




“প্রবেশ থেকে আরম্ভ করে চা তৈরীর প্রত্যেক অঙ্গ যেন ছন্দের মতো। ধোয়ামোছা, আগুন জ্বালা, চা-দানির ঢাকা খোলা, গরম জলের পাত্র নামানো, পেয়ালায় চা ঢালা, অতিথি সম্মুখে এগিয়ে দেওয়া, সমস্ত এমন সংযম এবং সৌন্দর্যে মন্ডিত যে না দেখলে বোঝা যায় না। এই জাপানের প্রত্যেকটি আসবাব দুর্লভ ও সুন্দর। অতিথিদের কর্তব্য হচ্ছে এই পাত্রগুলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে একান্ত মনোযোগ দিয়ে দেখা। প্রত্যেক পাত্রের স্বতন্ত্র নাম ও ইতিহাস রয়েছে।” কবিরই ‘জাপান যাত্রীর ডায়রি’-র এই অংশটুকুর ভেতর লুকিয়ে আছে ‘চা’ সংস্কৃতির ধ্যানমগ্ন রূপটি।
চা এক অদ্ভুত সংস্কৃতি। এর দীর্ঘ ইতিহাস মানব সভ্যতাকে এনে দিয়েছে অনন্যতার স্বাদ। এ এমন এক পানীয়, ফুটপাত থেকে রাজবাড়ির টেবিল পর্যন্ত যার অনায়াস যাতায়াত।
চিন দেশের মানুষই প্রথম চায়ের খোঁজ পান। চিনে চা চাষের জন্য যে মানুষটির নাম প্রথম পাওয়া যায় তিনি হলেন উ লিসেন। তাকে বলা হত ‘মিঠে শিশিরের স্থপতি’। প্রজন্মের পর প্রজন্ম গেছে। অনেক বদল এসেছে চা চাষে। কথিত আছে, চায়ের একটি সাদা বীজ এনে দিয়েছিল এক সাদা পরী।
‘মৃত্যুহীন এ বাজু, শুভ্র চা / তুমিও শুভ্র হবে, পানের পর।’ অর্থাৎ এই শুভ্র-চা পান করলে তুমিও শুভ্র হবে। মূল্যবান এই পাতাটির মূল্য বোঝানোর জন্য এমন গল্প প্রচলিত আছে যে, নীলচে একটা সাদা বাঘকে স্বর্গে পাঠানো হয়, যেন সাহস করে কেউ চা পাতা নিতে না পারে।
চা অনেক রকমের হয়ে থাকে। যেমন সূর্যমুখী চা, কমলালেবু চা, বাঁশ চা ইত্যাদি। লিউ ইউ প্রথম চা তৈরীর কৌশলের বিবরণ দেন। তিনি বলতেন, গরম জলে চা পাতা ফেলে দেওয়াটুকুই কাজ। তারপর নাকি তার সঙ্গে রসুন, লবণ, চিনে খেজুর মিশিয়ে পানীয়টিকে স্বাস্থ্যকর করে তোলা হত। পরে অবশ্য চা পান আধ্যাত্মিক আনন্দের উপকরণ হয়ে ওঠে। চা পানের আনন্দকে প্রেমের আনন্দের সঙ্গে তুলনা করা যায়।
কনফুসিয়াস বিশ্বাস করতেন ‘জল’ মহৎ গুণের অধিকারী। জলের ভেতর পর্যবেক্ষণ আছে, দয়া আছে, উচ্চাকাঙ্ক্ষা আছে, নিয়ম আছে, সাহস আছে, মহত্বও আছে। সেই জলে চায়ের পাতা ভেজানো হলে পানীয়টিও হয়তো মহত্বের প্রতীক হয়ে উঠবে।
এই পানীয়টির পানের বিষয়ে চিনা কবি লো তুঙ্-এর একটি উক্তি বিশেষভাবে উল্লেখ্য — “প্রথম পাত্র ভেজায় আমার ঠোঁট আর গলা। দ্বিতীয় দূর করে আমার একাকীত্ব। তিন নম্বর পেয়ালা সটান ঢুকে যায় আমার ঊষর অন্তরে। খুঁজে বার করে রাশি রাশি যত লেখাপত্রের প্রাণোন্মাদনা। চতুর্থ পাত্র শরীরে একটু ঘাম দেয়। জীবনের ভুল বেরিয়ে যায় রোমকূপ দিয়ে। পঞ্চম পেয়ালায় পবিত্র হয়ে যাই আমি। ছ নম্বরে পৌঁছে যাই অমর লোকে। আমি শুধু আবেশে ডুবে যাই।”
পায়ে পায়ে কেটে গেছে অনেক যুগ। একসময় বোধিধর্মের মূর্তির সামনে সমবেত হয়ে বসে চা পান করতেন মানুষ। ধর্মানুষ্ঠান-তুল্য চা-সংস্কৃতি জাপানিদের কাছে এক জাতীয় সাধনা। আজ সেই চা অলস বিলাসিতা কাটিয়ে হয়ে উঠেছে সর্বসাধারণের আত্মোপলব্ধির অন্যতম পথ।
পৃথিবীতে সম্ভবত জলের পরবর্তী জনপ্রিয় পানীয় হল চা। এর বৈজ্ঞানিক নাম ক্যামেলিয়া সিনেনসিস। চায়ের ইতিহাস প্রায় সাড়ে চার হাজার বছরের পুরনো। তাই হয়তো একে নিয়ে বহু গল্প প্রচলিত আছে। বাগানে চা পাতা তোলা থেকে কাপে পৌঁছানো পর্যন্ত পেশাদার টি-টেস্টারদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
চা কী? চা হল একটি অনুভূতি। আনন্দে চা, কষ্টে চা, টেনশনে চা, ব্রেক-আপে চা, চায়ের পর আবার চা। ট্রেনে, বাসে, ট্রামে, স্টেশন, রাস্তার মোড়ে, সদন চত্বরে ‘গরম চা-য়ে-এ’ ডাকটা আমাদের সকলেরই খুব প্রিয়। আবার কবীর সুমনের ‘এক কাপ চায়ে আমি তোমাকে চাই’ অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি গান। গানটির মধ্যে এমন শক্তি আছে যে, এক কাপ চায়ের সঙ্গে আমাদের সকলকে লুট করতে পারে। আসলে চা হল আমাদের কাছে একটা জীবনীশক্তির আধার। সমকালীন বহু সিনেমার শুরু হয়, চায়ের পাত্র থেকে ছাঁকনিতে ছেঁকে কাপে চা ঢালার মধ্যে দিয়ে। আসলে চা একটা শুরুর নাম। দিনের শুরু, সময়ের শুরু। চা একটা সময়ের কথা বলে, একটা মানুষের কথা বলে। চা মানুষের খিদে-তেষ্টার সীমানা পার করে, সম্ভাবনাময় জীবনের বাইরে একটা নেশার জগতের আভাস দেয়।
বহু বছর আগে চায়ের জন্মভূমি চিনে মাটি খুঁড়ে পাওয়া যায় স্টোভ, চায়ের বাসনপত্র। একইসঙ্গে পাওয়া যায় এক ব্যক্তির মূর্তি। ব্যক্তি মানুষটি ছিলেন এক জ্ঞানী তার্কিক এবং একই সঙ্গে একজন কবি। কবির শিল্পবোধ ছিল প্রশংসনীয়। তর্কপ্রিয় মানুষটির তর্কই ছিল প্রাণ। একবার পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে চা পান করে নেশায় মাতাল হয়ে ওঠেন কবি। কবির মতে চায়ের সুবাস সমস্ত পাহাড় জুড়ে ঘুমিয়ে থাকে। পারিবারিক কলহে জর্জরিত সেই জ্ঞানীতার্কিক কবি লিউ ইউ-এর জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। এক মুহূর্তের সিদ্ধান্তে প্রাণাধিক প্রিয় সঙ্গিনী ত্যাগ করেছিলেন তাঁর সঙ্গ। একাকিত্বের গ্লানি কাটানোর জন্য নেশার দ্বারস্থ হন কবি। চা পাতার সোনালী নির্যাস বিষয়ে মাতাল কবি একটি গ্রন্থও রচনা করেছিলেন। ‘চায়ের ধ্রুপদী কাহিনী’ নামাঙ্কিত গ্রন্থটির নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে চা-চর্চার ইতিহাসে। তার্কিক কবি লিউ ইউ-এর মূর্তি আজও প্রদর্শিত রয়েছে চিনের চা মিউজিয়ামে। সেই প্রস্তর মূর্তির হাতে ধরা রয়েছে ‘চায়ের ধ্রুপদী কাহিনী’ গ্রন্থটি।
শীতপ্রধান অঞ্চলে উপভোগ্য দৈনন্দিন জীবনের উষ্ণতা লুকিয়ে থাকে কুঁড়িসহ পাতায়। চা গাছের দুটো পাতা একটি কুঁড়ি দেখলে মনে হয় যেন ছোট্ট পাখি ঘাড় উঁচু করে ডানা মেলে উড়তে চাইছে আকাশে, দেখতে চাইছে আকাশের বুকে ভাসমান মেঘ। বৈঠকখানার তক্তপোষে স্বাদু খাবারের সঙ্গে জমে ওঠা আড্ডার সৌন্দর্য বৃদ্ধির একমাত্র উপকরণ হল ধোঁয়া ওঠা চা। শোনা যায় এক সময় তর্কবাগীশ কিছু মানুষ বা জ্ঞানী পণ্ডিতমণ্ডলী আলাপ-আলোচনা, তর্ক চালাতেন সময়ের বাধা না মেনে, দীর্ঘক্ষণ। আর তর্কের ক্লান্তি দূর করার জন্য পান করতেন চা। তর্কের আয়ু দীর্ঘ করাই ছিল তাদের একমাত্র লক্ষ্য।
ওকাকুরা কাজুকো ১৯০২ সালে প্রথম ভারতে যান। তিনি ভারতবর্ষে এসেছিলেন বিবেকানন্দের টানে। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, বিবেকানন্দকে সঙ্গে নিয়ে জাপানে ফিরবেন। কিন্তু ১৯০২ সালের ৪ জুলাই বিবেকানন্দ দেহ রাখলেন। ফলত, জাপানে যাওয়া তাঁর আর হল না। ওকাকুরা বিশ্বাস করতেন চা-শিল্প চিত্রকলার মতোই অত্যাধুনিক একটি শিল্প। এর নির্দিষ্ট কোনো ছক নেই। প্রতিবার চায়ের মেজাজ আলাদা, ছন্দও আলাদা। জলের সাথে চা পাতার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। চা শ্রান্তিহারী, আত্মবিনোদক, ইচ্ছাবর্ধক, মানববন্ধু। বাতের ব্যথা উপশমের জন্য চা বহুল প্রচলিত একটি লৌকিক ভেষজ। আবার অমরত্বের খোঁজে চা ছিল অত্যাবশ্যক উপাদান। বৌদ্ধরা চা ব্যবহার করতেন ধ্যানের সহায়ক হিসেবে।
শোনা যায় পাহাড়ি ঝর্ণার জল কিংবা নদীর জল কিংবা সাধারণ ঝোরার জল চা তৈরির ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়ে থাকত। সেই জল ফোটানোর কতগুলো স্তরভেদ ছিল। প্রথমে জল ফুটবে আর জলের নিচে ছোট ছোট বুদবুদ জলের তলায় সাঁতার কাটবে। দ্বিতীয় দফায় জল আরো বেশি ফুটবে এবং তৃতীয় দফায় জলের ফোটার মাত্রা এতই বাড়বে যে ঘূর্ণির মতো উদ্দাম নৃত্য করবে। নৃত্য করতে করতে কেটলিতে লুটোপুটি খাবে। এরপর জলে সামান্য লবণ ফেলে চায়ের চাঙড়কে সেঁকে নিয়ে গুঁড়ো করে ছড়িয়ে দিতে হবে গরম জলে। একেবারে শেষ দফায় পড়বে এক হাতা ঠান্ডা জল। হয়তো অস্থিরতাকে দূর করার এক পদ্ধতি। যা স্থিরতার জন্ম দেয়। ফিরিয়ে দেয় জলের যৌবন। তাই হয়তো বৌদ্ধরা ঘুম থেকে বিরত থাকতে বা দীর্ঘ ধ্যানের ক্ষেত্রে এই চা-কে ব্যবহার করতেন। অথবা অমরত্বের খোঁজেও চা ব্যবহার হত।
পরশুরাম চায়ের গুণের কথা বলেছিলেন ‘স্বয়ম্বরা’ গল্পে। শোনা যায়, মনের জানালা খুলে দেয় এই পানীয়টি। এক চুমকে বেরিয়ে পড়ে সমস্ত বেফাঁস কথাবার্তা । তবে চায়ের বাণিজ্যিক চেহারা দিয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। উদ্ভিদবিজ্ঞানী রবার্ট ফর্চুনকে ভার দেওয়া হয়েছিল চীন থেকে ভারতে চা গাছ নিয়ে আসার জন্য। যা পরবর্তীকালে এক বিরাট শিল্পের আকার নিয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ঠান্ডা লাগলে নুন আদা দিয়ে চা খেতেন। আবার কবি জীবনানন্দ দাশ চা-কে অসংযম হিসেবে দেখতেন। একদম বিপরীত দিকে মনীন্দ্র গুপ্ত চায়ের নেশা ধরানোর ছবিকে বাঁচিয়ে রাখতে হাটে খানিকটা জায়গা নিয়ে বড় বড় বিশাল বিশাল হাঁড়িতে চায়ের পাতা, দুধ আর আখের গুড় পাচনের মতো জাল দেওয়ার কথা বলেছেন। হাতে আসা মানুষজনকে সেই চা ঘটি ঘটি গেলাস গেলাস খাওয়ানো হত। সারাদিন যা সেদ্ধ হচ্ছে। সারাদিন মানুষ পেট ভরে চা খাচ্ছে- সাহিত্যে এই ভাবনা চা-শিল্পকে পর্বতের শিখরে পৌঁছে দেয়। আবার বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর গল্পে দেখিয়েছেন চায়ের নেশার কথা। গল্পে যারা চা খাচ্ছেন তারা কখনো চা খাননি। সৌখিন জিনিস হিসেবে এক পেয়ালা চা কিনে দেখেছেন, খেয়েছেন। লেখার মজা এখানেই — তিনি বলছেন, “মা চা খাচ্ছেন এবং ছেলেকেও চা খাওয়াচ্ছেন। শুধুমাত্র খাওয়াচ্ছেন না, চা খাওয়ার ব্যাপারে প্ররোচিত করছেন। ও যে খেলে জ্বর হয় না আর চায়ের জায়গা পর্বত শিখর থেকে হয়তো এবার আকাশে।”
চা অনেকের কাছেই আভিজাত্য রুচি ও প্রশান্তির প্রতীক। চায়ে চুমুক দেওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে জীবনের সরলতা, বন্ধুত্বের মাধুর্য আর মন খারাপ দূর করার জাদু।
পুরুষতান্ত্রিক সমাজে প্রথমদিকে মহিলাদের চা খাওয়ার কোনো অনুমতি ছিল না। পরবর্তীকালে কোনোভাবে অনুমোদন পেয়েছে। ‘গরিবের এক ভাঁড় চা’- বহুল প্রচলিত একটা কথা। একবার চা খেলে বেশ কিছুক্ষণ অন্য কিছু খাবার আর প্রয়োজন পড়ে না। যে ভাবনা দারিদ্র্যকে এক প্রকার সাহায্যই করে থাকে। খিদেকে দমিয়ে রাখে। তাই হয়তো আজও কাগজ কুড়ুনী মেয়েরা কিংবা ভিখারিনীর দল কাকভোরে কাজে বেরোনোর আগে বাচ্চাদের আফিং মেশানো চা খাইয়ে যান, যাতে বাচ্চাটি খিদের কষ্ট বুঝতে না পারে বা খিদের কষ্টে কান্নাকাটি না করে।
চা বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় একটি পানীয়। শুধুমাত্র শরীরের ক্লান্তি মেটায় না, মনকেও সতেজ রাখতে সাহায্য করে। চায়ে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট-এর পরিমাণ বেশি থাকায় আমাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় থাকে।
বৃষ্টির দিনে ঘরে বসে সময় কাটানোর একমাত্র সঙ্গ হল এক কাপ চা আর একটা ভালো বই — চা হল শান্তি, আত্মোপলব্ধি এবং প্রকৃতির সাথে মিলনের প্রতীক। জাপানি চা পান একটি ধ্যান বা প্রার্থনার সমতুল্য— সম্প্রীতি, শ্রদ্ধা পবিত্রতা এবং প্রশান্তি। চায়ের দর্শন প্রতিটি মুহূর্তকে অমর হিসেবে গণ্য করতে শেখায়। ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার সময় অতীত বা ভবিষ্যতের চিন্তা না করে বর্তমানকে উপভোগ করা হয়। সুকিয়া মানে হলো কল্পনা। অর্থাৎ যা শূন্যতার আশ্রয়। তাই হয়তো সেখানে পূর্ণতার অবকাশও রয়েছে।
চা বাঙালি জাতির এক ঐতিহ্য। বেঁচে থাক সেই ঐতিহ্য, বেঁচে থাক চা-এর ইতিবৃত্তান্ত। বেঁচে থাক শিল্প-সংস্কৃতিকে বুকে জড়িয়ে চা-চর্চা। বেঁচে থাক কলকাতার অলিতে-গলিতে মাটির ভাঁড়ে গরম ধোঁয়া।
তথ্যসূত্রঃ
১) চা-এর দেশ চীন; ওয়াং জুফেং (সম্পর্ক)
২) চা চরিত; কাকুজো ওকাকুরা (মনফকিরা)