• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৩ | জুলাই ২০২৬ | ভ্রমণকাহিনি, প্রকৃতি, বাকিসব
    Share
  • অ্যামালফি একটি অর্কেস্ট্রার নাম : কৌশিক সেন

    Sweet the memory is to me
    Of a land beyond the sea,
    Where the waves and mountains meet;
    Where amid her mulberry-trees
    Sits Amalfi in the heat,
    Bathing ever her white feet
    In the tideless, summer seas.

    (Masque of Pandora and other poems, Henry Wordsworth Longfellow, 1875)

    রমণীয় ইটালির দক্ষিণ প্রান্তে পাহাড় এবং দ্বীপমালা শোভিত একফালি উপকূলের নাম কোষ্টা-ডি-অ্যামালফি। ভূমধ্যসাগরের এই অংশটির নাম টাইহেরিয়ান সী, সেখানে ঘননীল জলের মধ্যে যত্রতত্র মাথা তুলে আছে ডোলোমাইট চুনাপাথরের, স্তম্ভ, খিলান এবং গুহাপথ। খাড়াই পাহাড় ধাপে ধাপে নেমে এসেছে সুচারু বেলাভূমিতে, রাত্রে সেই পাহাড়দের গায়ে গায়ে লক্ষ প্রদীপের আলো জ্বলে ওঠে, বিমুগ্ধ পর্যটকের মনে হয় সে বুঝি গ্রহান্তরের কোনো অপার্থিব পরিবেশে সশরীরে এসে হাজির হয়েছে। প্রেমিক প্রেমিকারা কথা হারিয়ে ফেলে, সুবাসিত সমুদ্রের হাওয়া তখন নিয়ে আসে এক অদ্ভুত, আবিল নীরবতা।


    শিল্পীর তুলিতে অ্যামালফি কোস্ট

    ফটোগ্রাফ, আঁকা ছবির মতোই

    যাদের বেড়ানোর নেশা আছে তাঁরা সকলেই উত্তর ইটালির নামজাদা শহরগুলোর সঙ্গে অল্পবিস্তর পরিচয় আছে, যেমন নাকি রোম, ফ্লোরেন্স, মিলান এবং আরো উত্তরে ভেনিস। এই যাত্রায় আমাদের গন্তব্যস্থল দক্ষিণ ইটালির ক্যাম্পানিয়া প্রদেশের প্রধান শহর নেপলস বা নাপোলি। ইউরোপ আমেরিকার বড়ো শহরগুলো থেকে এখানে সরাসরি উড়ে আসা যায়, ভারতীয় যাত্রীরা দিল্লী, মুম্বাই, আমেদাবাদ বা হায়দ্রাবাদ থেকে সহজেই এখানে পাড়ি জমাতে পারেন। নেপলস শহর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অপরূপ হলেও ভিড়ভাট্টার ফলে জায়গায় জায়গায় বেশ নোংরা। পাথুরে বেলাভূমিতে ঢেউরা আছড়ে পড়ছে, চারপাশে সারি সারি রেস্টুরেন্ট, ভূমধ্যসাগরীয় আবহাওয়া বছরের বেশিভাগ সময়েই চমৎকার তাই খেতে বসার ব্যবস্থা বাইরেই। রান্নাঘর থেকে রকমারি পাস্তা, রিসোতো বা রাভিওলি আসছে, তার মধ্যে ঠাসা গরু-শুয়োর তো বটেই, তার সঙ্গে টাটকা মাছ, চিংড়ি কাঁকড়া, গেঁড়ি, গুগলি, অক্টোপাসের শুঁড় ইত্যাদি সবই মজুত এবং বলাবাহুল্য ওয়াইনের স্রোত বয়ে যাচ্ছে চব্বিশ ঘণ্টা। ট্যুরিস্ট বোঝাই এই শহরে রয়েছে একাধিক মধ্যযুগীয় কেল্লা, অঢেল দোকানপাট আর পাথরে বাঁধাই পুরনো রাস্তা। সমুদ্রতীরে মাথা তুলে তাকালেই দেখতে পাওয়া যায় ভয়ঙ্কর সুন্দর ভেসুভিয়াস আগ্নেয়গিরি, যার অন্যপ্রান্তে পম্পেই আর হার্কুলেনিয়াম শহরের গায়ে কাঁটা দেওয়া খুবই জীবন্ত ধ্বংসাবশেষ। কিন্তু আমাদের এই ভ্রমণ কাহিনী থেকে ইচ্ছে করেই আমি নেপলস শহর, ভেসুভিয়াস আর পম্পেইয়ের গল্প বাদ রেখেছি, কেননা তাই নিয়ে একেবারে অন্যরকম আরেকটি কাহিনী লেখা উচিত, অ্যামালফি কোস্টের কাব্যময়তার সঙ্গে সেই ট্র্যাজিক ইতিহাস ঠিক খাপ খায় না। নেপলস থেকে একদিনের ট্রিপে ওই তল্লাট ঘুরে আসা যায় যদিও ঠিক করে দেখতে গেলে হপ্তাখানেক লেগে যাবে।


    নেপলস সমুদ্রতটে ক্যাস্টেল ওভো

    নেপলস থেকে ভেসুভিয়াস

    আঁকাবাঁকা এই উপকূলরেখা বেয়ে মোট তেরোটি ছোট ছোটো শহর আর গ্রামকে যুক্ত করেছে একটি নিখুঁত সুন্দর সড়ক ব্যবস্থা (হাইওয়ে A3 & SS145) যার কল্যাণে এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যে গাড়ি নিয়ে নেপলস থেকে উপকূলের যে কোনো এলাকায় পৌঁছে যাওয়া যায়। ওয়াকিবহাল মহল অবশ্য ট্যুরিস্টদের গাড়ি ভাড়া করতে মানা করেন। হাইওয়েটির খাড়াই উৎরাই বেশ গোলমেলে, তার ওপর ট্র্যাফিকের ভিড়, পার্কিং স্পেসের অভাব এবং সর্বোপরি এই তল্লাটে পেশাদার গাড়িচোরদের প্রবল উৎপাত। ড্রাইভার জোগাড় করতে পারলে ভালো, তাহলে পিছনের সিটে গা ছেড়ে দিয়ে বসে, নয়নাভিরাম পথশোভা উপভোগ করতে করতে গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়া যায়। ব্যক্তিবিশেষে ঠিক সময়ে বমি তাড়ানো ট্যাবলেটটি খেয়ে নিলে আরো ভালো লাগে। অন্যথা নেপলস থেকে ফেরিবোট ধরে উপকূলের যে কোনো শহরে পাড়ি দেওয়া সম্ভব কেননা ওই ক্ষুদে ক্ষুদে শহরগুলো প্রধানতঃ জলপথেই একে অপরের সঙ্গে চমৎকার যোগাযোগ রেখেছে। অ্যামালফি কোস্টের সবটুকু তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে হলেও মাসখানেক সময় হাতে নিয়ে আসা উচিত, কিন্তু সত্যি বলতে কি সবকিছু না দেখলেও চলে। স্বর্গের এপাড়া আর ওপাড়ায় কীই বা তফাত আছে? তাই সীমিত সময় হাতে নিয়ে আসা পর্যটকদের জন্য কোনো একটা শহরে রাত্রিবাসের জন্য ঘাঁটি গাড়া সুবিধাজনক। সেখান থেকে অনায়াসেই গাড়ি কিংবা ফেরি নিয়ে ইচ্ছেমতন অন্যান্য জায়গায় ডে ট্রিপ মারা যায়। আমার মতে কমপক্ষে পাঁচটি শহর ছুঁয়ে দেখা জরুরি- রাভেলো, অ্যামালফি, পসিটানো, সোরেন্টো এবং ক্যাপ্রি। অবশ্য রুচিবিশেষে মতভেদ থাকতেই পারে। কমসংখ্যক কিছু হাঁদা টাইপের লোক এখনও টিঁকে আছে যাদের নাকি এমন জমজমাট ট্যুরিস্টের ভিড়, সংখ্যাহীন এই সব বিপণির আলো-আঁধারি, সমুদ্রতটে বিকিনিদের প্রাণঘাতী প্রতিযোগিতা এবং রাস্তাঘাটে মদের ফোয়ারায় বিলক্ষণ অরুচি। তাঁরা অবশ্যই খুবই নিরিবিলি ও প্রাচীন একটি মৎস্যজীবী গ্রাম বেছে নেবেন, যেখানে সেই অগাস্টাস সীজারের আমল থেকে জীবনধারা খুব একটা কিছু বদলায়নি। আমাদের সে কপাল কোথায়?


    রাভেলো

    অ্যামালফি

    ছবিগুলো এক পলক দেখলেই বোঝা যাবে যে অ্যামালফি কোস্ট আসলে একক এবং অবিচ্ছিন্ন এক সঙ্গীতময় ল্যান্ডস্কেপ। এখানে সবুজ পাহাড়, টারকয়েজ সমুদ্র, নীলের কোলে সাদা মেঘ, যত্রতত্র ফুলেদের জলসাঘর আর টাটকা লেবুর সুগন্ধ মিলিয়ে জমজমাট। হাওয়ায় কোত্থেকে যেন এক নামহীন সিম্ফনি বাজছে, কান পাতলেই পরিষ্কার শোনা যায় সেই মিলিত সুরের ঝংকার। এসবের মাঝে ক্ষুদে ক্ষুদে শহরগুলো তাদের হোটেল, দোকানপাট এবং অগ্নিমূল্যের আতিথেয়তা নিয়ে হাজির। ভাবটা এই যে ওরা নেহাত কৃপাবশতঃ দুনিয়ার হতভাগাদের জন্য এই স্বর্গীয় নির্ঝর থেকে কমসে কম এক আঁজলা জল খেয়ে ধন্য হবার সুযোগ করে দিচ্ছে।

    আমরা ঘাঁটি গেড়েছিলাম পসিটানো শহরে। গাড়িতে আসার সময় অ্যামালফি শহরে অনেকটা সময় কেটেছে, ওখানে থেকে যাবার ইচ্ছে উবে গেছে তখন থেকেই। এমন সুন্দর জায়গাটা ট্যুরিস্টের ভিড়ে ভিড়ে ভিড়াক্কার, চতুর্দিকে অজস্র বার, রেস্তোঁরা, স্যুভেনিরের দোকানে চেল্লাচেল্লি এবং পুরো মুড বরবাদ। তার মধ্যেই ডুমো-ডি-অ্যামালফি ক্যাথিড্রালটা যেন পাহাড়ের কোলে আকাশের পটে আঁকা ছবির মতন দাঁড়িয়ে আছে, মানুষের কোলাহল ওখানে গিয়ে আপনা থেকেই স্তব্ধ হয়ে যায়। এ ক্যাথিড্রালও নানান শৈলীর এক অদ্ভুত অর্কেস্ট্রা- আরব, নরম্যান, গথিক, রেনেশাঁস, বারোক, বাইজেন্টিন, কি নেই এখানে?


    অ্যামালফি ক্যাথিড্রাল

    অ্যামালফির বিখ্যাত লেবু

    অ্যামালফি নৌকোঘাট

    মেঘলা সন্ধ্যায় অ্যামালফি শহর

    তবে একটা কথা মানতেই হয় যে বালুকাবেলায় ঠিকঠাক একটি নাম লেখার মতন লম্বাচওড়া বেলাভূমি এ তল্লাটে যা দেখেছি, অ্যামালফি তার মধ্যে নিঃসন্দেহে সেরা। হয়তো সেইজন্যেই এত হাড্ডাহাড্ডি ভিড় আর হোটেলের ভাড়া দৈনিক ন'শো থেকে শুরু করে হাজার তিনেক ডলার ছুঁয়ে যায়। আমি নমস্কার করে মানে মানে কেটে পড়লাম।

    পসিটানো শহরটা সমুদ্র থেকে আকাশের দিকে খাড়াই উঠে গেছে সাত পাহাড়ের চূড়ায়। মন্টে-সান-মাইকেল দাঁড়িয়ে আছে ১৪৪৪ মিটার উঁচুতে, তার মাথায় ফুঁয়ো ফুঁয়ো মেঘের ছানাদের দেখে অকারণেই দার্জিলিঙের কথা মনে আসে। আশেপাশেই রয়েছে পুন্টা-সাল-ল্যাজারো, মন্টে-ত্রে-কালি, মন্টে-ভিকো-অ্যালভানো, কাপো মিউরো ইত্যাদিরা। চুনাপাথরের এই নয়নাভিরাম পর্বতাঞ্চল দুনিয়া ঝেঁটিয়ে আসা হাইকার এবং বাইকারদের স্বর্গ। সেইসব চনমনে যুবক-যুবতীদের দেখে মন চঞ্চল হয়ে ওঠে, কিন্তু হাঁটুর প্রবল আপত্তির ফলে দূর থেকেই ওদের সেলাম জানাতে হয়। এই মেঘের রাজত্বে রাস্তারা যেখানে খোঁপার কাঁটার মতন বাঁক নিয়েছে, সেখানে থেকে অনেক নিচে চিকমিকে এক সোনালিপাড় নীল শাড়ির মতন ছড়িয়ে আছে সমুদ্র, তার গায়ে বুটি কাটা নৌকোগুলো।


    পসিটানোয় পাহাড়, সমুদ্র

    হাঁটু খুলে নেওয়া পাকদণ্ডী

    শহরটা যেহেতু মোটামুটি পাহাড়ের গায়ে ঝুলে আছে তাই এখানে সোজা রাস্তা বলে কিছু নেই, সর্বত্র কেবল ধাপ আর সিঁড়ি। সেই সব রাক্ষুসে সিঁড়ি ভেঙে পাহাড় থেকে সমুদ্রে নেমে আসতে না আসতেই ঝটপট চারদিকে গজিয়ে উঠবে নানারঙের মানুষের ঢল, দোকান বাজার, আর্ট গ্যালারি, রেস্টুরেন্ট। অ্যামালফি কোস্টে দেদার লেবু ফলে তদের সাইজ মোটামুটি ডাবের মতন। এই এলাকা নাকি লাল লঙ্কার জন্য বিখ্যাত, কিন্তু খাদ্যে ঝাল, নুন কিছুই নেই। ওই রাক্ষুসে লেবুর রস চোলাই করে যে পানীয়টি পয়দা হয় তার নাম লেমনচেলো। ওয়াইনের থেকে কড়া কিন্তু হুইস্কির তুলনায় হাল্কা এই লিকুওরটিকে প্রায়ই স্পার্কলিং ওয়াইনের সঙ্গে মিশিয়ে পরিবেশন করা হয় যার নাম লেমনচেলো ফ্রিৎজ। জমজমাট সমুদ্রতীরে সামুদ্রিক খাদ্য আর লেবু চোলাই করা পানীয় যেখানে সেখানে ফটাফট বিক্রি হচ্ছে। লেমনচেলোর গ্লাস কিংবা বিয়ারের বোতল হাতে নিয়ে বেবাক আনন্দে পায়চারি করছে টিপসি জনতা, কিন্তু গড়াগড়ি খাওয়া পাঁড় মাতাল কাউকে খুঁজে না পেয়ে আমি একটু হতাশই হলাম। এই চত্বরে গাড়ি চলে না, পুরোটাই আদ্যিকালের পাথরে বাঁধানো গলিঘুঁজি, সিঁড়ির ধাপে ধাপে ফুলের টব, হাতে আঁকা ছবি, স্যুভেনিরের দোকান, আর্ট গ্যালারি, এইসব। কোত্থেকে যেন ভেসে আসছে বেহালা বা স্যাক্সাফোনের সুর, তার সঙ্গে মিশেছে পাথরের ওপর আছড়ে পড়া ঢেউদের অন্তহীন কলরব।

    পসিটানোর বিখ্যাত ম্যারিনা গ্র্যান্ডে থেকে নৌকাযোগে উপকূলের সব জায়গায় যাওয়া যায়। সকাল থেকে রাত অবধি দৈত্যাকার ফেরিবোট, পালতোলা ক্যাটামেরান, দ্রুতগামী মোটর বোট আর ছিপছিপে ডিঙিনৌকো মিলিয়ে কয়েক হাজার জলযানের আনাগোনা এখানে। তারা সবাই বেলাভূমি থেকে একটু দূরে জলের মধ্যে নোঙর ফেলে ভাসমান, ডাঙায় বালির ওপর গুমটি বানিয়ে তাদের দালালরা খদ্দের পাকড়াতে শশব্যস্ত। এই সময় চুপি চুপি বলে রাখি যে অ্যামালফি কোস্টের সর্বত্র ফেরি সব থেকে সস্তা এবং নির্ভরযোগ্য বাহন, শুধু একটিই ব্যতিক্রম আছে, যার নাম ক্যাপ্রি দ্বীপ। ওখানে যেতে হলে ছোটো নৌকা নিয়ে যাওয়াই প্রশস্ত কেননা ক্যাপ্রির আশেপাশে তিনজন সমুদ্র দৈত্যের সঙ্গে আপনার মোলাকাত হয়ে যাবে এবং ছোটো নৌকা ছাড়া তাদের পেটের ভেতরে ঢোকা অসম্ভব। দৈত্যদের নাম যথাক্রমে স্টেলা, ডি-মেজো এবং ডি-ফুয়োরি, পরিবারের নাম ফ্যারাগ্লিওনি রক ফরমেশন। এরা সমুদ্রের মধ্যে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা, খেয়ালী প্রকৃতির নিজের হাতে খোদাই করা পাথরের ভাস্কর্য! ফেরিবোট থেকেও এদের দেখা মিলবে কিন্তু ছোটো নৌকায় কাছাকাছি গেলেই অপেক্ষা করে আছে আরো এক অবাক বিস্ময়!


    ক্যাপ্রি দ্বীপের ফ্যারাগ্লিওনি রক ফরমেশন

    রক্তিম (গ্রটো রোজা) গুহাপথ, ক্যাপ্রি

    আমি জিয়োলজিস্ট নই তাই সমুদ্র ফুঁড়ে ওঠা পাহাড়দের মধ্যে এমন অদ্ভুত গর্তেরা কেমন করে পয়দা হয়, তাদের মধ্যে কেনই বা এইরকম লাল, নীল, সবুজের মেলা বসে গেছে, এসব ব্যপারে সঠিক ধারণা দিতে আমি অক্ষম। বোটের কাপ্তান তার জগাখিচুড়ি ভাষায় কি সব বললো, চুনাপাথরের ক্ষয়, জলের মধ্যে খনিজ পদার্থ, রোদ্দুরের প্রতিসরণ, প্রবালের বাড়বাড়ন্ত ইত্যাদি কিছুই আমার মাথায় ঢুকলো না। ডাকাবুকোরা ডিঙি নামিয়ে জলকেলি অর্থাৎ স্নরকেলিং করতে গুহার মধ্যে সেঁদিয়ে গেল, আমি মুগ্ধ হয়ে সেই রঙের খেলার দিকে তাকিয়ে থাকলাম।

    ক্যাপ্রি শহরটা ছবির মতন সুন্দর কিন্তু উচ্চকোটির ট্যুরিস্ট এবং তাদের সূক্ষ্ম রুচির সঙ্গে মানানসই রকমারি মহার্ঘ দ্রব্যের খোলা বাজার। সেই রোমান আমল থেকে অভিজাত ভদ্রলোকেরা এখানে ছুটি কাটাতে আসছেন, এখানকার রাস্তাঘাট বাগান আর ভিলা, সবই যেন এক অলৌকিক সুখের আলোয় উজ্জ্বল। এই দ্বীপের সিক্ত বাতাস শুধু নবীন প্রেমের নেশা আর ফুলের গন্ধে মাতাল মধুযামিনীর গল্প বলে। একটু দূরেই আসল পৃথিবীটায় যে এত রকমের নোংরামি, বিপন্নতা, দারিদ্র, হিংস্রতা আর ক্ষুধা জমে রয়েছে, এই দ্বীপের অগাস্টাস গার্ডেনে বসে তার পাত্তা খুঁজে পাওয়া মুশকিল। নাকি ফনের দিবাস্বপ্নের মতন, এটাই আসল সত্যি, বাকি পৃথিবীটা দুর্বিষহ মাতালের প্রলাপ! ভোজবাজির মতন মনে পড়ে গেল কবেকার পড়া সেই কবিতা।

    কিন্তু বাক্য, বিমুক্ত হৃদয় তথা গুরুভার দেহ,
    হার মানে শেষে মধ্যাহ্নের উদ্ধত মৌনের কাছে,
    আর নয় দেবনিন্দা,
    স্মরণের আনাচে কানাচে তন্দ্রা জমে।
    পাতি শয্যা তবে রুক্ষ এই বালিতে এবার,
    এবং সুরার পাত্র, জন্মপত্রে যে গ্রহ প্রবল,
    তার নিচে শুই।
    (ফনের দিবাস্বপ্ন; স্তেফান মালার্মে; অনুবাদ সুধীন্দ্রনাথ দত্ত)


    ক্যাপ্রি --অজস্র ফুলবাগান

    ক্যাপ্রি --রোমান স্থাপত্য

    এইভাবেই দু'সপ্তাহ কেটে যায়, আমিও ধীরে ধীরে এই অর্কেস্টার একটি তার হয়ে উঠি। ইতিমধ্যে সোরেন্টো এবং রাভেলো ঘুরে আসা হয়েছে। নতুন করে বলার বিশেষ কিছু নেই শুধু দেখা গেল সোরেন্টো শহরের হোটেল ভাড়া এবং মালপত্রের দাম অপেক্ষাকৃতভাবে সস্তা। চুপিচুপি বলে রাখা ভালো যে পসিটানো, ক্যাপ্রি বা অ্যামালফির এক্সক্লুসিভ হোটেলগুলো, যাদের লাগোয়া প্রাইভেট বীচ আছে, তাদের দৈনিক ভাড়া চার হাজার ডলার থেকে শুরু। দেশবিদেশের সেলিব্রিটিরা সেখানে থাকেন, বিয়েপত্তর করেন, জলে ইয়ট, ডাঙায় পোর্শ, ফেরারি বা ল্যাম্বারগিনি হাঁকিয়ে ঘুরে বেড়ান। যথারীতি তাঁদের পেছনে ধাওয়া করে ভক্তবৃন্দ এবং পাপারাৎসিদের দলবল। এইসব হাঙ্গামা সামলে তাঁরা যদি অ্যামালফি উপকূলের এই অনামী অর্কেস্ট্রায় সুর মেলাতে পারেন তাহলে তাঁদের জন্য রইলো আমার অভিনন্দন, যদি না পারেন তবে সে বড়ই দুঃখের কথা।

    অনেকেই সমুদ্রতীরে এসে সমুদ্রে স্নান করতে চান। বলে রাখা ভালো যে এখানকার বেলাভূমিতে প্রায় সর্বত্র বীচ ক্লাব আছে, সেখানে দুটি চেয়ার এবং একটি ছাতার দৈনিক ভাড়া মাত্র ৭০ ডলার! এদিক ওদিক ফাঁকেফোকরে গিয়ে বিনাপয়সায় সমুদ্রস্নান করা সম্ভব কিন্তু তার জন্য চড়াই-উৎরাই ভাঙতে হবে অনেকটা। তাছাড়া এই সব বীচে নুড়ি ও কাঁকর প্রচুর, তাই খালিপায়ের বদলে ওয়াটার শু পরে নামা উচিত। গোয়া, ক্যারিবিয়ান বা হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের মতন মিহি মোলায়েম বেলাভূমি এই চত্বরে আশা করলে ঠকে যাবেন।

    জীবনের সব অর্কেস্ট্রাই এক সময় স্তব্ধ হয়, প্রেক্ষাগৃহ থেকে ফিরে যেতে হয় পরিচিত পৃথিবীর কোলাহলে। প্লেনে ওঠার আগে চুপিচুপি আমার জীবনদেবতাকে আরেকবার কুর্নিশ জানালাম। তিনি যে আমাকে এই আকাশ-পাহাড়-সমুদ্রতটের অর্কেস্ট্রা শোনার কান দিয়েছেন তাই যথেষ্ট, তাঁর কাছে আমার দ্বিতীয় কোনো প্রার্থনা নেই। বাকি উৎপাত আমি নিজেই সামলে নিতে পারবো। ও রিভোয়া, অ্যামালফি।

    জুন, ২০২৪



    অলংকরণ (Artwork) : ছবি: লেখক
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments