



মহাস্থবির জাতক — প্রেমাঙ্কুর আতর্থী; প্রচ্ছদ- পূর্ণেন্দু পত্রী; প্রকাশক - দে'জ পাবলিশিং, কলকাতা ৭০০০৭৩; প্রথম দে'জ সংস্করণ- এপ্রিল ১৯৮৬; ISBN : 978-81-295-2272-6সে এক সময় ছিল বটে। যখন মানুষ মানুষের মুখের দিকে চেয়ে দেখত। মানুষ মানুষকে পড়ত। আর কেউ কেউ সেই পাঠ, সেই অভিজ্ঞতা লিখে রাখত। তিন ভাই স্থির, স্থবির আর অস্থির। বাবা এক অদ্ভুত মানুষ। যতখানি তরল, ততখানি কঠিন। যতখানি সজাগ, ততখানি নিরুত্তাপ। যতখানি কোমল, ততখানি উগ্র তার রাগ। কঠিন অনুশাসনের মধ্যে বেড়ে ওঠে এক বাঁধভাঙা ভবঘুরে মন। স্থবির লেখকের মানসচরিত্র বটে কিন্তু লেখক নিজেই তার মধ্যে দিয়ে ব্যক্ত হয়েছেন।
অভিজ্ঞতা নিজেই এক পাঠশালা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা লেখককে নগর সভ্যতার সঙ্গে জুড়ে রাখতে পারেনি। স্বাধীনতাবিহীন পাঠ্যসূচি এবং প্রাণহীন নিয়মের ধারাপাতের বাঁধনকে অস্বীকার করতে তিনি বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিলেন। শহর থেকে শহরে, মফস্সলে, ভিন্ন ভাষাভাষীর মানুষজনের সঙ্গে, ভিন্ন সাংস্কৃতিক আবহে সহায় সম্বলহীন বেঁচে থাকার সংগ্রাম তাকে শিক্ষিত করে তুলেছে। সে শিক্ষা মানবিক। জীবনানন্দের পঙক্তি স্মরণে আসে।
বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর:উনিশ শতকের শেষ এবং বিশ শতকের শুরুর দিকের সমাজচিত্রের প্রথম অংশের উল্লেখযোগ্য দিক হল লেখকের পারিবারিক শাসন এবং স্কুলের মাস্টারমশাইদের বিচিত্র ব্যবহার।
অন্ধকারে জেগে উঠে ডুমুরের গাছে চেয়ে দেখি ছাতার মতো বড়ো পাতাটির নীচে বসে আছে ভোরের দোয়েলপাখি—
চারিদিকে চেয়ে দেখি পল্লবের স্তূপ—
বাবা অত্যন্ত কড়া ধরনের মানুষ ছিলেন। তার মুখ এবং হাত দুটোই একসঙ্গে চলত। নিয়ম, নিয়ম, নিয়ম আর কঠোর অনুশাসন। একটু পিছলে গেছ কি চাবুক… একদিকে যেমন ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের আদর্শবাদী ও প্রবল দয়ালু, অন্যদিকে সন্তানদের সামান্য ভুলের জন্য চাবুক দিয়ে মারতেও দ্বিধা করতেন না, সেক্ষেত্রে বকাসুর হয়ে উঠতেন যেন। বর্তমান সময়ে বসে এইরকম কোনো অনুশাসনের কথা কল্পনা করতেও অবাক লাগে। কিন্তু মানুষের চারিত্রিক বৈপরীত্য এমন এক সূক্ষ্ম বিষয় যে চরিত্রকে একটি বিশেষ দোষে দুষ্ট করে দাগিয়ে দিয়েও মুক্তি পাওয়া যায় না। চরিত্র তোমার পিঠে বেত্রাঘাত করেও তোমাকে আগলে রাখে ছায়াশীতল বুকে। সেখানে অনিয়মের ক্ষমা নেই কিন্তু আশ্রয় আছে। গঠন এবং চাবুকের ব্যবহারের দিক থেকে মহাদেব শর্মণের সবচেয়ে বড়ো মিল পাওয়া যায় ডিকেন্সের বিখ্যাত খলচরিত্র ডেভিডের সৎ বাবা মিস্টার মার্ডস্টোনের সঙ্গে। মিস্টার মার্ডস্টোন নিজেকে একজন পরম ধার্মিক এবং ঈশ্বরের অনুগত মানুষ বলে মনে করতেন। তাঁর জীবনের মূল মন্ত্র ছিল— "Firmness"। তিনি বিশ্বাস করতেন, চাবুক এবং কঠোর শারীরিক শাস্তি ছাড়া কোনো শিশুকে সুনাগরিক বা সৎ বানানো সম্ভব নয়। ‘মহাস্থবির জাতক’-এ স্থবিরের বাবাও এই একই ধারণার মানুষ ছিলেন।
মানুষের মনের এই জটিল মনস্তত্ত্বকে প্রেমাঙ্কুর আতর্থী অত্যন্ত সততার সঙ্গে তুলে ধরেছেন। শুধু পরিবারের সদস্যদেরই নয়, সমাজের প্রতিটি প্রান্তিক মানুষ— পকেটমার, গণিকা অথবা যাযাবরদের প্রতি লেখকের গভীর সহানুভূতি ও সম্মান প্রকাশ পেয়েছে, যা সেই সময়ের বুর্জোয়া সাহিত্যধারার বাইরের সুবৃহৎ জীবনের দিকটি উন্মোচন করেছিল।
স্মৃতিকথা বনাম ফিকশনের মেলবন্ধন: বইটির সবচেয়ে বড় শক্তি হল এর ধরন। এটি যেমন নিখুঁত একটি আত্মজীবনী, ঠিক তেমনই এটি একটি রোমাঞ্চকর উপন্যাসের মতো গতিশীল। লেখক নিজের নাম সরাসরি ব্যবহার না করে ‘স্থবির’ চরিত্রের আড়ালে গল্প বলেছেন। এর ফলে লেখার মধ্যে একটি শৈল্পিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে, যা পাঠককে মোহগ্রস্ত করে।
রম্যরস ও নির্লিপ্ততা (Detached Humor): প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর গদ্যের প্রধান বৈশিষ্ট হল কৌতুক ও রসাত্মকতা। জীবনের কঠিনতম সংগ্রাম, দারিদ্র্য কিংবা প্রিয়জনের নিষ্ঠুর আচরণকেও তিনি চমৎকার কৌতুক ও হালকা হাসির ছলে প্রকাশ করেছেন। কোনো অবস্থাতেই তিনি অতি-আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েননি।
চলচ্চিত্রধর্মী বর্ণনাশৈলী (Cinematic Narrative): একজন সফল চলচ্চিত্র নির্মাতা হওয়ার কারণে প্রেমাঙ্কুর আতর্থী-র লেখার মধ্যে এক ধরনের দৃশ্যবিহ্বলতা রয়েছে। কলকাতার রাস্তাঘাট, মানুষের মুখের অভিব্যক্তি কিংবা কাশীর ঘাটের দৃশ্যগুলো বর্ণনা পড়ার সময় পাঠকের চোখে দৃশ্যগুলি ছায়াছবির মতো ভেসে ওঠে।
সমালোচক ভবানী মুখোপাধ্যায় এবং সমসাময়িক লেখক হেমেন্দ্রকুমার রায় ও শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে, এই বইটি কেবল একজন ব্যক্তির গল্প নয়। এটি মূলত একটি সময়ের ইতিহাস।
উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে বিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত কলকাতার যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তর ঘটেছিল, তার নিখুঁত বিবরণ রয়েছে এই চার খণ্ডে। কলকাতার বাবু কালচার, থিয়েটার জগৎ এবং আদি সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির ভেতরের গল্প এতে উঠে এসেছে।
লেখকের পিতা মহেশচন্দ্র আতর্থী ব্রাহ্মসমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তি হওয়ায় তৎকালীন ব্রাহ্ম আন্দোলনের ভেতরের উদারতা এবং একই সঙ্গে কিছু মানুষের গোঁড়ামির বাস্তব চিত্র বইটিতে পাওয়া যায়, যা অন্য কোথাও সহজে মেলা ভার।
উপন্যাসের প্রথম ভাগে ব্রাহ্ম আন্দোলনের প্রভাব স্পষ্ট। লেখকের নিজের পরিবার ব্রাহ্ম হওয়ায় সেখানে ছিল কঠোর অনুশাসন, মদ্যপান-বিরোধী অবস্থান এবং নারীশিক্ষার পক্ষে হাওয়া। তবে একই সঙ্গে সনাতন হিন্দু সমাজ ও তাদের সামাজিক দূরত্ব এবং মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনও বইটিতে নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে।
তৎকালীন বাঙালি পরিবারে ‘পিতার শাসন’ ছিল চরম ও প্রশ্নাতীত। সামান্য ভুলের জন্য সন্তানদের চাবুক দিয়ে মারার যে নির্মম বাস্তবতার কথা লেখক লিখেছেন, তা তৎকালীন মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের কঠোর ও পিতৃতান্ত্রিক রূপটিকে উন্মোচন করে। এই অতিরিক্ত শাসনই অনেক বাঙালি তরুণকে ‘ঘরছাড়া’ বা যাযাবর করে তুলত।
কলকাতার প্লেগ মহামারীর অধ্যায়টি তৎকালীন বাঙালির চরম অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের এক অন্ধকার দিক তুলে ধরে। ইংরেজ সরকারের দেওয়া প্লেগের টিকাকে বাঙালিরা মনে করত ‘বংশনাশের বিষ’। ফলে বিজ্ঞানকে ভয় পেয়ে মানুষ যেভাবে দলে দলে কলকাতা ছেড়ে পালিয়েছিল, তা তৎকালীন বাঙালি সমাজের হুজুগে ও হীনবল মানসিকতার প্রমাণ দেয়।
প্রথম খণ্ডের সবচেয়ে রোমহর্ষক ও ঐতিহাসিক অধ্যায় হল এই প্লেগের বর্ণনা। এটি নিছক মহামারীর বিবরণ নয়, বরং মানুষের মনস্তত্ত্বের দলিল। প্লেগের টিকা নিয়ে তৎকালীন সমাজে ছড়ানো গুজব (যেমন: ইংরেজরা বিষ খাইয়ে মারছে), মানুষের শহর ছেড়ে পালানোর হাহাকার এবং শ্মশান-কবরস্থানের বীভৎসতা লেখক অত্যন্ত নিরাসক্ত কিন্তু তীব্র ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন।
দ্বিতীয় খণ্ডে (১৯৪৭) কাশীর দশাশ্বমেধ ঘাটের বর্ণনা তৎকালীন বাঙালি সমাজের সবচেয়ে বড়ো কলঙ্ককে প্রচ্ছন্ন পর্দার আড়াল থেকে প্রকাশ করে সহজ ভঙ্গিমায়। সমাজ ও পরিবার থেকে বিতাড়িত, তথাকথিত ‘পাপের’ তকমা পাওয়া বাঙালি বালবিধবাদের অসহায়ত্ব, তাঁদের ওপর ধর্মের নামে চলা যৌন ও মানসিক শোষণ এবং ভণ্ড সাধু-সন্ন্যাসীদের অত্যাচার তৎকালীন বাঙালি হিন্দু সমাজের চরম ভণ্ডামিকে নগ্ন করে দেয়। বাড়ি পালিয়ে স্থবির আশ্রয় নিয়েছিল উত্তরপ্রদেশের কাশীতে। সেখানে তার পরিচিতি হয় সমাজের সেই অন্ধকার গলির বাসিন্দাদের সঙ্গে। অভিজ্ঞতা হয়েছিল কাশীর ঘাট এবং দশাশ্বমেধ ঘাটে আশ্রয় নেওয়া বাঙালি বালবিধবাদের করুণ জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের সঙ্গে কাটানোর, সুযোগ হয়েছিল তাঁদের ওপর সমাজের অত্যাচার এবং ধর্মের নামে চলা ভণ্ডামির বাস্তব চিত্রকে তুলে ধরার, যা পাঠককে স্তব্ধ করে দেয়।
এই খণ্ডে স্থবিরের সঙ্গে আলাপ হয় বিভিন্ন চোর, পকেটমার, সাধু এবং তান্ত্রিকদের। তথাকথিত ভদ্রসমাজ যাদের ‘অপরাধী’ বা ‘ব্রাত্য’ বলে দূরে ঠেলে দেয়, স্থবির তাদের ভেতরে খুঁজে পান অকৃত্রিম মানবিকতা। লেখক দেখিয়েছেন, অনেক সময় সাধুর পোশাকের আড়ালে শয়তান এবং চোরের পোশাকের আড়ালে হৃদয়বান মানুষ লুকিয়ে থাকে।
যাযাবর জীবনের পর স্থবির যখন কলকাতায় ফিরে আসেন, তখন তাঁর সামনে শুরু হয় কঠোর জীবনসংগ্রাম। এই খণ্ডটি মূলত তাঁর নানামুখী পেশা পরিবর্তন এবং অভিজ্ঞতার দলিল। এই খণ্ডে (তৃতীয়) বিস্তৃত হয়েছে স্থবিরের কর্মজীবন, নাগরিক সংগ্রাম ও থিয়েটারের অভিজ্ঞতা (১৯৫৪)।
পেট চালানোর জন্য স্থবিরকে করতে হয়েছে নানা কাজ। কখনো তিনি স্পোর্টসের দোকানে ব্যাট-বল বিক্রি করেছেন, কখনো টাইপিস্টের কাজ করেছেন, আবার কখনো জুতো তৈরির কারখানায় শ্রম দিয়েছেন। প্রতিটি পেশার ভেতরের মানুষগুলোকে তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন।
তিনি একসময় বোম্বে (এখনকার মুম্বাই) পাড়ি দেন। সেখানে নানা চড়াই-উতরাইয়ের পর কলকাতার তৎকালীন থিয়েটার এবং সংস্কৃতির জগতের সঙ্গে যুক্ত হন। গিরিশচন্দ্র ঘোষ এবং অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফীর যুগের থিয়েটার কালচার, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ভেতরের রেষারেষি ও মঞ্চের পেছনের আসল রূপটি কাহিনির এক অধ্যায়ে উন্মোচিত হয়েছে।
মহাস্থবির জাতকের চতুর্থ খণ্ডটি (১৯৬৪) বাংলা এবং ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসের জন্য একটি অমূল্য সংগ্রহ। জীবনের শেষভাগে এসে লেখক যখন পুরোপুরি শয্যাশায়ী, তখন অনুলিখনের মাধ্যমে এই খণ্ডটি সম্পূর্ণ করেছিলেন।
বোম্বে থেকে কলকাতায় ফিরে স্থবির যুক্ত হন চলচ্চিত্র নির্মাণে। ভারতীয় চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি প্রযোজনা সংস্থা ‘নিউ থিয়েটার্স’ প্রতিষ্ঠার পেছনের গল্প, নির্বাক সিনেমা থেকে সবাক সিনেমায় রূপান্তরের প্রযুক্তিগত ও মানসিক জটিলতা এখানে উঠে এসেছে।
১৯৩১ সালে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে বাংলার প্রথম টকি বা সবাক ছবি ‘দেনা পাওনা’ পরিচালনার পেছনের সমস্ত কারিগরি সংকট, অভিনেতাদের সংলাপ বলার সমস্যা এবং স্টুডিওর ভেতরের পরিবেশের এক ঐতিহাসিক আলোচনা এই খণ্ডে রয়েছে।
এই খণ্ডের শেষ অধ্যায়গুলোতে এক ধরনের শান্ত, নির্লিপ্ত দার্শনিকতা প্রকাশ পায়। জীবনের সমস্ত আলো-ঝলমলে জগৎ, সেলুলয়েডের ফিতে আর খ্যাতির মোহ পেরিয়ে একজন মানুষ যখন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন তার ভেতরের আত্মোপলব্ধি কেমন হয়— তা দিয়ে এই মহাকাব্যিক উপন্যাসের সমাপ্তি ঘটে।
গ্রন্থটির প্রথম অখণ্ড সংস্করণের প্রকাশক ত্রিদিবেশ বসু এবং বইটির চতুর্থ খণ্ড লিপিবদ্ধকারী সহযোগীদের সূত্রে জানা যায় এক করুণ কিন্তু লড়াকু অধ্যায়ের কথা।
জীবনের শেষ ১০ বছর লেখক যখন তীব্র অসুস্থতায় শয্যাশায়ী ছিলেন এবং আঙুলে কলম ধরার শক্তি হারিয়েছিলেন, তখন তিনি মুখে মুখে চতুর্থ পর্বের কথা বলে যেতেন এবং তা লিখে নেওয়া হত। সাহিত্যিকরা এই পর্যায়টিকে প্রেমাঙ্কুরের লেখার প্রতি এক অবিশ্বাস্য নিষ্ঠা ও “মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জীবনকে জয় করার গল্প” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
এককথায়, সাহিত্যিকদের চোখে ‘মহাস্থবির জাতক’ হল এমন এক কালজয়ী সৃষ্টি যেখানে লেখক নিজের জীবনের কোনো আলো-অন্ধকারকে আড়াল করেননি। জীবনের নগ্ন ও কঠিন সত্যকে পরম কৌতুক আর অগাধ ভালোবাসায় প্রকাশ করার মৌলিক লিখনশৈলী ‘মহাস্থবির জাতক’-কে বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য চূড়ায় বসিয়েছে।
বৌদ্ধ ধর্মে ‘জাতক’ বলতে বুদ্ধের পূর্বজন্মের গল্পগুলোকে বোঝানো হয়, যেখানে তিনি বিভিন্ন রূপে পৃথিবীতে এসে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। প্রেমাঙ্কুর আতর্থী তাঁর এই আত্মজৈবনিক উপন্যাসে নিজেকে একজন ‘মহাস্থবির’ বা প্রবীণ সন্ন্যাসী হিসেবে কল্পনা করেছেন, যিনি তাঁর জীবনের ফেলে আসা বিভিন্ন অধ্যায়কে বা ‘জন্ম’কে নির্লিপ্তভাবে দেখছেন। লেখক এখানে নিজের জীবনকে কোনো অহংকার বা অনুশোচনা ছাড়াই বর্ণনা করেছেন। তিনি একজন নিরপেক্ষ দর্শকের মতো নিজের ভুলভ্রান্তি ও সাফল্যকে ফুটিয়ে তুলেছেন, যা বাংলা সাহিত্যে অত্যন্ত বিরল।
উনিশ শতকের কলকাতার ‘বাবু কালচার’ এবং থিয়েটারের প্রতি বাঙালির তীব্র আসক্তির চিত্র উপন্যাসের বড়ো অংশ জুড়ে রয়েছে। গিরিশচন্দ্র ঘোষ ও অর্ধেন্দুশেখর মুস্তফীর যুগের থিয়েটার কালচারকে লেখক খুব কাছ থেকে দেখেছেন। মঞ্চের সামনের আলো-ঝলমলে রূপের আড়ালে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের চরম দারিদ্র্য, দলগুলোর ভেতরের রেষারেষি এবং থিয়েটারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বাঙালি বাবুদের রক্ষিতা সংস্কৃতির এক বাস্তব চিত্র এখানে পাওয়া যায়।
চতুর্থ খণ্ডটি বাঙালির সাংস্কৃতিক রূপান্তরের এক ঐতিহাসিক দলিল [২, ৩]। ১৯৩০-এর দশকে নির্বাক সিনেমা থেকে সবাক (টকিবাজ) সিনেমায় পা রাখার সময় বাঙালি দর্শকদের মধ্যে যে কৌতূহল ও উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল, তা লেখক দেখিয়েছেন। একই সাথে ‘নিউ থিয়েটার্স’-এর প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাঙালি যে ভারতীয় চলচ্চিত্রের টেকনিক্যাল ও শৈল্পিক দিকটি নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছিল, তার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস এতে রয়েছে।
তৎকালীন অভিজাত বাঙালি সাহিত্য যেখানে শুধু শিক্ষিত ও ভদ্রসমাজের কথা বলত, সেখানে ‘মহাস্থবির জাতক’ বাঙালির এক সমান্তরাল সংস্কৃতির খোঁজ দেয়। কলকাতার মেস জীবন, চোর-পকেটমারদের নিজস্ব ভাষা ও জীবনযাত্রা, কুস্তির আখড়া এবং বাউল-ফকিরদের জীবনকে লেখক বাঙালির লোকসংস্কৃতির অংশ হিসেবে মূলধারার সাহিত্যে নিয়ে এসেছেন।
এককথায়, ‘মহাস্থবির জাতক’ থেকে পাওয়া তৎকালীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি কোনো আদর্শায়িত রূপ নয়। এটি ছিল একদিকে কঠোর অনুশাসন ও ভণ্ডামিতে ভরা, অন্যদিকে থিয়েটার, সিনেমা এবং যাযাবর বৃত্তির এক অদ্ভুত ও প্রাণবন্ত মিশ্রণ।
প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর লেখার সবচেয়ে বড়ো শক্তি হল তাঁর নির্লিপ্ত কৌতুকবোধ (Detached Humor) এবং চলচ্চিত্রধর্মী বর্ণনাশৈলী (Cinematic Narrative)। জীবনের চরম অন্ধকার, দারিদ্র্য, মহামারী (১৮৯৮ সালের কলকাতার প্লেগ) কিংবা কাশীর ঘাটে বালবিধবাদের ওপর হওয়া নির্মম শোষণকে তিনি কোনো অতি-আবেগ (Melodrama) ছাড়াই ফুটিয়ে তুলেছেন। একজন দক্ষ চিত্রপরিচালকের মতো তাঁর লেখনীতে তৎকালীন কলকাতার রাস্তাঘাট বা কাশীর গলিগুলো পাঠকের চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
অকপট সততা: আত্মজীবনীতে সাধারণত মানুষ নিজের ভালো দিকগুলো দেখাতে চায়। কিন্তু লেখক এখানে নিজের জীবনের এলোমেলো দিনগুলো এবং সমাজের তথাকথিত ‘নিষিদ্ধ’ বা ‘গোপন’ অধ্যায়গুলোকে কোনো আড়াল ছাড়াই তুলে ধরেছেন।
ঐতিহাসিক মূল্য: উনিশ শতকের শেষ থেকে বিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাঙালির সামাজিক রূপান্তর, থিয়েটার কালচার এবং ভারতীয় চলচ্চিত্রের আদি যুগের (নিউ থিয়েটার্স-এর প্রতিষ্ঠা) ইতিহাস জানতে এই বইটি একটি অমূল্য আকর গ্রন্থ।
কাঠামোগত শিথিলতা: চার খণ্ডের এই বিশাল উপন্যাসে কোনো ধারাবাহিক বা টানটান একক প্লট নেই। এটি মূলত টুকরো টুকরো স্মৃতির কোলাজ। ফলে অনেক সময় মূল গল্প থেকে বিচ্যুত হয়ে দীর্ঘ বর্ণনা পড়ার ধৈর্য আধুনিক পাঠকদের নাও থাকতে পারে।
চতুর্থ খণ্ডের ভাষার রূপান্তর: জীবনের শেষ ১০ বছর শয্যাশায়ী থাকার কারণে লেখক চতুর্থ খণ্ডটি মুখে মুখে বলেছিলেন এবং অন্য একজন তা লিপিবদ্ধ করেছিলেন। এর ফলে প্রথম তিন খণ্ডের গদ্যের যে স্বভাবসুলভ ধারালো ধার ও তীব্র কৌতুক ছিল, শেষ খণ্ডে এসে তা কিছুটা শান্ত ও দার্শনিকতায় রূপ নিয়েছে।
সমালোচকরা এই উপন্যাসটিকে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘শ্রীকান্ত’ বা সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘জাগরী’-র মতো বিখ্যাত আত্মজৈবনিক উপন্যাসের সমগোত্রীয় বলে মনে করেন। তবে ‘শ্রীকান্ত’-এর মধ্যে যে রোমান্টিক বিষণ্ণতা বা আত্মদয়া ছিল, প্রেমাঙ্কুরের লেখায় তা নেই। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি অনেক বেশি আধুনিক এবং নির্মমভাবে বাস্তববাদী।
‘মহাস্থবির জাতক’ কেবল এক যাযাবরের আত্মকাহিনী নয়, এটি মূলত জীবনের এক মহোৎসবের গল্প । বর্তমান সময়ের পাঠকদের জন্যও এই বইটি অত্যন্ত সমসাময়িক এবং আকর্ষণীয়। পুরোনো কলকাতা, সিনেমা ও থিয়েটারের ইতিহাস এবং এক অদ্ভুত রোমাঞ্চকর জীবনসংগ্রামের কথা জানতে এই বইটি বুকশেলফের অন্যতম সেরা সংগ্রহ হতে বাধ্য।
গঠনগত এবং মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে ‘মহাস্থবির জাতক’-এর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মিল পাওয়া যায় ডিকেন্সের মাস্টারপিস— ‘ডেভিড কপারফিল্ড’-এর।
সাদৃশ্য: দুটি বই-ই ছদ্ম-আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস। ‘ডেভিড কপারফিল্ড’-এ যেমন ডেভিডের শৈশবের কঠোর পারিবারিক অনুশাসন (মিস্টার মার্ডস্টোনের অত্যাচার), ঘর ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া এবং পরবর্তীতে নানামুখী পেশা ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে লেখক হয়ে ওঠার গল্প রয়েছে; ঠিক একইভাবে ‘মহাস্থবির জাতক’-এ স্থবিরের বাবার কঠোর চাবুকের শাসন, বাড়ি থেকে পালানো এবং পরবর্তীতে চলচ্চিত্র জগতে নিজের স্থান তৈরি করার সমান্তরাল চিত্র দেখা যায়।
হাকলবেরি ফিন যেমন সমাজের তৈরি করা কৃত্রিম নিয়মকানুন ও বাবার অত্যাচার থেকে বাঁচতে নদীপথে এক যাযাবর যাত্রা শুরু করেছিল এবং পথে পথে সমাজের আসল রূপ দেখেছিল; স্থবিরের যাত্রাও ঠিক তেমনই অজানার উদ্দেশ্যে। দুজনেই ঘরছাড়া ভবঘুরে এবং দুজনের চোখ দিয়েই পাঠক সমাজের তথাকথিত ভদ্রলোকদের ভণ্ডামি এবং প্রান্তিক মানুষদের ভেতরের আসল মানবিকতা আবিষ্কার করে।
ইংরেজি সাহিত্যে ‘পিকারেস্ক’ (Picaresque) উপন্যাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হল এটি। পিকারেস্ক উপন্যাসের মূল বৈশিষ্ট্য হল— এক চতুর কিন্তু ভবঘুরে নায়ক এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরে বেড়াবে এবং টুকরো টুকরো ঘটনার মাধ্যমে পুরো উপন্যাসের পটভূমি তৈরি হবে। ‘মহাস্থবির জাতক’ অবিকল এই ধারার উপন্যাস। টম জোন্সের মতোই স্থবির কখনো কলকাতা, কখনো বারাণসী, কখনো বোম্বে বা দিল্লি ঘুরে বেড়িয়েছে এবং চোর, সাধু, পকেটমারদের মতো বিচিত্র চরিত্রের মুখোমুখি হয়েছে।
বাংলা সাহিত্যে ‘মহাস্থবির জাতক’-এর সঙ্গে সবচেয়ে স্পষ্ট এবং বহুল আলোচিত সাদৃশ্য পাওয়া যায় শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের। দুটি উপন্যাসই চার খণ্ডে বিভক্ত এবং দুটিই ছদ্ম-আত্মজীবনীমূলক পিকারেস্ক (Picaresque) বা যাযাবরধর্মী উপন্যাস। ‘শ্রীকান্ত’ ও ‘স্থবির’—দুজনেই ঘরছাড়া, ভবঘুরে এবং আজন্ম কৌতুহলী। দুজনেই সমাজ ও সংসারের চেনা বৃত্তের বাইরে গিয়ে শ্মশান, শ্মশানের সন্ন্যাসী, বাইজি এবং সমাজের প্রান্তিক মানুষদের খুব কাছ থেকে দেখেছেন।
শ্রীকান্তের চরিত্রে এক ধরনের রোমান্টিক বিষণ্ণতা, উদাসীনতা ও তীব্র দয়াপরবশ এক মন ছিল। অন্যদিকে, স্থবিরের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক বেশি বাস্তববাদী, আধুনিক এবং নির্মমভাবে অকপট।
বাঙালি কথাসাহিত্যিক অবধূতের অবধূতি বা তান্ত্রিক জীবনভিত্তিক উপন্যাসগুলোর সঙ্গে ‘মহাস্থবির জাতক’-এর দ্বিতীয় খণ্ডের (কাশী পর্ব) চমৎকার মিল রয়েছে।
অবধূতের উপন্যাসগুলোতে যেভাবে তীর্থক্ষেত্রগুলোর (যেমন হিংলাজ বা কাটোয়ার মহাশ্মশান) পেছনের অন্ধকার দিক, ভণ্ড সাধু-সন্ন্যাসীদের অত্যাচার, লালসা এবং ধর্মের নামে চলা ব্যবসার নগ্ন রূপ ফুটে উঠেছে, ‘মহাস্থবির জাতক’-এ স্থবিরের চোখে কাশীর দশাশ্বমেধ ঘাটের বাঙালি বালবিধবাদের করুণ জীবন এবং ভণ্ড তান্ত্রিকদের রূপ অবিকল সেভাবেই ধরা দিয়েছে।
‘মহাস্থবির জাতক’-এর সবচেয়ে বড়ো সার্থকতা হল এর নামকরণের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা দার্শনিক সত্য। বৌদ্ধ জাতকের গল্পের মতো এখানেও ‘স্থবির’ একের পর এক পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে নতুন নতুন ‘জন্ম’ বা অধ্যায়ের মুখোমুখি হয়েছেন। শৈশবের কঠোর পারিবারিক অনুশাসন, কলকাতার প্লেগ মহামারী, কাশীর ঘাটের অন্ধকার দিক, মেস লাইফের জীবনসংগ্রাম কিংবা থিয়েটার ও সিনেমার আলো-ঝলমলে জগত— প্রতিটি অধ্যায়কে তিনি এমন এক আশ্চর্য নির্লিপ্ততা ও সূক্ষ্ম হাস্যরসের মোড়কে প্রকাশ করেছেন, যা বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে এক বিশেষ স্থান অধিকারে সক্ষম।
শেষকথায় বইটির সেরা কয়েকটি উদ্ধৃতি রইল
“মানুষের জীবনের কাহিনীই সব-চাইতে বিচিত্র উপন্যাস।”— এটি অখণ্ড ‘মহাস্থবির জাতক’-এর অন্যতম সেরা উক্তি।
এছাড়া —
“মানুষকে দেখেছি, কিন্তু তাকে সাজাই নি; তার বিষ ও তার অমৃত—দুই-ই দু’হাতে ভরে নিয়েছি।”
“কোনও ছেঁদো কথার জাল ফেলে উড়ন্ত পাখির ডানা বাঁধতে চাই নি।” লেখকের আত্মবিশ্বাসী সাহিত্যদৃষ্টি এখানে স্পষ্ট।
“শৈশবের দিনগুলি চলে যায়, কিন্তু তাদের ছায়া কখনও সরে যায় না।”
“দুঃখ যত গভীর, স্মৃতি তত উজ্জ্বল।”
“যে-মানুষ হাসতে জানে, সে কাঁদতেও জানে সবচেয়ে গভীরভাবে।”
“জীবনে যাদের একবার সত্যি ভালোবেসেছি, তারা কখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায় না।”
“বিস্ময় হারানো মানেই বয়স বেড়ে যাওয়া।”
“অতীত কখনও মরে না; সে কেবল অন্য রূপে ফিরে আসে।”
“মানুষের ভিতরে একই সঙ্গে দেবতা ও অসুর বাস করে।”
“শিশুমন পৃথিবীকে যেমন দেখে, তেমন নির্মল দৃষ্টি বড়দের আর থাকে না।”
“স্মৃতিরও নিজস্ব আলো আছে— সে অন্ধকারের মধ্যেও পথ দেখায়।”