• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৩ | জুলাই ২০২৬ | গ্রন্থ-সমালোচনা
    Share
  • জানলায় আঁকা গ্রাম এবং হে বন্ধু, হে প্রিয় : গার্গী সেনগুপ্ত

    জানলায় আঁকা গ্রাম; — তিলোত্তমা বসু; প্রকাশক— ভাষালিপি, কলকাতা ৭০০০০৯; প্রচ্ছদ- সঞ্জীব চৌধুরী; প্রথম প্রকাশ— ২০২২

    ৪০ পাতার একটি চটি বই। গদ্যের। কবির লেখা গদ্য।

    যেমনটা হয়। কেমনটা? ধরুন বেড়াতে গেলেন একটা সবুজ প্রান্তরে, দূরে ছোট ছোট সবুজ টিলা, পথে যেতে যেতে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল এক ঝিরিঝিরি নদীর সঙ্গে। নাম না জানা। পাড়ে সবুজ ঘাস। বিকেলের আলো এসে পড়েছে। হয়তো আরেকটু হেঁটে গেলে দেখা হয়ে যাবে তরুণ জারুলগাছের সঙ্গে। ধুন্দুললতার সাথে সে তখন প্রেমে মগ্ন! অথচ আপনার সময় শেষ। ফিরতে হবে। আপনার, কিন্তু ইচ্ছে করছে না। ইচ্ছে হচ্ছে একটু শান্ত হয়ে বসতে। অনেকটা সেরকম একটি লেখা। ঠিক এমনটাই আমার হল-এই বইটি পড়ে। পাতার পর পাতা নাগাড়ে পড়ে যেতে ইচ্ছে করল না। একটু পড়েই মনে হল - বসি না একটু শান্ত হয়ে! যে মনখারাপটা মনের মধ্যে তিরতির করছে, দিই না তাকে একটু আদর! আসলে বইটিই এরকম।

    কবি তিলোত্তমা বসুর গদ্যের বই— “জানলায় আঁকা গ্রাম”। ‘ভাষালিপি’ থেকে প্রকাশিত হয়েছিল ২০২২ সালে। বইটা পড়তে পড়তে বার বার নিজের অনুভূতির কাছেই চলে যাচ্ছিলাম। যেন নিজেরই কথা পড়ছি! ছোটোবেলার কথা! মন কেমনের কথা! কত গোপন কথা! মন বলল — এত আমারই কথা! ও কেমন করে জানল! বুদ্ধি বলল - ভেবে দেখো এতো ঠিক তোমার কথা নয়! মন তা মানলে তো! এই যে বন্ধুর সাথে হঠাৎ দেখা, কফি কাপে উপচে পড়া ফেনার মধ্যে দুটো-তিনটে-চারটে — অনেক কবিতার সাথে চকিৎ প্রণয়— এইই রসায়ন— তিলোত্তমা বলছেন। সত্যিই তো রসায়ন ছাড়া কিছু হয় নাকি? ‘গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়া ট্রেনের মতোই কি করে ছেড়ে ছেড়ে এগিয়ে চলতে হয়’— এইভাবেই এগিয়ে চলেছে তিলোত্তমার লেখাগুলোও, কৈশোর, শৈশব, মাঝবেলা, বারে বারে এগিয়েও যেন ঘুরে ঘুরে ফিরে আসে ছেলেবেলায়। আসলে ছেলেবেলার তো একটা রং থাকে, থাকে একটা গন্ধ। ট্রেন যত দূরেই যাক মনে মনে তাকে ফিরতেই হয় সেই ছেলেবেলার গ্রামের স্টেশনে।

    লেখাগুলির সবগুলোর ধরণ একইরকম। মনের জানলা দিয়ে দেখা জীবনগ্রাম। একটা থেকে আরেকটা বিচ্ছিন্ন হলেও যেন একটা সুতোয় বাঁধা মালার মতোই গাঁথা রয়েছে। যেন লেখক মনের জানলায় বসে দেখছেন কীভাবে ট্রেন একটার পর একটা স্টেশন ছেড়ে ছেড়ে চলেছে। কোনো স্টেশনের নাম কবিতা, কোনো স্টেশনের নাম বাবুজি, কোনো স্টেশনের নাম মীরা ভাই, আবার কোনো স্টেশনের নাম ছেলেবেলা। সেই জানলায় জ্যোৎস্না এসে পড়ছে, সেই জ্যোৎস্নায় কখনো দেখা হয়ে যাচ্ছে মায়ের সাথে — “মায়ের খুব সাহস। ভূতে ভয় নেই। আরশোলাতে ভয় নেই। বিয়ের পর কত সাহসের ঘটনা। লোকজনকে স্পষ্ট কথায় জবাব দিয়ে দেওয়া। বাজির (আমার বাবার) তো অল্প বয়সে মাতৃবিয়োগ। মাকে সারাটা জীবন অনেক লড়াই করতে হয়েছে”।

    কখনো-বা মাকে নিয়ে কল্পনা করে লিখছেন “এখন এই ফেসবুক হয়েছে। মা বাইরে আগের মতো বেরোতে পারে না। ঘরে বসে ফেসবুকে আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ। দেখাশোনা। লাইক। কমেন্ট।”... ফেসবুকীয় জীবন। এই জানলাতে বসে কখনো তার দেখা হয়ে যায় উৎপল কুমার বসুর সঙ্গে, কখনো প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত, বিনয় মজুমদার কিংবা শঙ্খ ঘোষ, জাক দেরিদা। আর রবীন্দ্রনাথ! তার সাথে দেখা হল বলেই তো বিষাদের অশ্রুবিন্দুর মধ্যেও আলো জ্বলে উঠল, গভীর দুঃখের তলদেশে বইতে থাকল অন্তর্লীন আনন্দধারা!

    গম্ভীর মেঘে ঢাকা আকাশকে লেখকের মগনলাল মেঘরাজ বলে ডাকতে ইচ্ছে হয়। আসলে তো জানলায় বসে দেখা হয়ে গেল স্মৃতিদের সঙ্গে। স্মৃতিরা আসলে লক্ষ্মীর ঝাঁপিতে রাখা এক মুঠো চাল। বড়ো সহজ, বড়ো মায়াময় উচ্চারণ তিলোত্তমার। সরল অথচ গভীর। সুন্দর, তবে তা বাগানের হাস্নুহেনার মতো, গন্ধে আবিষ্ট করে, রূপের মোহজাল বিস্তার করে না। সকল সস্তা আর আপাত তুচ্ছ বিষয়ে তিলোত্তমার আকর্ষণ। যেমন “হেয়ার ব্যান্ড। টিপ। ইমিটেশন দুল। কৎবেলমাখা। হাতচিঠি”।

    এ লেখা নিতান্তই এক কবির লেখা। তিলোত্তমা গদ্যকার নন। কবি। তাই সত্যের প্রতি তার এত আকর্ষণ, এত ভালোবাসা। নকল নয় আসলই তার চাই, হোক তা কড়া— “বন্ধু কেউ হয় কখনো তোমার ‘সত্যি’ ছাড়া। বকুনি আর অভিমান ছাড়া। সম্পর্কে নকল তালমিছরি থাকলে সেই সম্পর্কে অসুখ বাড়ে। টের পাই। আর খুব শীত করে। মাঘ মাস নখ দিয়ে চিরে দেয়। সরে আসি। সরে যাই। খোলস পড়ে থাকে।” সমস্ত লেখাটার মধ্যে একটা মনখারাপ মনখারাপ গন্ধ। সে গন্ধ অনেকটা বৃষ্টি ভেজা কামিনী ফুলের মতো।

    এমন একটি সহজপাঠ্য অনুভবী গদ্যের বই বড়ো একটা হাতে আসে না। তিলোত্তমা লিখছেন “শাওয়ার থেকে নীল রঙের জল ছড়িয়ে যাচ্ছিল। হামাম একটা সাবানের নাম। চারদিকে ঘন কুয়াশা আর খুব শীত। শীতেরও রং নীল। জানলার ঝাপসা দিয়ে সামনের বাগানে ফুটে থাকা ছুটির সকাল দেখছিলাম তোমার সঙ্গে। চায়ে চুমুক দিতে দিতে ধমক দেয় হাত ঘড়ি। গোলাপি রঙের তোয়ালে। কেওকার্পিনের মিষ্টি গন্ধ। ওডিকোলন আর হি হি হি হি কেঁপে চলার শীত।.... সবকিছুই প্রথমবার দেখার আশ্চর্য আর অবাক। শাওয়ার থেকে এত জল, নীল জল.....” সেই নীল জল উপচে পড়ে যেন ভাসিয়ে দিল সব লেখাগুলোকে। বাঁশি বাজিয়ে দিল জানলায়, আর খুব সুন্দর নরম নীল রঙে আঁকা হয়ে গেল বইটির প্রচ্ছদ। প্রচ্ছদ শিল্পী সঞ্জীব চৌধুরী। বড়ো সুন্দর করে ধরেছেন তিলোত্তমার মনকে, “জানলায় আঁকা গ্রাম”-কে।

    ‘ভাষালিপি’-কে কৃতজ্ঞতা এমন একটি আশ্চর্য বই উপহার দেবার জন্য। তিলোত্তমাকে শ্রদ্ধা। পাঠক বইটি না পড়লে নীলধারাজলের স্নান থেকে, শব্দের মিষ্টি সুঘ্রাণ থেকে বঞ্চিত হবেন।


    হে বন্ধু হে প্রিয়; — অরুণাভ সরকার; প্রকাশক— ভাষালিপি, কলকাতা ৭০০০০৯; প্রচ্ছদ- সঞ্জীব চৌধুরী; প্রথম প্রকাশ— এপ্রিল ২০২৫

    একটি কবিতার বইয়ের প্রথম কবিতা শুরু হচ্ছে একটি স্বীকারোক্তি দিয়ে— ‘এই অস্থিরতা আজ আমাকে কোথায় নিয়ে এল দ্যাখো’। কবিতার বইয়ের এমন সূচনাভাষ্য পড়ে শুরুতেই যে পাঠক সচকিত হবেন, অনুসন্ধিৎসু হয়ে পড়বেন তাতে সন্দেহ নেই। তাই বইটি হাতে পেয়ে তাকে খনন করে দেখবার স্বাভাবিক আগ্রহ জন্মাল।

    এক ফর্মার একটি কবিতার বই। কবি অরুণাভ সরকার। প্রথম কবিতাটি পড়েই মনে প্রশ্ন এল—

    কাকে বলছেন কবি? কবির এই অস্থিরতা কোথা থেকে এল? এই অস্থিরতা তাকে কোথায়ই বা নিয়ে যাবে? যে জীবন সে এখন যাপন করে তার সাথে সোনালী অতীতের তফাতই বা কি? কে জানে তার খবর? এ উত্তর দিচ্ছেন কবি নিজেই। জানেন রবীন্দ্রনাথ— যার সঙ্গীতকেই উৎসর্গ করেছেন কবি এই বই। আশ্চর্য হই এই বইয়ের উৎসর্গপত্রে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সাথে আরও দুটি নাম দেখে। না, সে নাম কোন ব্যক্তি মানুষের নাম নয়। সে নাম দুটি হল ‘মহাভারত আর ওডিসি’। স্বীকার করছি এমন আশ্চর্য উৎসর্গ পত্র পড়ে চমকিত হয়েছি।

    এক ফর্মার বই। প্রতিটি কবিতা নামহীন সংখ্যা দিয়ে চিহ্নিত। প্রায় প্রতিটি কবিতার অভিমুখ বিরহ, এক যাপিত অতীতের কাছে ফিরে যাবার আকুতি।

    “অসুখ সকল গ্রাস করে নিচ্ছে অস্তিত্ব আমার” — কোন অসুখ? এ প্রশ্নের উত্তরও দেন কবি নিজেই —

    “এবার তোমার মুখ ভুলে যাচ্ছি যে-কেউ সম্মুখে আসে /
    তুমি মনে হয়,এই রোগ উপভোগ করে থাকি”।

    অর্থাৎ তোমায় ভুলতে না পারার অসুখ। রূপে নয় অরূপে এই তুমির উপস্থিতি আমরা টের পাই কবির মনোভূমিতে। এই বিরহ ছায়ার মতো জড়িয়ে আছে সমস্ত কবিতার শরীরে। কবি লেখেন “যদি বিরহ না থাকতো কী যে হতো!” — সত্যিই তো “বিরহ ফুরিয়ে গেলে বেঁচে থাকা তো অসভ্যতা'ই! প্রেম তো পূর্ণতা পায় বিরহেই! বিরহ আছে বলেই তো বেঁচে থাকা! প্রেমের আনন্দ ক্ষণিকের আর বিরহ চিরজীবনের। বিশেষত যে কবির কবিতার বইয়ের নাম ‘হে বন্ধু হে প্রিয়’, আর যে বই উৎসর্গ করা হয়েছে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে। হয়তো রবীন্দ্রনাথ সে, যার প্রতি তীব্র আকর্ষণই কবিকে গৃহমুখী করে, আবার তাকে বোঝার চেষ্টাতেই কবির অপেক্ষা!

    ছোটো ছোটো কবিতা। দশ বারো লাইনের বেশি নয়। কবিতাগুলির মধ্যে ব্যক্তি জীবনের অস্থিরতা আর অস্তিত্বের কঠিন বাস্তবতাকে দার্শনিকতার গভীরতায় অবগাহন করাচ্ছেন কবি। কবিতার ভাষা সহজ অথচ ব্যঞ্জনাময়। কবির প্রতিটি অনুভব ক্ষণিকের অথচ তা রেশ রেখে যায়। মনে রাখার মতই কিছু লাইনে যখন মিলে মিশে যায় কবির আর পাঠকের অনুভব।

    “কতদিন পরে আজ আলো দেখলাম — স্বর্ণালী,/
    আমার চিরবৃষ্টির দেশে।/
    এই রং সোনার। তুমি তো আমাকে বুঝিয়েছিলে/
    এ- ধাতুর গুণ।/
    আর বলেছিলে, মন ভেঙে গেলে/
    চেহারা নষ্ট হয়ে যায়। তখন আমাদের/
    মিলন ছিল জাগতিক।”

    ফিরে ফিরে আসে জাগতিক মিলনের দিনের সেই স্বীকারোক্তি। সেই মিলনের চূড়ান্ত সঙ্গমে গান বেজেছিল — “তুঁহু মম শ্যাম সমান”। সেই চুম্বনে, সেই আলিঙ্গনে অবধারিতভাবে সামনে এসে যিনি দাঁড়ান তিনি রবীন্দ্রনাথ। প্রেম তাঁর সাথে বিরহও তাই। জীবনমৃত্যর পারে দাঁড়িয়েছেন তিনি, মৃত্য তাই শ্যামসমান। কবির বর্তমান আর সোনালী অতীতের দ্বন্দ্ব বারবার ফিরে ফিরে এসেছে কবিতায়। আর সে সব কথা বলতে কবিতা বার বার হয়ে উঠেছে সংকেতময়। ব্যক্তিগত অনুভব ছাড়িয়ে কবিতা হয়ে উঠেছে কবির আধ্যাত্মিক মুক্তির দ্যোতক। হ্যাঁ তাই হয়তো বার বার রবীন্দ্রনাথের কাছে আশ্রয় খুঁজেছেন কবি।

    “যে জীবন আমি যাপন করি/
    তার সঙ্গে সেই, অতীত যাকে সোনালী/
    বলা যায় কত কত তফাৎ অন্তত তুমি/
    জানো। শুধু ফিরে ফিরে দেখি —রবীন্দ্রনাথ/
    শুনি, তুমি দেহো মোরে কথা,/
    তুমি দেহ মোরে সুর/”

    এমন করেই সব কবিতার অভিমুখ তিনি, তাঁর সঙ্গীত! তাই অন্তিমেও কবি লেখেন

    “বাষ্প থেকে জন্ম নিক — মেঘ, বৃষ্টিধারা নেমে আসুক/
    যেখানে তোমার অবস্থান —হে বন্ধু হে প্রিয়।”

    কবিতার কাব্যভাষা, শব্দশৈলী পাঠকের গহনে এক মায়াময় অনুভব আনে। কবিতাগুলি চোখ ধাঁধানো ঔজ্জ্বলতা নিয়ে নয় বরং বৃষ্টিধোয়া সজীব, সবুজ রঙের স্পর্শ আনে পাঠকের মনে।

    কবিতাগুলির মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্র সংগীত বারবার ঘুরেফিরে এলেও মহাভারতের অনুষঙ্গ এসেছে মাত্র এক বারই। আর উচ্চারিত না হলেও কবিতার সহজ, সুরেলা চিত্রময় কাব্যভাষাটিতে অনুচ্চারিতভাবে রয়ে গেছে ওডিসির অনুষঙ্গ। আর তাই বোধহয় এমন একটি উৎসর্গপত্র।

    কবিকে শুভেচ্ছা। এক ফর্মার এই বইটির প্রচ্ছদ করেছেন সঞ্জীব চৌধুরী— শুভেচ্ছা তাকেও। আর অবশ্যই প্রকাশক ভাষালিপিকে এমন শান্ত একটি কবিতার বই আমাদের উপহার দেবার জন্য ।

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments