• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৩ | জুলাই ২০২৬ | গল্প
    Share
  • বম্বে, দিল্লী, বেওকুফাবাদ : ইন্দ্রনীল দাশগুপ্ত

    বম্বে আর দিল্লী

    টোটোদা এসে পৌঁছেছিল ভোরবেলা। আমরা কেউ স্টেশনে নিতে যাইনি। পিছনের কাঠের জাফরি কাটা দরজা দিয়ে ঢোকার সময়ে সে আমার দিকে কিছু একটা ছুঁড়ে দেয়। লুফে নেবার পর দেখি ‘জিমখানা’ লেখা একটা সাদা ক্রিকেটের টুপি। কনট প্লেসেও এত স্টাইলিশ একটা জিনিস আমি দেখিনি। প্রসন্নতায় বিভোর হয়ে যাচ্ছিলাম।

    সবাই মানল বম্বে থেকে টোটোদা আরো স্মার্ট হয়ে ফিরেছে। নিখুঁতভাবে দাড়ি কামানো। চুলের ছাঁট আধুনিক। যে সেলুনে কাটাতে যায় সেখানে মোতিলাল আর দিলীপ কুমারের জুলপি থেকে হাফ ইঞ্চ কাটিং ফ্রেমে বাঁধানো আছে।

    মামা চোখ কপালে তুলে বলল – মোতিলালের জুলপি? মাই গড! ভারতের একমাত্র ব্লণ্ড অ্যাক্টর! হলিউড কিডন্যাপ করার জন্য কী ষড়যন্ত্রই না করেছিল! জুয়েল ইন দ্য ক্রাউন বলে ব্রিটিশরা আটকে দেয়। এরকম বেশ কিছু চিত্তাকর্ষক তথ্য উপহার দেবার পর করুণভাবে ভিক্ষা করল মামা - আচ্ছা, একটা চুল আমার জন্য আনতে পারবি কেউ?

    বলা বাহুল্য ব্লণ্ড শুনে সবাই হতবাক। তবে বিয়ের আগে রোজ একটা ব্ল্যাক আণ্ড হোয়াইট সিনেমা দেখত মাতুল। সে না জানলে কে জানবে? টোটোদা কিছু বলতে যাচ্ছিল। মামিমা তাকে থামিয়ে বলে - তোর বাবার কথা বিশ্বাস করিস না। সিপিয়া টোনে ছাপা ছবি দেখে ভেবেছে ব্লণ্ড। অন্যের চুলে নজর না দিয়ে লোকটাকে বল নিজেরগুলো বাঁচাতে। আচ্ছা টোটো, বিমল রায়ের কিছু কি পাওয়া যাবে? নখ, চুল, যা হয়। বা গীতা দত্ত?

    আমি আর টোটোদা মুখ চাওয়াচাওয়ি করছি। বিবেকানন্দের দাঁত বিদায় করার পর বিমল রায়ের নখ দিয়ে ঘর সাজাবে মামিমা? আবার সেটা ঠাকুরের আসনে না রেখে দেয়।

    - কেন পাওয়া যাবে না? পরে টোটোদা কল্পতরুর মতো সবাইকে আশ্বাস দিয়ে বলল। - লিস্ট বানাতে থাকো। নখ আর নেল কাটার একসঙ্গে সেট হিসেবে পেয়ে যাবে। বম্বেতে সব পাওয়া যায়, এবং জলের মতো সস্তা।


    এইভাবে সারাদিন ধরে শুধু বম্বের আলোচনাই চলছিল। - কোনটা বেশি ভালো? আমরা পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক টোটোদাকে জিজ্ঞেসও করেছিলাম। - বম্বে না দিল্লী? দু-নৌকোয় পা দিয়ে চলা যায় না। একটা সাইড নাও।

    হেরম্ব জ্যাঠা পূজোর চাঁদা নিতে এসেছিলেন। গোটা ছয়েক লুচি খেয়ে নেবার পর ঢেঁকুর তুলে তিনি বললেন – লজ্জা করিস না। যা সত্যি সেটাই বলিস, টোটেশ। বম্বে ভালো বললে বম্বেতে উঠে যাব। সেকেণ্ড বেস্ট শহরে কে থাকতে চায়? আমরা, উদ্বাস্তু বাঙালিরা ভারতের সবচেয়ে সুবিধেবাদী জাত। লক্ষ্মীর পিছনে হাঁটি না। লক্ষ্মী আমাদের পিছু পিছু ছুটে হয়রান। ছুঁয়ে ফেলার আগেই নতুন দেশে কেটে পড়ি।

    - জেঠু, আমার ভালো নাম টোটেশ নয়, অরিন্দম। এই বলে টোটোদা শুরু করেছিল। দ্বিতীয় বাক্য বলার আগে হেরম্ব জ্যাঠা থামিয়ে দিলেন।

    - কে বলেছে? হেরম্ব জ্যাঠা বললেন। - তোর অন্নপ্রাশনের নেমন্তন্নে হাতে লেখা কার্ড পাঠানো হয়েছিল। আমরা সবাই দেখেছি তাতে টোটেশ লেখা।

    মামিমা তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে বলে – ও ভুল বলেনি। ওর নাম অরিন্দম। ইস্কুলের খাতায় নাম লেখাবার সময় মাস্টারমশাইরা নাম ঠিক করেন। তার আগে কোনো ভালো নাম হয় না।

    - অরিন্দম থেকে টোটো? কখনো হয়? হোয়াট রাবিশ!

    রাবিশ শব্দটা শুনে মামিমা খুব চটে গিয়েছে। মা তাড়াতাড়ি বলল – টোটেশ নামের কোনো মানে হয় না হেরম্বদা। তোমার ভুল হচ্ছে। ওর অন্নপ্রাশনে আমরা কাউকে ডাকিনি। যারা নিজের থেকে চলে এসেছিল তাদের ভাত ডাল খাওয়ানো হয়েছে।

    হেরম্ব জ্যাঠাকে ভাঙা যায়। মচকানোও যেতে পারে। টলানো যায় না। বললেন - দুল, তোর একদম মনে নেই? হরিদ্বার থেকে কোন একটা মঠের পুরোহিত এসেছিলেন। সবাই দেখা করতে গেলাম। হাতে মোটা বাঁশ নিয়ে ঘুরতেন। বাঁশকে ওরা বলে টোটা। আর পুরুতের নাম ছিল টোটেশ, যার মানে বাঁশের রাজা, অর্থাৎ কার্তিক।

    টোটোদা কুইনিনের সরবত খাচ্ছে এমন মুখ করে বলে – টোটা কোনো সংস্কৃত শব্দ নয় তো টোটেশ আসবে কোথা থেকে?

    - দরবেশ কোত্থেকে এল? অক্‌লেশ, হক্‌লেশ, চম্‌কেশ, গম্‌লেশ, বন্দুকেশ? এগুলো?

    কিছুক্ষণ সবাই নিরুত্তর। টোটোদা মিনমিন করে বলল – হক্‌লেশ মানে আবার কী?

    - তুই জানস না? হেরম্ব জ্যাঠা পূর্ববঙ্গের ভাষায় একসঙ্গে বিস্ময় আর বিরক্তি প্রকাশ করলেন।

    - না।

    - সইত্য জানস না, না ভান করতাছস?

    মা আবার পরিস্থিতি সামলাবার জন্য মঞ্চে অবতীর্ণ হয়ে বলে – ও জানে না, হেরম্বদা। আমি কইছি। হক্‌লা মানে তোতলা। হক্‌লেশ হইল গিয়া তোতলার রাজা। কিন্তু এ নাম কেউ নিজের পোলারে দিব ক্যান? কানা পোলার নামও কেউ কানা দেয় না।

    জ্যাঠা বললেন - নিজের পোলার নাম নয়, পরের পোলার নাম। আমাগো অফিসের চাপরাসিরে আমরা কই। দুধওয়ালার পোলাডারে কই। যার মা-বাপ নাই তারে পাড়ার লোকে এই নাম দেয়। সেইডা কথাও না। কথা হইল এই যে এই নামগুলা বোনাফাইড কি না।

    - হ। হ। বোনাফাইড। মা মাথা নেড়ে বলে। - টোটো, তুইও কইয়া দে।

    টোটোদা প্রসঙ্গে ফিরে আসার জন্য মায়ের বাড়ানো কুটো আঁকড়ে ধরেছে। – রাইট, রাইট। পয়েন্ট টেকন। খাবি খেতে খেতে বলে সে। - যাহোক, অল থিংস্‌ কন্সিডার্ড, দিল্লীর মতো কোনো জায়গা হয় না। এক কথায় অতুলনীয়। বম্বে যতই সুন্দর হোক, তার মধ্যে এরকম বৈচিত্র এবং ঐতিহ্যের ছোঁয়া নেই। দিল্লী আসলে একটা জীবন্ত মিউজিয়াম অ্যাণ্ড জু-গার্ডেন - অল ইন ওয়ান।

    এতক্ষণে টোটোদা একটা কাজের কাজ করেছে। যা আন্তরিকতা ছিল কথাটার ভিতর, যেরকম গাম্ভীর্য ও কৌতুক এক সঙ্গে ঝলমল করছিল তার মধ্যে, যে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে তালি পড়ে যায়।

    হেরম্ব জ্যাঠার সমস্ত ক্ষোভ যেন এক নিমেষে উবে গিয়েছে। গভীর সন্তোষে তিনি বললেন – না, না। বাড়িয়ে বলছিস তুই।

    - বাড়াইনি, তবে…। টোটোদা আঙুল তুলে আরো কিছু যোগ করতে যাচ্ছিল। প্রমাদ গুনে আমি তৎক্ষণাৎ ইশারা করি। বম্বেতে আড়াই-তিন মাস থেকে এসে আমার মামাতো ভাই ভুলে গেছে শিমলিপুরের লোকেরা কী মাল। চোখ পাকিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু ততক্ষণে তার মুখের গুলতি থেকে কথার ঢিল বেরিয়ে গেছে।

    - বম্বের সাধারণ জনতার মতো ফ্রেণ্ডলি, সদাশয়, এবং হাই কোয়ালিটির মানুষ পৃথিবীতে কোথাও নেই। সরল মনে ঘোষণা করে দিল টোটোদা।

    ***

    টোটোদা তার বক্তব্য শেষ করে লুচিতে মন দিয়েছিল। হেরম্ব জ্যাঠার মুখের স্বল্পস্থায়ী হাসি আবার ভ্যানিশ করে গেছে। ধীরে সুস্থে চাঁদার বইটা বন্ধ করার পর ব্যাগে পুরে বললেন – কী বলতে চাইছিস তুই? দিল্লী শহরটা বেস্ট, কিন্তু তার লোকগুলো সেকেণ্ড ক্লাস?

    টোটোদা চিবোনো থামিয়ে একটু অবাক হয়ে বলল – সেকেণ্ড ক্লাস তো বলিনি আমি।

    - তাহলে বলছিসটা কী? সেকেণ্ড বেস্ট?

    - দেখুন জেঠু, আপনি মিথ্যে বলতে বারণ করলেন, তাই সত্যিটাই বলছি। সেকেণ্ড বেস্ট আর বেস্টের মধ্যে খুব বেশি দূরত্ব থাকা উচিত না। এক্ষেত্রে তফাৎ তার চেয়ে বেশি। বম্বের মতো হাই কোয়ালিটির মানুষ দিল্লীতে খুবই দুর্লভ।

    হেরম্ব জ্যাঠা বললেন – পরিষ্কার বলছিস দিল্লীর মানুষরা থার্ড ক্লাস। তাহলে আমাদের কোথায় থাকা উচিত? বম্বে না দিল্লী?

    মা এতক্ষণ আমার পাশে দাঁড়িয়ে চুপচাপ সবার কথা শুনছিল। টোটোদাকে বাঁচাবার জন্য আবার ঝাঁপিয়ে পড়ে বলল – হেরম্বদা, দিল্লীর বাইরে বাঙাল রিফিউজি কেউ অ্যাক্সেপ্ট করব না। ওয়েস্ট বেঙ্গল আমাগো পছন্দ করে না। ঢাকায় ফেরৎ যাওয়ার উপায় নাই। বম্বে গেলে অরা তোমায় আরব সাগরে ফালায়ে দিব। তখন তুমি খাইবা কী? মাছ?

    আমার মামাবাড়িতে ভাইবোনরা এককাট্টা হয়ে থাকে। যে কারণে মামিমা বলে – সব শিয়ালের এক রা। এবারও মামা অমনি মায়ের কথায় সায় দিয়ে রোবটের মতো মাথা নাড়াতে লাগল। - হ্যাঁ। মাছ আর জল।

    মামিমা বলল – কেন, আমরা অন্যদের চেয়ে কম কীসে? বম্বের মানুষরাও আমাদের মতো ভাত, ডাল, রুটি খায়। আমরা তাদের মতো ভালো হতে পারব না কেন?

    ‘ভালো’ শব্দটা মামিমার মুখ দিয়ে বেরোতেই মা, মামা, আর হেরম্ব জ্যাঠা একসঙ্গে বলল – কাম নাই। আমরা দিল্লীতেই থাকুম।

    মামা বলল – ব্রিটিশরা আমাগো ক্যাপিটালে এস্টাব্লিশ কইরা গেছে। লাস্ট ইম্পিরিয়াল ডিউটি কইতে পারো। আমরা সে জমি ছাড়ুম ক্যান?

    টোটোদা ইতিহাসের ছাত্র। সে খাওয়া থামিয়ে বলল – দিল্লীতে কি আমরা ওয়ান্টেড? এটা তো মোঘলদের শহর ছিল। ব্রিটিশরা বাঙালিদের কেরানি বানিয়ে আনবার সময় লোকালদের পারমিশান নিয়েছে?

    - নট ইন দ্য লীস্ট। হেরম্ব জ্যাঠা বললেন। - মোঘলদের সমস্ত পাওয়ার ধ্বংস করে দেবার পরেই ব্রিটিশরা আমাদের আনে। পারমিশান নেবার প্রশ্ন ওঠেনি।

    - তাহলে কেন ধরে নিচ্ছি দিল্লীর পুরোনো অধিবাসীরা আমাদের অপছন্দ করেনি?

    - কী মুশকিল! অপছন্দ তো করেছেই। টোটোদার কথায় কোনো যুক্তি না দেখতে পেয়ে অধৈর্য হয়ে বললেন হেরম্ব জ্যাঠা। - আমাদের সকলেই অপছন্দ করে। তাতে কী হয়েছে?

    মা বলে – আমাগো অফিসের সবকটা পাঞ্জাবী মেয়ে আমারে কইছে রিফিউজিগো কেউ পূজা করার লগে বইস্যা নাই। তাই শহরের এক একটা অংশ পারমিশান ছাড়াই দখল কইর‍্যা বসতে হয়। আর লোকালদের পোকা মাকড়ের মতো পিছার বাড়ি মাইরা তাড়াইতে হয়। দুইটার কোনোটাই আমরা পারি নাই।

    মা শিমলিপুরের আগের প্রজন্মের লোকেদের চেয়ে বয়সে অনেক ছোট হলেও কোয়ালিফিকেশানে বড়ো এবং ভারত সরকারের গেজেটেড অফিসারদের লিস্টে তাদের সবার চেয়ে অনেক উপরে থাকার জন্য একটু আধটু পাত্তা পায়। হেরম্ব জ্যাঠা মায়ের কথাটা ‘রাবিশ’ বলে উড়িয়ে দিতে পারলেন না। বললেন – দুল, ইংরেজরা আমাদের হইয়া যমুনা পাড়ের গ্রামগুলা খালি করছে। তারপর যে সরকারী কোয়ার্টার বানায় তা ত আমরাই নিছি। আটটা বাংলা স্কুল, সাতটা কালিবাড়ি, এসব বানাই নাই? বম্বেতেও পারতাম।

    - কোথায় সাতটা কালিবাড়ি হেরম্বদা? আমি তো পাঁচটাই জানি।

    - কেন? বেয়ার্ড রোডের পুরোনো কালি মন্দির, তিস-হাজারী কালিবাড়ি, নিউ দিল্লী কালিবাড়ি, চিত্তরঞ্জন পার্ক কালি মন্দির, লোদী রোড কালিবাড়ি, লক্ষ্মীনগর কালি মন্দির, আর আমাগো শিমলিপুর কালিতলা…।

    - শিমলিপুর কালিতলা? মামা বাদে বাকিরা সবাই হাঁ হয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। এতদিন ধরে শিমলিপুরে আছি, কোথায় এই কালিতলা আমরাই জানি না। - না শুনেছি, না দেখেছি। সবার হয়ে মা বলে।

    - তরা ভাঙা ই-কোয়ার্টারগুলার মাঝখানে প্রাচীন বরগদ গাছটা দেখস নাই?

    - কোন বরগদ গাছ? ওখানে ত পুরা জঙ্গল। অশ্বত্থ, বট, নীম, কী নাই? কোন গাছটার কথা কও?

    - ওল্ডেস্ট যে গাছ। যার গোড়ার কাছটা ফাঁপা। সাপ-খোপ থাকে।

    - সেখানে কালি কই? কেউ তার ধার মাড়ায়?

    - আমাগো বাপ-চাচার ইচ্ছা ছিল ওইখানে কালি মন্দির হোক। আমরা কথা দিছি। কথা রাখুম।

    - কবে হইব এসব? জমি কার? আপনি তার দখল পাইবেন ক্যামনে?

    - জমি গভর্নমেন্টের। আমরা পিটিশন করুম। অ্যালট হইলেই কাজ শুরু।

    - ফাণ্ড্‌ কই?

    হেরম্ব জ্যাঠা চেয়ারে বসে এপাশ ওপাশ করে বললেন – এইসব ফিউচারের কথা। সেই লগে আমরা কালিবাড়ি কই না। কালিতলা কই। একটা গাছ থাকা দরকার। মূর্তি তো চিন্ময়। আমাগো বুকের ভিতর বাস করে। যাহোক আসল বিষয় থিক্যা ডাইভার্ট করতাছি। আসল কথা এই যে পূর্ববঙ্গের গাঁওয়ের মানুষ সদাশয় হইতে যাইব ক্যান? তারে কি কুকুরে কাটছে? শহরে তারা আসে মুখ বুইজা চাকরি করার লগে। তখন একটু বদাশয় হইতে লাগে।


    টোটোদা নেপথ্যে চুপচাপ বসে অপরাধীভাবে ম্লান হাসি হাসছিল। যেন বম্বের লোকেদের সদাশয়তার জন্য সে-ই দায়ী। মামিমা বলল – হেরম্বদা, কাউকে ভালো বললে আপনার খারাপ লাগে শুনতে?

    হেরম্ব জ্যাঠা উঠে পড়েছিলেন। হাত ঝাড়তে ঝাড়তে কথাটা নির্দ্বিধায় মেনে নিলেন। – সদাশয় মানুষ দেখলে আমাগো ইনসিকিউরিটি বাইড়া যায়। তারপর আমাদের উঠোনে পুচ করে পানের পিক ফেলে হালকা হয়ে নিয়ে টোটোদার দিকে ফিরে বললেন - ব্রিটিশদের আমরা বিশ্বাস করতাম কেন জানিস? তাদের মধ্যে এসব ফ্যান্সি জিনিস ছিল না, একটু চাপ পড়লে যা গুঁড়িয়ে যেতে পারে। লোহার দুর্গের মতো অটল চরিত্র। নেটিভদের কীভাবে জুতোর নিচে রাখতে হয়…

    মামিমা হাত তুলে বলল – থাক, থাক। বুঝে গেছি। বম্বের লোকেরা ভালো বলে খারাপ আর ব্রিটিশরা খারাপ বলে ভালো। আপনার যুক্তি নিয়ে আপনি থাকুন। আমাদের ছেলেরা ওরকম হবে না।

    যাওয়ার সময় হেরম্ব জ্যাঠা হাসতে হাসতে বলে গেলেন – আমরা যা করে যাচ্ছি তার অর্ধেকও যদি ওরা করতে পারে তো বুঝব বাপ কা ব্যাটা, সিপাহী কা ঘোড়া। টোটেশ নাম দেওয়া হয় সবাইকে পিটায়ে ছাতু করার জন্য। অরিন্দম মানেও তাই, কিন্তু পিটাইব কী দিয়া? বাঁশ কই?


    পরে মামা টাক চুলকোতে চুলকোতে বলল – হেরম্বদা মানুষ নয়, একটা জাগ্রত বিবেক। মাসে একবার করে শিমলিপুরের সব কটা বাঙালি বাড়িতে ঘুরে যায়। সেইজন্য আমাদের মধ্যে এখনো ইউনিটি আছে। নইলে কবে সবাই নিজেদের কালচার ভুলে যেত। সি-আর পার্কে যখন বাঙালরা জমি পায় তখন মাছের বাজারের গন্ধে বাড়িগুলো তৈরি হবার আগেই আশে পাশের কলোনি থেকে সবকটা নেড়ি কুকুর সেখানে গিয়ে হাজির হয়। অ্যাডমিনিস্ট্রেশান বলেছিল ভ্যান পাঠিয়ে কুকুর উৎখাত করে দেবে। হেরম্বদা কলোনির তরফ থেকে কড়া চিঠি লিখে থামায়।

    আমি আর টোটোদা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম – খোলা কুকুরের উৎখাত আবার কেউ থামায়? জলাতঙ্ক হয় তাদের থেকে।

    মামা আমাদের দু-ভাইয়ের ইউনিটি দেখে ব্যাকফুটে চলে যায়। - তোরা বুঝবি না, ছাড়ান দে। বাঙালদের কলোনিতে স্ট্রে ডগ রাখতে হয়।

    - বাট হোয়াই?

    - প্রেস্টিজ।


    মামা সরে পড়লে মা আমাদের সান্ত্বনা দিয়ে বলল – আসলে আমরা বাঙালরা যদি ছাড়া জন্তু-জানোয়ারদের আশ্রয় না দিই তো কে দেবে, বল? তারপর মা আমাদের দু-ভাইকে এড়াবার জন্য আরো লুচি ভাজবে বলে ছুটে রান্নাঘরে চলে গিয়েছিল। মামিমাও দাঁড়ায়নি। টোটোদার জন্য দিস্তে দিস্তে লাল করে ভাজা খাস্তা লুচি আর গরম আলুর দম আসতে শুরু করে। পাতের উপর আরো চারটে বিরাট সাইজের পুরী দেখে টোটোদা চেঁচিয়ে বলেছিল – এ অসম্ভব! আমি রাক্ষস নই। তোমরা আমাকে মেরে ফেলবে নাকি?

    মা বলল – না টোটো, এতদিন কিছু খেতে পাসনি। তোকে খেতেই হবে। নিজের মায়ের আত্মার শান্তির জন্য খা।

    - কার আত্মা? তোমরা তো বেঁচে আছো! নিজের আত্মার শান্তির জন্য নিজেরাই খাও।

    মা বলে - আজ বেঁচে থাকলেও একদিন তো মরব? এখন থেকে অভ্যেস না করলে তুই তখন খাবি কী করে?

    মামাও এসে মায়ের কথার পিঠে পুতুলের মতো মাথা নাড়াতে লাগল। মনে মনে ‘ডিজগাস্টিং ফ্যামিলি’ ভাবলেও কেউ কিছু করতে পারলাম না। তারপর টোটোদার উপর সারা সকাল ধরে এমন জুলুম চলল যে দুপুরে সবাই যখন ঘুমোতে গিয়েছিল তখন সে আমার সঙ্গে বাইরে চলে আসে এবং যে ভাবে হোক শিমলিপুরের বাঙালদের এড়াবার জন্য আমরা স্ট্রে ডগের মতো দুলকি চালে সোজা চলে যাই ক্যান্টনমেন্টের রাস্তায় এবং সেখান থেকে টোটোদাকে দেখাব বলে আর্য সমাজ লাইব্রেরি।


    আমাদের বেওকুফাবাদ

    আর্য সমাজ মন্দিরে গিয়ে মুক্তাজীকে পেলাম। তিনি হই হই করে বললেন – জয়, তুই তো স্কুল খুলে যাবার পর থেকে শকল্‌ দেখাস না। এদিকে চতুরানন দেশের বাড়ি চলে গেছেন। লাইব্রেরিতে আগে শুধু লোক আসত না, এখন নতুন বইও আসছে না।

    মুক্তাজীর সঙ্গে টোটোদার আলাপ করিয়ে দেবার পর বলি – মুক্তাজী, শকল্‌ দেখিয়েই বা কী হবে? আমার বুধ-বুখার হয়েছিল। তারপর থেকে কলোনিতে কেউ চিনতে পারছে না। আপনি কি আমাকে অন্যরকম দেখছেন? মুক্তাজী ভালো করে নিরীক্ষণ করে বললেন – ধৎ, কিচ্ছু পালটায়নি তোর। আসলে টিভিতে উন্নীস কা জাপ বলে একটা নতুন প্রোগ্রাম হিট হয়েছে। সকালবেলা উঠেই খুব তাড়াতাড়ি বলে যেতে হয় – উন্নীস-বীস, উন্নীস-বীস, উন্নীস-বীস …। কে কতবার বলতে পারে। এক লক্ষের বেশি হলে ওরা প্রাইজ দেবে। মানেটা হল এই যে মানুষের ভাগ্যে কী আছে তা তো আগেই লেখা হয়ে যায়, পরে যতই চেষ্টা করো উনিশ-বিশের বেশি তফাৎ হবে না। তো সবাই সারাদিন সেটাই করে যাচ্ছে। কারো মুখ চেনার সময় নেই।

    কী বক্‌ওয়াস! চাঁদ যেমন শেয়ালের দলকে বসিয়ে রেখে হুক্কা হুয়া করায় সেরকম টিভি মানুষকে দিয়ে করাচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম – আপনি এসব বিশ্বাস করেন?

    মুক্তাজী বললেন - প্রথম চার পাঁচ দিন করেছিলাম। রোজ বেলা বারোটার আগে এক লক্ষ হয়ে যেত। টিভির সামনে বসে করেছি, তাও ওরা জানতে পারেনি, প্রাইজ দিয়েছে পাড়ার একটা পাঞ্জাবী মেয়েকে। সে উন্নীস-বীসকে বলে উন্নী-বী। শোনার পর আমার পৃথিবীর উপর থেকেই বিশ্বাস উঠে গেছে। তুই আমার হয়ে মিনিস্টরকে একটা শিকায়তের চিঠি লিখে দিবি?

    দেব না কেন? দিল্লীতে যখন আছি তখন কেন্দ্রীয় সরকারকে মাঝে মাঝে চিঠি দেবার অভ্যেস রাখা ভালো।

    টোটোদা লাইব্রেরীটা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল। আমি আর মুক্তাজী চতুরাননের ঘরে গেলাম চিঠি লিখবার জন্য। সবাই বলে মিনিস্টারদের প্রকৃত কিছু করার ক্ষমতা নেই। তাই মন্ত্রীর বদলে ইনফরমেশন অ্যাণ্ড ব্রডকাস্টিংয়ের সেক্রেটারিকে উদ্দেশ্য করে লিখলাম উন্নীস-বীসের জায়গায় উন্নী-বী বললে ফাউল হয়। সরকার যেন প্রাইজটা ফিরিয়ে নিয়ে অন্য কাউকে দেন।

    - পাঠাবি কোন ঠিকানায়? জিজ্ঞেস করলেন মুক্তাজী।

    - কেন? সঞ্চার ভবন, পার্লামেন্ট স্ট্রীট। আমার মায়ের অফিসের পাশের বিল্ডিংটাই তো!

    - উফ্‌, কী সেয়ানা রে তুই! সিমেন্টগন্ধী চত্বর দিয়ে ইউক্যালিপটাসের পাতা মাড়াতে মাড়াতে মন্দিরের কাছে এসে মুক্তাজী বললেন। – পার্ট টাইম চাকরি লাগলে বলিস। আর্যসমাজী হয়ে গেলে মন্দিরের প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত হতে পারবি। লোকল্‌ ছেলে। লোকল্‌ই থাক। কী খারাপ?

    মুক্তাজীকে বলিনি পরের বছর থেকে আমাকে আর এখানে দেখতে পাওয়া যাবে না। শরতের হাওয়ায় মন্দিরের চারদিকে লাগানো ইউক্যালিপটাস আর দেবদারুর গাছগুলো আমাদের অচলায়তন মোহল্লাকে আশ্বাস দেবার জন্য উন্নীস-বীস করে যাচ্ছিল। বললাম – আপনার শিমলিপুর খুব ভালো লাগে, তাই না? মুক্তাজী একটু লজ্জিত হয়ে বললেন – আমরা সরকারী চাকরি পাইনি। লায়লী টিলার কাছে পুরানী সরকারের পরিত্যক্ত বাংলো শেয়ার করে থাকি। বাড়িগুলো কন্ডেম্‌ড হয়ে গেছে। ইলেক্ট্রিসিটির কানেকশানও প্রাইভেটে লাগাতে হয়েছে। তাও উঠে যেতে পারি না।

    - কেন? আরেকটা বাড়ি নেন না কেন?

    মুক্তাজীর মুখের উপর গাছের ফাঁক থেকে আলো আর ছায়া এসে পড়ছে। তিনি কপাল থেকে চুল সরিয়ে বললেন - আমার একটা ভাই বছর দশেক ধরে গায়েব। প্রথম প্রথম তার চিঠি পেতাম। লিখেছিল গ্যারান্টি দিতে পারছে না, কিন্তু ইচ্ছে হলে একদিন ফিরে আসবে। নিজের কোনো ঠিকানা জানায়নি। তারপর তো পোস্টম্যান চিঠি দেওয়া বন্ধ করে দেয়। এখন আমরা যদি উঠে যাই তো ভাই আমাদের কোথায় খুঁজবে?

    - সে কী? পোস্টম্যান চিঠি দেয় না?

    - না রে। তবে তার সেটিং আছে। কন্‌ডেম্‌ চিঠিগুলো ওরা সস্তা-গল্লার দোকানে সের দরে বিক্রি করে দেয়, সেখান থেকে রোববার রোববার আমি পয়সা দিয়ে ছাড়িয়ে আনি। - একদিক থেকে ভালোই বুঝলি তো? যদি কোনোদিন বুলডোজার দিয়ে আমাদের পাড়া ভেঙে দেয় তাহলেও ভাইয়ের চিঠি আমি কোনো একটা দোকান থেকে পেয়ে যাব।

    এই রকম বুলডোজারের মুখে দাঁড়ানো টিমটিমে আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখা পাড়া ছেড়ে যেতে কষ্ট হয় আমারও। ভাগ্যিস মুক্তাজীর মতো কোনো দিদি এখানে পড়ে নেই আমার। ছেলেবেলার খেলাঘরে লোকল্‌ হয়ে কে না থাকতে চায়? কিন্তু মানুষ তো ইউক্যালিপটাস গাছ নয় যে অস্ট্রেলিয়া থেকে এনে এখানে লাগিয়ে দিলেও মনের সুখে জীবন কাটিয়ে দেবে? তার তো কিছু কারবার চাই। এখানে না আছে ব্যবসা, না আছে ভালো চাকরি। সমস্যাগুলো মুক্তাজীকে জানালাম।

    মুক্তাজী প্রতিবাদ করে বললেন – না, না, তা বলিস না। কলোনিতে পঁচিশজনের উপর জ্যোতিষী। পুরো ইস্ট দিল্লী, এমন কী ইউ-পি থেকে লোকেরা এসে কুণ্ড্‌লী লেখায়। একুশটা কপি লাগে, সেই জন্য সকালবেলা থেকে দুর্গামন্দিরের কাছে সবকটা জেরক্স দোকানের সামনে লাইন। আমাদের পাশের বাড়িতে এক আঙ্কলজী আগে প্রাইভেটে অ্যালোপ্যাথিক ডাক্তারি করতেন। মেডিকাল ডিগ্রী ছিল না বলে হাসপাতালে চাকরি হয়নি। এখন সেসব ছেড়ে বর্তন-গাইডের ব্যবসা খুলেছেন। দেওয়ালী, হোলী, ধনতেরস ইত্যাদিতে লোকেরদের বাসন কিনতে হয়। সবার তো সব বাসন স্যুট করে না, কার কী ধরনের কেনা উচিত, চৌকো না গোল, ঢাকাওয়ালা না খোলা, একটা হ্যাণ্ডেল না দুটো…

    - গুড গড।

    - …ঠিক বলেছিস। প্রভুর কৃপায় এই সব নির্ভুলভাবে গুনে বলে দেন তিনি। আচার্য ধন্‌কারী নামে সবাই চেনে। যেমন প্রিন্টিং করাতে চাইলে মায়াপুরী, ইলেকট্রিকাল পার্ট্‌স্‌ লাগলে লাজপত রায় মার্কেট, কাটা পকেট সেলাইয়ের জন্য পাহাড়ি দর্জিয়াঁ, আর পাকা চুল তোলাবার জন্য তেলীওয়াড়াতে যেতে হয় তেমনই কোন জিনিসটা কাকে স্যুট করে বা করে না তার গাইডেন্সের জন্য এখন হোল দিল্লীর লোক কোথায় যায়? শিমলিপুর। তুই ইচ্ছে করলে সোয়েটারের প্যাটার্ন গাইড হতে পারিস। সোজা, উলটো, মৌচাক, চামেলি, জাল, বরফি। গাইড আছে শুনলেই লোকে ভিড় করে আসবে কোনটা তার পক্ষে ভালো জানার জন্য। আর যে সব ডজন ডজন মহিলারা সোয়েটার বোনে, তারা এসে শিখিয়ে দেবে কোন প্যাটার্নগুলো কবে বলা উচিত। শিমলিপুর এখন দিন কে দিন আগের চেয়েও ভালো হয়ে যাচ্ছে, জয়। ভাইটা যদি ফিরে আসত তাহলে বুঝত।

    সুভানাল্লা! পুরোনো দিল্লীতে মোঘল আমল থেকে সুবিদিত যে শিমলিপুরে কেউ কিচ্ছু জানে না। কেউ কেউ বলে আইন-ই-আকবরীতেও বেওকুফাবাদ বলে কোনো একটা জায়গার জিক্র ছিল। সেটা আসলে আমাদের গুড ওল্ড শিমলিপুর। এখানে ডিগ্রীধারী মানুষ আজও হাতে গোনা যায়। আজ সেই ধুর্‌রা কলোনি পুরো দিল্লীর ভবিষ্যতের গাইড হয়ে গেছে? মুক্তাজীর মনে আঘাত না দেবার জন্য শিষ্টতা করে বললাম – অবাক লাগছে শুনে। আগে সবাই ভাবত এখানকার লোক পঢ়ালিখা নয়। আশা করি সে ভুল ভেঙেছে তাদের।

    মুক্তাজী বললেন – আরে, ভুল কেন হবে? সেটা এখনো ভাবে, জয়। সেইজন্যই তো আমাদের উপর ভরসা বেশি। মনে রাখিস পঢ়ালিখা লোকেদের কাছে মানুষ নিজেদের ভয় আর সমস্যার খুলাসা করতে লজ্জা পায়। আমাদের জীবনে চয়েস খুব বেড়ে গেছে। আগে শুধু কাঁসার থালা পাওয়া যেত। এখন স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম, আন-ব্রেকেবল চীনেমাটি, কত কী আছে। কোনটা কার পক্ষে লাকি, কোনটা নয়, কী করে জানা যাবে? কারো পরামর্শ তো লাগবেই। যে যত বেশি পঢ়ালিখা সে তত বেশি এই লাকি-আনলাকির বিষয়টাতে অবুঝ। তার কাছে কেউ সুঝাও চাইবে কেন?

    ব্যাপারটা অবাস্তব হলেও এবার আর অবিশ্বাস করতে পারছিলাম না। শিক্ষিত কেউ শিমলিপুরে ভুল করে ঢুকে পড়লে বিলিয়ার্ড বলের মতো ছিটকে বেরিয়ে যায়, কিন্তু গোটা দিল্লীর ক্র্যাকপট ধুর্‌রা জনতা তাদের লাকি প্যাটার্নের হদিশ বেওকুফাবাদ ছাড়া আর কোথায় পাবে?

    মুক্তাজীর বিষয়ে কিছুই জানতাম না। আজ অনেকগুলো স্তর আমার কাছে উন্মোচিত হচ্ছিল। নানারকম সমস্যার মধ্যে থেকেও একটা চরম প্রশান্তি আর নির্জনতার ছাপ লক্ষ করছি তাঁর মুখে। যেন নিজের সম্পূর্ণ ভবিষ্যত তিনি কোনো দিব্যচক্ষু দিয়ে শিশুকালে দেখে রেখেছিলেন। এখন যেটুকু অনিশ্চয়তা আছে সেটা উন্নীস-বীস।

    মাথা নাড়িয়ে যাচ্ছি কিন্তু কিছু বলছি না। আমি সবাইকে যতটা সম্ভব বিশ্বাস করি বলে সারাক্ষণ একটা উদ্বেগ আর আশঙ্কা নিয়ে থাকি। কে কখন কোন ধুর্‌রা স্কীমে ঢুকিয়ে ধড়াম করে দরজা বন্ধ করে দেয়।

    মুক্তাজী আঙুল নেড়ে বললেন - যত দূরেই যাস, তোকে একদিন ফিরতে হবে। যেদিন ফিরবি সেদিন আমি তোকে বলে দেব তোর কীসের গাইড হওয়া উচিত।


    টোটোদার জন্য অপেক্ষা করতে করতে অনেকক্ষণ গল্প করে যাই আমরা। মুক্তাজীর বাড়ি ফেরার সময় হয়ে যাচ্ছিল। বইগুলো ইশ্যু করে দেবার জন্য তিনি লাইব্রেরীর দিকে ফিরে চললেন। পিছু পিছু গিয়েছিলাম আমি। টোটোদার কোনো পাত্তা নেই। নাম ধরে ডাকতে ডাকতে লাইব্রেরীর ভিতর দিকে যাচ্ছিলাম আমরা। হঠাৎ মুক্তাজী বললেন – এই দ্যাখ, কাণ্ড।

    উঁকি মেরে দেখি দুটো র‍্যাকের মাঝখানে গলির ভিতর জানালা দিয়ে বিকেলের ত্যারছা রোদ আসছে। সেখানে জমির উপর লম্বা হয়ে শুয়ে টোটোদা অঘোরে ঘুমোচ্ছিল। হালকা হালকা নাক ডাকছে। মুখে অনির্বচনীয় পুলক। - সারারাত জেগেছে নাকি? গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন মুক্তাজী।

    আমি ভাবছিলাম তিন মাস এই বেওকুফাবাদের আলো আর হাওয়া থেকে দূরে ছিল টোটোদা। তার মধ্যে সে কি একদিনও ভালো করে ঘুমোতে পেরেছিল?


    বেওকুফাবাদে একটা বিকেল

    পরের দিন পম্পা চণ্ডীগড় থেকে ফিরল। ঠিক হয়েছিল শিমলিপুরের পূজো পাণ্ডেলটা কতদূর তৈরি হল আমরা দুজন গিয়ে দেখে শুনে আসব।

    মল রোডে বাস থেকে নেমে আমরা শিমলিপুর রোড ধরি। আমার বান্ধবী আজ সিখনীদের মতো মাথায় কাপড় দেয়নি। ভাবছি এইভাবে চললেই ভালো। যেখানে যেমন সেখানে তেমন। দিল্লীতে কিছুদিন থাকলে হয়তো হাইস্কুলের পুরোনো পম্পাকে আবার ফিরেও পেতে পারি।

    শিমলিপুরের প্রতিমার মুখ উলটোদিকে ঘোরানো। প্যাণ্ডেল পুরোপুরি তৈরি হয়নি। মাটিতে ধুলোর উপর শালের বল্লি ডাঁই করে রাখা। আগে এখানে নেউলেদা সর্বেসর্বা ছিল। এলেই তাকে দেখতে পাওয়া যেত। এবার জায়গাটা একেবারে ফাঁকা। পম্পা খুব ভক্তির সঙ্গে মণ্ডপকে প্রণাম করল। আমি পাশে দাঁড়িয়ে খোশ মেজাজে চুলের গন্ধ শুঁকছি।

    কিছুক্ষণ পরে টের পাই আমার সঙ্গিনী বিড়বিড় করে কী সব বলছে। প্রথমে ভেবেছিলাম প্রার্থনা বা স্তব। কথাগুলো শুনে বুঝলাম তা আসলে আমাকে উদ্দেশ্য করে বলা। তবে হাতজোড় করে মুখ ওইদিকে ফিরিয়ে রেখেছে কেন?

    - একটা কাজে তোর একটু সাহায্যের প্রয়োজন, জয়।

    - কী কাজ?

    - যে কাজটার জন্য গাইডেন্স নিচ্ছি।

    আবার কী শুরু হল? বেকুবের মতো বলি - কার গাইডেন্স? আচার্য ধনকারী?

    - আমি জানি না কার কথা বলছিস তুই। পম্পা এখনও হাতজোড় করে চোখ বুজে ছিল। - আমি ঠাকুরের কাছ থেকে গাইডেন্স পাই।

    - বাট হাউ? কোথায় ঠাকুর? প্রতিমা তো দেখাই যাচ্ছে না।

    - সে তুই বুঝবি না। তুই আমার কথামতো কাজটা করে দিবি তো?

    - কাজটা কী? চোখ বন্ধ করেই বা কথা বলছ কেন?

    - ‘হ্যাঁ’ না ‘না’?

    - হ্যাঁ। করে দেব।

    আরো খানিকক্ষণ চোখ বুজে শিমলিপুরের ভাগ্যদেবতাদের গাইডেন্স নেবার পর বান্ধবী ঘাড় ঘোরাল। - হয়ে গেছে, চল।


    প্যাণ্ডেল থেকে বেরোবার পথে আরেক বিপত্তি। ডান দিকের কোণ থেকে রক্ত জল করা দৃষ্টি নিয়ে হেরম্ব জ্যাঠা আমাকেই দেখছেন। মুখোমুখি পড়ে গিয়ে আমি পম্পার শরীরের আড়ালে লুকোতে চেয়েছিলাম। লাভ হল না। হেরম্ব জ্যাঠা হাতছানি দিয়ে আমাকে ডাকলেন।

    বিড়বিড় করে সঙ্গিনীকে বললাম – তুমি বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করো। খবরদার আমার দিকে তাকিও না।

    মুহতরমাকে রওয়ানা করে দেবার পর হেরম্ব জ্যাঠার দিকে পা বাড়াই। বাঙালদের প্রথমেই অ্যাটাক করা ভালো, নইলে তারা পিছোয় না। এ সব বাড়িতে শেখানো হত আমাদের। কাছে গিয়ে এক গাল হেসে বললাম - কী ব্যাপার জেঠু, পূজো এখনো শুরু হল না? তিথি কনফার্ম্‌ড্‌ তো?

    হেরম্ব জ্যাঠা পান চিবোচ্ছিলেন। আমার প্রশ্নে টাল না খেয়ে বিকৃত মুখে বললেন – ছেমরিটা কে?

    - ছেমরি? কোথায় ছেমরি? এদিক ওদিক তাকিয়ে জিজ্ঞেস করি।

    - যার গায়ে গা ঠেকাইয়া তুই দাঁড়ায়ে ছিলি।

    উফ্‌, এই বুড়োদের চোখ কোনো ছেমরি এড়াতে পারে? বললাম - ওঃ উনি? আমাদের গেস্ট। বাইরে থেকে এসেছেন। আমায় ডেকে বললেন প্যাণ্ডেলটা কোথায় দেখিয়ে দেবে? আমি বলেছিলাম ভালো জায়গা নয়, কেউ যায় না। আপনিও যাবেন না। কথা না শুনলে কী করব বলুন? শিমলিপুর আগের মতো আনপপুলার নেই আর।

    - সবাইরে ছাইরা তর মতো বান্দররে ধরল ক্যান? তরে দেখতে ভালো?

    একটু ক্ষুব্ধ ভাব দেখিয়ে বলি – কী করে জানব? গিয়ে জিজ্ঞেস করে আসছি। বলব হেরম্ব জেঠু জানতে চাইছেন আপনি সবাইকে ছেড়ে…।

    - থাক, থাক। প্যাণ্ডেল দেখাইতে কইছে, দেখায়ে দিছস। গায়ের সঙ্গে লাইগ্যা দাঁড়াইবার কী প্রয়োজন?

    বিরক্তি প্রকাশ করে বললাম - আঃ গায়ে গা লাগবে কেন? এখান থেকে আপনি বুঝতে পারছেন না। প্যারাল্যাক্স বলে একে। আকাশের তারা দেখলে মনে হয় না সব একই দূরত্বে একটা চাঁদোয়ায় লাগানো আছে? এটা সেরকম।

    - অ আমার চাঁদোয়ায় সাঁইট্টা তারা রে। দেখস, পইরা হাড়গোড় না ভাঙে।

    - জেঠু, আমি ভদ্রমহিলাকে ডেকে দিচ্ছি। আপনি জেরা করে যা জানার জেনে নিন। শিমলিপুরে বাইরে থেকে যে কটা লোক আসে এর পর তারাও আসবে না।

    - যা, তুই। দফা হ। আমার কাউরে জেরা করতে লাগব না। দুলকে আমি গিয়া কমু তার পোলা কীর’ম কথা শিখছে।

    স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে যেতে উদ্যত হয়েও থেমে গিয়ে বলি - জেঠু, বাড়িতে যদি আমাকে অপদস্থ করেন তাহলে এই আধ-খেঁচড়া প্যাণ্ডেলে দাঁড়িয়ে দিব্যি করছি মেজমা আর মাকে বলব আপনাকে লুচির একটা টুকরোও দেওয়া হলে আমি তাদের হাতের রান্না খাব না।

    চলে যাচ্ছিলাম। পিছন থেকে আওয়াজ এল। - লোক নাই, শুয়ার। ট্যান্ট খারা করব কে? তর মামায়?

    স্পীড না কমিয়ে বলি - সন্ধ্যের পর আসব। টোটোদাকে নিয়ে।

    ***

    প্যাণ্ডেল থেকে বেরিয়ে পম্পাকে কবজা করার পর প্রায় টেনেই দুর্গাপূজোর চৌহদ্দি থেকে দূরে নিয়ে যাচ্ছিলাম। পম্পা বলে – টানছিস কেন? লোকটা কে বলতো? ছন্নছাড়া চেহারা। স্পষ্ট দেখেছি আমার দিকে চোখ পাকাচ্ছিল। যেন ভস্ম করে দেবে।

    - স্ট্রে ডগ। স্ট্রে ডগ।

    - হোয়াট?

    পম্পাকে বললাম – ইনি কলোনির ঐতিহ্যের বাহক। জাগ্রত বিবেক। বাঙাল এবং অকৃতদার। কোনো পরিবার-টরিবার নেই। তুমি ঠিকই ধরেছ, আমাদের দিকে চোখ পাকাচ্ছিলেন। কিন্তু আমরা যদি এরকম একটা প্রাণীকে আশ্রয় না দিই তো কে দেবে, বলো?

    পম্পা আমার সঙ্গে ছুটতে ছুটতে বলল – ইস্‌, এই বয়সেও একা? কেন রে?

    - খুবই দুঃখের গল্প, বান্ধবীকে বললাম আমি। - হেরম্ব জ্যাঠা জোয়ান বয়সে দেখতে ভীষণ ভালো ছিলেন। পড়াশোনাতেও ভালো। এক সহপাঠিনীর সঙ্গে তাঁর প্রেম হয়। সহপাঠিনীর শর্ত ছিল বিয়ে করতে চাইলে পাত্রকে তার চেয়ে অন্তত ছ ইঞ্চি লম্বা হতে হবে। পাত্রী নিজে ছিল মেরে-কেটে পাঁচ ফুট, কিন্তু দেখা যায় হেরম্ব জ্যাঠাও মাত্র পাঁচ সাড়ে পাঁচ। আধ ইঞ্চির ঘাটতি।

    - তুই কি সিরিয়াস? আধ ইঞ্চি হাইটের জন্য একটা মানুষকে বাতিল করে দিল? এরকম মেয়েকে তো ছাড়াই উচিত।

    - অত সহজে হেরম্ব জ্যাঠাকে বাতিল করা যায় না। তিনি এক বছর সময় চেয়েছিলেন। সেই বছরটাতে রাত দিন সাঁতার কেটে আর যোগাভ্যাস করে আধ ইঞ্চি উচ্চতা বাড়িয়ে ফেলেন। তারপর বিয়ের যখন সব ঠিকঠাক তখন পাত্রী অন্য একজনের সঙ্গে পালিয়ে যায়। সেই নতুন প্রেমিকের হাইট আন্দাজ করতে পারবে তুমি?

    - ওঃ মাই প্রভু!

    - ঠিক। পাঁচ তিনও নয়। শজারুর কাঁটার মতো দাড়ি। পাটকাঠির মতো চেহারা। ম্যাট্রিক ফেল। বেসিকালি গঙ্গারাম।

    - দেন হোয়াই? ছুটন্ত মুহ্‌তরমা ব্যগ্র হয়ে জানতে চায়।

    - তুমি বিশ্বাস করবে না, কারণ হল একটা সুগন্ধ। বডির ওডর। যারাই সেই লোকটাকে দেখেছে তারা বলে তার গা দিয়ে একটা আশ্চর্য রকমের আকর্ষণীয় গন্ধ পাওয়া যেত। নাকে এলে মানুষ বুঁদ হয়ে যায়। গন্ধটা কেমন জানো? অনেকটা খুব দূরের কোনো নির্জন কিন্নরদের দেশে বিকেলের আলোয় চোবানো রহস্যময় অরণ্যের মতো।

    পম্পা থেমে যায়। ফলে আমাকেও থামতে হল।

    - হোয়াট অন আর্থ…! দু-হাতে মুঠো পাকিয়ে বলে সে। - বজ্জাত, আবার বানাচ্ছিস! কিন্নরদের দেশে বিকেলের আলোয় চোবানো অরণ্যের কীরকম গন্ধ সেটা তুই জানলি কী করে?

    বান্ধবীর ঘুঁষির রেঞ্জ থেকে আধ ইঞ্চি দূরে গিয়ে বলি - কারণ তোমার গা থেকে এতক্ষণ আমি সেই গন্ধটাই পাচ্ছিলাম।


    (অপ্রকাশিত উপন্যাস থেকে)

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments