• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৭৮ | এপ্রিল ২০২০ | গল্প
    Share
  • জাসুসনামা : ইন্দ্রনীল দাশগুপ্ত



    দ্বিতীয় ভাগ

    ছোটি-বেগম


    || ১ ||


    আমিনাবাদের ছোটি-বেগম হরফন জাসুসকে বলেছিলেন—দেখেছ আমি কীরকম ফর্সা!

    হরফনের বয়স আঠাশ। ছোটি-বেগম আরো বছর দশেক বড়ই হবে্ন। তাঁর গায়ের রঙ সত্যিই অস্বাভাবিক সাদা। হরফন জানত পালাবার কোনো পথ নেই। আফতাব আর খণ্ড্‌ তাকে সারাক্ষণ পাহারা দিচ্ছে। সেটা কার নির্দেশে তা না জেনে একজন জাসুসের পক্ষে পালানোর কথা ভাবাও উচিত নয়। ছোটি-বেগমকে সে জিজ্ঞেস করেছিল—আপনি বিরিয়ানি খান না?

    —হ্যাঁ নিশ্চয়ই খাই। বেশি করেই খাই। তাও আমার গায়ে রক্ত হয় না।

    —মনাক্কা খেতে হবে ভোরবেলা।

    —কত হাকীম কত কিছু খাওয়াল, কিছুতেই কিছু হবার নয়।

    —হাওয়া বদলের কথা ভেবেছেন? পাহাড়ে, ঠান্ডা কোনো জায়গায় গিয়ে থাকার কথা মনে হয়েছে?

    —থেকেও এসেছি তো। এই তো গত গরমেই গেলাম কুল্‌ফিপাহাড়ের চূড়ায়। সেখানে বরফের চাঁই গলে তৈরি হয়েছে কুল্‌ফি ঝিল। তাতে স্নান করে করে আমার গায়ে একটা গো্লাপি আভা এসে যাচ্ছিল। কিন্তু ফিরে এসে আবার যে কে সেই। ধরে রাখতে পারলাম না।

    —নবাব কেন বিরিয়ানি খান না সেটা আপনি জানেন?

    ছোটি-বেগমের মুখটা ছোট হয়ে গেল। খানিক্ষণ চুপ করে থেকে তিনি বললেন—তার প্রয়োজন কীসের? সে তো রুটি গুড় খেয়ে দিব্যি বেঁচে থাকতে পারে।

    —এই নকল খোশক্‌ বিরয়ানকে আপনারা ছেড়ে দিন না। ইনি আসলে সাহিবাবাদের বাদশা। কী ভূত চেপেছে ঘাড়ে, নিজেকে সামান্য বিরয়ান ভেবে এদেশে এসে পড়ে আছেন। বদলে একটা অন্য বাবুর্চী এনে দিচ্ছি আপনাদের। তাশখন্দ্‌ থেকে। তুর্কী আর ফার্সী দুটোই জানে।

    —তার গুনাহের ভূত কে নেবে নিজের ঘাড়ে? আমরা কি ধরে রেখেছি?



    সাহিবাবাদের নবাবের সেই অগুনতি ছেলেপুলে আর নাতি নাতনি দিনের বেলা কোথায় গায়েব হয়ে যায়। শীশমহলে শুধু একটি মানুষ তখনও পড়ে থাকে। ছোটি-বেগম। শুকনো পাতাগুলো আস্তে আস্তে ঝেঁটিয়ে তিনি জড়ো করে রাখেন হভেলীর এককোণে। পরদিন জমাদার এসে নিয়ে যাবে। বিরাট চবুতরাটিকে ঘিরে চামেলির বাগানের জমিতে যে ফুলগুলো পড়ে সারাদিন সেগুলো তুলে রাখেন বিকেলের জন্য। কোথায় যেন গিয়ে টুকটাক রান্নাও করে ফেলেন। বাদশার জন্য রুটি, আফতাব আর খণ্ডের জন্য তড়কা দেওয়া ডাল, হরফন আর তাঁর নিজের জন্য পেস্তা দেওয়া বরফি। ছোটি-বেগমের উপর নজর রাখার জন্য হরফন বেগমের সারাদিনের ধীরে সুস্থে করা কাজগুলোতে সাহায্য করতে শুরু করেছিল।

    সারাদিন ধরে বিরাট বিরাট শোবার ঘরগুলো এক এক করে পরিষ্কার করা ছোটি-বেগমের প্রধান কাজ। এতগুলো ঘর, একদিনে করা সম্ভবও নয়। দিনে বড় জোর গোটা কুড়ি। এক সপ্তাহে পুরো হভেলীটা একবার সাফ করা হয়ে যায়। হরফন সব কাজে হাত লাগাতে শুরু করল। যে চাদরগুলো পালটাতে হবে সেগুলো পালটে কখনো নতুন চাদর পাতছে হরফন। কখনো ধোবীর জন্য সমস্ত নোংরা কাপড় রেখে আসছে বাইরের ঘরে। তেল ভরে দিচ্ছে লন্ঠনগুলোতে। চট করে হাওয়ামহলে চলে গিয়ে আমিনাবাদের নবাবের হুক্কায় ভরে দিচ্ছে তাম্বাকু আর ইত্র। তার এক একটি যত্নের ঘন্টা যেন ছোটি-বেগমের বিশ্বস্ত অনুচর হবার নীরব দরখাস্ত।

    দুপুরের পর যখন একটু সময় বাঁচে দুজনের হাতে তখন উঠোনের একদিকে বেগমকে একটা গালিচায় বসিয়ে দেয় সে। রূপোর পাত্রে এনে দেয় কখনো শরবত্‌, কখনো গোলাপের পাপড়ি ছেঁচা রুহ্‌ আফজা, কখনো গুলকন্দ দেওয়া লস্যি। ছোটি-বেগম এই অপ্রত্যাশিত তোয়াজে এতই সুখ পান যে তাঁর চোখদুটো বুজে আসে আরামে। একমাত্র শুধু তখন, আফতাব আর খণ্ডের সতর্ক চোখ ও কান কোথাও না কোথাও খোলা জেনেই, হরফন ছোটি-বেগমের গল্পটা বের করতে থাকে।

    —আপনার ওয়ালিদ, আম্মু, এরা সব কোথায়? কোনো ভাই বোন নেই?

    —এত খবর জেনে কী করবে হরফন? তুমি বিরিয়ানিটা খাচ্ছো না কেন সেটা জানাও বরং। তোমার ভালো লাগেনি?

    —কী বলছেন? অপূর্ব, লাজবাব, দিলকশ্‌ লেগেছ! এ স্বাদ, এ জায়কা, ভুলবার নাকি? কিন্তু রোজ খাবার সাহস নেই। দেখতেই তো পাচ্ছি বিরিয়ানি যারা খাচ্ছে তাদের কী অবস্থা। কোনো কাজের নেই কেউ, সারাদিন কোথায় যে যায়।

    —শীশমহলের নীচে তহ্‌খানায় অনেকগুলো ঘর আছে যেগুলো শীতকালে গরম আর গরমকালে ঠান্ডা। সবাই সেখানে চলে যায়। একেবারে যে ঘুমোয় তা নয়।

    —আপনি সেখানে গিয়ে পড়ে থাকেন না কেন? বিরিয়ানি খেয়েও আপনি দিব্যি সুস্থ, স্বাভাবিক আছেন। রক্তাল্পতা হলে কী হবে, জবরদস্ত্‌ দিমাগী তন্দুরস্তি আপনার। এটার উত্স কোথায়?



    রাত্রে বিরিয়ানি খাবার পর যখন সবাই এদিক ওদিক সরে পড়েছে, নবাবও তাঁর ছাতিমতলার আশ্রয় ছেড়ে কোনো একটা হাওয়াঘরের জানলার দেহলিতে মাথা রেখে ঢুলে পড়েছেন নিশ্চয়ই, তখন চাঁদের আলোয় হাওয়ামহলের উঠোনে বসে ছোটি-বেগম তাঁর গল্পটা শুনিয়েছিলেন হরফন জাসুসকে।





    ছোটি-বেগমের গল্প - ১

    প্রায় পঁচিশ বছর আগের কথা। এই যে নবাবকে দেখছ, তখন তার দাড়ি কুচকুচে কালো ছিল। চিড়িমার নবাবজাদা বলত সবাই। সে ছিল নবাবজাদাদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট, আর তার বাপ তখনও বেঁচে। সেই বুড়ো নবাবের ফুফাতো ভাইয়ের জিগরি বন্ধুর মেজো শালার চাচাতো বোনের সবচেয়ে ছোট মেয়ে হলাম আমি। অর্থাৎ নিকট আত্মীয়ই বলতে পারো। এ বাড়িতে আসা যাওয়া তো ছিলই। হাওয়ামহলে তখন অনেক লোক দেখা যেত দিনের বেলাতে। বুড়ো নবাবের অনেকগুলি নবাবজাদা তো ছিলই, বেগমরা ছিলেন, অগুনতি নাতিনাতনিও ছিল।

    মহলের পিছনে রসদ আর মাল আসার একটা রাস্তা গিয়েছে শহর পর্যন্ত। এখনও সেটা তুমি দেখতে পাবে। যদিও কাঁটাঝোপে আর ইমলি গাছের জঙ্গলে অনেকটা ঢাকা পড়ে গেছে। সেই রাস্তাটা এসে হাওয়ামহলের পিছনে একটা খোলা জায়গায় শেষ হয়। তার দুদিকে টিলার দেয়াল, আর মাঝখান দিয়ে হাওয়ামহলের তহ্‌খানায় ঢোকার একটা লোহার দরজা আছে। হাওয়ামহলের সামনে মানুষজন আসার জন্য যে দরজা, তার নাম হল ফাটক-শরীফ, আর শীশমহলের পিছনের তহ্‌খানায় ঢোকার এই দরজার নাম হল বস্ত্‌-ও-দর্‌।

    সেই রাস্তা দিয়ে একদিন একটা রুগ্ন ঘোড়ার পিঠে চেপে একটা লোক এসে হাজির। তার জামাকাপড় ময়লা, মুখে ও মাথায় কাটা দাগ, সারা গায়ে পট্টি বাঁধা। সে এসে বলল যে বুখারা আর সমরকন্দের রান্না জানে। করে দেখাতে পারে যদি সুযোগ পায়। তার ঝোলার মধ্যে ছিল কিশমিশের বড়ভাই মিশমিশ, যেটা সে বুখারা থেকেই এনেছে নাকি। কিন্তু এরকম কাটা-ছেঁড়া যার শরীর তাকে বিশ্বাস করবে কে? বুড়ো নবাব মাঝখানে এসে তাকে না বাঁচালে, ডাকাত ভেবে পিটিয়েই মারা হত। যাহোক বুড়ো নবাব জানতে চাইলেন তার সারা গায়ে এরকম তলোয়ারের ক্ষত কেন। তখন সে জানায় যে আজমের থেকে লম্বা পথ ধরে যখন তারা আসছিল তাতে যে এত জংলী জানোয়ার, এত ডাকু, এত নৃশংস সিপাহী, কে জানত। কত যে বিপদের মধ্যে দিয়ে জান নিয়ে পালিয়ে এসেছে তার ইয়ত্তা নেই। এখন একটা আশ্রয় পেলে বাঁচে।

    ঘোড়াটা তার নয়, শহর থেকে ভাড়ায় নেওয়া। ঘোড়াওয়ালার সঙ্গে আরো একটা ঘোড়া এসেছিল। তার উপর একটা চটের বস্তা। সেটাকে বস্ত্‌-ও-দরের ফাটক দিয়ে নামিয়ে তহ্‌খানার শেষ প্রান্তে একটা কুঠরির মধ্যে ফেলে দেওয়া হল। লোকটাকেও সেখানেই ঢুকিয়ে দিয়ে নবাব বললেন—নজর রাখো। দেখা যাক এর হাতের রান্না কীরকম।



    জিজ্ঞেস করছ—সেই লোকটাই আমাদের খোশক্‌ বিরয়ান কিনা? একটু সবুর করে ওই চৌকিটাতে বসো তো বাপু। জানতেই পারবে। গল্প তো চলছে।



    আগে আমার কথাটা বলি। মা মরা তিন বোন। আমি বাকি দুজনের চেয়ে অনেকটাই ছোট। আমার সেই বড়-দিদিদের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। আমার আব্বু ছিলেন হাকীম। সকালের রোদ উঠলেই বুড়ো নবাবের সারা গায়ে দর্দ হত আর ফোস্কা পড়ত। সেই রোগের ইলাজ করতেন আমার আব্বু। জহরাই খোবানির নাম শুনেছো? এটা একটা বিষাক্ত লতা। তার রসের সঙ্গে সাপের থুক আর সাঙ্খিয়াচূরণ মিশিয়ে তৈরি হয় মোহলিক সিরকা, দুই দুনিয়ার একমাত্র প্রতিষেধহীন মারাত্মক তীব্র বিষ। সেই সিরকার একফোঁটা নিয়ে এক গামলা দুধে মেশাতে হয়। তারপর এক গামলা গোলাপজলের মধ্যে সেই দুধের এক ফোঁটা ফেলে তৈরি হয় এই রোগের মর্হম্‌। সেটা বুড়ো নবাবের সারা গায়ে মাখিয়ে তাঁকে রাত্রিবেলা ঘুম পাড়ানো হত। আমার আব্বু যখন দাওয়াই নিয়ে বুড়ো নবাবের সঙ্গে শতরঞ্জ খেলতে আসতেন তখন আমি তাঁর সঙ্গে চলে আসতাম। শতরঞ্জ খেলাটা হত হাওয়ামহলের মেহ্‌মান-খানায়। আর আমি হাওয়ামহল থেকে শীশমহলের তহ্‌খানা অবধি সব জায়গায় ঘুর ঘুর করতাম।

    বয়স কম ছিল আমার। এই ছোট নবাবকে তখন লোকে বলত সাহিবজাদা চিড়িমার। কালো মখমলের ফেজটুপি পরত সে আর একটা টাট্টু ঘোড়ায় চেপে কাঁধে বন্দুক নিয়ে মহলের পিছনে যে পাহাড় আর জঙ্গল আছে, তাতে চিড়িয়া শিকার করার নামে ফাঁকায় বন্দুক চালিয়ে বেড়াত। কখনো কখনো লুকিয়ে তার পিছনে যেতাম। কোনোদিন তাকে আমি চিড়িয়া হাতে ফিরতে দেখিনি। একদিন সে আমাকে ডেকে বলল—বন্দুক চালানো শিখবি? এক কথায় রাজি হয়ে গেলাম। দুজনে মিলে জঙ্গলে গিয়ে হাজির। প্রথমবার বন্দুক চালাতে গিয়ে উলটে তো পড়লামই, গুলিটা চিড়িমারের গায়ে লাগতে লাগতে বাঁচল। এ জিনিশ আমার দ্বারা হবে না বুঝলাম। পরে এক হাতে চালানো যায় এমন একটা হালকা বন্দুক—তমঞ্চা বলে যাকে, সেটা এনে সে আমাকে কাছের নিশানা কী করে সাধতে হয় শিখিয়েছিল। ভালোই চলছিল, এবং এইভাবেই একদিন আমারও বিয়ে হয়ে যেত কোনো অন্য বাড়িতে। এমন এক দিনে সেই সব্‌রঙ্গ্‌ মির্চী, সেই যে লোকটা ঘোড়ায় চড়ে আধমরা হয়ে এসেছিল, সে আমাদের তার প্রথম রান্না করে খাওয়ালো।



    সেও একটা কাণ্ড। এরকম সুস্বাদু খাবার নবাববাড়ির কেউ কোনোদিন তাদের বাপের জন্মে খায়নি। মেহ্‌মানরা অনর্গল ওয়াহ্‌ ওয়াহ্‌ করছে, আবার ভিতরে ভিতরে হিংসেয় জ্বলেও যাচ্ছে। কারো বাড়িতে এরকম খানা পাকাবার মতো রাঁধুনে নেই। সবাই যখন সব্‌রঙ্গের তারীফ করছে আর সব্‌রঙ্গ্‌ কুর্নীশ করে সেই প্রশংসা কুড়োচ্ছে তখন বুড়ো নবাব তাকে ইশারায় বলে দিলেন তহ্‌খানায় চলে যেতে। তারপর থেকে সব্‌রঙ্গ্‌কে আর দেখা যেত না, শুধু তার রান্না খেয়ে অবাক হত সবাই।

    সব্‌রঙ্গ্‌ একটা ভালো ঘর পেয়ে গেল এবার। আলাদা রসুইঘর পেল। নবাব আর তার বেগমদের এতই ভালো লেগে গেল সেই রান্না যে অন্য সব বাবুর্চীদের বরখাস্ত করা হল। যে কটা রইল তারা রান্নাঘরের বাইরে ঝাড়পোঁছ আর বাসন মাজার কাজে বহাল হয়ে গেল।



    এইভাবে দিন কাটছিল। আমি তো বাড়িতে এলে সারাদিন ঘুরঘুর করতাম। কিছুই এড়াত না আমার চোখ। দুটো জিনিশ দেখে ফেললাম যেটা আর কারো নজরে পড়েনি। তার একটা হল এই যে চিড়িমার বয়সে জোয়ান হলে কী হবে, ভিতরে ভিতরে ছিল মনের মরীজ। সে মাঝে মাঝে জঙ্গলের মধ্যে একটা উঁচু টিলার উপর বসত বিকেলের সূর্যের দিকে মুখ করে আর একটা তমঞ্চা নিয়ে নিজের গলায় তাক করে ঘোড়াটা টিপে দিত।

    হাঁ হয়ে গেলে তো? আমিও হয়েছিলাম। কিন্তু যখন কোনো গুলি বেরোতো না, তখন সে হাসতে হাসতে টিলা থেকে নেমে এসে খোশমিজাজে ঘোড়ায় উঠে পড়ত। তারপর কয়েক মাসের জন্য তার মনের বিমারীও দূর হয়ে যেত।

    গুলি বেরোতো না কেন শুধোচ্ছো? বেরোবে কী করে? তমঞ্চা ছিল তার গোটা দশেক, আর গুলি ভরত মাত্র একটাতেই। তারপর চোখ বুজে তুলে নিত যেটা হাতে উঠে আসে। প্রথমবার এটা ধরতে পারিনি। নিজের গলায় তমঞ্চার নলটা যখন ঠেকাল তখন আমার হাত-পা ভয়ে ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। পরে ব্যাপারটা বুঝে ফেলার পর বসে বসে ভাবতাম, এইভাবে যদি সে বছরে দুই কি তিনবার নিজেকে মারার চেষ্টা করে, তাহলে কতদিন লাগবে কাময়াব হতে? একদিন না একদিন গুলিভরা বন্দুকটা তার হাতে কি আসবে না উঠে?

    যাহোক, এসব নবাবদের ব্যাপার। সাহস করে আমিও কাউকে কিছু বলিনি। যেদিন সে তমঞ্চাগুলো বাড়িতে রেখে শুধু বড় বন্দুকটা নিয়ে বেরিয়ে যেত, সেদিন আমিও নিশ্চিন্তমনে শীশমহলের তহ্‌খানায় ঢুকে এঘর ওঘর করে বেগমদের খবর নিতাম। এইভাবেই ঘুরতে ঘুরতে এক দুপুরবেলা দেখি বস্ত্‌-ও-দরের খুব কাছে একটা দু-কামরার কুঠরিতে পৌঁছে গেছি। আর একটু এগিয়ে লোহার দরজাটা খুলে বেরিয়ে যাব, এমন সময় শুনি কুঠরিতে কেউ মিহি গলায় হাঁচল—ছিঁক্‌। আমি কিছু না ভেবেই সেখানে উঁকি দিয়ে দেখি কেউ কোথাও নেই, শুধু দেয়ালের এক-কোণে একটা বড় ছালার বস্তা পড়ে আছে যেগুলোতে করে আনাজ আর রসদ আসে শীশমহলে। হঠাৎ সেই ছালার ভিতর থেকে আরেকটা হাঁচির শব্দ এল—ছিঁক্‌। তারপর ছিঁক্‌ ছিঁক্‌। তারপর? যা ভেবেছো, ছিঁক্‌ ছিঁক্‌ ছিঁক্‌ ছিঁক্‌।

    ছালার মুখে আলতো করে একটা দড়ি জড়ানো, শক্ত কোনো গিঁট নেই তাতে। পা টিপে টিপে গিয়ে সেই দড়িটা আলগা করে ছালা খুলে দিতেই কী আশ্চর্য! দেখতে পেলাম ভিতরে জড়ো সড়ো হয়ে বসে আছে গাঢ় সবুজ আর বাদামী রঙের ছোট্ট বোরখা পরা দশ বারোটা পুতুলের মতো পুঁচকে মেয়ে। তাদের কারো চুল হলুদ, তো কারো নীল, কারো চোখ সবুজ, তো কারো কালো। ছিটকে সরে আসতে গিয়ে পায়ে পা জড়িয়ে ধপাস করে পড়লাম মেঝেয়। হঠাৎ শুনি তাদের একজন মিষ্টি পুতুলের মতো গলায় বলে উঠছে—কিশমিশ চাই, না মিশমিশ?

    মেঝেতে বসেই বললাম—মিশমিশ।

    তখন বোরখার ফাঁক দিয়ে পাখির মতো স্বচ্ছ আঙুল বার করে তাদের একজন আমার দিকে একটা বড় আর রসালো বোগদাদী খোবানির মিশমিশ বাড়িয়ে দিল। হাত পেতে সেটা নিতে গিয়ে দেখলাম তাদের ছোট্ট শরীরগুলো গাছের লতার মতো দুলছে আর তার মধ্যে থেকে আশ্চর্য সব ফলমূল, জড়ীবুটি, আর শুকনো মশলার গন্ধ বেরিয়ে এসে ভরিয়ে দিচ্ছে সব্‌রঙ্গ্‌ মির্চীর ভাঁড়ারের খুপরি।

    তারপর? তারপর আরো কত কী!

    এবার এক টুকরো মিছরি আর একটু জল নিয়ে এসো বাপু। গলাটা ভিজিয়ে নিই। ভয় নেই। বলব একদিন সব।



    পরে হরফনের ঘুমের মধ্যে ছোটি-বেগম এসে চাঁদের দিকে আঙুল দেখিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন—এরকম চাঁদনি রাতে হাওয়ামহলে একা ঘোরাফেরা কোরো না হরফন। বহুদিন আগেকার লোকগুলো ফিরে এসে পথ আগলে দাঁড়াবে। সিপাহী বা বাবুর্চী যদি হয় তো তোমাকে চিনতে না পেরে ভাববে তুমি রসদ আর মালের সঙ্গে পিছনের দরজা দিয়ে ঢুকে পড়েছো। ওদের কোমরবন্ধে ছুরি থাকে, সাবধান!

    সেই স্বপ্নের মধ্যে হরফন দেখে সে চাঁদনি রাতে শীশমহলের তহ্‌খানায় প্রবেশ করছে। সিঁড়ি দিয়ে খানিকদূর নামতেই কে উপর থেকে তহ্‌খানার দরজাটা বন্ধ করে দিল। হরফন একটা ছোট বাতি হাতে তহ্‌খানার গলি ঘুঁজি পার হয়ে অকস্মাৎ কোনো প্রকাণ্ড চৌমাথার মোড়ে। সেখানে চারজন বাবুর্চী হাতে বিরাট বিরাট দা নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাদের সামনে মাটিতে একটা ছালা। সেটা দেখিয়ে তারা হরফনকে বলল—বহুৎ খুব, ঢুকে পড়ো। হরফন মন্ত্রমুগ্ধের মতো ছালার মুখ খুলে তার মধ্যে ঢুকে যেতেই সেখান থেকে লাফ দিয়ে বেরিয়ে এল চাঁদ। হরফন দেখল কোথায় ছালা, সে শীশমহল আর হাওয়ামহলের মাঝখানের পাথরের চত্বরেই পড়ে আছে। একটু দূরে কালো আলখাল্লা পরা একটা ছায়ামূর্তি তার দিকে পিছন ফিরে কুতবী সিতারার দিকে বন্দুক তাক করে স্থিরভাবে দাঁড়িয়েছিল।

    হঠাৎ ছোটি-বেগমের গলা—পালাও! পালাও!





    || ২ ||


    পরের দিন ভোরবেলা আফতাব আর খণ্ড্‌ এসে ঘুম ভাঙালো হরফনের। আফতাবের হাতে একটা প্রাচীন খঞ্জর। কোথায় পেল? আফতাব মাড়ি বের করে হাসতে থাকে। তারপর দুজন মিলে ইশারায় ডাকে হরফনকে। কিছু একটা দেখাতে চায়।

    তাদের পিছু পিছু প্রায় এক ক্রোশ জঙ্গলের পথ ভেঙে হরফন উপস্থিত হয় একটা টিলার উপর। ঠিক তুঙ্গ থেকে শীশমহলের জানলাগুলো দেখা যায়। আফতাব আর খণ্ড্‌ সোল্লাসে লাফ দিল নীচে। হরফন দেখে প্রায় দু মানুষ গভীরতায় একটা সমতল জমি। ঘাস আর গাছ-গাছালি ধরে ঝুলতে ঝুলতে নামবার পর সে দেখতে পায় বস্তুটা। পাথরের চাঁইয়ের ফাটলে একটা ভয়ংকর জঙ ধরা লোহার তমঞ্চা উদ্ভিদের মতো গজিয়ে গেছে কীভাবে। খণ্ড্‌ সেটাকে দুহাতে ধরে উপড়ে নেয় এবং হরফনের দিকে তাক করে খ্যাক খ্যাক করে হাসতে থাকে। ভীষণ বিরক্ত হয়ে হরফন তাকে ঠাস করে একটা চড় মারতে এগিয়েছিল, কিন্তু দুটো বাঁদর দুদিক থেকে তার চুল ধরে টেনে তাকে মাটিতে বসিয়ে দিয়ে পালায়।



    দুপুরে বিরাট হুক্কার নল মুখে করেই নবাব যখন ছাতিমতলার নীচে আরামকুর্সীতে গা রেখে কাৎ, তখন রোজকার মতো ছোটি-বেগমের জন্য রূপোর থালায় পানের ডিবেটা নিয়ে যায় হরফন জাসুস।—একটু জরদা ফরমান বেগম-সাহিবা। কিঞ্চিৎ গুলকন্দের জায়কা নিন।

    বেগমকে খুশী করার পর কোর্তার ঢোলা জেব থেকে কাপড়ে জড়ানো তমঞ্চাটা উপঢৌকনের মতো রূপোর থালার উপর স-কুর্নীশ পেশ করে সে। নবাবের একটি হারানো সম্পত্তি সমর্পণ করার ইজাজত চায় নিখুঁত আদবে। জড়ানো কাপড়টা সরাবার আগেই যে ছোটি-বেগমের হাত কেঁপে যাচ্ছে সেটা গোপন থাকে না। তমঞ্চার বাঁটটা দিবালোকে প্রকাশ হবার সঙ্গে সঙ্গে ছোটি-বেগমের চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা জলও গড়িয়ে পড়েছিল এই যোগাযোগ কি কোনো জাসুসের দৃষ্টি এড়াতে পারে?

    —কোথায় পেলে এটা?

    —আফতাব আর খণ্ড্‌ পেয়েছে খুঁজে। টিলার উপর।

    —রক্তের দাগ আছে, তাই না? রক্ত ছড়িয়ে আছে পাথরের উপর?

    —রক্তপাত হয়েছিল নাকি? এখন অবশ্য দেখার কিছু নেই। কবে ধুয়ে মুছে গেছে সব। অস্ত্রটা তো বেশ জঙ ধরা। তাজ্জব হয় এটা টিলার উপর রয়ে গেল কী করে।

    —সব কিছুর মূলে ওই সব্‌রঙ্গ্‌ মির্চী। সে না এলে কিছুই হত না।

    —কী হত না, বেগম-সাহিবা?

    —রক্তপাত! এতগুলো প্রাণহানি। পৃথিবীটা যে কীরকম জালিম সেটা জানা হত না। কেন তুমি এটা নিয়ে এলে আমার কাছে?

    —আমায় মাফ করবেন। গুস্তাখী হয়ে গেছে। একটা সরবৎ নিয়ে আসি আপনার তবিয়তের খিদমতের জন্য?



    যাবার সময় হরফন তমঞ্চাটা সরিয়ে নেয়। এটা তারই হয়ে গেল তাহলে।



    পরে হরফন ভাবছিল, অতগুলো নবাবজাদা থাকতে এই ছোট নাবাবজাদা কী করে নবাব হয়ে গেলেন। আর তার দাদারা সবাই কোথায়? হভেলীতে হরফন আর নতুন খোশ্‌ক্‌ বিরয়ানকে বাদ দিলে একজন মাত্র পুরুষ—নবাব নিজে। বেগমদের ও ছেলেপুলেদের ছেড়ে বাকি পুরুষরা গেলেন কোথায়?

    আফতাব আর খণ্ড্‌কে ধরে জিজ্ঞেস করেছিল হরফন। তারা খোক্‌ খোক্‌ করে হাসতে হাসতে গলার সামনে হাতটা এদিক ওদিক চালিয়ে দেখিয়েছিল—অর্থাৎ কচুকাটা। কিন্তু কীভাবে? কে করল এবং কেন? কোনো জবাব নেই তার। খণ্ডের টুঁটি ধরে তাকে দেয়ালের গায়ে চেপে হরফন বলেছিল—তোর তো এক ছিঁটে বুদ্ধি আছে ঘটে। এখানে কী করতে এসেছি? সাহিবাবাদের বাদশাকে হুঁশে ফেরাবার কোনো তরীকা আছে কিনা সেটা জানতে। মটরগশ্‌তী করে বেড়াবার জন্য আসিনি কেউ। উত্তরগুলো খুঁজে বার কর।

    তারপর থেকে দুজনে গায়েব। তহ্‌খানাতেই গিয়ে সারাদিন ঘুমোচ্ছে নির্ঘাত।

    আমিনাবাদের নবাব আছেন নিজের খেয়ালে। কখনও একটা সোনালী চশমা পরে হাওয়ামহলের কিতাবঘরে বসে পড়ছেন অল-কিমিয়া আর বারুদ বানাবার কেতাব, কখনও ছাতিমতলায় বসে হুক্কা ফরমাচ্ছেন। চিড়ি মারা তো দূরের কথা, কোনোদিন বন্দুক ধরতে দেখা যায়নি তাঁকে। মাঝে মাঝে হরফনের দিকে মাথা নাড়েন। ফিরেই যাও—যাকে নিতে এসেছো সে তো আর ভালো হবার নয়।

    —আপনি চাইলে কী না হয়। মোসাহেবী করে বলেছিল হরফন।

    —আমার হাতে কিস্‌সু নেই। ছোটি-বেগমকে ধরতে পারো। বিড়বিড় করে শীশমহলের দিকটা দেখিয়ে নবাব শালের খুঁটটা তুলে নিজের পথ ধরেছিলেন। হরফনও চলে যাচ্ছিল শীশমহলে। হঠাৎ নবাব কী ভেবে থমকে দাঁড়ালেন।—আজ তো পূরণ-মাসী, মাহ্‌-কামীল। রাতে যখন গেন্দুয়ার মতো পুরা চাঁদ আসমানের ছপ্পর ফেঁড়ে হভেলীর চত্বরে এসে হল্লা করবে তখন খানিকটা হলদির মর্হম তৈয়ার রেখো। কাজে লাগতে পারে।

    কী এর মানে কে জানে?



    সেদিন রাত্রে ছোটি-বেগমেরও ঘুম আসছিল না। তাঁকে যত্ন করে পান সেজে দিয়েছিল হরফন। কী করে সাহিবাবাদের নবাবকে সুস্থ করা যায় সেটা জানবার জন্য উঠোনের উপর একটা কুর্সী পেতে বসিয়েছিল সে বেগমকে।

    —পঁচিশ বছর আগে কী হয়েছিল বেগমসাহিবা? কার রক্ত লেগেছিল তমঞ্চাতে? যে ছেলেপুলেগুলোকে আজকাল দেখি সেগুলো কাদের বাচ্চা? তাদের ইতিহাস কী? অদ্ভুত যে সব কাণ্ড হয় এই হভেলীতে তার কোনো মানে আছে?

    তখন ছোটি-বেগমের বে-আঁচড়ানো চুলগুলো ফিনফিনে হাওয়ায় উড়তে উড়তে তাঁর মুখে এসে পড়ছিল। বেগম সব প্রশ্ন শুনতে পাননি, তাঁর উদ্বিগ্ন চোখের দৃষ্টি ছিল দূরে হভেলীর দেয়ালের দিকে, যেখানে লেজ ঝুলিয়ে বসেছিল আফতাবের অবয়ব, কিন্তু যার উপরে একটু পরে পূর্ণিমার চাঁদেরও আসার কথা।

    —নবাব কিছু বললেন তোমাকে?

    —আপনাকেই শুধোতে বললেন। আমাদের বাদশার মাথা খারাপ হয়ে গেছে, তিনি নিজেকে বাবুর্চী ভাবছেন। স্বীকার করছি সে জন্য দায়ী তিনি নিজেই। কিন্তু কিছুটা দায়িত্ব আপনাদের উপরেও কি আসে না? এই হভেলীতে কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে। তার খুঁট ধরে এগোলে তবেই জট খুলতে পারে। সে খুঁট বেগম-সাহিবা আপনার হাতে। কে এই খোশ্‌ক্‌ বিরয়ান এবং কেন তাকে এখান থেকে সরানো অসম্ভব সেটা আপনি জানেন?

    —পূরণ-মাসীর রাতেই ঘটে সবকিছু। বললেন ছোটি-বেগম।—সে জন্য আজকের রাতে আমার ঘুম হয় না। একমাত্র তোমাদের নবাব ঘুমোতে পারে। পাথরের মতো দিল আছে তো তার।

    —কী হয়েছিল পূরণ-মাসীর রাতে?

    —পারবে সইতে? পারবে না তুমি। পালাও হরফন, এখান থেকে দফা হও তুমি।

    কিন্তু হরফনের বরফের মতো ঠান্ডা হাত গোলাপের সরবত এগিয়ে দিচ্ছিল। পালাবার হিম্মত বা ইরাদা কোনোটাই ছিল না তার।





    ছোটি-বেগমের গল্প - ২

    শোনো তবে।

    এরকমই এক পূরণ-মাসীর সন্ধ্যেবেলা জল্লাদের মতো চারজন পুরোনো বাবুর্চী খোশক্‌ বিরয়ানকে ধরে দড়ি দিয়ে আগাপাশতলা বেঁধে ফেলল।

    হভেলীর সমস্ত পুরুষ তখন দেওয়ানখানায় বসে হুক্কা খাচ্ছিল আর তাশ খেলছিল। জল্লাদগুলো বস্ত্‌-ও-দরের রাস্তা দিয়ে এসে কীভাবে যেন তহ্‌খানায় ঢোকার ইজাজত পেয়ে যায়।

    তাদের আরো কিছু বদমাইশ শাগির্দ সবকিছু তছনছ করবে বলে খোশ্‌ক্‌ বিরয়ানের ঘরটাতে ঢুকেছিল। কিন্তু বস্তার মধ্যে থেকে কচি গলায় কেউ তাদের ডেকেছিল “বাবা!” বলে। তখন ছালা খুলে সেই পুতুলের মতো মেয়েগুলোকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে তাদের কী হাসি!

    সেই হাসি শুনে শীশমহলের মধ্যে আমরা যারা ছিলাম তাদের সবার রক্ত জল হয়ে গিয়েছিল। তার পর শোনা গেল খোশ্‌ক্‌ বিরয়ানের গলা। শিশুদের মতো ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদছে সে। কী যে সে বলছে প্রায় কিছুই বোঝা যাচ্ছে না, শুধু একটা জিনিস বাদে। মাঝে মাঝে সে পুতুলগুলোকে নাম ধরে ডাকছে আর আদর করে বলছে—ভয় নেই নরগিস্‌! চিন্তা করিস না রে আয়েষা! এক্ষুনি নবাব আসবেন আর সব ঠিক হয়ে যাবে।

    সেই শোর-শরাবার মধ্যে চত্বরে তুলে এনে থামের সাথে বাঁধল বাবুর্চীরা খোশ্‌ক্‌ বিরয়ানকে। লপাৎ করে আকাশে লাফিয়ে উঠল চাঁদ। হাওয়ামহল থেকে হুক্কা হাতে নবাবের যে সব ছেলেরা বেরিয়ে এসেছিল তাদের সূর্মা লাগানো চোখ কপালে উঠে গিয়েছিল এই দৃশ্য দেখে। শীশমহলের তামাম জেনানা সভয়ে কিবাড়ের ফাঁক দিয়ে আর থামের আড়াল থেকে দেখছিল জল্লাদেরা একটা বস্তা এনে সবার সামনে মাটিতে ফেলে বলছে—দেখবে এসো নতুন বাবুর্চীর খুফিয়া কারচুপী। কোত্থেকে জিন আর ভূত এনে ঢুকিয়েছে হভেলীর ভিতর।

    জিন? ভূত? শুনে নবাবজাদারাও দু-পা পিছিয়ে গেল। তখন বাবুর্চীরা খোশ্‌ক্‌ বিরয়ানের ছালাটাকে উলটো করে ঝাড়তে শুরু করল সেই চকচকে চাঁদের আলোয় আর তার ভিতর থেকে সকালবেলার ফুলের মতো হালকা আর নরম তুলতুলে একটা একটা করে পুতুল ঝরে পড়তে লাগল চত্বরে।

    `আল্লাহ্‌', বলে একটা ধ্বনি উঠল চারদিক থেকে! এ আবার কী আফত্‌? এ কী কয়ামত্‌! এরকমটা দেখেছে কেউ কোনোদিন? আতঙ্কে, বিস্ময়ে সমবেত একটা হায় হায় শোর মচে গেল।

    জল্লাদরা বলল—ভয় নেই। আমরা থাকতে কোনো ক্ষতি করতে পারবে না এই জিনরা। নিন না এদের হাতে করে তুলে? ধরে দেখুন, কীরকম নরম তুলতুলে শরীর, আর কী সুন্দর এদের গায়ের গন্ধ। নবাবজাদাদের কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিল এই হতচ্ছাড়া বিরয়ান।

    তখন একটু সাহস পেয়ে নবাবজাদারা একজন একজন করে পুতুলদের হাতে তুলে দেখতে লাগল। হাতে হাতে ঘুরতে লাগল পুতুলরা। আঃ কী সুন্দর গন্ধ। মনে হয় একটু চেটে দিই।

    —দিন না চেটে। দেখুন না, কী জন্নতের ফলের মতো স্বাদ! বলল বাবুর্চীরা।—ভয় কীসের? আসলে এগুলো তো খাবারই জিনিস। বস্ত্‌-ও-দরের রাস্তা দিয়ে বস্তাবন্দী হয়ে ঢুকেছিল মহলে। আপনাদের নতুন বাবুর্চীর মশলা তো এরাই। রান্নার উপর এদের কোনো একজনের আঙুল ঠেকালেই সেটা লবাবদার হয়ে যাচ্ছিল। নইলে ব্যাটা উল্লু-কা-চরখা রান্নার কী জানে?

    পুতুলরা রিনরিনে গলায় কী বলল তা আর শোনা গেল না। একজন আরেকজনের নাম ধরেই ডাকছিল হয়ত তারা। কিন্তু নবাবজাদারা ততক্ষণে তাদের আস্তে আস্তে চাটতে শুরু করেছে। কেউ সেই ফুলের পরাগের মতো স্বচ্ছ আর পলকা আঙুলগুলো চুষে বলছে—সুভানাল্লা! কেউ মুখের সুগন্ধ গ্রহণ করে গালটা চেটে দিয়ে বলছে—লাজবাব! একটু বয়স্ক নবাবজাদা যারা, যাদের বেশ অনেকগুলো বেগম ও ছেলেপুলে আছে, তারা একটু আড়ালে গিয়ে কোনো পুতুলের জামা একটু তুলে তার লিচুর কোয়ার মতো রসালো ঊরু চেটে দিয়ে কুদরতকে তার মেহেরবানীর জন্য অগুনতি শুক্রিয়া জানাচ্ছে মনে মনে।

    বাবুর্চীদের হর্ষোন্মত্ত অট্টহাসি, আর পুতুলদের মিহি আর্তনাদের মধ্যে এই বিরাদরী দাওয়াত কতক্ষণ চলেছিল তার ঠিক নেই। হঠাৎ ঝপ করে একসময় বাবুর্চীরা চুপ করে যায়। সেটা দেখে নবাবজাদারাও নিজেদের কাজ থামিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। শেয়ালের কান্নার মতো খোশ্‌ক্‌ বিরয়ানই শুধু তার একটানা গৎ-টা গেয়ে চলেছিল।

    কী হল?

    মসলিনের আলখাল্লা পরা বুড়ো নবাব হাওয়ামহল থেকে ধীর পায়ে এগিয়ে আসছিলেন। তাঁর ঘুম চোপট হয়ে গেছে। উস্কোখুস্কো সাদা চুল ও অসন্তুষ্ট দৃষ্টি নিয়ে তিনি সবার মাঝে এসে দাঁড়ালেন। বিরাট চত্বরের মাঝখানে চাঁদের চোখ ধাঁধানো আলোয় সেই সাদা বুড়োকে দেখাচ্ছিল কোনো জাদুকরের পিটারা থেকে বেরিয়ে আসা একটা খেলনা বাজীগরের মতো। তিনি বিরক্ত হয়ে সবার দিকে তাকিয়ে বললেন—এত চিল্লাচিল্লি কেন? মাজরা-টা কী?



    চাঁদটা পাঁচিলের উপরে চলে এসে হুলো বেড়ালের মতো উঁকি ঝুঁকি মারছিল। হভেলীর অলি গলি দিয়ে অন্ধকারে যে ইঁদুরগুলো ছুটোছুটি করে বেড়ায় তার একটাকে দেখতে পেলেই যেন কপ্‌ করে গিলে খাবে। ছোটি-বেগম জল খাবার জন্য আবার থেমেছিলেন। তাঁর ফর্সা ঘাড় বেয়ে একটা ঘামের সরু ধারা বেরিয়ে আসছে। হরফনের মনে হল সাহিবা সম্পূর্ণ সুস্থ নেই।

    —বাকিটা আরেকদিন বলবেন। আজ আর তকলীফ নেবেন না বেগম। আদাব করে সে জানায়।

    ছোটি-বেগম চাঁদের দিকে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে বলেন—ওই দ্যাখো। আবার উঠে এসেছে সেই জালিম জন্তুটা। নেকড়ের চেয়ে ভয়াবহ। আমাদের পুড়িয়ে খাক করে দেবে।

    —আপনি না হাকীমের মেয়ে? ঘুমের জন্য একটা দাওয়া-দারু করতে পারেন না?

    —আমাকে জেগে থাকতে হয় যতক্ষণ না ওটা আকাশের মাঝখানে চলে আসে।

    —কেন? আপনি ঘুমিয়ে পড়লে কী হবে?

    —একটা কাজ করতে হয় পূরণ-মাসীর মাঝ-রাত্তিরে। আমি জেগে না থাকলে সেটা করবে কে?

    —কী কাজ সেটা?

    কিন্তু ছোটি-বেগম কিছু বলতে চান না। তাঁর চোখের চাউনি বরাবর ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে গিয়ে হরফনের প্রায় দিল-কা-দৌরা পড়ে যায়।

    চত্বরের ঠিক মাঝখানে জাদুকরের পিটারা থেকে বেরোনো খেলনার মতো একডজন মূর্তি এসে জড়ো হয়েছিল! হরফনের হাতের পাঞ্জার থেকে বড়ো হবে না কেউই। কোত্থেকে একটা আসমানী রোশনীর বৃত্ত এসে মূর্তিগুলোকে ধুইয়ে দিচ্ছিল ভৌতিক আলোয়।

    আরও এক মুহূর্ত পরে বিস্ময়ে আর আতঙ্কে হরফনের হাত থেকে রূপোর পেয়ালাটাও ঠকাস করে খসে পড়ে জমিতে।

    কারণ কোনো শয়তানী শক্তির ইচ্ছে অনুসারে খেলনাগুলো নিঃসন্দেহে চলতে শুরু করেছিল এবার।

    কে করাচ্ছে এ-সব?





    ছোটি-বেগমের গল্প - ৩

    ছোটি-বেগম আঙুল দেখিয়ে কিছু বলছিলেন, কিন্তু তাঁর ঠোঁট নড়ছিল না। হরফন বুঝল সে শুধু চোখের সামনে পুতুলের মতো খেলনাগুলোকে চলতে দেখছে না, বেগমের মন থেকে ফোয়ারার মতো বেরিয়ে আসা অব্যক্ত শব্দগুলোও শুনতে শুরু করেছে।

    ওই দ্যাখো হরফন! বাজীগরের মতো সেই বুড়ো নবাব এসে হাজির!

    দ্যাখো, ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করছেন সবাইকে—মাজরা কী? কীসের এত হল্লা?

    থামের গায়ে যে খেলনার মতো মানুষটা পিছমোড়া বাঁধা অবস্থায় কথা বলতে শুরু করল, সে-ই হল সব্‌রঙ্গ্‌ মির্চী। আমাদের খোশক্‌ বিরয়ান। কী বলছে সে শোনো।

    সে মেয়েদের নাম ধরে ডাকছে আর বলছে—কোথায় গেল ওরা? কী হল ওদের?

    নবাব আরো গুলিয়ে গিয়ে এদিক ওদিক চাইছেন। ওই দ্যাখো নবাবজাদাদের মধ্যে বয়স্ক একজন এসে তাঁকে বুঝিয়ে দিচ্ছে ব্যাপারটা। নবাব তাজ্জব হয়ে মাথা নাড়ছেন। বাবুর্চীরা জড়ো সড়ো হয়ে হাত জোড় করে বলছে—বিচার করুন হুজুর। নবাবের হুকুমে সেই দু-ডজন পুতুল মেয়েকে এনে তাঁর সামনে রাখা হচ্ছে এবার।

    ওই দ্যাখো তাদের জড়ো করে নিয়ে আসছে সবাই। কীরকম ছোট্ট আর অসহায় দেখাচ্ছে। খেলনার মানুষের হাতের আরো ছোট খেলনার মতো, খুব নজর করে না দেখলে দেখতে পাবে না। কারো আঙুল খসে গেছে, কারো একটা পা নেই। মিছরির নশ্বর মেঠাইয়ের মতো তারা যে কী ভীষণ কম সময়ের মধ্যে ফুরিয়ে যেতে পারে সেটা দেখে সবাই অবাক হয়ে যাচ্ছে।

    আঃ। দেখলে এবার? নবাব সব শুনে পুতুলগুলির গায়ে হাত বুলিয়ে তাদের আদর করে দিলেন। তারপর তাদের মধ্যে সবচেয়ে অক্ষত ও সুন্দর একটিকে বেছে নিজের মুঠোয় নিয়ে চলে গেলেন শোবার ঘরে!

    চোখ বন্ধ কোরো না হরফন! এখনও দেখার আছে।

    লক্ষ্য করে থাকবে, এতক্ষণ চাঁদ পর্যন্ত স্তব্ধ হয়ে কাণ্ডকারখানা দেখছিল। এবার তার অট্টহাস্য শুনবে সবাই। বাবুর্চীরাও হাসতে শুরু করেছে সেই বেয়াদবের প্রশ্রয়ে। পুতুলগুলো আবার হাতে হাতে ঘুরতে শুরু করল। আর চেষ্টা করলে দেখতে পাবে, সেই যে থামের গায়ে খোশ্‌ক্‌ বিরয়ানকে বাঁধা হয়েছিল, তার কাছাকাছি একটা কালো রূপোর সুতোর মতো রক্তের ধারা, এই সব পাগলামি ছেড়ে দূরে চলে যাবে বলে চত্বর থেকে নেমে বস্ত্‌-ও-দরের দিকে এঁকেবেঁকে এগোতে শুরু করেছে।

    ব্যাস্‌, এইবার আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাবে জাদুই পিটারা থেকে বেরিয়ে আসা রাতের খেলনাগুলো।

    আর দেখতে পাচ্ছো কি তাদের?

    পাচ্ছো না।



    সত্যিই আর কিছু দেখা যাচ্ছিল না। হরফনের হাত থেকে পড়ে যাওয়া পেয়ালাটা এতক্ষণ পরে বাতাসে নড়ে উঠল। কিন্তু হরফন স্বস্তি পাচ্ছিল এই ভেবে যে ছোটি-বেগম এবার ঘুমোতে যাবেন।

    —নাঃ গেছে সব। চলুন আমরাও শুয়ে পড়ি গিয়ে। রাত তো অনেক হল।

    —চাঁদটা মাঝখানে চলে এসেছে চত্বরের। দেখতে পাচ্ছো না সেটা?

    —দেখেছি।

    —যা বলেছিলাম মনে নেই? একটা কাজ বাকি আছে আমার।



    ছোটি-বেগম উঠলেন যখন, তখন হরফন দেখল তাঁর হাতে একটা মাটির পাতিলা। যেরকমটাতে দহি, বা চূন রাখা হয়। হাওয়া মহলের দিকে চলতে শুরু করেছিলেন বেগম। হরফন পিছন পিছন গেল।

    হাওয়া মহলে ঢোকার মুখে চত্বরের পাঁচিলের পাশে একটা পাথরের মেঝেতে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে ছিল একটা মূর্তি। সাহিবাবাদের বাদশা, এখন আমিনাবাদের নতুন খোশ্‌ক্‌ বিরয়ান। ছোটি-বেগম দ্রুত পায়ে হেঁটে গিয়ে তার চাদরটা সরাতে শুরু করলেন। হরফন দেখল ঘুমের চেয়ে গভীর কোনো অন্ধকার জগতে পৌঁছে যাওয়া খোশ্‌ক্‌ বিরয়ানের সারা গায়ে প্যাঁচানো দড়ির মতো কালো দাগ। যেন এইমাত্র তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা হয়েছিল। সেই চামড়া ও মাংস কেটে বসে যাওয়া দড়ির ক্ষতের মধ্যে থেকে কালো রূপোর সুতোর মতো রক্তের আধ ডজন সাপ বেরিয়ে কিলবিল করে মাটিতে এগোতে শুরু করেছে। ছোটি-বেগম হাঁটু গেড়ে বসে তাঁর পাতিলা থেকে সাদা একটা মলম বের করে খোশ্‌ক্‌ বিরয়ানের গায়ে লাগাতে শুরু করলেন।

    —তুমিও লাগাও। রক্তটা বন্ধ করতে হবে।

    হরফনের মাথা ঘুরে যাচ্ছিল।

    —এটা কি সত্যিকারের রক্ত?

    —নয়তো কী? আমি ওর রুটিতে রূপোর তবক আর গিরগিটের আঠালো রস মিশিয়ে দিই। রক্তটা অভ্রের মতো চমকীলা, গাঢ় আর ভারী হয়ে যায় তাতে। খুব শীগ্গীর বেরোতে পারে না শরীর থেকে, আর দূর থেকে দেখা যায়—তাই রাতের অন্ধকারেও মানুষটাকে খুঁজে বের করতে অসুবিধে না হয় আমার।

    —জ্যাল তু জ্যালাল তু ...। এসব কি সত্যি ঘটছে? কবে থেকে এরকম মলম লাগাচ্ছেন আপনি?

    ছোটি-বেগম থমকে ঘুরে তাকালেন হরফনের দিকে।—প্রথমবার লাগাই পঁচিশ বছর আগে। তখন আমার বয়স ছিল পনেরো। তারপর থেকে প্রতি পূরণ-মাসীতে এটা আমার কাজ।

    —শুধু আপনিই করেন? এই নবাববাড়িতে খোশ্‌ক্‌ বিরয়ান আর তার মেয়েদের বাঁচাতে আর কেউ আসেনি সেদিন?

    ছোটি-বেগমের হাত একবার থেমে গিয়ে আবার চলতে শুরু করেছিল।—বলছি তোমাকে। হাত লাগাও একটু, মর্হমটা আগে লাগিয়ে দেওয়া যাক। রক্তটা বন্ধ হয়ে যাবে।



    মলম লাগানো হলে ঘুমন্ত মানুষটাকে আবার চাদর মুড়ে রেখে আসে তারা দুজন।—কাল সকালে দাগও থাকবে না এই চোটের। মর্হম আর দাগ দুটোই গায়ব হয়ে যাবে।

    হরফন তালপাতার মতো কাঁপছিল। মনে মনে বলছিল জ্যাল তু জ্যালাল তু, আই বলা কো টাল তু। ছোটি-বেগমের নরম কিন্তু ভারী শরীরের সামনে তার নিজেকে মনে হচ্ছিল ছোট ছেলের মতো প্যাংলা আর ডরপোক। একটু একটু করে যেন বেগমের শরীরটা বড় হতেও শুরু করেছিল। এখন সেই মানুষটাকে মনে হচ্ছে বেশ বিপজ্জনক। পোষাকের মধ্যে একটা খঞ্জর কি তমঞ্চা লুকোনো নেই কে বলতে পারে? প্রয়োজন হলে হরফনকে এই খৌফনাক খাতুন অনায়াসে পটকে দিতে পারবে না?

    —ভয় পাচ্ছো হরফন? তাহলে আমার কাছাকাছি থাকো আজকের রাতটা। চাঁদটা কোথায় দেখছ?

    —শীশমহলের উপর চলে এসেছে দেখতে পাচ্ছি।

    —কান খোলা রেখো। এবার একটা বন্দুকের আওয়াজ পাবে। এসো আমরা আমাদের জায়গায় গিয়ে বসি।

    ঝাড়ফুঁকে বশ করা বাধ্য জিনের মতো হরফন বেগমের পিছু পিছু চলে যায়। চত্বরের একধারে বেগমের পিঁড়ি আর তার চাটাই পাতাই ছিল। বসার পর বেগম বললেন—নবাব-বাড়ির একজন এসেছিল খোশ্‌ক্‌ বিরয়ান আর তার মেয়েদের ছাড়িয়ে নিতে। কে সে জানতে চাও?

    —আমি জানি। সেটা হলেন আপনি।

    —এক্ষুনি দেখতে পাবে কে। সময় তো হয়ে এল। ভোর হতে বেশি দেরী নেই। হাওয়াটা এখন আর গরম নেই। কেন জানি না এই সময়টা আমার ভয় কেটে যায়। অথচ পঁচিশ বছর আগে, কী ভয়ই না পেয়েছিলাম সেই গুলির শব্দ শুনে। চত্বরটার দিকে নজর রাখো। ওরা সবাই আবার ফিরবে।





    ছোটি-বেগমের গল্প - ৪

    গুড়ুম্‌!

    দেখতে পাচ্ছো হরফন? আবার ফিরেছে ওরা। বাবুর্চীগুলো দিশেহারা হয়ে লুকিয়ে পড়ছে থামের আড়ালে। নবাবজাদারা চমকে উঠে সরে যাচ্ছে হাওয়ামহলের দিকে। বেগম আর বাচ্চারা হঠাৎ একসঙ্গে রাতের উল্লুর মতো চিত্কার করে উঠল ভয়ে। নতুন একটি নবাবজাদা হাতে বন্দুক নিয়ে উঠে এসেছে চত্বরের উপর। চাঁদের দিকে তাক করে সে আবার গুলি ছুঁড়তে চলেছে। শোনো।

    গুড়ুম্‌!

    কে এই নতুন চিড়িয়াটি? আমিও জেনানাদের মধ্যে থেকে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করছিলাম। সবার আগে আমিই চিনেছিলাম তাকে। চিড়িমার সাহবজাদা! কোনো সন্দেহই নেই। ঘোড়সওয়ারীর কালো পোষাকটি দেখেই চিনেছি। দ্যাখো বাবুর্চীদের সে ইশারায় বলছে খোশ্‌ক্‌ বিরয়ানের বাঁধন খুলে দিতে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাদের একজন দড়িটা খুলে দিল। এবং খোশ্‌ক্‌ বিরয়ানও কাটা গাছের মতো ধপাস করে পড়ল পাথরের মেঝেয়। তার কোনো জ্ঞানই নেই এখন। বিরয়ানকে পড়ে যেতে দেখে চিড়িমার সাহবজাদা আর বুঝতে পারছে না কী করবে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। বাবুর্চীরা এক এক করে থামের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে দ্যাখো বলছে কিছু। তারা হয়তো বলছে—লোকটা তো মরেই গেছে। আর কিছু করার নেই সাহবজী। মাফ করবেন হুজুর, কিন্তু আদমীটা ভালো ছিল না।

    দ্যাখো হাওয়ামহল থেকে এক এক করে জিভ চাটতে চাটতে বেরোচ্ছে শাহজাদারা—কারো হাতে একটা পুতুলের সোনালী চুল, কারো হাতে শুধু জামা। পুতুলগুলো এইটুকু সময়ের মধ্যেই খাওয়া হয়ে গেছে সবার। যে কটা এ-হাত ও-হাত ঘুরে একটু বেঁচে ছিল, চিড়িমারের বন্দুকের আওয়াজ শুনে তড়িঘড়ি সেগুলোকেও মুখে পুরে নিয়েছে তার নিজেরই ভাইরা। কারো কারো মুখ চলছে এখনও।

    চিড়িমার তাদের দিকেই বন্দুকটা তাক করেছে এবার। আবার একটা বিরাট শোরগোল শুরু হয়েছে দ্যাখো। ভাই ভাইয়ের গায়ে গুলি চালিয়ে দেবে নাকি? বৃদ্ধ নবাব নিজের শয্যা ছেড়ে উঠে এসেছেন আবার। তাঁকে এই রাতভোরের শীতল চাঁদের আলোয় এবার আর বাজীগর বলে মনে হচ্ছে না। বরং একজন স্নেহশীল পিতার মতোই এসে তিনি জড়িয়ে ধরলেন নিজের স্পর্ধিত ও বিপথগামী সন্তানকে। দ্যাখো কেমন সহজে চিড়িমারের হাত থেকে বন্দুকটি খসিয়ে নিলেন তিনি। কানে কানে তাকে বললেন—তোর জন্য একটাও রাখেনি এই নেমকহারামরা? আমি সবাইকে ভাগ করে খেতে বলেছিলাম।

    বন্দুকটা চলে যাবার পর অন্যান্য নবাবজাদারা হঠাৎ গায়ে বল পেয়ে গেছে সবাই। দ্যাখো সবাই মিলে চিড়িমারকে ধরল কীরকম খপ করে। বৃদ্ধ নবাবও আর কিছু করতে পারছেন না। ঝাপড়ের পর ঝাপড় লাগাতে লাগাতে চিড়িমারকে নিয়ে গেল শীশমহলের নীচের তহখানায়। কী হবে সেখানে তার? বলছি। কিন্তু দেখে যাও। আর বেশি দেরি নেই ভোর হবার।

    সবাই এক এক করে চলে যাচ্ছে নিজেদের ঘরে। বেগম আর বাচ্চারা জেগে থাকতে পারছিল না, তারাও দ্যাখো কিবাড় বন্ধ করে ঢুকে পড়ছে নিজেদের কামরায়। নবাবজাদা আর বাবুর্চীরা দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে শেষ রাতের ঘুমের আশায় সরে পড়ছে নিজের নিজের আরামখানায়। শুধু বিরস ফ্যাকাসে চাঁদের নীচে খোশ্‌ক্‌ বিরয়ানের নিস্পন্দ শরীরটা পড়ে রইল। এবার কে আসবে তুমি পারবে বলতে?

    সেই মেয়েটা!

    এবাড়ির কেউ হয় না যে—মাঝে মাঝে সময় কাটাতে চলে আসে। সেই মেয়েটা থেকে গিয়েছিল রাত্রিবেলা। দ্যাখো সে আসছে এবার! লুকিয়ে। একটা ছোট্ট পাতিলা আছে তার হাতে দ্যাখো। একটা চাদর আছে কাঁধে। সব্‌রঙ্গ্‌ মির্চীর আহত শরীরের পাশে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসল সে দেখতে পাচ্ছো? আহ্‌ কীরকম রোগা ছিল তখন। রক্ত তখনও ছিল না গায়ে। মাংসও ছিল না। কিন্তু মলমটা সে খুব তাড়াতাড়ি লাগিয়ে দিচ্ছে মির্চীর সারা শরীরে। চাদর দিয়ে মুড়ে দিচ্ছে তাকে, যাতে উষ্ণতা হারিয়ে না যায়।

    এবার সে পালাবে। সকাল তো হয়ে এল। না শীশমহলে আর নয়, নিজের আব্বুর বাড়ির দিকেই রওনা হবে সে। কেন বুঝলে না? বাড়িতে খবরটা দিতে হবে তো? তার হাকীম বাপ ছাড়া সব্‌রঙ্গ্‌ মির্চীকে বাঁচাবে কে?

    যেতে যেতেও উলটো পায়ে একবার শীশমহলের দিকে যে ফিরে যেতে হচ্ছে তাকে সেটা লক্ষ্য করলে? বলতে পারবে কেন? ঠিক ধরেছো। তহ্‌খানাতেই নেমে গেল সে। সেখানে চিড়িমারকে যে কুঠরিটাতে বন্ধ করে রেখেছিল, সেটা খুলে দিয়ে গেল। এই প্রথম তার মনে হয়েছিল যে চিড়িমার এই নবাববাড়ির কেউ নয়। যেন তাদেরই মতো বস্ত্‌-ও-দর দিয়ে আসা কোনো অজনবী মুসাফির।

    ব্যস্‌, আর কিছু দেখার নেই এখানে।

    আজকের মতো খেল খতম হরফন মিঁয়া।





    অলংকরণ (Artwork) : অনন্যা দাশ
  • প্রথম ভাগ | দ্বিতীয় ভাগ | দ্বিতীয় ভাগ - ২ | তৃতীয় ভাগ (শেষ)
  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)