• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৩ | জুলাই ২০২৬ | গল্প
    Share
  • ঋণ : দেবাশিস দাস

    দরজা খুলতেই ঘরের ভেতর ঢুকে এল একঝলক স্যাঁতসেঁতে হাওয়া আর মাথার জল ঝাড়তে থাকা এক অচেনা মানুষ। বারান্দায় দরজা ঘেঁষে জলঝরা ছাতাটা রেখে লোকটা যখন স্পষ্ট পূর্ববঙ্গীয় টানে শুধাল—'দিলু আছে বাড়িতে?', একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা আকর কিছুটা থমকে গেল। একমাত্র বড় পিসি ছাড়া বাবাকে এই নামে ডাকতে সে কাউকে শোনেনি। হাঁটু অবধি তোলা ধুতি আর আধময়লা ফুলহাতা জামা পরা এই মানুষটা কোনোভাবেই বাবার ছিমছাম বন্ধুতালিকার সঙ্গে মেলে না। আকর যখন লোকটার চোরকুঠুরির মতো চোখের চাউনি আর বাবার ঝকঝকে চেহারার টানাপোড়েন মেলাতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই পেছন থেকে বাবার গম্ভীর গলা ভেসে এল, 'আরে তারক এসেছিস? আয় আয়, বোস।’

    ‘আকর তুই ভেতরে যা, মাকে বল কাকুর জন্য একটু চা জলখাবার বানাতে।'

    বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ড্রইংরুমের সোফায় জড়সড় হয়ে বসে আধময়লা জামা পরা মানুষটা বাবার দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল, 'তোকে তো বলেইছিলাম দিলু, বিপদ বোধহয় আর আটকাতে পারব না।'

    কলেজের দেরি হয়ে যাচ্ছে, তাই রান্নাঘরে মাকে খবরটা দিয়েই স্নানের জন্য বাথরুমে ঢুকলো আকর।

    পরের শনিবার সকালেই বাবা বললো ‘আজ তো তোর কলেজ ছুটি, একটা জায়গায় যেতে হবে। কুসুমপুর। একটা প্যাকেট দিয়ে আসতে হবে তারককাকুকে। সেই যে গতসপ্তাহে এসেছিল।’

    সেদিন তারককাকু চলে যাবার পর বাবা চুপ করে জানালার দিকে তাকিয়ে ছিল বেশ কিছুক্ষণ। তারপর বলেছিল, 'জানিস আকর, তারক বাংলাদেশে আমার সঙ্গেই পড়ত, পাশাপাশি বাড়ি। বর্ষায় একই নৌকোয় স্কুলে যেতাম আমরা।' একটু থেমে বলেছিল, 'সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগাতে ভিটেমাটি ছেড়ে এ দেশে চলে এসেছিলাম সবাই।’

    বাবা সাধারণত এত কথা বলে না, কিন্তু সেদিন বাবা মৃদুস্বরে বলেই যাচ্ছিল, যেন আকরকে নয় নিজেকেই শোনাচ্ছিল-

    ‘এদেশে এসে আমার যা হয়েছে, ওর তা হয়নি। বিভিন্ন রিফিউজি কলোনি থেকে রেলবস্তি, বস্তি থেকে কুসুমপুরে নিজেদের ছোট্ট ডেরা — অনেকটা পথ ও একা হেঁটেছে, এখনও লড়াই করে চলেছে। অবশ্য আমাদের মধ্যে কোন যোগাযোগই ছিল না এতদিন। হঠাৎই কয়েকদিন আগে শিয়ালদা স্টেশনে ওর সঙ্গে দেখা হল। এদেশে আসার এতগুলো বছর পর।’

    আকর জানে এদেশে এসে বাবার বিশেষ অসুবিধা হয়নি, কারণ দাদুর এক প্রভাবশালী বন্ধু ছিল এখানে, যার পরিবার দেশভাগের সময়েই এদেশে চলে এসেছিল। সব বন্দোবস্ত সেই মানুষটিই করে দিয়েছিল--বাবাদের বাসস্থানের ব্যবস্থা, স্কুল, পরবর্তীকালে কলেজ, এমনকি বাবার চাকরি ইত্যাদিরও। এখন অবশ্য উনি সম্পর্কে আকরের দাদু অর্থাৎ মায়ের বাবা।


    ***

    লোকে বলে কুসুমপুর স্টেশনের চারপাশটা একেবারেই বদলে গেছে। আট-দশ বছর আগেও যারা এখানে এসেছে তারাও কিছু মেলাতে পারবে না। সেই পুরনো নির্জন স্টেশনটা আশপাশের বাজার হাটের ভিড়ে হারিয়ে গেছে। স্টেশন থেকে বেরিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার লম্বা একটা হাইওয়ে কানেক্টর রাস্তা তৈরি হয়েছে। আর কাছে হাইওয়ে থাকাতে সেই কানেক্টর রাস্তার দুপাশে অনেকগুলো হাইরাইজ বিল্ডিং, হাউসিং ও মল গজিয়ে উঠেছে। মানুষের ভিড়ে এখানে হাঁটাই এখন বেশ কষ্টকর।

    একটা টোটো চেপে কানেক্টর রাস্তা থেকে অনেকটা ভেতরে ঢুকে তবেই গ্রাম গ্রাম ভাবটার দেখা মিলল। বাঁশের বেড়া দেওয়া এক চিলতে উঠোন পেরিয়ে একটা টিনের চালের বাড়ির সামনে এসে পৌঁছল আকর। কড়া নাড়তেই দরজা খুলে দাঁড়াল চার-পাঁচ বছরের এক শিশু।

    'বাড়িতে বড় কেউ আছে?' আকরের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগেই ঘরের ভেতর থেকে একটা রুগ্ন, খসখসে মহিলাকণ্ঠ ভেসে এল, 'কে এসেছে রে মনা? কার সাথে কথা বলছিস?'

    আকর একটু গলা চড়িয়ে বলল, 'আমি তারকনাথবাবুর স্ত্রীর খোঁজে এসেছি। দিলীপবাবুর ছেলে।'

    ভেতরের কাশিটার শব্দ একটু থমকে গেল। তারপর জড়ানো গলার আওয়াজ ভেসে এল, 'ভেতরে আসুন।'

    ঘরে ঢুকেই আকর দেখল একটা বড় তক্তপোষে শুয়ে আছে এক বয়স্কা মহিলা। সে-ই কথা বলছিল। আকরকে দেখে জিজ্ঞাসু চোখে উঠে বসল।

    অবাক হল আকর। এই মহিলাটি যেন এই দীর্ণ ঘরে একটা পুরনো, ভাঙা অথচ অভিজাত আসবাবের মত বিরাজ করছে। গায়ের রং, নাক, চোখ, আঙ্গুলের গড়ন, সুডৌল নিরাভরণ হাত যেন অন্য কোন জীবনের স্মৃতি বহন করছে। আকর নিজের পরিচয় দিয়ে বিছানার পাশের চেয়ারটাতে বসল।

    ‘আমার বাবা তারককাকুর ওপার বাংলার বন্ধু ছিল। কাকু ওনাকে “দিলু” বলে ডাকত।’

    ‘ও তুমি দিলু-দাদার ছেলে? বউমা দেখে যাও কে এসেছে?’ মহিলার চোখে যেন আলো ফুটে উঠল।

    ‘অনেক কষ্টে আপনাদের বাড়ি খুঁজে পেয়েছি।’

    ‘হ্যাঁ। আমরা আগে অন্য জায়গায় থাকতাম। সেটা ছিল উদ্বাস্তুদের দখলী জমি। ওখান থেকে আমাদের জোর করে তুলে দেওয়াতে আমরা এখানে চলে এসেছি।’

    ‘কাকিমা, একটা জিনিস দিতে এখানে আসা। আপনাদেরই জিনিস। অনেক বছর আগে বাবা কিছু একটা আপনাদের দেবার কথা বলেছিল। কিন্তু বাবা হঠাৎ মারা যাওয়াতে আমরা জানতেই পারিনি জিনিসটার কথা। কয়েকদিন আগেই আমরা এদিকেই হাইওয়ের কাছে একটা নতুন ফ্ল্যাটে এসেছি। দুদিন আগে জিনিসপত্র গোছাবার সময় বাবার আলমারিতে জিনিসটা পেলাম।’

    ‘কী জিনিস বলো তো?’

    ওই মহিলার হাতে আকর তুলে দিল ভেলভেট কাপড়ে মোড়ানো একটা প্যাকেট। ভদ্রমহিলা কাশতে কাশতে কাঁপাকাঁপা হাতে প্যাকেটটা নিল। তারপর প্যাকেট খুলে স্বর্ণলতা দেবীর মানে আকরের ঠাকুমার নিজের হাতে লেখা কাগজ আর ভেতরের জিনিসটা দেখে অঝোরে অশ্রুবিসর্জন করতে লাগল। অস্ফুটে বলল-- ‘গুরুজনের আশীর্বাদ ফেরত দিতে নেই। কিন্তু সময়মত জিনিসটা পেলে আমাদের জীবন হয়ত অন্যরকম হত বাবা। এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।’

    ভেতর থেকে ততক্ষণে ঘরে ঢুকল একটি মিষ্টি চেহারার অল্পবয়সী বউ। বোধহয় ওই বাচ্চাটার মা।

    ‘বউমা, দেখো কে এসেছে--’

    ‘ওনাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না?’ বউটি সতর্ক দৃষ্টি মেলে আকরের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।

    ‘আরে ও হল তোমার শ্বশুরমশাইয়ের ছোটবেলার বন্ধুর ছেলে। আমাদের বাংলাদেশের জ্ঞাতি। আর এ হল পরিতোষের বউ।’ কাকিমা জানাল।

    নমস্কার বিনিময়ের পর কাকিমার কথামত বউটি বাক্সটা নিয়ে ভেতরের ঘরে চলে গেল। কাকিমা কী যেন ভাবছিল তখন।

    ‘আজকে চলি তাহলে,’ কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর আকর উঠে দাঁড়াল।

    ‘এখনই চলে যাবে? আসলে বউমা কাজে বেরিয়ে যাবে। আমার অবস্থা তো দেখছই। একটু চা খেয়ে যাও অন্ততঃ।’

    ‘আজ নয় কাকিমা। আর একদিন আসব।’

    কাকিমার কাছে বিদায় নিয়ে চালাঘর থেকে বেরিয়ে উঠোনে পা দেবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পেছন থেকে একটা ডাক এল,

    ‘দাদা, শুনছেন, একটু দাঁড়াবেন দয়া করে--’

    আকর দেখল বাড়ির পেছন দিকের একটা দরজা খুলে তার দিকে এগিয়ে আসছে সেই অল্পবয়সী বউটি। আর তার পেছনে আঁচল ধরে আসছে বছর পাঁচেকের বাচ্চাটা।

    ‘আপনি কে তা আমি বুঝতে পেরেছি। আজ সময় নেই তাই বসতে বলতে পারলাম না। আপনি তো বললেন নতুন ফ্ল্যাটে শিফট করেছেন আপনারা। তা বাড়ির ঠিকানাটা যদি বলেন--অবশ্য যদি কোন অসুবিধা না থাকে। আসলে যিনি দিয়ে গেলেন এই দামি জিনিসটা, তার ঠিকানা জানা থাকলে ভাল হয়। না হলে গরীবদের ঘরে দামি কিছু থাকলে তো নানা রকম প্রশ্ন আসেই।’

    আকরের মনে হল, মেয়েটি যথেষ্ট বুদ্ধিমতী।

    ‘না না অসুবিধা কী?’ এখান থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরের নিজের নতুন ফ্ল্যাটের ঠিকানা দিল সে।

    উঠোন পেরিয়ে গেটের বাইরে অপেক্ষমান টোটোতে উঠে গলিটার থেকে বেরিয়ে এলো আকর।

    বাচ্চা ছেলেটা তখনো গেটের পাশে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে।


    ****

    বৈঠকখানা বাজারে ভিড় এখনো হয়নি। বাবার কথামতো বেশ সকাল-সকাল পৌঁছে গেছে আকর। বাজারের গেট দিয়ে ঢুকে ডানদিকেই খুঁজে পেল মানুষটিকে। নানান ফলের ঝুড়ি দিয়ে দোকান সাজিয়ে তারককাকু বসে আছে একটা ছোট্ট টুলের ওপর। খদ্দেরদের ভিড় এখনো শুরু হয়নি বলে মানুষটি ভালো করে গুছিয়ে নিচ্ছিল নিজের পসরা। তাকে দেখেই বললো ‘আরে আকর, এসেছো? এই টুলটাতে বসো।’ নিজের টুলটাই এগিয়ে দিল সরল মানুষটা। আকর অবশ্য বসল না। কিছু কথাবার্তার পর পকেট থেকে ছোট্ট একটা খাম বের করে মানুষটাকে দিয়ে সে বললো ‘বাবা পাঠাল।’

    প্যাকেটটা নিয়ে নিজের পকেটে রেখে তারককাকু বলল, ‘তোমার বাবা যেভাবে আমাদের সাহায্য করছে, কী ভাবে তার প্রতিদান দেব আমি জানি না। বাবাকে বোলো, আমি আরেকদিন তোমাদের বাড়িতে যাব গল্প করতে। জানো, তোমার বাবা আর আমি স্কুলে একই ক্লাসে পড়তাম। দেশের বাড়িতে একসঙ্গে খেলাধুলা আর অনেক মজা করতাম আমরা। বর্ষার সময় নৌকো করে কত ঘুরেছি।’ বলতে বলতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল তারক কাকুর মুখ।

    ‘হ্যাঁ আমি শুনেছি বাবার মুখে।’

    ‘এর মধ্যে একদিন তোমরা এসো আমাদের বাড়িতে, তোমার কাকিমার হাতের রান্না খেয়ে যাবে। তোমার সঙ্গে পরিচয় হলে পরিতোষও খুব খুশি হবে।’

    ‘পরিতোষ কে?’

    ‘পরিতোষ আমার ছেলে। প্রায় তোমারই বয়সী। জানো তো দেশের বাড়িতে তোমরা আর আমরা প্রায় একই পরিবারের মানুষ ছিলাম। তোমার বাবাকে আর আমাকে কেউ আলাদা করতে পারত না। সব সময় একসঙ্গে থাকতাম।’

    কথা বলতে বলতে কাউকে পাঠিয়ে মিষ্টি আনিয়ে খাওয়াল তারককাকু। মিষ্টি আসার ফাঁকে সে নিজেই জানাল, 'পরিতোষ এবার কলকাতার একটা ক্লাবে সুযোগ পেয়েছে। সেকেন্ড ডিভিশন।' বলতে বলতে ফলের ঝুড়িটা আবার একটু গুছিয়ে নিল — যেন হাত ব্যস্ত না রাখলে গর্বটা লুকানো যাবে না। 'ভালো খেললে আরও উপরে যাবে। ওর মাও তো তোমার বাবাদের পাশের গ্রামেরই মেয়ে। দাঙ্গা লাগাতে কিছুদিন আগে-পরে সবকটা পরিবারই এদেশে চলে এসেছিলাম আমরা।' খদ্দেরদের ভিড় হচ্ছিল, তাই আকর ‘আজ আসি কাকু, নাহলে কলেজের দেরি হয়ে যাবে’ বলে বেরিয়ে পড়ল।


    ***

    হাইওয়ে কানেক্টর তৈরি হওয়ার পর অ্যাক্সিডেন্টের সংখ্যা ভীষণ বেড়ে গেছে এই মোড়টাতে। আশপাশের মানুষের বস্তি, প্রচুর দোকানপাট। ফুটপাথ বলে আর কিছু নেই। তার সঙ্গে বাইক, টোটো, অটো, লরি ও ট্যাক্সির লাগাম ছাড়া গতি। অফিসের কাজে এদিকে এসেছিল আকর। ফেরার পথেই দেখল দুর্ঘটনাটা।

    বাইকটা পড়ে রয়েছে রাস্তার ধার ঘেঁষে। কিছুটা দূরে পড়ে আছে একটা নিথর দেহ। মৃত না সংজ্ঞাহীন কে জানে? হেলমেট ভেঙ্গে গেছে। মাথা থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে নামছে রক্তের ধারা। রাস্তায় পড়ে শুকিয়ে গেছে কিছুটা। হেডলাইট, সাইড-লাইটের টুকরো ছড়িয়ে আছে বাইক আর পড়ে থাকা দেহটির মাঝখানের জায়গাটুকুতে। এক্সিডেন্টের দৃশ্য এতটুকুই। পুলিশ আছে দুজন। তৎপরতার সঙ্গে এ্যাম্বুলেন্সে তোলার ব্যাবস্থা হচ্ছে দেহটিকে। শোনা গেল দুর্ঘটনাগ্রস্ত যুবকটি নাকি এই এলাকারই বাসিন্দা। কাছাকাছি একটা কারখানায় চাকরি করে। বাড়ি ফিরছিল মর্নিং শিফট শেষ হবার পর। বাড়িতে বাড়া-ভাত নিশ্চয়ই অপেক্ষা করছিল। দুপুরের দিকে খালি রাস্তায় তাই কিছুটা বাড়তি গতিও ছিল হয়ত আরোহীর। একটা বেপরোয়া লরি হঠাৎ পেছন থেকে এসে ছুঁয়ে গিয়েছিল ওর বাইকটাকে। তারপর হওয়ার বেগে অন্তর্ধান। এদিকে সিসিটিভি আছে কিনা কে জানে? লরির নম্বরও কেউ বলতে পারছে না।

    আকরদের নির্মাণ সংস্থাটি বেশ বড় এবং সারা ভারত জুড়েই ছড়িয়ে রয়েছে এদের কর্মক্ষেত্র। কলকাতায় মাত্র বছর তিনেক কাজ করলেও, এর মধ্যেই বেশ নাম করে ফেলেছে কোম্পানিটি। শহরের উপকণ্ঠে হাইওয়ে কানেক্টরের পাশেই একটা বড় প্রজেক্ট শুরু করছে তারা। কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে প্রজেক্টটা দেখতে এসেছিল আকর। জমি অধিগ্রহণের ব্যাপারটা অনেকদিন ধরেই চলছিল। শুনেছে কয়েকটা পরিবার কিছুতেই জায়গা ছাড়ছে না। নানাভাবে চেষ্টা চলছে এদেরকে সরাবার। কিন্তু কিছুতেই কাজ হচ্ছে না। এমনকি উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব দিয়েও না। এই কয়েকটা ঝুপড়ি নাকি এই পরিবারগুলোর শেষ সম্বল। পাড়ার নেতাগোছের কিছু লোকজনও নরমে গরমে কথাবার্তা চালাচ্ছে। এভাবে প্রতিরোধ কতদিন থাকবে কে জানে? কোম্পানির কাছে কিন্তু সময় খুবই মূল্যবান। কাজ করতে করতে ঝুপড়িগুলোর দিকে একবার চোখ পড়েছিল আকরের। এদের চরম দুরবস্থা দেখেই বুঝতে পারল রক্ত জল করা পরিশ্রমে তৈরি আশ্রয় কেন এরা ছাড়তে চাইছে না। কিন্তু প্ল্যান অনুযায়ী ওখানেই ক্লাব-হাউস উঠবে। কিছুই করার নেই। ফাইলে চোখ রেখে সে ড্রাইভারকে বলল, 'কুসুমপুর স্টেশনের দিক দিয়ে ফিরব, ঘুরপথ হলেও রাস্তা ফাঁকা থাকতে পারে।' কোম্পানির গাড়িতে ফিরতে ফিরতে রাস্তায় দুর্ঘটনার দৃশ্যটা দেখে ফেলল আকর। তারপর থেকে বার বারই মনের মধ্যে ভেসে উঠছিল রাস্তায় পড়ে থাকা লাল বাইক, চারদিকে ছড়ানো রক্ত, ভাঙ্গা কাঁচের টুকরো। লাল রঙটা মাথার মধ্যে যেন ছেপে গেল তার।


    ***

    প্রায় বছর পাঁচেক লাগলো এই হাউসিং প্রজেক্টটা শেষ হতে। বাড়ি শিফট করে এখানকার নতুন ফ্ল্যাটে আসার কয়েক দিন পর সমস্ত জিনিসপত্র আনপ্যাক করছিল আকর। অনেকগুলো টাওয়ার সহ এটাই এদিককার সবচেয়ে অভিজাত হাউজিং প্রজেক্ট। জিমখানা, সুইমিং পুল, ক্লাব, খেলার মাঠ, হাঁটার পথ, সমস্ত কিছু রয়েছে এখানে। হাইওয়ের কাছে হওয়াতে এই আবাসনের ফ্ল্যাটগুলো খুব দামি। তবে নির্মাণকারী সংস্থার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে বেশ কিছুটা কম দামে এখানে একটা ছোট্ট ফ্ল্যাট পেয়েছে আকর।

    বাবার আলমারিটা গোছাতে গিয়েই চোখে পড়ল একটা নীল ভেলভেট কাপড়ে মোড়া কাঠের একটা বাক্স। বেশ কারুকাজ করা। গয়নার বাক্স বলেই মনে হচ্ছে। অন্যান্য জিনিসের মধ্যে লকারের এক কোণে রাখা। মা-বাবা দুজনেই গত হয়েছে। বাবা তো অনেক আগেই গেছে, মাও চলে গেল গত বছর। বাক্সটা বের করে খুলেই চমকে গেল আকর। অনেকবছর আগে বাবা একবার বলেছিল কুসুমপুরে গিয়ে তারককাকুকে একটা প্যাকেট দিয়ে আসার কথা। এটাই সেই বস্তুটি নয়তো? কারণ বাক্সের উপরে একটা কাগজ সাঁটা, তাতে নাম লেখা ‘তারকনাথ দাস’। বাক্সের ঢাকনা খুলতেই বের হল আরও দুটো ভাঁজ করা কাগজ। একটাতে পেন দিয়ে যত্ন করে লেখা ‘ভাবী বউমাকে আশীর্বাদ সহ - স্বর্ণলতা দেবী।’ বহুদিন আগের কালির লেখা জায়গায় জায়গায় কিছুটা অস্পষ্ট। স্বর্ণলতা দেবী মানে আকরের ঠাকুমা বাংলাদেশ থেকে এদেশে আসার বছর খানেক পরেই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গিয়েছিল। এটাই তবে আকরের নিয়ে যাবার কথা ছিল সেদিন? সেসময় যাওয়া হয়নি, এমনকি কখনই আর যাওয়া হয়নি। অন্য কাগজটাতে রয়েছে বাবার হাতে লেখা তারকনাথের নাম আর নিচে একটা হাতে আঁকা রাস্তার ম্যাপ। ম্যাপের এক জায়গায় তীর চিহ্ন দিয়ে লেখা ‘কুসুমপুর স্টেশন’, আরেক জায়গায় একই ভাবে দেখানো আছে ‘তারকের বাড়ি’। তারককাকুর বাড়ির দিক-নির্দেশ। আকরের মনে হল- যেন ম্যাপ নয়, এটা একটা সম্পর্কের নকশা, যা আঁকা হয়েছিল কিন্তু কখনো অনুসরণ করা হয়নি। এখন রাস্তাঘাট সহ পুরো জায়গাটা আমূল বদলে যাওয়াতে এই নকশার কোন মূল্য নেই আর। কিন্তু এই বাক্সটা কেন এতদিন তারককাকুর বাড়ি দিয়ে আসা হয়নি? বাবাও তো সেদিনের পর আর কোনদিন তাকে এটা নিয়ে আর কোন কথা বলেনি। তবে কি পরবর্তীকালে মত বদলেছিল বাবা। নাকি ভেবেছিল নিজেই এসে একদিন তারককে দিয়ে যাবে বাক্সটা। তবে সেইসময় পরপর কয়েকবার বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে বৈঠকখানা বাজারে কাকুকে দিয়ে এসেছিল আকর। এরই বছরকয়েক পরে একদিন হঠাৎ অফিস থেকে ফেরার পথে হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে চলে গেল বাবা। কাগজগুলো সরিয়ে গয়নার বাক্সটার ভেতরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই অবাক হয়ে গেল আকর। ভেতর থেকে উঁকি মারছে একটা মোটা সোনার বিছেহার।

    বাবার মৃত্যুর পরেও দুয়েকবার আকরদের বাড়িতে এসেছিল তারককাকু। মায়ের হাতে কিছু টাকা দিয়ে বলেছিল বাবার কাছে ঋণ ছিল তার। আরও বলেছিল, টাকা ফেরত দিয়ে সে ঋণ শোধ হয় না। তাই বাবার কাছে চিরঋণী থাকবে সে। এরপর একসময় তারও আসা বন্ধ হয়ে গেল। কোন এক আত্মীয়ের মুখে আকর শুনেছিল, বৈঠকখানা বাজারের দোকানের ভাড়া মেটাতে না পেরে সেটা ছেড়ে দিতে হয়েছিল তারককাকুকে। নিজের শেষ সম্বলটুকু দিয়ে কুসুমপুর রেলস্টেশনের একপ্রান্তে ফলের একটা ঝুপড়ি দোকান লাগিয়েছিল তারকনাথ। কিন্তু বছরখানেক যেতে না যেতেই হকার উচ্ছেদের ফলে দোকানটা ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। এরপরে সে আর মনের জোর ধরে রাখতে পারেনি। ভীষণ বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। যে লাইন ধরে সে এদেশে এসেছিল, এক কাকভোরে সেই রেল লাইনেই চলন্ত ট্রেনে কাটা পড়ে শেষ হল তার যাত্রা। অনেকে বলে দুর্ঘটনা নয় আত্মহত্যা। সত্যি মিথ্যা কে জানে — এইসব মৃত্যুর সাক্ষী থাকে না। খুবই বিপদে পড়েছিল তার পরিবারটি। এদিক ওদিক ধাক্কা খেতে খেতে ছেলে পরিতোষ একটা কারখানায় কাজ জুটিয়েছিল কোনরকমে। ফুটবল খেলা আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তার।


    ***

    অফিসে বের হওয়ার মুখে গেটের সিকিউরিটি অফিস থেকে ফোন এল, ‘স্যার একজন মহিলা আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান। বললেন, উনি আপনার আত্মীয়।’

    ‘আত্মীয়? ঠিক আছে, পাঠিয়ে দিন।’

    ‘না স্যার, উনি বলছেন আপনি যদি গেটে এসে ওনার সঙ্গে দেখা করেন তবে খুব ভালো হয়। উনি ভেতরে ঢুকবেন না।’

    কিছুটা অবাক হলেও আকর বলল, ‘বেশ তো, ওনাকে আপনারা ভিজিটারস রুমে বসিয়ে রাখুন, আমি অফিসে বের হচ্ছি, যাবার সময় দেখা করে নেব। মিনিট পাঁচেক লাগবে।’

    অফিসের ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে ভিজিটারস রুমে ঢুকেই বেশ অবাক হল আকর। তারককাকুর বউমা বসে আছে একটা চেয়ারে। হাল্কা নীল শালোয়ার কামিজে আজ বেশ পরিপাটি লাগছে তাকে।

    তাকে দেখে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো বউটি। হাতজোড় করে প্রণাম করলো।

    ‘ফ্ল্যাটে এলেন না কেন? আমাদের ভালো লাগত।’ প্রতিনমস্কার করে পাশের চেয়ারে বসল আকর।

    ‘না, আমরা এখানে ঢুকি না। আমাদের রিফিউজি পরিবারগুলোর সঙ্গে এই আবাসনগুলোর জড়িয়ে আছে অনেক সংগ্রাম, উচ্ছেদ, ও মৃত্যুর ইতিহাস।’

    কথাটা শুনে একটু থেমে আবার কথায় ফিরল আকর।

    ‘যাই হোক। এবারে বলুন কী ব্যাপার?’

    ‘একটা বিশেষ কাজে আপনাকে একটু বিরক্ত করতে হল দাদা।’

    কথা বলতে বলতেই ব্যাগের ভেতর থেকে ভেলভেট কাপড়ে মোড়া সেদিনের প্যাকেটটা বের করল বউটি। 'এটা আমাদের না,' প্যাকেটটা সামনের টেবিলে রেখে বলল, 'তাই ফেরত দিতে এলাম।'

    ‘আগে বসুন তো।’

    ‘এটি আপনি গতসপ্তাহে কেন আমাদের দিয়ে এসেছিলেন, সেটা খুব একটা স্পষ্ট নয়।’

    ‘তা কেন। জিনিসটা তো আসলে আপনাদেরই। আমার ঠাকুমার লেখা চিঠি আছে এর ভেতরে।’

    ‘হ্যাঁ দেখেছি আমরা। ওর লেখা অনেক বছর আগের একটা চিঠি।’ একটু থেমে আবার বলল, 'সময়মতো না পেলে জিনিসের মূল্য থাকে না। এটার সময় পেরিয়ে গেছে।'

    ‘ঠিক কী বলতে চাইছেন বলুন তো?’

    ‘আপনার ঠাকুমা ভালো করেই জানত এই উপহারের একটা বিরাট আর্থিক মূল্য আছে। সেই মূল্য আমার শ্বশুরমশাইকে দরকারের সময় সাহায্য করবে।’

    ‘হ্যাঁ, তবে আর্থিক সাহায্য তো যে-কোন সময়ে দরকার হতে পারে।’

    ‘আর একটা ব্যাপার জানা দরকার আপনার। মা’র কাছে শুনেছি, দেশে থাকতে আপনার ঠাকুমা নাকি প্রায়ই বলত - দিলুর জীবন বাঁচাবার জন্য আমরা তারকের কাছে ঋণী।’

    ‘উনি বাবার জীবন বাঁচিয়েছিলেন?’ অবাক হল আকর।

    ‘হ্যাঁ। ঘটনাটা ঘটেছিল বাংলাদেশে। আমি শাশুড়ি-মা’র কাছে শুনেছি। এক প্রবল বর্ষায় স্কুলে যাবার সময় মাঝনদীতে দিলু ও তারকদের নৌকো উল্টে গিয়েছিল। দিলু ডুবে যাচ্ছিল। কাছাকাছি আর কেউ ছিল না। তারক নিজের জীবন বাজি রেখে মাঝনদী থেকে অনেক চেষ্টায় দিলুর প্রায় সংজ্ঞাহীন দেহটা টেনে পারে তুলে এনেছিল। এটুকুই। সেই ঋণ শোধ করার জন্যই এই দামি উপহার।’

    ‘হতেই পারে। তাতে অসুবিধে কী?’ বলল আকর।

    ‘কিন্তু বন্ধুত্বে কোন ঋণ হয় না। আর তাছাড়া প্রাপকই তো পৃথিবীতে নেই আর।’

    ‘ঋণ কেন, এটা তো বিয়ের উপহার।’ আকর বোঝাবার চেষ্টা করল।

    ‘বাবা থাকলে আজ কী করত আমরা জানি না। সময়মত পেলে হয়তো গ্রহণ করত। শুনেছি তখন বাবার খুব দরকার ছিল টাকার। হয়তো নিজের জীবনটাও বেঁচে যেত তার। কিন্তু মা কিছুতেই পারবে না এটা গ্রহণ করতে।’

    মনে হল মেয়েটি একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে রাখল ।

    ‘কারণটা কিন্তু এখনও আমার বোধগম্য হচ্ছে না একেবারেই। এটা তো কাকুর স্ত্রী মানে আপনার শাশুড়ি-মায়েরই প্রাপ্য।’

    ‘আপনি আর একটা ব্যাপার হয়তো জানেন না, আমার শ্বশুরমশাইয়ের বিয়ের উপহার হলেও আমার শাশুড়ি-মা কিন্তু এই উপহারের লক্ষ্য ছিল না।’ কারণ সেই সময় পাশের গ্রামের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে মানে আমার শাশুড়িকে স্বর্ণলতাদেবী আপনার বাবার সঙ্গে বিয়ে দেবার জন্যই পাত্রী হিসেবে ঠিক করে রেখেছিল।’

    ‘বলেন কী? কিন্তু তাহলে হল না কেন বিয়েটা?’ অবাক হয়ে প্রশ্ন করল আকর।

    ‘হ্যাঁ দুই পরিবারের মধ্যে সব কথা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এদেশে এসে আপনাদের পরিবারের কেউ, তারকনাথের বা আমার শাশুড়ি-মার পরিবারের কোন খোঁজ নেয়নি কোনদিন।’

    ‘তা কেন? হয়ত খোঁজ করেও সন্ধান পায়নি।’ আকর একটা কারণ বের করার চেষ্টা করল।

    ‘না। খোঁজ না নেবার অন্য কারণ ছিল। একটা অতি দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটেছিল। আমার শাশুড়ি শরণার্থী হয়ে বাংলাদেশ থেকে এদেশে আসার পথে দলছুট হয়ে হারিয়ে গিয়েছিল। এরকম ব্যাপার অনেক হত তখন। এইসব দলছুট কমবয়সী শরণার্থী মেয়েদের অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোন গতি থাকত না।’

    একটু দম নিয়ে আবার কথা শুরু করল বউটি। ‘কিন্তু এক্ষেত্রে তা হল না। কয়েকদিন বাদে তাকে খুঁজে পাওয়া গেল অন্য একটি শরণার্থী শিবির থেকে। জানেন তো এইসব খবর চারদিকে রটতে দেরি হয় না। আপনার পরিবার হয়ত ওই কারণেই ওর কোন খোঁজই নিল না। এমনকি আপনাদের জন্য অনেক অপেক্ষার পর শাশুড়ির যখন অন্যত্র সম্বন্ধ খোঁজা হচ্ছিল, সেই সময় কোন পাত্রপক্ষই বিয়েতে রাজি হয়নি। হারিয়ে-খুঁজে-পাওয়া শরণার্থী মেয়েকে কে আর ঘরের বউ করে নিয়ে যায়? তা সে যতই সুন্দরী আর গুণবতী হোক না কেন। ওই পরিবারটি ভেঙেই পড়েছিল একেবারে। সেই সময় আমার শ্বশুরমশাইয়ের পরিবার এগিয়ে আসে। তারা নিজেরাই ওই মেয়ের সঙ্গে তাদের ছেলের বিয়ের প্রস্তাব দেয়। হয়তো লড়াই করতে করতে পাশে দাঁড়ানো ছাড়া অন্য সবকিছু গৌণ হয়ে গিয়েছিল তাদের কাছে।’

    আকর চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। এই প্যাকেটটা তারককাকুকে দেওয়া নিয়ে বাবার গড়িমসির কারণ কিছুটা হলেও আন্দাজ করতে পারল হয়ত।

    তাকে চুপ থাকতে দেখে বউটি বলল, ‘তবে আমরা জানি যে আপনার বাবা মাঝে মাঝেই টাকা পয়সা দিয়ে আমার শ্বশুরমশাইকে সাহায্য করত। বিপদের সময় সাহায্য করার জন্য আমরা সত্যিই কৃতজ্ঞ আপনাদের কাছে।’

    ‘কিন্তু আপনি জানেন কি যে আমার বাবা মারা যাবার পর তারককাকু কিছু কিছু করে সেই টাকা শোধ করেছিল?’

    ‘বিপদের সময় করা সাহায্যের মূল্য কোনভাবে ফেরত দেওয়া যায় কি? যাক গে এসব কথা। যা হবার হয়ে গেছে।’

    ‘কিন্তু জিনিসটা তো ঠাকুমা আপনাদেরই দিয়েছেন।’ শেষ চেষ্টা করল আকর।

    ‘না, বিবাহের উপহার বা বন্ধুকে বাঁচাবার পুরস্কার যাই বলুন, কোনটাই আমরা নিতে পারব না। মা আর আমি তাই স্থির করেছি জিনিসটা ফেরত দেব।’

    আকরের মুখ থেকে কথা বের হচ্ছিল না। কোনরকমে বলল, ‘এতকথা একেবারেই জানা ছিল না আমার। কিন্তু আপনাদের টাকার দরকার তো ফুরিয়ে যায়নি এখনো।’

    ‘দেখুন, এই মূল্যবান জিনিসটা ছাড়াও আমাদের তো চলে যাচ্ছিল কোনো রকমে। আর আমিও তো কিছু কাজকর্ম করছি। ঠিক চালিয়ে নেব। ছেলেটাকে বড় করব।’

    ‘কিন্তু এটা নিলে তো আপনার ছেলের পড়াশুনা আরও একটু ভালোভাবে হবে। আপনারা আর একটু সচ্ছল হবেন। তাছাড়া, কিছু মনে করবেন না, এতে আপনার স্বামীরও হয়ত নিজে কিছু করার জন্য একটা প্রাথমিক আর্থিক সাহায্য হতে পারে।’

    ‘স্বামী? স্বামীর সঙ্গে সংসার করার ভাগ্য কি আমাদের হয়?’ মনে হল একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে গেল তারককাকুর বউমা?

    ‘মানে? আপনার স্বামী কি--?’

    পুরো প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করতে পারল না আকর। মনে পড়ে গেল সেদিন ওদের উঠোনের এক কোণে একটা পুরনো বাইক দাঁড় করানো ছিল। ধুলো ময়লা লেগে থাকলেও ভেতর থেকে লাল রংটা চোখে লাগছিল তার। সেই লাল রং, যা তার মাথার মধ্যে ছেপে গেছে অনেকদিন আগে।

    বউটি চুপ করে গেল। উদ্বেগ ধরে রাখতে না পেরে এবারে সরাসরি প্রশ্নটা করল আকর, ‘সংসার করার ভাগ্য নেই মানে? কী হয়েছে আপনার স্বামীর?’

    ‘আমাদের মত সংসারে যা হয় তাই হয়েছে। বাচ্চার জন্মের কিছুদিন পরেই ওর এখানকার কারখানাটা বন্ধ হয়ে গেল। অনেক জায়গায় চেষ্টা করেও বহুদিন কোন কাজ জুটল না। তারপর প্রায় বাধ্য হয়েই এক কনট্রাক্টরের হয়ে কাজ করার জন্য ও চলে গেল আবু ধাবিতে। সেখানে রাস্তা বানাবার কাজ করে। বাড়ি আসতে পারে না প্রায় দু বছর। তবে টাকা পয়সা পাঠায়। কনট্রাক্টরের কাছে মাঝে মাঝে খবরও পাই তার। এখানে কিছু পেয়ে গেলে আর কোথাও যেতে বারণ করেছি আমি ও মা দুজনেই।’

    ‘হ্যাঁ সেটাই তো ভালো হয়।’

    ‘এখানে কাজ পাওয়া কি সহজ?’

    নিজেকে আর একটু গুছিয়ে নিয়ে এবারে উঠে দাঁড়াল মেয়েটি, অনেক চেষ্টায় নিজের বুজে আসা গলা স্বাভাবিক করে বলল, ‘আজকে আসি তাহলে। আপনার অফিসের দেরি করিয়ে দিলাম। যদি পারেন আরেকদিন আসবেন বউদিকে নিয়ে।’ প্যাকেটটা আকরকে দিয়ে নমস্কার করে বেরিয়ে গেল বউটি।

    গেটের বাইরে তাকিয়ে আকর দেখল একটা বাইক জান্তব আওয়াজ করতে করতে বেরিয়ে গেল ওপরে হেলমেট ও সালওয়ার কামিজ পরা সওয়ারির কোমরে একটা নীল ওড়না শক্ত করে বাঁধা।

    অফিসের কথা ভুলে গেল আকর।

    প্যাকেটটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। ভেতরে সোনার বিছেহার। বাইরে রোদের তাপ বাড়ছে। মনে হল কোথাও কোনো ঋণ শোধ হয়নি —হাত বদল হয়েছে শুধু।



    অলংকরণ (Artwork) : অনন্যা দাশ
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments