



৫
ষড়যন্ত্র
বেশিরভাগ জনগোষ্ঠীতে নারীর শাসন পুরুষেরা সহজে মানতে চায় না। নারীকে শুধু দৈহিক দিক দিয়ে নয়, মানসিক ও চারিত্রিক দিক দিয়েও দুর্বল ও ভঙ্গুর, এবং পুরুষের ভোগ্য বস্তুবিশেষ বলে মনে করা হয়। কাশ্মীরের নিজস্ব পুরাণ নীলমত এবং ইতিহাস-কাব্য রাজতরঙ্গিণীতে আছে, প্রথম রাজবংশ গোনন্দ বংশের দ্বিতীয় রাজা প্রথম দামোদরের যুদ্ধে মৃত্যু হলে তাঁর পুরুষ উত্তরাধিকারী না থাকায় শ্রীকৃষ্ণ নিজে এসে বিধবা ও অন্তঃসত্ত্বা রানি যশোবতীকে সিংহাসনে অভিষেক করতে মনঃস্থ করেছিলেন। তিনি দেখলেন, শাসক হিসেবে একজন নারী সেখানকার অমাত্য ও প্রজাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হল না যেহেতু তারা নারীকে পুরুষভোগ্য ও দুর্বল মনে করে। কৃষ্ণকে তখন অলৌকিকতা আমদানি করে তাদের বোঝাতে হয়েছিল, এই কাশ্মীরভূমি জননী পার্বতীর থেকে অভিন্ন। এখানকার রাজারা শিবের অংশ থেকে জাত। তাই এই যে রানি, যিনি সিংহাসনে বসলেন, কোনো মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তি তাঁকে অবজ্ঞা করবে না, বরং মাতা পার্বতীর মত সম্মান করবে। এই বাক্যে রানিকে অবজ্ঞা করলে যে সেই ব্যক্তির মঙ্গল হবে না, তাও নিহিত ছিল।
কিন্তু ভাল উপদেশ সর্বত্রই কুলুঙ্গিতে তোলা থাকে। প্রাক্-মধ্যযুগের কাশ্মীরও এ ব্যাপারে আর দশটা রাজ্যের থেকে ব্যতিক্রম ছিল না। একে শিশু রাজা, তায় কমবয়সী রাজমাতা শাসনকার্যে অভিজ্ঞ নন। ফল্গুনকে দমন করা হল, কিন্তু আরো অনেকে মাথা চাড়া দেবার উদ্যোগ করছিল। ফল্গুন রাজ্যশাসনের কাজকর্ম জানত, সে ছিল বহুদিনের একাধিক রাজার অমাত্য। কিন্তু সে রাজপরিবারের জীবনে হস্তক্ষেপ করতে চেয়েছিল, তার চোখের দৃষ্টিতে যুবতী রাজপত্নীর প্রতি কামের আগ্রাসন ছিল। নিজের আয়ত্তে আনতে না পেরে সে ইর্ষান্বিত হয়ে কৌশলে দিদ্দাকে সরাতে চেয়েছিল, তাই তাকে আর ভরসা করা যেত না। তবে সে ছাড়াও আরো শত্রু ছিল, শিশু রাজা ও তার বিধবা যুবতী মাকে সরিয়ে রাজ্য দখল করতে আরো অনেকেই মনে মনে ইচ্ছা পোষণ করছিল। এই যেমন মহিম ও পাটল।
ক্ষেমগুপ্তের পিতা পর্বগুপ্ত নিজের দুই কন্যার সঙ্গে দুই যোদ্ধা রাজপুত্রের বিয়ে দিয়েছিলেন এবং সেই দুজন ঘরজামাই ছিলেন। ক্ষেমগুপ্তের এই দু’জোড়া বোন ভগ্নিপতির ছেলে ছিল এই মহিম ও পাটল। এই দুজন ভাগিনেয়, রাজপ্রাসাদেই জন্মে এখানেই বড় হয়, এবং তাদের মাতাপিতা আশা করত এদের কেউ রাজা হতেও পারে, কারণ ক্ষেমগুপ্তের বহুদিন অবধি পুত্রসন্তান ছিল না। মাসতুত ভাই দুজনে দুজনের সঙ্গে যেন আজীবন সদ্ভাব রেখে চলে সেই উদ্দেশ্যে তাদের মা-বাবা কোশ চুম্বন করিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিলেন। কোশচুম্বন হল কোনো দেবতা বা গুরুজনের সামনে দুজনে নিজেদের হাতের কোশে জল নিয়ে পরস্পরকে চুম্বন করে চিরকালীন মিত্রতার প্রতিজ্ঞা করা। দুই ভাই নিজেরাও বড় হতে হতে রাজা হবার উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করত। রাজপুত্র অভিমন্যুর জন্মের পর দুটো পরিবারই হতাশ হয়েছিল। তারা খুব খুশি হয়েছেল যখন ফল্গুন দিদ্দা সহ ক্ষেমগুপ্তের সব ক’জন রানিকে সহমরণে যেতে বলেছিল। যখন দিদ্দা না মরে শ্মশান থেকে উঠে এসে রাজ্যভার গ্রহণ করলেন, তাতে তাদের আশার প্রদীপ একেবারে নিবুনিবু হয়ে গেল।
মহিম পাটলকে বলল, ভাই, যৌবন শেষ হবার পথে এসে মামা যে পুত্র পেয়েছিল, সেটা কী তার? তুমি কী মনে কর?
পাটল বলল, আমার তো সন্দেহই হয়। ওই খোঁড়া মহিলা রাজাকে গোলামের মত বশ করে রেখেছিল, তার উপপতি থাকলেও রাজা তা দেখতেন না, তিনি এমন ভেড়ুয়া হয়েছিলেন।
মহিম বলল, রাজার ছেলে বলে পরিচয় আছে, কেউ প্রকাশ্যে আপত্তি করে পারবে না। আগেও ঠেকাতে পারত না, লোহররাজা বেঁচে ছিল তখন। তাকে সবাই ভয় পেত। এখন আমাদের আর কোনো সুযোগ নেই।
দিদ্দাকে সরিয়ে দিলেই হত, কিন্তু সে তো ফল্গুনের পরিকল্পনাটা ব্যর্থ করে দিল। দেখলে না, কেমন করে সহমরণে যাবে বলেও আবার ফিরে এল। অত্যন্ত ধূর্ত মেয়েছেলে। নরবাহনের সঙ্গে পিরিত আছে, তাই সে সহায় আছে তার, পাটল বলল।
আমাদের নিজেদের শক্তি বাড়াতে হবে, বুঝলে পাটল। দিদ্দাকে আর বেশি এগোতে দেওয়া ঠিক হবে না। আমাদের শ্বশুরের সঙ্গে কথা বলতে হবে।
এই আলোচনার পরে তাদের বেশ ঘনঘন তাদের শ্বশুরবাড়ি আসা যাওয়া করতে দেখা যাচ্ছিল। তাদের দুজনে একই পরিবারে বিয়ে করেছিল। শ্বশুর শক্তিসেন শ্রীনগরীতেই থাকত, রাজপরিবারের সঙ্গে আগে থেকেই ক্ষীণ সূত্রে আত্মীয়তা ছিল এবং অর্থবলেও এরা যথেষ্ট বলীয়ান। সে স্বাভাবিকভাবে নিজের জামাতাদের সমর্থন জানাল। সে বলল, যোদ্ধার ছেলেদের এতদিনে তেজ জেগেছে দেখছি। আমি সবসময় চেয়েছি তোমরা যেন রাজা হও। মহিম ও পাটল, আমি তোমাদের সঙ্গে আছি। একথা জেনো, উদ্যম থাকলেই কার্য সিদ্ধ হয়, শুধু মনে মনে চাইলেই হয় না।
কিছুদিন ধরে দিদ্দা প্রাসাদের দাস, বিশেষ করে দাসীদের মধ্যে নিজের চরদের সংহত করেছিলেন। রাজার মৃত্যুর পর বালকপুত্র সহ তিনি দুর্বল। এখন বাঘিনীর মত নিজের সন্তানকে রক্ষা করতে হবে, হিংস্র হতে হবে। এখানে কাউকে বিশ্বাস করতে নেই, তিনি দিনে দিনে বুঝতে পারছিলেন। তাই চরের মুখে মহিম ও পাটলের গোপন আলোচনা এবং বারবার শ্বশুরবাড়িতে যাতায়াতের উদ্দেশ্য টের পেয়ে তাদের প্রাসাদ থেকে বিতাড়িত করলেন এবং তারা যেন আর ঢুকতে না পারে রক্ষীদের সেরকম নির্দেশ দিয়ে রাখলেন।
শক্তিসেন বহুদিন আশা পোষণ করত যে তার কোনো এক জামাতা শ্রীনগরীর সিংহাসনে একদিন বসবেই। এবং তখন রানির পিতা হিসেবে তার অমাত্যপদে নিয়োগও হতে পারে। কিন্তু আশা বিফলই শুধু নয়, তারা প্রাসাদ থেকেই বিতাড়িত হওয়ায় সে জামাতাদের জনবল জোটাতে উপদেশ দিল। সে বলল, মহিম, আমাদের নজর রাখতে হবে কারা দিদ্দার বিরোধী। তাদের এক করতে হবে। আমার জানামতো ললিতাদিত্যপুরের নগরপতি যশোধর আছে, সে ভাল যোদ্ধা। এর পিতা তোমার পিতার বন্ধু ছিল, একসঙ্গে অনেক যুদ্ধে সহযোগী হয়েছে, তাই সে পিতৃবন্ধুর পুত্রের ডাক অগ্রাহ্য করবে না। আর একজন আছে, পরিহাসপুরের নগরপতি এরমন্তক। ইনিও দিদ্দার প্রতি প্রসন্ন নন। ইনি ফল্গুনের আত্মীয়, ফল্গুনের নির্বাসনের পর সুযোগ খুঁজছেন। তা ছাড়া ইনি জনপ্রিয় মানুষ, কারণ গয়াতীর্থে তীর্থযাত্রীদের যে কর দিতে হয়, ইনি গয়াধিপতির সঙ্গে আলোচনা করে কাশ্মীরীদের জন্য সেই কর উঠিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন। এঁর জন্য কাশ্মীরী তীর্থযাত্রীদের খুব সুবিধা হয়েছে। সেই কারণে ইনি তোমাদের জন্য জনবল এবং অর্থবল দুইই জোটাতে সক্ষম হবেন। এঁদের কাছে দূত না পাঠিয়ে নিজেরা যাও।
তাই হবে, পিতা। এবং এঁদের নিজেদের যারা সমর্থক তাদের কথা ও জানতে হবে।
ঠিক বলেছ, মহিম।
পাটল বলল, পিতা, তাহলে আমি নিজে গিয়ে এঁদের সঙ্গে কথা বলব। কয়েকজন বিশ্বস্ত রক্ষী ও ঘোড়া আমাদের দিতে আদেশ করুন, আমি আজই ললিতাদিত্যপুর যাব, যশোধরকে আমন্ত্রণ করে আসব।
যথোচিত কথাই বলেছ, পাটল, শক্তিসেন বলল। মহিম, পরিহাসপুরে তুমি যাও, তাহলে ভাল হবে। এই দুজন প্রভাবশালী। এদের সঙ্গে যথোচিত সম্মান দিয়ে কথা বলতে হবে, মনে রেখো। এদের পেলে আরো অনেকেই আমাদের সঙ্গে আসবে। দেরি করো না।
যশোধর ও এরমন্তক শক্তিসেনের প্রত্যাশামত এলো, এবং তাদের সঙ্গে দলে মুকুল এবং উদয়গুপ্ত নামে আরো দুজন যোদ্ধা এল। এই পরের দুজন ছিল ক্ষেমগুপ্তের জ্ঞাতি ভাই। তারা দিদ্দার শাসন মানতে রাজি ছিল না, এবং নিজেরাই বালক রাজার অভিভাবক হবার ইচ্ছে পোষণ করত। সেই ইচ্ছে পূর্ণ না হওয়ায় তারা মহিমের দলে যোগ দিল। আরো একজন ছিল, হিম্মক নামে এক বিশালদেহী সৈনিক। জাতিতে তুর্ক, সে ভাড়াটে সৈন্য হিসেবে অনেক রাজ্যে কাজ করেছে, তাই নিজেকে খুব প্রশিক্ষিত ও যুদ্ধে অভিজ্ঞ সৈনিক বলে আত্মশ্লাঘা করত। হিম্মকের সম্পর্কে লোকে বলত, সে এত বলশালী যে বড় বড় পাথর শুধু হাতে খণ্ড খণ্ড করতে পারে, লোহার শেকলও ভাঙতে পারে। তাই লোকে তাকে দুর্জয় বলত, এবং বিশ্বাস করত সে যে পক্ষে যোগ দেবে সে পক্ষেই জয় অনিবার্য। সেও যুদ্ধের জন্য মুখিয়ে থাকত, এটাই তার পেশা। মহিম তাকে আমন্ত্রণ করল অন্যদের চাইতে যথেষ্ট বেশি স্বর্ণদীনার দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। মুকুল, ঐরমন্তক, যশোধর ইত্যাদিও হিম্মকের যোগদানে উদ্দীপ্ত বোধ করল। আহবায়ক মহিম হল পুরো দলের সেনাপতি ।
নরবাহন চরদের সাহায্যে পুরো খবর রাখছিল, এবং রাজমাতাকে অবহিত করাচ্ছিল। তবে হিম্মক বিদ্রোহীদের সহায় হয়েছে শুনে দিদ্দা উদ্বিগ্ন হলেন। বুঝলেন, শত্রুরা দিন দিন দলে ভারি হচ্ছে। এদের আর বাড়তে দেওয়া উচিত নয়। যুদ্ধ হতে পারে, তাই তিনি শত্রুদের ভয় দেখাতে প্রথমটা লাঠিধারী সৈন্যদল পাঠালেন, সতর্কবার্তা হিসেবে। এদিকে বালক অভিমন্যুকে নিরাপদে রাখতে গোপনে শূরমঠে পাঠিয়ে দিলেন, কারণ মঠগুলো ধর্মকর্মের কেন্দ্র বলে সহজে আক্রান্ত হয় না। আরো দেখলেন, সৈন্যসংখ্যা বাড়ানোর আগে কূটনীতি অবলম্বন করা দরকার। জানা গেল, ললিতাদিত্যপুরের যোদ্ধা ব্রাহ্মণেরা তখনো বিদ্রোহী নগরপতির সঙ্গে যোগ দেয়নি। এই ব্রাহ্মণেরা টাকার বিনিময়ে যুদ্ধ করত। তাই দিদ্দা আগে থেকেই নরবাহনকে দিয়ে তাদের ডেকে পাঠালেন, এবং তাদের হাতে যথেষ্ট স্বর্ণদীনার দিয়ে প্রতিজ্ঞা করালেন তারা যেন রাজার বিপক্ষে না যায়, আর রাজধানী বিপক্ষের দ্বারা আক্রান্ত হলে সবাই যেন অস্ত্রহাতে প্রতিরোধ করে। তারা স্বীকৃত হল। এভাবে তিনি শত্রুপক্ষের বলবৃদ্ধি সীমিত করে ফেললেন। যশোধর দেখল, দিদ্দা তার ভরসার যোদ্ধাদের হাত করে ফেলেছেন। এখন যুদ্ধ করলে জয় সম্ভব নাও হতে পারে, আর যদি মহিম জয়ীও হয়, নিজস্ব সৈন্য না থাকায় শক্তিহীন যশোধরের বিশেষ লাভ হবে না। যে সেনাধ্যক্ষ বেশি শত্রুক্ষয় করতে পারে, সেই বড় পুরস্কার পায়। নিজের স্বার্থের কথা সে গোপন রেখে মহিমকে সন্ধির প্রস্তাব পাঠাতে উপদেশ দিল। সে বলল, দেখো, মহিম, আমরা যুদ্ধ করতেই পারি। আমাদের যথেষ্ট বল রয়েছে। তবে যুদ্ধ করার চাইতে সন্ধি ভাল, যদি সন্ধি করলে লাভের পাল্লা ভারি হয়। আমরা রাজমাতার কাছে আমাদের জন্য উচ্চপদ চাইব। তাহলে পরে একদিকে বেতন ও উপঢৌকন হিসেবে, অন্যদিকে যুদ্ধ উপস্থিত হলে যথেষ্ট শত্রুধন পাবার সুযোগ রয়েছে। এরমন্তক এবং মুকুল ও এই কথায় সমর্থন জানাল। হিম্মককে যথেষ্ট আগাম অর্থ দেওয়াই হয়েছিল, তারও অসন্তোষের কারণ ছিল না। মহিম কিছুটা হতাশ হল, তবে ভাবল, একদিকে ঠিকই হল, কারণ তার নিজের ও পাটলের যুদ্ধে অভিজ্ঞতা নেই। অসন্তোষ প্রকাশ করলে ভবিষ্যতে সাহায্যের আশা থাকবে না, এই ভেবে সে সন্ধির পরামর্শে সম্মতি দিল, এবং দিদ্দাকে প্রস্তাব পাঠাল।
নরবাহন বলল, দেবী, শত্রুকে বিশ্বাস করা যায় না। আপনি কি সন্ধি করবেন?
দিদ্দা বললেন, দেখো, নরবাহন, যুদ্ধ করলে আমাদেরও তো ক্ষতি হবে। যদি বিনা যুদ্ধে সন্ধি হয়, সেটাই ভাল নয় কি? তাছাড়া শত্রু হলেও মহিম ও পাটল রাজার পিসির ছেলে, আত্মীয়। উদয়গুপ্ত, মুকুল, এরাও জ্ঞাতি। তাদের প্রাসাদে যদিও আর নিচ্ছি না, তবে প্রথম বার অপরাধ করেছে, তাই ক্ষমা করে দিচ্ছি, তারা বেঁচে থাক।
নরবাহন নিমরাজি হল।
দিদ্দা মহিমের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হলেন। সন্ধির শর্ত হিসেবে মহিম নিজের সহযোগীদের জন্য রাজসরকারে উচ্চপদ চাইল। কিন্তু সে নিজের জন্য পদ চাইল না। দিদ্দা যশোধরকে অন্যতম সেনাপতি ও মুকুলকে রাজস্ববিভাগে পদ দিতে রাজি হলেন। আরো দুতিন জনকে আলাদা আলাদা বিভাগে নিযুক্ত করলেন, যাতে তাদের পরস্পরের মধ্যে যোগাযোগ কম থাকে। বাকিদের নিজের রাজ্যে ফিরে যেতে বললেন।
নরবাহন বলল, দেবী, আমার মনে হচ্ছে, মহিম নিজেকে রাজকার্যে জড়াচ্ছে না যাতে সে আবার বিদ্রোহ করতে পারে। সে তার বন্ধুদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করে আবার বিদ্রোহ সংঘটিত করতে পারে।
দিদ্দা বললেন, নজর রেখো।
কিছুদিন পরেই নরবাহনের আশঙ্কা সত্য হবার সম্ভাবনা দেখা দিল। মহিমকে মাঝেমাঝেই রাত্রিতে সেনাপতি যশোধর ও মুকুলের বাড়িতে যেতে দেখা যায়। যশোধরকে ডেকে একদিন নরবাহন জিগ্যেস করল, তোমার বাড়িতে কাল রাতে কি কোনো অনুষ্ঠান ছিল? মুকুল ও রাজার দাদা মহিমকে যেতে দেখলাম যেন।
যশোধর বলল, প্রভু, আমি আপনাকে কথাটা বলব বলেই ভেবেছিলাম। রাজভ্রাতা মহিম এখনো অসন্তুষ্ট, চাইছেন বিদ্রোহ করতে। আমাকে বলছিলেন তাকে সহায়তা করতে, কিন্তু আমি বললাম, আমার বর্তমান অবস্থায় কোনো অসন্তোষ নেই। রাজমাতা আমাতে বিশ্বাস রেখেছেন, এতে আমি খুশি।
অল্পদিনের মধ্যেই মহিমকে নিজের ঘরেই মৃত অবস্থায় পাওয়া গেল। কেউ তাকে হত্যা করেছে অথবা অন্য কারণে সে মারা গেছে তা বোঝা যাচ্ছে না, লোকে বলাবলি করতে লাগল অভিচারের ফলে মহিমের মৃত্যু হয়েছে। নিশ্চয় এর পেছনে দিদ্দার হাত আছে। এদিকে দলপতি মারা যাওয়াতে বাকিরা ডাইনির ভয়ে আপাতত নিস্তেজ হল।
দিদ্দা প্রাথমিক ভাবে সমবেত শত্রুর উপর নিজের আধিপত্য স্থাপন করলেন।
যশোধর ভাবল, তার উপর নরবাহনের সন্দেহ আছে। তাই এমন কিছু করতে হবে যাতে রাজমাতার সন্দেহ কাটিয়ে বিশ্বাস উৎপাদন করা যায় এবং নিজেরও শক্তিবৃদ্ধি হয়।
কাশ্মীরের পশ্চিমে শাহিরাজ্য একদা দিদ্দার মাতামহের রাজ্য ছিল, এজন্য দিদ্দার সেই রাজ্য সম্পর্কে অধিকারবোধ ছিল। কিন্তু মাতামহের মৃত্যুর পর সেখানে অনধিকারী অমাত্য থক্কন রাজা হয়ে বসেছিল। রাজ্যটি পর্বত ও নদীবহুল দেশ, দুর্গম পাহাড়ি রাস্তা। এই খবর শ্রীনগরীতে পৌঁছালে সেনাপতি যশোধর প্রস্তাব করল সে শাহিরাজ্য আক্রমণ করে থক্কনকে হত্যা কিংবা নির্বাসনে পাঠিয়ে শাহিবংশীয় কোনো উত্তরাধিকারীকে সিংহাসনে বসাবে, তারপর যা উপঢৌকন লাভ করবে নিয়ে ফিরে আসবে। রাজমাতা তার প্রস্তাব অনুমোদন করলে সে বিশাল বাহিনী নিয়ে দুর্গম পথ পেরিয়ে শাহিরাজ্যে পৌছল এবং থক্কনকে পরাজিত করে প্রচুর সোনাদানা আদায় করল। থক্কন সম্পূর্ণ বশ্যতা স্বীকার করলে তাকে তাড়াল না, অনধিকারী হলেও তাকেই আবার সিংহাসনে বহাল করে সে ফিরে এল।
পরাজিত শত্রু যে কর দেয় তা রাজস্ব হিসেবেই গণ্য হয়, কিন্তু যশোধর শত্রুরাজ্য জয় করেও রাজকোষে তেমন কিছু সোনাদানা জমা দেয়নি। মহিমের সঙ্গে সন্ধির শর্ত অনুসারে যশোধর রাজার বাহিনীতে অন্যতম সেনাপতি হবার পর অমাত্য সর্বোচ্চ কম্পনপতি রক্ক তার উপর নজর রাখত। চর এসে রক্ককে খবর দিয়েছে, শাহিরাজ্যের দিক থেকে অনেকগুলো খচ্চর পিঠে বোঝা নিয়ে ললিতাদিত্যপুরের দিকে গিয়েছে। রক্ক দিদ্দাকে বলল, এটা অতি সম্ভব যে যশোধর নিজেই প্রচুর উপঢৌকন গ্রহণ করে অনধিকারী থক্কনকে রাজপদে থাকতে দিয়েছে। নিশ্চয় সে বিদ্রোহ করার উদ্দেশ্যে শাহিরাজ্য থেকে প্রাপ্ত অর্থ নিজের ভাণ্ডারে জমা করছে। বিশেষত যশোধর আগে রাজ্যাকাঙ্ক্ষী শত্রুদলের পক্ষে ছিল, মহিম বেঁচে না থাকলেও অন্য পূর্বমিত্রদের সঙ্গে তার এখনো যোগাযোগ আছে। শাহিরাজ্যের থক্কনও এখন কাশ্মীররাজের মিত্র নয়, যশোধরের মিত্র হয়েছে।
দিদ্দার আদেশে সৈন্য গেল যশোধরকে বন্দি করতে। পূর্বাহ্নেই খবর পেয়ে যশোধর রাজধানীতে না ফিরে আগের বন্ধুদের সঙ্গে মিলে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিল। বোঝা গেল রক্ক ঠিক খবরই পেয়েছিল। রাজধানীতে আরো কয়েকজন রাজপুরুষ ছিল যারা ছিদ্র অন্বেষণে ব্যস্ত থাকত। তারাও যশোধরের পক্ষে যোগ দিল। নিরাপত্তার জন্য রানি এবার পুত্র অভিমন্যুকে ভট্টারক মঠে নিরাপত্তার জন্য পাঠালেন, আগের শূরমঠে পাঠালেন না, কারণ শূরমঠের দিক থেকেই শত্রুরা নিজেদের সৈন্য সমাবেশ করে এগোচ্ছিল। এদিকে তিনি নিজে যুদ্ধের আয়োজন করতে লাগলেন। তাঁর সৈন্যবাহিনী সংহত হচ্ছে, পরের দিন সকালে আসবার কথা আছে, এই খবর গোপনে পেয়ে শত্রুসৈন্য রাজধানীতে প্রবেশ করে রাতেই প্রাসাদের ফটক ঘেরাও করে ফেলল, যদিও তারা ভেতরে প্রবেশ করতে পারল না। একাঙ্গ নামে রাজার সুরক্ষার জন্য আমৃত্যু শপথধারী কিছু সৈন্য প্রাসাদ রক্ষার জন্য ভেতরে থাকত। দিদ্দা তাদের প্রাসাদের ফটকের অর্গল ভেতর থেকে আটকে রাখতে আদেশ দিলেন। তারা প্রাচীরের উপরে গুপ্ত কোটর থেকে যুদ্ধ করতে লাগল। পরদিন সকালে রানির সৈন্যদল রাজকুলভট্ট নামে সেনাপতির নেতৃত্বে এসে হাজির হল, তারা এলে প্রাসাদ ঘিরে রাখা শত্রুসৈন্যদের ঘিরে ধরে সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করল। যশোধর ইত্যাদির সৈন্যরা একদিকে দেওয়াল ও অন্যদিকে রাজসৈন্যের মধ্যে বেশিক্ষণ যুদ্ধ চালাতে পারল না। সব মিলিয়ে কিছু ক্ষয়ক্ষতি হলেও দিদ্দা শেষ পর্যন্ত জয়ী হলেন। হিম্মকের উপর বিরোধীরা খুব নির্ভরশীল ছিল, কিন্তু কার্যকালে দেখা গেল সে কিছুই করতে পারেনি, এমন কী তার তরোয়ালের ঘা রাজকুলভট্টের কোমরে আঘাত করলেও বর্মের চামড়াও কাটতে পারেনি। সে যুদ্ধে নিহত হল। হিম্মক নিহত হলে বিদ্রোহীদের মনোবল ভেঙে গেল। বিদ্রোহী মুকুলও নিহত হলে সৈন্যরা পালাতে লাগল, ঐরমন্তক, যশোধর ও তার ভাই শুভধর ইত্যাদি যেসব রাজপুরুষ রাজকার্যে নিযুক্ত থেকেও রানির বিরুদ্ধে একসঙ্গে হাত মিলিয়েছিল, তারা বন্দি হল। একমাত্র রাজার জ্ঞাতি উদয়গুপ্তকে বৃদ্ধ বলে ছেড়ে দেওয়া হল, সে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেল। বাকি ভেতরের শত্রু যারা আগের রাজাদের সময়ও বিদ্রোহ করত, তাদের মধ্যে কয়েকজন তখনো বেঁচেছিল এবং প্রত্যক্ষ বিদ্রোহ না করলেও বিদ্রোহীদের মন্ত্রণা দিত। তাদেরও বন্দি করে নিয়ে আসা হল।
নরবাহন দিদ্দাকে বলল, দেবী, এদের আগের বার ক্ষমা করে রাজ্যশাসনে অধিকার দিয়েছিলেন। তবুও এরা বিদ্রোহ করেছে। অকৃতজ্ঞতা ও বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি মৃত্যু হয়ে থাকে। এদের আর জীবন ভিক্ষা না দেওয়াই উচিত।
রানি বললেন, তাই হোক।
৬
প্রেম ও বিচ্ছেদ
যে কোনো দেশই তার অধিবাসীদের চোখে বড় সুন্দর। স্থলে জলে আকাশে বাতাসে দিনে রাতে যে সৌন্দর্য খেলতে থাকে, জন্ম থেকে মৃত্যু মানুষ ও অন্যান্য জীবকুল এই পরিচিত সৌন্দর্যের মধ্যে জন্মায়, বড় হয়, সুখদুঃখ উপভোগ করে, আশায় ভালবাসায় বাঁচে, ছেড়ে যেতে দুঃখ পায়, কাল পূর্ণ হলে মরে। কিন্তু দেশ যখন রাজ্যে পরিণত হয়, তা প্রায়ই হয় কণ্টকক্ষেত্র। রাজ্যশাসন এক বালাই, অবিরত কণ্টকশোধন করে যেতে হয়।
সমাজের সহজ নারীনিন্দামোদী পরিস্থিতিতে যুদ্ধটুদ্ধ করে জয়ী রানি ভাবলেন, এবারে তিনি নিষ্কণ্টক হলেন। এবার তিনি তাঁর বিশ্বস্ত রক্ককে সন্ধিবিগ্রহিক পদে নিযুক্ত করলেন, এবং প্রধান অমাত্যের পদ এখন থেকে সর্বাধিকারী বলে পরিচিত হল। সর্বাধিকারী নরবাহনের ক্ষমতা এখন রাজার, অর্থাৎ রাজা অভিমন্যুর বকলমে রাজমাতা দিদ্দার পরেই। আরো কয়েকজন লোককে তিনি বিশ্বস্ত মনে করতেন, যেমন তাঁর পুরোনো শিবিকাবাহী কুয্যের পুত্র সিন্ধু ও ভুয্য। এদের মধ্যে সিন্ধু কোশাধ্যক্ষের কাজ করত সেই ক্ষেমগুপ্তের পিতা পর্বগুপ্তের কাল থেকেই। সে নিজের নামে সিন্ধুগঞ্জ নামে কর আদায়ের সংস্থা তৈরি করেছিল, এবং নিজের ভাণ্ডারেও যথেষ্ট ধন জমা করেছিল। তবে এই সিন্ধু নরবাহনের ক্ষমতা বেড়ে যাওয়ায় ভীত ও ইর্ষান্বিত ছিল, কারণ নরবাহন মাত্র ক্ষেমগুপ্তের সময় থেকে কাজে নিযুক্ত হয়েছিল, এবং ক্ষেমগুপ্ত মারা যাবার পর দিদ্দাকে সহমরণ থেকে রক্ষা করে মাত্র কয়েক মাসেই প্রধান অমাত্যের পদ পেয়ে গেছে, আর বিদ্রোহীদের কঠোর হাতে দমন করার কাজে রানির প্রধান মন্ত্রণাদাতা ও সহায়ক হয়ে এখন সর্বাধিকারী হয়েছে। রানিকে সিন্ধু মাঝে মাঝেই বলত, দেবী, ধৃষ্টতা মার্জনা করবেন, আপনার, আমাদের রাজা অভিমন্যুর এবং রাজ্যের মঙ্গলের জন্যই বলছি, দয়া করে একটু এই সেবকের কথা শুনবেন। নরবাহন মাত্র ছ’ সাত বছর হল আমাদের এখানে আছে। তাকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করতে সময় লাগবে। আবারও বলছি, ধৃষ্টতা মার্জনা করবেন রাজমাতা, তার প্রতাপ আগের থেকে প্রচণ্ড বেড়ে গেছে। আপনি জানেন, অমাত্যের বেশি ক্ষমতা হলে রাজার অধিকার খর্ব হতে পারে। তাকে সর্বাধিকারী করতে আরো সময় নেওয়া উচিত ছিল।
দিদ্দা বলতেন, তার কাজকর্ম তো ভালোই আছে, দক্ষহাতে কাজ চালাচ্ছে। তা ছাড়া সে আমাকে একবার নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছে।
সিন্ধু বলত, হ্যাঁ, সে ঠিক। তবে তার পেছনে নিজের স্বার্থ কতটুকু আছে তা জানতে হবে, দেবী। আমার বাবা আপনার শ্বশুরকুলকে সেই মহারাজ যশস্করের সময় থেকে সেবা করে আসছেন রাজপরিবারের পুরুষ ও মহিলাদের শিবিকা বহন করার ব্যবস্থা করে। তিনি জানতেন শিবিকাতে করে কত ষড়যন্ত্রী নারীপুরুষ যাতায়াত করে, যারা বাইরে থেকে খুবই ধার্মিক সজ্জন। তাঁর পাওয়া তথ্য বহুবার রাজপরিবারের সদস্যদের বিপদ থেকে বাঁচিয়েছে। কিন্তু তিনি সেই কারণে কোনো ক্ষমতা চাননি। তাঁর ছেলে আমি স্বর্গীয় মহারাজ পর্বগুপ্তের সময়ে কোশাধ্যক্ষ হতে পেরেছি। পুরুষানুক্রমে নিরলস সেবা করে এতদিন লেগেছে আমাদের বিশ্বস্ততা অর্জন করতে।
দেখো, সিন্ধু, বিশ্বস্ততা তো বটেই, তবে বিশেষ বিশেষ কার্যক্ষেত্রে বিশেষ কর্মসম্পাদনের যোগ্যতা এবং দক্ষতাও তো যাচাই করা হয়। সেসব দেখেই কোনো পদে নিযুক্ত করা হয়, তুমি নিশ্চয় জান।
সিন্ধুর মুখ আরক্ত হল। সেদিনকার মত সে চুপ করে গেল।
সিন্ধুকে দিদ্দা এভাবে নিরস্ত করলেও সে আবারও কদিন পরে অন্যভাবে সেই কথাই বলত, দেবী, আমাদের রাজা এখনো বালক। তাকে নরবাহনের থেকে সাবধানে রাখবেন।
কেন সিন্ধু, কিছু সন্দেহ হচ্ছে তোমার?
হ্যাঁ দেবী। নরবাহনের বাড়িতে ধনের পাহাড় জমছে, বিশ্বস্তসূত্রে জানলাম। সে আজকাল কোনো গঞ্জে ধন খাটাচ্ছে না। মাঝে মাঝে অপরিচিত লোকজনকে তার বাড়িতে আসতে দেখা যাচ্ছে।
দিদ্দা বললেন, ঠিক আছে, দেখার মত বিষয় হলে আমি অবশ্যই দেখব। এখন তুমি তোমার কাজে যাও। আমি সময়মত তোমাকে ডাকব।
কিছুদিন পরে এক সেদিন বিশেষ রাজসভা ডাকা হল যেখানে সব অমাত্যকে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছিল। অমাত্য রক্ক, গঞ্জবর সিন্ধু, তার ভাই ভুজ্য, এমন কী ফল্গুনের পুত্র কর্দমরাজ, যে দিদ্দার শাসনে একজন মাঝারি গোছের অমাত্য, সেও উপস্থিত ছিল। তাছাড়া রাজধানীর আরো যত বড় পদাধিকারী, তারাও এসেছিল। সেই সভায় রাজমাতা দিদ্দা সর্বাধিকারী নরবাহনকে ‘রাজানক’ উপাধি প্রদান করলেন।
এই উপাধি এখন পর্যন্ত কোনো অমাত্য পায়নি। নরবাহন যখন সর্বাধিকারী হয়েছিল, তখনই অনেকে ভেবেছিল, এত তাড়াতাড়ি পদোন্নতি ! সিন্ধু এবং আরো কারো কারো বেশ ঈর্ষা হয়েছিল। দিদ্দার যে নরবাহনের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক আছে, এই কথা কানাকানিতে রাজ্য ছেয়ে গিয়েছিল। আজ ‘রাজানক’ উপাধি যেন সেই ইর্ষাকাতরদের বুকে আরো জ্বালা ধরাতে দেওয়া হল। রাজসভায় দিদ্দা বললেন, এই যে সর্বাধিকারী নরবাহন, এঁর প্রশংসনীয় কর্মদক্ষতাকে পুরস্কার দিতে আমি মাত্র এইটুকুই করলাম। এঁর মত সুদক্ষ প্রশাসক থাকায় আমি ও আমার পুত্র মহারাজ অভিমন্যু সুষ্ঠুভাবে রাজ্যের কাজ চালাতে পারছি, বর্তমানে প্রজারাও ভাল আছে। তাই, হে নরবাহন, আপনি সামনে এগিয়ে আসুন। আমাদের কৃতজ্ঞতা গ্রহণ করুন। একটি মণিখচিত সোনার হার তিনি নরবাহনের গলায় পরিয়ে দিলেন। সভাসদেরা পরস্পর চোখাচোখি করল।
‘রাজানক’ মানে হল যে ব্যক্তি রাজার মত, তবে রাজা নয়।
দিদ্দার পায়ের সমস্যা বেড়ে গিয়েছিল। চলাফেরাতে অসুবিধা হত। এজন্য বল্গা নামে দাসী তাঁকে সাহায্য করত। রাজকার্যের ব্যাপারে তিনি নরবাহনের উপর ধীরে ধীরে বেশ নির্ভরশীল হয়ে উঠেছিলেন। নরবাহন রাজ্যে রানির আজ্ঞা প্রচার করে তাঁর প্রতাপ অপ্রতিহত করেছিল। দিদ্দার কথা মিথ্যা ছিল না, প্রজাদের অবস্থাও বর্তমানে আগের চাইতে অনেকটা ভালোর দিকে। কৃষকের কৃষি ব্যর্থ হত না, তাই রাজ্যে দুর্ভিক্ষ ছিল না, বণিকেরাও যথেষ্ট আয় করত। গৃহশত্রুদের দমন করাতে রাজস্ব রাজভাণ্ডারেই জমা পড়ত।
নরবাহনের সঙ্গে দিদ্দার সম্পর্ক সেই চিতার আগুন থেকে থেকে বাঁচানোর সময় থেকেই বন্ধুর মত ছিল। তাঁদের মধ্যে উপহার দেওয়া নেওয়া এবং পরস্পরের বাড়িতে খাওয়াদাওয়াও করতে দেখা যেত। কিছু লোকে কানাকানি করত, রানির সঙ্গে নরবাহনের প্রেমের সম্পর্ক আছে। নরবাহনের খাওয়া হলে রানি খান, তিনি শুতে গেলে ইনি শুতে যান— কে কোথায় কোন বিছানায় শুতে যান তার দরকার কি জানবার?--– এই ধরণের রসালো কথার চাপা হাহাহিহি, চোখ টেপাটেপি চলত। রানি এখনো যথেষ্ট সুন্দরী, যৌবনের শেষপর্যায়ে এসেও আত্মবিশ্বাসে দৃপ্ত; নরবাহন ও মাঝবয়সি। এই বয়সি দুজন নারীপুরুষের বন্ধুত্ব হলে তা নিয়ে রসালো কেচ্ছা সমাজে চলে, তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই, এবং এইসব উঁচুতলার লোকজনের থেকেই নিচের দিকে ছড়ায়। ক্ষমতালোভী রাজপুরুষদের স্বাভাবিকভাবেই একদিকে যেমন দিদ্দাকে শাসক হিসেবে মন থেকে সমর্থন করা একপ্রকার অসম্ভব ছিল, অন্যদিকে তাঁর প্রধান বিশ্বস্ত সহায়কে তারা হিংসে করত।
সিন্ধু আরেকদিন দিদ্দাকে বলছিল, দেবী, নরবাহন রাজশক্তিকে নিজের কাজে লাগাচ্ছে। সে আপনার আজ্ঞা নিজের নামে প্রচার করছে, আপনার নামে রাজস্ব আদায় করে নিজের কোশ ভর্তি করছে, নিজের রক্ষীদল গঠন করছে। আমার মনে হয় সে যে কোনো দিন আপনাকে ও রাজাকে বন্দি করতে পারে। তাই আপনি তার বাড়িতে যাওয়া আসা না করলে ভাল করবেন। তা ছাড়া লোকে আপনার সঙ্গে তার সম্বন্ধকে নিয়ে কলঙ্কজনক কথাবার্তা কানাকানি করছে। আমার সন্দেহ সে ইচ্ছে করেই এই রটনা করাচ্ছে, যাতে আপনি তার অধীন থাকেন। আপনার চরিত্রহনন হচ্ছে তার জন্য।
দিদ্দার মুখ আরক্ত, কপালে ভ্রূকুটি পড়ল।
যেদিন সিন্ধু একথা বলল, সেদিনই রানির নরবাহনের বাড়িতে দুপুরে খাবার নেমন্তন্ন ছিল। সিন্ধুর কথায় তাঁর মনে সন্দেহের ছায়া পড়ল। ভাবলেন, এও ঠিক, রাজপুরুষদের সম্পূর্ণ বিশ্বাস করা যায় না, এ তো কৌটিল্য ও বলে গেছেন। সিন্ধু বারবার বারণ করছে, সত্যি কী কোনো কারণ আছে? কিন্তু নরবাহন কী অবিশ্বস্ত হতে পারে? বিশ্বাস হয় না। সেদিন তিনি রজঃস্বলা হবার কারণ দেখিয়ে নরবাহনের বাড়ি গেলেন না। কিন্তু নরবাহনের মন খারাপ হয়ে গেল। দিদ্দা এলে তার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়, তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, হৃদয়েও কী দোলা লাগে না? আজ তিনি আসবেন না? রানি ও তার সম্পর্কে কুৎসিত কানাকানি তার কানেও এসেছে। রানি কী সেই মিথ্যার ফাঁদে পড়লেন? তবে লোকে অনেক কিছু বললেও একটা কথা তো মিথ্যা নয়, দিদ্দাকে সে ভালবাসে। দিদ্দার জন্য সে জীবন দিতেও পিছপা হবে না। তিনি যেদিন তার হাত আঁকড়ে ধরে তাঁকে বাঁচাতে বলেছিলেন, সেই স্পর্শ এখনো যেন সে অনুভব করে। সেদিন তার মনে হয়েছিল, এই ভীতা পক্ষিণীকে তার বুকে জড়িয়ে আশ্রয় দেয়। কিন্তু না, সে সামলে নিয়েছে। এর বেশি কিছুর কথা সে কল্পনা করে না, নিজেকে তাঁরই কাজে ডুবিয়ে রাখে। তবে রোজ একটিবার তাঁকে না দেখলে তার বুক যেন খালি লাগে, তার মন বিষণ্ণ হয়ে যায়।
তার খটকা লাগল, এমন তো কখনো হয়নি। যে কারণে তিনি আসবেন না বলেছেন, সেটা কেমন যেন ওজর মনে হল। দিদ্দা কি তাকে অবিশ্বাস করছেন? সিন্ধুকে মাঝে মাঝে দিদ্দার কাছে আসতে দেখা যায়। এই লোকটাকে নরবাহনের তেমন সুবিধের মনে হয় না। তবে পুরোনো লোক, রাজবংশের কাজে বংশানুক্রমিক ভাবে জড়িত। সে কি কিছু অভিযোগ করেছে?
পরদিন সে রানির সঙ্গে দেখা করতে প্রাসাদে গেল, কিন্তু সিন্ধু সেদিন দরজায় দাঁড়িয়েছিল। সে বলল, রাজমাতার শরীর ভাল নেই, তিনি বিশ্রাম নিচ্ছেন, তিনি যে কোনো কাউকে ঢোকাতে বারণ করেছেন।
তাঁর প্রতিহারী কোথায়? তুমি এখানে?
সিন্ধু বলল, প্রতিহারী কোনো কাজে গেছে। দেবী আমাকে এখানে থাকতে বলেছেন।
নরবাহন বলল, এমন কী হল যে আমাকেও ঢুকতে দেওয়া যায় না? আমি কে তুমি জান না?
সিন্ধু বলল, তিনি তোমাকে আর বিশ্বাস করতে পারছেন না। তুমি যাও, নিজের কোশ পাহারা দাওগে’।
এতবড় কথা? নরবাহন প্রায় তার তরবারি্র হাতল ধরে কোষমুক্ত করেই ফেলছিল, নিজেকে মুহূর্তে সংবরণ করল।
বড্ড স্পর্ধা হয়েছে তোমার!
তোমার তো স্পর্ধা তো আকাশচুম্বী। কেন হয়েছে তা রাজমাতা ধরে ফেলেছেন।
নরবাহনের মুখ শুকিয়ে গেল। সে ফিরে চলল। যেতে যেতে ভাবছিল, কী এমন কথা রানি জেনেছেন? হ্যাঁ, সে স্বর্ণদীনার জমিয়েছে বটে। কোশ তার ক্রমবর্ধমান, সে তো সব অমাত্যেরই হয়ে থাকে। সবাই জানে, সেকথা আলাদা করে রাজা বা রানিকে বলবার দরকার পড়ে না। সে অমিতব্যয়ী নয়, সেটাও কোশবৃদ্ধির একটা কারণ। রাজা বিপদে পড়লে অমাত্যের কোশাগার থেকেই অর্থ দিয়ে বিপন্মুক্ত হন--- এরকম অজস্র উদাহরণ আছে। তার কথা সে রানিকে জানায়নি, এটা সত্য বটে, তবে জানানোর অবসরও আসেনি। আর সেটা অপরাধ তো নয়। সে বলতই কোনো না কোনো সময়। তার সব কিছুই তাঁর জন্য উৎসর্গীকৃত। রানির যদি কোনো বিপদ আসে সে তার কোশ তো বটেই, জীবন দিয়ে দেবে তাঁর জন্য। কিন্তু একথা তো সাধারণ সময়ে প্রকাশ করা যায় না। তবে তিনি কী সত্যি আমার প্রতি বিমুখ? এ জীবন রেখে তাহলে কী লাভ?
বাড়ি ফিরে সে দুদিন খুব ভাবল। অপেক্ষা করল যদি দিদ্দা আসেন। কিন্তু অপেক্ষা সার, দিদ্দা এলেন না। সে শুনেছে, দিদ্দা প্রাসাদের বাইরে এসেছিলেন। অন্য অমাত্যদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তবুও তার সঙ্গে দেখা করেননি, বা তাকে ডাকেননি। সে রাজকার্য করছিল যথানিয়মে, কিন্তু কাজের মধ্যে উত্সাহ পাচ্ছিল না। রানি তার সঙ্গে ইচ্ছে করেই দূরত্ব রাখছেন, সে বুঝতে পারছিল। ক’দিন অপেক্ষার পর সে ভাবল, তার স্থান পালটে গেছে। অসম্মানের, অবিশ্বাসের, অপ্রেমের এই জীবন রেখে আর লাভ নেই। সে শাণিত ছুরিকা নিজের গলায় ঢুকিয়ে দিল।
খবর এল দিদ্দার কাছে। বুকের হাহাকারের মধ্যে দিদ্দা বুঝলেন, তাঁর সব চাইতে বিশ্বাসী বন্ধু তাঁকে ছেড়ে চলে গেল। লোকের কানাকানিকে চাপা দিতে তিনি কিছুদিন তার সঙ্গে দেখা করা থেকে বিরত ছিলেন, প্রেমকে চেপে রাখতে চেয়েছিলেন। হ্যাঁ, তিনিও তাকে ভালবাসতেন। এরকম পুরুষই তো তিনি একসময় পাশে চেয়েছিলেন, বিশ্বস্ততা, বীরত্ব, ও সংযমের সমাহার যার মধ্যে আছে। এই প্রেম প্রথম যৌবনের উদ্দাম শারীরিক প্রেম নয়, পড়ন্ত যৌবনে সাহচর্য ও সহমর্মিতা দিয়ে সান্নিধ্য উপভোগ করার অনাবিল সম্পর্ক। এ সমাজে একজন রাজমাতা এর বেশি কিছু চাইতে পারেন না। এদিকে সিন্ধু অনবরত নজর রাখছিল, তার দৃষ্টি ও বাক্য থেকে বাঁচতে ভেবেছিলেন কিছুদিন আড়ালে থাকবেন। আর নরবাহন অভিমানে চিরদিনের জন্য চলে গেল!
শোকের ভারে মনে হল, চারধার যেন নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। তার মধ্য দিয়ে তাঁকে একা পথ চলতে হচ্ছে। শুধু ছেলেটার মুখ তাঁকে এখনো চালিয়ে রাখছে, নাহলে তিনিও এক্ষুনি শানিত ক্ষুর নিজের গলায় চালিয়ে দিতেন। সারা পৃথিবীই তাঁর শত্রু, কেউ কোথাও বন্ধু নেই, জটিল কুটিল এই সমাজ। একএক বার রাগও হচ্ছে প্রচণ্ড। তরবারি হাতে চামুণ্ডার মত এক দিক থেকে এই ষড়যন্ত্রীদের শরীর থেকে মুণ্ড আলাদা করে ধরণীকে রক্তস্নান করিয়ে সব শেষ করে দাও, তবেই শ্মশানের শান্তিতে মনে শান্তি আসবে।
৭
অবরোহণ
অভিমন্যুর মাত্র আঠেরো বছর বয়স। জীবনের বহুদিন মঠে কাটানোর ফলে তার বিভিন্ন শাস্ত্রগ্রন্থ পড়াশুনোর ও পণ্ডিতদের সংসর্গে থেকে উচ্চমার্গের দার্শনিক আলোচনা শুনবার সুযোগ হয়েছে। ফলস্বরূপ সে এখনো শাস্ত্রপাঠ ও আলোচনা নিয়েই থাকে, কূটনীতির কিছুই জানে না। এক রাজ্যহীন রাজবংশের কিশোরীর সঙ্গে বিয়ে হয়েছে দুবছর আগে। একটি সন্তান হয়েছে তাদের, নাম নন্দিগুপ্ত। রাজা হলেও অভিমন্যু বড়ো কোমলমতি, এখনো শিশুর মত সরল। ঘোড়া চড়তে, অস্ত্রশস্ত্রের চালনা করতে শেখেনি, এবং কখনো ইচ্ছুকও ছিল না। এই কুটিল সংসারে সে কী করে চলবে, মায়ের মনের স্বাভাবিক শঙ্কায় দিদ্দা ভাবেন। নরবাহন নেই, শাসন ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। ছোটখাটো বিদ্রোহ এদিকে ওদিকে আবার মাথা চাড়া দিচ্ছে। ডামর সর্দারেরা আবার সৈন্য সংগ্রহ করছে। ডামরেরা মূলত সঙ্গতিপন্ন কৃষক, রাজারা যেমন তাদের মধ্যে থেকেই সৈন্য সংগ্রহ করেন, সামন্তেরাও করেন। এইজন্য ডামর সেপাইদের প্রচুর খাঁই, যে পক্ষে বেশি অর্থ, সেই পক্ষেই তারা যায়। কেন্দ্রীয় শাসন দুর্বল হলে ডামর সর্দারেরা সসৈন্য রাজধানীতে এসেও মাঝে মাঝে উৎপাত করে।
সংগ্রাম নামে এক ডামরসর্দারের ছেলেরা রাজধানীর উপকণ্ঠে জনপদে ও পথে যথেচ্ছ ডাকাতি শুরু করেছিল। তারা নিকটে অবস্থান করছে জেনে দিদ্দা নগরপালকে তাদের হত্যা করবার অনুমতি দিলেন। তারা উলটে দ্বারপতি কজ্যক ও তার রক্ষীদের হত্যা করে উত্তরঘোষ অঞ্চলে পলায়ন করল। কয়েকমাস পর অবস্থা শান্ত হলে আবার দলবল নিয়ে কাশ্মীরে ফিরে এল। এর মধ্যে সর্বোচ্চ কম্পনপতি বৃদ্ধ রক্কের মৃত্যু হল। রক্ক মারা গেলে পর ডামরেরা সবাই ভাবল এই সুযোগ। তারা একসঙ্গে মিলিত হয়ে বিদ্রোহের তোড়জোড় করতে লাগল। নতুন অমাত্য যারা নিযুক্ত হয়েছে, তাদের কর্মদক্ষতা তেমন নেই। রাজমাতা শোক ভুলে কঠিন বাস্তবে ফিরে এলেন। রাজ্যের ও রাজার রক্ষা তাঁর উপরেই নির্ভর করছে। এদিকে ঘোর বিপদ। যারা প্রধান অমাত্য হবার উপযোগী যারা ছিল তারা কেউ নেই। বেশিরভাগ অভিজাতদের এমন চরিত্র যে কাউকে কাজে বিশ্বাস করা যায় না। একটু যারা কাজ জানে, তারা অল্পদিন পরে রাজস্ব অপহরণ করে নিজেদের শক্তিবৃদ্ধি করে, তারপর বিদ্রোহী হয়ে রাজ্ঞীর বিরুদ্ধে চক্রান্ত করতে শুরু করে। এক বিদ্রোহীকে উপেক্ষা করলে সেটাকে দুর্বলতা ভেবে আরো অনেকে একই পথ ধরে। তখন বাধ্য হয়ে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হয়। কেউ কেউ আবার দুচারদিন কাজ দেখিয়ে বাকি সময় কর্তব্য ভুলে বিলাসব্যসনে ডুবে থাকে। এদিকে নিজের পা চলে না। বিশ্বস্ত দাসী বল্গার কাঁধে ভর করে চলতে হয়। আজকাল বল্গা তাঁকে প্রয়োজনে বহনও করে। লোকমুখে ‘পঙ্গু রাজ্ঞী’ নাম হয়েই গেছে। ভাবছেন, রাজ্যকে, ছেলেকে কী করে বাঁচাই! হঠাৎ মনে পড়ল পুরোনো মন্ত্রী ফল্গুনের কথা। সেই যে অস্ত্র সমর্পণ করেছিল, তারপর সে আর তাঁর বিরুদ্ধে যায়নি। পর্ণোৎসেই দিন যাপন করছিল সপরিবারে, আগের সেবা অনুসারে রানি তার বৃত্তিও ঠিক করে দিয়েছিলেন। তার ছেলে কর্দমরাজ অবশ্য পর্ণোৎসে বাপের সঙ্গে থাকে না, তাকে শ্রীনগরীতেই রাজসেবায় বহাল করা হয়েছে, কিন্তু পিতার সেই ক্ষুরধার বুদ্ধি তার নেই, এবং বিরোধীদের সঙ্গে তার যোগাযোগ আছে বলে কানাঘুষা খবর শোনা যায়। তবে ফল্গুনের কাছে সাহায্য চাইতে হবে একথা দিদ্দা কখনো ভাবেননি। এখন উপস্থিত বিপদে উপায়ান্তর নেই, সঙ্কোচ ত্যাগ করে তাকেই রাজধানীতে ডাকালেন। ফল্গুন তাঁর কাছে এল। তার চুল দাড়ি এখন পুরো সাদা হয়ে গেছে। তবে স্বাস্থ্য অটুট আছে।
সে রাজ্যের অবস্থার খোঁজ খবর নিয়েই এসেছে। জানে মহিলাটি চাপে পড়ে তাকে ডেকেছে। সে দিদ্দার দিকে প্রগল্ভ দৃষ্টিতে তাকাল।
রাজমাতা দিদ্দা! কেন ডেকেছ এই অধমকে?
এই রাজ্য ও রাজা সঙ্কটে। তাই তোমার সাহায্য দরকার, ফল্গুন। তুমি যোদ্ধা, আবার রাজনীতিজ্ঞও। তাই আমি চাই তুমি আবার প্রধান অমাত্যের পদ গ্রহণ কর। এই দেশে এখন তোমার চাইতে যোগ্য আর কেউ নেই।
কেন? আর সবার কী হল?
রক্ক ও নরবাহন মারা গেছে। আগের আরো যারা ছিল, তাদের কেউ কেউ যুদ্ধে মারা গেছে, কেউ কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করার অপরাধে মৃত্যুদণ্ড পেয়েছে, কেউ কেউ কারাগারে।
আমি দায়িত্ব নিতে পারি, কিন্তু এক শর্তে।
তার পলিত ভ্রূর নিচে, চোখ দুটোতে এখনো সেই আগ্রাসী দৃষ্টি যা বহুদিন আগে দিদ্দা দেখেছিলেন। এখন তিনি তার কাছে এবারে নিরুপায় হরিণী। জিজ্ঞেস করলেন,
কী শর্তে?
তোমাকে আমার উপপত্নী হতে হবে। এই রাজ্যে তোমার অধীনে নয়, তোমার সমান ক্ষমতা থাকবে আমার।
এই তোমার শর্ত? আমি তো তোমার কন্যার সপত্নী ছিলাম। তোমার কন্যাসমা। আমার সঙ্গে এরকম ব্যবহার করার শর্ত দিতে পারলে?
ফল্গুন বলল, কন্যা তো কবে মরেছে। তাও নিঃসন্তান অবস্থায়। সেই সম্পর্কের জের টেনে কেন থাকব? যবে থেকে দেখেছি, তুমি চিরকাল আমার মাথা ঘুরিয়েছ। এখনো যুবতী আছ, এখনো তোমার রক্তিম ঠোঁটদুটো দেখলে আমি কামার্ত হই। পুরুষের কামনা পূর্ণ করার সাধ্য তোমার এখনো আছে। লোকের মুখে শুনেছি তুমি নরবাহনের কামনা নিয়মিত পূরণ করতে। এবারে আমারও করবে। বলো, রাজি?
দিদ্দার মনে পড়ে ক্ষেমগুপ্ত বেঁচে থাকতে লোকে বলাবলি করত দিদ্দাকে না বলে তিনি কোনো সিদ্ধান্ত নেন না, ওঠবস করেন বউয়ের কথায়। তাই ফল্গুন দিদ্দাকেই বশে আনার চেষ্টা করেছিল একসময়, সে সম্ভবত ভেবেছিল তাহলে তার রাজ্য করতলগত করতে সহজ হবে। প্রথমদিকে দ্বারপতি অমাত্য হবার সুবাদে সে সময় সময় প্রাসাদে আসত রাজার সঙ্গে শাসন সম্পর্কে পরামর্শ করতে, দিদ্দাও রাজার ইচ্ছাক্রমে মন্ত্রণাকক্ষে থাকতেন, কারণ রাজা কূটনীতি বুঝতেন না, পরে রানি তাঁকে বুঝিয়ে দিতেন। তবে ফল্গুনের রাজার সঙ্গে কথা বলতে প্রাসাদে যাওয়া অনেক সময়ই ছিল নিতান্তই অজুহাত, কারণ ক্ষেমগুপ্তের চাইতে দিদ্দার দিকেই সে তাকাত বেশি, তার দৃষ্টি তাঁর সর্বাঙ্গে বিচরণ করত। অভিবাদনের সময় তাঁর সৌন্দর্যের, গয়না ও পোশাকের প্রশংসা করে রাজার সামনেই রানির শরীরের কাছে চলে আসত। সে কাশ্মীরের পূর্বতন রানি অনঙ্গলেখার গল্প করত, যিনি বিবাহিত হয়েও অমাত্য খঙ্খের প্রেমে পাগল ছিলেন, রানি নরেন্দ্রপ্রভার গল্প করত যিনি বণিক স্বামীকে পরিত্যাগ করে রাজা দুর্লভককে বিয়ে করেছিলেন, রানি শ্রীলেখা যিনি অমাত্য প্রভাকর প্রাসাদে ঢুকলে অন্য কারো প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দিতেন। অনেক রানিই স্বামী ছাড়াও অন্য পুরুষ সংসর্গ করেছেন, এতে দোষের কিছু নেই--- তার এইসব গল্প, কথাবার্তা, ব্যবহার ও তাকানোর মধ্যে যে কামনার ইঙ্গিত ছিল দিদ্দা তা বুঝতে পেরে পরে তাকে এড়িয়ে যেতেন। সে বুঝেছিল রানি তার উদ্দেশ্য বুঝেছেন এবং তাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে যাওয়ায় সে তাঁর শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
এখন এতবছর পরে তাঁকে তার ফাঁদে পা দিতে হচ্ছে। তাও জেনেশুনে।
দিদ্দা একমুহূর্ত চিন্তা করলেন, আপ্ত বাক্য মনে করলেন, সর্বনাশ আসন্ন হলে পণ্ডিত ব্যক্তি অর্ধেক ত্যাগ করেন। সবকিছু যখন যাবার মুখে, তখন প্রাজ্ঞ ব্যক্তি অর্ধেক ছেড়ে দেন, যাতে বাকি অর্ধেক হাতে থাকে। এর কথার কোনো প্রতিবাদ করে লাভ নেই এখন। নরবাহন নেই, তার সঙ্গে কী সম্পর্ক তাঁর ছিল সেকথা এই জানোয়ার বুঝবে না। মিছিমিছি কাদা ছোঁড়াছুড়ি হবে, মৃত নরবাহনের পরিবার নিয়ে, স্মৃতি নিয়ে কলঙ্ক মাখানোর চেষ্টা হবে। তা ছাড়া তাঁর নামে কলঙ্ক আগেও অকারণে রটেছে, এখন না হয় কারণে রটবে। তবুও এই লোকটি কাজ জানে, তাকে দিয়ে কাজ হবে, এই সঙ্কটকালে কাশ্মীর তো রক্ষা পাবে, অভিমন্যুও রক্ষা পাবে।
দিদ্দা বললেন, ঠিক আছে, রাজি।
মনে মনে ভাবলেন, দুর্নাম রটবে, কিন্তু আত্মসমর্পণ এত সহজে করব না।
ফল্গুন অস্ত্র ছেড়েছিল, রানির আজ্ঞায় আবার অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে রাজ্যের কাজে যোগ দিল।