• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৯২ | অক্টোবর ২০২৩ | ভ্রমণকাহিনি, প্রকৃতি, বাকিসব
    Share
  • বুড়োবুড়ির বিনা ভিসায় বিদেশভ্রমণ (২) : রাহুল মজুমদার



    ১১ অক্টোবর

    আলোভরা সকালেও অন্নপূর্ণারা মেঘের মাস্ক পরে থাকাটাই ঠিক মনে করেছে, এটুকুই যা দুঃখু; নইলে অনাবিল আলোয় পোখরা ঝলমল করছে। বেরিয়ে পড়ার জন্য প্রাণ আঁকুপাঁকু করছে, কিন্তু ফ্রী ব্রেকফাস্ট ফেলে বেরোবে, এতটা ভীমরতি তাদের ধরেনি। তাই পেট ভরিয়ে তবে গতর নাড়াল বুড়োবুড়ি। ফল কী হলো? পৌনে দশটায় যখন ওরা ফেওয়া তালের ধারে পৌঁছল, তখন মেঘেরা আকাশ জুড়ে পোখরা দেখতে বেরিয়ে পড়েছে। ভুঁড়োবুড়ো এর আগে যতবারই পোখরায় এসেছে, ফেওয়ার বুকে নৌকাবিহার করা হয়ে ওঠেনি। এবার বুড়ির দৌলতে সেই শখ পুরণ হতে চলেছে। নাইয়া সহ দু ঘন্টার জলবিহারের দক্ষিণা ১৪০০ টাকা(নেপালি)। লাইফ জ্যাকেট চাপিয়ে বুড়োবুড়ি নাওয়ের সওয়ার হলো— ডিঙি ভাসল জলে। পোখরার জল ওদের পেয়ে নৌকোর চারদিকে ছোট্ট ছোট্ট ঢেউয়ের লহর তুলে তার খুশি জাহির করল। লেকের বুকের দেবীমন্দিরও ভক্তদের নিয়ে আনন্দিত। নাইয়া নাও বাইতে বাইতে সেই মন্দিরের কাছে পৌঁছতেই বুড়োবুড়ি মত জাহির করল যে, দেবদেবীদের দূর-দর্শনই ভালো। নাইয়া এর আগে এমন আজব চীজেদের সাক্ষাৎ পায়নি, ওর চোখমুখের ভাব দেখেই বোঝা যাচ্ছে। এমন আজব কাণ্ড দেখে আকাশজোড়া মেঘেরাও কেউ কেউ সরে পড়ল। দূর থেকে অন্নপূর্ণাও এক দেড় ঝলক উঁকিঝুঁকি মেরে গেল। একটানা বাইতে বাইতে নাইয়ার ডানার হাল বেহাল। তাই দু ঘন্টার জলবিহারের দেড় ঘন্টায় অপমৃত্যু ঘটল। জলবিহারের পর বুড়োবুড়ির শখ হলো গাড়িবিহার করার। আসলে ভুঁড়োবুড়ো অনেক আগে পোখরায় ভীমসেনের মন্দির দেখেছিল। এবার দেখতে পেল, পোখরাবাসীই তার খবর রাখে না। সেটা খোঁজাই বুড়োর ধান্দা। এ পথ ও পথ করতে করতে হঠাৎ বুড়োর চোখেই ধরা পড়ে গেলেন ভীমসেন। হারানো হীরে খুঁজে পাওয়ার আনন্দে বুড়ো ছোঁড়াদের মতো লাফাতে লাগল। দেখে ড্রাইভার তো ড্রাইভার, বুড়িও ভ্যাবাচ্যাকা। জায়গাটার নামও ভীম চৌক। ভালো করে দেখে বুড়িও মানতে বাধ্য হলো, মন্দির সত্যিই সুন্দর। এদিকে ভীমসেন দরজা বন্ধ করে ভরপেটে এমন দিবানিদ্রায় মগ্ন যে, অপেক্ষা করে করে বুড়িরও দাড়ি গজানোর দাখিল। আফসোস নিয়ে বুড়োবুড়ি হোটেলে ফিরে এসে পেট ঠুসে খেয়ে মনের দুঃখে ঘুমিয়ে পড়ল। দিনের বাকিটুকু আলস্যের প্রদর্শনী করে কাটাল রাতের খাওয়ার সময় পর্যন্ত। তারপর? আবার কী? ঘুউউউম।

    ১২ অক্টোবর


    আজ আলস্যের খোলস ছেড়ে চক্কর মারার দিন। অবশ্যই (ফ্রী) ব্রেকফাস্ট সেপ্টেম্বর, তারপর। সকাল দশটায় বেরিয়ে কুড়ি মিনিটে বিন্ধ্যেবাসিনীর মন্দিরের দোরগোড়ায়। মন্দির পাহাড়ের মাথায়। বুড়ির দৌলতে লিফটবাহিত হয়ে দু মিনিটেই মন্দির চত্বরে। চত্বরে মায়ের মন্দির ছাড়াও মহাদেব, বিষ্ণু, রামসীতা এঁদেরও মন্দির রয়েছে। এখান থেকে তুষারশৃঙ্গদের যে দর্শন পাওয়ার যে পুণ্যি, তা অধরাই রয়ে গেল। অন্নপূর্ণারা কোন কারণে বিমুখ, সেটা হাজার ভেবেও বুঝে উঠতে পারল না বুড়োবুড়ি।

    বিন্ধ্যেবাসিনীর পর এবার ছুট পাতাল ছাঙ্গু বা ডেভী'স ফল দেখতে। রোদ ঝলসানো আধঘন্টার পথ পেরিয়ে পাতাল ছাঙ্গুর দুয়ারে। একসময়কার নির্জন জায়গাটা এখন জমজমাট, ভিড়ে ভিড়াক্কার। দোকানের জঙ্গল এড়িয়ে গেটের কাছে পৌঁছতে খানিক সময় গেল। অনেক হাঁটাহাঁটি — তাই বুড়িকে এক দোকানে জমা করে আসা হয়েছে; এমনিতেই কিছু সুভেনির নিতেই হতো।

    ৬০ টাকা প্রবেশমূল্য চুকিয়ে ঢুকে বুড়ো দেখল, আগের মতো খোলামেলা আর নেই; ফেন্সিং দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার কারণে। পাতাল ছাঙ্গু আগের মতোই বয়ে এসে পাতালে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। এখানেই মি. ডেভী ছাঙ্গুর রূপ আনমনে দেখতে দেখতে পা পিছলে পাতালে পড়ে যান। বুড়োর আফসোস হলো, একটু কষ্ট হলেও বুড়িকে পাতাল ছাঙ্গু দেখিয়ে নিয়ে যাওয়াই যেত। এবার উল্টোদিকের গুপ্ত মহাদেব — তিনিও পাতালবাসী। এঁর প্রবেশপথটি কিন্তু প্যাঁচালো, পাতালমুখী। কোনোমতে উঁকি মেরে দোকানে ফিরে এলো বুড়ো। সুভেনির মন্দ জমা হয়নি। চড়বড়ানো গরম মেখে হোটেলে ফিরতে ফিরতে দুটো। এসি-র ঠান্ডার ছোঁয়া পেয়ে পাঁচটার আগে বেরোনোর কোনোরকম চেষ্টাই করল না বুড়োবুড়ি। সন্ধে ছুঁই ছুঁই সময়ে ফের ফেওয়ার ধারে। গরমটা দিনভর জ্বালাতন করে বোধহয় লজ্জা পেয়েছে। লেকের জল ছুঁয়ে বাতাস এসে আলতো করে আদর করে যাচ্ছে। দেশী বিদেশী সবাই এসেছে সেই আদর খেতে। কয়েকজন বাংলাদেশের 'পর্যটিকা' এসে বুড়োবুড়ির সঙ্গে গল্প করে আনন্দ পাঁচ গুণ করে দিল। সেই আনন্দে সামিল হতেই মনে হয়, অন্নপূর্ণারাও শেষ আলোর লালিমা মেখে দেখা দিল। বুড়োবুড়ির দিল খুশ। সেই খুশি জড়িয়েই রাত্রে বুড়োবুড়ি ঘুমের সঙ্গে ভাবসাব জমালো।

    ১৩ অক্টোবর

    ইংরেজরা বলে, 'মর্নিং শোজ দ্য ডে'। সেটা ঠিক হলে 'আজ দিন যাবে ভালো'। দিবাকরের সোনালী আলো মেখে নীল আকাশের গায়ে অন্নপূর্ণাদের ছবি স্বপ্ন সাকার করে হাজির। বুড়োবুড়ি মুগ্ধ হয়েই কাটিয়ে দিল পাক্কা একটি ঘন্টা।

    তারপর ঝটপট ব্রেকফাস্ট সেরে সাতটাতেই বুড়োবুড়ি গাড়িতে। দশ মিনিটে চাকাও গড়াল। পোখরা ছাড়াতে ছাড়াতে অন্নপূর্ণা রেঞ্জের ভুরিভোজ হয়ে গেল। আগের রাতে বৃষ্টি হয়ে রাস্তা কলকাতার কথা মনে পড়িয়ে দিচ্ছে; সেটাও মন খারাপ করাতে পারল না বুড়োবুড়ির। ন-টার সময় একটা দোকান দেখে দু-জনেরই মনটা এমন জোরে 'কফি' 'কফি' করে উঠল যে, ড্রাইভার দাদা গাড়ি সাইড করে দিল।

    এরপর মার্সিয়াংদিখোলার পুল পেরিয়ে সাড়ে এগারোটায় এসে হাজির হলো মুংলিংবাজারে। এখানে গাড়ি সোজা পথ ছেড়ে বাঁকা পথ ধরল, মারল ডাইনে মোচড়। এ পথ ওদের পৌঁছে দেবে চিতওয়ন, নেপালের জগৎখ্যাত জাতীয় বনাঞ্চলে। সঙ্গী নারায়ণী নদী। খানিক পথ চলার পর দেখা দিলেন কালীগণ্ডকী, পৃথিবীর প্রাচীনতম নদীর অন্যতম। ভরদুপুরে সেই মহা নদীই মনে করিয়ে দিলেন, 'বাছাধনেরা, এই দাসঢুঙ্গীতে একটু চা-বিরতি দাও হে।' তাঁর কথা কি অমান্য করা যায়, না করা উচিত! আধঘন্টা ধরে 'চা টা' খেয়ে কালীগণ্ডকীর মান রেখে আবার চলমান হওয়া গেল। পথে গাছপালারা ভিড় বাড়াতে লাগল। সুবিধামতো সুবিধানগর, রামনগর, এরপর তস্য ভ্রাতা ভরতনগর, রত্ননগর পৌঁছিয়ে জানা গেল চিত্তহারী চিতওয়ন 'অব দূর নহী'। ডানদিকে ঘুরতেই এলো সৌরাহা চৌক। 'জাঙ্গল ক্রাউন'-এর খোঁজে খানিক ইদিক উদিক চক্কর মেরে তবে তার হদিস মিলল। দিব্যি গরম। বুড়োবুড়ি ঝটপট ১০৩ নম্বর ঘরের ঠান্ডায় ঢুকে প্রাণ বাঁচাল। স্নান করে জবরদস্ত লাঞ্চ শেষে বিছানায় গড়ানোর যে কী আনন্দ, কেউ বুড়োবুড়িকে জিজ্ঞেস করুক।

    দিনটা সত্যিই সুন্দর কাটল।

    গরমের জ্বালায় বাইরের হাওয়া খাওয়ার ইচ্ছা পেটেই রয়ে গেল। তার বদলে স্নান সেরে ভাতের থালায় ঝাঁপিয়ে পড়াটাই অগ্রাধিকার পেল। বুড়ি তো বহুদিন পরে মাছের দেখা পেয়ে আহ্লাদে ডগমগ। দাপটে রাজত্ব করে সুয্যিঠাকুর যখন দাপটে একটু ঢিল দিলেন, তখন বারান্দায় বেরোনোর সাহস দেখানো গেল। এখন আর যাই হোক, বারান্দাটাকে ওপেন আভেন বলা চলে না। বিকেলের চা-টা ওখানেই পেটস্থ হলো। রাতে প্রায় না-গরম আবহাওয়া আর ঘরের এসির দৌলতে কখন যেন কম্বলও গায়ে উঠল।

    পাখির ডাক জানান দিল ভোর হলো, দোর খোলো, বুড়োবুড়ি ওঠো রে— সক্কাল সক্কাল চা বিস্কুট, আর সাতটায় ব্রেকফাস্ট আর ওষুধ খেয়ে আমরা রেডি — আজ 'জাঙ্গল সাফারি'। সাফারির গাড়ি আমাদের নিতে সাড়ে সাতটায় হাজির। খচমচ করে বুড়োবুড়িতে উঠে বসলুম। আরও কয়েকজনকে নানান আস্তানা থেকে 'পিক আপ' করে সতেরো মিনিটের মাথায় পারমিট নিয়ে ধানক্ষেতের ধার দিয়ে দে দৌড়। সেই পারমিটের দৌলতে গেট পেরিয়ে অরণ্যচারণ শুরু। অরণ্যকে যে খুব গহীন বলা যাবে, এমন নয়— এখানে জলাভূমিই মূল গায়েন। নানা রকমের পাখিরা হরদমই দেখা দিচ্ছে; ঝলমলে ময়ূর থেকে গম্ভীর কালো-গলা সারস, কে নেই! এলিফ্যান্ট গ্রাসের নামের সার্থকতা প্রমাণ করতে একটা হাতি, অবশ্যই নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেই, বেশ কিছুক্ষণ শুঁড় আর ল্যাজ নাড়াল। গণ্ডারেরাও গোঁ ছেড়ে দর্শন দিল। এমনকি ঘড়িয়ালরাও নদীর চরে নির্বিকারে রোদ পোয়াতে থাকল। হতচ্ছাড়া মোবাইল ফোনের ক্যামেরা কালচে দাগ ছাড়া আর কিছুই যোগাড় করতে পারল না। হরিণেরা অনেক মাথাওয়ালা গোল গোল চারপায়ের জানোয়ারটাকে প্রতিদিনের মতো মাঝে মাঝে মাথা তুলে দেখল। এক জায়গায় গাড়ি নদীর ধারে খানিক দম নিল, আমরাও চড়া দামে মরা কফি খেলাম। কী দেখলাম, কতটা দেখলাম, তার থেকেও জাঙ্গল সাফারির 'এই বুঝি কিছু দেখে ফেললাম'-এর উত্তেজনাটা পুরোমাত্রায় পেলাম।

    সাড়ে দশটায় হোটেলে ফিরে বেশি ফুরসৎ পাওয়া গেল না— গরম ঠেলল স্নানঘরের দিকে। বাকি দিনটা কাটল এসির আরামে। সন্ধে থেকেই পোকামাড়েরা বাধ্য না করা পর্যন্ত বারান্দাতেই (থুড়ি, আজকাল তো বলতে হয় ব্যালকনি) কাটল।

    আগামীকাল বুড়োবুড়ির দুই মুণ্ডু আবার ফিরবে কাটামুণ্ডু, না, মানে, ইয়ে কাঠমাণ্ডুতে।

    স্নান করে বেরিয়েই বুড়োবুড়ি সোজা ডাইনিং হলে। কোনোরকমে ঠুসে সোয়া এগারোটায় দুই মুণ্ডু রওনা দিল কাটামুণ্ডু, থুড়ি, কাঠমাণ্ডুর দিকে। সত্তর মিনিট পরে মৌরী পুল। পুল একটা আছে বটে, কিন্তু মৌরী, জিরে টিরে কিচ্ছু চোখে পড়ল না। তবে, সেই ধ্বসটা দিব্যি গ্যাঁট হয়ে বসে আছে। তাকে বাবা বাছা বলে সামলেসুমলে আধঘন্টায় আসা গেল মুংলিং বাজার। টংলিং টংলিং বলে মুংলিংকে ফেলে আরও দশ মিনিট চলে দেখা মিলল মনোকামনা দেবীর মন্দিরের তোরণদ্বারের। অগণিত ভক্ত ভক্তা দেবীর দর্শনের জন্য লম্বা লাইনে ধৈর্য ধরে দাঁড়িয়ে। বুড়ির মনে বোধহয় দেবীদর্শনের ইচ্ছে ছিল, কিন্তু গেঁতো বুড়ো বোবাকালা সেজে রইল, যতক্ষণ না মনোকামনা আবছা হয়ে আসে। মোয়াখোলা নামটা দেখে দেবীর বদলে বুড়ির মন মোয়া মোয়া করতে লাগল। কোত্থাও কোনও দোকান খোলা নেই, শুধু নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া 'নদী'টাই যা খোলা। নোলা টেনে নিয়ে বুড়ি উদাস চোখে দৃশ্যাবলোকন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বেণিঘাট, মলেখু, গজুরী পার করার সময়ও কচুরির কথা তুলল না। ঘাটবেশীকে বেশি পাত্তা না দিলেও পোখরেখোলা পেরিয়ে বেলা আড়াইটেয় বৈরাং আসতেই বুড়ি চুপচাপ থাকলেও পেটের ভেতর ছুঁচোরা বক্সিং প্র্যাকটিস আরম্ভ করল। সেটা মনে হয় বুড়োবুড়ি ছাড়াও ড্রাইভারদাদাকেও খোঁচাতে লাগল। গল্ছীবাজার পার করে একটা ভারি সুন্দর বাঁকে গল্ছীতে একটা নিঝ্ঝুম 'ঢাবা'র সামনে গাড়িকে তিনটে বাজতে তিনে বলল, 'দাঁড়া রে বাপু, ছুঁচোদের শান্ত করার ব্যবস্থা করি।'

    খিদে আর গরমের মুখে ওয়াই ওয়াই নুডলস আর ঠান্ডা কোক যেন গোলোকধামের অমৃত। এরপর দু’ঘন্টার আগেই বুড়োবুড়ি কাঠমাণ্ডুর হোটেল আকামার দোরগোড়ায়।

    ওম্ শান্তি, শান্তি, শান্তি।



    অলংকরণ (Artwork) : রাহুল মজুমদার
  • পর্ব ১ | পর্ব ২ | শেষ পর্ব
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)