





এর পরেই আমরা অসমবয়সী বন্ধু হয়ে গেলাম। শিশিরদা, মঞ্জিলদা, আর অসিতদা (চৌধুরী) তিনজনেই আমার থেকে বছর তিরিশের বড়ো, কিন্তু সেটা প্রায়শই ভুলে যেতাম। কতবার কত প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে মঞ্জিলদার সতীশ মুখার্জী রোডের বাড়িতে গিয়েছি, আলোচনায়, গল্পে সময় বয়ে গিয়েছে। আর বইমেলায় তো একসময় আমরা তিনজন (শিশিরদা, মঞ্জিলদা, আমি) সামনের খদ্দের সামলানোর কাজে মেতে থাকতাম। শিশিরদা আর মঞ্জিলদা অদ্ভুত এক বন্ধুত্বের বাঁধনে বাঁধা ছিলেন। সন্দেশ-এর সাহিত্য পাঠের আসর থেকে দুজনে একসঙ্গে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরতেন। দেশপ্রিয় পার্কের মোড়ে এসে শিশিরদা ডাইনে ঘুরে যেতেন, আর মঞ্জিলদা সোজা। কখনো কখনো আমি দেশপ্রিয় পার্ক অবধি ওঁদের সঙ্গী হতাম, ওখান থেকে বাস ধরতাম কলেজ স্ট্রীট ফেরার। কত বিষয়ে যে আলোচনা হত — সাহিত্য, সমাজের, দেশের বর্তমান, ভবিষ্যৎ, অ্যাডভেঞ্চার, আরও কত কী! দুজনেই অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় ছিলেন। মাঝেমধ্যে বেরিয়ে পড়তেন। বেড়াতে গিয়ে অবাঞ্ছিত অ্যাডভেঞ্চারের কবলেও পড়েছেন। সে কথা মঞ্জিলদা লিখেও গিয়েছেন। সন্দেশী সকলের জন্য ওঁরা এত ভাবতেন — ১৯৯২তে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের কারণে দাঙ্গা পরিস্থিতির থমথমে অবস্থায় দুজনে পায়ে হেঁটে মিন্টো পার্কের কাছে সাত্তারদার (হুমায়ুন সাত্তার, যিনি সন্দেশীদের কাছে চম্পক সৌরভ নামে পরিচিত) কুশল জানতে চলে গিয়েছিলেন। সন্দেশ ছাড়াও শিশুসাহিত্য পরিষদের সমস্ত সভা অনুষ্ঠানেও ওঁদের জুটি হাজির থাকত। পরিষদের ‘ভাড়াটে চাই’ নাটকে মঞ্জিলদা সদ্য তরুণের চরিত্রে এমন অভিনয় করেছিলেন যে, বউদি পর্যন্ত দর্শকাসনে বসে তাঁকে চিনতে পারেননি। সন্দেশী সব অনুষ্ঠানে এই দুজন অবশ্যই উপস্থিত থাকতেন। সত্যজিৎ স্মরণ সভায় হৃদয়গ্রাহী লেখা পড়েছিলেন মঞ্জিলদা।
হঠাৎ মনে পড়ল, মঞ্জিলদার আরেকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুর কথা তো বলাই হয়নি। তরুণ বয়স থেকেই বন্ধুত্ব ওঁদের, যা আমৃত্যু বজায় ছিল। তাঁর নাম ছিল শক্তিপ্রসাদ রায়চৌধুরী। খেলাধুলোর ক্ষেত্রে মঞ্জিলদা বক্সিং বেছে নিয়েছিলেন আর ওঁর বন্ধু অ্যাথেলেটিক্স। মঞ্জিলদা পরবর্তী জীবনে লেখক হিসেবে খ্যাতিলাভ করলেন আর শক্তিপ্রসাদ লেখা এবং আঁকা দুই ক্ষেত্রেই খ্যাত হন। দু ক্ষেত্রেই উনি নিজের নাম ছেঁটে প্রসাদ রায় লিখতেন। আরেকটা ক্ষেত্রে উনি খ্যাতির চূড়ায় উঠে গিয়েছিলেন — কমিকস। এখানে উনি ব্যবহার করেছিলেন ছদ্মনাম — ময়ূখ চৌধুরী। ওঁদের বন্ধুত্ব এতটাই গাঢ় ছিল যে, প্রতি সন্ধ্যায় মঞ্জিলদার বাড়িতে ওঁর আগমন ছিল নিশ্চিত। মাঝেমধ্যেই বউদি ওঁর এই একা থাকা অকৃতদার দেওরকে রাতে না খাইয়ে ছাড়তেন না।
মঞ্জিলদার বাড়ির বৈঠকখানায়, থুড়ি, ড্রয়িংরুমে গেলে অবাক হয়ে দেখতাম দেওয়ালজোড়া আলমারি ভরা ওঁর লেখা বই, ড্রয়ার, তাক খুলে দেখিয়েছেন ওঁর অসংখ্য পাণ্ডুলিপি। অথচ ওঁর সঙ্গে কথা বললে টেরই পাওয়া যেত না, উনি এত উঁচুদরের লেখক। কত পুরস্কার যে পেয়েছেন! উল্লেখযোগ্য ফটিক স্মৃতি পদক, ভুবনেশ্বরী পদক, বিদ্যাসাগর পুরস্কার, জাতীয় পুরস্কার (গোরাচাঁদ উপন্যাসের জন্য)।

১৯২৬ সালে জন্ম, ৯০ বছর বয়সে পাড়ি দিলেন অমরত্বের দেশে। মঞ্জিলদার সেই দৃপ্ত অথচ স্নেহশীল ছবি আজও আমার মনে অমলিন।
পরবাস-এ মঞ্জিল সেনের লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন