



পুত্রবধূর কলমে গৌরী আইয়ুব এবং প্রসঙ্গত — চম্পাকলি আইয়ুব; প্রকাশক—পরবাস; প্রচ্ছদ- সম্বিত বসু; প্রথম প্রকাশ— জানুয়ারি ২০২৬; ISBN: 978-1-946582-5-77 সেই লজ্জা এবং দুঃখের দারিদ্র্যর কিছুটা অবসান ঘটানোর উদ্দেশ্যে গৌরী আইয়ুবের পুত্রবধূ চম্পাকলি আইয়ুব কলম ধরেছেন এবং এই গ্রন্থটি উপহার দিয়েছেন বাঙালি পাঠকসমাজকে। Biology-তে Ph.D এবং Physics এর M.Sc লেখকের কলমে যে বিজ্ঞানলক্ষ্মী এবং সাহিত্য-সরস্বতীর যুগপৎ আশীর্বাদ বর্ষিত — এই বই তার স্নিগ্ধ স্বাক্ষর বহন করে। চম্পাকলির বিদগ্ধ শ্বশুর তাঁকে এই আশীর্বাদই করেছিলেন।
তবে যে কথাটি এই আলোচনার মুখবন্ধেই স্বীকার করে নেওয়া দরকার, বা ঘোষণা করার — তা হল এটি আদৌ কোনও জীবনীগ্রন্থ নয়; প্রকৃত অর্থে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর নীরবিন্দুর মত, বা প্রতিভা বসুর স্মৃতি সততই সুখের মত স্মৃতিচিত্রণও নয়। অথচ একটি মানুষকে জানতে গেলে, কিছুটা অন্তত চিনতে গেলে যেমন কিছু তথ্য আবশ্যক, তেমনি তাঁর অন্তরঙ্গ কিছু মানুষের সঙ্গে আন্তরিক কথোপকথনের দলিলও দরকার বৈকি!
এই আলোচ্য বইটি তাই জীবনী, স্মৃতিচারণ এবং সমাজচিত্রের একটি দৃষ্টিনন্দন, (নাকি পাঠনন্দন?) কোলাজ। বাংলাতে candid এর প্রতিশব্দ থাকলে লিখতাম candid কোলাজ। চম্পাকলিকে কুর্নিশ এই রচনার জন্য।
২৫ বছর বয়সে তাঁর দ্বিগুণ বয়সের অধ্যাপককে স্বামী হিসেবে বরণ করে নিয়েছিলেন গৌরী দত্ত: দর্শনের অধ্যাপক নীতিনিষ্ঠ ধীরেন্দ্রমোহনের কন্যাটি। আজ থেকে সাত দশক আগের বাঙালি সমাজে এই বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত তাঁকে বঞ্চিত করেছিল নিজের পিতার স্নেহচ্ছায়া থেকে সুদীর্ঘ ১৮ বছর। সেই পিতৃস্নেহে নিশ্চয়ই আঘাত ছিল, কিন্তু অবহেলা নয়। দীর্ঘ অদর্শন এবং বিচ্ছেদের পরে যে পুনর্মিলনের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা আছে, তার মানবিক মাধুর্য আমাদের মুগ্ধ করে!
সমগ্র বইটিতে মোটামুটি ছয়টি অধ্যায় বা অংশ: গোড়ার কথা, বা প্রাক্কথন (৪) গৌরী আইয়ুবের জীবনী (১১), আমার শাশুড়ি-মা (৬৯), মায়ের ও আমার পরস্পরকে লেখা চিঠি (৭৮), গৌরী আইয়ুবকে লেখা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের চিঠি (৩৩), মায়ের স্মৃতিচারণায় আমাদের বিবাহ-অনুষ্ঠান (৬) এবং সব শেষে ৫ নম্বর পার্ল রোড্ : শেষ অংক (১১) । (বন্ধনীতে মোট পৃষ্ঠাসংখ্যা)।
বইটির অঙ্গসৌষ্ঠব সুন্দর। শ্যেনদৃষ্টিতেও কোনও মুদ্রণপ্রমাদ চোখে পড়েনি। এই কৃতিত্ব অবশ্যই ‘পরবাস’ প্রকাশনের।
আরও বিশদে যাবার আগে গৌরী আইয়ুবের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলি যদি ‘বুলেট’-বদ্ধ করতে চাই তা’হলে কি কি পাই? ⯀লেখিকা ⯀সমাজসেবী ⯀শিক্ষা-বিশারদ্ ⯀সুগৃহিণী ⯀অতিথি-বৎসল ⯀সুরসিকা ⯀নাস্তিক বা অনীশ্বরবাদী ⯀রন্ধন-পটিয়সী ⯀অতীব স্নেহ-পরায়ণা অথচ আদ্যন্ত ব্যবহারিক বা practical ⯀বিনয়ী অথচ দৃঢ়চেতা (বিদ্যাসাগরীয় তত্ত্বানুযায়ী স্নেহের স্বভাবানুসারে অকারণ আশঙ্কা প্রবণ)
জানি না ঠিক কি রসায়নে এই নিবিড়ভাবে ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ মনের গভীরে গিয়ে মনকে দ্রবীভূত করে, আবার পরমুহূর্তেই সাম্প্রদায়িক সমস্যা বা সম্প্রীতির উল্লেখ পাঠককে নামিয়ে আনে বাস্তবের কংক্রিটে। শাশুড়ি-মাকে নিয়ে রচিত এই গ্রন্থটি খানিকটা অগোছালো বলেই কি বহমান স্রোতের মতন পাঠককে টেনে নিয়ে চলে নির্বাধ নিস্তরঙ্গ? অসুস্থ স্বামীর নিয়ত সেবা-পরিষেবা ছাড়াও তাঁকে বৌদ্ধিক সাহচর্য দিতে গিয়ে নিজের সাহিত্য-চর্চা বা উচ্চতর শিক্ষার্জন হয়ে ওঠেনি, কিন্তু “অজস্র-সহস্রবিধ চরিতার্থতায়” কীভাবে তাঁর জীবন ভরে উঠেছিল অসংখ্য গুণিজনের সান্নিধ্যে, শ্রদ্ধায়, সম্মানে ও প্রশংসায় তার পরিচয় এই বইয়ের পঞ্চম অংশে, অর্থাৎ ওঁকে লেখা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের চিঠিতে। কে নেই তার মধ্যে? অমিতা সেন, কৃষ্ণ কৃপালনি, গৌরকিশোর ঘোষ, নীরদ চৌধুরী, নীলিমা সেন, বীণা দাস (ভৌমিক), শঙ্খ ঘোষ, শাঁওলি মিত্র, সুচিত্রা মিত্র, সুকুমারী ভট্টাচার্য, সৈয়দ মুজতবা আলি — বাদ পড়ে গেলেন আরও কয়েকজন! আহা! কৃত্রিম মেধা (AI)-কে যদি বলা যেত একটা ১০০ কি ২০০ শব্দের সারাংশ বানিয়ে দিতে!
বইটির বিভিন্ন অংশ থেকে কয়েকটি ছিন্ন উদ্ধৃতি দিলে হয়তো খানিকটা সহজ হবে মানুষটিকে চেনা: আসলে মানুষ তো একটি নয়। গৌরীর সঙ্গে সঙ্গে চম্পাকলিও পাঠকের কাছে এসে দাঁড়ান, হয়তো তাঁরই সামান্য আড়ালে। দেখা যাক্:
⯀ ....তাঁর জীবনচর্যার মধ্যে দিয়ে তিনি প্রমাণ করে গিয়েছেন, যে তিনি সত্য ও সুন্দরের পূজারী। [চ] (পৃ. ১৯)
⯀ বড়ো সুন্দর সেই হাসি আর সেই কারণে যে-কারও জন্য প্রথম দর্শনেই মানুষটিকে নিজের মানুষ বলে ভাবা সহজ হত। [চ] (পৃ. ২০)
⯀ স্নেহের চম্পক, এখন আর কলি বলা চলে না (পৃ. ৩৮) [মৈত্রেয়ী দেবী] (চম্পাকলির সঙ্গে আইয়ুব-পুত্র পূষণের বিয়ের পরে লেখা চিঠি)
⯀ স্ত্রী-স্বাধীনতা আসলে পুরুষের স্বাধীনতা (পৃ ৪১) [গৌ]
⯀ গৌরীর আচার-নিষ্ঠা নেই, কিন্তু আচারে নিষ্ঠা আছে: [আবু সয়ীদ] (পৃ. ৫৯)
⯀ আমাদের পরিবারের বিশেষ সম্পদ বলতে ছিল রাশি রাশি বই ও পত্র-পত্রিকা ....গৃহসজ্জার বাহুল্য-ছাড়াও আমাদের বাড়িটা সবসময় খুব হাসিখুশি থাকত [চ]
⯀ তুমি সম্পর্কের জোরেই আমার আপন ও প্রিয়। কোনোকোনো সম্পর্ক হাওয়ার মতো, দৃষ্টির বাইরে অথচ সতত আমাদের জড়িয়ে থাকে। আইয়ুব, গৌরীদির এবং পূষনের সঙ্গে সেই বাঁধনহীন বন্ধনেই আমরা বাঁধা। এখন তুমিও তাই। [‘চ’ কে লেখা বুদ্ধদেব বসুর কন্যার চিঠি।]
⯀ সারা দেশেই এখন TV-র নির্বোধ Tyranny (পৃ. ১৪৫) [গৌ]
⯀ জীবনে কোন্টাকে আমরা কত মূল্য দেবো, তার কোনো বাঁধাধরা হিসেব করা না থাকাই ভালো। (পৃ. ২০১) [গৌ]
⯀ জীবন থেকে উৎসবকে নির্বাসিত করলে সেই কেজো জীবন যেন রসহীন লাগে আমার কাছে (পৃ. ২০২) [গৌ]
মেরি কন্ডো (Marie Kondo) নামে জনৈকা বিদেশি রমণী Konmari Method নামে একটি আপাত-নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করে ও কার্যে রূপায়িত করিয়ে প্রভূত খ্যাতি, প্রতিপত্তি এবং সম্পত্তি অর্জন করেছেন বলে পড়েছি আন্তর্জালে। সংসারের অপ্রয়োজনীয় জঞ্জাল (clutter) থেকে কীকরে মুক্ত হওয়া যায় মেরি-দেবী তার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
এই বইটি পড়লে, বিশেষ করে ৬ নম্বর অধ্যায় ৫ নং পার্ল রোড্ : শেষ অঙ্ক-টি পড়লে তাঁকে কিঞ্চিৎ করুণা করতেই সাধ যায়। অবশ্যই তিনি রবীন্দ্রনাথ পড়েননি, যাঁর অযুত-পঙ্ক্তির চারটিতে আছে
স্মৃতির পাতায় রইবে আভাসগুলি কালকে দিনের তরে
শিরীষ পাতায় কাঁপবে আলো নীরব দ্বিপ্রহরে।।
পড়েননি নীরেন চক্রবর্তীর বাসী বকুল
ছোট ছোট ছবিগুলি কেন বারে বারে
মুছে গিয়ে ভেসে ওঠে মনের কিনারে?
.......
বারে বারে কেন এরা ফিরে ফিরে আসে,
ছবি হয়ে ফুটে ওঠে মনের আকাশে!
.......
ছোট ছোট কথাগুলি কেন বারেবারে
নিভে গিয়ে জ্বলে ওঠে মনের কিনারে?
.......
...স্মৃতির অতলে,
ব্যথার জোনাকিগুলি সারারাত জ্বলে।
নীরেন চক্রবর্তীর লেখা এই স্মৃতি-মেদুর কবিতাটিতে যদি বা কোনো দুঃখের বা বেদনার স্পর্শ থাকে, চম্পাকলির স্মৃতির ক্যানভাসে কিন্তু কোনো বিষণ্ণতার ছোঁয়া নেই; বরং যা আছে, তা শুধু স্নিগ্ধ স্মরণ, শ্রদ্ধা ও প্রীতিস্নাত পারিবারিক পূজা উপচার! মেরি কণ্ডোর পেশার প্রয়োজনের থেকে যা সম্পূর্ণ বিপ্রতীপে অবস্থিত। আবু সয়ীদ আইয়ুব এবং গৌরী আইয়ুবের স্মৃতিবিজড়িত পার্ক সার্কাস-অঞ্চলের ৫ নম্বর পার্ল রোডের বাড়িটি, যেখানে ঐ বিখ্যাত পরিবারটি ভাড়াটে হিসেবে বসবাস করেছে প্রায় পাঁচদশক, ২০২১ সালে সেই বাড়িটির হস্তান্তর এবং সম্ভবত পরবর্তীতে জন্মান্তর হয়ে যায়। ১৮ই নভেম্বর থেকে ২৯শে নভেম্বর পর্যন্ত প্রতিটি দিনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিনলিপির আকারে বিবৃত বইটির শেষ এগারোটি পৃষ্ঠায়।
বহু নামী-অনামী লোকের দেওয়া উপহার (প্রধানত বইই), পুরোনো ছবি, ব্যবহৃত কাপড়জামা, পাণ্ডুলিপি, খাটপালং, বাসনপত্র, চেয়ার-টেবিল বাক্স-প্যাঁটরা — আরও অনেক কিছুর সঙ্গে চলে গেল ঐ বাড়ি ছেড়ে : কিছু আগ্রহী মানুষ বা প্রতিষ্ঠানের কাছে, কিছু নামগোত্রহীন গ্রহীতার কাছে। “Detachment is the key to happiness” বলা মুখে যত সহজ, অন্তরে তুলে নেওয়া ততটা নয়। চম্পাকলির ভাষায় “ছোটবড় কত জিনিসের সঙ্গে কত স্মৃতি, কত ভালোলাগা জড়ানো - তাদের দূরে সরাতে চাইলেই কি তা করা যায়!”
বইটি যেমন নিরাভরণ, প্রচ্ছদটিও তেমন নিরলঙ্কার; আর তাই বইয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে তার অস্তিত্ব মিশে গিয়েছে; কোনো উচ্চারিত উল্লাস ছাড়াই।
বইটি শেষ করেও অনেকক্ষণ হাতে নিয়েই বসে থাকতে হয়। রেশ কাটতে চায় না। পৃথিবীতে আর কোনও সাহিত্যে/ভাষায় শ্বশ্রূমাতাকে নিয়ে এমন memoir কোনও পুত্রবধূ লিখেছেন কি না ঘোর সন্দেহ। কিন্তু আন্তরিকতায়, অকপটতায়, শ্রদ্ধা-ভালোবাসা-মমতায় চম্পাকলি যে পারিবারিক চিত্রপটটি আমাদের উপহার দিলেন, তার অনন্যতায় উজ্জ্বল হয়ে রইলো কেন্দ্রীয় চরিত্রটি।
বঙ্গীয় সমাজের বর্তমান বাতাবরণে ক্ষীয়মাণ পারিবারিক বন্ধনের পটভূমিতে বইটির বিপুল বিক্রি হবে আশা করা বাতুলতা! বিশেষ করে গ্রন্থপাঠের মুমূর্ষু অভ্যাসের পরিপ্রেক্ষিতে। কিন্তু স-নিষ্ঠ পাঠক এটিকে সাদরে বরণ করে নেবেন, অবশ্যই। তুলসীদাস কি আজকে লিখে গিয়েছেন? গো-রস গলি গলি ফিরে, সুরা বৈঠকে বিকায়!