• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৩ | জুলাই ২০২৬ | গ্রন্থ-সমালোচনা
    Share
  • ‘নীল কুয়াশার জোছনা’-য় সহজিয়া অবগাহন : পাপিয়া ভট্টাচার্য

    নীল কুয়াশার জোছনা — সেলিম মন্ডল ; প্রচ্ছদ -- রাজদীপ পুরী; প্রকাশক- হ্যালো বুক্‌স, কলকাতা- ৭০০১২২; প্রথম প্রকাশ-- জানুয়ারি ২০২৪; ISBN: 978-81-961788-8-8











    গাছের সঙ্গে যদি গাছের বিরোধ বাধে
    পাখিরা কি তার ডালে এসে বসবে?

    মূল এত ছড়িয়ে যায় গাছের আত্মীয়তা ছিন্ন হয় না

    পাতায় যে বিদ্রোহ লাগে
    পাখি তাই দ্যাখে

    পাখি তাই দেখে ওড়ে

                                                                                 (বিদ্রোহের গল্প/সেলিম মন্ডল)
    জীবনের পরিসর অল্প হলেও তার গল্প অনেক। ট্র্যাজিক, কমিক, অথবা রোম্যান্টিক। ভিন্ন রস, ভিন্ন ভাবনা এবং ভিন্ন চরিত্র। কিন্তু নানান খুঁটিনাটি দিয়ে ভরাট করা কোনো ব্যক্তিজীবনের ক্যানভাস সবসময়ই স্বতন্ত্র। বিশেষ করে সেই ক্যানভাসে যখন পড়ে কোনো দক্ষ শিল্পীর তুলির আঁচড় কিংবা কোনো বিদগ্ধ কবির নিরীক্ষিত যাপনচিত্র। একঘেয়ে ছায়াছবিগুলো তখন হয়ে ওঠে কিছুটা আলাদা, একটু অন্যরকম। দৈনন্দিন নিত্যনৈমিত্তিকতাকে খানিক আড়ালে রেখে ফিরে দেখা মুহূর্তের সেই অভিনব জীবন বৃত্তান্তের নাম ‘নীল কুয়াশার জোছনা’। লেখক সেলিম মন্ডল।

    বহুস্তরীয় জীবনের স্তরে স্তরে প্রাকৃতিক-অপ্রাকৃতিক অথবা প্রেম-অপ্রেম বিন্দু বিন্দু ঘামের মতো জমে থাকে মনের অতলান্তিক গভীরতায়। কখনও কখনও সেই জমে থাকা অপ্রকাশিত অনুভূতি খুঁজে বেড়ায় প্রকাশের মসৃণ পথ। লেখক কবি সেলিম তার ‘নীল কুয়াশার জোছনা’ বইটিতে উন্মুক্ত করেছেন সেই পথ। অনুভূতি থেকে অভিব্যক্তি পর্যন্ত তিনি নির্মাণ করেছেন এমনই এক শাব্দিক সেতু যার নীচ দিয়ে বহুকাল ধরে হয়তো বয়ে চলেছে উত্তাল কোনো জলরাশি অথবা যার শান্ত অববাহিকায় গড়ে উঠেছে নারকেল, আম, জাম, কাঁঠাল, সুপারি, পদ্মকচু, পেয়ারা, লম্বু এরকমই আরও কত গাছের আরণ্যক সংসার। যেখানে হাওয়ারা খেলা করে, পাখিরা বাসা বোনে নিশ্চিন্তে। ‘নীল কুয়াশার জোছনা’ ব্যক্তিগত জীবন কাহিনির বাইরেও এক বিস্তীর্ণ জীবনদর্শনের কথা বলে।

    ছিয়ানব্বই পাতার নাতিদীর্ঘ এই বইটিকে লেখক মূল দুটি বিভাগে বিভক্ত করেছেন। যথা— ‘মায়াবাড়ি, মায়াঘর’ এবং ‘হইদেখা, পরদেখা’। এই দুই বিভাগকেই প্রায় কুড়িটি ছোটো ছোটো শিরোনামাঙ্কিত পর্ব দিয়ে তিনি সাজিয়েছেন। প্রতিটি পর্বেই লেখকের সংবেদনশীলতা এবং অন্তর্দৃষ্টির গভীরতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ভাষার সারল্য, শব্দ চয়নের দক্ষতা এবং বাক্যবিন্যাসের জাদুকরী বইটির পাঠসুখের অনুভূতিকে দ্বিগুণ করেছে। কবির দৃষ্টির বিস্তার এড়িয়ে যেতে পারে না কোনোকিছুই।

    জীবজগতের অপার বৈচিত্রের সঠিক পর্যবেক্ষণ বদলে দিতে পারে সাদামাটা জীবনের স্বাদ। পাঠক্ষণে সেই স্বাদের ভাগীদার হতে পারেন পাঠক নিজেও। দৃষ্টি এবং ভাবনার তীক্ষ্ণতা খুব সাধারণ ছবিকেও যে অনায়াসে নান্দনিক করে তুলতে পারে তার বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টান্ত লেখকের এই আখরকথায় বাঙ্ময়— “বর্ষার জল জমলে গাছেদের বড় অসহায় লাগে। অথচ, জল ছাড়া গাছেরা প্রাণ পায় না। বৃষ্টির পর ধুয়ে যাওয়া পাতায় যখন রোদ পড়ে তখন গাছেদের বিবাহ লাগে। এই বিবাহে সবাই আমন্ত্রিত। কে কনেপক্ষ আর কে বরপক্ষ তার তদবির করতে হয় না। গাছেদের যত নিকটে এসেছি বুঝেছি তার আত্মার রঙ হৃদয়ে লাগলে মনটা ফুরফুরে হয়ে যায়। একটা বসন্ত আসে। এই বসন্তে একজন বাউল দোতারা বাজায়।” (পৃ-৪৬)

    সেলিমের বাবা পেশায় পুলিশ হলেও জন্মসূত্রে ছিলেন কৃষক পরিবারের সন্তান। সাহিত্য অনুরাগী মানুষটির গাছপালার সঙ্গেও ছিল অলিখিত নাড়ির টান। তাই সাহিত্য ও গাছের প্রতি লেখকের প্রেম উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বলেই ধরে নেওয়া যায়। তাঁর মায়ের প্রসঙ্গে প্রথমেই যে কথা বলতে হয় তা হল, স্নেহ অতি বিষম বস্তু। শুধু স্নেহাস্পদ নয় নিজের মাতৃত্বকে তিনি দু-হাত দিয়ে আগলে রাখেন। সন্তান স্নেহে প্রতিপালন করেন প্রতিবন্ধী পোষ্যকে— “আমার মা উলটো। মুরগি পুষবে অথচ ডিম খাবে না। মাংস খাবে না। একবার মা বারোটা ডিম তাওয়াতে দিল। সপ্তাহ খানেক পর দেখা গেল আটটা ফুটফুটে বাচ্চা উঠেছে। মা খুব খুশি। তখনও মা খেয়াল করেনি একটি বাচ্চা স্বাভাবিক নয়। তাওয়া থেকে যেদিন নামাল দেখা গেল— একটি বাচ্চার একটি পা খোঁড়া। চোখের সামনে এক প্রতিবন্ধী শিশু মুরগির বেড়ে ওঠার লড়াই দেখাটা সত্যিই ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক।” (পৃ-১৬)

    শুধুমাত্র কবিতা বা গল্প নয় মানুষের অন্বেষণ সেলিমকে তৃপ্তি দেয়। তিনি নিজের অন্তর্গত শিল্পসত্তার দোসর খুঁজে বেড়ান গ্রামেগঞ্জে ঘুরে। স্ব-সম্পাদিত পত্রিকার মাধ্যমে পাঠক ও সেই সমস্ত নামী অথবা বেনামী শিল্পীর মধ্যে এক নিবিড় যোগাযোগ স্থাপন করার চেষ্টা করেন। জীবনবোধের মতো শিল্পবোধেও তাঁর ঝকঝকে স্পষ্ট ভাবনার আভাস স্পষ্ট। “শিল্প একটা অধ্যবসায়। একজন শিল্পী নিজেকে তিলে তিলে সেভাবে গড়ে তোলেন। তৈরি করেন একটা আলাদা দেখার চোখ। আমরা যা দেখি, তা আসলে আবছা, অস্পষ্ট একটা অবয়ব। দূর থেকে আমরা গাছ দেখি। ফুল দেখি। কিন্তু যত এগিয়ে যাওয়া যায় দেখা যায়, গাছের ডালে থাকা পোকা, আরও কাছে গেলে দেখা যায়, পোকার মুখে দানা। কিন্তু এই চোখ চাইলেই কি আমরা অর্জন করতে পারি? হয়তো, নাহ… ” (পৃ-৬৯)

    পূর্বোদ্ধৃত কথার সূত্র ধরেই বলা যায়, মানুষ নিজের অন্তরসত্তাকেই কি সঠিকভাবে অর্জন করতে পারে! স্নেহ, মমতা, ও যত্নের এক মানসিকবোধ শুধুমাত্র নারীদের একচেটিয়া অধিকৃত সম্পত্তি নয় তা পুরুষের মধ্যেও থাকে। এই অনুভব লেখকের মনেও প্রতিধ্বনিত হয়— “প্রেমিকা চলে যাওয়ার সময় যখন বলে, আমি কাঁদলেও তোর চোখ ভেজে না। আমার কষ্টেও তুই একটা আড়ষ্ট কাঠ। তখন কীই- বা বলার থাকে। আসলে, অসাড় কাঠের সাড়টুকু জমানো মায়া। সে হয়তো জানতেই পারে না প্রেমিকরা কাঁদে। ভিতরে এত বৃষ্টি, ভরাডুবি হয়। নিজেই নিজের ভিতর পিছলে পড়ে। আবার সে উঠে পড়ে। ভিজে গেছে কিছুতেই বুঝতে দেয় না। সংসারের মায়ের মতো। চরম দুঃখকষ্টেও আঁচল দিয়ে কখন যে চোখ মোছে টের পাওয়া যায় না।” (পৃ-৬৩)

    জীবন মায়ায় ভরা। তারই মধ্যে উৎসবমুখর বঙ্গজীবনে ঋতু পরিবর্তনের মতো পাল-পার্বণ, পরব আসে যায়। ছিটেফোঁটা আনন্দের রেশটুকু গায়ে মেখে সময়ও বয়ে চলে আপন নিয়মে। সেলিম বিশ্বাস করেন ধর্মীয় সংকীর্ণতা নয়, উদারতাই উৎসব উদযাপনের সঠিক পথ। তাঁর কথায়, “যতদিন গেছে ধর্মীয় রীতিনীতি এড়িয়ে চলার অভ্যাস রপ্ত করে ফেলেছি। আমাদের মন সবচেয়ে বড় ধর্মগ্রন্থ। এই গ্রন্থ পাঠ করতে করতে উৎসবের প্রকৃত আলো মেখেছি। তবে তার রঙে ধুর্ত কোনো শেয়াল এসে গন্ধ ছড়িয়ে দিক চাইনি। এখনও ইদ আসে। একইরকম আলতা পায়ে। আমি বাড়ির দরজা খুলে রেখে তাকে জল মিষ্টি দিই। সে-ও আমাকে জড়িয়ে ধরে। চুমু দেয়।” (পৃ-২৩)

    কখনও গদ্য, কখনও কবিতা, কখনও গ্রাম, কখনও শহর — এই সবকিছুর মধ্যে এক অদ্ভুত ভারসাম্য রক্ষা করে চলেন সেলিম। মনের মধ্যে দু-কূল ছাপিয়ে বয়ে চলে জলঙ্গী অনির্দিষ্ট ঠিকানার খোঁজে। ঠিক যেমন করে বৈচিত্রময় জীবনে মানুষ অনবরত বাসা বদল করে, অনবরত খুঁজে চলে নতুন ঠিকানা। “নদীকে ফেলে রেখে কখনো যাওয়া যায় না। তাকে বহন করতে হয়। তাই তো কলকাতাতেও আমার ভিতর জলঙ্গী বয়ে যায়। আমার সঙ্গে সঙ্গে ঘোরে। আমাকে পার করে দেয় একূল ওকূল। একটা লাল নৌকা। তার দাঁড় টানি। সাঁতার না জানা মাঝি আমি। নৌকোর লালে দেখি আমার রক্ত। জন্ম রক্ত। নাড়ি কাটার রক্ত।” (পৃ-৪৯)

    এভাবেই গভীর মনস্তাত্ত্বিক উপলব্ধিগুলি কবি ও গদ্যকার সেলিম মন্ডলের স্মৃতির ক্যানভাসে লিপিবদ্ধ হয়ে অপেক্ষা করে পাঠকের সমানুভূতির।

    ‘নীল কুয়াশার জোছনা’ বাস্তবের বন্দরে নোঙর ফেলা টুকরো টুকরো অনুভূতির চন্দ্রালোকিত মায়াময় কোলাজ। আরেক জনপ্রিয় কবি রাজদীপ পুরীর প্রচ্ছদে লেখকের অনুভূতি মালার সেই অলৌকিক কোলাজের যথাযথ প্রতিবিম্বন ঘটেছে।

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments