




সন্ধেবেলা সাধুদার চায়ের দোকানে ঢুকে দেখি একটা পাখির খাঁচা। খাঁচাটা খালি। খাঁচার দরজা খোলা। খাঁচার মাথায় বসে আছে একটা টিয়া পাখি। আমার দিকে একবার তাকাল পাখিটা। তারপরে মুখ ঘুরিয়ে নিল। খাঁচার পাশে বেঞ্চিতে বসে সাধুদা একটা বুদ্ধদেব বসুর কবিতার বইয়ের পাতা ওলটাচ্ছে। সাধুদার পরনে যথারীতি বাদামী হাফপ্যান্ট আর সাদা ফতুয়া। বয়স কত বোঝা মুশকিল – পঞ্চাশও হতে পারে, ষাটও হতে পারে।
বললাম, “এ আবার কে? নতুন পোষ্য বুঝি?”
সাধুদা বলল, “ওর নাম বুদবুদ। লেকের ধারে ডানা ভেঙে পড়েছিল। তুলে আনলাম, ডাক্তার দেখালাম, শুশ্রূষা করলাম। তিন সপ্তাহ হয়ে গেছে। এখন খাঁচার দরজা খুলে দিয়েছি। তাও ব্যাটা যাবে না!”
আমি - “বাঃ। কথা-টথা বলে নাকি?”
সাধুদা - “হ্যাঁ, মাঝে মধ্যে বলে।”
আমি - “কী খায়?”
সাধুদা - “কাঁচা লংকা, কলা আর বিস্কুট।”
আমি একটা ফাঁকা বেঞ্চে বসলাম। পাখিটাকে বললাম, “তোর নাম বুদবুদ?”
পাখিটা পাত্তা দিল না।
সাধুদাকে বললাম, “একটা হাফটোস্ট দিন। আর লেবু-চা।”
সাধুদা কবিতার বই রেখে উঠে পড়ল। উনোনের পেছনে গিয়ে টোস্ট আর চায়ের বন্দোবস্ত করতে শুরু করল।
আমি - “কী কথা বলে ও? যা শোনে, তার পুনরাবৃত্তি?”
সাধুদা - “খানিকক্ষণ বোসো। বুঝতে পারবে।”
আমি বসে বসে একটু কাজের কথা ভাবলাম, মানে অফিসের কাজ। ভাবতে না ভাবতেই মনের মধ্যে হুড়হুড় করে ঢুকে পড়ল যত সব বাজে উদ্বেগ। পৃথিবী সম্বন্ধে আমার নেতিবাচক সব দুশ্চিন্তা।
সাধুদা চা আর টোস্ট দিল। আমি এক হাতে লেবু-চা’র ভাঁড় নিয়ে, অন্য হাতে হাফটোস্টে কামড় দিলাম।
সাধুদা - “অনেক দিন আসোনি। সব খবর ভালো তো?”
আমি হয়তো ওই প্রশ্নটার অপেক্ষাতেই ছিলাম সেই বিকেল থেকে। মুখের টোস্টটা ভালো করে না চিবিয়েই গিলে ফেললাম। লেবু-চা’য় চুমুক দিয়ে গলাটা পরিষ্কার করে বললাম, “ভালো?! কিসের ভালো? পৃথিবীটাকে প্রায় আমরা মেরে ফেলেছি। সমুদ্রের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক গরম। অ্যাটলান্টিকে জলস্রোত প্রায় থেমে যেতে বসেছে। সারা পৃথিবীর ওপর তার যে কি ভয়ানক প্রভাব পড়বে কেউ জানে না। উত্তরমেরুর শ্বেত ভাল্লুকরা মরতে বসেছে। আরো কত পশু পাখি কীটপতঙ্গ গাছপালা যে মৃতপায় কে জানে। প্রাণজগতের যে ডালে বসে আছি আমরা, কালিদাসের মতো তারই গোড়ায় কুড়ুল মারছি।”
একটা লোক দোকানে ঢুকল। আমি থামলাম। লোকটার বয়স ষাটের ঊর্ধ্বে। হয়তো পঁয়ষট্টি। পরনে খাদির পাজামা পাঞ্জাবি। লোকটা একটা লেবু চা চাইল। তারপর আমার পাশের বেঞ্চে বসল। সাধুদা আবার চা বানানোর জন্য উদ্যত হল। বাইরে আকাশে দূরে কোথাও বাজ পড়ার শব্দ হল।
আমি আবার শুরু করলাম, “প্লাস্টিক বোতল আর প্লাস্টিক ব্যাগ দিয়ে সমুদ্রের মধ্যে পাহাড় তৈরি হচ্ছে। আজ থেকে পঁচিশ বছর পর এই গ্রহের সমস্ত মানুষ বাস করবে অগ্নিকুণ্ডের মধ্যে। অবশ্য যদি ততদিন অবধি আমরা টিঁকে থাকি!”
লোকটা আমার দিকে তাকাল। সাধুদা চা বানাতে বানাতে সহানুভূতির মাথা নাড়ল।
আমি একক সংলাপ চালিয়ে গেলাম।
“তার ওপর সারা পৃথিবীতে একটা অভিজাত-বিরোধী ডানপন্থী রাগ। বিদ্বেষ। ঘৃণা। সেই আক্রোশকে উশকে দিচ্ছে রাজনৈতিক অনৈতিক নেতারা। এই মুহূর্তে সারা বিশ্বে কটা যুদ্ধ চলছে জানেন? ছাপ্পান্নটা! তার মধ্যে সবচেয়ে বড় দুটো রোজ খবরের কাগজের প্রথম পাতায়। অবশ্য কাগজ কে আর পড়ে! সবাই দেখি মোবাইলে ভিডিও দেখছে। যে যা পারছে বলছে, বাকি সবাই হাঁ করে তা-ই গিলছে। সত্যি মিথ্যের বালাই নেই।”
সাধুদা চুপ।
লোকটা - “একদম ঠিক বলেছেন।”
আমি বললাম, “আর যে রাজ্যে বাস করি সেটা তো মুরগির খামার। কখনো পাহারা দিচ্ছে শকুনি আর ঈগল পাখি। তখন পাঁচিলের ওপারে শেয়াল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জিব চাটছে। আবার কখনো শেয়ালগুলো রাজত্ব করছে আর শকুনিরা গাছের ডালে বসে ঠোঁটে শান দিচ্ছে।”
আমার দুজন শ্রোতাই “হুঁ” জানাল।
“যেন এটাই যথেষ্ট ছিল না। তার ওপর আবার এ-আই! ছাত্ররা এখন মাষ্টারমশায়ের থেকে এ-আই-কে বেশি বিশ্বাস করে। এই এ-আই বস্তুটা যে ঠিক কী, তা কিন্তু কেউ জানে না! অন্ধের মত বিশ্বাস করে শুধু। এই যুগের নতুন ধর্ম – এ-আই।”
একটু থেমে হাফ টোস্টের অবশিষ্টটা মুখে পুরলাম।
লোকটা চায় চুমুক দিল। সাধুদা বলল, “খুবই হতাশ হয়ে পড়েছ দেখছি।”
বুদবুদ - “কালিদাস!”
বুদবুদের কথায় আমি একটু চমকে গেলাম। ডান হাতের আঙুলগুলো থেকে কয়েকটা চিনির দানা চেটে নিয়ে লেবু-চা’য় চুমুক দিলাম। আবার দূরে কোথাও বাজ পড়ার শব্দ হল।
সাধুদা বলল, “তোমায় একটা ভালো খবর দেব? কেজো খবর নয় কিন্তু।”
আমি - “হ্যাঁ, প্লীজ!”
সাধুদা - “পুরোনো খবর অবশ্য। প্রায় দু হাজার বছরের পুরোনো।”
আমি - “বলো।”
সাধুদা - “এই মুহূর্তে পৃথিবীতে জনা তিরিশেক লোক হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে যাদের ওপর নির্ভর করে আছে সমস্ত মানুষের মরণবাঁচন।”
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম।
সাধুদা - “শুধু এই মুহূর্তে নয়, সমস্ত মুহূর্তেই।”
আমি - “মানে?”
সাধুদা উত্তর না দিয়ে বলে গেল - “এই লোকগুলোকে আমি মহত্রিশ বলি। তারা কে কেউ জানে না। তারা নিজেরাও জানে না।”
আমি - “সত্যি?”
লোকটা - “খবরটা আমারও জানা।”
সাধুদা - “যদি তাদের মধ্যে কোনো একজন বুঝতে পারে যে সে নিজে ওই তিরিশ জনের মধ্যে একজন – যাদের ওপর সমগ্র মনুষ্যত্বের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে আছে – সে সেটা জাহির করা দূরে থাক, কবুলও করবে না।”
আমি - “তিরিশ জন…”
সাধুদা - “মহত্রিশরা সংখ্যায় যদি খুব কমে যায়, তাহলে সর্বনাশ। মানুষ সেদিন শেষ হয়ে যাবে।”
আমি - “সব কি বিখ্যাত লোক? ধর্মের গুরু?”
সাধুদা - “মহত্রিশরা কেউ বিখ্যাত নয়, কেউ কুখ্যাত নয়। কেউ নেতা নয়, কেউ পণ্ডিত নয়, কেউ বড়লোক নয়। কেউ নামজাদা বিজ্ঞানী নয়, কেউ ক্যারিস্ম্যাটিক ধর্মপ্রচারক নয়, কেউ সিনেমার উজ্জ্বল নক্ষত্র নয়, কেউ রাজনৈতিক ক্ষুধার্ত নায়ক নয়, কেউ চমকপ্রদ ইনফ্লুয়েন্সার নয়, কেউ চিরপিপাসিত কোটিপতি নয়।”
আমি - “আরিব্বাস!”
সাধুদা - “সাধারণ মানুষ সব। যতদিন বেঁচে থাকে, ততদিন কোনো না কোনো ভাবে পৃথিবীর মানুষের ভার বহন করে – অজান্তে, নিঃশব্দে, বিনা আড়ম্বরে। যখন মরার সময় হয়, মরে যায়। নতুন কোনো মহত্রিশ মানুষ জন্ম নেয় সেই ফাঁক বোজানোর জন্য।”
সাধুদা থামল।
আমি বললাম, “খবরটা খুবই ভালো। কিন্তু পুরোটা বুঝলাম না।”
সাধুদা - “কী বুঝলে না?”
আমি - “একজন মহত্রিশকে চিনতে পারব কী করে?”
সাধুদা - “পারবে না তো! চিনতে পারবে না। তুমি যে লোকটাকে অবজ্ঞা করো, যাকে গালাগাল দাও, লাথি মারো, যাকে অন্য ধর্ম বা অন্য ভাষা বলে ঘৃণা করো, যে পুরোনো নিয়ম ভেঙে তোমার শহরে অনাহূত ঢুকে পড়ছে – তারা যে কেউ মহত্রিশ হতে পারে। যত নিরপরাধ মানুষ যুদ্ধে মরছে, তাদের মধ্যেও হয়তো কিছু মহত্রিশ আছে।”
লোকটা হাসল।
আমি - “রবীন্দ্রনাথ কি মহত্রিশ? কিম্বা পরমহংস রামকৃষ্ণ?”
লোকটা - “না না। উনি বললেন না? বিখ্যাত হলে হবে না!”
আমি - “কিন্তু নিশ্চয়ই সৎ হতে হবে।”
সাধুদা - “হয়তো। সততাও অনেক রকম হয়…”
আমি - “মানে?”
লোকটা - “কোনটা সত্যি – সেটা তো সব সময় পরিষ্কার নয়! কখনো কখনো সেটা ভালোমন্দ বিচারের ওপর নির্ভর করে।”
আমি - “বিবেকের ওপর।”
সাধুদা - “ঠিক। আর বিবেক হল সেই বস্তু যাকে বার্ট্রাণ্ড রাসেল ‘ডেঞ্জারাস গাইড’ বলেছিলেন – বিপজ্জনক নির্দেশিকা। বিবেকের তাড়নায় মানুষ অনেক অন্যায় করতে পারে।”
আমি - “যাক। তাহলে গুড নিউজটা হল মহত্রিশরা আছে। আর ব্যাড নিউজটা হল তাদের সনাক্ত করার উপায় নেই।”
বুদবুদ - “অহংকার।”
সাধুদা দাঁত বার করে হাসল।
আমি বললাম, “কিন্তু এই মহত্রিশরা কী করে সব মানুষের ভার বহন…”
আমাকে থামিয়ে সাধুদা তাড়াতাড়ি বলে উঠল, “না না, ওই প্রশ্ন করা যাবে না! বলেছি না খবরটা কেজো নয়! একবারেই অকেজো খবর।”
আমি চুপ করে ভাবতে লাগলাম। জীবনে রোজ কত মানুষের সাথে দেখা হয় রাস্তায় ঘাটে বাসে ট্রেনে! কত মানুষ সারা জীবন ধরে এসেছে, গেছে, যাবে। কল্পনা করার চেষ্টা করলাম তাদের কেউ কেউ হয়তো মহত্রিশ। কোনো কথা না বলে আমাদের সবার ভার বহন করে যাচ্ছে।
লোকটা চা শেষ করে বলল, “আমি একটা কথা বলব? হয়তো অপ্রাসঙ্গিক। হয়তো নয়।”
সাধুদা বলল, “বলুন না। অপ্রাসঙ্গিক হলেও ক্ষতি নেই।”
লোকটা - “গতকাল আমি ’গানের ওপারে’ টিভি সিরিয়ালটা দেখছিলাম। আগে কখনো দেখিনি। প্রথম কয়েকটা এপিসোড দেখলাম। ওই যে – যে সিরিয়ালটা ঋতুপর্ণ ঘোষ বানিয়েছিল ১৫-১৬ বছর আগে।”
সাধুদা সম্মতির মাথা নাড়ল।
আমি বললাম, “আমি দেখিনি।”
লোকটা - “গল্পটা এক টিভি চ্যানেলের দুই অল্পবয়স্ক জার্নালিস্টকে নিয়ে শুরু। রবীন্দ্রনাথের জন্মের দেড়শ’ বছর উপলক্ষ্যে একটা প্রোগ্রাম করতে হবে। দেখা গেল কমবয়সীরা রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে কিছুই জানে না, জানতে চায়ও না। আর তাদের অন্য মেরুতে আছেন এক রবীন্দ্র-বিশারদ বৃদ্ধ, যিনি সত্তর বছর ধরে মৃত কবিকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছেন। আমি অবশ্য শুধু প্রথম কয়েকটা এপিসোড দেখেছি। সব মিলিয়ে বোধহয় আড়াইশ’টার বেশি এপিসোড আছে। সুন্দর কিছু রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনলাম।”
সাধুদা - “আমি সবটাই দেখেছিলাম। দারুণ লেগেছিল।”
লোকটা - “আমার মনে হল যেন একটা প্লাবনের মুখে পড়েছি। খড়কুটোর মত এবার আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।”
আমি - “সে কি?! কেন?”
লোকটা - “এই ভাবেই চিরকাল সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। সোনার তরী যখন ফসল নিয়ে চলে যায়… শেষের কবিতা শেষ হয়ে যাবার পর… তখনও আসে এই রকম বন্যা, দু’কূল ছাপিয়ে।”
সাধুদা - “আমি জানি আপনি কী বলতে চাইছেন।”
লোকটা - “রবি ঠাকুরের মৃত্যুর দিন যে জন্মেছিল, সে যদি এখনো বেঁচে থাকে, তবে তার বয়স পঁচাশি। তাকেও সময়ের প্রবল স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে নিরুদ্দেশ যাত্রায়।”
সাধুদা - “নিরুদ্দেশ যাত্রা। ভালো বলেছেন!”
সাধুদা আবৃত্তি করল –
তুমি হাসো শুধু মুখপানে চেয়ে কথা না বলে।
লোকটা - “রবীন্দ্রনাথ আমার আত্মার গুরু। তাঁর কাছে শিখেছি ভালোবাসা – তা সে ভাষার ভালোবাসা হোক কি গানের, মানুষের কি প্রকৃতির, রূপের কি অরূপের। শিখেছি সত্যকে ভালোবাসা, সুন্দরকে ভালোবাসা। ইতিহাসের খাতায় যদি রবীন্দ্রনাথের অস্তিত্ব না থাকত, তাহলে এই আমি অন্য কেউ হতাম, সম্পূর্ণ অন্য কেউ। তাঁর কাছেই জীবনের প্রকৃত হাতেখড়ি। তিনি এখনো দিয়ে যাচ্ছেন, আমি দু’হাত পেতে নিয়ে যাচ্ছি আর বদলে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত।”
আমি যত শুনছি, তত অবাক হয়ে যাচ্ছি। লোকটা বলে কী?!
লোকটা - “আজ কেউ তাঁকে পড়ে না। তাঁর সম্বন্ধে কিছু জানে না। সময় এগিয়ে চলেছে, অপ্রতিরোধ্য। যা কিছু তিনি সৃষ্টি করে গেছেন, সব আস্তে আস্তে ভেসে যাচ্ছে, ধুয়ে মুছে একাকার হয়ে যাচ্ছে। জানি, সব তারাই আছে দিনের আলোর গভীরে। কিন্তু…”
লোকটা কয়েক সেকেণ্ড থেমেছে। সাধুদা একটা লাইন আবৃত্তি করল -
খটকা লাগল, কি জানি বানিয়ে বললেম নাকি?
লোকটা - “না, এটা বানিয়ে বলা কথা নয়। কিন্তু আমি মাটির নিচে লুকোনো শিকড়ের কথা বলছি না। আমি বলছি সেই সব গাছ ডালপালা পাতা ফুলের কথা যা অনর্গল ভেসে যাচ্ছে বন্যার জলে, মিশে যাচ্ছে অন্ধকার অতলে।”
বুদবুদ - “খড়কুটো।”
একটা হলুদ সালওয়ার কামিজ পরা রোগা মেয়ে চায়ের দোকানে ঢুকল। দেখে মনে হল আমার মেয়ের বয়সী হবে। মানে পনেরো-ষোলো বছর। লম্বা সুন্দর চুল একটা রাবার ব্যান্ড দিয়ে অযত্নে বাঁধা। ওর ডানহাতের তর্জনী আর মধ্যমার মাঝে একটা না-জ্বলা সিগারেট। চোখে সরু চশমা।
কাছাকাছিই কোথাও জোরে একটা বাজ পড়ল। একটু চমকে গেলাম।
মেয়েটি - “এক কাপ চা হবে?”
সাধুদা - “লাল চা? না লেবু চা?”
মেয়েটি - “দুধ চা হবে না? চিনি দিয়ে?”
সাধুদা - “হ্যাঁ, হবে। বোসো।”
মেয়েটি - “একটু আগুন হবে?”
সাধুদা কিছু বলার আগেই, আমি বললাম, “এই নাও।” পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার বার ক’রে, মেয়েটাকে লাইটার দিলাম। তারপর নিজের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বার করলাম। মেয়েটা তার সরু লম্বা সিগারেট ধরিয়ে আমাকে লাইটার ফেরত দিল। আমি আমার বেঁটে সিগারেট ধরালাম।”
একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললাম, “আঃ!”
লোকটা - “আর একটা লেবু-চা দিন।”
আমি - “আমাকেও আরেকটা দেবেন প্লীজ।”
সাধুদা চা বানাতে লেগে গেল।
লোকটা - “রবীন্দ্রনাথের সমস্ত সৃষ্টির দাম কি? চারপাশের এই জাগতিক বাস্তবের পরিপ্রেক্ষিতে কি সেই প্রশ্নের উত্তর সম্ভব? আর যাদের সৃষ্টি তাঁর থেকে অনেক কম? বা যাদের আদৌ কোনো সৃষ্টি আছে কিনা ঠাহর করা যায় না?”
মেয়েটি একটা লাইন আবৃত্তি করল -
সন্তানের জন্ম দিতে দিতে যাহাদের কেটে গেছে অনেক সময়?
লোকটা - “ঠিক! তাদের কি কোনো অবদানই এক মিনিটের বেশি টেঁকে না?”
এক মুহূর্ত থেমে লোকটা বলল, “আচ্ছা থাক। সাধারণ মানুষের কথা থাক। অসাধারণ নিয়েই কথা হোক।”
মেয়েটি - “আপনি কি রবি ঠাকুরের মৃত্যুর কথা বলছেন? মানে শারীরিক মৃত্যু নয়। এই যে কেউ তাঁকে আর পড়ে না?”
লোকটা - “হ্যাঁ।”
মেয়েটি - “শুধুই ভাষা-ভিত্তিক কোনো আর্টের বোধহয় নিজস্ব প্রাণ থাকে না। তার প্রাণস্থাপন হয় পাঠকের হৃৎপিণ্ডে। যদি পাঠক না থাকে, তবে সে মরে যায়। যে আর্ট শুধু ভাষা-ভিত্তিক নয় – যেমন সংগীত বা ছবি আঁকা – তার মেয়াদ অপেক্ষাকৃত বেশি, কারণ সেটা ক্রমাগত-বদলে-যাওয়া ভাষার অনুশাসনের বাইরে। আরেকটা কারণ হল এই, যে সেই ধরণের আর্ট মানুষের ইমোশনে আঘাত করতে পারে সোজাসুজি, কান আর চোখের মাধ্যমে, মস্তিষ্কের ভাষা-দপ্তর কে পাশ কাটিয়ে।”
লোকটা - “বাঃ! দারুণ বলেছ। তাই জন্য এখনো রবীন্দ্রসঙ্গীত খানিকটা টিঁকে আছে। ওই সিরিয়ালটাতেও একটা চরিত্র সেই কথা বলছিল।”
তারপর মেয়েটার দিকে তাকিয়ে লোকটা বলল, “আমরা ঋতুপর্ণ ঘোষের বানানো ’গানের ওপারে’ নামে টিভি সিরিয়ালটা নিয়ে কথা বলছিলাম।”
মেয়েটি - “নাম শুনেছি। দেখিনি। ওটা বোধহয় আমার জন্মের আগের। বাই দ্য ওয়ে, শেক্সপিয়ার কিন্তু ভাষা-ভিত্তিক হয়েও টিঁকে আছে। বোধহয় নাটক বলে। মানুষ তো আর শেক্সপিয়ার পড়ে না। দেখে। শোনে। মানুষের অনাদি ইমোশনের অনন্ত কাহিনী।”
লোকটা - “রবি ঠাকুরের অপসারণ আমাকে বিহ্বল করে। আমার ছেলেকে করে না। সমস্যাটা স্পষ্টতই আমার।”
সাধুদা আমাদের তিনজনকে চা দিল। আমরা চুমুক দিলাম। বাইরে আবার কোথাও বাজ পড়ল। এক দমক হাওয়া দিল হঠাৎ।
লোকটা - “সমস্যাটা আমার অহংকার। একদিকে এই অহংকারটার খুবই প্রয়োজন। এটা না থাকলে ঘাস খেয়ে আর বাছুর প্রসব করেই জীবন কাটত। আর কোনো কাজ করা হয়ে উঠত না। কোনো যৎসামান্য কাজও না।”
আমরা সবাই হাসলাম।
লোকটা - “অন্য দিকে এই অহংকারটা প্রতারক। এটা একটা নীচ পদার্থ যার ছোটো মুখে বড়ো কথা। মুখোশ প’রে ভয় দেখায়। এমন একটা ভাব করে যে সে নিজেই রাজা। খুব শিগ্গিরি একদিন মৃত্যু এসে মুখোশখানা টান মেরে ফেলে দেবে।”
আবৃত্তির মত করে মেয়েটি বলল -
মৃত্যু অত্যুক্তি করে না।
লোকটা - “এটাও ওই রবীন্দ্রনাথের কাছেই শিখেছি। আহা! যদি ওনার মত দুটো উপমা পেতাম তাহলে বলতে সুবিধে হত।”
মেয়েটি - “অহংকার বলতে আপনি আপনার ইগো-কনশাসনেসের কথা বলছেন তো?”
লোকটা - “হ্যাঁ, আমার ‘আমি’।”
মেয়েটি - “রবি ঠাকুরের উপমাগুলো মাঝে মাঝে সত্যিই মারাত্মক হয়। কখনো কখনো… কেউ যদি জিগ্যেস করে একজ্যাক্টলি কিসের কথা বলছেন, কখনো কখনো বলতে পারব না। কিন্তু তাও কিছু একটা অর্থ, কোনো একটা মানে যে মাথার মধ্যে ঢোকে তাতে কোনো সন্দেহ থাকে না।”
লোকটা মাথা নাড়ল।
বুদবুদ - “ঠাকুরদা।”
মেয়েটি - “যেমন ’স্ফুলিঙ্গ’তে একটা চারপেয়ে কবিতা আছে…”
মেয়েটি আবৃত্তি করল –
বাঁশি বলে, মোর কিছু নাহিকো গৌরব,
কেবল ফুঁয়ের জোরে মোর কলরব।
ফুঁ কহিল, আমি ফাঁকি, শুধু হাওয়াখানি–
যে জন বাজায় তারে কেহ নাহি জানি।
মেয়েটি - “অবশ্য এটাতে উপমাগুলো তৎক্ষণাৎ হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে না। এর সাথে হয়তো আপনার ওই ’আমি’র কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে।”
লোকটা - “বাপ্ রে বাপ্! ফুঁ’ও কথা বলে? ওনার পক্ষেই সম্ভব।”
সাধুদা - “আপনার ‘আমি’ যদি কথা বলতে পারে, ফুঁ পারবে না কেন?”
লোকটা - “একজ্যাক্টলি!”
মেয়েটি - “আপনি উপমা খুঁজছেন?”
ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরে একটা নিঃশব্দ বিদ্যুৎ খেলে গেল। আমার মনে হল মেয়েটার কথাগুলো সেই হঠাৎ-আলোর ছন্দে মিলে গেল। যেন বিদ্যুৎটা কথাগুলোর ওপর আলো ফেলল।
মেয়েটি - “উপমা তো আপনি হাতে ধরে আছেন!”
লোকটা অবাক হয়ে নিজের হাতের দিকে তাকাল।
লোকটা - “মানে…?”
সাধুদা - “প্লাস্টিক নয়। কাগজের কাপ নয়। আপনার হাতে আছে মাটির ভাঁড়।”
লোকটা - “ভাঁড়টা কি আমি? নাকি চা-টা?”
মেয়েটি - “সে আপনি বুঝবেন। উপমা আমি দিয়ে দিয়েছি, ঠাকুর আমায় ক্ষমা করবেন।”
আমি হেসে ফেললাম।
সাধুদা - “মাটির ভাঁড়ে চা নিয়ে একটা ছড়া বলতে পারি। বলব?”
লোকটা খুব উৎসুক হয়ে বলল, “হ্যাঁ, বলুন না!”
মেয়েটা ডান হাত তুলে সাধুদাকে একটা ইঙ্গিত করল। যেন একটু অপেক্ষা করতে বলল। ঠিক তক্ষুনি বাইরে, খুব কাছাকাছি, অনেকক্ষণ ধরে বাজ পড়ল। একটা পর একটা। ক-র্-র্-র্ ক-রা-আ-ৎ! সাথে বিদ্যুৎ চমকালো। হাওয়া দিল জোরে।
মেয়েটা ওর ডান হাত নামাল।
সাধুদা - “আহা, এই ছড়াটার পক্ষে দারুণ পরিবেশ।”
আমি - “এক্ষুনি বৃষ্টি নাববে রে!”
সাধুদা আবৃত্তি করল -
মাটির ভাঁড়ে ঝড় উঠেছে, চল্কে পড়ে চা
সর্বনাশের পর্ব এবার, ভেলকি দেখে যা
মুখখু চায়ের দুঃখ বড়, বলতে পারে না
চায়ের ভীতির টানতে ইতি, জলদি করে খা
ফুরিয়ে গেলে জুড়িয়ে যাবে তপ্ত চায়ের গা
চা ফুরাতে মাটির সাথে মিটবে মাটির ছা
কবিতাটা শেষ হবার আগেই ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল।
আমি - “এটা কার লেখা, সাধুদা?”
সাধুদা - “দু’বছর আগে এমনি এক বৃষ্টির সন্ধ্যায় এই দোকানে এসেছিলেন এক বুড়ো ভদ্রলোক। নাম জানি না। লম্বা সাদা দাড়ি-গোঁফ। উস্কোখুস্কো বড় বড় চুল। সাদা রঙের ঢোলা পাজামা-পাঞ্জাবি পরা। বিশেষ কথা বলেননি, তবে চা খেতে খেতে সুন্দর গান গেয়েছিলেন। আর এই ছড়াটা শুনিয়েছিলেন। আমার সন্দেহ উনি সেদিন এখানে বসে বসেই লাইনগুলো মনে মনে রচনা করেছিলেন।”
মেয়েটি - “আমিও ওনার সাথে ছিলাম। উনি আমার ঠাকুরদা।”
সাধুদা - “আমার মনে আছে তুমি ছিলে। সেদিনও আজকের মতনই একটা আলোচনা চলছিল। যাকে বলা যেতে পারে — ঝড়ের মুখে খড়কুটোদের গান।”
আমি - “এক্সিস্টেনশিয়াল অ্যাংস্ট্!”
সাধুদা - “বাংলায় বললে - অস্তিত্বের উদ্বেগ।”
বুদবুদ - “মাটির ছা।”
লোকটা - “যে রকম বৃষ্টি নামল, এখন তো আর বাড়ি যাওয়া যাবে না। সাধুদা, আরেক কাপ লেবু চা হয়ে যাক্!”
আমি - “আমাকেও দেবেন।”
মেয়েটি - “আমার জন্য একটা দুধ চা।”
সাধুদা আবার চায়ের বন্দোবস্ত করতে লাগল।
বাইরে অন্ধকারে ঝরঝর বৃষ্টি ঝরছে। সেই দিকে তাকিয়ে মেয়েটা বলল, “আপনি কি এই বিষয়ে একমত?”
আমরা কিছু বুঝতে না পেরে একে অন্যের মুখ চাওয়াচায়ি করলাম। মেয়েটা লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল, “সরি। বুঝিয়ে বলছি।”
মেয়েটি - “রবীন্দ্রনাথ যে পৃথিবী থেকে আস্তে আস্তে মুছে যাচ্ছেন, তার জন্য যে কষ্ট, আপনি কি মনে করেন সেই কষ্টের সাথে আপনার অস্তিত্বমূলক উদ্বেগের যোগাযোগ আছে?”
লোকটা - “জানি না। ওই এক্সিস্টেনশিয়াল অ্যাংস্ট্ ব্যাপারটাই আমার কাছে স্পষ্ট নয়।”
সাধুদা - “আমি তো কলকাতার ফুটপাথে চায়ের দোকান চালাই। কাজেই ছোট মুখে বড় কথা বলার হক আমার আছে।”
আমি - “আলবাত আছে!”
সাধুদা - “অস্তিত্বের উদ্বেগ কথাটা প্রথম ব্যবহার করেন আমাদের কিউকগো (Kierkegaard) – ডেনিশ দার্শনিক। পরে ফরাসীরা সে বিষয়ে আরো বিস্তারিত ভাবে ভাবেন, যেমন সার্ত্র (Sartre)। অবধারিত মৃত্যুর পটভূমিতে মানুষের নিজস্ব দায়িত্ব ও স্বাধীনতার উদ্বেগ। জীবনের অর্থ বা তাৎপর্য খুঁজে বেড়ানোর অদম্য ইচ্ছে।”
আমরা সবাই চুপ করে শুনছি।
সাধুদা - “পরে আমার প্রিয় কামু (Camus) সিসিফাসের উপকথা অবলম্বন করে তৈরী করলেন আবসার্ড হিরো’র আইডিয়া। সিসিফাসের অভিশাপ ছিল এই – অনন্তকাল ধরে সে একটা বিশাল পাথর ঠেলে ঠেলে পাহাড়ে তুলবে। আর প্রত্যেকবার সেই পাথরটা আবার গড়িয়ে নিচে নেমে যাবে। নেহাতই বিশৃঙ্খল একটা উদাসী পৃথিবীতে এই উদ্ভট বা অ্যাবসার্ড নায়কচরিত্র খুঁজে বেড়াচ্ছে অর্থ, উদ্দেশ্য আর শৃঙ্খলা। এবং সেই খোঁজার অনিবার্য পরিণতি হল ব্যর্থতা।”
আমি - “অনেকগুলো কঠিন কঠিন শব্দ বললেন।”
সাধুদা একগাল হেসে, চোখ মেরে বলল, “কেমন দিলাম?”
মেয়েটি - “দিলেন তো ভালোই, তবে কামুর আগেই অন্য এক আধুনিক সাহিত্যে আবসার্ড হিরো এসেছিল।”
লোকটা - “কোথায়?”
মেয়েটি - “এই পোড়া বঙ্গদেশে। যদি নবনীতা দেবসেনের কথা বিশ্বাস করি, তবে আজ থেকে প্রায় একশ’ বছর আগে মানিক বন্দোপাধ্যায়ের লেখা ’পুতুল নাচের ইতিকথা’ উপন্যাসে শশী ডাক্তার হল পৃথিবীর প্রথম উদ্ভট নায়ক। আর নবনীতা দেবসেনকে বিশ্বাস না করার কোনো কারণ নেই।”
লোকটা - “বাপ রে, বাপ।”
সাধুদা - “কিন্তু আমার ছোট মুখে বড় কথা এখনো শেষ হয়নি। কিউকগো আর সার্ত্র-এর মাঝখানে আছে ইতিহাসের একটা বেড়া। বেড়ার ওপারে ছিল ঈশ্বর আর মিথলজির আদিম জঙ্গল। এপারে আছে ব্যক্তিবাদ আর ব্যক্তি-স্বাধীনতার নিঃসঙ্গ মরুভূমি। কিউকগোর পরবর্তী সব তাবড় তাবড় আধুনিক পুরুষেরা একটা মস্ত ভুল করে বসেছেন। বস্তুবাদী বিজ্ঞানের ওপর সব ভার চাপিয়ে, ওঁরা আধ্যাত্মিকতাকে বেমালুম ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছেন। ভগবানকে মৃত ঘোষণা করেছেন। ওঁদের মধ্যে কোমলতার ঘাটতি ঘটেছে, ভালোবাসার অভাব পড়েছে। আমার নিজের কামুকে খুবই ভালো লাগে। কামু লিখেছেন – এমন কোনো নিয়তি নেই, যা অবজ্ঞা দিয়ে অতিক্রম করা যায় না। কিন্তু আমার তার থেকে আরো বেশি ভালো লাগে রবি ঠাকুরের ভঙ্গিটা – কাঁদালে তুমি মোরে ভালোবাসারই ঘায়ে। নিবিড় বেদনাতে পুলক লাগে গায়ে।
লোকটা - “বাঃ! ভারী সুন্দর বললেন। অন্য ধরণের জেদ আমাদের রবীন্দ্রনাথের। চলিতে পথে পথে বাজুক ব্যথা পায়ে।
সাধুদা সবাইকে চা দিল। আমরা সবাই চুমুক দিলাম।
সাধুদা - “আমি মনে করি যথার্থ ভাবে বাঁচতে হলে মানুষের জীবনে একট বিশ্বাসের ঝুঁকি নেবার প্রয়োজন আছে। একটা এমন কোনো বিশ্বাস যেটা সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়। ভগবানের ধারণা যদি নিতান্তই অরুচিকর হয়, তাহলে ভগবানকে বাদ দিয়ে অন্য কিছুও চলবে। যেমন মানুষের ওপর বিশ্বাস। বা মানুষের যে ভালো হবার সম্ভাবনা আছে, মানুষ যে ভালোবাসতে পারে, তার ওপর বিশ্বাস। বিশ্বাসের বিষয়ের আর একটা উদাহরণ হল মহত্রিশ।”
মেয়েটি - “সেটা আবার কী?”
সাধুদা - “ও সরি। তুমি বোধহয় তখনো আসোনি। আমরা মহত্রিশ নিয়ে কথা বলছিলাম। মানে ওই জনা তিরিশেক লোক যারা পৃথিবীময় সমস্ত মানুষের ভার বহন করছে।”
মেয়েটি - “ওঃ। খবরটা আমি শুনেছি আগে। আশার খবর। নরম খবর।”
সাধুদা - “কামু’র পছন্দমত নয়।”
সাধুদা হাসল। মেয়েটি চা’য় একটা চুমুক দিয়ে লোকটাকে জিগ্যেস করল, “এইবার বলুন তাহলে। রবীন্দ্রনাথ যে পৃথিবী থেকে আস্তে আস্তে মুছে যাচ্ছেন, তার জন্য যে কষ্ট, আপনি কি মনে করেন সেই কষ্টের সাথে আপনার অস্তিত্বমূলক উৎকন্ঠার যোগাযোগ আছে?”
লোকটা - “থাকতে পারে। শিয়োর নই।”
মেয়েটি - “আমার মনে হয় - আছে। বলব কি ভাবে?”
লোকটা - “হ্যাঁ, বলো।”
মেয়েটি - “এক্সিস্টেনশিয়াল অ্যাংস্ট্-এর যে আইডিয়া, যে কনসেপ্চুয়ালাইজেশন, তার পেছনে তিনটে অ্যাক্সিয়োম বা অ্যাসাম্পশান আছে বলে আমি মনে করি। তিনটে আপাতদৃষ্টিতে স্বতঃসিদ্ধ কিন্তু প্রমাণহীন ধারণা।”
আমরা তিনজন শুনছি।
বুদবুদ - “উপমা।”
মেয়েটি - “এক নম্বর অ্যাক্সিয়োম। হিউমান কণ্ডিশন বা মানবিক অবস্থা বোঝার জন্য বস্তুবাদী বিজ্ঞানের যুক্তিই যথেষ্ট। এই যুক্তির বাইরে যদি কিছু থাকে তবে সেটা অপ্রাসঙ্গিক। অর্থাৎ এই যুক্তির কাঠামোটা কমপ্লীট।”
লোকটা - “ও।”
মেয়েটি - “আরেকটু খোলসা করে বলি। কামু’র যে অ্যাবসার্ড হিরো বা উদ্ভট নায়ক, সে বিশ্বাস করে যে পৃথিবীর কোনো মানে নেই, অস্তিত্বের কোনো অর্থ নেই। এই দৃষ্টিভঙ্গীটা যেমন মানুষের সাধারণ পরিস্থিতির সঙ্কেত দেয়, তেমনই ইঙ্গিত দেয় যে দেখছে তার চাহনির পদ্ধতির দিকে। সবুজ চশমা পরে থাকলে লাল গোলাপকে হলুদ দেখায়। আমার মতে ফরাসী দার্শনিকরা সবাই বিজ্ঞানের জোরালো চশমা পরে ছিলেন।”
সাধুদা - “আমাদের এই পৃথিবী-গ্রহটাও বায়ুমণ্ডলের চশমা পরে আছে। মহাশূন্য থেকে দেখলে সূর্যের রং সাদা। কিন্তু পৃথিবীর অ্যাটমস্ফিয়ারে ঢুকে সুর্যের আলোর নীল অংশটা চারপাশে ছড়িয়ে যায় বলে সূর্যটা দেখায় হলুদ আর আকাশটা হয়ে যায় নীল।”
মেয়েটি - “দু’ নম্বর অ্যাক্সিয়োম। ফরাসী দার্শনিকদের কথায় নিহিত যে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি, সেই যুক্তির কাঠামোটা মানুষের সব অভিজ্ঞতার সঙ্গে কনসিস্টেন্ট – মানে যুক্তিবাদী বিজ্ঞানের সাথে মানুষের অভিজ্ঞতার সম্পূর্ণ সংগতি আছে।”
লোকটা আর আমি মাথা নাড়লাম। সাধুদা অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে মন দিয়ে শুনছে।
মেয়েটি - “এই কথাটা যে ঠিক নয়, তার অনেক উদাহরণ আছে আধুনিক পদার্থবিদ্যায়। আমরা যে স্তরে দুনিয়াটাকে অনুভব করি, তার সাথে বিজ্ঞানের অনেক সত্যের সমীকরণ হয় না। যেমন আলোর কিরণ নাকি তরঙ্গ, অথচ একই সঙ্গে আলোর মধ্যে নাকি শুধুই কিছু বস্তুর কণা আছে, যাকে ফোটন্ বলে। এটা বৈজ্ঞানিক সত্য। কিন্তু আমি যদি বলি অর্জুন এই মুহূর্তে বিছানায় শুয়ে ঘুমোচ্ছে, আবার ঠিক এই মুহূর্তেই অর্জুন লেকের ধারে ছুটছে, আপনি আমায় পাগল ভাববেন। কিম্বা আরেকটা উদাহরণ ধরুন – মাধ্যাকর্ষণের শক্তি নাকি স্পেসকে কার্ভ্ড্ করে দেয়, বেঁকে চুরে দেয়। মানে, স্থান মহাকাশ শূন্যতা – তার মধ্যে নাকি নিহিত আছে একটা বক্রতা – বুঝুন কাণ্ড!”
লোকটা - “অবাক ব্যাপার।”
মেয়েটি - “তিন নম্বর। মানুষের এই ’আমি’র বস্তুত একটা তাৎপর্যপূর্ণ প্রাথমিক অস্তিত্ব আছে। আমাদের ’আমি’টা আছে, এবং এক অর্থে সেটাই যেন চরম শেষ কথা।”
মেয়েটা থেমে চা শেষ করল। আমিও চায়ে আরেকটা চুমুক দিলাম। বাইরে তুমুল বৃষ্টি।
মেয়েটি - “ওই তিনটে কথাতেই এক ধরণের রক্ষণশীলতার লক্ষণ আছে। আমার তিনটে অ্যাসাম্পশন নিয়েই যথেষ্ট সন্দেহ আছে।”
লোকটা - “খানিকটা বুঝলাম। ভাবতে হবে। তোমার বিশ্লেষণ বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে। কিন্তু এর থেকে এগোবো কোথায়?”
মেয়েটি - “সেটা তো আপনার ওপর! আমি শুধু বলতে পারি যে আর কিছু না হোক, ওই তিন নম্বর অ্যাক্সিয়োমটা একটু খতিয়ে দেখুন।”
লোকটা - “মানে আমার ‘আমি’টার প্রাথমিক অস্তিত্ব আছে কিনা?”
সাধুদা - “আপনি উপমা খুঁজছিলেন। একটা বোকা বোকা উপমা দিতে পারি। ওই যে বাইরে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো পড়ছে, কল্পনা করতে দোষ নেই যে ওই এক একটা ফোঁটা আকাশের মেঘ থেকে বেরিয়ে, অনেকটা পথ পেরিয়ে, পড়তে পড়তে পড়তে, শেষে ওই মাটির ওপর পড়ছে। পড়ার পর ফোঁটাগুলোর আর কোনো অস্তিত্ব নেই। জলটা অবশ্য থেকে যাচ্ছে। আপনি কি ওই ফোঁটাগুলোর সংক্ষিপ্ত জীবন নিয়ে শোকপালন করবেন?”
বাইরে বৃষ্টিটা ধরে এল।
মেয়েটি - “ঝড়ের মুখে খড়কুটোর মত রবি ঠাকুর ভেসে যাচ্ছেন। আপনি, আমি, আমরা সবাই ভেসে যাচ্ছি। ভেসে যাচ্ছে আমাদের সমস্ত ’আমি’।”
লোকটা - “বুঝলাম। কিন্তু আমি তো ’আমি’টাকে মনে মনে বানাইনি। ’আমি’টা তো সত্যি সত্যি রয়েছে। নেই – তা তো নয়।”
মেয়েটি - “আমি তো বলিনি – নেই!”
আমি - “তুমি বোঝাতে চাইছো যে ওই ’আমি’র পয়েন্ট অফ ভিউটাই একমাত্র পয়েন্ট অফ ভিউ নয়।”
মেয়েটি - “একজ্যাক্টলি।”
আমি - “অনেক দিন আগে নাকি কেউ আইনস্টাইন বা কোনো বিখ্যাত বিজ্ঞানীর কাছে রেডিও কি করে কাজ করে জানতে চেয়েছিল। উত্তরটা ছিল এইরকম – মনে করুন একটা লম্বা বেড়াল আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর শুয়ে আছে। তার মাথাটা লণ্ডনে, আর লেজটা নিউ ইয়র্কে। যদি কেউ নিউ ইয়র্কে লেজ ধরে টানে, তাহলে লণ্ডনে বেড়ালটার মুখ থেকে মিঁউ মিঁউ শব্দ বেরোয়। এইভাবে মহাসাগরের এক দিক থেকে অন্য দিকে খবর পাঠানো যায়। রেডিও ব্যাপারটা প্রায় ওই বেড়ালটার মাধ্যমে খবর পাঠানোর মত। পার্থক্য শুধু এই যে আসলে কোনো বেড়াল নেই! ”
সবাই হেসে উঠল।
আমি - “হয়তো আপনার ’আমি’টা ওই কাল্পনিক বেড়ালের মত।”
লোকটা - “মিঁউ।”
সবাই হেসে উঠল।
আমি - “কেউ লেজ ধরে টানছে। তখন মুখ দিয়ে মিঁউ মিঁউ আওয়াজ বেরোচ্ছে। ওই লেজ আর মিঁউ মিঁউ-এর ভিত্তিতে আপনি ভাবছেন তাহলে বোধহয় বেড়ালটা আছে। আছে নিশ্চয়ই!”
সাধুদা - “আরো কয়েকটা বাজে উপমা দিতে পারি। কখনো সন্ধেবেলা বাড়ি-ফেরতা পাখির ঝাঁককে উড়তে দেখেছেন? লেকের ধারে বা চিড়িয়াখানার ওপর বা ময়দানে দেখা যায় মাঝে মাঝে। আরো ভালো দেখা যায় শহরের বাইরে গেলে। হয়তো পঁচিশটা বা একশ’টা পাখি এক সাথে উড়ছে। কিন্তু পুরো ঝাঁকটা যেন একটা একক প্রাণের মত – কখনো বাঁয়, কখনো ডাইনে ঘুরছে। কখনো জোরে, কখনো আস্তে। সব সময়ে ঐক্য বজায় রেখে। দেখে মনে হয় না ওদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা অস্তিত্ব আছে, আলাদা আলাদা সিদ্ধান্ত আছে। ওরা সবাই মিলে যেন একটা প্রাণ।”
লোকটা - “আমার ’আমি’টা কি ওই একটা পাখির মত?”
সাধুদা - “এক একটা বট গাছ কত বছর ধরে বেঁচে থাকে! শিকড় থেকে রস উঠে উঠে কাণ্ডটা প্রকাণ্ড হয়ে ওঠে। চারপাশে ঝুরি নামে। ঝুরি নেমে মাটিতে ঢুকে শিকড় হয়ে যায়। হয়তো দু’শ বছর পরে আর বোঝাই যায় না কোথায় প্রথম কাণ্ডটা ছিল। দশ বছর বয়সের বটগাছটার ’আমি’ ফুলে ফেঁপে একটা ’আমি’র জঙ্গল হয়ে ওঠে।”
লোকটা - “হুঁ।”
সাধুদা - “পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ছত্রাকটা – মানে ফাঙ্গাস্ – আয়তনে ২৪০০ একর, বয়সে কয়েক হাজার বছর। হয়তো শুরু হয়েছিল একটা পুঁচকে ব্যাঙের ছাতা হিসাবে। ওর ’আমি’ কোনটা? একটা না অনেক?”
খানিকক্ষণ কেউ কিছু বলল না।
সাধুদা - “কোন সত্তাটাকে ’আমি’ বলবেন? যে বোধটা আপনার শরীরের বিভিন্ন ইন্দ্রিয় থেকে উৎপন্ন? আপনার মস্তিষ্কে বিদ্যুৎ প্রবাহ হচ্ছে, চিন্তা অনুভূতি ইমোশান উঠছে, ঘুরপাক খাচ্ছে, মিলিয়ে যাচ্ছে। সেই সমস্ত কর্মের যে কর্তা তাকেই তো আপনি ’আমি’ বলেন! সে কোথায়? আয়নার দিকে তাকালে কি তাকে দেখতে পান? নাকি সেখানে শুধুই আপনার শরীরের প্রতিবিম্ব?”
মেয়েটি আবৃত্তি করল -
ক্ষুদ্র-আপন-মাঝে
পরম আপন রাজে,
খুলুক দুয়ার তারই।
দেখি আমার ঘরে
চিরদিনের তরে
যে মোর আপনারই।
সাধুদা - “নিজেকে আগুন ভেবে খামোখা কষ্ট পাচ্ছেন। আমরা কেউ আগুন নই। আমরা সবাই স্ফুলিঙ্গ। আমরা প্রত্যেকে এক একজন এক একটা আগুন-হবার-ইচ্ছে। রবি ঠাকুর স্ফুলিঙ্গ ছিলেন। আপনি আমিও স্ফুলিঙ্গ।”
মেয়েটি - “সাধুদা কল্পনার কথা বলছিলেন। আমার মতে ওটাই আমাদের শেষ নির্ভর। আমাদের চরম ক্ষমতা, চূড়ান্ত আশ্রয়। বুদ্ধি, অনুভূতি, বোধ – সে-সব অন্য অনেক পশু-পাখিরও আছে। কিন্তু আমাদের মত কল্পনাশক্তি আর কারো আছে কিনা আমার জানা নেই।”
বুদবুদ - “খটকা।”
বৃষ্টি থেমে গেছে।
মেয়েটি - “ডেপ্থ্ সাইকলজি – যাকে বলতে পারি গহীনতা মনস্তত্ব – আজকাল আর বুদ্ধিজীবী বাজারে চলে না। সে নাহয় নাই চলুক। সেই মনস্তত্বের ভঙ্গিতে বলতে পারি যে কল্পনাকে অসত্য বলে উড়িয়ে দেবেন না। অনেক কল্পনাই সত্যের চেয়েও বড় সত্য।”
সাধুদা আবৃ্ত্তি করল –
বাস্তবকে যত একান্ত করে দেখি ততই সে আমাদের পেয়ে বসে,
আভাসমাত্রে সত্যকে যখন দেখি তখনই মুক্তির হাওয়া গায়ে লাগে।
সবাই খানিকক্ষণ চুপ করে বসে থাকলাম। শুধু বুদবুদ একবার আস্তে করে “বুদবুদ” বলল।
তারপর এক সময় লোকটা উঠে পড়ল।
লোকটা - “আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ। এখন বেশ হালকা লাগছে।”
লোকটা সাধুদার কাছে দাঁড়িয়ে হিসেব মিটিয়ে চলে গেল।
তারপর মেয়েটাও উঠে পড়ল। আমার দিকে তাকিয়ে ’বাই’ বলল। তারপর সাধুদাকেও একটা ’বাই’ জানিয়ে, বুদবুদকে বলল, “গুডবাই, বুদবুদ!”
দোকানের বাইরের অন্ধকারে পা বাড়াল মেয়েটা।
আমার হাতে শেষ ভাঁড়টা তখনো ধরা ছিল। উঠে সাধুদাকে জিগ্যেস করলাম, “কত দিতে হবে?”
সাধুদা - “ভদ্রলোক যাবার সময় সবার হিসেব মিটিয়ে দিয়ে গেছেন।”
অবাক হলাম। কিম্বা হয়তো হলাম না।
আমি - “আজ চলি।”
দোকান থেকে বেরিয়ে ফুটপাতের একপাশে হাতের ভাঁড়টা ফেলে দিলাম। সেটা ভেঙে টুকরো হয়ে গেল।