




কলঙ্ক
ভবিষ্যতের একটা বিশেষ আশা ধ্রুবতারার মত অনেক মানুষকে পথ দেখায়। সেই আশা সফল করার পথে সে সব আপদ বিপদ তুচ্ছ করে চলে, সুনাম, কলঙ্ক, ধর্ম অধর্ম কোনো কিছুকে গ্রাহ্য না করে, বরং কিছুমাত্রায় সেসবের সহায়তা নিয়ে এগিয়ে যায়। এগোনোই তার মূল মন্ত্র, বাকি সব তার কাছে গৌণ হয়ে যায়।
দিদ্দা রাজ্ঞী হয়েও অবস্থার ফেরে প্রধান অমাত্য বৃদ্ধ ফল্গুনকে উপপতি হিসেবে গ্রহণ করলেন। আসলে লোকে তাই জানল। রাজাদের এরকম অবস্থাতে কোনো দুর্নামের প্রশ্ন নেই। আগের প্রত্যেক রাজারই একাধিক পত্নী ও উপপত্নী ছিল, কেউ কেউ তাতে সন্তুষ্ট না হয়ে প্রজাদের নারী হরণ করতেন, ধর্ষণ করতেন, কিন্তু বহুগামিতা পুরুষের স্বভাবধর্ম ভেবে লোকে মেনে নিত। সংযমের কথা শাস্ত্রে বহুবার বলা হলেও যৌন আচরণে বেশিরভাগ রাজাদের সংযম কোনো যুগেই থাকত না, থাকে না। তবুও তাদের তেমন দুর্নামের প্রশ্ন ছিল না। কিন্তু বিধবা রাজমাতা যখন উপপতি গ্রহণ করলেন বলে খবর ছড়াল, সেই দুর্নামের ঢেউ তাঁর পুত্রকে ধাক্কা দিল। সে জানত না এই ব্যাপারটা দিদ্দা একটা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। প্রধান অমাত্য হিসেবে ফল্গুনের প্রাসাদে আসাযাওয়া অবারিত হলেও তিনি ফল্গুনকে শয্যায় আসতে দেননি, উপাধানের নিচে একটি শানিত ছুরিকা এবং চারজন সশস্ত্র নিপুণ দেহরক্ষী নারী তাঁর দ্বারে সবসময় থাকত, একথা ফল্গুনের জানা ছিল।
অভিমন্যু ছোটবেলা থেকেই খানিকটা রোগাভোগা, স্বাস্থ্য ভাল নয়। রাজার ছেলের সাধারণত যেমন শিক্ষা হয়, তাতে তার মন ছিল না, তাই সে কূটনীতির মারপ্যাচ বুঝত না। বহিঃশত্রুর আক্রমণ হলে যখন তাকে নিরাপদ কোনো মঠে পাঠানো হত, তার সময় কাটত নিজস্ব রুচিতে, প্রাসাদে ফিরলেও শত্রুর ভয়ে তাকে বাইরে যেতে খুব কমই দেওয়া হত, বাইরের সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ প্রায় ছিল না। নামে রাজা হলেও রাজনীতি বুঝত না বলে রাজ্যশাসনের ব্যাপারে তার তেমন কোনো মতামত ছিল না।
ষোল বছর বয়সে বিয়ের পর থেকে অভিমন্যুর স্ত্রী সুভগা রাজবাড়ির দাসদাসীদের কাছ থেকে রাজপরিবারের ব্যাপারে যেটুকু কথাবার্তা শোনে, তারা রঙ চড়িয়ে যা বলে তা-ই সত্যি খবর ভেবে মনে রাখে। স্বামী অভিমন্যু স্ত্রীর কাছে তার মায়ের কলঙ্কের কথা শোনে। অমাত্যদের কেউ কেউ অভিমন্যুকে বলে, মহারাজ, এবার তুমি নিজে শাসনের কাজ নিজের হাতে নাও। আমরা তোমায় সাহায্য করব। তোমার কলঙ্কিনী মাকে প্রজারা মানতে চাইছে না। অভিমন্যু নিজেও ভাল করে বোঝে না তার মা কত সাবধানে তাকে পালন ও কত বিপদের মুখ থেকে রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছেন। তবে মাকে এতদিন সে অশ্রদ্ধা করেনি, বরং বাধ্য থেকে পাশে দাঁড়াতে চেষ্টা করেছে। মা যখন যুদ্ধের মুখে তাকে মঠে সরিয়ে দিচ্ছেন, সে মায়ের কাছ ছেড়ে যেতে চাইত না, তাকে অনেকে বুঝিয়ে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হত। তাতে তাকে বিপদ থেকে দূরে রাখা হয়েছে বটে, কিন্তু সে বিপদের গভীরতা আঁচ করতে পারেনি, এবং তার রাজ্য রক্ষা করতে তার মায়ের দায়বোধ, সাহস ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের পরিচয় যা সেই সঙ্কটকালে ঝিলিক দিয়ে উঠত, তার আঁচও সে পায়নি। এখন সুভগা এবং তার পিতৃকুলের আত্মীয়েরা, যাদের কেউ কেউ রাজসেবায় নিযুক্ত আছে, যারা সামনে দিদ্দার বিরুদ্ধে কিছু বলার সাহস পায় না, তারা গোপনে তাকে মায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবার কথা বলছে, কিন্তু অভিমন্যু তার মায়ের বিবেচনাপূর্ণ কাজের স্বপক্ষে যুক্তি দিয়ে বলবার কথা খুঁজে পাচ্ছিল না। বছর কুড়ির রোগা অভিমন্যু মানসিক চাপে অসুস্থ হয়ে পড়ল।
অসুস্থতার কথা শুনে দিদ্দা ছেলের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। সে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চায় না। এতদিন মা তার বন্ধু, তার আশ্রয়স্থল ছিলেন। এখন মাকে দেখে সে উল্টোদিকে মুখ করে থাকল। দিদ্দা তার পরিবর্তন দেখতে পেলেন। তিনি ডাকলেন, অভিমন্যু, পুত্র!
অভিমন্যু বলল, আমায় পুত্র বোলো না। সবাই তোমায় দুঃশীলা বলছে। আমি দুঃশীলার পুত্র বলে অভিহিত হতে চাই না।
কী বলছিস, অভি!
হ্যাঁ, তাই বলছি যা তুমি শুনছ। আমি রাজা। আমি রাজ্যের প্রজাদের মনের খবর পাই।
শোন অভিমন্যু, যা শুনছিস, তা সত্য নয়। তুই জানিস, তোর পিতা বেঁচে থাকতেই কত ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে আমাদের এগোতে হয়েছে। মহারাজ মারা যাবার পর অমাত্যরা আমাদের যেমন তেমন করে তাদের খুশিমত চালাতে চাইছিল। তোর ও আমার দুজনেরই জীবন সংশয় ছিল। বহু কষ্টে, বহু কৌশলে, দুহাতে এদের ঠেকাতে ঠেকাতে আমরা এতদূর এসেছি। একমাত্র নরবাহন ও রক্ক ছিল আমাদের সহায়। তাদের সঠিক পরামর্শে আমরা শত্রুদের পরাজিত ও বিধ্বস্ত করেছি। শত্রুর শেষ রাখিনি। সেজন্যই আমাকে ক্রুর, নিষ্ঠুর, দুঃশীল, আরো কত অপশব্দ শুনতে হয়েছে।
সেসব তো জানি। কিন্তু সেসব অতীত হয়ে গেছে।
অতীত কিছুই হয়নি। সেইসব লড়াই চলছেই, কিছু কুশীলব পাল্টেছে মাত্র।
কিন্তু ফল্গুনের সঙ্গে তোমার এ কী সম্পর্কের কথা শুনতে পাচ্ছি।
তুইও শুনতে পেয়েছিস? ঠিক আছে, রাজা হিসেবে লোকের অভিমত শোনা তোমার কর্তব্য। তবে শোন, ফল্গুনের ও আমার সম্পর্কে যা শুনেছ, সব মিথ্যা। ফল্গুন একদা আমার শত্রু ছিল। কেন শত্রু ছিল তা বলতে হবে? সে তার কন্যাকে তোমার পিতার সঙ্গে বিবাহ দিয়ে আমাকে ও তোমাকে তোমারই পৈতৃক রাজ্যে অপ্রাসঙ্গিক বানাতে চাইছিল। তোমাকে হত্যা করতে তার হাত কাঁপবে না--- এ রাজ্যে এরকম বহু ঘটনা ঘটেছে। তোমার পিতামহ পর্বগুপ্ত এইভাবেই রাজা হয়েছিলেন, উনি ধর্মত উত্তরাধিকারী ছিলেন না। তুমি জান, সে সহমরণে অনুমতি দিয়ে আমাকে প্রাণে মারতে চেয়েছিল, তাতে তার সুবিধা হত, কিন্তু তার দুর্ভাগ্যবশত আমি মরলাম না। আমি শাসনভার নিলাম, তাকে নির্বাসনে পর্ণোৎসে রাখলাম। কিন্তু এটা মানতে হবে, ফল্গুন রাজ্যশাসনের কাজ চালানোর বুদ্ধি ধরে, যা এই এখনকার সময়ে রাজ্যে কারো নেই। তা ছাড়া তুমি উপযুক্ত বয়ঃক্রমে পৌছে গেছ, তোমার সন্তান হয়েছে। এখন সুস্থ থেকে, রাজ্যের ব্যাপারে নজর রাখতে হবে, তাহলেই অমাত্যরা তোমাকে সহজে কিছু করতে পারবে না। তুমি জান ডামরেরা আবার শক্তিশালী হয়ে যখনতখন লুটপাট করতে শুরু করেছে। এরকম একবার শুরু হলেই কিছু অমাত্য ওত পেতে বসে থাকে বিদ্রোহ করার জন্য। তুমি নিজে কী সেই অবস্থা সামলাতে পারবে? সেই কারণে এই অবস্থা থেকে বাঁচতে ফল্গুনের মত কূটনীতিকের প্রয়োজন। তাই তাকে ডেকেছি, তাকে আবার প্রধান অমাত্য করেছি।
কিন্তু আমার প্রশ্নের জবাব দিচ্ছ না।
দিচ্ছি। তুমি এখন বয়ঃপ্রাপ্ত, বিবাহিত, সন্তানের পিতা। তোমাকে এখন আর বলতে বাধা নেই। আমি জানি ফল্গুন রাজ্যের জন্য ভাল কাজ করবে বাধ্য হয়ে, বিদ্রোহ করবে না, কারণ তার ছেলে কর্দমরাজ বিদ্রোহী দলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে, প্রধান অমাত্য পদের জন্য সে তার বাপের প্রতিদ্বন্দ্বী। এটা আমাদের পক্ষে সুযোগ, কিন্তু আমাদের সাবধান থাকতে হবে যাতে পিতাপুত্র একসঙ্গে মিলে না যায়। সেজন্য আমি ফল্গুনের প্রস্তাব স্বীকার করেছি। কিন্তু ফল্গুনকে আমার শয্যায় আসতে দিই না, একথা জেনো। লোকে আমার সম্পর্কে যা বলে বলুক, আমার চিন্তা তোমার জীবন ও তোমার পৈতৃক রাজ্য। এ দুটো রক্ষা পেলে আমি আর কোনো কিছু নিয়ে ভাবি না।
অভিমন্যু চুপ করল। দিদ্দা বললেন, অভিমন্যু, মানুষকে জীবনে অনেক উত্থানপতনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, আমার জীবন ধরে দেখছি। তুমি সুস্থ হও, সবল হও, আমার আর কোনো চিন্তা থাকবে না।
অভিমন্যু ভাবল, প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তের এই বেঁচে থাকার জটিল সংগ্রামে সে বড়ই বেমানান।
খবর লোহরে দিদ্দার বাপের বাড়ির আত্মীয়দের কাছেও যায়, নারী শাসকের কেচ্ছা মুখে মুখে আরো বেশি মুখরোচক হয়ে ছড়ায়। পিতার মৃত্যুর পর এখন ভাইদের হাতে লোহর রাজ্য। ভাই উদয়রাজের প্রিয়পাত্র জয়গুপ্ত কাশ্মীর রাজসরকারে কাজ করত। সে ভাবল, দিদ্দা তো কলঙ্কের ভয়ে লুকিয়ে থাকে। এই বিশৃঙ্খলার সুযোগে কিছু লুটেপুটে নিই। বুড়ো ভাম ফল্গুন আর কী করবে? জয়গুপ্ত তার সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে মাঝে মাঝেই লুঠতরাজ শুরু করল। দিদ্দা ব্যতিব্যস্ত থাকেন, রাজ্যে বেশ বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। ফল্গুন চেষ্টা করছে, কিন্তু আগের মত তার তত শক্তি, তত উদ্যম নেই।
অভিমন্যুর শরীর দিনদিন খারাপের দিকে যাচ্ছিল। শেষপর্যন্ত তার যক্ষ্মা ধরা পড়ল। রাজবৈদ্যদের সকল চেষ্টা বিফল করে, কিছুদিন পর স্ত্রী সুভগা ও দুটো ছোট ছোট শিশুপুত্র রেখে সে মারা গেল।
দিদ্দার সেই ধ্রুব আশা শেষ হয়ে গেল। যার জন্য এত সব যুদ্ধ, প্রতিকূল অবস্থাকে আয়ত্তে আনতে এত সংগ্রাম, সে-ই যখন চলে গেল তবে আর ধর্ম দিয়ে কী হবে, বা অধর্ম দিয়েই বা কী হবে? শত্রু, মিত্র, লোকনিন্দা, প্রশংসা, সব কিছুই এখন অর্থহীন বলে মনে হয়। শুধুই বিষণ্ণতা, হাহাকারের ভারি মেঘ দিকদিগন্ত আচ্ছন্ন করে রেখেছে।
শোকের সময় অমাত্যেরা এক এক করে সান্ত্বনা দিতে আসছে। কারো সঙ্গ ভাল লাগে না। সান্ত্বনার কথা নিরর্থক লাগে, নির্জনতায় বসে থাকতে ইচ্ছে করে। তবুও কথা বলতে হয়, রাজ্যের কথা, প্রজাদের কথা তো ভাবতে হবে। দুটো ছোট ছোট শিশু রয়েছে, অভিমন্যুর চিহ্ন। তাদে্র কী ভবিষ্যত হবে জানা নেই। সুভগা আছে, পুত্রবধূ, কিন্তু বিশ্বস্ত নয়। এর মধ্যে কাজ করে যেতে হবে, ছাড় নেই। বড় নাতি নন্দিগুপ্তকে সিংহাসনে বসাতে হবে।
সিন্ধুর ভাই নগরপাল ভুয্য শোকাতুর রাজমাতার সঙ্গে দেখা করতে এল। সে জানত, তার ভাই সিন্ধুর ষড়যন্ত্রের বলি নরবাহন। পুত্রহীন হওয়াতে নরবাহনের মৃত্যুর পর তার ধনের একটা বড় অংশ রাজসরকারে জমা পড়েছে। সেই অর্থে কিছু কাজ করা যায়, কাজ করলে ভুয্যের নিজের ভাণ্ডারেও কিছু জমা পড়ে। অনেকগুলো মন্দির ভগ্ন দশায় আছে, ভুয্য সেগুলোর অবস্থা ফেরাতে চাইছিল। দিদ্দাকে রাজি করাতে গেলে অন্যদিক দিয়ে প্রস্তাবটা উপস্থাপন করতে হবে।
সে রাজমাতার দর্শনপ্রার্থী হল। দিদ্দাকে সে বলল, দেবী, আপনার জন্য আমরা দুঃখিত। শুধু আপনি নন, সারা রাজ্য রাজা অভিমন্যুর অকালমৃত্যুর জন্য অশ্রুপাত করছে। কিন্তু দেবী, মৃত্যু মহাকালের নিয়ম, তাঁর ইচ্ছা। তবে আমরা শুধু একটা কাজ করতে পারি।
দিদ্দা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালেন।
দেবী যদি আদেশ করেন, আমরা রাজার স্মৃতিতে একটা ভব্য মন্দির এবং মঠ নির্মাণ করতে পারি, যা আমাদের হৃদয়ে তাঁর স্মৃতিকে চিরউজ্জ্বল রাখবে।
দিদ্দা এক মুহূর্ত ভাবলেন। সঠিক বলেছ, ভুয্য। আমরা তা-ই করব। বিতস্তার পুলিনে যেখানে পূর্বরাজাদের স্মৃতি সৌধ আছে, সেখানেই একটুকরো ভূমিতে সৌধটা নির্মাণ করো।
বিতস্তার পুলিনে আরো কয়েকটা পুরাতন মন্দির ভগ্ন দশায় আছে। সেই মন্দিরগুলোও যদি সংস্কার করা হয়, তাহলে স্মৃতিসৌধটির পরিবেশ সুন্দর থাকবে, মহারানি যদি আজ্ঞা করেন, একসঙ্গে এই কাজটাও হয়ে যায়।
দিদ্দা রাজি হলেন। অভিমন্যুর স্মৃতিতে একটি বিষ্ণুমন্দির নির্মিত হল, নাম হল অভিমন্যুস্বামীর মন্দির। সাদা মন্দিরটি নির্মাণ হবার পর সেটা বড় সুন্দর দেখাচ্ছিল। শ্বেত সরল মন্দিরটা, মালিন্যবিহীন, ঠিক যেন অভিমন্যুরই প্রতীক। শান্তিতে থাকিস বাবা, তুই যেখানে আছিস শান্তিতে থাকিস, প্রার্থনা করলেন দিদ্দা।
এরপর তাঁকে যেন স্থাপত্যে পেয়ে বসল। মন্দিরটা মাঝখানে করে চারপাশ ঘিরে একটি নতুন নগর নির্মাণ করালেন, নাম দিলেন অভিমন্যুপুর। নিজের নামে করলেন দিদ্দাস্বামীপুর। স্বামী ক্ষেমগুপ্ত, একসময় যাঁর কাছে কেউ ধন চাইতে এলেই সোনার কঙ্কণ দান করতেন বলে ‘কঙ্কণবর্ষী’ নাম পেয়েছিলেন, তাঁর স্মৃতিতে কঙ্কণপুর নগর প্রতিষ্ঠা করলেন। বিদেশী ব্রাহ্মণদের থাকবার জন্য নিজের পিতার নামে সিংহস্বামীর মঠ করলেন, যে কোনো কাশ্মীরী ও বৈদেশিক পথিক ও পরিব্রাজকদের আবাসের জন্য বড় ও উচ্চ বিহার স্থাপন করলেন। যে সব মন্দিরের এবং নগরের প্রাচীর ধসে গিয়েছিল, সেগুলোও সংস্কার করে রাজধানীকে এক সুন্দর নগরীতে পরিণত করলেন। এমন কী চলচ্ছক্তি কমে যাবার পর যে দাসী তাঁকে বহন করে, কৃতজ্ঞতাবশত সেই বল্গার নামেও বল্গামঠ প্রতিষ্ঠা করলেন।
৮
তুঙ্গ
বৎসর গড়ায়। পুত্রশোকও কমে আসে, মন নিজে থেকেই প্রবোধ পায়। সময় সবচাইতে বড় নিরাময়কারী। নূতন লক্ষ্য সামনে দেখা দেয়, জীবন তখন নূতন উদ্যমে সেই লক্ষ্যে এগোয়। জীবনের ধর্মই এই। দিদ্দার জীবনের মূলমন্ত্র হল অতীত ভুলে এগিয়ে যাওয়া।
একটা বছর সৃষ্টিশীল কাজ করতে করতে তিনি রাজনীতির থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন। এরই মধ্যে যে অন্তঃপুরেই বিষধর প্রবেশ করেছে তা তাঁর নজরে আসেনি।
অন্তঃপুরে বিদ্রোহের আভাস দেখা দিয়েছে। অভিমন্যুর বিধবা পত্নী সুভগা বাইরের লোকেদের সঙ্গে পরামর্শ করছে। মাঝে মাঝেই সে স্বৈরিণী বলে শাশুড়িকে পরোক্ষে অপমান করে। তার ছেলে দু’বছরের নন্দিগুপ্তকে সিংহাসনে বসানো হয়েছে, পিতামহী দিদ্দাই আগের মত রাজার কাজ করছেন। সুভগা চাইছিল রাজমাতার পদ ও অধিকার, যদিও তার বয়স মাত্র কুড়ি। সে নিতান্ত অনভিজ্ঞ তরুণী, তার পরিবারেও কেউ রাজ্যশাসনের উচ্চপদে কাজ করেনি কখনো, তার স্বামী অভিমন্যু রাজা হওয়া সত্ত্বেও অনভিজ্ঞ ছিল, তাই সুভগার কোনো বাস্তবিক শিক্ষা নেই। প্রধান অমাত্য ফল্গুন তার পক্ষে নয়, কিন্তু সে এখন বৃদ্ধ, প্রভাব কমে আসছে। তার ছেলে কর্দমরাজ প্রস্তাব দিল সুভগাকে রাজমাতা করা যেতেই পারে। কিন্তু ফল্গুন এতে রাজি নয়, কারণ দিদ্দা যতদিন রাজমাতার পদে থাকবেন, ততদিন তার নিজের ক্ষমতাও থাকবে। তাই সুভগা কর্দমরাজ ও কম বয়সের কয়েকজন রাজপুরুষের সঙ্গে মিলে দিদ্দার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের জন্য গোপন কথাবার্তা চালাচ্ছিল। সুভগা তার মন্ত্রণাদাতাদের কথায় দু’বছরের নন্দিগুপ্তকে শীতেও দীর্ঘ সময় সিংহাসনে বসিয়ে রাখত, যাতে অমাত্য ও রাজকর্মচারীরা এসে শিশু রাজা ও তার মাকে অভিবাদন জ্ঞাপন করতে পারে। এত ধকল শিশুটি সইতে পারছিল না, সে অসুস্থ হয়ে পড়ল এবং তিন বছর বয়স হতে না হতেই মারা গেল। সে মারা যাবার পর সুভগা তার অনুগামীদের বলল, দিদ্দা অভিচার ক্রিয়া করে নন্দিগুপ্তের মৃত্যু ঘটিয়েছেন।
দিদ্দা আবারও আঘাত পেলেন। এসব কী বলছে সুভগা? এত মিথ্যা? তিনি তাঁর নপ্তাকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসতেন, তার জন্মের সময় খুশি হয়ে দানধ্যান করেছিলেন। তবে শিশুটি প্রথম থেকে প্রায়ই অসুখবিসুখে ভুগত। রোগা ছিল তার বাপের মত। সিংহাসনে অভিষেক হবার পর তার মা তাকে সেখানে বসিয়ে রেখে দিত ঘণ্টার পর ঘণ্টা, না খাইয়ে। কত লোক আসত, তার পা ছুঁত, তার মায়ের পা-ও ছুঁত, তখন গৌরবান্বিত মায়ের ছেলের দিকে তাকানোর ফুরসত মিলত না। শিশুটি অসুস্থ হবার পর তাকে আর নিয়ে আসা হত না। তাকে তিনি অভিচার করে মেরেছেন, এ তো সর্বৈব মিথ্যা। অভিচার করে কেউ কিছু করতে পারে না, যাকে মারতে হয়, তার খাবারে বিষ মিশিয়ে দিতে হয় আগে। তারপর যত খুশি জাদুটোনা করো, বাণ মারো। সিংহরাজের মেয়ে দিদ্দা এসবে বিশ্বাস করে না। শিশুটিকে খাওয়ানোর দায়িত্ব তো সুভগার নিজের, এবং তার খাস ধাত্রীর। এতে দিদ্দার নাম কেন জড়াচ্ছে ওরা?
তাঁর আরেকটা নাতি আছে, তার নাম ত্রিভুবন। সে তার পিতার মৃত্যুর দিনকয়েক আগে মাত্র জন্ম নিয়েছিল। তিনি আর তাকে দেখতে যান না, কারণ সুভগার যখন মিথ্যে সন্দেহ মাথায় ঢুকেছে, তার সন্তানের কাছে গেলে তার সন্দেহ বাড়বে। এখন কিন্তু ত্রিভুবনকে সিংহাসনে বসাতেই হবে, পরম্পরায় সে-ই আছে। সুভগা আরো একটা ছেলেকে দত্তক নিয়েছিল, সে তারই কোনো এক আত্মীয়ের অনাথ ছেলে। অভিমন্যু বেঁচে থাকতেই নেওয়া হয়েছিল, নাম দেওয়া হয়েছিল ভীমগুপ্ত। সুভগা তখনই বুঝতে পেরেছিল, ক্ষয়রোগে আক্রান্ত অভিমন্যু বেশিদিন বাঁচবে না। তাই তার এই দুই ছেলের বেশি সন্তান পাবার আশা নেই। ভীমগুপ্তের বয়স নন্দিগুপ্তের চাইতেও তিন চার বছর বেশি ছিল। সে পুত্র হবে, আবার গর্ভজাত পুত্র নন্দিগুপ্ত ও ত্রিভুবনের দেহরক্ষীর মত হবে, সেই ভরসায় সুভগা ছেলেটাকে দত্তক নিয়েছিল।
যা হোক, দু বছরের শিশু ত্রিভুবনকে সিংহাসনে বসানো হল। এই ছেলেটিরও স্বাস্থ্য ভাল নয়। তাই তাকে রোজ সভায় নিয়ে আসা হয় না। মাঝে মাঝে কোনো বিশেষ উপলক্ষে তাকে আনা হয়। একটি সন্তান হারিয়ে সুভগা দিদ্দার উপর প্রচণ্ড রেগে আছে। কিন্তু হঠাৎ শিশু ত্রিভুবন জ্বরে পড়ল। রাজবৈদ্য দেখল, যথাসম্ভব ওষুধপত্র দিয়েছিল, কিন্তু ছেলেটি দুদিন পর মারা গেল। কিন্তু শিশুর মা হাহাকার করতে লাগল, কিন্তু তার মধ্যেও দিদ্দার ষড়যন্ত্র বলে তাঁর দিকে অঙ্গুলি তুলতে ভুলল না।
দিদ্দা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হলেন। কিন্তু ঘরের কোন্দল বাইরে প্রকাশ করলেন না। এর মধ্যে প্রধান অমাত্য বৃদ্ধ ফল্গুনও মারা গেল। এইবার রাজধানীতে অমাত্য হিসেবে প্রত্যাবর্তন করলেও ফল্গুনের প্রতাপ আগের মত ছিল না। তার মৃত্যুতে কিছুদিন শোক পালন হল, রাজ্যের কাজকর্ম ব্যাহত হল, কিন্তু দিদ্দার মনে হল এখন তিনি পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করলেন। তাঁর পতি, প্রেমাস্পদ, বিশ্বস্ত সহযোগী, পুত্র, পৌত্র, সব চলে গেছে। এমন কী দেহের বিনিময়ে যাকে কিনেছিলেন বলে রটনা হয়েছে, সেই ফল্গুনও চলে গেছে। আর ধর্ম নেই, অধর্ম নেই, বাধা নেই, তিনি এখন নিন্দা ও কলঙ্কের ঊর্ধ্বে। অতীত তাঁর জন্য অতীত, যারা গেছে, তারা যাক, যা হারিয়ে গেছে তা হারাক, তিনি সমাজের কাছে পরাজয় স্বীকার করবেন না। তিনি নিজের খুশিমত যাকে ইচ্ছা নিয়োগ করবেন, যাকে ইচ্ছে কাছে ডাকবেন, সামাজিক নিয়মের ধার ধারবেন না।
সুভগার বন্ধু অমাত্যেরা শূন্য সিংহাসনে ভীমগুপ্তকে বসিয়ে দিল, দিদ্দা আপত্তি করলেন না, যদিও তিনি নিজেই মুখ্য অমাত্যের কাজ করতে লাগলেন। এক রোদ ঝলমলে সকালে প্রাসাদের দ্বিতলের অলিন্দে বসে তিনি দেখলেন, একজন পাহাড়ি যুবক অমাত্য সন্ধিবিগ্রহিকের কার্যালয়ের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে একটি বস্তু, পত্রের মত মনে হয়। বোধ হয় লেখহারক, তারা সন্ধিবিগ্রহিকের কাছেই বেশি আসে, কারণ এই অমাত্যের দায়িত্ব হল রাজার তরফে রাজধানীর বাইরের অমাত্য, সামন্ত ও প্রতিবেশী রাজাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা, বার্তা পাঠানো। তাই এঁর অধীনে অনেক লেখহারক বা পত্রবাহক থাকে, তাদের কাজ হল দূরত্বে থাকা দুই পক্ষের মধ্যে লেখ বা পত্র নিয়ে যাওয়া। পার্বত্য পথে তাদের অনেক দূর পায়ে হেঁটে যেতে হয় বলে এদের অত্যন্ত কষ্টসহিষ্ণু হতে হয়। তাই পাহাড়িদেরই বিশেষভাবে এই পদে নিয়োগ করা হয়। এই লোকটি মনে হয় এই কাজ করতেই এসেছে, তাঁকে হাতের পত্রখানা দিয়ে আরেকটি পত্র নিয়ে যাবার অপেক্ষায় আছে। তার সঙ্গে পেছনে একটু দূরে আরো চারপাঁচজন ছেলে দাঁড়িয়ে আছে, তাদের দেখতেও ঐরকমই, পাহাড়ি, রোদে পোড়া বলিষ্ঠ চেহারা, অতি সাধারণ মলিন বেশভূষা। এদের দেখে কেমন চেনা চেনা মনে হচ্ছে।
দিদ্দা বল্গাকে বললেন, দেখ তো বল্গা, এদের কেমন চেনা চেনা লাগছে। ওকে একটু ডেকে আন। বল্গা গিয়ে যুবকটিকে রাজমাতার নামে ডাকলে সে এল। যুবকটি খশ! শুনে তাঁর বড় আনন্দ হল। এ যে তাঁর বাপের বাড়ির দেশের লোক। বহুবছর নিজের মাতৃভাষায় কথা বলেননি, আজ এই ছেলেটির সঙ্গে বলবেন। সে দীর্ঘদেহী সুঠাম সুদর্শন যুবক, যেমন তাঁর মাতৃভূমিতে হয়। তিনি তার পরিচয় জিগ্যেস করলেন। সে বলল, তার নাম তুঙ্গ, তার পিতার নাম বাণ। তাদের বাড়ি পর্ণোৎসের বদ্দিবাস, লোহর দুর্গের নিচেই। সে আগে তার বাপের মহিষ চরাত। গ্রামের মঠে সামান্য পড়াশোনা শিখেছে। সেটুকুর জোরে লেখহারকের পদ পেয়ে কাশ্মীরে এসেছে। এবারে সে সঙ্গে তার ভাইদেরও নিয়ে এসেছে, তাদের যদি কোনো কাজে রাখা হয়, সেই আশায়। দেশে বড় কষ্ট, কাজ নেই, রোজগার নেই, শুধু মহিষ পালন করে সংসার চলে না। তাদের জমিগুলো পাথুরে, চাষ হয় না। তাই তুঙ্গের ভাইয়েরা লেখহারকের কাজ পেলে তো ভালই, না পেলে যেকোনো কাজ করবে। অমাত্য সন্ধিবিগ্রহিক তাদের কাজের আশ্বাস দিয়েছেন।
দিদ্দা তুঙ্গকে বললেন, তুমি আমার কাছে কাজ করবে?
অবশ্যই দেবী। আপনি যা আদেশ করেন।
তুঙ্গের এক ভাই তুঙ্গের জায়গায় নিযুক্ত হল, অন্য ভাইয়েরাও রক্ষীবাহিনীতে কাজ পেল। তুঙ্গ দিদ্দার প্রাসাদে রইল। তার সঙ্গে প্রাণভরে মাতৃভাষায় গল্প করে দিদ্দা বহুবছর পর তাঁর বালিকাবয়স খুঁজে পান। মনের পটে দেখতে পান লোহর দুর্গের ছবি, যেখানে তিনি তাঁর কৈশোর অবধি কাটিয়েছিলেন। কোথায় আজ পিতামাতা, সেইসব খেলার সাথিরা, কোথায় সেই নির্ভার দিনগুলো! বিয়ে হয়ে পিতৃগৃহ ছেড়ে আসার পর আর কখনো সেখানে যাওয়া হয়নি, মা-বাবার সঙ্গে দেখা হয়নি। ভাইয়েরা নিজেদের প্রয়োজনে কখনো দূত পাঠায়, এদিক থেকে দূত যায়, রাজপরিবারের মানুষ কারো সঙ্গে কোথাও স্নেহ-ভালবাসার সম্পর্কের নবীকরণ করে না। বড় কঠোর রাজবংশীয়দের জীবন।
তুঙ্গ বলল, সে লোহর দুর্গে মাঝেমাঝেই যায়, সেখানে তাঁর পিতার অবর্তমানে ভ্রাতারা আছেন, তাদের প্রাসাদে পত্র নিয়ে ক’বার গিয়েছে, এবং উত্তরপত্র নিয়ে এসেছে যথাস্থানে দেবার জন্য। তার চোখে তিনি নিজের জন্মভূমিকে স্পষ্ট দেখতে থাকেন।
দিদ্দার পায়ের কষ্ট দেখে সে একদিন বলল, দেবী, আমি বিশেষ তেল বানিয়ে তা দিয়ে পা মালিশ করতে পারি, আমার গাঁয়ের বয়স্ক লোকে এরকম মালিশ নেয়। আপনাকে করে দেব? দিদ্দা রাজি হলে সে তাঁর পা কোলে নিয়ে যখন সেই বিশেষ তেল মালিশ করে দেয়, পায়ের ব্যথা যেন অনেকটা আরাম হয় বলে তাঁর মনে হয়। পত্রবাহকের কাজ করতে তাকে বহু জায়গায় যেতে হয়েছে, তাই দেশ ও রাস্তাঘাট সম্পর্কে জানে, মানুষ সম্পর্কেও ভাল পরিচয় আছে। তেল মালিশ করতে করতে সেসব গল্প করে। সে এমন কী মন্ত্রী এবং রাজকর্মচারীদের সম্পর্কেও সে অনেক কিছু জানে, এবং সেই জানা থেকে তাদের চরিত্রসম্পর্কেও ধারণা দিতে পারে। দিদ্দা দেখলেন ছেলেটি বুদ্ধিমান, তার যা দেখার চোখ এবং জ্ঞান আছে তাতে সে অনেক রাজপুরুষকে টেক্কা দিতে পারে। কয়েকদিন তার উপর নজর রেখে তিনি উপযুক্ত প্রশিক্ষক দিয়ে তাকে যুদ্ধবিদ্যার প্রাথমিক পাঠ দেওয়ালেন, নিজেই রাজ্যশাসনের কাজ বোঝালেন, তাকে যোগ্য করে নিয়ে কনিষ্ঠ অমাত্যের পদে নিযুক্ত করলেন। তার বাসস্থান হল প্রাসাদেই, দিদ্দার ঘরের পাশের একটি ছোট কুঠুরিতে, সে তাঁর বিশ্বস্ততম রক্ষী এবং ছায়াসঙ্গী, শোবার সময় ও সে তার সদাপ্রস্তুত তলোয়ারটিকে তাঁর রক্ষণের জন্য নিজের বিছানার এক পাশেই রাখে।
৯
সিংহাসনে
ভীমগুপ্ত রাজা হয়েছে বছরপাঁচেক হল। তার বয়স এগারো বারো হবে। সুভগা তার কানে বিষ ঢুকিয়ে চলেছে, সে দিদ্দার প্রতি সন্তুষ্ট নয়। এটা ঠিকই, রাজ্যশাসনের কাজ আজকাল ঠিকমত চলছে না। দিদ্দার চলাফেরার সীমাবদ্ধতা তো আছেই, বয়সও হচ্ছে। তবুও আগের মতই কাজ করতে হয়, কারণ অভিজ্ঞ অমাত্য নেই। ভুয্য আছে, কিন্তু সে কাজ করার চাইতে বেশি দিদ্দা কী করেন সেদিকে বেশি নজর। দিদ্দার নেকনজরে পড়ে সামান্য লেখহারক তুঙ্গ অমাত্যের পদে উন্নীত হল দেখে তার হিংসেয় বুক জ্বলে যাচ্ছে। তুঙ্গের ভাইয়েরাও এখানে কাজ করছে, যেসব রাজপুরুষের উপর রানির সন্দেহ ছিল তাদের সরিয়ে তুঙ্গের পাঁচ ভাইকে নিযুক্ত করা হয়েছে। সেজন্য তাদের দলবল আছে। ভুয্য বহুদিন ধরে কাজ করছে, কিন্তু এখনও মুখ্য অমাত্যের পদে উন্নীত হল না বলেও ক্ষুব্ধ। তাই বালক রাজা ভীমগুপ্তের সঙ্গে সে বিদ্রোহের কথা আলোচনা করছে আজকাল। পঙ্গু বৃদ্ধাকে শয্যায় আনন্দ দিচ্ছে তরুণ তুঙ্গ--- এইধরণের কথা সে রাজ্যে ছড়াচ্ছে। লোকে আবার কানাকানি করতে শুরু করেছে, বৃদ্ধা রানির সঙ্গে যুবক তুঙ্গের প্রেমের কথা। এরকম সময়ে লোকের দেওয়া পুরোনো অপবাদও বহুশাখায় পল্লবিত হয়, তার সঙ্গে নতুন কলঙ্ক জুড়ে দেওয়া হয়। ভীমগুপ্ত সব শোনে, আজকাল যৌনসম্বন্ধী কিছু কিছু কথা সে বুঝতে পারে। রাজসভা থেকে ফিরে গিয়ে সুভগার কাছে নিজের রাজকার্যের গল্প করে, গুজবের গল্পও করে। সুভগা সেইসব কথা রঙ লাগিয়ে তার বান্ধববর্গের কাছে ছড়ায়।
ভীমগুপ্ত দিদ্দার সঙ্গে আদেশের সুরে কথা বলে। সে রাজ্যের এটা ওটা কাজকর্ম ঠিক হচ্ছে না বলে সর্বসমক্ষে বয়স্ক অমাত্যদের তিরস্কার করে। সে কটুভাষী এবং দুর্বিনীত, বালক বলে কেউ কিছু বলছে না। বর্ণপরিচয়ের পরই সে অস্ত্রচালনা শিখছে। তাকে লক্ষ্যভেদ শেখানো হচ্ছে। অস্ত্র যে সে কখন কার প্রতি প্রয়োগ করবে তার ঠিক নেই। সব কিছু মিলে সে সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়।
সামনে কারো কিছু বলার সাহস নেই, কিন্তু বিধবা বুড়ি বলে পরোক্ষে তাচ্ছিল্য, পঙ্গু বলে উপহাস, তুঙ্গের সঙ্গে প্রেম আছে বলে রটানো, ছুটকো বিদ্রোহ—সব বিরুদ্ধ খবরই তিনি পান, এসব তাঁর গা-সহা হয়ে গেছে। সহ্য করতে করতে দিদ্দা এবার মনে কঠোর থেকে কঠোরতর হচ্ছেন, এবার আর কাউকে ছাড় নেই। তুঙ্গকে সব কথা বলে ফেলে দিদ্দার মন শান্ত হয় বটে, কিন্তু ভীমগুপ্তকে কী করা যায়! প্রথম দিকের বিশ্বস্ত অমাত্য রক্কের ছেলে দেবকলস এখন অমাত্য হয়েছে, সে তার বাবার মতই ক্রুর, যদিও বিশ্বস্ত। সে বলল, ঠিক আছে, দেবী, চিন্তা করবেন না। এই ভুয্য ও ভীমগুপ্তকে আমি দেখছি। সে ভুয্যকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করল, আর ভীমগুপ্তকে বন্দি করে কারাগারে নিক্ষেপ করল। কিছুদিনের মধ্যে ভীমগুপ্তের সেখানেই মৃত্যু হল। দিদ্দা আর পেছন ফিরে দেখলেন না। মন থেকে সব কোমলতা, সব আবেগ দূর করে দিলেন।
আর উত্তরাধিকারী কেউ বংশে নেই, তাই সামনে পেছনে কেউ নেই। তাই দিদ্দা এবার স্বয়ং সিংহাসনে বসলেন। উৎপল বংশের একেবারে প্রথমদিকের দুজন রাজা ছাড়া আর যে কজন রাজা হয়েছেন কারো শাসক হবার যোগ্যতা ছিল না। নিষ্ঠুর, অত্যাচারী, ইন্দ্রিয়পরায়ণ, অকর্মণ্য সব রাজা। সাধারণ নাগরিকেরাও বুঝল, রাজার পুরুষ উত্তরাধিকারী নেই বলে আক্ষেপ করার কিছু নেই।
দিদ্দা তুঙ্গের কার্যদক্ষতাকে গুরুত্ব দিয়ে তাকে এবার প্রধান অমাত্যের পদে নিযুক্ত করলেন। যারা আগে নানা দোষে পদচ্যুত হয়েছিল, এবং যারা ছোট পদে থেকে অনেকদিন ধরে উচ্চপদ আকাক্ষা করছিল, তারা তুঙ্গের সর্বোচ্চ পদপ্রাপ্তিতে যারপরনাই অসন্তুষ্ট হল। সেই অসন্তুষ্ট রাজকর্মচারীদের নেতা ছিল ফল্গুনের ছেলে কর্দমরাজ, যে নিজেকে প্রধান অমাত্য পদের দাবিদার মনে করত। কিন্তু বহুদিন সরকারের উচ্চপদে থাকলেও তার কার্যকলাপ সন্দেহের ঊর্ধ্বে ছিল না। তার সঙ্গে অভিমন্যুর স্ত্রী সুভগা ও ভীমগুপ্তের সম্পর্ক আছে, দিদ্দার বিরুদ্ধে তাদের মনে সে-ই বিরোধিতার বীজ বুনত, একথা অনেক দিন ধরেই দিদ্দার গোচরে ছিল, তবে ফল্গুনের ছেলে হবার কারণে সে ছাড় পায়। এবার সে অন্য বিদ্রোহীদের সঙ্গে মিলে দিদ্দার অন্যতম ভাইয়ের ছেলে বিগ্রহরাজের সঙ্গে গোপনে ডাকল। তারা বিগ্রহরাজকে বার্তা পাঠাল, প্রভু, আপনি শ্রীনগরীতে শীঘ্র আসুন, সিংহাসন দখল করুন। আপনার পিসি নিষ্ঠুরা দিদ্দা নিজের পৌত্রদের হত্যা করে নিজে সিংহাসনে বসেছেন। তিনি তাঁর স্বামীর জ্ঞাতি কাউকে অথবা পিতৃবংশ থেকে আপনাকে বা আপনার কোনো ভাইকে ডেকে সিংহাসনে বসাতে পারতেন, তাহলে দেশে কোনো রাজা থাকত; তা না হয়ে এক নারীর আধিপত্যে আমাদের থাকতে হচ্ছে। স্বৈরিণী এই নারী এক খশ মহিষপালকের ছেলেকে প্রধান অমাত্যপদে নিযুক্ত করেছেন, শুধু তাই নয়, সেই খশের সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক আছে। এঁকে আমরা চাই না। আমরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আপনাকে সম্পূর্ণ সহায়তা করব।
বিগ্রহরাজ উত্তরে বার্তা পাঠালেন, ঠিক আছে, আমি আসছি। আপনারা তৈরি থাকবেন।
বিগ্রহরাজ বিদ্রোহের ছক কষে প্রথমেই মন্দিরের পূজারি ও ব্রহ্মোত্তরভোগী ব্রাহ্মণদের কাছে গেলেন। সমাজের উপর এঁদের প্রভাব বেশি, রাজার উপর অসন্তুষ্টি বোঝাতে, অথবা কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে তারা যুদ্ধ না করলেও উপবাস করে ধর্মঘটে বসে রাজাকে চাপ দেয়, এই কাজকে প্রায়োপবেশনে বসা বলে। যেহেতু এদের সবাই মানে, তাই উপবাস করে ব্রাহ্মণ মরে গেলে তা রাজার অপরাধ বলে গণ্য হয়। তাই বিগ্রহরাজ এসে এদের প্রায়োপবেশনে বসতে অনুরোধ করলেন। তিনি ও তাঁর লোকেরা সবসময় ব্রাহ্মণদের সঙ্গে থেকে তাদের বিদ্রোহে উদ্বুদ্ধ করতে লাগলেন,--- দেখুন, আপনারা পূজনীয় ও জ্ঞানী ব্রাহ্মণ। রানি আপনাদের উপেক্ষা করে এক নীচ মহিষপালকের অভব্য পুত্রকে প্রধান অমাত্য নিযুক্ত করেছেন, এটা অত্যন্ত অন্যায়। আপনারা থাকতে এই দুঃশীলা পঙ্গু বৃদ্ধা যাকে ইচ্ছে হত্যা করাচ্ছেন, যাকে তাকে উচ্চপদ দিচ্ছেন, এসব চলতে পারে না। তার উপর এই মহিষপালকের পুত্র রানির প্রেমাস্পদ হয়েছে, সে তাঁর কাছেই থাকে— এর চাইতে ঘৃণার বিষয় আর কী হতে পারে! আপনারাই এই নীচ লোকটাকে হত্যা করে এই অধর্মের প্রতিকার করতে পারেন। তাই বলছি, আপনারা সঙ্কল্প করে প্রায়োপবেশনে বসুন, উপবাস শেষ হলে সেই পাপীকে খুঁজে বের করে হত্যা করুন।
বিদ্রোহের খবর পেয়ে দিদ্দা কিছুদিন তুঙ্গকে বাইরে বেরোতে দিলেন না, লুকিয়ে রাখলেন। ব্রাহ্মণেরা তাকে খুঁজে পেল না। দিদ্দা জানতেন, এই ব্রাহ্মণেরা নিজেদের উচ্চবংশীয় মনে করলেও আসলে এরা প্রচণ্ড লোভী, উৎকোচ দিলেই এদের সংকল্প ভেঙ্গে যায়। তাই তিনি কয়েকজন নেতৃস্থানীয় ব্রাহ্মণকে ডাকালেন, তাদের বললেন, আপনারা বিগ্রহরাজের কথা শুনছেন কেন? সে আমার ভাইপো, আমি জানি সে ভীষণ ক্রুর ও মিথ্যাচারী, কাজ শেষ হলে সে আপনাদের কিছু দেবে তো না-ই, বরং মেরে তাড়িয়ে দেবে। তার চাইতে আমি আপনাদের প্রত্যেককে কিছু দীনার দিচ্ছি, আপনাদের অত খোঁজাখুঁজি ঘোরাঘুরি করার দরকার নেই, আপনারা উপবাস ভঙ্গ করে শান্তিতে নিজেদের বাড়িতে গিয়ে থাকুন।
অর্থ পেয়ে সন্তুষ্ট হয়ে ব্রাহ্মণেরা তাদের প্রধান সুমনোমন্তক সহ সকলে উপবাস ভেঙ্গে বাড়ি চলে গেল। অন্যেরাও তাদের অনুগমন করল। তখন তুঙ্গ তার দলবল নিয়ে বেরোল। ব্রাহ্মণেরা চলে যাওয়াতে বিদ্রোহীরা দুর্বল হয়ে পড়েছিল, তখন সুযোগ বুঝে সে বিদ্রোহীদের নেতা ফল্গুনপুত্র কর্দমরাজ ও আরো কয়েকজনকে অতর্কিতে আক্রমণ করে হত্যা করল। যারা বিদ্রোহ করেনি, যেমন পুরোনো অমাত্য রক্কের পুত্র সুলক্কন, তাদের মন্ত্রীর পদে নিযুক্ত করা হল। বিগ্রহরাজ সেই সময়ের জন্য পালিয়ে গেলেন বটে, কিন্তু হাল ছাড়লেন না। কিছুদিন পর আবার ব্রাহ্মণদের কাছে তাঁর দূত পৌঁছল, তাদের পুনরায় অনশনব্রত করতে অনুরোধ নিয়ে। এবারে তিনি আদিত্য নামে এক চরকে ব্রাহ্মণদের উপর নজর রাখার জন্য নিযুক্ত করেছিলেন। লোভী ব্রাহ্মণেরা ভাবল, আগে ও পক্ষ থেকে পাওয়া গেছে, আবার এ পক্ষ থেকে ঘুষ পেলে মন্দ কী? তবে তুঙ্গ এদের চরিত্রের খবর রাখত। সে তাদের বিশ্বাসঘাতকতার খবর পেয়েছিল সঙ্গে সঙ্গেই। ব্রাহ্মণেরা জমায়েত শুরু করল, বিগ্রহরাজ ঘুষ দিতে আসবার আগেই সে দলবল সমেত এসে তাদের কিছু দীনার দিয়ে তলোয়ার উঁচু করে বলল, এক্ষুনি এখান থেকে পালাও। আর এখানে বসে থাকলে আমি তোমাদের মুণ্ড ফেলতে দ্বিধা করব না, যতই তোমরা ব্রাহ্মণ হও। প্রাণভয়ে তারা যে যার বাড়ি পালিয়ে গেল।
ব্রাহ্মণদের মধ্যে বিগ্রহরাজের চর আদিত্যও ছিল, তার বাড়ি এখানে নয়, এবং তার বিগ্রহরাজকে সব কথা জানানোর দায়িত্ব ছিল। তাই ব্রাহ্মণেরা যে রাস্তা দিয়ে পালাচ্ছিল, সে সেদিকে না গিয়ে অন্যদিক ধরে পালাচ্ছিল। তাই তার চর পরিচয় সহজেই ফাঁস হয়ে যাওয়ায় সে তুঙ্গের রক্ষীদের হাতে নিহত হল। ব্রাহ্মণদের ক’জন নেতাও পালায়নি, তারা কী করবে ভাবছিল, তবে তুঙ্গের অনুচরেরা তাদের ব্রাহ্মণ বলে রেয়াত করল না। তাদের হত্যা করা হল না, কিন্তু প্রথমেই বিদ্রোহী প্রতিহারী বৎসরাজ বন্দী হল, পরে সুমনোমন্তক নামে নেতৃস্থানীয় ব্রাহ্মণ ও তার বড় বড় সহযোগী যারা দুদিকেই উৎকোচ নিতে এসেছিল তাদেরও বাড়ি থেকে এনে কারাগারে নিক্ষেপ করা হল। বিগ্রহরাজের শিবির অনতিদূরেই ছিল। তিনি পালিয়ে যাবার চেষ্টা করতেই তুঙ্গ দ্রুতগামী অশ্বে তাঁর পিছু নিয়ে তাঁকে ধরে ফেলল, বন্দী করল। তবে দিদ্দার আত্মীয় বলে তাকে হত্যা করা হল না বটে, কিন্তু তাঁকে লোহরে ফিরতে দেওয়া হল না, সঙ্গীহীন ও কপর্দকহীন করে নির্বাসিত করা হল। দেশের ভেতরের বিদ্রোহ দমন হল।
কিন্তু ভেতরের অশান্তির খবর বাইরেও ছড়িয়েছিল, বাইরের শত্রু মাথা চাড়া দিয়ে উঠছিল। ফল্গুনের মৃত্যুর পর শাসন আলগা হয়ে যাওয়ায় সামন্তরাজ্য রাজপুরীর অধিপতি পৃথ্বীপাল কর দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। এবার তুঙ্গ তার বাহিনী নিয়ে পৃথ্বীপালকে শায়েস্তা করতে রওয়ানা হল। সঙ্গে কয়েকজন পুরোনো সেনাধ্যক্ষ ও ছিল, তারা নিজেদের তুঙ্গের চাইতে বেশি অভিজ্ঞ মনে করত। তুঙ্গ তাদের পাহাড়ি পথে একটু ধীরে ও নিজেদের গোপন রেখে উঠতে বলেছিল। কিন্তু পুরোনো দুই সেনাধ্যক্ষ শিপাটক ও হংসরাজ নিজেদের অধীন সৈন্য নিয়ে দুর্গম গিরিপথে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছিল। পৃথ্বীপাল উপর থেকে নজর রাখছিল, তার বাহিনী নেমে এসে সেই সঙ্কীর্ণ পার্বত্য পথে অগ্রগামী দুজন সেনানী সহ কয়েকজন সৈনিককে হত্যা করল। তখন তুঙ্গ দেখল এখানে পালটা আক্রমণ করা যাবে না, করলে পুরো বাহিনী ধ্বংস হতে পারে। সে তাড়াতাড়ি পুরো বাহিনীকে খানিকটা পিছু হটে সমতলে নিরাপদ জায়গায় সাবধানে অপেক্ষা করতে নির্দেশ দিল। এদিককার গিরিপথগুলো তার পরিচিত, তাই পাহাড়ে চলতে অভ্যস্ত কয়েকজন বিশ্বস্ত সৈনিক ও তার দুই ভাইকে সঙ্গে নিয়ে অন্যদিক থেকে একটি গোপন রাস্তা ধরে রাজপুরী প্রবেশ করল এবং পৃথ্বীপালের রাজধানী শহরে আগুন ধরিয়ে দিল। শহর ভস্মীভূত হল, পৃথ্বীপালের বহু সৈন্য এমন কী কিছু পরিজন ও নিহত হল, তিনি নিজে কোনোরকমে বাঁচলেন। বাধ্য হয়ে তিনি তুঙ্গকে ক্ষতিপূরণ ও কর দিয়ে সন্ধি করলেন।
দিদ্দার অমাত্য নির্বাচন যে নির্ভুল ছিল, প্রমাণ হয়ে গেল। তুঙ্গ অভিজাত বংশে জন্মায়নি, তার তেমন বিদ্যাও নেই। শুধু কর্মদক্ষতার গুণে তার হাতে আবার কাশ্মীর রাজ্য দৃঢ় ভিত্তির উপর স্থাপিত হল। রানি তাকে এবার প্রধান অমাত্যের পদে নিযুক্ত করলেন। এবার আর কোনো পক্ষ থেকে আপত্তি উঠল না।
তিনি তাকে বললেন, তুঙ্গ, তোমার প্রতি আমার বিশ্বাস বেড়ে গেল। তারপর মজা করে বললেন, হায় হায়, তোমার সঙ্গে আমার কেন যৌবনে দেখা হল না! তাহলে তোমাকেই বিয়ে করতাম।
তুঙ্গ লজ্জায় লাল হয়ে তাঁকে প্রণাম করল। পাহাড়ি নির্ভীক ও নির্লোভ যুবকটি তাঁর পরে যে রাজা হবে তারও বিশ্বস্ত সহায়ক হবে, তাঁর মনে আশা জাগল।
১০
ভবিষ্যৎ চিন্তা
যে রাজা হতে চায়, তার শুধু দৈহিক বল থাকলে হয় না। এমন কী অস্ত্রবিদ বা শাস্ত্রবিদ হলেও রাজ্যরক্ষার উপযোগী শাসক নাও হতে পারে। শাসকের কূটনীতির জ্ঞান থাকা চাই। বলদর্পী পুরুষ প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বহু লড়াই করে, কূটনীতিতে তাদের অস্ত্রে তাদেরই বারেবারে হারিয়ে দিয়ে অভিজ্ঞ দিদ্দা একথা এখন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। যতদিন কূটনীতি সেরকম বোঝেননি, লোকে তাঁকে বুদ্ধিহীনা বলত। এখন হেরে গিয়ে তারা তাঁকে ক্রুর, নির্দয়, দুঃশীলা ইত্যাদি নিন্দাসূচক বিশেষণে বিভূষিত করে। কিন্তু তিনি এসবের ধার আর ধারেন না। তিনি জানেন, রাজা শক্ত না হলে ঘরে বাইরে শত্রু লুটেপুটে নেবে, রাজ্য দুর্বল হবে, প্রজাদের জীবন দুঃসহ হয়ে উঠবে।
আজকাল দিদ্দা বুঝতে পারেন, তাঁর বয়স হয়েছে। যে কোনোদিন তাঁর ডাক আসবে। তাই এবার রাজ্যের উত্তরাধিকারী নির্বাচন করা দরকার। সংসার ছেড়ে তো যেতে হবেই, তবে নিজের পুত্র বা পৌত্র হলেই যোগ্য উত্তরাধিকারী হয় না। এইসব ভেবে তিনি একদিন তাঁর ভাই উদয়রাজের ছেলেদের ডেকে পাঠালেন, মনে মনে ভাবলেন, ছেলেগুলোকে পরীক্ষা করে দেখি কেউ রাজা হবার যোগ্য কী না।
তিনি তাদের সামনে অনেকগুলো পালেবত ফল গড়িয়ে দিয়ে বললেন, দেখি, তোমাদের মধ্যে কে কত বেশি ফল নিতে পারে। পালেবত হল আপেল, তখনো কাশ্মীরে আপেল বাইরের দেশ থেকে আসত, তাই ফলগুলো মহার্ঘ ও কাঙ্ক্ষিত ছিল। ছেলেরা ফল কুড়োতে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া শুরু করল। শেষ পর্যন্ত দিদ্দা দেখলেন, একজন মাত্র ছেলে অনেকগুলো ফল পেয়েছে, এবং কেউ কেউ দুটো একটা পেয়েছে, কেউ বা একেবারে পায়নি। আবার যারা অল্প পেয়েছে বা পায়নি, তারাই মারামারি করে অল্পবিস্তর চোটও পেয়েছে, কিন্তু যে বেশি ফল পেয়েছে, তার একটুও আঘাত লাগেনি। রানি দেখে চমকিত হলেন, এবং বেশি ফল যে পেয়েছে, তাকে জিগ্যেস করলেন, সংগ্রামরাজ, কী করে তুমি বেশি ফল পেলে? তোমার ভাইয়েরা ফল কম পেয়েছে অথচ চোট পেয়েছে বেশি, তোমার তো দেখছি চোট লাগেইনি একেবারে।
সংগ্রামরাজ বলল, আমি ওদের বললাম, যা, ছুটে যা, ওই যে সবাই ফল নিয়ে নিচ্ছে। এই বলে ওদের দৌড় করিয়ে দিলাম। ওরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করতে লাগল--- এটা আমি নেব –- ওটাও আমি নেব --- বলে ধাক্কাধাক্কি করতে থাকল। একজন আরেকজনকে মারলে, সে ফল কুড়োনোর কথা ভুলে গিয়ে তাকে উলটে মারতে থাকল। আমি ওদের মারামারির মধ্যে ঢুকলাম না, অথচ ওদের মারামারির অবসরে অনেকগুলো ফল পেয়ে গেলাম। অন্যেরা যখন কোন্দলে ব্যস্ত থাকবে থাকবে তখন নিজের বুদ্ধি স্থির থাকলে অনায়াসে কার্যসিদ্ধি করা যায়।
দিদ্দা বুঝলেন এই ছেলেটিই কূটনীতি বুঝবে, একে রাজা করলে সে যোগ্য উত্তরাধিকারী হতে পারে। তাই তিনি সংগ্রামরাজকেই সর্বসমক্ষে তাঁর উত্তরাধিকারী ঘোষণা করে দিলেন এবং তুঙ্গকে ডেকে তার সঙ্গে মিত্রতা করিয়ে দিয়ে বললেন, তুঙ্গ, এ-ই হবে তোমার ভবিষ্যত রাজা। তুমি সম্পদে বিপদে এর সহায় থেকো। সংগ্রামরাজ, তুমি একে সর্বপ্রধান মিত্র হিসেবে গণ্য করো। তোমরা কেউ কারো প্রতি কখনো বিশ্বাসঘাতকতা করবে না-- প্রতিজ্ঞা করে দুজনে পরস্পরের কোশচুম্বন করো।
দুজনে মাথা নত করে তাঁর আদেশ শিরোধার্য করল।
সমস্ত কাজ শেষ করে হৃদয়ে নিশ্চিন্তি ও প্রশান্তি নিয়ে দিদ্দা বিশ্রামে গেলেন।