• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৩ | জুলাই ২০২৬ | স্মৃতি
    Share
  • আমাদের যাদবপুর আর যাদবপুরের আমরা (৩) : সুনন্দন চক্রবর্তী
    পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩



    অন্য আরেক টিউটোরিয়াল শুরু হয়েছিল গোলপার্কে। তখনও রামকৃষ্ণ মিশনের হাতে চলে যায়নি পার্ক। সর্বসাধারণের প্রবেশ অবাধ ছিল। বিকেলের দিকে সেখানে আড্ডা বসত আমাদের পশ্চিম দিক ঘেঁষে। পূর্ণ দাস রোডের কোনার চায়ের দোকান থেকে চা আসত। এখানে কারিগরি বিভাগের ছেলেরাই ছিল সংখ্যায় বেশি। গৌতম- গৌতম গুপ্ত – আর আমি প্রধানত আর্টস কলেজের, পরে যোগ দেবে মনসিজ সেনগুপ্ত যে গোটা কলেজ জীবনেই শানাই নামে খ্যাত। কুনাল বাসু, নীলোৎপল বসু, রাজা গুপ্ত, রাজু বোস, সৌমেন বসু– সবাই কারিগরি বিভাগের। টিউটোরিয়ালের প্রধান শিক্ষক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় – কারিগরি বিভাগের এই প্রাক্তনী তখন একটি টেকনিক্যাল কলেজের শিক্ষক আর পুরোদস্তুর গদ্যচর্চায় মাতোয়ারা – চলচ্চিত্রবিদ্যার জাদুকরী অধ্যাপক হয়ে ওঠা তখনও ভবিষ্যতের গর্ভে।

    বস্তুত সঞ্জয়দা-র গদ্য আমাদের কবিতা থেকে গদ্যে টেনে এনেছিল। আমি তখনও স্কুলের ছাত্র। বেলেঘাটায় সি পি আই এম কর্মি অসীমা পোদ্দার বেলেঘাটা থানার মধ্যেই ধর্ষিত হন। এটা বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজকে অন্তত খুব নাড়া দিয়েছিল। সেই সময় কারিগরি বিভাগের পত্রিকা ছায়াপথের একটি সংখ্যা সঞ্জয়দা, অশোকদা (ভট্টাচার্য) ইত্যাদি তৎকালীন ছাত্রসংসদের সভ্যরা অসীমা পোদ্দারকে নিয়ে বানিয়েছিলেন। ওরকম যন্ত্রণাক্ষুব্ধ, সংরক্ত, বারুদনিষিক্ত গদ্য আমি আগে কখনও পড়িনি। সেই সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় গোলপার্কের ঘাসে নামিয়ে নিয়ে আসত আঁদ্রে ব্রেতোঁ-র অলৌকিক ইস্তাহার, কাইয়্যে দ্যু সিনেমা-র ঠিকরে ওঠা তর্ক, অনন্য রায়ের দ্রোহ উন্মাদনার বিচ্ছুরণ, সুশীলসমাজ সম্পর্কে ঋত্বিকের বিবমিষা, মদন তাঁতির হরতাল মুখরিত তাঁত, মেদুরতা পরবর্তি জীবনানন্দের সশ্লেষ, নির্মম উন্মোচন। সঞ্জয়দা জানত সদ্য কৈশোর-উত্তীর্ণ তরুণদের শিল্পরুচির প্রাকার ঘিরে কোনো দেবসেনার জ্যোতির্বলয় ব্যুহ দরকার।

    সঞ্জয়দা যদি নাশকতার দেবদূত তাহলে কুণাল ছিল মূর্তিমান যুক্তিশৃংখল। ট্র্যাঙ্গুলার পার্কের পিছনে কুণালদের বাড়ি ছিল বই-এর রত্নভাণ্ডার। কুণালের বাবা, সুনীল বসু (কাটু বসু) ছিলেন ন্যাশনাল বুক এজেন্সি-র কর্ণধার। একাধিক বিদেশি ভাষায় ব্যুৎপত্তি ছিল তাঁর। আর ছিল অমোঘ, অব্যর্থ রুচি। কুণাল মেকানিক্যাল এঞ্জিনিয়ারিং-এর ছাত্র, কিন্তু আমাদের সবার থেকেই বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল অনেক বেশি। স্বাভাবিকভাবেই সে হয়ে উঠল আমাদের শিক্ষক। রীতিমতো নিয়ম করে সে আমাদের পড়াতে শুরু করল মার্ক্সবাদের মৌলিক গ্রন্থাবলি। তখন এমার্জেন্সি লাগু হয়েছে। তাই এই পাঠক্রম চলত গোপনে। লেনিনের ‘রাষ্ট্র ও বিপ্লব’, ‘এম্পিরিওক্রিটিসিজম’, মার্ক্স-এর ‘ক্রিটিক অভ গোথা’, ‘থিসেস অন ফয়েরবাখ’, ‘দ্য এইটিন্থ ব্রুমেয়ার’, এঙ্গেলস-এর ‘সোশিয়ালিজম ইউটোপিয়ান এন্ড সায়েন্টিফিক’, ডায়ালেক্টিক্স অভ নেচার’, মাও-এর ‘অন নিউ ডেমোক্রাসি’ ইত্যাদি ছিল মৌল পাঠক্রম। চে আর গিয়াপের গেরিলা যুদ্ধের কৌশল এবং রেজি দ্যব্রে-র ‘বিপ্লবের মধ্যে বিপ্লব’-ও ছিল খুব জনপ্রিয়। এছাড়া হাতে হাতে ঘুরত অস্ত্রভস্কি-র ‘ইস্পাত’, পলেভয়-এর ‘মানুষের মত মানুষ’, চিং চিং মাই-এর ‘বিপ্লবের গান’ ভিয়েতনামের গল্প সংকলন ‘হাতির দাঁতের চিরুনি’। প্রগতি প্রকাশন এবং রাদুগা-র কল্যানে সব বই-ই ছিল সুলভ। সঞ্জয়দা-র একটা প্রিয় লব্জ ছিল – রাশিয়ান গদ্য শাসন করতেন ঈগলতুল্য পুরুষেরা। সস্তা বলেই হয়তো আমাদের কাছে চেখভ, গোগোল, তলস্তয়, তুর্গেনেভ, পুশকিন, মায়াকোভস্কি, ব্লক-রা ছিলেন পরিচিত অন্তরঙ্গ ভালোবাসার লোক। ইংরেজি প্রকাশনার সস্তা সংস্করণও আমাদের মহার্ঘ মনে হত। কলেজ স্ট্রিট বা গড়িয়াহাটের ফুটপাথ ছিল পুরোনো ইংরেজি বই-এর স্বর্ণখনি।

    এই বই দেওয়া-নেওয়া আর রাজনৈতিক তত্ত্ব অধ্যয়ন শুধুমাত্র শখ নয়। কাগজে কলমে যদিও ছাত্র ইউনিয়নের দখল ছিল ছাত্র পরিষদের, আসল লড়াই ছিল ডি. এস. এফ. বনাম এস. এফ. আই-এর। ডি. এস. এফ. আনুষ্ঠানিকভাবে জন্ম নেয় ১৯৭৭ সালের পর। এটা ছিল মূলত নকশালপন্থার সমর্থক বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং ডি. এস. ও-র সম্মিলিত মঞ্চ। যুযুধান এই দুই পক্ষের কেউ-ই প্রকাশ্যে তেমন কোনো রাজনৈতিক পরিচয় দেওয়া বা রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের সুযোগ পেত না। দুপক্ষেরই লক্ষ্য ছিল কত বেশি সংখ্যক ছেলেমেয়েকে নিজের মতে দীক্ষিত করে ফেলা যায়। কথার ভাঁজে বুঝে নিতে হত কে এস. এফ. আই. আর কে ডি. এস. এফ.। প্রকাশ্য রাজনৈতিক পরিচয় স্পষ্ট করে না থাকার একটা সুবিধা ছিল সবাই মনে করত যুক্তি দিয়ে হয়তো এই ছেলেটা বা এই মেয়েটাকে নিজের পক্ষে নিয়ে আসা যাবে। কথা বলার একটা পরিসর ছিল। এক ধরণের বই বা গান ভালোলাগার একটা সৌহার্দ্য ছিল। প্রবল তাত্ত্বিক ঝগড়ার পরেও বন্ধুত্ব টিঁকে যেত। যাদবপুর আমাদের রাজনৈতিক বিভিন্নতাকে সংকীর্ণতায় আবিল হতে দেয়নি। আমার সেই সময়ের বহু বিরোধী ছেলেমেয়ের সঙ্গেই সখ্য অটুট থেকেছে।

    আর আমার মনে হয়েছে একটু আধটু পাগলামি তো সবার মধ্যে আছে কিন্তু যাদবপুরে ছাত্র এবং শিক্ষকদের মধ্যে যারাই নজরকাড়া পাগলামিতে চোখে পড়তেন তাঁরাই একটু বিশেষ সমীহ এবং স্নেহাশ্রয় পেতেন। আর এ ব্যাপারে তুলনামূলক সাহিত্য-কে টেক্কা দেবে সাধ্য কার! প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত এঁদের মধ্যে ছিলেন সবথেকে ধীর স্থির। তাঁর চলন বা চেহারায় কোনো উৎকেন্দ্রিকতা ছিল না। কিন্তু তাঁর কবিতার মতোই তাঁর চিন্তা এবং কথার বিচ্ছ্যুরণ ছিল কিছুটা হটকে।

    ক্ষ্যাপা সৃষ্টিশীলতা আর ধারালো বাক্‌ভঙ্গির ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর ছিলেন নবনীতা দেবসেন, শুদ্ধশীল বসু এবং মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। মানববাবু তখন জিনস্‌ এবং বাটিকের পাঞ্জাবি আর শান্তিনিকেতনি ঝোলায় শোভিত থাকতেন প্রায় প্রতিদিন। আমার সহপাঠি নির্মল আড়ালে ওঁকে বাতিকবাবু বলে ডাকত। মানববাবু সহস্র কিংবদন্তীর নায়ক। এই অসামান্য ব্যক্তিটি কন্টকময় বাক্যবর্মের অন্তরালে একজন অসামান্য নরম মনের মানুষ সেটা টের পেতে আমাদের একটু সময় লেগেছিল। সদ্য তরুণ ছাত্রছাত্রীদের চিন্তার জাড্যকে নাড়া দেওয়ার জন্যে মানববাবুর পদ্ধতি ছিল একটা আপাত অস্বৈরণ কথা বলে অল্প চুপ করে থাকা। তাঁর শ্রেণিকক্ষে একটি বিস্ফোরক সূচনায় তিনি বলেছিলেন ‘রবীন্দ্রনাথ তো বিদ্যাসাগরকে বেজন্মা বলে গিয়েছিলেন’। আসলে তিনি পরখ করে নিচ্ছিলেন কে কে মনে রেখেছে যে চরিতকথায় বিদ্যাসাগরের অবাঙালিসুলভ দৃঢ়তা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ‘কোকিলে আসিয়া কাকের বাসায় ডিম পাড়িয়া গিয়াছিল’ গোছের উক্তি করেছিলেন। আমি এরকম মহাপণ্ডিত ছেলেমানুষ আর দেখিনি। ওনার ছোটো ভাই সম্বরণ আমাদের স্কুল ক্রিকেট টিমের ক্যাপ্টেন ছিল। মানববাবুর জীবনে অন্যতম প্যাশন ছিল ক্রিকেট। বিশেষতঃ ক্রিকেটের গল্প।

    খুব ছেলেবেলা থেকেই অভাবী সংসারের দুঃখ লাঘব করতে মানববাবু অনুবাদ এবং লেখার কাজ করেছেন। তখন উনি ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসও লিখেছেন। তুলনায় অসফল কিনু প্রতিভাবান খেলোয়াড় প্রতি তাঁর ছিল অসীম পক্ষপাত। লালা অমরনাথ ছিলেন ওনার এক প্রিয় নায়ক। ইংল্যান্ড সফর থেকে অমরনাথকে যে বোর্ড ফিরিয়ে এনেছিল মানববাবু বলেছিলেন তার পিছনের গল্পটা হল লালা এক পার্টিতে ভিজিয়ানাগ্রামের নবাবের বান্ধবীকে জড়িয়ে ধরে নেচেছিলেন। বলাই বাহুল্য প্রমা্ণ তেমন কিছু নেই। কিন্তু মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় বললে এ গল্প তো বিশ্বাস করতেই ইচ্ছে হবে আপনার। মানববাবুর ইব্রাহিমপুর রোডের বাড়িতে এক চিলতে ঘরে মেঝে থেকে ছাদ অবধি ডাঁই করা আশ্চর্য সব বই। অকাতরে পড়তে দিতেন আমাদের। বিছানারও একটা অংশ দখল করে থাকত বই-এর স্তূপ।

    এই পাগলামির পরম্পরায় সবচেয়ে উজ্জ্বল সংযোজন শিবাজি বন্দ্যোপাধ্যায় – প্রথমে মানববাবুর ছাত্র এবং অচিরেই তাঁর সহকর্মী। শিবাজি আগে সেন্ট জেভিয়ার্স থেকে অঙ্কে স্নাতক। তারপর কিছুদিন ছেদ পড়ে তার। তারপর তুলনামূলক বিভাগে স্নাতকোত্তর পড়তে শুরু করে যতদূর মনে পড়ে ১৯৭৮ সাল থেকে। অম্লানের পুরোনো দোস্ত শিবাজি। সে-ই একদিন আলাপ করিয়ে দিল। ক্রমশ আমরা হয়ে উঠলাম অবিচ্ছেদ্য বন্ধু। ক্ষীণতনু, একমাথা অবিন্যস্ত চুল, প্রতিভাদীপ্ত শাণিত চোখের এই তরুণ ছাত্র মানববাবুকে তিরস্কার করতে করতে ঝিলপাড়ের রাস্তা ধরে হেঁটে আসছে এই দৃশ্য হামেশা চোখে পড়ত। আমাদেরও বিভাগের সব শিক্ষকের সঙ্গেই অবাধ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও একটা সম্ভ্রমের দূরত্ব ছিল। মানববাবু-ই একমাত্র ব্যক্তি যিনি সম্পর্কের ব্যাপারে পুরোপুরি সাম্যবাদী ছিলেন, বিশ্বাসে এবং ব্যবহারে। শিবাজি তখন প্রচুর পরিমাণে অঙ্ক শিক্ষকতা করে সংসার চালায়। (তুলনামূলক-এর আরেক আশ্চর্য অধ্যাপক সুবীর রায়চৌধুরি-র একটা বাচ্চাদের বই-এর গল্পে এক অঙ্কের মাস্টারমশাই ছিল এক শিবাজিবাবু স্যার। সুবীরবাবু বলতেন আমার গল্পের চরিত্ররা সব আমার ছাত্র হয়ে ফেরত আসে।) ফলত তার শিক্ষকতার অভিজ্ঞতাও মানববাবুর থেকে কম বলে সে মানবে কেন। কিন্তু শিবাজির গল্পটা পুরোটা আলাদা করে না বললে অন্যায় হবে। পরের কোনো কিস্তিতে সে চেষ্টা করা যাবে।



    অলংকরণ (Artwork) : ছবিঃ ইন্টারনেট থেকে নেওয়া
  • পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments