• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৩ | জুলাই ২০২৬ | গ্রন্থ-সমালোচনা
    Share
  • খাওয়া আর রাঁধার গপ্পে মজিয়ে দেওয়া বই : স্বাতী পারেখ

    খাই দাই ঘুরি ফিরি — অভিজিৎ চক্রবর্তী; প্রচ্ছদ—দেবাশীষ দেব; প্রকাশক- সপ্তর্ষি প্রকাশন, কলকাতা ৭০০০০৯; এপ্রিল ২০২৫

    বইয়ের নাম “খাই দাই ঘুরি ফিরি”। লেখক বিজ্ঞানী অভিজিৎ চক্রবর্তী। সপ্তর্ষি প্রকাশনা থেকে বইটি প্রকাশিত। কোভিডের সময় আমাদের জীবন গৃহবন্দি ছিল। সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের তখনকার অবসাদ, মনখারাপ দূর করতে এক বিরাট ভূমিকা পালন করেছিল। সে সময় ফেসবুকের পাতায় লেখকের রান্না সংক্রান্ত চমৎকার লেখা পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। রোজই অপেক্ষায় থাকতাম এরপর নতুন কী রন্ধনপ্রণালী নিয়ে আসেন তিনি। আরও মুগ্ধ হতাম লেখার বৈশিষ্ট্যে, নানা জায়গার নানা রকমের গল্প শোনাতে শোনাতে রান্নার খুঁটিনাটি কলা-কৌশল শিখিয়ে দেওয়া হয়ে যেত। হাত নিশপিশ করত রান্নাগুলো নিজের হাতে করে দেখতে।

    ফেসবুকের ইতস্তত লেখাগুলো অবশেষে পুস্তকাকারে প্রকাশিত হল। বইটি হাতে পেয়ে বহুবার পড়ে ফেলেছি। বইয়ের যেকোনো স্থান থেকে সময়ে অসময়ে পড়তে গিয়ে দেখেছি মন কখন লেখার রসে ডুবে গেছে। কয়েক বার এমন হয়েছে যে রান্নাগুলো করার অভিলাষ জাগছে, আবার সেই সঙ্গে লেখা শেষের চমকগুলোতে বেশ মজা লাগছে। উদাহরণ দেওয়া যাক। লেখকের বই থেকে উদ্ধৃতি দিলে বোঝা যাবে: “সম্বৎসর যদি আপনার রসনাকে ধারালো রাখতে চান তবে মার্চ-এপ্রিলে নিয়মিত নিম বেগুনের সেবা জরুরি। লুচি আর বেগুনভাজা আমার বেণীমাধব।” কিংবা “বেণীমাধব শব্দটিকে পালটে দিলে আর যেমন মালতীবালা হবে না, তেমনি বেগুনকে সর্ষের তেলের বদলে সূর্যমুখী তেলে কিংবা অলিভ অয়েলে ভাজলেও তাই।” অথবা, “তাপসীর মাছের ঝোল আর কণকদির মাছের ঝোল সম্পূর্ণ আলাদা। বর্ণে, গন্ধে, ছন্দে, গীতিতে” — রান্নার গপ্পে এরকম বাক্যবন্ধ অনেক আছে যা মনে রসবোধ জাগিয়ে তোলে।

    ভাবছি, বইটা কী জাতীয়? নিছক রান্নার বই তো নয়, আবার সাহিত্যরসে টইটম্বুর। সঙ্গে রয়েছে দেশে-বিদেশে ঘোরাফেরার গপ্পো, যেন কবিতা। অতশত ঘোরাফেরা “কলেজ-জ্যাকেরিয়া-সুকিয়া স্ট্রিট থেকে বর্ধমান-বাসন্তী, চিকমাগালুরু হয়ে সুকুবা-লন্ডন-প্যারিস” অতীব সংক্ষিপ্ত পরিসরে বর্ণনা, সঙ্গে রান্না ও খাওয়ার বর্ণনা— খাওয়ার বর্ণনাই বেশি— যেন এক দীর্ঘ কবিতা। বইয়ের “খাই খাই” অংশে খাদ্যরসে মজে ছিলাম। “ঘুরি ফিরি” অংশে মন ভরল না। ঘোরাফেরার আরও গপ্পো শোনার আকাঙ্ক্ষা রয়ে গেল।

    লেখক যে খাদ্যরসিক এবং খুব ভালো রন্ধনশিল্পী, তা লেখার ছত্রে ছত্রে প্রকাশ। একে বিজ্ঞানী তায় সঙ্গীত বিশেষত উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত ও কাব্যে পারদর্শী, উপরন্তু ক্রীড়া বিশেষজ্ঞ, ফলে লেখায় উপমা দেবার ক্ষেত্রে কখনও তিনি সঙ্গীতের রাগ, কখনও বা জয় গোস্বামী, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার উদ্ধৃতি দিয়েছেন, ক্রিকেট খেলোয়াড়দের প্রসঙ্গ এনেছেন। বড়ো ভালো লাগল ওনার বিবিধ রসবোধের পরিচয় পেয়ে। সাহিত্যরস, শিল্পরস, কাব্যরস সব রসের সংমিশ্রণে একটি অতীব সুস্বাদু লেখা পরিবেশন করলেন তিনি। পাঠকবর্গও সেই রসাস্বাদনে আনন্দ লাভ করবেন। বইটি ঘরে ঘরে আদরণীয় হবে। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয় পরিজনকে উপহার দিলে তারাও আমার মতো খাদ্যরস, কাব্যরস আস্বাদন করে পরম তৃপ্তি লাভ করবেন।

    দেশ-বিদেশ ঘুরে, নানাবিধ খাবার গ্রহণ করে অবশেষে বাড়ি ফিরে গরম গরম ভাত, মুসুরির ডাল, সঙ্গে আলুভাজা অথবা আলুসেদ্ধ কাঁচালঙ্কা সহযোগে অমৃততুল্য। সঙ্গে হালকা মাছের ঝোল তো সোনায় সোহাগা!

    বইয়ে দেওয়া রন্ধন প্রণালীর পদ্ধতিটি চমৎকার। খুব মশলা, নামীদামি উপকরণ দিলেই যে রান্না সুস্বাদু হবে তা নয়। সাধারণ উপকরণ যদি নুন-হলুদের জ্ঞান মাথায় রেখে রান্না করা যায় তা ম্যাজিক ঘটাতে পারে। রন্ধন এক মহান শিল্প। সুস্বাদু রান্না রেঁধে খাইয়ে যদি অন্যকে তৃপ্তি দেওয়া যায়, তার মতো আনন্দ আর কিছুতে হয় না।

    জীবন ধারণের জন্য খাদ্যগ্রহণ প্রয়োজন কিন্তু শুধু উদরপূর্তির জন্য খাওয়া, সেটা খাওয়া নয়। উপকরণ যত সামান্যই হোক, রান্নায় যদি যত্ন থাকে তাহলে সে রান্না স্বর্গীয় সুখ দিতে পারে। কখন কোন রান্না কার হাতে ভালো খুলবে, সেটাও একটা রহস্য। অতি ভালো রাঁধুনিও কখনও ভুলভাল রান্না করে ফেলতে পারে। আবার আনাড়ির হাতে কখনও কী জাদুমন্ত্রে সামান্য নুন-হলুদে অসাধারণ সুস্বাদু রান্না হয়ে যেতেই পারে। দেশ-কাল-মেজাজ ভেদে খাদ্যের স্বাদ বিভিন্ন হয়। ব্যক্তিগত খাদ্যরুচির ব্যাপারও আছে: কেউ ঝাল পছন্দ করে, কেউ বিনা ঝালে স্বস্তি পায়, নিরাপদ বোধ করে। কেউ নুন বেশি খায়, কেউ বা কম। কেউ তেলে-ঝোলে-ঝালেতে খুশি, কেউ বা হালকা-পলকা রান্নায় তৃপ্ত। বাঙালি রান্নায় ফোড়নের এক বিশাল ভূমিকা, একথা সত্য। রান্নার ক্ষেত্রে আগুনের তাপও উল্লেখযোগ্য। কোনও কোনও রান্না ঢিমে আঁচে জমে যায়, কোনোটার জন্য বেশি আঁচের প্রয়োজন হয়। আমার বাঙালি জিভে যে খাদ্যবস্তু অতি প্রিয়, অন্য অবাঙালি জিভে তা অখাদ্য, কুখাদ্য— এ আমার বৈবাহিক জীবনের অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত।

    যখন ডালহৌসি পাড়ায় অফিসে যেতাম, তখন ফুটপাতে খাবারের দোকান দেখতাম, সেখানে বেঞ্চে বসে লোকেরা লাল করে ভাজা ডিমের কারি ভাতে মেখে পরিতৃপ্তি করে খাচ্ছে। অনেক সময় মনে হত ওদের সঙ্গে বেঞ্চে বসে খেয়ে দেখি। রবীন্দ্রসদনে যাওয়ার রাস্তায় ইঁটের উনুনে নোংরা কালো কড়াইতে বাজারের ঝড়তি-পড়তি সবজি দিয়ে যে রান্না ফুটপাথবাসী করত, তার থেকে চমৎকার সুগন্ধ বের হত। দিনের শেষে, সারা দিন খাটাখাটুনির পর সদ্য হাঁড়ি থেকে নামানো গরম ভাতের সঙ্গে সেই তরকারি তাদের মুখে অমৃত ছাড়া আর কীই বা হতে পারে? সেই রান্নার কাছে কোথায় লাগে ফাইভ স্টার হোটেলের রান্না!

    খাওয়ার ব্যাপারটাও আপেক্ষিক। কখন কোন খাদ্য আমার রসনাকে পরিতৃপ্ত করবে তা বোঝা কঠিন। অসুস্থ শরীরে হাজার সুস্বাদু রান্না বিরিয়ানি-কোপ্তা-কালিয়া-মাটন-পিৎজা নামীদামি খাবার যতই ভালো হোক, মুখে কিছুই রুচবে না। আবার গ্রামে কোনও চাষির বাড়ির দাওয়ায় মাদুরে বসে নারকেল দিয়ে মুড়ি দুর্দান্ত লাগবে। একবার গাড়িতে দিল্লি থেকে জয়পুর যাওয়ার পথে ধাবায় আলুর পরোটা আর টক দই, সঙ্গে কাঁচালঙ্কা আর লালচে পেঁয়াজ দিয়েছিল, তার স্বাদটা এখনও টের পাই।

    অভিজিৎ চক্রবর্তীর বই পড়ে রান্নার উৎসাহ আরও বেড়ে গেল। বাংলার নানা ধরনের শাক, ডুমুর, চালতা, উচ্ছে, বেগুন, পটল, মুলো দিয়ে অভিনব সব রান্নার গপ্পো আছে বইটাতে, আছে মাছের রান্নারও অনেক রকমফের। বিদেশি খাওয়ার অত নাম জানি না, বই পড়ে অনেক কিছু জানলাম। বিদেশে পিৎজা, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, বার্গার, টুনা ফিশ ইত্যাদির সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। তবে ইচ্ছে রইল পৃথিবী ত্যাগের আগে বইয়ে বর্ণিত কিছু কিছু খাদ্য গ্রহণের সুখ অনুভব করার। খাদ্য বিনা প্রাণ বাঁচে না। অথচ খাদ্যবস্তুতেও ধর্মের হাত। কিছু খাদ্য শাস্ত্রসম্মত নয়, কিছু খাদ্য অবশ্য গ্রহণীয়। তাছাড়া শরীরের অসুস্থতার কারণেও ডাক্তারের বিধিনিষেধ থাকায় সব খাদ্য ইচ্ছে থাকলেও গ্রহণ করা যায় না।

    “খাই দাই ঘুরি ফিরি” পাঠ করে আমার যে প্রতিক্রিয়া তা হল ব্রহ্মজ্ঞানানুভূতির মতো, খাদ্যরসানুভতি। ঘরে ঘরে এই বই সমাদর পাক, এই আমার অভিপ্রায়।

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments