• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৯১ | জুলাই ২০২৩ | ভ্রমণকাহিনি, প্রকৃতি, বাকিসব
    Share
  • বুড়োবুড়ির বিনা ভিসায় বিদেশভ্রমণ : রাহুল মজুমদার



    ৮ অক্টোবর ২০২২

    সক্কাল সক্কাল, মানে ৭টা ২০তে 'নেতাজী সুভাষ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে' হাজির বুড়োবুড়ি। উদ্দেশ্য — বিনা ভিসায় বিদেশ যাওয়া।

    বিদেশ যেতে গেলে পাসপোর্ট, ভিসার দরকার। পাসপোর্ট তো আছে, কিন্তু ভিসার তো হাজার ফৈজত, গাঁটগচ্চা তো আছেই। তবে? তবে কী আবার! বিনা ভিসা পাসপোর্টে বিদেশ বলতে হাতের কাছে নেপাল। অতএব চালাও পানসি নেপালে। ট্রেনে বাসে চড়ে যাওয়া শস্তা হলেও শরীর আর সময়ের শ্রাদ্ধ। সেজন্যই বুড়োবুড়ি এয়ারপোর্টে; এয়ার ইন্ডিয়ায় সওয়ার হয়ে এক ঘন্টা পাঁচ মিনিটে কাঠমাণ্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দরে। সব সেরে বাইরে বেরোতেই আগে থেকে বলে রাখা গাড়ি পাশ ঘেঁষে এসে দাঁড়াল। কাঠমাণ্ডুর অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। রাস্তাঘাট চওড়া হয়েছে, বাড়িঘরের সংখ্যাও বেড়েছে প্রচুর। আধুনিক স্থাপত্য পুরোনো বাড়িঘরকে অতীত করে দিয়েছে। সুযোগসুবিধা বাড়লেও প্রাচীন কাঠমাণ্ডুর ঐতিহ্য গতপ্রায়। ঘন্টাখানেকেরও বেশি পথ পেরিয়ে পৌঁছনো গেল অনন্য HOTEL AKAMAয়। যেমন হোটেল তেমনই তার ব্যবস্থাপনা। খেয়েদেয়ে টুকুসখানি বিশ্রাম করতেই বুড়োবুড়ির চারটে বেজে গেল। এক ডাকে হাজির হওয়া ট্যাক্সি চড়ে এবেলা বৌধানাথ দর্শন। প্রাচীন এই স্তূপ কাঠমাণ্ডুর গর্ব, ভক্তদের আরাধনাস্থল। এর বর্ণনা দেওয়া বুড়োর কলমের কম্মো নয়। সুবিশাল স্তূপ, তাকে ঘিরে দোকানপাট, পরিক্রমাকারী অগণিত ভক্তরা, তারই মাঝে টুরিস্টদের আনাগোনা, সবই এত বর্ণময় অথচ নিরুচ্চার ভাবগম্ভীর! আড়াইটা ঘন্টা কোথা দিয়ে কেটে গেল টেরই পেল না বুড়োবুড়ি। ফেরার সময় ট্যাক্সি পেতে খানিক 'দিক্কত' হলেও অজস্র তারার চুমকি বসানো কালো চাঁদোয়ার নিচ দিয়ে হোটেলে ফিরে এলো ওরা।

    রাতে খাওয়াদাওয়া সেরে পরদিনের দ্রষ্টব্যগুলোর স্বপ্ন দেখতে নরম লেপের তলায় তলিয়ে গেল বুড়োবুড়ি।

    ৯ অক্টোবর


    আরামের ঘুম ভাঙাল পায়রার প্রেমালাপে। বাইরে কাঠমাণ্ডু সকালের হালকা ঠান্ডার আমেজে আড়মোড়া ভাঙছে। আজ কাঠমাণ্ডুর সাইডসীন, ইয়ে মানে সাইট সিয়িং। বুফে ব্রেকফাস্টে পেট ঠেসে ট্যাক্সির পেটে ঢুকে পড়ল বুড়োবুড়ি দশটা কুড়িতে। পয়লা গন্তব্য ভক্তপুর — কাঠমাণ্ডুর পুরোনো (৮ম শতাব্দীর) রাজধানী। গাড়ি কখনও ছুটে কখনও হেঁটে সোয়া ঘন্টায় নিয়ে এলো ভক্তপুরে। মাথাপিছু ৫০০ টাকা প্রবেশমূল্য দেওয়ার পর ফ্রী হুইলচেয়ার নিতে পরিচয়পত্র জমা রাখা গেল। হুইলচেয়ার ঠেলার জন্য একজন বোবা ভালোমানুষকে নেওয়া গেল ৫০০ টাকার বিনিময়ে। ভক্তপুরের দরবার স্কোয়ারে ঢুকে বিস্ময়ে হতবাক হতে হলো। কী অসাধারণ নান্দনিক! প্রতিটি ভবনের কাঠের স্থাপত্য, সূক্ষ্ম কারুকার্য যে কোনও শিল্পকীর্তিকে বলে বলে টেক্কা দিতে পারে। এক দিনে এর রসাস্বাদন অন্তত ভুঁড়োবুড়োর কম্মো নয়। অগুনতি মন্দির, প্রাসাদ, ঘন্টাতলা বুড়ি ছুঁয়ে ছুঁয়েই দেখতে হলো। মূল রাজপ্রাসাদের কারুকার্য যে কোনও শিল্পপ্রেমীকে পাগল করে দেবার পক্ষে যথেষ্ট। নেপালের সবচেয়ে উঁচু আর সম্ভবত সবথেকে প্রাচীন কাঠের স্থাপত্য ন্যয়াটা পোলা এখানেই। তিনটে ঘন্টা কোথা দিয়ে পার হয়ে গেল, টেরই পেল না বুড়োবুড়ি। আবার আসার পিতিজ্ঞে করে ভক্তপুর ছাড়ল ওরা। মুগ্ধতা খানিক কাটতে চলতি গাড়িতেই ছুঁচোরা কেত্তনের দল খুলে বসল। ঘন্টাখানেক কাটার পর অবস্থা করুণতর হতে সারথিদাদাকে বলতেই একটা মাঝারি ধরনের খাদন-বিপণিতে নিয়ে এলো। পেটের ছুঁচোদের কেত্তন থামিয়ে আপৎকালীন রসদ হিসেবে কিছু বিস্কুট বগলদাবা করা গেল। ঠান্ডা হয়ে ফিরে হোটেলের নরম বিছানায় নিজেদের বিছিয়ে দিল বুড়োবুড়ি। আজ খাওয়া ঘুম ছাড়া আর 'নো অ্যাক্টিভিটি' বাক্স প্যাঁটরা কোনোমতে গুছিয়ে নেওয়া ছাড়া। কাল 'মিশন পোখরা'। সাতসকালে গাড়ি আসবে, তাই একটু আগেই বিছানাগত হতে হবে। বুড়োবুড়ি ঘুমবুড়িকে অনুরোধ করেছে টুকুস তাড়াতাড়ি ভিজিট করতে।

    ১০ অক্টোবর

    সকাল সাতটা মানে যে কাঁটায় কাঁটায় সাতটা এমন অভিজ্ঞতা ভুঁড়োবুড়োর জীবনে বিশেষ ঘটেনি। মুখটা বেজার করে বুড়িকে আর প্যাকড ব্রেকফাস্ট বগলদাবা করে গাড়িতে উঠে বসল। ঘন্টাখানেক বেশ ফুরফুরিয়ে কাটল। তারপরই ভুঁড়োবুড়োর কপালবাবাজী জ্যাম সেজে এসে হাজির। ইয়া লম্বা গাড়ির লাইন। সামনে কোথায় নাকি একজোড়া ষোলো চাকার কন্টেনার ধ্বসে ফেঁসে আমাদের মতো কতশত লোককে ফাঁসিয়েছে। মাত্তর আধঘন্টাটাকের মধ্যেই গাড়ি নড়তে আরম্ভ করল আবার। ওই দু জোড়া ট্রাক আর গোটা দশেক নানা সাইজের ধ্বস সামলে (এখানেও উন্নয়ন — রাজপথ প্রশস্তিকরণ চলছে) ৯টা ২০তে সিকরেখোলায় এসে পরাণটা 'কফি' 'কফি' করে উঠল। কফির সঙ্গে প্যাকড ব্রেকফাস্টের সদগতি করল বুড়োবুড়ি। আবার চলমান হওয়ার ৯ মিনিটের মধ্যেই দেখা দেওয়া নওবিসেকে বিশেষ পাত্তা না দিয়ে গাড়ি ছুটতে থাকল। ধুনিবেসি ধুনি জ্বালিয়ে বসে থাকলেও তাকে পেরিয়ে মহাদোবসী, একেলাফাটকে একলা ফেলে এগিয়ে চলল। ১০টা ০৮-এ এলো গল্ছী। এখান থেকেই ডানদিকে লাংতাংয়ের পথ গিয়েছে। বৃষ্টিভেজা পথ ধরে বৈরেনী, আদমঘাট, ঘাটবেসী, গজুরী পেরিয়ে ইট্টু দম নিল নারায়ণগঢ়ে। দম নিয়ে ফের ছুট। পোখরা আর মাত্র ১৩৩ কিলোমিটার। মলেখু, সলাইঘাট (এই ঘাটে দিয়াসলাই পাওয়া যায় বোধহয়), বেণীঘাট (এখানেই কি 'আমার যেমন বেণী তেমনি রবে, চুল ভেজাব না?) বাজার পেরিয়ে ইচ্ছাকামনা। ইচ্ছা কামনা কোনোকিছুই পূরন করার চান্স পেলো না বুড়োবুড়ি। চুমলিঙটার, কুরিনটারের পর পেরিয়ে এলো মুংলিংবাজারও। থামা হলো আরও পাঁচ মিনিট এগিয়েই। না থেমে উপায় ছিল না — ত্রিশূলীখোলা আর মার্সিয়াংদিখোলার সঙ্গমের ওপর ব্রিজ। নিচ দিয়ে দুরন্তগতিতে বয়ে চলেছে মার্সিয়াংদি খোলা, যার উজানে থোরাং লা। এখানে থেমে ব্রিজের ওপর থেকে মার্সিয়াংদিখোলাকে না দেখলে পাপ হয়। তার ওপর যদি দু কাপ চা জোটে, তবে তো সোনায় সোহাগা। আধঘন্টা পর ওঠার ইচ্ছে জোটানো গেল। খানিক পরে দেখা দিল আবুসেরেনি। এখান থেকেই সরে গেছে গোর্খা-র পথ। তাকে ফেলে কুড়ি মিনিটে বন্দিপুর। বন্দি না হয়ে একটা বাজতে পাঁচে ডুমরেয়। বেসিশহরের পথের হাতছানি এড়িয়ে ব্যাস। যদিও বুড়োবুড়ির ব্যাস আরও ব্যাপ্ত। তালঘরে-র তাল শুনে, দমৌলি-র ডাকে না দমে, রাস্তার 'উন্নয়নের' ঠেলা ঠেলতে ঠেলতে পেরোনো হলো গুনাদী, ম্যয়াগ্দী দিদিদের টা টা করে থর্পুতে থামা হলো লাঞ্চ করতে তিনটে ছুঁই ছুঁই বেলায়। লাঞ্চান্তে বেলচৌতারাকে তাড়াতাড়ি পেরিয়ে না দুলেই দুলেগৌড়া ছাড়িয়ে দৌড়। গাছেপানিতে গাছে জল দেবার চান্সই মিলল না। কোতরেকে কেতরে এড়িয়ে গগনগৌড়া বাদলচৌকগ যখন পাড়ি দিচ্ছে গাড়ি , সুয্যিঠাকুর তখন গগনের পশ্চিমদিকে গড়ান দিয়েছেন। ৪.২০-এ পোখরা পৌঁছে গাড়ি বুড়োবুড়িকে 'হোটেল পোখরা বাটিকা'য় ঝেড়ে ফেলে জান বাঁচালো। বুড়োবুড়িও চমৎকার হোটেলের চমৎকার ঘরে গা এলিয়ে বাঁচল।



    অলংকরণ (Artwork) : রাহুল মজুমদার
  • পর্ব ১ | পর্ব ২ | শেষ পর্ব
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)