে কি তারও?

    স্যার তার বন্ধুর মত। কাজে অকাজে স্যারের বাড়ি গিয়ে এক কাপ কফি তো জোটেই, স্যারের স্ত্রী নিজে হাতে রেঁধে তাকে না খাইয়ে ছাড়েন না অধিকাংশ দিনই। স্যারই বলেন তাকে, না হে সূর্য, তুমি বিদেশ যাবার ব্যবস্থাটাই এবার দেখো। বিদেশ না গেলে তোমার লাইনে সামনের দিকে এগুবার সম্ভাবনা তো বিশেষ দেখি না। এখানে ইকুইপমেন্ট তো সব এখনো কেনা হয়নি। বছর কয়েক আরো লাগবে। ওখানে তুমি তৈরি জায়গা পাবে। আইওয়ার এইমস, ওটা কারিগরি প্রযুক্তি শেখারই তো জায়গা। ওদেশের এডুকেশন সিস্টেমখানাও তো করেছে জব্বর। ভাবো সূর্য, ইউরোপের মত সাত-আটশো বছরের ইতিহাস নেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। তবু দু-তিন শো বছরে সারা পৃথিবীর নেতৃস্থানীয় হয়ে বসেছে ওরা।

    মন খুঁতখুঁত করে সূর্যর। সারা বিশ্বে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, তৃতীয় যুদ্ধটা কবে হবে তারই যেন প্রস্তুতি চলছে। পৃথিবীটা যেন দু-ভাগে বিভক্ত এখন। শীতল যুদ্ধ চলছে আমেরিকা আর রাশিয়ার ভেতরে। এক দিকে পুঁজিবাদী দেশগুলো পুঁজির শেষকথা আমেরিকার ধামাধরা আর অন্য দিকে রুশেদের চেলারা সবাই সমাজতন্ত্রী। পুঁজিবাদীরা বিশ্বাস করে বাজার অর্থনীতিতে চায় এমনকি আলপিন পর্যন্ত জনগণ দাম দিয়ে কিনুক। তাতেই অর্থনীতি চাঙ্গা থাকবে। আর সমাজতন্ত্রীরা চায় জনগণকে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো বিনামূল্যে দিতে। ক্ষুধার অন্ন, পরিধানের বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্যের সুযোগ ফ্রি করে দিতে হবে।

    সেই এগারো-বারো বছর থেকে বহরমপুরে ঢাকুদার হাতে তৈরি সূর্য। সমাজতন্ত্রের পাঠ সে পেয়েছে তাদের ছোট্ট ক্লাবের লাইব্রেরি ঘরে। ঢাকুদা এখন দিল্লিতে, রেভলিউশনারি সোশ্যালিস্ট পার্টির টিকিটে লোকসভা নির্বাচনে জিতে এম পি। এখন ক্রান্তি পত্রিকার সম্পাদক বুদ্ধ ভটচায তার বন্ধু। বিদেশে গেলে ক্রান্তি পাবে না নিয়মিত। মানব মাঝে মাঝে শতভিষাতে লেখে। সুনীল বলে একটি ছেলে কৃত্তিবাস পত্রিকা করছে এই হালে। সেখানেও লিখবে নাকি মানব। এক গোছা কবিতা।

    সূর্য গেল ক্রান্তির দপ্তরে। বুদ্ধকে টাকা দিতে হবে। বিদেশে সি মেইল-এর ডাকে পাঠাবে ক্রান্তি নিয়মিত সে। পই পই করে মানবকে বলে গেল তার যেখানে যা কাগজ বেরুবে সব যেন পাঠায়। আগেভাগে সেজন্যেও টাকা দিয়ে দিয়েছে মানবকে। জাহাজে চেপে মেজদার কাছে কাগজ যাবে। সে নিজে যেতে পারবে না। মানবের উত্তেজনা হয় ভাবতে। কিন্তু এই প্রিয় দাদা দূরে চলে যাবে। এ এই শত্রুপুরীতে তার কবিতা লেখার পক্ষে দাঁড়ানো একমাত্র মানুষ।

    অ্যাই, অ্যাই ইস্টুপিড! দাঁড়া। যাস্‌ কোথায়!

    হঠাৎ চিৎকার শুনে দাঁড়াল সূর্য। ক্রান্তি প্রেস সাঁইত্রিশ নং রিপন স্ট্রিটে উঠে এসেছে। সাংস্কৃতিক আর মননশীল পত্রিকা হিসেবে একে গড়ে তুলতে চায় বুদ্ধ। আর এস পি পার্টির মুখপত্র দ্য কল যেটা ত্রিদিব চৌধুরীর সম্পাদনায় চলে, তার থেকে আলাদা ক্রান্তি এখানেই। বুদ্ধ তাকে দেখতে পায়নি, ডাকছে কাকে যেন তার চিরাচরিত ভঙ্গিতে।

    একটি কৃষ্ণকায় এবং তদুপরি কৃশকায় ছেলে। প্রায় বালকই বলা যায়, বত্রিশ পাটি দন্ত বিকশিত করে ফিরে এল। রাস্তা দিয়ে খানিক এগিয়ে গেছিল। সে হাতে একটা বাজারের ডোরাকাটা থলিতে কিছু কাগজ নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল । বোধ হয় ক্রান্তির বিলিবন্দোবস্ত করতেই যাচ্ছিল।

    সুজ্জি, এই হল সমর। আমাদের এ অঞ্চলের সব বই বিলি করে ও। ওই তোমার কাগজ নিয়ে গিয়ে জাহাজে বুক করে আসবে। কুলতলিতে বাড়ি। সমর, জানো তো, স্থানীয় ছেলেমেয়েদের নিয়ে বিশাল কর্মকাণ্ড ফেঁদে বসেছে একেবারে। নাম দেওয়া হয়েছে তরুণ তীর্থ। ক্লাবের মত কিন্তু একেবারে নিচুতলার খেটেখাওয়া মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে ওরা। ছোটদের লেখাপড়া শেখাচ্ছে, গান, আঁকা, ব্রতচারী, কুচকাওয়াজ। শিগগিরি বড় করে রবীন্দ্র নজরুল সুকান্ত জয়ন্তী হবে ওখানে। যাবে? চলো না, তোমার যাবার আগে একটা পিকনিক মত হয়ে যাবে।

    সমরের ছিপছিপে তারুণ্য সূর্যর মনে ছেপে বসে যায়।

    বুদ্ধ বলে, এই সমর, এই দাদা কিন্তু লেখেটেখে।

    সূর্য লজ্জা পায়, যাহ কই আর লিখি। লেখার কথা ভাবছি। হয়ে আর ওঠে কই।

    না না, সমর একটা ভাবনা ভাবছে।

    হ্যাঁ সূর্যদা, বাচ্চারা নিজেরা হাত পাকাতে পারবে এমন একটা কাগজ ভাবছি। নামটা এখনো ভাবিনি।

    সূর্য বলে, কেন, তরুণ তীর্থই নাম থাক না! চমৎকার নাম।

    আপনি লিখবেন সূর্যদা? ছোটোদের মত করে বাংলাতে বিজ্ঞানের কথা লিখবেন?

    লেখো না সূর্য। বাংলায় সহজ ভাষায় বিজ্ঞানের নানা বিষয় লেখার কেউ নেই আমাদের। লেখো না! এই ব্যাটা, সমর, যা, ওই মোড়ের মাথার দোকান থেকে তিনটে চা বল না। খুব বেশি মিষ্টি দিতে মানা করবি। ও যেন গুড় গুলে পায়েস করে দেয় একেবারে।

    বুদ্ধ খুচরো বার করে পাঞ্জাবির পকেট থেকে। সূর্য আর বুদ্ধ রোয়াকে মোড়া পেতে বসেছে।

    এবারের ইস্যুতে দেখো সূর্য। আমরা সোমেন চন্দের সেই বিখ্যাত গল্পটি আবার ছেপেছি। বনস্পতি।

    সূর্যর মনে আছে। তখন সে কিশোর বালক। বহরমপুরের কাগজে পড়ত হিটলার বাহিনির ইউরোপ তছনছ করার কাহিনি। ফ্যাসিবাদ, শব্দটা আকাশে বাতাসে ঘুরছে। লেখক শিল্পীরা সারা পৃথিবীতে একজোট হচ্ছেন ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে। সেই সময়ে ঢাকার বুকে শহীদ হয়েছিলেন সোমেন চন্দ। অচ্যুত গোস্বামী ১৯৪০ সালে ঢাকায় প্রগতি লেখক সংঘ স্থাপনে অন্যতম উদ্যোক্তার ভূমিকা নেন। সেই সময় সোমেন চন্দের সহযোগে ক্রান্তি পত্রিকা সম্পাদনা করতে শুরু করেন। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন বাংলার সব জেলা শহরে ছড়িয়ে পড়ে যার মধ্যে ঢাকা শহর ছিল অন্যতম শক্তিশালী কেন্দ্র। ১৯৪২ সালের ৮ই মার্চ ঢাকার বুদ্ধিজীবী, লেখক প্রভৃতি শহরে এক ফ্যাসিবাদবিরোধী সম্মেলন আহবান করেন। স্থানীয় জেলা পার্টির অনুরোধে কমরেড বঙ্কিম মুখার্জি ও জ্যোতি বসু সেখানে বক্তা হিসেবে যান। সম্মেলন উপলক্ষ্যে শহরে খুবই উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং রাজনৈতিক মহল প্রায় তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। প্রথম যারা সম্মেলনের পক্ষে, দ্বিতীয় যারা সরাসরি বিপক্ষে, তৃতীয় যারা মোটামুটিভাবে তূষ্ণীভাব অবলম্বন করে নিরপেক্ষতার আবরণ নিয়েছিলেন। শেষোক্তদের মধ্যে প্রধানত কংগ্রেস মতবাদের অনুসারীরা ও দ্বিতীয় দলে ছিলেন জাতীয় বিপ্লবী, বিশেষত শ্রীসংঘ ও বিভির লোকেরা। যাই হোক, সম্মেলনের দিন সকালে উদ্যোক্তাদের অন্যতম তরুণ সাহিত্যিক সোমেন চন্দ আততায়ীর হাতে নিহত হন। তিনিই বাংলার ফ্যাসিবাদীবিরোধী আন্দোলনের প্রথম শহীদ।


    দেবযানী রান্না নিয়ে বসেছিলেন। উঁচু চৌকিতে বসেছেন। সামনে মস্ত উনুন। তোলা উনুনের চল এখনো হয়নি সেভাবে। বাড়ির পাকশালে থাকে মস্ত একটা ইট গাঁথা উনুন। তার গায়ে মাটি জলের পোঁচ বুলিয়ে বুলিয়ে উনুনের এবড়োখেবড়ো শরীরকে মোলায়েম করে রাখা হয়। ভেতরে পড়ে কয়লার আঁচ। সব বাড়িতেই রান্নাঘরের কাছাকাছি অংশে থাকে কয়লার ঘর বা কয়লার গাদা।

    রোজ রাঁধেন না দেবযানী। ছোকরা চাকর আছে একটি। সে বাজার করে। জোগান দেয় পাচক ঠাকুরকে। কিন্তু আজ দেবযানীর আনন্দের দিন। সূর্য ভাল খবর নিয়ে আসছে। বিদেশ যাবার সুযোগ পাবে, চিঠি পেয়েছে। তাছাড়া ওর জন্মদিনে এবার কিছু করাই হয়নি। সেদিন ও বিশেষ কাজে হিজলি গেছিল। হিজলিতে যে প্রযুক্তির বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে, সেখানকার রসায়নের অধ্যাপক শঙ্করবাবুর কাছে গিয়েছিল রিসর্চের কাজে। সেদিনের ক্ষোভ মিটিয়ে আজ দেবযানী আনন্দের সঙ্গে পায়েস রাঁধছিলেন।

    সূর্য বাড়ি ঢুকল সঙ্গে বিশাল একটা বাদামি পিচবোর্ডের বাক্স নিয়ে। প্রায় গন্ধমাদন যেন। বয়ে আনতে গলদঘর্ম।

    মা, ও মা, দেখো এদিকে এসে। কী এনেছি। দাদু, দেখো দেখো।

    দাদু, চোখে চশমা এঁটে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। মনোযোগ দিয়ে খবরের কাগজটা আদ্যোপান্ত পড়া তাঁর দিনের একটা কাজ। যদিও চোখে সামান্য অসুবিধা হয় এখন। নতুন চশমা করাতে দেওয়া, চোখের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া সবই সুজ্জি করেছে তাঁকে নিয়ে।

    দেবযানী উনুনের বুক থেকে কিছুটা কয়লা লোহার কাঁটা দিয়ে বার করে দিয়ে আঁচটা কমিয়ে দিলেন। মরা আঁচে চাপানো থাকলে পায়েস ঘন হবে। তলায় লেগে যাবে না।

    আঁচলে হাত মুছতে মুছতে এগিয়ে এলেন। কী রে, সুজ্জি। কী রাজ্যজয় করে এলি, দেখি!

    দেখে তাঁর মাথায় হাত। মুখে আঁচল তুলে খুঁক খুঁক করে হাসলেন। ও কী রে, এ যে রেডিওগ্রাম! বলিস কী সুজ্জি। এদিকে যে টাকার টানাটানি, আমার সোনার চুড়িকটাও বাঁধা দিতে হল। আবার এত্তো খরচ করে বসলি তুই?

    তোমার চুড়ি যতদিন না ছাড়াই আমি মরমে মরে থাকব মা। ও কথা বল না।

    আহা রে না না সুজ্জি, তোকে কি আমি খোঁটা দিতে পারি। সুজ্জির মুখে হাত বুলিয়ে, থুতনি ধরে এনে চুমো খেলেন আঙুলের মুঠিতে।

    সুজ্জি হেসে বলল, মা চিন্তা কোরো না, এ আমার নিজের অল্পসল্প উপার্জনেই কেনা। সামান্য দামের জিনিস। তবে হ্যাঁ, শখ আমার অনেক দিনই ছিল, এখন ভেবে দেখলাম দাদুর যেমন খবরের নেশা, এ দাদুর খুব কাজে লাগবে। আমি তো কত দূরে চলে যাব, বলো তো, তখন দেশ-বিদেশের খবর তো এ থেকেই জানতে পারবে। সঙ্গে সংগে। ধরো আমার যদি জাহাজডুবি হয়! খবরের কাগজ আসতে তো লাগে পুরো এক দিন। সাত সকালে তো বাসি খবর পড়ে দাদু। এটা থাকলে যেদিনের খবর, সেদিনই জানবে। আজ ভোরে আটলান্টিক সাগরের বুকে জাহাজডুবি হয়েছে...

    অসম্ভব ক্রুদ্ধ হলেন দেবযানী। চুপ কর বোকা ছেলে চুপ! চুপ! কী অলুক্ষুণে কথা বাবা, কখনো এসব খারাপ কথা বলে কেউ? ক্ষণে পড়ে যাবে কখন!

    রেগে অগ্নিবর্ণ হয়ে খুব বকলেন সুজ্জিকে। ছি সুজ্জি, ছি। ফিরিয়ে নে ওসব কথা।

    সুজ্জি হো হো করে হেসে দাদুকে বলল, দাঁড়াও আমি শর্ট ওয়েভে বিবিসি, ভয়েস অফ আমেরিকা সব ধরা শিখিয়ে দেব তোমাদের। পৃথিবী হাতের মুঠোয় এসে যাবে।

    দাদু হাসতে লাগলেন। নাতির গৌরবে। নাতির উদ্যোগে তাঁর এতদিনের সাধ তাহলে পূর্ণ হল। রেডিও ছাড়া কি আজকের দিনে পৃথিবীর একটা কাজও হয়? মানুষের প্রযুক্তির অগ্রগতির সবচেয়ে আধুনিক নমুনা তো রেডিও, ইথারতরঙ্গে এই খবর পাঠানোর প্রক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করেই তো দু-দুখানা বিশ্বযুদ্ধ হয়ে গেল। দেশে দেশে তথ্যের লেনা দেনা সবটাই এর হাত ধরে। কিন্তু সে হল বড় ঘরের বড় কথা। বড় বড় দেশের গল্প। কলকাতায় বাঙালির প্রতি ঘরে ঘরে রেডিও এখনো আসেনি বটে, তবে পাড়ায় এক বাড়িতে গান হলে অন্যেরা তাদের নিজেদের ঘরে বসে, বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে গান শুনে নেয়। আত্মীয় বা প্রতিবেশীরা দল বেঁধে রেডিও শুনতেই যায় একে অন্যের বাড়িতে। যাই বল তাই বল, এ কিন্তু বেশ শখের জিনিস এটি। আর কে না জানে যে সুজ্জির স্বভাবটাই বেশ শৌখিন। তা পকেটে রেস্ত থাক আর না থাক।

    হলদেটে বাক্স, মাথাটা দামি বাদামি কাঠের খোল। বাক্সর মত অংশটায় বোতাম আছে, দাগ দাগ কাটাও আছে। বোতাম ঘোরালে কাঁটা সরে সরে দাগে দাগে পড়ে। বিজলিতে চলে। প্লাগের পয়েন্টে তার ঢুকিয়ে দিতেই কেমন একটা গোঁ গোঁ খশ খশ আওয়াজ, রেডিওর ভেতরে যেন ঝড় বইছে, সমুদ্রের ঢেউ ভাঙছে।

    গোটা একটা দিন কেটে গেল দাদু নাতিতে রেডিও চালু করতে। পায়েস খাওয়া মাথায় উঠল। এ দিক সেদিক ঘুরিয়ে শেষমেশ আকাশবাণীর স্টেশন ধরল সুজ্জি। হেমন্তকুমারের গান চালু হতে মনে বেশ শান্তি এল সবার। থিতু হয়ে বসল সবাই মিলে রেডিওর চারধারে। দাদু তাঁর পছন্দের আরামকেদারায়, মা খাটে আর সুজ্জি মাটিতে। বাড়ির সব কাজের লোকেরাও দরজার বাইরে মেঝেতে থুবড়ে বসে গান শুনছিল। ছোকরা চাকর মধুকে সুজ্জি খেপাচ্ছিল, দ্যাখ যারা গান গাইছে, এই বাক্সটার ভেতরে তাদের হাত পা কেটে বসিয়ে দিয়েছে। তাই গান বেরুচ্ছে। বুঝেছিস?

    গান শুনতে পাগলের মত ভালবাসলেও, রেডিও কেনার কথা ভাবতেই পারত না কিছুদিন আগেও তো সে। তখন হিজলিতে রিসার্চ করতে যায় সূর্য। সামান্য জলপানি পায়। চাকরির কোন আশা দেখছে না।

    সে রুপোর চামচ মুখে দিয়ে আসেনি। জীবনে কোনকিছুই তাই সহজে হবার না। নিজের হাতেই সব করতে হবে। আপনা হাত জগন্নাথ।

    কেমিস্ট্রি নিয়ে পড়াশুনো করলেও, প্রথম জীবনে ফিজিক্স নিয়ে তার পড়ার ইচ্ছে ছিল। অ্যাস্ট্রোনমি তাকে খুব টানত... গ্রহ তারা সূর্য চাঁদের রহস্য, মহাকাশ, গ্যালাক্সি... ভিন্‌গ্রহের প্রাণীদের গল্প পড়েছে শৈশবে... তার সঙ্গে এইসব। কিন্তু অঙ্ক তার ভাল হল না। পদার্থবিদ্যা পড়বে অথচ অঙ্ক তেমন শক্তপোক্ত নয় এমন তো হয় না। মনে দুঃখ পেল সূর্য। অঙ্কের নম্বর তাকে দুঃস্বপ্নের মত তাড়া করত। মনে হত আমার মাথাটা অসীম সরখেল বা দীপক রায়ের মত চাঁচাছোলা নয়। আমার মাথায় ঝামা। তারপর সে নিজের ভাগ্যকে দুষত, তার সব সময় মনে হত সে ভাগ্যদোষে পিছিয়ে পড়ছে। কী যেন নেই, কী যেন পাচ্ছে না। পেতে পেতেও পাচ্ছে না।

    এইসব ভাবনা একদিন সচেতনে দূরে রেখে বি এসসিতে ভর্তি হয় বহরমপুর কলেজেই। তারপর কেমিস্ট্রিতেই তার মন লেগে যায়। কিছুদিনের মধ্যে কেমিস্ট্রি ল্যাবরেটরির ঝাঁঝাল সালফিউরিক অ্যাসিডের গন্ধ, যা নাকি অনেকের দু-চক্ষের বিষ, তার ভাল লাগতে থাকে। তাদের এক সহপাঠী গরম ল্যাবরেটরিতে ওইসব ঝাঁঝাল ইউরিয়া আর সালফারের গন্ধে অজ্ঞানও হয়ে গিয়েছিল। সবাই বলে কেমিস্ট্রি মানেই কেবল মুখস্ত আর মুখস্ত। থিওরি ক্লাসে মাঝে মাঝে ঘুম পেলেও, তাকে টানে প্র্যাকটিকাল ক্লাসগুলিই।

    যদ্দিনে সে কলকাতায় রাজাবাজারে এম এসসি পড়তে আসে, ততদিনে মন থেকে উধাও হয়ে গিয়েছে এইসব ক্লাসরুমের আর ল্যাবের দিনগত পাপক্ষয়ের চিন্তা। ওগুলো তো আছেই। কিন্তু সে পাগলের মত তখন পড়ছে নানা বই। বিশেষত বিজ্ঞানের ইতিহাস। পড়ছে আইনস্টাইনের করা কাণ্ডগুলো। ১৯০৫ সালে নাকি আইনস্টাইনের মত তরুণ গবেষক, অংক কষে প্রমাণ করলেন, আছে আছে, অণুর ভেতর যে পরমাণু আছে, আর পরমাণুর ভেতর যে ইলেকট্রন আছে, সেই ইলেকট্রনেরা কেবলমাত্র বাঁধাধরা শক্তির আসনে, থুড়ি, কক্ষেই থাকতে পারে। তার আগে অব্দি যা ছিল আন্দাজি তত্ত্ব, থিওরি, তাকে নাকি অংক কষে হাতে কলমে প্রমাণ করে দিলেন আইনস্টাইন। তারপর সেই কোয়ান্টাম থিওরির আশ্চর্য জাদুর খেল। কী থেকে ফোটো ইলেকট্রিক এফেক্ট এল... জার্মানিতে গবেষণা করতে করতে ধাঁধা লেগে গেল মাথায় বিজ্ঞানীদের। সোনার দুটো পাতলা পাত, তার ওপর তীব্র আলো ফেলা হল, পাত দুটো নড়ে উঠল। আলো কি তরঙ্গে চলে না আলো আসলে কণিকা? আইনস্টাইন এলেন। বললেন আলো হল কণা। খুব ক্ষুদ্র হলেও ধাক্কা দিতে পারে। ঠিক কম্পাঙ্কের আলো সোনার পাত থেকে ইলেক্ট্রনেদের ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিতে পারে, আর তখন সোনার পাত দুটো বৈদ্যুতিক আকর্ষণ-বিকর্ষণের লীলায় মেতে এ ওকে নড়াতে পারে। কীমাশ্চর্যমতঃপরম।

    রসায়নের গল্পই বা কী এমন কম উত্তেজক? এই যে সূর্য এম এসসি পড়তে পড়তেই বেছে নিল জৈব রসায়নের দিকটাকে... তার পরের ধাপে, পিএইচ ডিতে সে জৈব রসায়ন নিয়েই কাজ করবে ভেবে ফেলল, তা তো এমনি এমনি নয়। রোম সাম্রাজ্যের সময়ে রং রেজিনিরা আবিষ্কার করে ফেলেছিল যে মানুষের প্রস্রাবে এমন কিছু আছে যা দিয়ে কাপড় রঙের ভেতর ছোপালে, রং হয় উজ্জ্বল আর টেঁকসই। ব্যাস শুরু হয়ে গেল পেচ্ছাপ বিক্কিরি। এমনকি সম্রাট পেচ্ছাপ বিক্রির ওপর করও চাপালেন... রাজস্ব তো আসা চাই এই রমরমিয়ে চলা ব্যবসা থেকেও!

    তার কত কত দিন পর, সবেমাত্র ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে, ভোলহার নামে এক বিজ্ঞানী অ্যামোনিয়াম সায়ানেট থেকে ইউরিয়া তৈরি করলেন। বলা যায়, আবিষ্কার করলেন। মানুষের বা পশুর প্রস্রাবে যে ইউরিয়া থাকে তা জানা গেছে তার আগেই। কিন্তু এবার থেকে ইউরিয়া হয়ে গেল শিল্পবিপ্লবের অন্যতম প্রিয় উপাদান... জৈব রসায়নের কাজে, পলিপ্রপিলিন থেকে শুরু করে কত না জিনিস বানাতে মূল উপাদান। কৃষিতেও সার হিসেবে ঘটল ইউরিয়ার প্রবল প্রসার।

    নতুন নতুন কত না জানা! কত না পড়া। দিনগুলো যেন উত্তেজনার ঢেউয়ের মাথায় চেপে কাটতে থাকে। জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় তো এই কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনই। বইপড়া, ক্লাস, ল্যাবরেটরি। তাছাড়া আড্ডা! সেখানেও ঘন্টার পর ঘন্টা কাটানো। কলকাতার পথে পথে ঘোরা... সিনেমা দেখা... আর রবি ঠাকুরের গান গাওয়া আর শোনা। পাশাপাশি আর একরকম গান উঠে আসছে... প্রগতিশীল ছেলেমেয়েদের কন্ঠে... তেতাল্লিশের সেই মন্বন্তরের সময় থেকেই, গণনাট্য সংঘ আর ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের দলগুলোর ভেতরে কয়েকজন সাংঘাতিকরকমের ভাল ভাল গান বাঁধছেন।

    সলিল চৌধুরী তাদের মধ্যে অন্যতম। সুচিত্রা মিত্রের কন্ঠে কৃষ্ণকলি। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কন্ঠে ‘কোন এক গাঁয়ের বধূ’ চমৎকার গান হয়েছে। সকলেই বলাবলি করে, রবীন্দ্রনাথের পর এমন সুরারোপ এই প্রথম। উদ্‌বুদ্ধ করছে এইসব গান মানুষকে।

    কম বয়সে ডি এল রায়ের গানও খুব উত্তেজিত করত সূর্যকে। গাইতেও ভাল লাগত সবাই মিলে। কিন্তু তারপর কেমন যেন মিইয়ে গিয়েছিল গানের সুর। মধ্যের কিছুদিনের রোমান্টিক সুরকে অতিক্রম করে সলিল চৌধুরীর সুর জনগণের সুর হয়ে উঠছে ক্রমশ। অসামান্য এক স্পিরিট এইসব গানে পায় সূর্যরা। নিজেদের আত্মার আত্মীয় যেন এসব গান। ঢোলক জাতীয় তালবাদ্য শুধু না, ট্রাম্পেট, ক্ল্যারিনেট এইসব যন্ত্রের অনুষঙ্গগুলো এমনই, গানগুলো হয়ে দাঁড়ায় যেন মার্চিং সং। রাজনৈতিক জীবনে খুব বেশি মানুষের কাছাকাছি না থাকলে পারা যায় না এমন সব বাজনা ব্যবহার করতে। আই পি টি এ-তে হেমন্ত আছেন, সেই হেমন্ত যিনি সব কিশোর কিশোরী বালক বালিকার হার্টথ্রব...।

    এম এসসি শেষ করার পর কী করবে ভাবছে সূর্য। দাদু ও মা কোন চাপ দেন না। কিন্তু বাবার দিক থেকে একটা চাপ আছে। আসলে বাবা খুবই জর্জরিত ঋণের বোঝায়। এই ঋণ একদিনে শোধ হবার নয়। তবে বড় সংসার হলে যা হয় আর কি, বাবা নিজের চাকরি করে আর দোকানভাড়া থেকে যেটুকু যা পান, সবটাই তলিয়ে যায় দিনগত পাপক্ষয়ে।

    বাবাকে সাহায্য করতে চাইলেও, এখুনি কলকাতা শহরে যে কোন একটা চাকরি কী পাওয়া যাবে, সে চেষ্টা করে দেখবে কি না ভাবছিল সূর্য। যে কোন বিষয়েই সে বড় দ্বিধাদোদুল থাকে। এই তার চরিত্রের আর একটা বড় দোষ। সে একবার ভাবে এখনই যা পাওয়া যায় তেমন একটা চাকরি নিয়ে ফেলি। বাবাকে খানিক আর্থিক সাহায্য তো করতে পারব। আবার ভাবে, তার যে অনেক পড়ার ইচ্ছে। অনেক দেশ দেখার ইচ্ছে। অনেক দূরে দূরে গিয়ে নিজেকে আবিষ্কার করার ইচ্ছে। সেসব কিছুই হবে না এখনি চাকরি নিলে।

    শেষমেশ, সমাজতান্ত্রিক ভাবধারায় দীক্ষিত হয়েও সে চলেছে মার্কিন মুলুকের স্বপ্ন দেখে। নিজের কেরিয়ার তৈরি না করলে সব বৃথা। বন্ধুরা খেপিয়েছে, রাজার মত তোমার চেহারা। জমিদারপুত্তুর তুমি। রাঙা মূলা! তার ওপর আবার দাদুর টাকায় বিদেশ যাচ্ছ। আমাদের কপাল ফুটো তাই কিসসু হল না।

    মুখ লাল করে সূর্য চেষ্টা করে নিজের পক্ষ সমর্থনের। আর তত জিভ জড়িয়ে আসে। সে তো দেশোদ্ধারের স্বপ্নও দেখেছিল। অথচ নিজের জীবনের পথটাকে সুন্দর করে গড়ে তোলার স্বপ্ন, একটা বিশাল, একেবারে আধুনিক যন্ত্রপাতি সজ্জিত ল্যাবরেটরিতে কাজ করার স্বপ্ন। সে আকর্ষণ যে কী!

    এবার তার প্রস্তুতি সম্পূর্ণ হয়েছে। আর দেরি নেই। জাহাজের টিকিট কাটা হয়েছে। কাগজপত্র সব রেডি।

    চামড়ার একটা স্যুটকেস কেনা হয়েছে, নতুন শার্ট প্যান্ট কয়েকজোড়া বানানো হয়েছে। সব সাহেবপাড়ায় করানো। অবিনাশদার দেখানো দোকান থেকে। রক্ত জল করা অর্থ সব ব্যয় হয়েছে তাতে।


    শাট আপ অ্যান্ড ক্যালকুলেট!

    কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ক্ষেত্রে কথাটা এসেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পর। তাত্ত্বিক, দার্শনিক যে সব প্রশ্ন গুঁড়ি মেরে উঠে পড়েছিল বিজ্ঞানিদের ল্যাবের টেবিলে, সেগুলো এক পাশে সরিয়ে রেখে নয়া ব্যবহারিক জ্ঞান নয়া প্রযুক্তি নয়া উদ্ভাবন করো, তার জন্য ক্যালকুলেশন মানে হিসেবনিকেশ করা জরুরি। তাত্ত্বিক কথা কপচানোর সময় নেই।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পৃথিবীটা খান খান হয়ে গেছে। ধ্বসে গেছে ঊনবিংশ শতকের শেষাশেষি থেকে প্রযুক্তিগত জ্ঞানের শিখরে উঠে আসা জার্মানি। সেখানে একমাত্র বিশ্বের বিজ্ঞানের কাজকর্মের রাশ ধরতে পারে কে?

    কে? কে? আমেরিকা! আবার কে।

    এমনিতেও ইহুদি বিজ্ঞানী ও বুদ্ধিজীবীদের যাঁরা হিটলারের মুঠো থেকে পালিয়ে বাঁচতে পেরেছেন তাঁদের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে আমেরিকাই। তাই সেখানেই জ্ঞান-বিজ্ঞানের পরের ধাপগুলো লড়ে নেবেন তাঁরা। অসম্ভব মেধাবী প্রখর বুদ্ধিশালী একটা বিশাল বিজ্ঞানী গোষ্ঠী আমেরিকার নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে আছেন। তাঁদের এখন গোটা পৃথিবীকে পুনর্নির্মাণ করতেই হবে আর তৈরি করতে হবে নতুন নতুন যন্ত্র, উদ্ভাবন করতে হবে আপাতদুর্বহ জীবনকে সুবহ করার নতুন নতুন শৈলী, উপায়। ফলত রিসার্চের পর রিসার্চ হয়ে চলেছে।

    এই রকম ঐতিহাসিক মুহূর্তেই সূর্যশেখর চলল বহুদূরের ওই আমেরিকা নামের দেশে। স্ট্যাচু অফ লিবার্টি সেখানে হাতছানি দিয়ে ডাকে মানুষকে। উচ্চাকাঙ্ক্ষী নতুন জীবনের খোঁজে বেরুনো মানুষকে। জ্ঞানার্থীকে। ছাত্রদলকে। দেশ-বিদেশের চিনে কোরিয়ান ভারতীয় জাপানি ইউরোপিয় ছাত্রেরা দল বেঁধে জাহাজে উঠছে। দু-চোখে স্বপ্ন।

    চুয়ান্ন সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে মাত্র কটা বছর আগে। ১৯৪৫ সালে। এই গত নয় বছরে অনেকটাই গুছিয়ে নিয়েছেন বৈজ্ঞানিক কুল তাঁদের ল্যাবরেটরিগুলো।

    --যে বিজ্ঞান মানুষের কাজে লাগে না সে বিজ্ঞানকে আমি মানি না। সোস্যালিস্ট পার্টির দর্শন এটাই। সমাজতান্ত্রিক দর্শনের মার্ক্সিস্ট দর্শনের বৈজ্ঞানিক জে ডি বার্নালের লেখা পড়ো সূর্য। উনতিরিশ সালে তাঁর দ্য ওয়ার্ল্ড, দ্য ফ্লেশ অ্যান্ড দ্য ডেভিল বেরিয়েছিল। সে যেন গল্পকথা। ভবিষ্যৎ পৃথিবীকে তিনি কী চমৎকার ভাবে এঁকেছেন।

    মন্টুদা বলেছিলেন সেদিন। মাথায় গেঁথে ছিল সেটা।

    সূর্য আমেরিকা এসে লাইব্রেরিতে সে বই পড়েছে। আর সদ্য কিনেছে বার্নাল সায়েবের নতুন বইটা। এই তো ১৯৫৪ সালেই বেরিয়েছে তাঁর বই সায়েন্স ইন হিস্টরি। তার টেবিলের ওপরেই শোভা পায় বইখানা। বার্নাল বলেছিলেন অধ্যাপকরা রাজনীতির বাইরে থাকলেও, রাজনীতি কখনো অধ্যাপকদের বাইরে রাখে না। পৃথিবীর যেকোন শিল্প-সাহিত্যের মত বিজ্ঞানের ক্ষেত্রটিও রাজনৈতিক রঙে ছোপানো। ব্রিটিশ এই বৈজ্ঞানিকের কথা অনেকের ভাল লাগেনি। বিজ্ঞান বিজ্ঞানের জন্য। এরকম বলেছেন অনেকে। যেমন বলা হয় শিল্প শিল্পের জন্য। কলাকৈবল্যবাদীদের কথাকে অনেক দিক থেকে ঠিক লাগে অনেকের। হ্যাঁ তো, মানুষ খেতে পাক আর না পাক, সূর্য পূর্ব দিকে উঠবে। আর দুই আর দুই চার হবেই। কাজেই সমাজ সংসারের ভাল করার দায় বিজ্ঞানের নেই। বিজ্ঞানকৈবল্যবাদীরা এমন বলবেন। অথচ সত্য সুন্দর শিব, এগুলো কি সবার জন্যে কাজে আসবে না? কাজে আসা উচিত না?

    তবে কেন ডাক্তাররা খেটে মরেন ম্যালেরিয়ার ওষুধ বের করার জন্য, অথবা বসন্তের টিকা দেবার বিশাল প্রকল্প নিয়েছে একের পর এক সরকার? কেন নানা রোগের জন্য চিকিৎসার খোঁজে মাইক্রোস্কোপের ওপর ঝুঁকে কোমরের দফারফা করেছেন বৈজ্ঞানিক ডাক্তারদের দল, যুগে যুগে। মানুষের জন্যই তো সব।


    আমেরিকায় বসে বসে, যে দিনগুলোতে তার ছাত্রপড়ানো বা ল্যাবরেটরির শিশিবোতল ঘাঁটাঘাঁটি নেই, পেট্রিডিশে বিশ্বদর্শন নেই, সেই সেই দিনগুলো সূর্য চুপটি করে খাটে শুয়ে সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে স্মৃতিরোমন্থন করে। কলকাতার। কলকাতা! তার মনকে গড়ে দিয়েছে কলকাতাই। মন্টুদা তার রাজনীতির মনকে গড়ে দিয়েছিলেন। আর প্রেমেনজেঠু তার লেখালেখির মননকে।

    মন্টুদার বাড়ি থেকে সেদিন বেরিয়ে এক হাঁটা দিয়েছিল সূর্য। প্রেমেনজেঠুর বাড়ি গিয়েছিল। এ হাঁটা কিছুই নয়। বাহান্ন সালের কলকাতা শহরের রাস্তায় ধর্মতলা থেকে কালিঘাট হেঁটে চলে যাওয়ার অভ্যেস অনেকেরই আছে। বড় বড় প্রশস্ত ফুটপাত তৈরি আছে। রাস্তায় ক্বচিৎ কদাচিৎ ধনীদের মোটরগাড়ি দেখা যায় । শুধু ট্রামে চাপা না পড়লেই হল। ঘড়ঘড় করে টিকিবাঁধা ট্রাম তার নির্দিষ্ট পথ দিয়ে চলে... লৌহপাতের ওপর তার সেই ভারিক্কি মন্থর চলাকে বড় আপন মনে হয় সূর্যর। আজ সে কয়েকটা পয়সার জন্য ট্রামে না চেপে এপাড়-ওপাড়া হেঁটেই মারবে। এটাই রেওয়াজ...

    অবিশ্যি ট্যাক্সি চেপেছে সে এক-আধদিন... খুব শখ করে। ফেলোশিপের পয়সা প্রথম যেদিন হাতে এল আর বোনেদের জন্য জামার ছিটকাপড় নিউ মার্কেট থেকে কিনল...

    হলুদ ট্যাক্সি। চালক অধিকাংশই পাগড়ি পরা শিখ সর্দারজি। হিন্দিতে ছাড়া তারা কথা বলে না বলে অনেক বাঙালি ট্যাক্সি চাপতেই ভয় পায়।

    প্রেমেনজেঠু সূর্যকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন।

    আশ্চর্য। এমন অদ্ভুত ডাক তো কোনদিন পায়নি সূর্য? বরং নিজেই নিজের গরজে গিয়ে বসে থেকেছে লোকটার বাড়িতে। পিতৃবন্ধুত্বের খাতিরে ওকে স্নেহই করেন উনি। কিন্তু তবু, নিজেকে সামান্য এক পাঠক, নেহাতই এক পুত্রস্থানীয় ছাত্রই ভাবে সূর্য।

    চটপট গায়ে একটা শার্ট গলিয়ে সূর্য দ্রুত হাঁটা দেয়। হরিশ মুখার্জি রোড পেরিয়ে রাস্তাটা যেখানে আদিগঙ্গার ঘাটের দিকে সরু হয়ে বেঁকে গেছে সেখানেই প্রেমেনজেঠুর বাড়ি। রোজ এ বাড়িতে তিরিশ-চল্লিশ কাপ চা হয়, বিশেষ করে ছুটির দিনে। কাকিমা নিজেও খুব চা খেতে ভালবাসেন। এদিকে আবার কলিকের ব্যথা আছে।

    প্রেমেন্দ্র মিত্র যখন ছায়াছবির জগতে পা রাখলেন অনেকেই বলেছিল, এবার তোমার সাহিত্য যাবে। ১৯৪৫ সালে প্রথম এই ব্যক্তিই মশা নামে একটা অসাধারণ বিজ্ঞানভিত্তিক গল্প লিখে ফেললেন দেবসাহিত্য কুটিরের পূজাবার্ষিকী আলপনায়। সেই থেকে বছরে একটা করে তাক লাগানো গল্প লিখে যাচ্ছেন। অন্যদিকে সেই সময় থেকেই কাজ করে যাচ্ছেন চিত্র পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার হিসেবে। দুটো কেমন মেলানো কঠিন। এই তো, ১৯৪৮ সালেই, কালোছায়া বলে একটা দুর্দান্ত রহস্যরোমাঞ্চে ঠাসা ছায়াছবি বানালেন জেঠু। ধীরাজ ভট্টাচার্যকে দিলেন ডাবল রোল। তখন ডাবল রোল খুব একটা ছবিতে দেখাই যায় না। সিনেমা ব্যাপারটাই বাঙালি বুধসমাজে কেমন যেন ব্রাত্য, কেমন যেন মনে করা হয় ও লাইনের লোকেরা ঠিক সুবিধের নয়। অথচ এই নতুন মাধ্যমটাকে নিয়ে এমন মেতে উঠলেন প্রেমেনজেঠু, যে রাত দিন এক করে কাজ করতে লাগলেন। অথচ ফাঁকে ফাঁকে লিখে যাচ্ছেন কী সব গল্প। প্রতি বছর পুজোর সময় ঘনাদার গল্পটার জন্য এরই মধ্যে সূর্যদের মত কত পাঠকের পথ চেয়ে থাকা।

    নিজের ছেলেমেয়ের কাছে যেমন, সূর্যর মত ছাত্রদের কাছেও কিন্তু তিনি আগে লেখক পরে সিনেমার লোক। উঠতি ছেলেপিলেরা কেউ সিনেমায় নামার ইচ্ছে নিয়ে এলে পরে প্রেমেনজেঠু খুব রাগ করেন। বলেন, আগে লেখাপড়া শেষ কর তবে অন্য কাজ। সূর্যকে তার পড়াশুনোর জন্যই এত ভালবাসেন প্রেমেনজেঠু। বিজ্ঞানবিষয়ে নিজের মত কাজ করছে একটি ছেলে, এরাই তো দেশের ভবিষ্যৎ।

    পণ্ডিত নেহেরু সাতচল্লিশ সালের পনেরোই আগস্ট রাত্রে বলেছিলেন, ভারত চলেছে নিজের নিয়তির সঙ্গে অভিসারে। একের পর এক নতুন নতুন গবেষণাকেন্দ্র তৈরির কাজ চলছে। বেকার সমস্যা দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা এখনো। শেয়ালদা স্টেশনের প্লাটফর্মকে ঘরবাড়ি বানিয়ে রয়েছে এখনো রিফিউজিরা। হিন্দু রিফিউজি দেশভাগের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য ও যন্ত্রণার শিকার। অনিশ্চিতি মাথায় করে নতুন নতুন ঢেউয়ে রিফিউজি, শরণার্থীর দল এসে পড়ছে এ বাংলায়। পূর্ব পাকিস্তান থেকে। তারা জানে না কোথায় যাবে। দেশে এখনো গড়ে ওঠেনি তেমন কর্মসংস্থানের সুযোগ।

    তবু প্রেমেনজেঠুর মত লোকেরা আশাবাদী। বলেন, দেখ চতুর্দিকে কী বিশাল সাড়া পড়ে গেছে। কত নতুন পরিকল্পনা হচ্ছে। কত শত নতুন চাকরি পাচ্ছেন নানা ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিকেরা। খুব আশা পোষণ করেন প্রেমেনজেঠুও, বলেন, তোমরাই হলে নবযুগের পুরোহিত। ভগীরথের মত তোমরা নতুন প্রযুক্তি আনবে দেশের বন্ধ্যা জমিতে।

    আজ প্রেমেনজেঠুর বাড়িতে গিয়ে সূর্য চমকে উঠল। কত ছবিতে দেখেছে এঁকে, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়। ঘরোয়া চেহারা, শ্যামলা রঙের মধ্যে বড় বড় দুটি চোখ যেন কথা বলে। সাধারণ শাড়ি পরেই এসেছেন, গুছিয়ে বসে কথা বলছেন। একটা মজার কথা বলে হেসে গড়িয়ে পড়লেন নিজেই। কবে নাকি প্রেমেনজেঠুর স্ত্রী, মানে জেঠিমাকে সোজা রান্নাঘরে গিয়ে জড়িয়ে ধরেছিলেন, আসলে জেঠিমার কাছে বায়নাটা ছিল, ডায়ালগ মুখস্ত হয়নি বলে প্রেমেনবাবু যেন সেটে বেশি না বকেন।

    কথায় কথায় শোনা গেল, সাধনা চট্টোপাধ্যায় নাকি একবার নারকেলডাঙ্গার অরোরা স্টুডিওতে ডাকিনীর চরের শুটিং-এর সময়, ‘ডায়ালগ, ডায়ালগ’ বলে কান্না জুড়ে দিয়েছিলেন। তখন প্রেমেনবাবু সেই লোকলস্কর, হট্টগোলের মধ্যেই কোলে ফাইল রেখে ডায়ালগ লিখতে বসে গিয়েছিলেন। উনি সব পারেন।

    সূর্যকে দেখেই প্রেমেন্দ্র মিত্রের অন্যমনস্ক মুখে একটা চিন্তার রেখা ফুটে উঠল। “ও হো, সূর্য, তোমায় ডেকে পাঠিয়েছিলুম, তাই তো? আরে তোমার সেই এক দিস্তে কবিতার কাগজ আমি যেন কোথায় রাখলুম, ফেরত দেব দেব করে... তারপর খুঁজেই পাই না। লজ্জায় পড়ি আর কি। শেষে আজ সকালে খুঁজে পেয়েই তোমাকে ডেকে নিলুম।”

    ভেতরের ঘর থেকে বান্ডিল করা কাগজগুলো এনে সূর্যর হাতে দিলেন। সূর্যর গলার কাছটা উৎকন্ঠায় দলা পাকিয়ে আছে। লজ্জাও হচ্ছে। এত ব্যস্ততার মধ্যে জেঠু এই লেখাগুলো পড়েছেন, শুধু তার আবদার রাখতেই?

    --আমার ভারি লজ্জা হচ্ছে জেঠু। আপনার সময় নষ্ট করালাম। কবিতাগুলো কিচ্ছু হয়নি, তাই তো?

    --আরে কী বলছ এটা সূর্য। তোমার লেখা, কিচ্ছু হয়নি কী বলছ। হয়েছে তো অবশ্যই। কিন্তু কি জানো, কিছুটা রাবীন্দ্রিক, কিছুটা রবি-অতিক্রমের চেষ্টা সব মিলিয়ে কবিতাগুলো বেশ চটকদার, চমকদার হলেও, আমার মতে, এটা তোমার লাইন নয়। তোমার কাছে বাংলা সাহিত্য আরো অনেক কিছু আশা করতে পারে।

    --মানে?

    --আরে তুমি গল্প উপন্যাস লেখো সূর্য। এই যে হিজলিতে কাজ করছ, অর্গ্যানিক কেমিস্ট্রির এত জটিল সব বিন্যাস নিয়ে ভাবছ, পড়ছ, কত কত সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাচ্ছে। মাথার মধ্যে কত কিছু গড়ে উঠছে, ভাঙছে। ... এই যে সর্পগন্ধার শিকড় নিয়ে সেদিন আমাকে কী একটা বললে, ব্যস্ততার মধ্যে ছাই সব কি শুনেছি? এইসব বিষয় নিয়ে, বা প্যালিয়েন্টোলজি, জিওলজি, মহাকাশবিজ্ঞান এসব নিয়ে কিছু লেখো না কেন? মনকাড়া লেখার হাত আছে তোমার। গভীর পড়াশুনোও আছে। সব মিলিয়ে চেষ্টা করো।

    মাথা নিচু করে ভাবার চেষ্টা করে সূর্য। হ্যাঁ, জেঠু নিজেও যে বিজ্ঞানভিত্তিক গল্পগুলি লেখেন, হাজার গল্পের মধ্যে সেগুলি স্বতন্ত্র, প্রচণ্ডভাবে নিজস্বতায় ভরা। এইসব লেখা সবাই লিখতে পারে না। ঘনাদার গল্পগুলোর মত লেখা তো সহজে হয় না। এমন এক-একটা লেখা লিখতে তাকে সারা বছর কত প্রস্তুতি নিতে হয়, চিন্তা করতে হয় এবার কোন বৈজ্ঞানিক বিষয় বা সূত্র নিয়ে লিখবেন। একটা মশা লিখে দেখাতে গেলে কত অগাধ জ্ঞান ও পড়াশুনো যে দরকার। অথবা পিঁপড়েপুরাণের মত লেখা একটা, লিখতে গেলে যে কারুর কব্জি খুলে পড়ত। সমসাময়িক রাজনীতির কতটা জ্ঞান থাকলে সাখালিন দ্বীপের মত একটা ভৌগোলিক রাজনীতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিয়ে ফেলা যায় গল্পকে! এই দ্বীপটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে এসে যায় সারা পৃথিবীর নজরে, এর একাংশ দখল করে জাপান, একাংশ রাশিয়া। বিজয়ী আর বিজিতের মধ্যে সন্ধিপ্রস্তাবে সাখালিনের ভাগ্যনির্ণয় উঠে এসেছিল খবরের কাগজের পাতায়। সেই কারণেই একে বেছে নিয়েছিলেন জেঠু।

    বিনীত ভঙ্গিতে সূর্য জেঠুর দিকে তাকায়। বলে, বুঝতে পারছি আপনি কী বলছেন। আমার এসব লেখা দু-তিন বছর আগে লেখা, সবই কাঁচা হাতের। তাও যে আপনি পড়েছেন আমি কৃতার্থ। তবে আমার এগুলি ছাপাবার ইচ্ছে নেই একেবারেই। বরঞ্চ আমি আজকাল মানবকে বলি বেশি বেশি করে লিখতে। ওরও কবিতার হাতটা বেশ। ও আবার আলোক সরকার নামে একটি ছেলের সঙ্গেও মেশে। খুব ভাল একটা কাগজ বার করছে আলোক। শতভিষা।

    -- সে তুমিও এগুলি ছাপতেই পারো। তবে আমার কথাটা মাথায় রেখো। গল্প লেখো, বিজ্ঞানভিত্তিক গল্প।

    -- জানি না, ভয় ভয় করে। আমি কি পারব?

    -- আরে, আজ না হয় কাল পারবে। ভয়টা কী? যত বেশি দেখবে, যত বেশি জানবে, লেখার ভেতরে তত বিশ্বপৃথিবীটাকে আনবে।

    -- চেষ্টা অবশ্যই করব জেঠু। হস্টেলে থাকি যখন, তখন একা একা এসব ভাবি। তবে বোধ করি লিখতে শুরু করে দিলে আর বেশি ভাবতে হবে না।

    -- হ্যাঁ, একটা কি দুটো চরিত্রকে ধরে নাও। যেমন আমি ঘনাদাকে বানিয়ে বেঁচেছি। মজার চরিত্র বানিয়ে নিয়ে তার মুখ দিয়ে যা খুশি বলানোর মত স্বাধীনতা, যেটা লেখক পান, সেরকম ক্ষমতাবান আর কে আছে, বলো তো?

    -- ঠিক, ঠিক বলছেন। তবে বড় একা লাগে মাঝে মাঝে। আপনাদের দিকে দূর থেকে দেখি, আপনাদের লেখা পড়ি, একটু ভরসা পাই।

    -- পৃথিবীকে দরজার বাইরে আটকে রেখে তবেই লেখকের লেখা। একাকীই তো হয় লেখা। দরজা বন্ধ করে যখন লিখবে তখন আর কারুর কথা ভাববে না । শুধু লেখা আর তুমি। সিনেমা বানানোর একেবারে উল্টো প্রসেস। সিনেমা হল কতরকম লোককে এক জায়গায় করে শিল্প করা... ভিড়ে, হৈ হট্টগোলে। আর লেখা পুরো নিঃসঙ্গতার ফসল। শুরু করে দাও হে। লিখতে লিখতেই হাত সরে । তখন দেখবে ভাবনাগুলো আপনা থেকেই মাথার মধ্যে আসছে। এসে হাজির হয়ে যাচ্ছে। একেবারে অলৌকিকভাবেই একটা প্রসেস চালু হয়ে যায়। সে আনন্দের কোন তুলনা নেই।

    ভরা মন নিয়ে প্রেমেনজেঠুর বাড়ি থেকে বেরোয় সূর্য। এই মানুষটি সাহিত্যপ্রাণ। নইলে, এই সেদিনই সে যে পড়ল, ফ্যাসিস্টবিরোধী লেখক শিল্পী সংঘের সেই “কেন লিখি” বইতে, লেখাটা শুধু অবসর বিনোদন নয়, মানসিক বিলাস নয়। সামনের ও পেছনের এই দুর্ভেদ্য অন্ধকারে দুর্জ্ঞেয় পণ্যময় জীবনের কথা জীবনের ভাষায় বলার বিরাট বিপুল এক দায়।... সত্যিকারের লেখা শুধু প্রাণের দায়েই লেখা যায়।

    সে কি পারবে? এখনো পড়াশুনো করার কত বাকি, চাকরি করতে হবে তারপর, বাবাকে, দাদুকে কিছু অর্থসংস্থান করে সুপুত্রের দায় মেটানো বড় প্রয়োজন... সবার কাছে ঋণ বড় বেড়ে যাচ্ছে। দেশের এই বেকারত্ব, এত অভাব দারিদ্র্য, এসব থেকে মুক্তি পাওয়াও তো একটা কাজ। লেখক জীবনে সমস্ত উৎসর্গ করা খুব কঠিন তার পক্ষে। আর, এতকিছুর পেছনে পরিশ্রমের পর কি লেখার জন্য এতটুকুও কোন শক্তি বা অর্জন পড়ে থাকবে তার? অথচ লিখতে তো খুব ইচ্ছে করে।

    ...আজ সন্ধ্যাতেই হিজলি ফিরতে হবে। ফিরতে ফিরতে ভাববে সে। গল্প। বিজ্ঞানভিত্তিক।

    এখন, আমেরিকায় বসে, সে একে একে টাকা দিয়ে মেম্বারশিপ নিয়েছে কতগুলি সায়েন্স ফিকশন পত্রিকার। এই তো সুবর্ণ সুযোগ। পৃথিবীতে কী কী লেখা হচ্ছে বিজ্ঞানভিত্তিক গল্পের, তার হিসেব নেবার।



    অলংকরণ (Artwork) : অনন্যা দাশ
  • পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | পর্ব ৪ | পর্ব ৫
  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)