




প্রবন্ধ পরিচিতি- ‘শৈলী’ শব্দের অর্থ ‘রীতি’ বা ‘style’। সাহিত্য সমালোচনায় শৈলীতত্ত্বের বাজার-চলতি গ্রন্থগুলিতে মূলত প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব থেকে উদাহরণে (অবরোহ পন্থা বা Deductive Method) পৌঁছনোর প্রচেষ্টা থাকে—যেখানে পাশ্চাত্য তত্ত্বের নিরিখে বাংলা সাহিত্যের দৃষ্টান্তগুলি বিচার্য। বর্তমান প্রবন্ধের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত। কোনো কাল্পনিক তত্ত্ব থেকে দৃষ্টান্তে উপনীত হওয়ার পরিবর্তে এখানে উদাহরণ থেকে (আরোহ পন্থা বা Inductive Method) লেখকমানসে পৌঁছনোর প্রচেষ্টাই প্রবন্ধটির ভরকেন্দ্র। গদ্যশৈলীর যে বিশেষ উপাদানটি এখানে আলোচ্য, সেটি হল বৃহৎ বাক্যগঠন। ‘ছিন্নপত্রাবলী’তে কেন রবীন্দ্রনাথ এই বিশেষ শৈলীকে নির্বাচন করলেন, সেই উত্তর অনুসন্ধানে কোনো স্বকপোল কল্পনার আশ্রয় গ্রহণ করা হয়নি, বরং রবীন্দ্রসাহিত্যের অন্যান্য দৃষ্টান্তের ভিত্তিতে এই প্রবন্ধ যৌক্তিকভাবে অনুসন্ধিৎসু; সেইসঙ্গে ভাবালুতার পরিবর্তে সাহিত্যিক টেক্সটের যুক্তিসংগত পাঠাভ্যাস কীভাবে পাঠকের রসাস্বাদন-অধিকারকে বিস্তৃতি প্রদানের মাধ্যমে চরম স্তরে উন্নীত করতে পারে, সেটিও এই প্রবন্ধের অন্বিষ্ট।
চাবিশব্দ- রবীন্দ্রমানস, ‘ছিন্নপত্রাবলী’, বর্ণনারীতি, বৃহৎ বাক্যরচনার মনস্তত্ত্ব, সাহিত্য রসাস্বাদন।
১.
‘জীবনস্মৃতি’র প্রথম পাণ্ডুলিপিতে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘কাব্যরচনা ও জীবনরচনা ও-দুটা একই বৃহৎ রচনার অঙ্গ। …কবির জীবন যেমন কাব্যকে প্রকাশ করে কাব্যও তেমনি কবির জীবনকে রচনা করিয়া চলে।…পদ্মের বীজকোষ এবং তাহার দলগুলির মতো একত্রে রচিত আমার জীবন ও কাব্যগুলিকে একসঙ্গে দেখাইতে পারিলে সে চিত্র ব্যর্থ হইবে না।’১
‘কাব্য’ অর্থে এখানে, বলাই বাহুল্য, সাহিত্যকর্ম।
সাহিত্য সংরূপের বিবিধ ক্ষেত্রে রবীন্দ্রপ্রতিভা বহুল আলোচিত। ‘ছিন্নপত্রাবলী’ও তার ব্যতিক্রম নয়। স্বাভাবিকভাবেই মনে হতে পারে, বর্তমান প্রবন্ধ কি তারই চর্বিতচর্বণ? ‘ছিন্নপত্রাবলী’তে রবীন্দ্রনাথ কীভাবে প্রকৃতিদর্শন করেছেন, তারই বিবরণ পাই সমালোচনামূলক প্রবন্ধ বা গ্রন্থগুলিতে। অর্থাৎ, সমালোচনার মূল ঝোঁক সেখানে রবীন্দ্র-দৃষ্ট প্রকৃতি। বর্তমান প্রবন্ধে অভিমুখটি সম্পূর্ণ বিপরীত—বর্ণনারীতি (style) থেকে রবীন্দ্র-মনস্তত্ত্ব আবিষ্কার।
‘ছিন্নপত্রাবলী’র বিভিন্ন পত্রে রবীন্দ্রনাথ একাধিক দীর্ঘ বাক্য রচনা করেছেন। যেসমস্ত বাক্য অনায়াসেই হতে পারত বহুখণ্ডিত, সেই সহজসাধ্য লিখনশৈলীর পরিবর্তে কেন রবীন্দ্রনাথ সুদীর্ঘ বাক্যই নির্বাচন করলেন, সেই অনুসন্ধানই বর্তমান প্রবন্ধের মূল ভরকেন্দ্র। অর্থাৎ, ‘জীবনস্মৃতি’র প্রথম পাণ্ডুলিপিতে যে-জীবনীমূলক সমালোচনা (Biographical Criticism) কবির প্রার্থিত ছিল, ‘ছিন্নপত্রাবলী’র নির্বাচিত পত্রে দীর্ঘ বাক্যবিন্যাসের প্রেক্ষাপটে সেই রবীন্দ্রমানসকে স্পর্শের ঐকান্তিক প্রচেষ্টাতেই প্রবন্ধটি আবর্তিত।
প্রশ্ন উঠতে পারে, রবীন্দ্রনাথ কি কেবল ‘ছিন্নপত্রাবলী’তেই এমন সুদীর্ঘ বাক্য রচনা করেছেন? কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস কিংবা প্রবন্ধে কি এমন দৃষ্টান্ত বিরল? না। তাহলে ‘ছিন্নপত্রাবলী’ই কেন? কারণ, ‘পৃথিবীতে অনেক মহামূল্য উপহার আছে; কিন্তু সামান্য চিঠিখানি কম জিনিষ নয়। পোস্ট্ আফিস হয়ে মানুষের এই একটা নতুন সুখবৃদ্ধি হয়েছে। এ একটা নতুন জাতের সুখ। আমি সুবিধার কথা বলছি নে, সে তো আছেই। কিন্তু চিঠির দ্বারা পৃথিবীতে একটা নতুন আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের সঙ্গে মানুষের আর-একটা বন্ধন যোগ করে দিয়েছে। আমরা মানুষকে দেখে যতটা লাভ করি, তার সঙ্গে কথাবার্তা কয়ে যতটা লাভ করি, আবার চিঠিপত্র পেয়ে আর-এক দিক থেকে তাকে আর-এক রকম করে পাই। চিঠিপত্র-দ্বারা যে আমরা কেবল প্রত্যক্ষ আলাপের অভাব দূর করি, অসাক্ষাতে থেকেও কথাবার্তা কই, তা নয়, তার মধ্যে আরও একটু রস আছে—ঠিক সেটা প্রতিদিনের দেখাসাক্ষাৎ কথাবার্তার মধ্যে নেই। মানুষ মুখের কথায় আপনাকে যতখানি এবং যেরকম করে প্রকাশ করে লেখার কথায় ঠিক ততখানি করে না, আবার লেখায় যতখানি করে মুখের কথায় ততখানি করে না। উভয়ের মধ্যেই খানিকটা অসম্পূর্ণতা আছে যা কেবল উভয়ে মিলে পূরণ করতে পারে। এই জন্যে মানুষের পরস্পর সম্বন্ধের মধ্যে চিঠিপত্র একটা নতুন-জাতীয় সুখ এবং বার্তা বহন করছে, যা পূর্বে ছিল না। এ যেন মানুষকে দেখবার জন্যে এবং পাবার জন্যে একটা নতুন ইন্দ্রিয়বৃদ্ধি হয়েছে। সামান্য কথাবার্তা এবং আলোচনা চিঠির মধ্যে বাঁধা প’ড়ে একটা নতুন চেহারা বার করে—কথায় যে জিনিষটা এড়িয়ে যায় এবং প্রবন্ধে যে জিনিষটা কৃত্রিম হয়ে ওঠে, চিঠিতে সেইটে অতি সহজে আপনাকে ধরা দেয়। আমার মনে হয়, যারা চিরকাল অবিচ্ছেদে চব্বিশ ঘণ্টা পরস্পর কাছাকাছি যাপন করেছে, যাদের মধ্যে কখনো চিঠিপত্র-লেখালেখির অবসর হয় নি, তারা পরস্পরকে অসম্পূর্ণভাবে জানে, পরস্পরের চরিত্রের অনেক ডেলিকেট অনেক সত্য এবং সুগভীর জিনিষ তাদের জানবার কোনো উপায়ই হয় না।’২
যে-রবীন্দ্রনাথ ‘চিঠি’ নামক সাহিত্য সংরূপকে ‘নতুন ইন্দ্রিয়’র মর্যাদাদান করেছিলেন, সেই সংরূপ থেকেই রবীন্দ্রনাথকে ‘আর-এক দিক’ থেকে ‘আর-এক রকম’ করে ‘পাওয়া’র কৌতূহলেই ‘ছিন্নপত্রাবলী’র নির্বাচন। কিন্তু চিঠি-ই যদি হবে, সেক্ষেত্রে কেবল ‘ছিন্নপত্রাবলী’র চিঠি-ই কেন? কেন ‘চিঠিপত্র’ নয়? কারণ, ভাইঝি ইন্দিরা [বব]কে-লিখিত চিঠিগুলিতেই রবীন্দ্রনাথ নিজেকে অসংকোচে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করতে পেরেছিলেন। লিখছেন, ‘যদি কোনো লেখকের সবচেয়ে ভালো লেখা তার চিঠিতেই দেখা দেয় তা হলে এই বুঝতে হবে যে, যাকে চিঠি লেখা হচ্ছে তারও একটি চিঠি লেখাবার ক্ষমতা আছে। আমি তো আরও অনেক লোককে চিঠি লিখেছি, কিন্তু কেউ আমার সমস্ত লেখাটা আকর্ষণ করে নিতে পারে নি।’৩ পুনশ্চ, ‘কারও কারও মন ফোটোগ্রাফের wet plate-এর মতো; যে ছবিটা ওঠে সেটাকে তখনি ফুটিয়ে কাগজে না ছাপিয়ে নিলে নষ্ট হয়ে যায়। আমার মন সেই জাতের। যখন যে-কোনো ছবি দেখি অমনি মনে করি, এটা [বব]কে চিঠিতে ভালো করে লিখতে হবে।’৪
২.
‘ছিন্নপত্রাবলী’র প্রথম চিঠিটি রবীন্দ্রনাথ লিখছেন দার্জিলিং থেকে, ১ সেপ্টেম্বর ১৮৮৭তে। সপরিবার তিনি গেছেন দার্জিলিং। সেই যাত্রীদলে ‘মেয়ে মানুষ পাঁচটা এবং পুরুষ মানুষ একটিমাত্র’৫। ‘সহস্র জিনিসপত্র’ নিয়ে কীভাবে-যে গন্তব্যস্থলে পৌঁছনো গেল, এবং সেই সামগ্রিক প্রক্রিয়ায় ওই ‘একটিমাত্র পুরুষ’ রবীন্দ্রনাথকে-যে ঠিক কোন্ কোন্ কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে অবগাহন করতে হল, তারই সরস বিবরণ এই পত্রের উপজীব্য। প্রভূত মালপত্র নিয়ে রবীন্দ্রনাথ সীমাতীত নাস্তানাবুদ হওয়ার পরেও ন’দিদি স্বর্ণকুমারী দেবীর মন্তব্য ছিল, রবি ‘কিছুই’ করেনি। রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘কিন্তু এই দু দিনে আমি এত বাক্স খুলেছি এবং বন্ধ করেছি এবং বেঞ্চির নীচে ঠেলে গুঁজেছি এবং উক্ত স্থান থেকে টেনে বের করেছি, এত বাক্স এবং পুঁটুলির পিছনে আমি ফিরেছি এবং এত বাক্স এবং পুঁটুলি আমার পিছনে অভিশাপের মতো ফিরেছে, এত হারিয়েছে এবং এত ফের পাওয়া গেছে এবং এত পাওয়া যায়নি এবং পাবার জন্যে এত চেষ্টা করা গেছে এবং যাচ্ছে যে, কোনো ছাব্বিশ বৎসর বয়সের ভদ্র সন্তানের অদৃষ্টে এমনটা ঘটে নি।’৬
সমগ্র রবীন্দ্রসাহিত্যে, একটি-দুটি নয়, দশ-দশটি ‘এবং’ সমৃদ্ধ এই বাক্যের জুড়ি মেলা ভার। বাক্যটি অনায়াসে একাধিক স্বতন্ত্র বাক্যে খণ্ডিত হতে পারত। কিন্তু হয়নি। কেন? আসলে অসংখ্য বাক্স ও পুঁটুলি নিয়ে নিজের হয়রানির আনুক্রমিক ইতিহাসকে ঘনীভূত করে তুলতেই বাক্যটি অখণ্ডিত।
পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ প্রদানে রবীন্দ্রনাথের এই প্রবণতায় আমাদের অবধারিত মনে পড়বে ‘জীবনস্মৃতি’র ‘ঘর ও বাহির’ অধ্যায়—শ্যাম চাকর ছোট্ট রবিকে যে-গণ্ডীর মধ্যে আটকে রাখত, সেই গণ্ডীতে সৌভাগ্যক্রমে একটা জানলা ছিল। জানলার নিচেই একটা ঘাট-বাঁধানো পুকুরের পাড়ে ছিল প্রকাণ্ড একটা চীনাবট। ‘গণ্ডি বন্ধনের বন্দী’ রবি জানলার খড়খড়ি খুলে প্রায় সমস্তদিন সেই পুকুরটাকে ‘একখানি ছবির বহির মতো’ দেখে দেখে কাটিয়ে দিতেন। সকাল থেকে সেখানে নানা প্রতিবেশী স্নান করতে আসতেন। কে কখন আসবে, শুধু সেটুকুই-যে শিশু রবি জানতেন, তাই নয়, ‘প্রত্যেকের স্নানের বিশেষত্বটুকুও’ পরিচিত ছিল তাঁর। কীরকম? ‘কেহ-বা দুই কানে আঙুল চাপিয়া ঝুপ্ ঝুপ্ করিয়া দ্রুতবেগে কতকগুলা ডুব পাড়িয়া চলিয়া যাইত; কেহ-বা ডুব না দিয়া গামছায় জল তুলিয়া ঘন ঘন মাথায় ঢালিতে থাকিত; কেহ-বা জলের উপরিভাগের মলিনতা এড়াইবার জন্য বার বার দুই হাতে জল কাটাইয়া লইয়া হঠাৎ একসময়ে ধাঁ করিয়া ডুব পাড়িত; কেহ-বা উপরের সিঁড়ি হইতেই বিনা ভূমিকায় সশব্দে জলের মধ্যে ঝাঁপ দিয়া পড়িয়া আত্মসমর্পণ করিত; কেহ-বা জলের মধ্যে নামিতে নামিতে এক নিশ্বাসে কতকগুলি শ্লোক আওড়াইয়া লইত; কেহ-বা ব্যস্ত, কোনোমতে স্নান সারিয়া লইয়া বাড়ি যাইবার জন্য উৎসুক; কাহারো-বা ব্যস্ততার লেশমাত্র নাই—ধীরেসুস্থে স্নান করিয়া, জপ করিয়া, গা মুছিয়া, কাপড় ছাড়িয়া, কোঁচাটা দুই-তিনবার ঝাড়িয়া, বাগান হইতে কিছু-বা ফুল তুলিয়া, মৃদুমন্দ দোদুল-গতিতে স্নানস্নিগ্ধ শরীরের আরামটিকে বায়ুতে বিকীর্ণ করিতে করিতে বাড়ির দিকে তাহার যাত্রা।’৭
১৯১২য় প্রকাশিত ‘জীবনস্মৃতি’তে পঞ্চাশ-উত্তীর্ণ রবীন্দ্রনাথ অনুপুঙ্খ বিবরণ প্রদানের জন্য দীর্ঘ বাক্য-সমন্বিত যে-গদ্যশৈলীর আশ্রয় গ্রহণ করবেন, পঁচিশ বছর আগে তারই সূচনা ঘটেছিল ‘ছিন্নপত্রাবলী’তে।
৬ জানুয়ারি, ১৮৯০। রবীন্দ্রনাথ তখন জমিদারির কাজে সাজাদপুরে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্ভাবনায় ম্যাজিস্ট্রেটকে চিঠি পাঠিয়ে নিজের বাড়িতে আশ্রয় নিতে অনুরোধ করেছেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু সাহেবের যাপন-উপযুক্ত ঘরটির অবস্থা তখন কীরকম? রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘চিঠি পাঠিয়ে দিয়ে ঘর তদারক করতে গিয়ে দেখি, সে ঘরে দুটো বাঁশের ঝোলার উপর তাকিয়া গদি ময়লা-লেপ টাঙানো—চাকরদের গুল টিকে তামাক, তাঁদেরই দুটো কাঠের সিন্ধুক, তাঁদেরই মলিন লেপ, ওয়াড়হীন তৈলাক্ত বালিশ ও মসীবর্ণ মাদুর, এক টুকরো ছেঁড়া চট ও তার উপরে বিচিত্রজাতীয় মলিনতা—কতকগুলো…বাক্সর মধ্যে নানাবিধ জিনিসের ভগ্নাবশিষ্ট—যথা মর্চেপড়া কাৎলির ঢাক্নি, তলাহীন ভাঙা লোহার উনুন, অত্যন্ত ময়লা একটা দস্তার চাদানি, কতকগুলো কাঁচের…গ্লাসের পারা, ভাঙা সেজের কাঁচরাশি ও ময়লা শ্যামাদান, দুটো ফিলটার, meat safe, একটা সুপ-প্লেটে খানিকটা পাৎলা গুড়, ধুলো পড়ে পড়ে সেটা গাঢ় হয়ে এসেছে, অনেকগুলো ভাঙা এবং আস্ত প্লেট, গোটাকতক ময়লা কালীবর্ণ ভিজে ঝাড়ন—কোণে প্লেট ধোবার গামলা, গফুর মিঞার একটা ময়লা কোর্তা এবং পুরোনো মক্মলের skull cap—একটা জীর্ণ পোকা-কাটা জলের দাগ-তেলের দাগ-দুধের দাগ-গুড়ের দাগ-কালো দাগ-brown দাগ-সাদা দাগ-এবং নানা মিশ্রিত দাগ-বিশিষ্ট আয়নাহীন dressing table—তার পারা-ওঠা ভাঙা আয়নাটা অন্যত্র দেয়ালে ঠেসান-দেওয়া—তার খোপের মধ্যে ধুলো, খড়কে, ন্যাপ্কিন, পুরোনো তালা, ভাঙা গেলাসের তলা এবং সোডা ওয়াটর বোতলের তার, কতকগুলো খাটের খুরো, ডাণ্ডা এবং চাল—একটা পায়া-ভাঙা washhand stand, একটা দুর্গন্ধ, দেয়ালময় অনেকগুলো দাগ এবং গোটাকতক পেরেক—ব্যাপার দেখে আমার চক্ষুস্থির।’৮
ঘরটির এহেন অবস্থায় রবীন্দ্রনাথের ‘চক্ষুস্থির’। অন্যদিকে একটি সম্পূর্ণ বিশ্রস্ত ঘরের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ডিটেলিং একটিই সুদীর্ঘ বাক্যে অন্বিত করে কীভাবে লেখকের দৃষ্টি অনুসরণে মানসচক্ষে, চলচ্চিত্রের মতো সামগ্রিক ঘটনাটি ক্রমপরম্পরায় অনুধাবন করানো সম্ভব—তা ভেবে অত্যাশ্চর্য হন পাঠক, ‘চক্ষুস্থির’ হয়ে যায় ‘তাঁদেরও।
৩.
পুনরুক্তি কি কখনো গদ্যশৈলীকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করতে পারে? ‘পুনরুক্তি’ শব্দের অর্থ হল একই শব্দ বা তার সমার্থক শব্দের পৌনঃপুনিক ব্যবহার। সাহিত্যে এই পুনরুক্তি সাধারণত ‘দোষ’ হিসেবে বিবেচ্য। কিন্তু প্রতিভাশালী লেখক কেন সেই পুনরুক্তি নির্বাচন করলেন, সেই অন্তর্গূঢ় কারণটি অনুধাবন করলে তা পুনরুক্তির সীমা পেরিয়ে হয়ে ওঠে রসোত্তীর্ণ।
শিলাইদহে অবস্থানকালীন রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘…শিলাইদহের অপর পারে একটা চরের সামনে আমাদের বোট লাগানো আছে। প্রকাণ্ড চর—ধূ ধূ করছে—কোথাও শেষ দেখা যায় না—কেবল মাঝে মাঝে এক এক জায়গায় নদীর রেখা দেখা যায়—আবার অনেক সময় বালি’কে নদী বলে ভ্রম হয়—গ্রাম নেই, লোক নেই, তরু নেই, তৃণ নেই—বৈচিত্র্যের মধ্যে জায়গায় জায়গায় ফাটল-ধরা ভিজে কালো মাটি, জায়গায় জায়গায় শুক্নো সাদা বালি—পূর্ব দিকে মুখ ফিরিয়ে চেয়ে দেখলে দেখা যায় উপরে অনন্ত নীলিমা আর নীচে অনন্ত পাণ্ডুরতা, আকাশ শূন্য এবং ধরণীও শূন্য, নীচে দরিদ্র শুষ্ক কঠিন শূন্যতা আর উপরে অশরীরী উদার শূন্যতা। এমনতর desolation কোথাও দেখা যায় না।’৯
দ্বিতীয় বৃহৎ বাক্যটিতে একাধিক পুনরুক্তি। ‘গ্রাম নেই, লোক নেই, তরু নেই, তৃণ নেই’—‘নেই’-এর বহুল ব্যবহার থেকে অনায়াসে এই বাক্যাংশকে মুক্ত করে রবীন্দ্রনাথ লিখতেই পারতেন, ‘গ্রাম, লোক, তরু, তৃণ নেই’। কেন লিখলেন না? তার কারণ কি এই যে, পুনরুক্তিই এখানে মূল উদ্দিষ্ট? ‘গ্রাম, লোক, তরু, তৃণ নেই’—এর পরিবর্তে প্রতিটি বিশেষ্যের অব্যবহিত পরবর্তী ‘নেই’ শব্দের সহাবস্থানে-গড়ে-ওঠা ‘গ্রাম নেই, লোক নেই, তরু নেই, তৃণ নেই’ আসলে প্রত্যেক বিশেষ্যকে সম গুরুত্বপ্রদানে নঞর্থক করে তুলেছে এবং সেই পুনরুক্তিতে সূচিত হয়ে উঠেছে এক সামগ্রিক নেতিমাহাত্ম্য। একইভাবে, ‘আকাশ শূন্য এবং ধরণীও শূন্য, নীচে দরিদ্র শুষ্ক কঠিন শূন্যতা আর উপরে অশরীরী উদার শূন্যতা’ও ‘শূন্য’ শব্দের পৌনঃপুনিকতা বর্জন করে হয়ে উঠতে পারত নির্মেদ। হল না কেন? কারণ, আকাশ ও ধরণীর শূন্যতায় ‘desolation’-যে ঠিক কেমনতর, তা পত্রপ্রাপককে বোধগম্য করাতেই ‘শূন্য’ শব্দের পুনরাবৃ্ত্তি।
রবীন্দ্রনাথ কি এই পুনরুক্তি বিষয়ে নেহাত অন্যমনস্ক ছিলেন? না। অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। ছিলেন বলেই লিখছেন, ‘জলের শব্দ, দুপুর বেলাকার নিস্তব্ধতার ঝাঁ-ঝাঁ, এবং ঝাউঝোপ থেকে দুটো-একটা পাখির চিক্ চিক্ শব্দ, সবসুদ্ধ মিলে খুব একটা স্বপ্নময় ভাব।…খুব লিখে যেতে ইচ্ছে করছে—কিন্তু আর কিচ্ছু নয়, এই জলের শব্দ, এই রোদ্দুরের [যৎ] দিন, এই বালির চর। মনে হচ্ছে তোকে রোজই ঘুরে ফিরে এই কথাই লিখতে হবে—কেননা, আমার যখন নেশার মতন হয় তখন আমি বারবার এক কথা নিয়েই বকি।’১০
প্রশ্ন ওঠে, শুধু ‘নেশার’ টানেই কি এই পুনরাবৃত্তি? তাই যদি হয়, তাহলে কলকাতায় স্থিতিকালে কি এই পুনরুক্তি সম্ভব ছিল? না। তারই সাক্ষ্য বহনকারী এই চিঠি—‘আমার মফস্বলের চিঠিগুলো ঠিক সেই একই স্থান, একই দৃশ্য, একই অবস্থার মধ্যে বারবার লেখা—সবগুলো মিলিয়ে দেখলে বোধ হয় কতই যে পুনরাবৃত্তি পাওয়া যায় তার আর সংখ্যা নেই। বোধ হয় কতবার অবিকল একই ভাষা ব্যবহার করেছি। কলকাতায় থাকলে নিত্যনতুন কথা বলা সহজ—কিন্তু পাড়াগাঁয়ে কেবল দুটি মাত্র বিষয় আছে, প্রকৃতি এবং স্বয়ং আমি—এই দুটি বিষয়ই আমার পক্ষে যথেষ্ট আনন্দদায়ক—এবং এই দুটি বিষয়ের মধ্যে বৈচিত্র্যেরও অভাব নেই—কিন্তু মানুষের ‘পএন্ট্ অফ্ ভিয়ু’ এবং প্রকাশ করবার ভাষা এবং ক্ষমতা সীমাবদ্ধ—কাজেই সহস্রবার পুনরুক্তি করা ছাড়া আর উপায় নেই।’১১
‘নেই’-এর একাধিক প্রয়োগে-লিখিত সুদীর্ঘ বাক্যের আরেকটি দৃষ্টান্ত নিম্নরূপ—
১৮৯১-এর ১৯ অক্টোবর (৩ কার্ত্তিক, ১২৯৮) ছিল কোজাগরী পূর্ণিমা। রবীন্দ্রনাথ সেদিন পদ্মানদীর ধারে বেড়াচ্ছিলেন, নদীর সঙ্গে চলছিল তাঁর স্বগতোক্তি। কেমন ছিল সেইসময়ের প্রকৃতি? ‘নদীতে একটি রেখামাত্র ছিল না—ও—ই সেই চরের পরপারে যেখানে পদ্মার জলের শেষ প্রান্ত দেখা যাচ্ছে, সেখান থেকে আর এ পর্যন্ত একটি প্রশস্ত জ্যোৎস্নারেখা ঝিক্ ঝিক্ করছে—একটি লোক নেই, একটি নৌকো নেই—ও পারের নতুন চরে একটি গাছ নেই, একটি তৃণ নেই—মনে হয় যেন একটি উজাড় পৃথিবীর উপরে একটি উদাসীন চাঁদের উদয় হচ্ছে—জনশূন্য জগতের মাঝখান দিয়ে একটি লক্ষ্যহীন নদী বহে চলেছে, মস্ত একটা পুরাতন গল্প এই পরিত্যক্ত পৃথিবীর উপরে শেষ হয়ে গেছে, আজ সেই-সব রাজা রাজকন্যা পাত্র মিত্র স্বর্ণপুরী কিছুই নেই, কেবল সেই গল্পের ‘তেপান্তরের মাঠ’ এবং ‘সাত সমুদ্র তেরো নদী’ ম্লান জ্যোৎস্নায় ধূ ধূ করছে।’১২
কেন বারবার রবীন্দ্রনাথ উজাড়-নিঃস্ব ভূমির বর্ণনায় এত নেতিবাচক শব্দের প্রয়োগ ঘটান? কারণ ভূমির শূন্যতা ভয়াবহতম। শিলাইদহ থেকে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘দিগন্তের শেষ সীমা পর্যন্ত সাদা বালির চর ধূ ধূ করছে; তাতে না আছে ঘাস, না আছে গাছ, না আছে বাড়ী ঘর, না আছে কিছু—সেবারকার চরে মাঝে মাঝে বনঝাউ ছিল, এবার তাও নেই। এত বড় প্রকাণ্ড শূন্যতার ভাব চোখে না দেখলে ঠিক কল্পনা করতে পারবি নে। আকাশের শূন্যতা, সমুদ্রের শূন্যতা আমাদের অভ্যস্ত হয়ে গেছে, সেখানে আর-কিছু প্রত্যাশা করি নে; কিন্তু ভূমির শূন্যতাকে সব চেয়ে বেশি শূন্য বলে মনে হয়—কোথাও গতি নেই, জীবন নেই, বর্ণের বৈচিত্র্য নেই, কোমলতার আভাসটুকু মাত্র নেই—যেখানে শস্যে তৃণে তরুলতায় পশুপক্ষীতে ভরে যেতে পারত সেখানে একটি কুশের অঙ্কুর পর্যন্ত নেই—কেবল একটা উদাস কঠিন অসীম বৈধব্যের বন্ধ্যাদশা—পাশ দিয়ে পদ্মা নদী চলে যাচ্ছে, ও পারে ঘাট, বাঁধা নৌকো, স্নানরত লোকজন, নারকেল এবং আমের বাগান—সন্ধ্যাবেলায় নদীর ধারের হাট থেকে কলধ্বনি শোনা যায়, বহুদূরে পাবনার পারের তরুশ্রেণী ঘননীল রেখার মতো দেখা যায়—কোথাও গাঢ়নীল, কোথাও পাণ্ডুনীল, কোথাও সবুজ, আর মাঝখানে এই রক্তহীন মৃত্যুর মতো ফ্যাকাশে শাদা—নিস্তব্ধ, নিশ্চেষ্ট, জনহীন।’১৩
‘বৈধব্যের বন্ধ্যাদশা’প্রাপ্ত ‘শূন্য’ ভূমির বর্ণনাটিও, খেয়াল করুন, একটি সুদীর্ঘ বাক্যে আধারিত।
৪.
রবীন্দ্রমানসে দুই বিপরীতের লীলা সর্বদাই ক্রিয়াশীল। তিনি একবার বলেন, ‘ধন নয়, মান নয়, একটুকু বাসা/ করেছিনু আশা’১৪; পরমুহূর্তেই ‘একটুকু বাসা’র সীমাবদ্ধতা অতিক্রমের চেষ্টায় তাঁর মন বলে ওঠে, ‘হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোথা, অন্য কোন্খানে’১৫। কিন্তু এই পারস্পরিক বৈপরীত্যের কোনো একটি প্রধান হলে তাঁর জীবনসাম্য বিঘ্নিত হত; তাই পারস্পরিক বৈপরীত্য-সঞ্জাত একটি সামঞ্জস্যেই রবীন্দ্রনাথ সুস্থিত ছিলেন। তাঁর এই ‘উভচর’১৬ সত্তাই অন্যতম চারিত্র্যবৈশিষ্ট্য।
সমগ্র পৃথিবীও দুই বিপরীতের সমন্বয়ে চালিত। তাই ‘দুই হাতে—কালের মন্দিরা যে সদাই বাজে’১৭। সেখানে চলে ‘ফুল’-‘কাঁটা’, ‘আলো’-‘ছায়া’, ‘জোয়ার’-‘ভাঁটা’, ‘সুখ’-‘দুঃখ’, ‘সাঁঝ’-‘সকাল’, ‘সাদা’-‘কালো’, ‘কান্না’-‘হাসি’, ‘জীবন’-‘মরণ’-এর ক্রমান্বয়িক আবর্তন। সেই কারণেই ‘হাসিকান্না হীরাপান্না দোলে ভালে,/ কাঁপে ছন্দে ভালো মন্দ তালে তালে,/ নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু পাছে পাছে,/…দিবারাত্রি নাচে মুক্তি নাচে বন্ধ’১৮।
পারস্পরিক এই বৈপরীত্যে সামঞ্জস্য কোথায়? ‘Thesis’ এবং ‘Antithesis’ কীভাবে ‘Synthesis’-এ পরিণত হয়? অন্তর্নিহিত সত্যে। ‘মানুষের দেখা-অংশের মধ্যে যে-সকল বৈপরীত্য প্রকাশ পায়, মানুষের না-দেখা অংশের মধ্যেই নিশ্চয় তাহার একটা নিগূঢ় সমন্বয় আছে; অতএব আসল সত্যটা যে প্রত্যক্ষের উপরেই ভাসিয়া বেড়াইতেছে তাহা নহে, অপ্রত্যক্ষের মধ্যেই ডুবিয়া আছে’১৯। কারণ, ‘সংসারের সমস্ত বিপরীতের সমন্বয় যদি কোনো একটি সত্যের মধ্যে না ঘটে তবে তাকে চরম সত্য বলে মানা যায় না।’২০ আর, যখন তা চরম সত্য হিসেবে প্রতিভাত হয়, তখনই ‘আরম্ভের সহিত শেষের, প্রধানের সহিত অপ্রধানের, এক অংশের সহিত অন্য অংশের গূঢ়তর সামঞ্জস্য দেখিয়া…আমরা আনন্দ পাই..। তার পরে কল্যাণবুদ্ধি যেখানে যোগ দেয় সেখানে আমাদের মনের অধিকার আরো বাড়িয়া যায়, সুন্দর-অসুন্দরের দ্বন্দ্ব আরো ঘুচিয়া যায়। সেখানে কল্যাণী সতী সুন্দর হইয়া দেখা দেন…।’২১
‘ছিন্নপত্রাবলী’র কয়েকটি পত্রে একই বাক্যে পারস্পরিক বিপরীত ভাবের সহাবস্থান ঘটিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। লিখছেন, ‘এবারকার ডায়েরিটা তো ঠিক প্রকৃতির স্তব নয়—মন-নামক একটা সৃষ্টিছাড়া চঞ্চল পদার্থ কোনো গতিকে আমাদের শরীরের মধ্যে প্রবেশ করাতে যে কিরকম একটা উৎপাত হয়েছে তৎসম্বন্ধে আলোচনা করা গেছে। আসলে, আমরা খাব, পরব, বেঁচে থাকব, এই রকম কথা ছিল—আমরা যে বিশ্বের আদিকারণ অনুসন্ধান করি, ইচ্ছেপূর্বক খুব শক্ত একটা ছন্দ বানিয়ে তারই মধ্যে খুব শক্ত একটা ভাব ব্যক্ত করবার প্রয়াস করি, আবার তার মধ্যে পদে পদে মিল থাকা চাই, আপাদমস্তক ঋণে নিমগ্ন হয়েও মাসে মাসে ঘরের কড়ি খরচ করে সাধনা বের করি, এর কি আবশ্যক ছিল—ও দিকে নারায়ণ সিং দেখো ঘি দিয়ে আটা দিয়ে বেশ মোটা মোটা রুটি বানিয়ে তার সঙ্গে দধি সংযোগ ক’রে আনন্দমনে ভোজন-পূর্বক দু-এক ছিলিম তামাক টেনে দুপুর বেলাটা কেমন স্বচ্ছন্দে নিদ্রা দিচ্ছে এবং সকালে বিকালে লো[কেনে]র সামান্য দু-চারটে কাজ ক’রে রাত্রে অকাতরে বিশ্রাম লাভ করছে; জীবনটা যে ব্যর্থ হল, বিফল হল, এমন কখনো তার স্বপ্নেও মনে হয় না—পৃথিবীর যে যথেষ্ট দ্রুতবেগে উন্নতি হচ্ছে না সে জন্যে সে নিজেকে কখনও দায়িক করে না। জীবনের সফলতা কথাটার কোনো মানে নেই—প্রকৃতির একমাত্র আদেশ হচ্ছে ‘বেঁচে থাকো’। নারায়ণ সিং সেই আদেশটির প্রতি লক্ষ রেখেই নিশ্চিন্ত আছে—আর, যে হতভাগার বক্ষের মধ্যে মন-নামক একটা প্রাণী গর্ত খুঁড়ে বাসা করেছে তার আর বিশ্রাম নেই, কর্তব্যের শেষ নেই, মনের সন্তোষ নেই; তার পক্ষে কিছুই যথেষ্ট নয়, তার চতুর্দিক্বর্তী অবস্থার সঙ্গে সমস্ত সামঞ্জস্য নষ্ট হয়ে গেছে; সে যখন জলে থাকে তখন স্থলের জন্য লালায়িত হয়, যখন স্থলে থাকে তখন জলে সাঁতার দেবার জন্যে তার ‘অসীম আকাঙ্ক্ষা’ উদ্রেক হয়।’২২
জগৎসংসারে ‘বিশ্বের আদিকারণ অনুসন্ধান’কারী যেমন সত্য, তার মানসিক অসন্তোষ যেমন অকৃত্রিম, ঠিক তেমনই সমান সত্য নারায়ণ সিং-এর মতো মানুষ—জীবনে বেঁচে থাকাই যার একমাত্র লক্ষ্য। দুই বিপরীত সত্যকে ধারণ করে আছে এই বৃহৎ বাক্যটি। ‘ইচ্ছেপূর্বক’ ‘অনাবশ্যক’ কাজে ‘মননশীল’ মানুষ যখন দেখে, ‘তার চতুর্দিক্বর্তী অবস্থার সঙ্গে সমস্ত সামঞ্জস্য নষ্ট হয়ে গেছে’, যখন ভাবে, ‘যাহা চাই তাহা ভুল করে চাই,/ যাহা পাই তাহা চাই না।’২৩; তখন সেই মানসিক অসন্তোষের বিপরীতে পৃথিবীতে সামঞ্জস্য রক্ষার জন্য প্রয়োজন নারায়ণ সিং-রা—সহজ-সরল জীবনযাপনে ‘প্রকৃতির আদেশ’-এর প্রতি লক্ষ রেখেই যারা ‘নিশ্চিন্ত’। অন্তর্গূঢ় সেই সামঞ্জস্যেই পৃথিবী সচল এবং সেই সমন্বয়সাধক সত্যে এই বৃহৎ বাক্যটিও সুস্থিত।
সামঞ্জস্যহীন প্রাত্যহিক দিনানুদৈনিকতায় ঠিক কোন সমন্বয় ঘটলে মানুষের যাপন ‘কবিতা’য় উন্নীত হতে পারে? রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘আমাদের কাছে আমাদের প্রতিদিনের সংসারটা ঠিক সামঞ্জস্যময় নয়—তার কোনো তুচ্ছ অংশ হয়তো অপরিমিত বড়ো, ক্ষুধাতৃষ্ণা ঝগড়াঝাঁটি আরামব্যারাম টুকিটাকি খুঁটিনাটি খিটিমিটি এইগুলিই প্রত্যেক বর্তমান মুহূর্তকে কণ্টকিত করে তুলছে, কিন্তু সংগীত তার নিজের ভিতরকার সুন্দর সামঞ্জস্যের দ্বারা মুহূর্তের মধ্যে যেন কী-এক মোহমন্ত্রে সমস্ত সংসারটিকে এমন একটি পারস্পেক্টিভের মধ্যে দাঁড় করায় যেখানে ওর ক্ষুদ্র ক্ষণস্থায়ী অসামঞ্জস্যগুলো আর চোখে পড়ে না—একটা সমগ্র একটা বৃহৎ একটা নিত্য সামঞ্জস্য-দ্বারা সমস্ত পৃথিবী ছবির মতো হয়ে আসে এবং মানুষের জন্মমৃত্যু হাসিকান্না ভূত-ভবিষ্যৎ বর্তমানের পর্যায় একটি কবিতার সকরুণ ছন্দের মতো কানে বাজে।’২৪
সমাজের পক্ষে ‘বিশেষ উপযোগী’ ‘ক্ষুদ্র এবং কৃত্রিম সমাজবন্ধন’-এর পাশাপাশি আছে ‘সংগীত এবং উচ্চ অঙ্গের আর্ট’—যা বন্ধনগুলির ‘অকিঞ্চিৎকরতা’ আমাদের মুহূর্তের মধ্যে উপলব্ধি করিয়ে দেয়। তাই ‘ভালো গান কিম্বা কবিতা শুনলে আমাদের মধ্যে একটা চিত্তচাঞ্চল্য জন্মে, সমাজের লৌকিকতার বন্ধন ছেদ করে নিত্যসৌন্দর্যের স্বাধীনতার জন্যে মনের ভিতর একটা নিষ্ফল সংগ্রামের সৃষ্টি হতে থাকে’।২৫ আমাদের মনে ‘অনিত্যের সঙ্গে নিত্যের’ পারস্পরিক বিরোধে-সৃষ্ট এই ‘অকারণ বেদনার’ সৌন্দর্যে প্রতিভাত হয়ে উঠেছে আলোচ্য চিঠির বৃহৎ বাক্যটি ।
‘পথে ও পথের প্রান্তে’ রানী মহলানবিশকে ১৪ মার্চ, ১৯২৯-এ রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘সেদিন হঠাৎ এক সময়ে, জানি নে কেন, ছেলেবেলাকার একটা ছবি খুব স্পষ্ট করে আমার মনে জেগে উঠল। শীতকালের সকাল বোধ হয় সাড়ে পাঁচটা। অল্প অল্প অন্ধকার আছে। চির-অভ্যাস-মত ভোরে উঠে বাইরে এসেছি। গায়ে খুব অল্প কাপড়, কেবল একখানা সুতোর জামা এবং ইজের। এই রকম খুব গরিবের মতোই আমাদের বাল্যকাল কেটেছে। ভিতরে ভিতরে শীত করছিল—তাই একটা কোণের ঘর, যাকে আমরা তোষাখানা বলতুম, যেখানে চাকররা থাকত—সেইখানে গেলুম। আধা অন্ধকারে জ্যোতিদার চাকর চিন্তে লোহার আঙটায় কাঠের কয়লা জ্বালিয়ে তার উপরে ঝাঁঝরি রেখে জ্যৈদার জন্যে রুটি তোস করছে। সেই রুটির উপর মাখন গলার লোভনীয় গন্ধে ঘর ভরা। তার সঙ্গে ছিল চিন্তের গুন গুন রবে মধুকানের গান, আর সেই কাঠের আগুন থেকে বড়ো আরামের অল্প একটুখানি তাত। আমার বয়স তখন বোধ হয় নয় হবে। ছিলুম স্রোতের শেওলার মতো—সংসারপ্রবাহের উপরতলে হালকাভাবে ভেসে বেড়াতুম—কোথাও শিকড় পৌঁছয় নি—যেন কারো ছিলুম না, সকাল থেকে রাত্তির পর্যন্ত চাকরদের হাতেই থাকতে হত, কারো কাছে কিছুমাত্র আদর পাবার আশা ছিল না। জ্যৈদা তখন বিবাহিত, তাঁর জন্যে ভাববার লোক ছিল, তাঁর জন্যে ভোরবেলা থেকেই রুটি-তোস আরম্ভ। আমি ছিলুম সংসার-পদ্মার বালুচরের দিকে, অনাদরের কূলে—সেখানে ফুল ছিল না, ফল ছিল না, ফসল ছিল না; কেবল একলা বসে ভাববার মতো অবকাশ ছিল। আর জ্যৈদা পদ্মার যে কূলে ছিলেন, সেই কূল ছিল শ্যামল—সেখানকার দূর থেকে কিছু গন্ধ আসত, কিছু গান আসত, সচল জীবনের ছবি একটু-আধটু চোখে পড়ত। বুঝতে পারতুম ঐখানেই জীবনযাত্রা সত্য। কিন্তু পার হয়ে যাবার খেয়া ছিল না, তাই শূন্যতার মাঝখানে বসে কেবলই চেয়ে থাকতুম আকাশের দিকে।’২৬
অন্যদিকে ‘ছিন্নপত্রাবলী’তে রবীন্দ্রনাথ ২৮ জুন, ১৮৯৪-এ লিখেছেন, ‘আজ বসে বসে ছেলেবেলাকার স্মৃতি এবং তখনকার মনের ভাব খুব স্পষ্ট প্রত্যক্ষবৎ মনে আনবার চেষ্টা করছিলুম। যখন পেনেটির বাগানে ছিলুম, যখন পৈতের নেড়া মাথা নিয়ে বাবামশায়ের সঙ্গে প্রথমবার বোলপুরের বাগানে গিয়েছিলুম, যখন পশ্চিমের বারান্দার সব-শেষের ঘরে আমাদের ইস্কুল-ঘর ছিল এবং আমি একটা নীল কাগজের ছেঁড়া খাতায় বাঁকা লাইন কেটে বড়ো বড়ো কাঁচা অক্ষরে প্রকৃতির বর্ণনা লিখতুম—যখন সেজদাদাদের ঘরে তোষাখানা ছিল এবং চিন্তা বলে একটা চাকর শীতকালের সকালে গুন্ গুন্ স্বরে গান করতে করতে কয়লার আগুনে জ্যোতিদাদার জন্যে মাখন দিয়ে রুটি তোষ করত—তখন আমাদের গরম কাপড় ছিল না, একখানা কামিজ প’রে সেই আগুনের কাছে বসে শীত নিবারণ করতুম এবং সেই সশব্দবিগলিত-নবনী-সুগন্ধী রুটিখণ্ডের উপরে লুব্ধদুরাশ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে চুপ করে বসে চিন্তার গান শুনতুম (সে সুরটা এখনও মনে আছে, তাকে মধুকানের সুর বলে)—সেই-সমস্ত দিনগুলিকে ঠিক বর্তমানের মতো করে দেখছিলুম এবং সেই-সমস্ত দিনগুলির সঙ্গে এই রৌদ্রালোকিত পদ্মা এবং পদ্মার চর ভারী এক রকম সুন্দরভাবে মিশ্রিত হচ্ছিল, ঠিক যেন আমার সেই ছেলেবেলাকার খোলা জানলার ধারে বসে এই পদ্মার একটি দৃশ্যখণ্ড দেখছি বলে মনে হচ্ছিল।’২৭
ছেলেবেলার বিশেষ স্মৃতিই দুটি পত্র থেকে এখানে উদ্ধৃত। পঁয়ত্রিশ বছরের কালব্যবধানে লিখিত এই দুই পত্রের উদ্ধৃতাংশে মূল পার্থক্য কোথায়? বিষয়বস্তুতে নয়—পরিবেশনভঙ্গিতে। ‘পথে ও পথের প্রান্তে’র ৩২ সংখ্যক চিঠিতে ছেলেবেলার যে-একটা ছবি ‘খুব স্পষ্ট করে’ রবীন্দ্রনাথের মনে জেগে উঠেছিল, সেই ছবির বিবরণ একাধিক বাক্যে লিখিত। কিন্তু ‘ছিন্নপত্রাবলী’তে সেই ‘ছেলেবেলাকার স্মৃতি এবং তখনকার মনের ভাব’ আধারিত একটি সুদীর্ঘ বাক্যে। কেন? এই বৃহৎ বাক্যগঠনের কারণটি ঠিক কী? ‘ছিন্নপত্রাবলী’তে ছেলেবেলাকার সেইসমস্ত দিনগুলিকে রবীন্দ্রনাথ যখন ‘খুব স্পষ্ট প্রত্যক্ষবৎ’ ‘ঠিক বর্তমানের মতো’ করে দেখছিলেন, তখন মনে হচ্ছিল, ‘ঠিক যেন আমার সেই ছেলেবেলাকার খোলা জানলার ধারে বসে এই পদ্মার একটি দৃশ্যখণ্ড দেখছি’। ‘একটি দৃশ্যখণ্ড’র ‘অখণ্ডতা’ রক্ষার্থেই কি এই সুবৃহৎ বাক্যরচনা?
৫.
জন কীটস ২২ ডিসেম্বর ১৮১৭য় দুই ভাইয়ের উদ্দেশে একটি চিঠিতে লিখছেন, ‘several things dovetailed in my mind, and at once it struck me what quality went to form a Man of Achievement, especially in Literature, and which Shakespeare possessed so enormously—I mean Negative Capability, that is when a man is capable of being in uncertainties, mysteries, doubts without any irritable reaching after fact and reason.’ ২৮ কী এই ‘Negative Capability’—যা-কিনা, কীটসের বক্তব্য অনুযায়ী, শেক্সপীয়রের রচনায় ‘enormously’ উপস্থিত? ‘Negative Capability’র সম্ভাব্য বাংলা পরিভাষা করা যেতে পারে ‘নঞর্থকতার সামর্থ্য’। এই সামর্থ্য কীভাবে গড়ে ওঠে? যখন মানুষ মানব-অহং থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিযুক্ত (negate) করতে পারে; কারণ, একমাত্র তখনই সে বিরক্তি-উদ্রেককারী তথ্য এবং যুক্তির পশ্চাদ্ধাবন (কীটসের ভাষায়, ‘irritable reaching after fact and reason’) করার পরিবর্তে নিজের ব্যক্তি-আবরণ নস্যাৎ করে যেকোনো কিছুর সঙ্গে মিশে গিয়ে অস্ত্যর্থক হয়ে ওঠে—‘By negative capability, Keats probably meant Shakespeare’s ability to imagine himself in each dramatic scene, to efface himself, and to enter with complete sympathy into the passions and moods of his character.’২৯ অর্থাৎ, নিজে ‘negative capable’ না-হলে অন্য সত্তায় নিজেকে অনুভব সম্ভব নয়। শেক্সপীয়র এই ‘Negative Capability’র কারণেই নিজের সত্তাকে বিলীন করে (‘to efface himself’) নিজসৃষ্ট চরিত্রগুলির মধ্যে সম্পূর্ণ অনুপ্রবিষ্ট হতে পেরেছিলেন। কীভাবে পেরেছিলেন? ‘with complete sympathy’। অর্থাৎ সৃষ্ট চরিত্রগুলির সমানুভূতি (কবি-প্রতিভার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে রবীন্দ্রনাথ একেই বলবেন ‘কল্পনা’; ‘কল্পনা’ অর্থে ‘imagination’ নয়—‘empathy’) তিনি ধারণ করেছিলেন।
কীটসের এই ‘Negative Capability’র-ই প্রতিধ্বনি শোনা যায় টি. এস. এলিয়টের প্রবন্ধে—‘…the poet must develop or procure the consciousness of the past and that he should continue to develop this consciousness throughout his career. What happens is a continual surrender of himself as he is at the moment to something which is more valuable. The progress of an artist is a continual self-sacrifice, a continual extinction of personality. There remains to define this process of depersonalisation...’৩০ কীটসের পরিভাষায় যা ‘Negative Capability’, এলিয়ট তাকেই বলছেন ‘continual surrender of…self’—‘a continual self-sacrifice, a continual extinction of personality’, যাকে এককথায় বলা যেতে পারে ‘depersonalisation’। ‘Negative Capability’ না থাকলে এই ‘depersonalisation’-এ উত্তরণ অসম্ভব।
প্রতিভাশালী কবি-লেখকদের এই নঞর্থকতার সামর্থ্য থাকে। বিষয়টির বোধগম্যতার সুবিধার্থে বাংলা সাহিত্যের কয়েকটি নিদর্শন উল্লেখ করা যাক। দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীল-দর্পণ’ নাটকে ভদ্রশ্রেণীর কোনো চরিত্রই সেভাবে জীবন্ত হয়ে উঠতে পারেনি। যে-চরিত্রটি সবচেয়ে জীবন্ত হয়ে উঠেছে, সেটি হল তোরাপ। অথচ নাটকে সে খলনায়ক। দীনবন্ধু মিত্র কীভাবে তোরাপের মতো আর্থ-সামাজিক স্তরে অবস্থানকারী একজন মানুষের চরিত্রকে এত নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করতে পারলেন? নঞর্থকতার সামর্থ্য বা Negative Capabilityর কারণে। সেই কারণেই নিজে যে-সামাজিক স্তরে অবস্থান করতেন, তাকে ‘negate’ করে দীনবন্ধু মানসিকভাবে তোরাপ হয়ে উঠতে পেরেছিলেন।
মনে পড়ে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আখরাইয়ের দীঘি’? ‘আখরাইয়ের দীঘির মাটি, বাহাদুরপুরের লাঠি, কুলীর ঘাঁটি’—এই তিনের ‘যোগাযোগে’ সেখানে ‘শত শত নরহত্যা’৩১ হত। রাতে ভয়ে পথিক চলত না সেই পথে। বাহাদুরপুরে বিখ্যাত লাঠিয়ালরা থাকত, কুলীর ঘাটিতে তারা রাতে নরহত্যা করে গোপনে সেইসব মৃতদেহ সমাহিত করত আখরাইয়ের দীঘির গর্ভে। সেরকমই এক ‘দুর্ধর্ষ লাঠিয়াল’ কালীচরণ বাগদীকে নিয়ে এই গল্প। কীভাবে সে মানুষ খুন করত? কালীচরণ বলে, ‘আজ চার পুরুষ ধরে আমরা এই ব্যবসা চালিয়ে এসেছি। জমিদারের লগদীগিরি লোক দেখানো পেশা ছিল আমাদের। রাত্রির পর রাত্রি চামড়ার মতো পুরু অন্ধকারে গা ঢেকে কুলীর ঘাঁটিতে ওত পেতে বসে থেকেছি। মদের নেশায় মাথার ভেতরে আগুন ছুটত। সে নেশা ঝিমিয়ে আসতে পেত না। পাশেই থাকত মদের ভাঁড়। সেই ভাঁড়ে চুমুক দিতাম। অন্ধকারের মধ্যে পথিক দেখতে পেলে বাঘের মতো লাফ দিয়ে উঠতাম। হাতে থাকত ফাবড়া—শক্ত বাঁশের দু-হাত লম্বা লাঠি, সেই লাঠি ছুঁড়তাম মাটির কোল ঘেঁষে। সাপের মতো গোঙাতে গোঙাতে সে লাঠি ছুটে গিয়ে পথিকের পায়ে লাগলে আর তার নিস্তার ছিল না। তাকে পড়তেই হত। তারপর একখানা বড় লাঠি তার ঘাড়ের ওপর দিয়ে চেপে দাঁড়াতাম, আর পা দুটো ধরে দেহটা উল্টে দিলেই ঘাড়টা ভেঙে যেত।’৩২ অজানা পথিককে কালীচরণ যেভাবে খুন করত, যেভাবে খুনের হাতে-খড়ি সে নিজে হাতে দিয়েছিল তার ছেলে তারাচরণকে; অদৃষ্টের নির্মম পরিহাসে সেই ছেলেকেই একদিন রাতের অন্ধকারে চিনতে না-পেরে, সাধারণ পথিক ভেবে, খুন করে বসে। ঘটনার দিন ‘দু-পহর রাত পর্যন্ত’ ‘শিকার’ না-পেয়ে কালীচরণ যখন ‘বিরক্ত’ হয়ে উঠেছে, এমন সময় মানুষের আওয়াজ পায় সে। সেদিন তার হাতে ‘পয়সাকড়ি কিছু ছিল না’। মানুষের সাড়া পেয়ে ‘মদের ভাঁড়ে চুমুক মেরে অভ্যাসমতো লাফিয়ে উঠে’ দাঁড়ায় কালীচরণ। তারপর? কালীচরণ বলে চলে, ‘মারলাম ফাবড়া। লাস পড়ল। চিৎকার করে সে কী বললে কানে এল না। ছুটে গিয়ে গলায় লাঠি দিয়ে উঠে দাঁড়াব, শুনলাম, “বাবা—বাবা—আমি—” কথাটা কানেই এল, কিন্তু মনে গেল না, তার গলা আমি চিনতে পারলাম না। লাঠির ওপরে দাঁড়িয়ে বললাম—“এ সময়ে বাবা সবাই বলে”।’৩৩ মানবচরিত্রের এই নৃশংসতা কীভাবে জানলেন তারাশঙ্কর? তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে তো কোথাও কালীচরণের মতো বীভৎস যাপন ছিল না! তাহলে? কীভাবে কালীচরণের মতো খুনিকে portray করতে পারলেন তারাশঙ্কর? নঞর্থকতার সামর্থ্য বা Negative Capabilityর বশে। তাই তিনি নিজের অস্তিত্বকে ‘নেই-করে তুলে’ নরঘাতী এক লাঠিয়াল ‘হয়ে উঠতে’ পেরেছিলেন, যে-কিনা নিজের ছেলেকেও খুন করতে পিছপা হয় না। সৃষ্টি হয়েছিল বাংলা সাহিত্যের অবিস্মরণীয় চরিত্র কালীচরণ বাগদী।
‘আত্মপরিচয়’ গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘এই জীবনযাত্রার অবকাশকালে মাঝে মাঝে শুভমুহূর্তে বিশ্বের দিকে যখন অনিমেষ দৃষ্টি মেলিয়া ভালো করিয়া চাহিয়া দেখিয়াছি তখন আর এক অনুভূতি আমাকে আচ্ছন্ন করিয়াছে। নিজের সঙ্গে বিশ্বপ্রকৃতির এক অবিচ্ছিন্ন যোগ, এক চিরপুরাতন একাত্মকতা আমাকে একান্তভাবে আকর্ষণ করিয়াছে।’৩৪
এই ‘আর এক অনুভূতি’ অর্থাৎ ‘নিজের সঙ্গে বিশ্বপ্রকৃতির এক অবিচ্ছিন্ন যোগ, এক চিরপুরাতন একাত্মকতা’ই হল সর্বানুভূতিচেতনা। নিজের মানবসত্তাকে মানসিকভাবে নস্যাৎ করতে পেরেছিলেন বলেই-না রবীন্দ্রনাথ ‘নিজের সঙ্গে বিশ্বপ্রকৃতির এক অবিচ্ছিন্ন যোগ, এক চিরপুরাতন একাত্মকতা’ অনুভব করতে পেরেছিলেন! অর্থাৎ নঞর্থকতার সামর্থ্যেই রবীন্দ্রনাথ সর্বানুভূ, অর্থাৎ সবকিছুই তাঁর অনুভূতির অন্তর্গত। তাঁর ‘স্বাতন্ত্র্যগর্ব’ নেই বলেই তিনি বিশ্বের সঙ্গে নিজের কোনো ‘বিচ্ছেদ’ স্বীকার করেননি।
পৃথিবীর সঙ্গে সেই একাত্মকতা প্রসঙ্গে তিনি লিখছেন, ‘এই পৃথিবীটি আমার অনেক দিনকার এবং অনেক জন্মকার ভালোবাসার লোকের মতো আমার কাছে চিরকাল নতুন; আমাদের দুজনকার মধ্যে একটা খুব গভীর এবং সুদূরব্যাপী চেনাশোনা আছে। আমি বেশ মনে করতে পারি বহু যুগ পূর্বে যখন তরুণী পৃথিবী সমুদ্রস্নান থেকে সবে মাথা তুলে উঠে তখনকার নবীন সূর্যকে বন্দনা করছেন, তখন আমি এই পৃথিবীর নূতন মাটিতে কোথা থেকে এক প্রথম জীবনোচ্ছ্বাসে গাছ হয়ে পল্লবিত হয়ে উঠেছিলুম। তখন পৃথিবীতে জীবজন্তু কিছুই ছিল না, বৃহৎ সমুদ্র দিনরাত্রি দুলছে, এবং অবোধ মাতার মতো আপনার নবজাত ক্ষুদ্র ভূমিকে মাঝে মাঝে উন্মত্ত আলিঙ্গনে একেবারে আবৃত করে ফেলছে। তখন আমি এই পৃথিবীতে আমার সমস্ত সর্বাঙ্গ দিয়ে প্রথম সূর্যালোক পান করেছিলুম, নবশিশুর মতো একটা অন্ধজীবনের পুলকে নীলাম্বরতলে আন্দোলিত হয়ে উঠেছিলুম, এই আমার মাটির মাতাকে আমার সমস্ত শিকড়গুলি দিয়ে জড়িয়ে এর স্তন্যরস পান করেছিলুম। একটা মূঢ় আনন্দে আমার ফুল ফুটত এনং নবপল্লব উদ্গত হত। যখন ঘনঘটা করে বর্ষার মেঘ উঠত তখন তার ঘনশ্যাম ছায়া আমার সমস্ত পল্লবকে একটি পরিচিত করতলের মতো স্পর্শ করত। তার পরেও নব নব যুগে এই পৃথিবীর মাটিতে আমি জন্মেছি। আমরা দুজনে একদা মুখোমুখি করে বসলেই আমাদের সেই বহুকালের পরিচয় যেন অল্পে অল্পে মনে পড়ে।’৩৫
তরুণী পৃথিবীর জন্মমুহূর্ত থেকে এই ধরিত্রীর সঙ্গে ‘বহুকাল’ ‘বহুজন্ম’ লগ্ন-হয়ে-থাকা রবীন্দ্রনাথ নিজের এই সর্বানুভূতি ভাষায় প্রকাশের ক্ষেত্রে বারংবার আশ্রয়গ্রহণ করেছেন দীর্ঘ বাক্যের। আমাদের মনে পড়ে যায় ‘বসুন্ধরা’ কবিতা, ‘ওগো মা মৃন্ময়ী./ তোমার মৃ্ত্তিকা-মাঝে ব্যাপ্ত হয়ে রই;/ দিগ্বিদিকে আপনারে দিই বিস্তারিয়া/ বসন্তের আনন্দের মতো; বিদারিয়া/ এ বক্ষপঞ্জর, টুটিয়া পাষাণবন্ধ/ সংকীর্ণ প্রাচীর, আপনার নিরানন্দ/ অন্ধ কারাগার, হিল্লোলিয়া, মর্মরিয়া,/ কম্পিয়া, স্খলিয়া, বিকিরিয়া, বিচ্ছুরিয়া,/ শিহরিয়া, সচকিয়া আলোকে পুলকে/ প্রবাহিয়া চলে যাই সমস্ত ভূলোকে/ প্রান্ত হতে প্রান্তভাগে, উত্তরে দক্ষিণে,/ পুরবে পশ্চিমে—শৈবালে শ্বাদলে তৃণে/ শাখায় বল্কলে পত্রে উঠি সরসিয়া/ নিগূঢ় জীবনরসে; যাই পরশিয়া/ স্বর্ণশীর্ষে আনমিত শস্যক্ষেত্রতল/ অঙ্গুলির আন্দোলনে; নবপুষ্পদল/ করি পূর্ণ সংগোপনে সুবর্ণলেখায়/ সুধাগন্ধে মধুবিন্দুভারে; নীলিমায়/ পরিব্যাপ্ত করি দিয়া মহাসিন্ধুনীর/ তীরে তীরে করি নৃত্য স্তব্ধ ধরণীর/ অনন্ত কল্লোলগীতে; উল্লসিত রঙ্গে/ ভাষা প্রসারিয়া দিই তরঙ্গে তরঙ্গে/ দিক্-দিগন্তরে; শুভ্র উত্তরীয়-প্রায়/ শৈলশৃঙ্গে বিছাইয়া দিই আপনায়/ নিষ্কলঙ্ক নীহারের উত্তুঙ্গ নির্জনে/ নিঃশব্দ নিভৃতে।।’৩৬ দীর্ঘ ছাব্বিশ পঙ্ক্তিব্যাপী একটিই বাক্য। আসলে, ‘দিগ্বিদিকে’—‘উত্তরে দক্ষিণে পুরবে পশ্চিমে’ আপনাকে বিস্তারের সুমহান কর্মকাণ্ডটি কি কোনো ক্ষুদ্র বাক্যে আধারিত করা সম্ভব? ‘হিল্লোলিয়া’, ‘মর্মরিয়া’, ‘কম্পিয়া’, ‘স্খলিয়া’, ‘বিকিরিয়া’, ‘বিচ্ছুরিয়া’, ‘শিহরিয়া’, ‘সচকিয়া’—পরপর আটটি অসমাপিকা ক্রিয়াপদের সহাবস্থানে৩৭ ‘সমস্ত ভূলোকে’ ‘প্রান্ত হতে প্রান্তভাগে’ ‘শৈলশৃঙ্গ’ থেকে ‘মহাসিন্ধুনীর’এ সর্বানুভূ কবিকে ধারণ করে আছে এই বাক্য।
‘বসুন্ধরা’ কবিতা রবীন্দ্রনাথ লিখছেন কার্ত্তিক ১৩০০য়। সমকালে একই-প্রসঙ্গে-লিখিত ‘ছিন্নপত্রাবলী’র চিঠিতেও রবীন্দ্রনাথ দীর্ঘ বাক্য ব্যবহার করছেন। শিলাইদহ থেকে ২০ অগাস্ট ১৮৯২-এ লিখছেন, ‘ছেলেবেলায় রবিন্সন্ক্রুশো পৌলভর্জিনি প্রভৃতি বইয়ে গাছপালা সমুদ্রের ছবি দেখে মন ভারী উদাসীন হয়ে যেত—এখানকার রৌদ্রে আমার সেই ছবি দেখার বাল্যস্মৃতি ভারী জেগে ওঠে। এর যে কী মানে আমি ঠিক ধরতে পারি নে, এর সঙ্গে যে কী-একটা আকাঙ্ক্ষা জড়িত হয়ে আছে আমি ঠিক বুঝতে পারি নে—এ যেন এই বৃহৎ ধরণীর প্রতি একটা নাড়ীর টান—এক সময়ে যখন আমি এই পৃথিবীর সঙ্গে এক হয়ে ছিলুম, যখন আমার উপর সবুজ ঘাস উঠত, শরতের আলো পড়ত, সূর্যকিরণে আমার সুদূরবিস্তৃত শ্যামল অঙ্গের প্রত্যেক রোমকূপ থেকে যৌবনের সুগন্ধি উত্তাপ উত্থিত হতে থাকত, আমি কত দূর দূরান্তর কত দেশ দেশান্তরের জল স্থল ব্যাপ্ত করে উজ্জ্বল আকাশের নীচে নিস্তব্ধভাবে শুয়ে পড়ে থাকতুম, তখন শরৎ-সূর্যালোকে আমার বৃহৎ সর্বাঙ্গে যে একটি আনন্দরস একটি জীবনীশক্তি অত্যন্ত অব্যক্ত অর্ধচেতন এবং অত্যন্ত প্রকাণ্ড বৃহৎ ভাবে সঞ্চারিত হতে থাকত, তাই যেন খানিকটা মনে পড়ে—আমার এই-যে মনের ভাব এ যেন এই প্রতিনিয়ত অঙ্কুরিত মুকুলিত পুলকিত সূর্যসনাথা আদিম পৃথিবীর ভাব।’৩৮
‘বৃহৎ’ ধরণীর প্রতি ‘নাড়ীর টান’-এ ‘কত দূর-দূরান্তর’ ‘কত দেশ-দেশান্তরের’ জল-স্থল ব্যাপ্ত-করে-থাকা কবির ‘বৃহৎ সর্বাঙ্গে’ যে-‘একটি আনন্দরস একটি জীবনীশক্তি অত্যন্ত অব্যক্ত অর্ধচেতন এবং অত্যন্ত প্রকাণ্ড বৃহৎভাবে সঞ্চারিত হতে থাকত’; সেই ‘প্রকাণ্ড বৃহৎ’ ভাব প্রকাশের সহযোগী হয়ে উঠেছে এই বৃহৎ বাক্য। ‘অঙ্কুরিত মুকুলিত পুলকিত’— ক্রমান্বয়িক সংঘটনসূচক ক্রিয়াপদের ব্যবহারে ‘সূর্যসনাথা’ ‘আদিম পৃথিবীর ভাব’ এখানে যুক্তিসংগতভাবেই সুদীর্ঘ বাক্যে প্রতিষ্ঠিত।
পাঠকের মনে হতে পারে, কেন রবীন্দ্রনাথ বারবার একই অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন বিভিন্ন সাহিত্য সংরূপে? কারণ, রবীন্দ্রনাথের অনুভূতি তাঁর ‘নিজের কাছেই প্রত্যেকবার নূতন এবং বিস্ময়জনক।’৩৯ লিখছেন, ‘…পুরাতন জিনিষও আমাকে নূতন করে আঘাত করে, আমার চিরপরিচিত প্রিয় পদার্থগুলির সঙ্গে প্রত্যেক পুনর্মিলনের মধ্যে একটা অংশ থাকে যেটা প্রথম মিলন, প্রত্যেক বারেই একটা নূতন বিস্ময় কোথা থেকে আবির্ভূত [যৎ] হয়।’৪০ এই ‘নিতুই নব’ অনুভবক্ষমতার কারণে রবীন্দ্রনাথ শুধু সাহিত্য সংরূপভেদে একই ভাবের পুনরাবৃত্তি করেছেন, তাই-ই নয়, নিজের সেই মুহূর্তকালীন সৌন্দর্যসম্ভোগকে তিনি ‘খাতায় টুকে’ করে তুলতে চেয়ছেন ‘ক্ষণশাশ্বতী’। ইন্দিরা দেবীকে-লেখা চিঠিতে সেই চিন্তনেরই বহিঃপ্রকাশ—‘আমার অনেক সময় ইচ্ছা করে তোকে যে-সমস্ত চিঠি লিখেছি সেইগুলো নিয়ে পড়তে পড়তে আমার অনেক দিনকার সঞ্চিত অনেক সকাল দুপুর সন্ধ্যার ভিতর দিয়ে আমার চিঠির সরু রাস্তা বেয়ে আমার পুরাতন পরিচিত দৃশ্যগুলির মাঝখান দিয়ে চলে যাই। কত দিন কত মুহূর্তকে আমি ধরে রাখবার চেষ্টা করেছি, সেগুলো বোধ হয় তোর চিঠির বাক্সর মধ্যে ধরা আছে—আমার চোখে পড়লেই আবার সেই-সমস্ত দিন আমাকে ঘিরে দাঁড়াবে। ওর মধ্যে যা-কিছু আমার ব্যক্তিগত জীবন-সংক্রান্ত সেটা তেমন বহুমূল্য নয়—কিন্তু যেটাকে আমি বাইরের থেকে সঞ্চয় করে এনেছি, যেটা এক-একটা দুর্লভ সৌন্দর্য, দুর্মূল্য [যৎ] সম্ভোগের সামগ্রী, যেগুলো আমার জীবনের অসামান্য উপার্জন—যা হয়তো আমি ছাড়া আর কেউ দেখে নি, যা কেবল আমার সেই চিঠির পাতার মধ্যে রয়েছে, জগতের আর কোথাও নেই—তার মর্যাদা আমি যেমন বুঝব এমন বোধ হয় আর কেউ বুঝবে না। আমাকে একবার তোর চিঠিগুলো দিস [বব], আমি কেবল ওর থেকে আমার সৌন্দর্যসম্ভোগগুলো একটা খাতায় টুকে নেব। কেননা যদি দীর্ঘকাল বাঁচি তা হলে এক সময় নিশ্চয় বুড়ো হয়ে যাব; তখন এই-সমস্ত দিনগুলো স্মরণের এবং সান্ত্বনার সামগ্রী হয়ে থাকবে। তখন পূর্বজীবনের সমস্ত সঞ্চিত সুন্দর দিন্গুলির [যৎ] মধ্যে তখনকার সন্ধ্যার আলোকে ধীরে ধীরে বেড়াতে ইচ্ছে করবে। তখন আজকেকার এই পদ্মার চর এবং স্নিগ্ধ শান্ত বসন্তজ্যোৎস্না ঠিক এমনি টাটকা-ভাবে ফিরে পাব। আমার গদ্যে পদ্যে কোথাও আমার সুখদুঃখের দিনরাত্রিগুলি এ রকম করে গাঁথা নেই।’৪১
১৭ চৈত্র ১২৯৯, ইংরিজি ২৯ মার্চ ১৮৯৩-এ রবীন্দ্রনাথ লিখলেন ‘সমুদ্রের প্রতি’ কবিতা। বসুন্ধরা-পুত্র তথা সমুদ্র-দৌহিত্র কবির সর্বানুভূতি সেখানে ব্যক্ত হয়েছে এইভাবে—‘…মনে হয়, যেন মনে পড়ে,/ যখন বিলীনভাবে ছিনু ওই বিরাট জঠরে/ অজাত ভুবনভ্রূণ-মাঝে, লক্ষকোটি বর্ষ ধরে/ ওই তব অবিশ্রাম কলতান অন্তরে অন্তরে/ মুদ্রিত হইয়া গেছে; সেই জন্মপূর্বের স্মরণ,/ গর্ভস্থ পৃথিবী-’পরে সেই নিত্য জীবনস্পন্দন/ তব মাতৃহৃদয়ের, অতি ক্ষীণ আভাসের মতো/ জাগে যেন সমস্ত শিরায়, শুনি যবে নেত্র করি নত/ বসি জনশূন্য তীরে ওই পুরাতন কলধ্বনি।’৪২ কী মনে পড়ে কবির? ‘লক্ষকোটি বর্ষ ধরে’ সমুদ্রের ‘বিরাট জঠরে’ ‘অজাত ভুবনভ্রূণ-মাঝে’ ‘বিলীন’ হয়ে থাকার স্মৃতি। এ কি নেহাত সাধারণ কোনো স্মৃতি? এ তো ‘জন্মপূর্বের স্মরণ’! সেই মহাস্মৃতির ধারক হিসেবেই এই দীর্ঘ বাক্যের সূত্রপাত।
এই কবিতা লেখার ঠিক আঠারো দিন পর ১৬ এপ্রিল ১৮৯৩ রবীন্দ্রনাথ ‘ছিন্নপত্রাবলী’র একটি চিঠিতে একই ভাব প্রকাশ করলেন। লিখলেন, ‘এই পৃথিবীর সঙ্গে, সমুদ্রের সঙ্গে, আমাদের যে-একটা বহুকালের গভীর আত্মীয়তা আছে, নির্জন প্রকৃতির সঙ্গে মুখোমুখি করে অন্তরের মধ্যে অনুভব না করলে সে কি কিছুতেই বোঝানো যায়! পৃথিবীতে যখন মাটি ছিল না, সমুদ্র একেবারে একলা ছিল, আমার আজকেকার এই চঞ্চল হৃদয় তখনকার সেই জনশূন্য জলরাশির মধ্যে অব্যক্তভাবে তরঙ্গিত হতে থাকত; সমুদ্রের দিকে চেয়ে তার একতান কলধ্বনি শুনলে তা যেন বোঝা যায়। আমার অন্তঃসমুদ্রও আজ একলা বসে বসে সেই রকম তরঙ্গিত হচ্ছে, তার ভিতরে ভিতরে কী-একটা যেন সৃজিত হয়ে উঠছে—কত নির্দিষ্ট আশা, অকারণ আশঙ্কা, কত রকমের সৃষ্টি, কত রকমের প্রলয়, কত স্বর্গ নরক, কত বিশ্বাস সন্দেহ, কত লোকাতীত প্রত্যক্ষাতীত প্রমাণাতীত অনুভব এবং অনুমান, সৌন্দর্যের অপার রহস্য, প্রেমের অতল অতৃপ্তি—মানবমনের জড়িত জটিল সহস্র রকমের অপূর্ব অপরিমেয় ব্যাপার।’৪৩
‘পৃথিবীতে যখন মাটি ছিল না’, ‘সমুদ্র একেবারে একলা ছিল’, সেইসময় কবির চঞ্চল হৃদয় যেমন ‘তখনকার সেই জনশূন্য জলরাশির মধ্যে অব্যক্তভাবে তরঙ্গিত হতে থাকত’, তাঁর ‘অন্তঃসমুদ্রও আজ একলা বসে বসে সেই রকম তরঙ্গিত’। সেই তরঙ্গে দোদুল্যমান উপাদানসমূহ কীরকম? ‘কত নির্দিষ্ট আশা, অকারণ আশঙ্কা, কত রকমের সৃষ্টি, কত রকমের প্রলয়, কত স্বর্গ নরক, কত বিশ্বাস সন্দেহ, কত লোকাতীত প্রত্যক্ষাতীত প্রমাণাতীত অনুভব এবং অনুমান, সৌন্দর্যের অপার রহস্য, প্রেমের অতল অতৃপ্তি’। মানবমনের এহেন ‘জড়িত জটিল সহস্র রকমের অপূর্ব অপরিমেয় ব্যাপার’ কি কোনো ছোট বাক্যে সীমায়িত করা চলে? তাই এই বৃহৎ বাক্যের অবতারণা।
‘আত্মপরিচয়’-এ যা ছিল তত্ত্বকথার বহিঃপ্রকাশ, সর্বানুভূতির সেই মূল ভাববস্তুকে ‘ছিন্নপত্রাবলী’র এই চিঠিতে আলাপচারী গদ্যে পরিবেশন করেছেন রবীন্দ্রনাথ—‘রৌদ্র ঝাঁ ঝাঁ করছে, জল ঝিক্মিক্ করছে, একটু একটু শীতের বাতাস দিচ্ছে, নদীর জল আয়নার মতো স্থির, মাঝে মাঝে এক-আধটা নৌকো পাশ দিয়ে ছল্ ছল্ শব্দে চলে যাচ্ছে। যদি একলা থাকতুম তা হলে এই সময়টাতে জানলার কাছে লম্বা কেদারায় আবিষ্টচিত্তে পড়ে থাকতুম—দিবাস্বপ্ন দেখতুম, এই রৌদ্রোজ্জ্বল আকাশের ভিতরকার একটি গভীর বেলাবলী রাগিণী শুনতে পেতুম এবং নিজের অস্তিত্বকে এই রৌদ্র জল বায়ুর ভিতরে সম্মিশ্রিত পরিব্যাপ্ত হিল্লোলিত অনুভব করতুম—নিজেকে অখণ্ড অনন্তকালের শয্যাতলে শয়ান উপলব্ধি করতুম—সমস্ত পৃথিবী জুড়ে তৃণগুল্ম তরুলতা পশুপক্ষী-রূপে যে জীবনরাশি উচ্ছ্বসিত হচ্ছে নিজেকে সেই কলধ্বনিমুখরিত চিরনির্ঝরের মধ্যে প্রবাহিত বোধ করতুম—আমার নিজের ব্যক্তিগত নিজত্ব-আবরণ এই শরতের রৌদ্রে বিগলিত হয়ে এই স্বচ্ছ আকাশের সঙ্গে মিশে যেত এবং আমি দেশকালের অতীত হয়ে যেতুম।’৪৪
খেয়াল করুন, নিজের অস্তিত্বের ‘সম্মিশ্রিত পরিব্যাপ্ত হিল্লোলিত অনুভব’ শুধু ‘এই রৌদ্র জল বায়ুর ভিতরে’ অর্থাৎ প্রকৃতির ভিতরেই নয়; মানবেতর প্রাণী ‘পশুপক্ষী-রূপে’ও ‘নিজেকে অখণ্ড অনন্তকালের শয্যাতলে শয়ান উপলব্ধি’ করতে কবি প্রস্তুত। তাই নিজের ব্যক্তিগত ‘নিজত্ব-আবরণ’ শরতের রোদে ‘বিগলিত হয়ে’ স্বচ্ছ আকাশের সঙ্গে মিশে গিয়ে ‘দেশকালের অতীত’ হয়ে-ওঠার ‘দিবাস্বপ্ন’টি একটি সুদীর্ঘ বাক্যের দাবিদার।
রবীন্দ্রসাহিত্য পাঠে এই সর্বানুভূতির মাহাত্ম্য কতখানি? একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ জানাচ্ছেন, ‘সমস্ত প্রকৃতির সঙ্গে আমার…খুব একটা নিগূঢ় অন্তরঙ্গ সত্যিকার সজীব সম্পর্ক আছে, এবং সেই প্রীতি সেই আত্মীয়তাকেই…আমি যথার্থ এবং সর্বোচ্চ ধর্ম বলে জ্ঞান এবং অনুভব করি এবং আমার এই অন্তরপ্রকৃতিটি না বুঝলে…আমার অধিকাংশ কবিতার রসাস্বাদন, এমন-কি, অর্থগ্রহণ করা যায় না…।’৪৫
আজকের এই একুশ শতকে কোনো টেক্সটের রসাস্বাদনে জীবনীমূলক সমালোচনা (Biographical Criticism) নস্যাৎ করে যখন পাঠকের পাঠ-প্রতিক্রিয়া বা Reader’s Response-কেই বিশেষ গুরুত্ব সহকারে প্রচারের প্রচেষ্টা চলছে, যখন ‘আপন মনের মাধুরী’ মেশানো উদ্ভট ব্যাখ্যায় হাস্যাস্পদ করে তোলা হচ্ছে রবীন্দ্র-আখ্যানকেও; তখন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের এই উক্তি পাঠকের গতানুগতিক পাঠ-অভ্যাসকে প্রশ্নচিহ্নের সামনে দাঁড় করায়। কারণ, রবীন্দ্রনাথের কবিতার ‘রসাস্বাদন’, এমনকি ‘অর্থগ্রহণ’ করতে গেলেও রবীন্দ্রনাথের ‘অন্তরপ্রকৃতি’ অর্থাৎ রবীন্দ্র-মানসকে অনুধাবন বিশেষ জরুরি।
‘ছিন্নপত্রাবলী’র নির্বাচিত চিঠিতে দীর্ঘ বাক্যরচনার প্রেক্ষাপটে-থাকা রবীন্দ্রমানস উপলব্ধি করতে পারলে সেইসব রচনার সম্পূর্ণ ও সামগ্রিক ‘রসাস্বাদন’ ঠিক কেমনতরো হতে পারে, তারই সামান্য নিদর্শন থাকল বর্তমান প্রবন্ধে।
উৎস ও অনুষঙ্গ
আলোচ্য প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের ‘ছিন্নপত্রাবলী’র বিশ্বভারতী সংস্করণ (প্রথম প্রকাশ- অক্টোবর ১৯৬০, নতুন সংস্করণ- চৈত্র ১৩৯৯) ব্যবহৃত।
১. সম্পা-শ্রীশোভনলাল গঙ্গোপাধ্যায়, ‘রবীন্দ্রবীক্ষা’, ত্রয়োদশ সংকলন, রবীন্দ্রভবন কর্তৃক প্রকাশিত, ২২ শ্রাবণ ১৩৯২, ৭ অগাস্ট ১৯৮৫, পৃ. ৩-৪।
২. ‘ছিন্নপত্রাবলী’, ১৯৮ সংখ্যক পত্র, পৃ. ২৯১-২৯২।
৩. তত্রৈব, ১৬০ সংখ্যক পত্র, পৃ. ২৪৩-২৪৪।
৪. তত্রৈব, ৮১ সংখ্যক পত্র, পৃ. ১২৪।
৫. তত্রৈব, ১ সংখ্যক পত্র, পৃ. ৯।
৬. তত্রৈব।
৭. রবীন্দ্রনাথ, ‘জীবনস্মৃতি’, বিশ্বভারতী, গ্রন্থপ্রকাশ ১৩১৯, সাধারণ সংস্করণ- জৈষ্ঠ্য ১৩৮৭, পৃ. ১৫।
৮. ‘ছিন্নপত্রাবলী’, ৬ সংখ্যক পত্র, পৃ. ২৪-২৫।
৯. তত্রৈব, ৪ সংখ্যক পত্র, পৃ. ১৭-১৮।
১০. তত্রৈব, ১৮ সংখ্যক পত্র, পৃ. ৪২।
১১. তত্রৈব, ১২৯ সংখ্যক পত্র, পৃ. ২০০।
১২. তত্রৈব, ৩৫ সংখ্যক পত্র, পৃ. ৬৬-৬৭।
১৩. তত্রৈব, ১৭৯ সংখ্যক পত্র, পৃ. ২৬৭।
১৪. রবীন্দ্রনাথ, “আশা”, ‘পূরবী’, বিশ্বভারতী, প্রথম প্রকাশ- শ্রাবণ ১৩৩২, দ্বিতীয় সংস্করণ- ভাদ্র ১৩৩৮, পৃ. ১০২।
১৫. রবীন্দ্রনাথ, “বলাকা” (৩৬ সংখ্যক কবিতা), ‘বলাকা’, বিশ্বভারতী, ১৯১৬, পৃ. ৯২।
১৬. ‘উভচর জীব হয়ে আমি ভারী মুশকিলে পড়াছি। সকল বিষয়েই আমি উভচর—মানসজগৎ এবং বস্তুজগৎ দুইয়ের মধ্যেই আমার সমান বন্ধন।’ (‘ছিন্নপত্রাবলী’, ১৫৪ সংখ্যক পত্র, পৃ. ২৩৫)
১৭. রবীন্দ্রনাথ, ‘গীতবিতান’ (অখণ্ড), বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, আশ্বিন ১৩৭১, পৃ. ৫৪৫।
১৮. তত্রৈব, পৃ. ৫৪৬।
১৯. রবীন্দ্রনাথ, “সৌন্দর্যবোধ”, ‘সাহিত্য’, বিশ্বভারতী, প্রকাশ- ১৩১৪, চতুর্থ সংস্করণ- শ্রাবণ ১৩৮৮, পৃ. ৩৬।
২০. রবীন্দ্রনাথ, “প্রেম”, ‘শান্তিনিকেতন’, রবীন্দ্র-রচনাবলী, সুলভ সংস্করণ, ত্রয়োদশ খণ্ড, বিশ্বভারতী, কার্ত্তিক ১৩৫৯, পৃ. ৪৬৫।
২১. রবীন্দ্রনাথ, “সৌন্দর্যবোধ”, ‘সাহিত্য’, বিশ্বভারতী, প্রকাশ- ১৩১৪, চতুর্থ সংস্করণ- শ্রাবণ ১৩৮৮, পৃ. ৪৯।
২২. ‘ছিন্নপত্রাবলী’, ৯৯ সংখ্যক পত্র, পৃ. ১৫২।
২৩. রবীন্দ্রনাথ, ‘উৎসর্গ’ (৭ সংখ্যক কবিতা), বিশ্বভারতী, প্রথম প্রকাশ ১৩২১, পঞ্চম সংস্করণ- জ্যৈষ্ঠ ১৩৮৭, পৃ. ১৭।
২৪. ‘ছিন্নপত্রাবলী’, ২১১ সংখ্যক পত্র, পৃ. ৩০৬।
২৫. তত্রৈব।
২৬. রবীন্দ্রনাথ, ‘পথে ও পথের প্রান্তে, ৩২ সংখ্যক পত্র, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, প্রকাশ- জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৫, পৃ. ৬৫-৬৬।
২৭. ‘ছিন্নপত্রাবলী’, ১২৩ সংখ্যক পত্র, পৃ. ১৮৯।
২৮. Edited by Horace E. Scudder, ‘The Complete Poetical Works and Letters of John Keats, Cambridge Edition, The Riverside Press, Cambridge, 1899, p. 277.
২৯. Ed. David George, General Editor- Brain Vickers, ‘Shakespeare: The Critical Tradition’, Thoemmes Continuum, 2004, p. 1.
৩০. T. S. Eliot, ‘Tradition and the Individual Talent’, The Egoist, September 1919. P. 55.
৩১. তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘স্বনির্বাচিত গল্প’, ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েটস পাবলিশিং কোং লিঃ, দ্বিতীয় সংস্করণ- চৈত্র ১৩৬২, পৃ. ৪।
৩২. তত্রৈব, পৃ. ১৪।
৩৩. তত্রৈব, পৃ. ১৫-১৬।
৩৪. রবীন্দ্রনাথ, ‘আত্মপরিচয়’, বিশ্বভারতী, প্রকাশ- ১ বৈশাখ, ১৩৫০, সংস্করণ- চৈত্র ১৪০০, পৃ. ২০
৩৫. ‘ছিন্নপত্রাবলী’, ৭৪ সংখ্যক পত্র, পৃ. ১১৫।
৩৬. রবীন্দ্রনাথ, “বসুন্ধরা”, ‘সোনার তরী’, বিশ্বভারতী বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়, প্রথম প্রকাশ- ১৩০০, নূতন সংস্করণ- আশ্বিন ১৩৪৮, পৃ. ১৬৮-১৬৯।
৩৭. যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক বাংলা দ্বিতীয় বর্ষে (২০০৪-২০০৫)র চতুর্থ সেমেস্টারে ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থের পাঠ্য দশটি কবিতার অন্তর্ভুক্ত ‘বসুন্ধরা’ ও ‘সোনার তরী’ কবিতার আলোচনা প্রসঙ্গে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তপোব্রত ঘোষ অসমাপিকা ক্রিয়া-সহ দীর্ঘ বাক্য প্রয়োগের প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রমানসের প্রতি ছাত্রছাত্রীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। গদ্যশৈলী থেকে গদ্যকারের মনস্তত্ত্বপাঠের সেই দীক্ষাপ্রদানে তিনি বিশেষ ধন্যবাদার্হ।
৩৮. ‘ছিন্নপত্রাবলী’, ৭০ সংখ্যক পত্র, পৃ. ১১০।
৩৯. ‘ছিন্নপত্রাবলী’, ১৪৪ সংখ্যক পত্র, পৃ. ২১৮।
৪০. ‘ছিন্নপত্রাবলী’, ২৪৪ সংখ্যক পত্র, পৃ. ৩৪০।
৪১. ‘ছিন্নপত্রাবলী’, ২০০ সংখ্যক পত্র, পৃ. ২৯৪-২৯৫ ।
৪২. রবীন্দ্রনাথ, “সমুদ্রের প্রতি”, ‘সোনার তরী’, বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়, প্রথম প্রকাশ- ১৩০০, নূতন সংস্করণ- আশ্বিন ১৩৪৮, পৃ. ৬৯।
৪৩. ‘ছিন্নপত্রাবলী’, ৯১ সংখ্যক পত্র, পৃ. ১৪২-১৪৩।
৪৪. ‘ছিন্নপত্রাবলী’, ২৩৯ সংখ্যক পত্র, পৃ. ৩৩৪-৩৩৫।
৪৫. ‘ছিন্নপত্রাবলী’, ১৮৭ সংখ্যক পত্র, পৃ. ২৭৬।
লেখক পরিচিতি : সহকারী অধ্যাপক, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, নেতাজি সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা। গবেষণায় আগ্রহের ক্ষেত্র রবীন্দ্রনাথ এবং গোয়েন্দা সাহিত্য।