• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৩ | জুলাই ২০২৬ | গল্প
    Share
  • কলাকারী فنکاری : আনোয়ার খান
    translated from Urdu to Bengali by শুভময় রায়

    [আনোয়ার খান (انورخاں; ১৯৪২ - ২০০১) জন্ম বোম্বেতে। উর্দু আর ফারসিতে ডবল এম.এ. নিয়ে তিনি বোম্বে পোর্ট ট্রাস্টে চাকরি জীবন শুরু করেন। তাঁর লেখা ছোট গল্প প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭০-এ, যার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে তিনি গদ্যসাহিত্য রচনা করে চলেন। এই শতাব্দের দ্বিতীয় বছরটিতে অকালমৃত্যুর আগে পর্যন্ত তাঁর চারটি ছোট গল্পের সংকলন আর একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়। আনোয়ারের গল্পে উঠে এসেছে নিজের শহরের চলমান জীবনের বিচিত্র সব চিত্র – বিশেষত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর জীবন এবং উপসংস্কৃতির ছবি। শহুরে জীবনের নিবিড় পর্যবেক্ষক হিসেবে এই কথাসাহিত্যিকের রচনা সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করেছে।

    অনূদিত গল্পটি মেয়ার পাবলিকেশনস্‌, নতুন দিল্লি থেকে ১৯৮৪-তে প্রকাশিত ‘ফনকারি’ শীর্ষক গল্প সংকলন থেকে সংগৃহীত।...অনুবাদক]

    ভারত হিন্দু হোটেলে শেঠী চায়ের দাম বাড়াতে বিভিন্ন টেবিলে রোজ আড্ডা দেওয়ার জন্য বেকার যুবকদের যে আসর বসত সেখানে তুমুল হইচই শুরু হল। দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি আর সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার পরে স্থির হল এই দাম বাড়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে। টেবিল-বয়কে দিয়ে খবরের কাগজটা আনিয়ে সেদিনই সন্ধ্যার অনুষ্ঠানের তালিকাটা দেখে শহরের সব হোমরাচোমরার উপস্থিত থাকার সম্ভাবনা আছে এমন একটা প্রোগ্রাম বেছে নেওয়া হল।

    অনুষ্ঠানের জায়গায় প্যান্ডেলটা নানা রঙের পতাকা দিয়ে সাজানো। সুসজ্জিত রইস আদমিরা সব ভেতরে ভিড় করেছে, প্যান্ডেলের অদূরে ছোট-বড় নানা আকারের গাড়ি দাঁড়িয়ে। আর তাদের আধখোলা দরজার পেছনে বসে বিড়ি ফুঁকছে কতগুলো ড্রাইভার। প্যান্ডেলের ভেতরে মেয়রের বক্তৃতা চলেছে.......:

    ‘সব শহরের মধ্যে রাজকন্যা এ শহরের উজ্জ্বল ঐতিহ্যের কথা মনে রেখে...’

    ‘হায় হায়... হায় হায়…’ জড়ো হওয়া যুবকদের হাড়-জিরজিরে শরীরের বেরিয়ে থাকা পাঁজরের মধ্য থেকে সম্মিলিত চিৎকারটা যেন অসংখ্য তীরের মতো দিগ্‌বিদিকে ছড়িয়ে পড়ল।

    বক্তৃতার মধ্যেই মেয়রের গলাটা কেঁপে উঠল। তিনি কথা বলা থামিয়ে দিলেন। লোকজন হতভম্ব হয়ে তখন দেখার চেষ্টা করছে যে শোরগোলটা আসছে কোত্থেকে!

    ‘সমাজ বদলাও,’ আবার একটা হুংকার যেন আকাশ বাতাস বিদীর্ণ করে দিল।

    মঞ্চে বসা অতিথিরা বিরক্ত। তাদের কপাল কুঁচকে আছে।

    একদল সেপাই আর সাব-ইন্সপেক্টর সঙ্গে নিয়ে পুলিশ কমিশনার বিক্ষোভকারীদের দিকে এগিয়ে গেলেন।

    ‘আমরা প্রতিবাদ জানাতে এসেছি,’ যুবকদের মধ্যে একজন মুখ খুলল। ‘হ্যাঁ স্যার, আমরা সবাই অনেক বছর ধরে বেকার!’ পাশ থেকে আরেকজন বলে উঠল।

    ‘আপনারা প্যান্ডেলের বাইরে গিয়ে যা করার করুন, ভেতরে নয়,’ পুলিশ কমিশনার বললেন।

    যুবকের দল নিঃশব্দে প্যান্ডেলের বাইরে বেরিয়ে গেল। কিন্তু তারপরেই আবার ‘হায় হায়... হায় হায়...’ আর ‘সমাজ কো বদল ডালো...’ স্লোগানে চারিদিকে হুলুস্থুল পড়ে গেল।

    জলসা দেখতে আসা আরও কিছু যুবক-যুবতীর বোধহয় প্রতিবাদ-বিক্ষোভটা মনে ধরেছিল। তারাও প্যান্ডেলের বাইরে এসে বিক্ষুব্ধদের দলে যোগ দিল।

    পরের দিনও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। তৃতীয় দিন, চতুর্থ দিন, পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম ... অবশেষে শহরের মন্ত্রী-আমলা আর অন্যান্য হোমরাচোমরারা মিটিংয়ের পরে একজোট হয়ে জানালেন যে এই ধরনের বিক্ষোভ আর ধরনা শহরের চিরাচরিত ঐতিহ্যের পরিপন্থী। এতে শহরের বদনাম হচ্ছে। কয়েকজন আইনজীবীর পরামর্শ ছিল এ জাতীয় সমবেত প্রতিবাদ-বিক্ষোভ রোধে আইন প্রণয়ন করা উচিত। কিন্তু ট্রেড ইউনিয়নের নেতারা তার বিরোধিতা করলেন। শেষমেশ সভায় কোনও সিদ্ধান্তই গৃহীত হল না।

    আরও এমন সভা-এজলাস বসলেও কোথাও সর্বসম্মতিক্রমে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছোনো গেল না।

    প্রতিবাদী যুবকের দল তো ‘হায় হায়’ আর ‘সমাজ কো বদল ডালো’ স্লোগান দিয়ে তাদের বিক্ষোভ শুরু করেছিল। কিন্তু এখন আন্দোলনকে জোরদার করতে তারা আরও কিছু উপায় অবলম্বন করল। দেখা গেল ‘হায় হায়’ এর বদলে বিক্ষুব্ধদের জমায়েতে প্রথমে আকাশ ফাটিয়ে কান্নার রোল উঠছে। আর তারপরেই সমবেতদের গভীর দীর্ঘশ্বাস। আরও নজরে এল যে আশপাশের এলাকার লোকজন এই বিক্ষোভ প্রদর্শন দেখতে হাসতে হাসতে আসে আর কাঁদতে কাঁদতে ফিরে যায়।

    আন্দোলন কিন্তু সেখানেই শেষ হল না। আর একদল যুবক বিক্ষোভ-প্রতিবাদকে আরও শৈল্পিক রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টায় শব্দ বা আওয়াজের বদলে অঙ্গভঙ্গি আর মূকাভিনয়ের আশ্রয় নিল। দু-চারজন জামা খুলে খালি গায়ে পেট পাকড়ে ধরে মাটিতে বসে পড়ে, কেউ কেউ খিদেয় মরে যাচ্ছে এমন অভিনয় করে মাটিতে ত্যাড়াবাঁকাভাবে শুয়ে পড়ে, গড়াগড়ি খায়। আর দলের বাকিরা বন্ধুদের ঘিরে ধরে শূন্য দৃষ্টি নিয়ে আকাশ পানে চেয়ে থাকে। তাতে হল কী মানুষ এবার বক্তৃতা শুনতে অথবা সঙ্গীতানুষ্ঠানে যাওয়ার বদলে বিক্ষুব্ধ যুবকদের চারপাশে তামাশা দেখার জন্য ভিড় জমাল।

    এই সময় শহরের বাসিন্দা দেশের নামী শিল্পপতির মেয়ের বিয়ের এলাহি আয়োজন চলছিল। বহু ধনী মানুষের সমাগম হবে, জাঁকজমকের শেষ নেই। শহর, এমনকী বাইরেরও নির্বাচিত সেলিব্রিটিরা অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছে। টেলিভিশনের ক্যামেরার ছড়াছড়ি, দূরদর্শনের অধিকর্তা স্বয়ং সামনের সারিতে বসে। হঠাৎই শোরগোল ফেলে সেখানে বিক্ষোভকারীদের আগমন ঘটল। অতিথি-অভ্যাগতদের কপালে বিরক্তির ভ্রূকুটি ফুটে উঠল। পুলিশ কমিশনার নিজেই দ্রুত পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। কিন্তু কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগেই দূরদর্শনের অধিকর্তার মনে হঠাৎ বিজলিচমকের মত একটা চিন্তা ঝিলিক মারল। দ্রুত পায়ে মঞ্চে উঠে তিনি মাইক্রোফোনের সামনে এলেন। তারপর আন্দোলনকারীদের অনুরোধ করলেন যে তারা বাইরে গণ্ডগোল না করে মঞ্চে এসেই তো শিল্পকলার প্রদর্শনের মাধ্যমে দর্শকদের মনোরঞ্জন করতে পারে!

    এমন একটা সম্পূর্ণ নতুন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে বিক্ষুব্ধ যুবকেরা প্রস্তুত ছিল না। এমন যে ঘটতে পারে তা তারা স্বপ্নেও ভাবেনি। তাদের হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে সমবেত দর্শকমণ্ডলী কেউ চেঁচিয়ে, কেউ হাততালি দিয়ে তখন তাদের এগিয়ে যাবার জন্য উৎসাহিত করছে। কিছু দর্শক তো প্রায় ধাক্কা দিতে দিতে কয়েকজনকে মঞ্চে তুলেই দিল।

    বিক্ষুব্ধদের মধ্যে কারও কারও মনে হল তাদের আন্দোলন যে জয়ী হতে চলেছে এটা হয়ত তারই ইঙ্গিত। তারা স্টেজে উঠে মূকাভিনয় শুরু করল। প্রদর্শন শেষ হতে দেখা গেল দর্শকবৃন্দ দাঁড়িয়ে উঠে হাতে তালি বাজিয়ে কলাকারদের ভূয়সী তারিফ করছে।

    ঘটনার পরদিন বিক্ষুব্ধ যুবকের দল তাদের কলাকুশল প্রদর্শনের জন্য দূরদর্শনের ডাক পেল। প্রদর্শনটি টিভিতে সম্প্রচারিত হল। অত্যন্ত জনপ্রিয় হল সে অনুষ্ঠান। সংবাদপত্রে প্রশংসাসূচক খবর ছাপা হল।

    পরের সপ্তাহে রেডিও থেকে আমন্ত্রণ এল। তারপরে কয়েকটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানও শিল্পীদের আমন্ত্রণ জানাল। ধীরে ধীরে একটা নতুন ট্রেন্ড দেখা দিল – যে কোনও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এখন বিলাপ-আর্তনাদ আর অঙ্গভঙ্গি দিয়ে শুরু হয়। চারুশিল্পে বিলাপ আর ক্রন্দনধ্বনি একটি বিশেষ জ়ঁর হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করল। বিলাপ-নৃত্য, বিলাপ-সঙ্গীত, বিলাপ-শিল্প...

    বিক্ষুব্ধ যুবকদের হাড়-জিরজিরে চেহারা আর বেরিয়ে থাকা পাঁজরগুলো এবার চর্বি আর মাংসের আস্তরণের নিচে চাপা পড়ে গেল। এখন তারা ধবধবে উজ্জ্বল সাদা শার্ট আর গাঢ় রঙের স্যুট পড়ে চুলে ব্রিলক্রিম লাগিয়ে হাততালির আওয়াজের মধ্য দিয়ে স্টেজে ওঠে। বরং বলা ভালো অত্যন্ত সম্মান দেখিয়ে তাদের স্টেজে তোলা হয়। অনেক স্বীকৃতি মিলল, কিছু পুরস্কারও তারা পেল। শহরের বিত্তবান মানুষের এলাকায় তারা একে একে চকমেলানো বাড়ির মালিক হল। শহরের যে কোন গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পার্টি, রেডিও আর টিভিতে তাদের উপস্থিতি অপরিহার্য হয়ে উঠল।

    তারপরে হল কী চায়ের দোকানের মালিক সেই শেঠী আরও একবার চায়ের দাম বাড়াতেই বিভিন্ন টেবিলে রোজ আড্ডা দেওয়ার জন্য বেকার যুবকদের যে আসর বসত সেখানে তুমুল হইচই শুরু হল। দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি আর সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার পরে স্থির হল এই দাম বাড়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে। টেবিল-বয়কে দিয়ে খবরের কাগজটা আনিয়ে সেদিনই সন্ধ্যার অনুষ্ঠানের তালিকাটা দেখে শহরের সব হোমরাচোমরার উপস্থিত থাকার সম্ভাবনা এমন একটা প্রোগ্রাম বেছে নেওয়া হল।

    অনুষ্ঠানের জায়গায় প্যান্ডেলটা নানা রঙের পতাকা দিয়ে সাজানো। সুসজ্জিত রইস আদমিরা সব ভেতরে ভিড় করেছে, প্যান্ডেলের অদূরে ছোট-বড় নানা আকারের গাড়ি দাঁড়িয়ে। আর তাদের আধখোলা দরজার পেছনে বসে বিড়ি ফুঁকছে কতগুলো ড্রাইভার। প্যান্ডেলের ভেতরে মেয়রের বক্তৃতা চলেছে..

    ‘সব শহরের মধ্যে রাজকন্যা এ শহরের উজ্জ্বল ঐতিহ্যের কথা মনে রেখে...’

    ‘হায় হায়... হায় হায়…’ জড়ো হওয়া যুবকদের হাড়-জিরজিরে শরীরের বেরিয়ে থাকা পাঁজরের মধ্য থেকে সম্মিলিত চিৎকারটা যেন অসংখ্য তীরের মতো দিগ্‌বিদিকে ছড়িয়ে পড়ল।

    বক্তৃতার মধ্যেই মেয়রের গলাটা কেঁপে উঠল। তিনি কথা বলা থামিয়ে দিলেন। লোকজন হতভম্ব হয়ে তখন দেখার চেষ্টা করছে যে শোরগোলটা আসছে কোত্থেকে!

    ‘সমাজ বদলাও,’ আবার একটা হুংকার যেন আকাশ বাতাস বিদীর্ণ করে দিল।

    চারপাশে অস্বস্তিকর নিঃশব্দতা। তারপরে ফিসফাস। তারপরে হঠাৎই শ্রোতারা বিরক্ত হয়ে চিৎকার জুড়ল, ‘এই এরা কারা যারা বিক্ষোভ দেখানোর সময় সাধারণ নিয়ম-নীতিরও তোয়াক্কা করে না?’

    বেকার যুবকদের মণ্ডপের বাইরে বার করে দেওয়া হল।

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments