




ছোটোবেলা থেকে রেবার মানসিক সংযোগ ও হৃদ্যতা বেশি ছিল মামাবাড়ির সঙ্গে। দাদামশায় সেকালের বিশিষ্ট ডাক্তার। উদার ও মানবিক। মামাবাড়িতে ছিল খুব খোলামেলা সজীব আবহাওয়া। রেবার ছবি আঁকার ঝোঁকে দাদামশায়ের ছিল যথেষ্ট সহানুভুতি। ১৯৪২-এ প্রাইভেটে ম্যাট্রিক, ১৯৪৪-এ আই.এ ও ১৯৪৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক হন রেবা। পড়াশোনা না ছবি আঁকা— ‘অনেক আলোচনার পর রফা হল ক্যাজুয়াল স্টুডেন্ট হিসেবে আর্ট স্কুলে ভর্তি হব, যদি অবশ্য আমাকে নেয়। আর্ট স্কুলের তৎকালীন অধ্যক্ষ অতুল বসু আমাকে ক্যাজুয়াল স্টুডেন্ট হিসেবে থার্ড ইয়ারে ভর্তি করে নিলেন। কিছুটা চর্চা ছিল বলেই সেটা সম্ভব হল। কিন্তু তিনি তখনই আমাকে বলেছিলেন ক্যাজুয়াল ছাত্রী হয়ে লাভ নেই। কাজ শিখতে হলে নিয়মিত ছাত্রী হতে হবে। আমারও সেইরকমই ইচ্ছা ছিল। মাস দুই-তিন ক্যাজুয়াল ছাত্রী হিসেবে থাকার পর নিয়মমতো পরীক্ষা দিয়ে নিয়মিত ছাত্রী হয়ে গেলাম।’ আর্ট স্কুলে রেবা দাশগুপ্তের জীবনে শুরু হল নতুন অধ্যায়।
কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অফ আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটস-এ চিত্রকলার উজ্জ্বল ছাত্রী ছিলেন রেবা হোর। তাঁর শিল্পকর্মের অভিমুখ দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতা। অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশে আছে আবেগ। তাঁর শিল্পীজীবনের শুরুতে তিনি ঘরোয়া দৃশ্য, কর্মব্যস্ত নারী, পশুপাখি ও মানুষের দৈনন্দিন জীবন নিয়ে ছবি এঁকেছেন, পরবর্তী সময়ে তাঁর ছবি বিমূর্ত এবং কখনও কখনও পরাবাস্তবতার দিকে ঝুঁকে গেছে। এ সম্পর্কে রেবা হোর নিজেই বলেছেন, ‘আমি মানুষটা আবেগ-নির্ভর— emotional। আমার ছবিতে স্বতঃস্ফূর্ত ভাব বেশি। ধারণা, theme একটা থাকে। সেটা আসে যা ভাবি, যা চারপাশে দেখি, যা আমাকে নাড়া দেয় তার মধ্যে থেকে। ...চেতন, অবচেতন চেষ্টা মিলে ছবি হয়। ...আমার কাজে বিমূর্ততার একটা ঝোঁক আছে। যা দেখি ও অনুভব করি দৃষ্টিভঙ্গি ও শিল্পপ্রকরণ মিশে সেই মূর্তি কতক যেন বিমূর্তের দিকে চলে যায়। এটা অনেক সময়েই জ্ঞানত হয় না, স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসে।’ তাঁর কন্যা চন্দনা হোর-ও লিখেছেন, ‘মায়ের ছবিতে বিমূর্ত উপাদান বেশি, এক পর্বের তেলরঙের কাজে সেটা বিশেষ ভাবে আছে। তবে, তারই সঙ্গে একইভাবে রয়েছে প্যাশন।’ আবেগ ও সমাজ বাস্তবতার এক আশ্চর্য সংশ্লেষণে নির্মিত রেবা হোর-এর চিত্রকর্ম। তাঁর ছবি যেন এক নীরব আত্মান্বেষণ। তাঁর কাজে কোনো অস্থিরতা নেই, অতিরঞ্জন নেই। বিমূর্ততার মধ্যে দিয়ে যে জগৎ তিনি নির্মাণ করেন, তা একই সঙ্গে ব্যক্তিগত ও সার্বজনীন। তাঁর চিত্ররচনায় অভিব্যক্তিবাদ বা এক্সপ্রেশনিজমের প্রবল প্রভাব।


১৯৪৮ সালে আর্টিস্ট ফ্রন্টের অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে রেবা কম্যুনিস্ট পার্টিতে আসেন। তখন পার্টি বে-আইনি। সেসময় রেবার বয়স কুড়ি-বাইশ। তাই এই আন্দোলন রোমান্টিক বীরত্বের মহিমায় উজ্জ্বল মনে হয়েছিল রেবার। তাঁর অকপট স্বীকারোক্তি— ‘আমার রাজনৈতিক বিশ্লেষণ দুর্বল ছিল। যা বুঝিয়ে দেওয়া হত বুঝে যেতাম; আর খুব আবেগ আর উৎসাহের সঙ্গেই কাজ করতাম। বস্তিতে যাওয়া, নানা জায়গায় ঘুরে প্রচার চালানো, পার্টির জন্য অর্থ সংগ্রহ করা, পোস্টার আঁকা— এসব করতে বেশ ভালো লাগত। নিষিদ্ধ মিছিল, সমাবেশে যেতে ভয় ভয় রোমাঞ্চ অনুভব করতাম। ভাবতাম মরে গেলেই বা কী? এইতো সত্যি দেশের কাজ, মানুষের জন্য কাজ করছি।’
১৯৫০ সাল। পার্টির অভ্যন্তরে তুমুল আলোড়ন-আত্মসমালোচনা, নেতৃত্বের পরিবর্তন, নীতি পরিবর্তন। রেবা দাশগুপ্ত নিজের উপলব্ধিতে সব কিছু বুঝেছিলেন। সমৃদ্ধ হয়েছিলেন নানা অভিজ্ঞতায়। দেখেছেন পার্টি কমরেডদের নীচতা, দলাদলি— তেমনি আশ্চর্য আত্মত্যাগ, পরিশ্রম, নির্লোভ আদর্শপরায়ণতা ও সাহসী মৃত্যুবরণ। যাপিত জীবনের এই পারিপার্শ্বিকতা থেকে তিনি বুঝেছিলেন রাজনীতির চৌহদ্দি তাঁর একমাত্র ক্ষেত্র নয়, বেশি করে ছবি আঁকার তাগিদ অনুভব করেছেন মানসিকভাবে। বাঁচতে চেয়েছেন সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্কে। তবে বেশ কিছুদিন কম্যুনিস্ট আন্দোলনে জড়িয়ে থাকায় তাঁর চিন্তা-চেতনায় সাম্যবাদ এক বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। তিনি বলছেন— ‘যে দোষগুণ ক্ষমতা অক্ষমতা জন্মসূত্রে ও পারিবারিক উত্তরাধিকারে আমার মধ্যে ছিল তা দৈনন্দিন জীবনচর্চা, কর্মগতি এবং পার্টি জীবনের টানাপোড়েনের অভিজ্ঞতায় এক বিশেষ চেহারা নিয়েছে। এই সমস্ত কিছুর মধ্যে থেকেই আজকের এই আমি উঠে এসেছি বা তৈরি হয়েছি।’
১৯৪৯-এ আর্ট স্কুলের পাঠ শেষে রেবা জীবিকার সন্ধানে বাতিদান, গ্রিটিংস কার্ড, ক্যালেন্ডার তৈরি করে বিক্রি করার চেষ্টা করলেন। কিছুদিন বুক-কভারও করেছিলেন। ১৯৫১ সালে ডায়াসেশন স্কুলে আর্ট টিচার হিসেবে যুক্ত হলেন রেবা হোর।
১৯৫৪-র ১৪ অগাস্ট রেবার বিবাহ হয় সোমনাথ হোরের সঙ্গে। কোনো আড়ম্বর নেই। সোমনাথ হোরের ভাষ্যে ‘পাঁচ সিকের বিয়ে’ কারণ তখন রেজিস্ট্রি করতে খরচ লাগতো পাঁচ সিকে। বিয়েতে সাক্ষী ছিলেন মুজফফর আহমেদ, আর সোমনাথ হোরের দুই বন্ধু সুবোধ রায় যিনি চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের অন্যতম সদস্য ও সুনীল কুন্দগ্রামী। পার্কসার্কাসের ছোট্ট দু-কামরা একটা বাসাতে শুরু হল নতুন জীবন। সেসময় আর্থিক অনটন কিছু ছিল, কিন্তু সেটা বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। দুজনে মশগুল হয়ে ছবি আঁকতেন। ওই বছরেই চৌরঙ্গি টেরাসে সোমনাথ ও রেবা হোরের যৌথ প্রদর্শনী। পাশে এসে দাঁড়ালেন যতীন মজুমদার। এক অন্য ধরণের মানুষ। তরুণ শিল্পীদের জন্য নিজের ঘর বিনা ভাড়ায় ছেড়ে দিতেন। রেবা ও সোমনাথ হোরকে পার্টির পরিচিতজন, কলকাতার তরুণ শিল্পী ও ছাত্র-শিল্পীরা দলে দলে আসতেন, সঙ্গ দিতেন ও সাহায্য করতেন নানাভাবে। অরুণ বসু, সুকান্ত বসু, সনৎ কর প্রমুখের সঙ্গে আলাপ ও বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। কলকাতার ‘কমলালয়’-এ মাঝে মাঝে জমে উঠত তুমুল আড্ডা, ছবি নিয়ে আলোচনা। তৈরি হল ‘কনটেমপোরারি গ্রুপ’। রেবা ও সোমনাথ যুক্ত হলেন, কিন্তু বেশিদিন স্থায়ী হননি। ক্রমে তাদের কাছে আপন হয়ে উঠলো ছবির জগৎ। সক্রিয় রাজনীতি মন টানতো না, কিন্তু মতাদর্শগত চিন্তাভাবনা থেকে কখনোই বিছিন্ন হননি।
১৯৫৮তে সোমনাথ হোর ইউ.পি.এস.সি-র মাধ্যমে দিল্লি আর্ট কলেজে চাকরি পান। ওই বছরেই রেবা হোরের ললিতকলার জাতীয় পুরস্কারের সম্মান। রেবার ভাষ্যে ‘বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়া’। সে যাইহোক, বন্ধুবান্ধবদের মহা উল্লাস। বাংলা থেকে এই জাতীয় পুরস্কার সেই প্রথম। ১৯৫৮র শেষদিকে সোমনাথের সঙ্গে রেবাকে দিল্লি যেতেই হল। দিল্লিতে কমলানগরের কাছে জওহর নগরে তিন কামরার এক ফ্ল্যাটে উঠলেন। ভাড়া মাত্র একশ ত্রিশ টাকা। দিল্লির পরিবেশ একেবারেই আলাদা। কিন্তু অনেক মানুষের সহমর্মিতা, সহযোগিতা পেয়েছিলেন তাঁরা। নিখিল চক্রবর্তী সর্বতোভাবে শুরু থেকেই সাহায্যর হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিছুদিন পর দিল্লির Spring Dales স্কুলে চাকরি পেলেন রেবা। মাঝে মাঝেই মনে পড়ত কলকাতার সহজ জীবন, কমলালয়ের আড্ডা, মা-বাবার সান্নিধ্য, তারক দত্ত রোডের সেই ছোট্ট বাড়িটার উষ্ণ আশ্রয়, সাংসারিক কাজে শাশুড়ির সস্নেহ সাহায্য ও প্রশ্রয়— রেবার মন ভারী হয়ে উঠত। এক সময় রেবার মা বাবা দুজনই দিল্লিতেই চলে আসেন। দিল্লিতেই মেয়ে চন্দনার জন্ম। এক আলাদা অনুভূতি। রেবার মা সে সময়ে খুব অসুস্থ হলেও রেবাকে নিজের কাছে রাখলেন। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হিদায়েতুল্লা ও তাঁর স্ত্রী পুষ্পা হিদায়েতুল্লার সাথে রেবার মা-বাবার বন্ধুত্বের সম্পর্ক। সেই বন্ধুত্বের আলো সে সময়ে রেবার জীবনেও ছড়িয়ে পড়েছিল তাদের স্নেহ ভালোবাসায়। দিল্লিতে রেবার মা কঠিন রোগে চলে গেলেন। মায়ের মৃত্যুর পর দৃঢ়চিত্ত, প্রবল স্বভাব বাবা কুলদাচরণ একেবারে শিশুর মতো অসহায় হয়ে গেলেন কিছুদিন। তাঁকে শিশুর মতোই লালনের দায়িত্ব পড়ল রেবার ওপর। মা-র মৃত্যু, বাবার আকুল অসহায়তা রেবাকে দুঃখ বেদনার অমোঘ পরিচয় এনে দিয়েছিল। চন্দনা জন্মের পর রেবা ও সোমনাথ কমলানগরের বাড়ি ছেড়ে হাউসখাসের একটি বাড়িতে উঠে এলেন। দিল্লিতে বিপুল কাজের মধ্যে ডুবে গেলেন রেবা। ১৯৫৭ সালে পার্কসার্কাসের ছোট্ট ঘরে জয়নুল আবেদিনের কাছে ছবির স্পেস (space) ও মাস (mass) সম্পর্কে যে শিক্ষা তিনি অর্জন করেছিলেন দিল্লিতে সেই শিক্ষা সচেতনভাবে ফুটে উঠল তাঁর ছবিতে। উন্মোচিত হল নতুন দিগন্ত। ১৯৬০ সালে দিল্লিতে রেবার প্রথম একক প্রদর্শনী। নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে দিল্লির জীবনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলেন। রেবা প্রায় ন’বছর দিল্লিতে ছিলেন। রেবা ও সোমনাথ দুজনই উপলব্ধি করেছিলেন দিল্লিতে পরিণত জীবনবোধের কাছাকাছি পৌঁছোনোর অন্তরায় অনেক। অবশেষে তাঁরা চলে আসেন শান্তিনিকেতনে। শান্তিনিকেতন রেবা হোরের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ শান্তিনিকেতনই ছিল তাঁর কাজের উপযুক্ত স্থান, তাঁর সৃজনশীল যাত্রাপথের আলোকবর্তিকা। ১৯৭০ সালের শেষ দিকে স্বাস্থ্যের কারণে তিনি তেলরঙের কাজ থেকে সরে আসেন। এই সময়ে তিনি মোমের সাথে রঞ্জক মিশিয়ে এনকস্টিক পেন্টিং নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর চিত্রকলার ধরণে পরিবর্তন আসে। আশির দশকের শেষে যখন লালবাঁধের বাড়িতে বসবাস করছেন তখন রেবা হোর টেরাকোটার কাজ আরম্ভ করেন। ওই অঞ্চলে তখন প্রচুর পরিমাণে এঁটেল মাটি পাওয়া যেত। ওই কাদামাটি দিয়ে তৈরি করতেন আদিবাসী মেয়েদের মুখ, কুকুর ইত্যাদি।
রেবা হোর লিখেছেন—
‘প্রায় নিরবছিন্নভাবেই নিজ ক্ষমতামতো ছবি এঁকেছি। অনেক সময় আর্থিকভাবে তেমন সফল না হলেও আঁকায় ছেদ পড়েনি। সংসার ও সন্তানের দায়িত্ব মেটানোর জন্যও এই কাজ ছাড়িনি। তাই এটাই আমার জীবিকা বা career। মাঝে মাঝেই এ কাজ আমাকে যশ ও অর্থও যুগিয়েছে। আর সব সময়েই দিয়েছে একরকম পূর্ণতা ও মুক্তির অনুভূতি। এখনকার সময়ের সাথে আপোষ করতে নিজের মৌলিক ধ্যান-ধারণা বিসর্জন দিতে পারি না। নিজের সময়ের সঙ্গেও অনেক ব্যাপারে আপোষ করতে পারিনি। আমি যা আমি তাই। তাই থাকব মোটের উপর। ...নিঃসঙ্গতা আমার দীর্ঘদিনের সঙ্গী। ছবি আঁকায় বা অন্য গঠনাত্মক কাজে বা কারো জন্য সেবামূলক কিছু করায় তাকে তাড়িয়ে দিই। আবার সে ফিরে ফিরে আসে। এখন তা সয়েও গেছে।’ব্যক্তি রেবা অন্তর্মুখী। অনাড়ম্বর জীবন, প্রচারবিমুখী জীবনচর্চা তাঁর স্বভাব। শিল্পের মধ্যেই তাঁর যাপন ও আনন্দ। প্যারিস থেকে স্কলারশিপ পেয়েছিলেন। যাননি। কারণ সেই সময়ে সোমনাথ হোর অসুস্থ ছিলেন। সেজন্যে তাঁর কোনো আপশোস ছিল না। পাওয়া অথবা না-পাওয়া বোধের বাইরের মানুষ তিনি।
রেবা হোর ব্যক্তিজীবনে নিজের সত্তাকে খুঁজেছেন নানা ভূমিকার ফাঁকফোকর দিয়ে— বিখ্যাত বিচারপতির মেয়ে, রাজনীতির উত্তাল সময়ের অংশগ্রহণকারী, স্বনামধন্য শিল্পীর স্ত্রী, অসুস্থ মায়ের শ্রুশ্রূষাকারী কন্যা, ছোট্ট মেয়ের মা। এসবের মধ্যেই নিজের শিল্পীসত্তাকে জাগিয়ে রেখেছিলেন রেবা হোর। বিখ্যাত শিল্পীর স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও রেবা হোরের শিল্পকর্ম ছিল একেবারেই স্বতন্ত্র। জীবনের শেষ দিকে তাঁর ছবিতে রেখা, রং সূক্ষ্ম ও তীব্র হয়ে উঠেছিল। শিল্পের দিক থেকে, শিল্পের ভাষার দিক থেকে কোথাও একটা উত্তরণ হল। খোঁড়া কুকুর, ডানা-ছেঁড়া মুরগি, লাঠি হাতে ফল বিক্রেতা, বৃদ্ধা মহিলা, চারপাশের এইসব দৃশ্য রেবা হোরের ছবিতে ধরা পড়ল সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম রেখায়। প্রতিদিনের ছোটো ছোটো বিষয়, যেমন সাঁওতালরা পান্তাভাত খাচ্ছে, এইসব দৃশ্য থেকে প্রাত্যহিক সংগ্রামকে নিজের কাজের জন্যে তুলে আনলেন রেবা হোর। আনন্দ-বেদনা-সুখ-দুঃখের মাঝে নিজের আইডেন্টিটিকে আলোকিত তাৎপর্যে ভরিয়ে তুলেছিলেন। এটাই তাঁর লড়াই। এটাই তাঁর জীবনসত্য। নিজের ছবির ভিতর রঙের যে বিস্ফোরণ, তা তো নিজস্ব দুঃখ, কষ্ট, একাকিত্বকে অতিক্রম করারই এক ভাষা। রেবা হোরের কাজ সম্পর্কে সোমনাথ লিখছেন, ‘রেবার কতকগুলি পেইন্টিং এবং ড্রয়িং দেখে মনে হয় এগুলি করা হয়নি। নিজের থেকে হয়ে গেছে। ছবিতে রঙগুলি নিজেরাই যার যার জায়গা দখল করে নিয়েছে। কুকুরের ড্রয়িং দেখে মনে হয় জ্যান্ত কুকুরটি ঘেউ ঘেউ করতে করতে কখন যেন কাগজে সেঁটে গিয়েছে।’
ছবি আঁকার পাশাপাশি রেবার শখ ছিল বই পড়া আর গান শোনা। বাড়িতে ছিল প্রচুর বই। মহাশ্বেতা দেবী, বিমল কর, রমাপদ চৌধুরী ছিলেন তাঁর প্রিয় লেখক। আর রবীন্দ্রনাথ তো ছিলেনই সারা জীবন জুড়ে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গান শুনতেন। নিয়মিত শুনতেন দেবব্রত বিশ্বাসের গান। সুচিত্রা মিত্র রেবার বাড়িতে আসতেন। লোকসঙ্গীতের প্রতিও আকর্ষণ ছিল খুব।
রেবা হোরের চিত্রকর্মের বিশালতা পরিমাপের অতীত। আজকের এই প্রচারসর্বস্ব সময়ে তাঁর সহজ জীবন ও তাঁর ছবির মননঋদ্ধ ব্যাপকতার সন্ধান বড় জরুরি। এই মানুষটি পৃথিবীর পথ ছেড়ে চলে গেলেন ২০০৯ এর ২২ মার্চ।
তথ্য সহায়তা-
চন্দনা হোর। ২০২৫। জীবনবন্ধনে। কলকাতা: দেবভাষা
রেবা হোর। ২০১৬। আমার কথা— কিছু মিছু। কলকাতা: কারিগর
সোমনাথ হোর। ২০১৮। মনে পড়ে, মনে পড়ে না। কলকাতা: দেবভাষা
ঋষিৎ দত্ত। ২০২৫| রেবা হোরের ছবির মানুষ রাজনৈতিক ও স্বাধীন, ক্লান্ত হলেও হেরে যায় না। বঙ্গদর্শন।