




যুক্তিবাদীদের একটা মহা সমস্যা হলো প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী তাঁরা যেন সমস্ত কিছুরই “ব্যাখ্যা” দিতে এক রকমের বাধ্য।
কথাটা কিন্তু ঠিক নয়। যুক্তিবাদীরা শুধুমাত্র এটুকুই মেনে চলেন যে, কোনো ঘটনার ব্যাখ্যা করার পথটা হওয়া উচিত যুক্তির পথ। কিন্তু তা বলে ইতিহাসের যেকোনো সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে নির্দিষ্ট কিছু পরিমাণ পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে যেকোনো ঘটনার ব্যাখ্যা যে পাওয়া যাবেই — এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। ১
তবু প্রায়শই আমায় (বা অন্য যেকোনো যুক্তিবাদীকেই) একটা অদ্ভুত কোনো ঘটনার উদাহরণ দিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া হয়, ”এই ঘটনাটার ব্যাখ্যা করবে কী করে?” প্রশ্নটার অন্তর্নিহিত দাবিটি স্পষ্ট। আমি যদি তক্ষুনি প্রশ্নকর্তাকে একটা সন্তোষজনক উত্তর দিতে অপারগ হই, তাহলে যেন গোটা বিজ্ঞানের কাঠামোটাই ভেঙে পড়বে।
কিন্তু অদ্ভুত ঘটনা কি আর আমার সঙ্গেই ঘটে না? এই যেমন ১৯৬৭ সালের এপ্রিল মাসে একদিন হঠাৎ আমার গাড়িটা বিগড়ে গেল। কী আর করা! অগত্যা গ্যারেজে ফোন করে লোক ডেকে সেই গাড়িটা টেনে নিয়ে যেতে হলো। সতেরো বছর ধরে নানারকম গাড়ি চালিয়েছি — এই প্রথমবার গ্যারেজ থেকে লোক ডেকে গাড়ি টেনে নিয়ে যাবার মতো অপমানের ভার বইতে হলো।
আচ্ছা, দ্বিতীয়বার এমনটা কবে হয়েছিল বলুন তো? — এই ঘটনার ঠিক ঘন্টা দুয়েক পরে। সেই একই দিনে। আর সম্পূর্ণ অন্য একটা কারণে।
সতেরো বছর ধরে কোনোদিন গাড়ি টো করতে হলো না, আর তারপর একই দিনে দু-দুবার! এর কী ব্যাখ্যা থাকতে পারে, ডক্টর আসিমভ? (রাক্ষস-খোক্কস? প্রতিহিংসাপরায়ণ অপদেবতা? ভিনগ্রহীদের চক্রান্ত?)
দ্বিতীয়বার আমি বেশ দিশেহারা অবস্থায় এই তিন রকমের থিয়োরিই পেশ করেছিলাম আমার নির্বিকার গাড়ির মিস্তিরির কাছে। তার থিয়োরি (সে-ও কিন্তু বেশ যুক্তিবাদী) অনুযায়ী আমার গাড়িটার অনেক বয়স হয়েছে বলে দেহ রেখেছে। অগত্যা, আমি একটা নতুন গাড়ি কিনে ফেললাম।
ব্যাপারটা এভাবে দেখা যাক। পৃথিবীতে প্রত্যেক মানুষের জীবনে প্রতিনিয়ত অসংখ্য ঘটনা ঘটছে — বড়ো, ছোটো, তুচ্ছ। প্রতিটা ঘটনা ঘটার একটা সম্ভাবনা থাকে, যদিও প্রতিটা ক্ষেত্রেই সেই নির্দিষ্ট সম্ভাবনাগুলো আমরা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করতে পারি না। মোটের ওপর একটা গড় গোছের হিসেব করে আমরা কল্পনা করতে পারি প্রতি হাজারটা ঘটনার মধ্যে একটা এমন ঘটনা রয়েছে যা ঘটার সম্ভাবনা হাজারে-এক, প্রত্যেক লক্ষ ঘটনার মধ্যে একটা এমন ঘটনা রয়েছে যা ঘটার সম্ভাবনা লাখে-এক, এইরকম।
তার মানে আমরা প্রতিনিয়তই খুব বিরল কিছু ঘটনার সম্মুখীন হচ্ছি। এটাই স্বাভাবিক সম্ভাবনার পরিণাম। যদি দীর্ঘদিন ধরে আমাদের জীবনে কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা না ঘটতো, তাহলে সেটাই বরং অস্বাভাবিক হতো।
আর যদি আমরা শুধু একজন মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে যত মানুষ বেঁচে আছে সবাইকে ধরে ভাবি — তখন মোট ঘটনার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ষাট বিলিয়ন গুন। তখন সহজেই ধরে নেওয়া যায় কোথাও না কোথাও, কারো জীবনে এমন কিছু একটা ঘটবেই যেটা তার জীবনে ঘটার সম্ভাবনা অন্য কারো জীবনের থেকে ষাট বিলিয়ন গুন বেশি। এই ধরনের ঘটনাও আলাদা করে কোনো ব্যাখ্যার দাবি রাখে না। এগুলো আমাদের স্বাভাবিক মহাজাগতিক নৈমিত্তিক কারবারেরই অংশ।
উদাহরণ? আমরা সকলেই আমাদের নানান দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অদ্ভুত কাকতালীয় ঘটনার গল্প শুনেছি — যেখানে আশ্চর্য সব পরিস্থিতির এমন অস্বাভাবিক সমাপতন ঘটে, যাতে মনে হয় টেলিপ্যাথি, বা উড়ন্ত চাকি, কিংবা শয়তানের অস্তিত্ব স্বীকার না করে উপায় নেই।
আমিও এখানে একটা উদাহরণ দেব। কোনো দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের গল্প নয়। ইতিহাসে সুপরিচিত এক ব্যক্তির কাহিনী, যার জীবনের বিবরণ যথেষ্ট নির্ভরযোগ্যভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। তাঁর জীবনে একটা অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেছিল, যা ইতিহাস নিয়ে আমার নানাবিধ আর বিস্তৃত পড়াশোনার মধ্যে কোথাও আমি বিশেষভাবে উল্লিখিত হতে দেখিনি। সেই গল্পটাই এখানে আমি করব — এমনভাবে, যাতে সহজেই বোঝা যায় যে এই ঘটনাটা আমার শোনা সমস্ত ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বিস্ময়কর, অথচ, তা সত্ত্বেও সেই বিস্ময় কখনোই মহাবিশ্বকে বোঝার ক্ষেত্রে যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গীর প্রতি আমার বিন্দুমাত্র অনাস্থার সঞ্চার করে না। রইলো সেই গল্প —
যাঁর কথা বলছি, তাঁর নাম হলো নিয়াস পম্পেইয়াস (Gnaeus Pompeius), ইংরেজিভাষীদের মধ্যে যিনি ❛পম্পেই❜ নামেই বেশি পরিচিত।
খ্রিষ্টপূর্ব ১০৬ সালে তাঁর জন্ম, এবং জীবনের প্রথম বিয়াল্লিশ বছর তাঁর অবিচ্ছিন্ন সৌভাগ্যের মধ্যেই কেটেছে। না, মানে, মাঝেমধ্যে নিশ্চয়ই পায়ের কোনায় ঠোক্কর লেগেছে, আজেবাজে খাবার খেয়ে অস্বস্তিকর সময়ে বদহজম হয়েছে, বা গ্ল্যাডিয়েটরের যুদ্ধে টাকা খুইয়েছেন — কিন্তু জীবনের বড়ো বড়ো ক্ষেত্রগুলোতে প্রায় সর্বদাই তিনি অপরাজিত ছিলেন।
পম্পেই জন্মেছিলেন এমন একটা সময়ে, যখন গৃহযুদ্ধ আর সামাজিক অস্থিরতায় রোম বিদীর্ণ। ইতালীয় মিত্ররা — যাঁরা তখন রোমের নাগরিক ছিলেন না — বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন কারণ রোমের অভিজাতরা তাদের নাগরিকত্ব দিতে রাজি ছিলেন না। ওদিকে আবার নিম্নবর্গের মানুষ, যাঁদের নাভিশ্বাস উঠেছিল একটা জঘন্য অর্থনীতির দমবন্ধ করা চাপে — বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন রোমের সেনেটরদের বিরুদ্ধে, যাঁরা ভূমধ্যসাগর-সংলগ্ন অঞ্চল থেকে লুঠ করা সম্পদের সিংহভাগই কুক্ষিগত করে রেখেছিলেন নিজেদের মধ্যে।
পম্পেই তখন নিতান্তই কিশোর। সে সময়ে তাঁর বাবা একটা ভয়ানক গোলমেলে পরিস্থিতি সামাল দেবার চেষ্টা করছিলেন। পম্পেইয়ের বাবা পেশায় ছিলেন সামরিক অধ্যক্ষ। তিনি ৮৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে কনসাল পদাধিকারী ছিলেন, ইতালীয় অ-নাগরিকদের যুদ্ধে পরাজিত করেছিলেন, এমনকি একটা বিজয়োৎসবের উদযাপন অবধি করেছিলেন। কিন্তু জন্মসূত্রে তিনি অভিজাত ছিলেন না, আর তিনি চেষ্টা করেছিলেন উগ্রপন্থীদের সঙ্গে সমঝোতা করতে। সম্ভবত এর ফলে একটা গভীর গোলমাল পাকিয়েছিল, কারণ তিনি অচিরেই এমন একটা জায়গায় পড়ে গেছিলেন যেখানে কোনো পক্ষই আর তাঁকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছিল না। এরকম সময়ে খ্রিষ্টপূর্ব ৮৭ অব্দে এক মহামারীর মধ্যে তাঁর সমস্ত পল্টনবাহিনী সমেত তাঁর মৃত্য ঘটে।
পড়ে রইলেন উনিশ বছরের যুবক পম্পেই, যিনি উত্তরাধিকার সূত্রে পেলেন একটা গৃহযুদ্ধে বিবদমান দুটো পক্ষেরই বৈরিতা।
টিকে থাকার জন্য তাঁকে পক্ষ একটা নিতেই হতো, আর সেটা নিতে হতো খুব সতর্কভাবে। কারণ রোম তখন উগ্রপন্থীদের দখলে, আবার ওদিকে এশিয়া মাইনরে রোমের শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছেন প্রতিক্রিয়াশীল রোমীয় সেনাপতি লুসিয়াস কর্নেলিয়াস সুল্লা (Lucius Cornelius Sulla)।
শেষমেশ কোন পক্ষের জয়লাভ ঘটবে সেটা ঠাহর করতে না পেরে শুরুর দিকে নিজেকে গুটিয়েই রেখেছিলেন পম্পেই। কিন্তু তারপর যখন খবর পেলেন এশিয়া মাইনরের যুদ্ধে জয়লাভ করে ফিরে আসছেন সুল্লা, তখন তিনি সুল্লাকেই সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। খুব কম সময়ের মধ্যেই তিনি তাঁর বাবার অনুগত সৈন্যসামন্ত জোগাড় করে একটা বাহিনী গঠন করে, প্রকাশ্যে নিজেকে সুল্লার সমর্থক হিশেবে ঘোষণা করে উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামলেন।
এই প্রথম তিনি পেলেন সাফল্যের স্বাদ। তিনি এক্কেবারে ঠিক লোকের ওপরেই বাজি ধরেছিলেন। ৮৩ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে ইতালিতে ফিরলেন সুল্লা, আর ফিরেই একের পর এক যুদ্ধে জিততে শুরু করলেন। খ্রিষ্টপূর্ব ৮২ সালের মধ্যেই তিনি ইতালির শেষ প্রতিরোধীকে গুঁড়িয়ে দিয়ে নিজেকে একনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলেন। পরবর্তী তিন বছর তিনিই হয়ে রইলেন ইতালির একচ্ছত্র অধিপতি। সুল্লা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে নতুন করে ঢেলে সাজালেন। আর সেনেটের অভিজাতদের ক্ষমতা আরো সুদৃঢ় করলেন।
এতে পম্পেইয়ের লাভই হলো, কারণ সুল্লা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ ছিলেন। সুল্লা তাঁকে প্রথমে সিসিলিতে পাঠান, পরে আফ্রিকায় — উগ্রপন্থীদের যে অংশগুলো ছত্রভঙ্গ হয়েও টিকে ছিল তাদের কড়া হাতে দমন করার জন্য। বলা বাহুল্য, সে কাজ সমাধা করতে পম্পেইয়ের তেমন কোনো অসুবিধে হয়নি।
যুদ্ধে জয়লাভ বিষয়টা এতটাই সস্তায় পাওয়া গেল, আর তাঁর সেনাবাহিনী তাঁকে নিয়ে এতটাই সন্তুষ্ট ছিল, যে পম্পেইকে তারা “মহান” খেতাবে ভূষিত করল — “নিয়াস পম্পেইয়াস ম্যাগনাস” (Gnaeus Pompeius Magnus) — একমাত্র রোমীয় যিনি এই আপাতো অ-রোমীয় খেতাবটি লাভ করেছিলেন। পরবর্তী বিবরণে বলা হয়, আলেকজান্ডার দা গ্রেটের সঙ্গে চেহারার একটা আশ্চর্য সাদৃশ্যের জন্যই নাকি তিনি এই উপাধি পেয়েছিলেন, যদিও এরকম সাদৃশ্য বোধহয় শুধুমাত্র পম্পেইয়ের কল্পনাতেই থাকা সম্ভব।
আফ্রিকা বিজয়ের পরে সুল্লা পম্পেইকে তাঁর সেনাবাহিনী ভেঙে দেবার নির্দেশ দিলেন, কিন্তু পম্পেই সে কথা শুনলেন না, বরং বেছে নিলেন নিজের বিশ্বস্ত সৈন্যসামন্ত দিয়ে পরিবৃত হয়ে থাকার সুবিধেজনক পরিস্থিতিকে। সাধারণত সুল্লার আদেশ অমান্য করার মতো সাহস কেউ চট করে দেখাত না, কারণ প্রাতরাশের টেবিলে বসার আগে সুল্লা নির্বিচারে ডজন খানেক মুণ্ডচ্ছেদ করার হুকুম দিতে পারতেন। অথচ, পম্পেই এসব করার পরে সুল্লার মেয়েকে বিয়ে করে বসলেন। আর এই বিবাহের ফলে সুল্লা এমন আহ্লাদে আটখানা হলেন, যে পম্পেই শুধুমাত্র “মহান” খেতাবটি ধরে রাখতেই সমর্থ হলেন তা নয়, তিনি সুল্লার কাছ থেকে একটা বিজয়োৎসব করবার অনুমতিও পেয়ে যান খ্রিষ্টপূর্ব ৭৯ অব্দে — এমন একটা সময়ে যখন আইনত উৎসব করার বয়সও পেরোননি পম্পেই।
এর প্রায় অব্যবহিত পরেই সুল্লা হঠাৎ তাঁর একনায়কের গদি থেকে অবসর নিলেন, সম্ভবত এরকম কিছু একটা ভেবে যে তাঁর যা করার ছিল তা করা হয়ে গেছে। কিন্তু পম্পেইয়ের উত্থান থমকে যায়নি। ততদিনে পম্পেইয়ের বেশ নামডাক হয়েছে (সহজ সহজ যুদ্ধে জয়লাভ করার সুবাদে), কিন্তু তার চেয়েও বড়ো কথা হলো আরো বেশি-বেশি সহজ যুদ্ধের জন্য পম্পেইয়ের যারপরনাই লোভ বেড়ে গেছিল।
যেমন, সুল্লার মৃত্যুর পরে মার্কাস এমিলিয়াস লেপিডাস (Marcus Aemilius Lepidus) নামের এক রোমীয় জেনারেল সুল্লার নীতির বিরুদ্ধাচারণ করলেন। প্রতিক্রিয়াশীল সেনেট পত্রপাঠ তার বিরুদ্ধে সেনা পাঠালো। সেই বাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন কুইন্টাস কাতুলাস (Quintus Catulus), আর পম্পেই ছিলেন তার সহ-অধিনায়ক। এর আগে পর্যন্ত পম্পেই লেপিডাসের পক্ষেই ছিলেন, কিন্তু আবারও, ঠিক সময়মতো তিনি আঁচ করে নিলেন কোন পক্ষ জিতবে। খুব সহজেই কাতুলাস পরাজিত করলেন লেপিডাসকে, আর সেই জয়ের বেশিরভাগ কৃতিত্ব আদায় করে নিলেন পম্পেই।
এই সময়ে স্পেনে একটা গোলমাল দেখা গেলো, কারণ ওটাই ছিল উগ্রপন্থীদের শেষ শক্ত ঘাঁটি। সেখানে কুইন্টাস সার্তোরিয়াস (Quintus Sertorius) নামে এক জেনারেল নিজের শাসন গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর অধীনে স্পেন কার্যত রোমের শাসনের বাইরে ছিল, আর সেখানের শাসনব্যবস্থাও ছিল যথেষ্ট উন্নত। কারণ সার্তোরিয়াস ছিলেন একজন দক্ষ এবং উদারনৈতিক প্রশাসক। তিনি স্থানীয় স্পেনীয়দের সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করতেন, তাদের সঙ্গে নিয়ে একটা সেনেট গঠন করেছিলেন যাতে তাদের প্রবেশাধিকার ছিল। এমনকি ইশকুলও স্থাপন করেছিলেন সার্তোরিয়াস, যেখানে স্পেনীয় তরুণদের রোমীয় ধাঁচে শিক্ষা দেওয়া হতো।
স্বাভাবিকভাবেই, বহু শতক ধরে কঠিন ও কঠোর যোদ্ধা হিশেবে খ্যাত স্পেনীয়রা সার্তোরিয়াসের পক্ষে দাঁড়িয়ে জান লড়িয়ে দিয়েছিল। ফলে যখন সুল্লা রোমীয় সৈন্য পাঠিয়েছিলেন স্পেনে, তারা খুব সহজেই পরাজিত হয়েছিল।
এরপরে খ্রিষ্টপূর্ব ৭৭ সালে, লেপিডাসের বিরুদ্ধে কাতুলাসের সহজ জয়লাভের ঘটনায় অনুপ্রাণিত হয়ে পম্পেই নিজেই স্পেনে গিয়ে সার্তোরিয়াসের মোকাবিলা করার প্রস্তাব দিলেন। সেনেট রাজি হলো, আর পত্রপাঠ লোকলশকর নিয়ে পম্পেই রওনা দিলেন স্পেনের উদ্দেশে। পথে গল পেরোবার সময়ে তিনি লেপিডাসের ভাঙা সেনাবাহিনীর অবশিষ্টাংশের মুখোমুখি হলেন। লেপিডাস ততদিনে মৃত হলেও তাঁর সেনাবাহিনীর এই অবশিষ্টাংশের নেতৃত্বে বহাল ছিলেন মার্কাস ব্রুটাস (Marcus Brutus) — যাঁর ছেলে একদিন এক বিখ্যাত ঘাতক হিসেবে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাবে।
এই ছিন্নভিন্ন বাহিনীকে হারাতে পম্পেইয়ের কোনো অসুবিধেই হলো না। ব্রুটাসকে আত্মসমর্পণের শর্তে প্রাণদানের আশ্বাস দিলেন পম্পেই। ব্রুটাস আত্মসমর্পণ করলেন — আর সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে প্রাণদণ্ড দিলেন পম্পেই। আরো একটা সহজ জয়, যার মধ্যে আবার একটা বিশ্বাসঘাতকতার গন্ধ লেগে রয়েছে। সুতরাং এসবের ফলে পম্পেইয়ের খ্যাতি যারপরনাই বেড়ে গেল।
এইসব মিটিয়ে স্পেনে পৌঁছোলেন পম্পেই। সেখানে তখন অভিজ্ঞ রোমীয় সেনাপতি মেটেলাস পায়াস (Metellus Pius) সার্তোরিয়াসের সঙ্গে কিছুতেই এঁটে উঠতে পারছেন না। সদম্ভে পম্পেই আগ বাড়িয়ে পায়াসের জায়গা নিয়ে সার্তোরিয়াসের সঙ্গে সম্মুখসমরে নামলেন। আর অবধারিতভাবেই সার্তোরিয়াস — যিনি দেখতে গেলে পম্পেইয়ের জীবনের প্রথম প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বী — আচ্ছা করে পম্পেইকে পরাজয়ের ঘোল খাওয়ালেন। পম্পেইয়ের সুখ্যাতির রথচক্র ওখানেই থেমে যেতে পারত — যদি না ঠিক সময়ে মেটেলাস আরো সৈন্যসামন্ত নিয়ে পম্পেইকে সাহায্য করতে এসে পড়তেন আর বেগতিক দেখে সার্তোরিয়াস পিছু হঠতে বাধ্য হতেন। পম্পেই অবশ্য পত্রপাঠ ব্যাপারটাকে নিজের জয় বলে ঘোষণা করলেন, আর স্বাভাবিকভাবেই, কৃতিত্বটাও তাঁরই হলো।
আগামী পাঁচ বছর সার্তোরিয়াসকে ঠান্ডা করার জন্য স্পেনেই পড়ে রইলেন পম্পেই, আর পাঁচ বছর ধরে তিনি টানা ব্যর্থ হলেন। তারপর হঠাৎ একদিন ভাগ্যের মোড় ঘুরে গেল — সেই ভাগ্য, যা কোনোদিন পম্পেইয়ের সঙ্গ ছাড়েনি। সার্তোরিয়াস দুম করে একদিন খুন হলেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে স্পেনের প্রতিরোধ ভেঙে পড়ল, এবং পম্পেই সহজেই আরেকটি বিজয় লাভ করলেন। খ্রিষ্টপূর্ব ৭১ সালে বুক ফুলিয়ে রোমে ফিরে এলেন পম্পেই, আর ঘোষণা করলেন যে তিনি স্পেনের বিশৃঙ্খলা দূর করে এসেছেন।
কিন্তু রোম কি খেয়াল করল না যে এই কাজটা করতে তার পাঁচ-পাঁচটা বছর সময় লেগে গেছে?
না। রোম তা দেখে উঠতে পারেনি। কারণ যে সময়ে পম্পেই স্পেনে পড়ে ছিলেন, ইতালির ভেতরে তখন এত গন্ডগোল, যে সেই ডামাডোলের মধ্যে স্পেনের খবর রাখার মতো অবকাশ কারো ছিল না।
এই সময়ে স্পার্টাকাসের নেতৃত্বে একদল গ্ল্যাডিয়েটর বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। দলে দলে বহু বঞ্চিত মানুষ এসে তাঁর দলে যোগ দিয়েছিল, এবং টানা দু বছর ধরে স্পার্টাকাস (যিনি ছিলেন একজন দক্ষ যোদ্ধা) তাঁর বিরুদ্ধে পাঠানো প্রতিটা রোমীয় বাহিনীকে পরাজিত করেছিলেন। রোমের অভিজাতদের মনের মধ্যে স্পার্টাকাসের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। ক্ষমতার শীর্ষে থাকার সময় তিনি প্রায় ৯০,০০০ সৈন্যের অধিপতি ছিলেন, আর দক্ষিণ ইতালির প্রায় পুরোটাই ছিল তার নিয়ন্ত্রণে।
খ্রিষ্টপূর্ব ৭২ সালে স্পার্টাকাস যুদ্ধ করতে করতে আল্পসের দিকে উত্তরমুখো যাত্রা শুরু করেন — আল্পস পেরিয়ে ইতালি ছেড়ে উত্তর অঞ্চলের বর্বরদের দেশে গিয়ে পাকাপাকি স্বাধীনতা অর্জনের উদ্দেশ্যে। কিন্তু সাফল্যের স্বাদ পেয়ে বিভ্রান্ত স্পার্টাকাসের সেনাদল ইতালিতেই থেকে আরো লুঠতরাজ চালাতে চাইল। অগত্যা স্পার্টাকাস আবার দক্ষিণমুখো হলেন।
এর মধ্যে সেনেট রোমের সবচেয়ে ধনী এবং সম্ভবত সবচেয়ে কূট ব্যবসায়ী মার্কাস লিসিনিয়াস ক্র্যাসাসের (Marcus Licinius Crassus) অধীনে একটা বাহিনী গঠন করেছিল। পরপর দুটো যুদ্ধে ক্র্যাসাস গ্ল্যাডিয়েটর বাহিনীকে পরাজিত করলেন, দ্বিতীয় যুদ্ধে স্পার্টাকাস নিহত হলেন। তারপর, কঠিন কাজ যখন প্রায় পুরোটাই শেষ, তখন পম্পেই তাঁর স্পেনীয় বাহিনী নিয়ে এসে অবশিষ্ট ছত্রভঙ্গ বিরোধীদের দ্রুত দমন করলেন। এরপর অবধারিতভাবেই পম্পেই নিজেকে জাহির করলেন এইভাবে যে তিনি স্পেন সামলে এসেই আবার গ্ল্যাডিয়েটরদেরও ঠান্ডা করে দিয়েছেন। ফলে, বিজয়োৎসব করবার অনুমতি পেয়ে গেলেন পম্পেই, আর বেচারা ক্র্যাসাসের কপালে জুটলো লবডঙ্কা।
সেনেট কিন্তু ভেতরে ভেতরে বেশ অস্থির হয়ে উঠছিল। কারণ তারা বুঝতে পারছিল না পম্পেইকে ঠিক কতটা বিশ্বাস করা উচিত। তিনি বড্ড বেশি-বেশি যুদ্ধ জিতে বড়ো বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠছিলেন।
কিন্তু আবার ক্র্যাসাসকেও তারা বিশেষ পছন্দ করত না (কেউই করত না অবশ্য)। প্রচুর সম্পত্তির মালিকানা থাকলেও ক্র্যাসাস অভিজাত বর্গের ছিলেন না। আর সামাজিকভাবে উচ্চতর সেনেটের ক্রমাগত অবজ্ঞা তাঁকে ভেতরে ভেতরে ক্ষিপ্ত করে তুলেছিল। জনগণের সমর্থন পেতে তিনি দান-খয়রাতি করা লোকেদের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করেন। পাশাপাশি তিনি পম্পেইয়ের সঙ্গেও সুসম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেন।
এ ধরনের প্রস্তাবে পম্পেই সাধারণত সাড়া দিতেন। তাছাড়া কোন পক্ষ জিততে চলেছে সেটা আন্দাজ করতে পারারও একটা ক্ষমতা ছিল তাঁর। খ্রিষ্টপূর্ব ৭০ সালে তিনি আর ক্র্যাসাস দুজনে কনসুলেটের পদপ্রার্থী হয়ে নির্বাচনে দাঁড়ালেন (প্রতি বছর তখন দু জন করে কনসাল নির্বাচন করা হতো), আর দু জনেই জিতেও গেলেন। কনসাল হবার পরে রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপরে সেনেটের অভিজাতদের প্রভাব খর্ব করার উদ্দেশ্যে ক্র্যাসাস প্রায় এক দশক পুরোনো সুল্লার বানানো সংস্কারগুলো ভাঙতে শুরু করলেন। যে পম্পেই এতদিন ধরে রাজনৈতিক কারণে সুল্লার পরম অনুগত ছিলেন, এখন বাস্তবতার খাতিরে তাল মেলালেন ক্র্যাসাসের সঙ্গে — যদিও খুব একটা খুশি না হয়েই।
কিন্তু রোমের সমস্যা তখনও পুরোপুরি কাটেনি। পশ্চিম অঞ্চল মোটামুটি শান্ত হয়ে এসেছে, কিন্তু সমুদ্রে উৎপাত লেগেই আছে। পুবদিকে রোমের যুদ্ধজয়ের ফলে পুরোনো সব শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, অথচ নতুন কোনো স্থিতিশীল ব্যবস্থা তখনো চালু হয়নি। ফলে ভূমধ্যসাগরের পুব অঞ্চল জুড়ে জলদস্যুদের উপদ্রব শুরু হয়েছে।
জলদস্যু-দমনের সমস্ত রোমের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল, খানিকটা যাদের পাঠানো হচ্ছিল সমস্যা মেটানোর জন্য, তাদের হাতে পর্যাপ্ত পরিমা্ণ ক্ষমতা না দেওয়ার কারণে। খ্রিষ্টপূর্ব ৬৭ সালে কৌশল করে পম্পেই নিজেই এই দায়িত্ব নেবার ব্যবস্থা করলেন — কিন্তু বেশ অনুকূল সব শর্তসাপেক্ষে। খাদ্যসংকটের ভয়ে একরকম বাধ্য হয়েই তাঁর সব শর্ত মেনেও নিল সেনেট।
পম্পেইকে সমগ্র ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল আর তার ভেতরের প্রায় পঞ্চাশ মাইল পর্যন্ত অঞ্চলের ওপর তিন বছরের জন্য কার্যত একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতা দেওয়া হলো। আর জলদস্যুদের সামলানোর জন্য সমস্ত রোমের নৌবহর তুলে দেওয়া হলো তাঁর হাতে। পম্পেইয়ের ওপর রোমীয়দের আস্থা এতটাই উঁচু দরের ছিল যে তাঁর নিয়োগের খবর প্রকাশ হতেই খাবারদাবারের দাম পড়ে গেছিল।
পম্পেইয়ের পূর্ববর্তী সমস্ত রোমীয় সেনানায়কেরা যেটা পাননি, পম্পেই সেটাই হাতে পেয়েছিলেন — প্রয়োজনীয় ক্ষমতা আর সৈন্যদল। তবে এটা মানতেই হয়, কাজটা তিনি করে দেখিয়েছিলেন। তিন বছর নয়, মাত্র তিন মাস সময়ের মধ্যেই ভূমধ্যসাগরকে জলদস্যুমুক্ত করে ফেললেন তিনি।
এর আগেই তিনি জনপ্রিয় ছিলেন — এবারে এক্কেবারে রোমের নায়ক হয়ে উঠলেন পম্পেই।
যেটুকু সমস্যা বাকি রয়ে গেছিল তা ছিল এশিয়া মাইনরের পুব দিকে, যেখানে পন্টাস রাজ্য হার-জিতের পতন-অভ্যুদয়ের মধ্যে দিয়ে বিশ বছর ধরে রোমের সঙ্গে লাগাতার যুদ্ধ করে যাচ্ছিল। সুল্লা একসময় সাম্রাজ্যের পুব দিকে এদের দমন করেছিলেন, কিন্তু পন্টাস প্রতিরোধ জারি রেখেছিল। এই সময়ে একজন রোমীয় সেনানায়ক, লুসিয়াস লিসিনিয়াস লুকালাস (Lucius Licinius Lucullus), পন্টাস দমনের কাজটা প্রায় গুটিয়ে এনেছিলেন। কিন্তু লুকালাস খুবই কঠোর গোছের সেনানায়ক ছিলেন। সৈন্যরা তাকে মোটেও পছন্দ করত না।
খ্রিষ্টপূর্ব ৬৬ অব্দে, যখন আর একবার আক্রমণ করলেই পন্টাসের পতন অনিবার্য, তখন লুকালাসের সৈন্যদল হঠাৎ বেঁকে বসল। তাদের বিদ্রোহের ঠেলায় লুকালাসকে সরিয়ে নেওয়া হলো। আর তার বিকল্প হিসেবে পাঠানো হলো পম্পেইকে। পম্পেইয়ের আগেই তাঁর সুখ্যাতি রোমীয় শিবিরে পৌঁছে গেছিল, কাজেই সোল্লাসে পম্পেইকে স্বাগত জানাল লুকালাসের সৈন্যদল। লুকালাসের জন্য তারা কোনোদিন যা করেনি, এরকম উৎসাহ নিয়ে পম্পেইয়ের সঙ্গে তারা আবার হানা দিল পন্টাস রাজ্যে এবং জিত হাসিল হলো সহজেই। শুধুমাত্র শেষ আঘাতটুকু হানলেন পম্পেই, এবং যথারীতি, গোটা সাফল্যের কৃতিত্বটি গ্রহণ করলেন সানন্দে।
এবার এশিয়া মাইনরের সমস্ত অঞ্চলই হয়ে পড়লো হয় সরাসরি রোমের অধীনে, নয়তো রোমের প্রভাবাধীন কোনো শাসকের নিয়ন্ত্রণে। পম্পেই এবারে ঠিক করলেন পূর্বাঞ্চলের গোটাটাই গুছিয়ে নিতে হবে। তিনি দক্ষিণ দিকে যাত্রা করতে করতে অ্যান্টিয়োকের (Antioch) কাছাকাছি এসে সেলুসিড (Seleucid) সাম্রাজ্যের ভগ্নশেষটুকু খুঁজে পেলেন, যা আলেকজান্ডার মারা যাবার প্রায় আড়াই দশক পরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তখন সেখানে ত্রয়োদশ অ্যান্টিয়োকাস (Antiochus XIII) নামের এক রাজার নামমাত্র শাসনকাল। পম্পেই সহজেই তাকে গদিচ্যুত করলেন আর তার রাজত্বকে ‘সিরিয়া’ প্রদেশ হিসেবে রোমের সঙ্গে যুক্ত করে নিলেন।
এর আরো দক্ষিণে ছিল জুডেয়া (Judea) রাজ্য। এক শো বছরের কিছু কম সময় ধরে সেটা ম্যাকাবীয় বংশের অধীনে একটা স্বাধীন রাজ্য ছিল। ম্যাকাবীয় বংশের দুই সিংহাসনের উমেদার তখন নিজেদের মধ্যে মারামারি করছে। এদের একজন পম্পেইয়ের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করল।
পম্পেই প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জুডেয়ায় ঢুকে পড়ে জেরুসালেম অবরোধ করে বসলেন। জেরুসালেম দখল করা খুব একটা সহজ কাজ ছিল না। উঁচু পাথুরে জায়গা, জলের সরবরাহ, দুর্ভেদ্য প্রাচীর, আর উগ্র প্রতিরোধকারী রক্ষকের দল — সব মিলিয়ে ব্যাপারটা ছিল বেশ জটিল।
কিন্তু পম্পেই লক্ষ করলেন প্রতি সাত দিনে একবার করে সবকিছু কীরকম যেন মিইয়ে যায়। তিনি জানতে পারলেন, সাবাথের দিন নিজেদের ওপর আক্রমণ না হলে ইহুদীরা লড়াই করে না — আর করলেও পুরো উদ্যমে কখনোই করে না। এরকম একটা বিদঘুটে অভ্যেসের কথা পম্পেইকে বিশ্বাস করাতে নিশ্চয়ই বেগ পেতে হয়েছিল, কিন্তু একবার বিশ্বাস করিয়ে ফেলার পরে তিনি কয়েকটা সাবাথের দিন জুড়ে তাঁর আক্রমণের জোগাড়-যন্ত্র সেরে ফেললেন, আর তারপর একটা সাবাথের দিন দেখে আক্রমণ করে বসলেন। কোনো সমস্যাই হলো না।
ম্যাকাবীয় শাসনের সমাপ্তি ঘটিয়ে পম্পেই জুডেয়াকে রোমের অন্তর্ভুক্ত করেন। কিন্তু ইহুদীদের ধর্মীয় স্বাধীনতা, মন্দির, পুরোহিত, আর সর্বোপরি, তাদের বিদঘুটে সাবাথ — এসবের ক্ষেত্রে কোনো বাধানিষেধ চাপালেন না পম্পেই।
পম্পেইয়ের বয়স তখন বেয়াল্লিশ, আর ভাগ্যদেবী ততদিন পর্যন্ত একটানা চোখের পলক না ফেলে হেসে গেছেন তাঁর দিকে চেয়ে। এইখানে পম্পেইয়ের জীবনে ঘটে যাওয়া একটা সামান্য ঘটনার কথা আপাতত উহ্য রেখে সেটার জায়গায় কয়েকটা তারকাচিহ্ন দিয়ে রাখছি। আপাতোভাবে, নিতান্তই তুচ্ছ একটা ঘটনা।
খ্রিষ্টপূর্ব ৬১ সালে সাফল্যের চুড়োয় বসা পম্পেই ইতালিতে ফিরে এলেন, আর দাবি করলেন (অবশ্যই বেশ খানিকটা জাহির করে) যে পুবদিকে যেখানে তিনি পৌঁছেছিলেন, কার্যত সেটাকেই রোমের কেন্দ্রস্থলে রূপান্তরিত করে এসেছেন। তাঁর সম্মানে এমন এক বিজয়োৎসবের আয়োজন করা হলো, যেমন সমারোহ এর আগে রোম কখনো দেখেনি।
সেনেট ভেতরে ভেতরে প্রমাদ গুনছিল। এইসবের চোটে পম্পেই নিজেই আবার নিজেকে একনায়ক ঘোষণা করে উগ্রবাদী হয়ে না পড়েন। পম্পেই অবশ্য সেটা করলেন না। বিশ বছর আগে তাঁর হাতে যখন সেনাবাহিনী ছিল, তখন সুল্লার রোষের মুখে পড়ার ঝুঁকি নিয়েও তিনি তা ধরে রেখেছিলেন। অথচ, এবারে কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তিনি সেনাবাহিনী ভেঙে-টেঙে দিয়ে সাধারণ নাগরিকের জীবনে ফিরে এলেন। হয়তো তাঁর মনে হয়েছিল যে শুধুমাত্র নাম-মাহাত্ম্যের জোরেই তিনি এবারে রোমের প্রজাতন্ত্রের সর্বেসর্বা হয়ে উঠতে পারবেন।
অবশেষে, সঠিক সিদ্ধান্ত নেবার ব্যাপারে পম্পেইয়ের স্বাভাবিক গুণের বিচ্যুতি ঘটল। আর একবার এই বিচ্যুতি ঘটার পর থেকে সারাজীবন তাঁকে এই ভুলের মাশুল গুনে যেতে হয়েছে।
প্রথমে পম্পেই সেনেটের কাছে তাঁর পূর্বাঞ্চলের সমস্ত কীর্তিকলাপ — যুদ্ধজয়, চুক্তি, রাজাদের অপসারণ, নতুন প্রদেশের প্রতিষ্ঠা — এইসব নথিভুক্ত করার জন্য আবেদন করলেন। এছাড়া তিনি তাঁর সৈন্যদের মধ্যে জমি বন্টন করার প্রস্তাবও পেশ করলেন, যেহেতু তিনি নিজেই তাঁর সৈন্যদের এ ব্যাপারে আশ্বাস দিয়েছিলেন। পম্পেই নিশ্চিত ছিলেন যে এ সবকিছুই চাওয়া মাত্র মঞ্জুর হয়ে যাবে।
কিন্তু তা হলো না। পম্পেইয়ের হাতে এখন কোনো সেনাবাহিনী নেই। সেনেট এবারে বলতে শুরু করল যে প্রত্যেকটা যুদ্ধজয়, চুক্তি, ইত্যাদি প্রস্তাব আলাদা আলাদা করে খুঁটিনাটি বিচার করে বিবেচনা করতে হবে। আর জমি-টমি দেবার প্রস্তাব একেবারে সরাসরি নাকচ করা হলো।
তার চেয়েও বড়ো কথা, পম্পেই হঠাৎ বুঝতে পারলেন সরকার পক্ষের কোনো ব্যক্তিই আর তাঁর সমর্থনে দাঁড়িয়ে নেই। তাঁর আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তার ফানুস যেন হঠাৎ চুপসে গেল, কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই কেমন যেন সব পক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে চলে গেল। আরো আশ্চর্যের ব্যাপার — পম্পেই কিছুই করতে পারলেন না! কিছু একটা যেন রাতারাতি বদলে গেছিল। তিনি আর তখন রোমের চালাক-চতুর সোনার টুকরো ভাগ্যদেবীর স্নেহধন্য পম্পেই নন, যেমনটা ৬৪ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের আগে ছিল। এখন তিনি দুর্বল, দোদুল্যমান, অনিশ্চিত।
এমনকি ক্র্যাসাসও আর তাঁর বন্ধু রইলেন না। ক্র্যাসাস নতুন একজনকে খুঁজে পেয়েছিলেন। সুদর্শন, আকর্ষণীয় একজন মানুষ যিনি অসাধারণ বাগ্মী আর ষড়যন্ত্রে নিপু্ণ — যাঁর নাম ছিল জুলিয়াস সিজার। সিজার ছিলেন উচ্ছৃঙ্খল অভিজাত, যাঁর বাজারে অনেক ধারদেনা হয়ে গিয়েছিল। ক্র্যাসাস সেই বিপুল ধার মিটিয়ে দিয়েছিলেন, আর বিনিময়ে লাভ করেছিলেন সিজারের নিঃশর্ত আনুগত্য।
পম্পেই যখন সেনেটের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত, সিজার তখন স্পেনে। ছোটোখাটো বিপ্লবীদের সঙ্গে যুদ্ধে জিতছেন আর ধন-সম্পদ লুট করছেন (যেমনটা তখনকার দিনে সব রোমীয় সেনানায়কেরাই করে থাকতো) — যাতে ক্র্যাসাসের ঋণ শোধ করে তিনি স্বাধীন হয়ে উঠতে পারেন। এসব সেরে ইতালিতে ফিরে সিজার যখন দেখলেন সেনেটের ওপর পম্পেই খাপ্পা হয়ে বসে রয়েছেন, তখন নিজের থেকে উদ্যোগ নিয়ে সিজারই ক্র্যাসাস, পম্পেই, আর তাঁর নিজের মধ্যে একটা জোটের প্রস্তাব গড়ে তুললেন, যা পরবর্তীকালে “প্রথম ত্রয়ীর শাসন” (First Triumvirate) বলে পরিচিত হয়।
আর এই জোট থেকে লাভের গুড় খেলেন সিজার, পম্পেই নয়। এই জোটের সাহায্যে খ্রিষ্টপূর্ব ৫৯ সালে সিজার কনসাল নির্বাচিত হলেন। কনসাল হবার পরে সিজার একরকম অবজ্ঞাপূর্ণ অনায়াস ভঙ্গীতে সেনেটকে নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করলেন, আর অন্য প্রতিক্রিয়াশীল কনসালটিকে কার্যত ঘরবন্দী করে ফেললেন।
তবে একটা কাজ করেছিলেন সিজার। তিনি সেনেটের অভিজাতদের পম্পেইয়ের সব দাবি মেনে নিতে বাধ্য করেছিলেন। পম্পেই তাঁর সমস্ত কীর্তিকলাপ নথিভুক্ত করার অনুমোদন পেলেন। তাঁর সৈন্যদের জন্য জমিজিরেত পেলেন। কিন্তু লাভবান হলেন না। বরং খানিকটা অপমানই জুটলো কপালে। ব্যাপারটা এরকম দেখালো, যেন পম্পেই হাত পেতে দাঁড়িয়ে ছিলেন, আর সিজারের দাক্ষিণ্যে তাঁর মনস্কামনা পূর্ণ হলো।
কিন্তু পম্পেই কিস্যু করতে পারলেন না। তিনি সিজারের মেয়ে জুলিয়াকে বিয়ে করেছিলেন। সুন্দর আর আকর্ষণীয় জুলিয়ার প্রেমে পাগল ছিলেন পম্পেই। যতদিন জুলিয়া বেঁচে ছিলেন, পম্পেই সিজারের বিরুদ্ধে যেতে পারেননি।
এ সময়ে সমস্তটাই ছিল সিজারের নিয়ন্ত্রণে। ৫৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে সিজার প্রস্তাব পেশ করলেন যে সামরিক অনুশীলন চালানোর জন্য তাঁকে, ক্র্যাসাসকে, আর পম্পেইকে যেন আলাদা আলাদা প্রদেশের দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রস্তাবে ক্র্যাসাস পেলেন সিরিয়া, পম্পেই পেলেন স্পেন, আর সিজার পেলেন দক্ষিণ গল — যা তখন রোমীয় সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। ঠিক হলো, সামরিক কেরামতি প্রদর্শনের জন্য প্রত্যেক সেনানায়ক পাঁচ বছর করে সময় পাবেন।
পম্পেই যারপরনাই খুশি হলেন। ক্র্যাসাসকে সিরিয়ায় মুখোমুখি হতে হবে শক্তিশালী পার্থিয়ান সাম্রাজ্যের, আর গলে সিজারকে মুখোমুখি হতে হবে উত্তরের দুর্ধর্ষ বর্বর জাতিগুলোর। পম্পেইয়ের ভাগ্য যদি সুপ্রসন্ন হয়, তাহলে দুজনেই বেশ ঝামেলায় পড়বেন, কারণ ক্র্যাসাস বা সিজার কেউই ঠিক প্রশিক্ষিত সামরিক নেতা ছিলেন না। উল্টোদিকে, স্পেন যেহেতু রাজনৈতিকভাবে শান্ত, সেহেতু নির্বিবাদে পম্পেই ইতালির কাছাকাছি থেকে রোমের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। এর চেয়ে ভালো ব্যবস্থা আর কী-ই বা হতে পারে?
একভাবে দেখলে মনে হয়, পম্পেই আবার বুঝি ভাগ্যলক্ষ্মীর বরাভয় ফিরে পেতে চলেছেন। খ্রীষ্টপূর্ব ৫৩ সালে ক্র্যাসাসের বাহিনী পার্থিয়ানদের হাতে ধ্বংস হলো, আর ক্র্যাসাস নিজেও নিহত হলেন।
আর সিজার? নাহ্, পম্পেইয়ের হারানো ভাগ্য আর ফিরে আসেনি। রোমের সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়ে, মাঝবয়সী সিজার (গলে যাবার সময়ে তাঁর বয়স ছিল চুয়াল্লিশ) — যাঁকে সবাই নেহাত একজন দামাল, উচ্ছৃঙ্খল, আর কূটনীতিবাগিশ যুবক হিসেবে চিনতো — এক দুর্দান্ত সামরিক প্রতিভা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন। পাঁচ বছর ধরে তিনি গল অঞ্চলে যুদ্ধ চালালেন আর জার্মানি ও ব্রিটেনেও সফল সামরিক অভিযান পরিচালনা করলেন। এর সঙ্গে সঙ্গে তিনি তাঁর সাফল্যের ইতিবৃত্ত “Commentaries” বইতে লিপিবদ্ধ করে রোমীয় পাঠকের সামনে তুলে ধরলেন। ফলে রাতারাতি রোম হঠাৎ একজন নতুন সামরিক নায়ক পেয়ে গেল — এমন সময়ে, যখন কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে ইতালিতে বসে বসে পম্পেই হতাশা আর ঈর্ষায় ক্রমশ ভেঙে পড়ছিলেন।
খ্রিষ্টপূর্ব ৫৪ সালে জুলিয়ার মৃত্যু হলো। আর এরপরে পম্পেই সিজারের প্রতি তাঁর বিরাগ আর চেপে রাখতে পারলেন না। সেনেটের অভিজাতরাও আবার পম্পেইকে তোষামোদ করতে শুরু করল, যেহেতু পম্পেইয়ের থেকে সিজারকেই তারা বেশি ভয় পাচ্ছিল। পম্পেই এতে সাড়া দিলেন, সেনেটরদের সঙ্গে যোগ দিলেন। এমনকি এক প্রভাবশালী সেনেটরের মেয়েকে বিয়েও করলেন।
সিজার যখন খ্রিষ্টপূর্ব ৫০ সালে গল থেকে ফিরে এলেন, তখন সেনেট নির্দেশ দিল সৈন্যবাহিনী ভেঙে দিয়ে সিজারকে একা ইতালিতে প্রবেশ করতে হবে। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল, এই প্রস্তাব মেনে নিলে সিজার সঙ্গে সঙ্গেই গ্রেফতার হবেন, হয়তো মৃত্যুদণ্ডের সাজাও জুটবে কপালে। কিন্তু সিজার যদি সেনেটের অবাধ্য হয়ে সেনাবাহিনী সমেত ইতালিতে ঢোকেন, তাহলে কী হবে?
“ভয় নাই, ওরে ভয় নাই,” দারুণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পম্পেই বলে উঠলেন, “আমি একবার মাটিতে পা ঠুকলেই সমস্ত সৈন্যেরা সুড়সুড় করে আমার পাশে এসে দাঁড়াবে।”
খ্রিষ্টপূর্ব ৪৯ সালে সিজার ইতালির সীমানা নির্দেশকারী রুবিকন নদী পার করলেন সেনাবাহিনী সমেত। পম্পেইও জোরসে মাটিতে পা ঠুকলেন — কিন্তু কিছুই হলো না। উল্টে ইতালির সৈন্যরাই দলে দলে সিজারের পতাকার নিচে গিয়ে দাঁড়াতে শুরু করল। অপমানিত পম্পেই আর তার সেনেটের বন্ধুরা পালিয়ে গ্রীসে গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হলো।
সিজারও সেনাবাহিনী সমেত তাদের পিছু ধাওয়া করলেন।
গ্রীসে গিয়ে পম্পেই একটা বড়োসড়ো বাহিনী জোগাড় করেছিলেন। উল্টোদিকে সিজার সমুদ্দুর পেরিয়ে খুব সীমিত সংখ্যক সৈন্যই সঙ্গে আনতে পেরেছিলেন। সুতরাং, সংখ্যার বিচারে পম্পেইয়ের পরিস্থিতি ছিল সুবিধেজনক। পম্পেই চাইলে এই সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে কাজে লাগিয়ে সিজারের প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহ বন্ধ করতে পারতেন, সম্মুখসমরে না গিয়েও তাকে দুর্বল ও ক্লান্ত করে তুলতে পারতেন।
কিন্তু বাস্তবে ঘটলো উল্টো। ভেতরে ভেতরে অপমানিত পম্পেই হৃত গৌরবের স্বপ্নে বিভোর হয়ে উদগ্রীব হয়ে উঠলেন সামনাসামনি যুদ্ধ করে সিজারকে পরাজিত করে নিজেকে যোগ্যতর সেনানায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য। আরো খারাপ ব্যাপার হলো, পম্পেইয়ের সেনেটের অভিজাত বন্ধুরাও সমানে পম্পেইকে উৎসাহিত করতে থাকলেন মুখোমুখি যুদ্ধ করার জন্য। বিশেষত, পম্পেইয়ের সৈন্যবল যখন সিজারের প্রায় দুই গুন।
থেসালির (Thessaly) ফার্সেলাসে (Pharsalus) খ্রিষ্টপূর্ব ৪৮ সালের ২৯শে জুন দু পক্ষের যুদ্ধ হলো।
পম্পেই ভরসা রেখেছিলেন তাঁর অশ্বারোহী বাহিনীর ওপরে, যাতে মূলত ছিলেন সাহসী তরুণ রোমীয় অভিজাতরা। যুদ্ধের শুরুর দিকে পম্পেইয়ের অশ্বারোহী বাহিনী দুই ধার দিয়ে আক্রমণ করে সিজারের সেনাবাহিনীকে বিপাকে ফেলেছিল। তখন পিছন দিক থেকে আক্রমণ শানাতে পারলে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যেতে পারত, আর সিজারের পতনও ঘটতে পারত। কিন্তু, এই ব্যাপারটা সিজার আগে থেকেই খানিকটা আঁচ করেছিলেন। তিনি হাতে গোনা কিছু সৈন্যকে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন এদের মোকাবিলা করার জন্য। এদের ওপর নির্দেশ ছিল বর্শা-টর্শা ছোঁড়ার চেষ্টা না করে বরং তা দিয়ে অশ্বারোহীদের মুখে খোঁচা মারার চেষ্টা করতে। সিজার ভেবেছিলেন অভিজাতরা নিজেদের মুখ নষ্ট হবার সম্ভাবনা দেখলে বিপদের ঝুঁকি নিতে চাইবে না। আর এই ভাবনাটা ছিল অব্যর্থ। অশ্বারোহীরা মুখের শ্রীরূপ নষ্ট হবার ভয়ে অল্পেই রণে ভঙ্গ দিল।
আর অশ্বারোহীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যেতেই সিজারের অভিজ্ঞ পদাতিক বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়লো সংখ্যায় বেশি অথচ অপেক্ষাকৃত দুর্বল পম্পেইয়ের পদাতিক সেনার ওপর। প্যাঁচে পড়লে সেনাবাহিনী কেমন করে সামলাতে হয় সে ব্যাপারে পম্পেইয়ের অভিজ্ঞতার ভাঁড়ার শূন্য। সুতরাং, বেগতিক দেখে তিনি পালানোই শ্রেয় মনে করলেন। এক আঘাতেই তাঁর যাবতীয় সামরিক দর্প চূর্ণ হয়ে গেল, আর এ-ও বেশ বোঝা গেল সামরিক কেরামতিতে পম্পেই নন, বরং সিজারই হলেন আসল ওস্তাদ।
পালিয়ে গিয়ে পম্পেই আশ্রয় নিলেন ভূমধ্যসাগর অঞ্চলের সেই দেশে, যেখানে পুরোপুরি রোমের কর্তৃত্ব তখনও কায়েম হয়নি — মিশর। কিন্তু মিশরও তখন গৃহযুদ্ধে জেরবার। তেরো বছরের কিশোর রাজা ত্রয়োদশ টলেমি (Ptolemy XIII) তার দিদি ক্লিওপেট্রার সঙ্গে সেখানে যুদ্ধ করছে। এর মধ্যে পম্পেই উড়ে এসে জুড়ে বসায় একটু মুশকিল হলো। যুবরাজের উপদেষ্টারা পড়লো ফাঁপরে। পম্পেইকে ফিরিয়ে দেবার পরে তিনি যদি জিতে যান, তাহলে একজন রোমীয় সেনাপতির চিরস্থায়ী শত্রুতা ডেকে আনা হবে। আবার পম্পেইকে আশ্রয় দিলে যদি সিজার ক্ষেপে গিয়ে ক্লিওপেট্রার সঙ্গে হাত মেলান, তাহলেও বিপদ কিছু কম হবে না।
এমতাবস্থায় তাই বিচার-বিবেচনা করে তাঁরা পম্পেইকে মিশরে অবতীর্ণ হতে দিলেন। আর সঙ্গে সঙ্গেই তাকে মেরে ফেললেন।
এভাবেই ছাপ্পান্নো বছর বয়সে পম্পেইয়ের ভবলীলা সাঙ্গ হলো।
বেয়াল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত পম্পেই কোনোকিছুতেই অসফল হননি। যাতে তিনি হাত রেখেছেন, তা-ই সোনায় পরিণত হয়েছে। আর বেয়াল্লিশ বছরের পর থেকে তিনি যা করতে গেছেন, কিছুতেই আর সাফল্যের মুখ দেখেননি তিনি। যা কিছু করতে উদ্যত হয়েছেন, সবেতেই ডাহা ফেল করেছেন।
কী ঘটেছিল পম্পেইয়ের বেয়াল্লিশ বছর বয়সে? এই নিবন্ধের যে অংশটা আমরা তারকাচিহ্ন দিয়ে দাগিয়ে রেখেছিলাম, সেখানে কী এমন ঘটনা ঘটেছিল যা দিয়ে এই আশ্চর্য পরিণতি “ব্যাখ্যা” করা যায়? বেশ। আমরা তাহলে এবার ফিরে গিয়ে ঐ তারকাখচিত অংশটার রহস্যোদ্ঘাটন করে ফেলি।
আমরা ফিরে গেলাম খ্রিষ্টপূর্ব ৬৪ সালে।
পম্পেই তখন জেরুসালেমে। ইহুদীদের অদ্ভুত ধর্মবিশ্বাস বোঝবার চেষ্টা করছেন। সাবাথ ছাড়া তারা আর কী কী আজগুবি জিনিশপত্র করে তার সুলুকসন্ধান করছেন।
যেমন, তিনি একটা মন্দিরের কথা জানতে পারলেন। রোমের বিশাল-বিশাল উপাসনাগৃহের তুলনায় নিতান্তই সাদামাটা চেহারা। কিন্তু সেখানে ইহুদীরা অপরিসীম শ্রদ্ধা সহযোগে পুজো-আচ্চা করতে যায়। অথচ মন্দিরটায় কোনো দেবতার মূর্তি-টুর্তি নেই। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় ইহুদীরা যেন কোনো একটা অদৃশ্য দেবতার আরাধনা করছে।
“তাই বুঝি?” ঈষৎ কৌতুকভরে বললেন পম্পেই।
আসলে তাঁকে জানানো হয়েছিল, মন্দিরের একদম ভেতরে পর্দা দিয়ে ঢাকা একটা গর্ভগৃহ রয়েছে, “The Holy of Holies”। প্রধান পুরুতমশাই ছাড়া আর কারোর সেই পর্দা অতিক্রম করবার অনুমতি নেই। এমনকি, প্রধান পুরোহিতও সেখানে শুধুমাত্র ‘প্রায়শ্চিত্তের দিনে’ (Day of Atonement) যেতে পারেন। কানাঘুষো শোনা যেত, ইহুদীরা নাকি সেখানে গাধার মাথার পুজো করে, কিন্তু ইহুদীরা বরাবর বলে এসেছে, একমাত্র নিরাকার ঈশ্বর ছাড়া সেখানে আর কোনো কিছুরই উপস্থিতি নেই।
কুসংস্কার-টারে বিশেষ আমল না দিয়ে পম্পেই ঠিক করলেন, এই ব্যাপারটার মীমাংসা করার একটাই রাস্তা — নিজেকেই উঁকি মেরে দেখতে হবে কী রয়েছে সেই গর্ভগৃহে।
প্রধান পুরোহিত স্তম্ভিত হলেন। ধর্মপ্রাণ ইহুদীরা শোকে আর্তনাদ করে উঠল, কিন্তু পম্পেই অবিচল। ভেতরে তিনি যাবেনই। আর তাঁর সঙ্গে রয়েছে তাঁর সেনাবাহিনী। তাঁকে ঠেকায়, এমন সাধ্য কার? সুতরাং তিনি ঢুকে পড়লেন সেই গর্ভগৃহে।
ইহুদীরা অবশ্য নিশ্চিত ছিল যে নির্ঘাত তাঁর মাথায় বজ্রাঘাত হবে বা ঐ ধরনের ঈশ্বরোচিত অন্য কোনো প্রহার। কিন্তু সেসব কিছুই হলো না।
বহাল তবিয়তে গর্ভগৃহ থেকে বেরিয়ে এলেন পম্পেই। তিনি কিছুই খুঁজে পাননি, আর আপাতভাবে মনে হচ্ছিল তাঁর কোনো ক্ষতিও হয়নি। ২
পরিশিষ্ট
এই নিবন্ধটি আমার বড্ড প্রিয়। প্রথমত, এর জন্য আমি নিবন্ধের শিরোনামে একটা দুঃসাহসী কথার খেলা খেলতে পেরেছি। আর সাহসী কথার খেলা খেলতে পারার চেয়ে বেশি আনন্দ আমি আর কোত্থাও পাই না। সত্যি বলতে গেলে, প্রায় আর কোত্থাও।
দ্বিতীয়ত, এটা ঐতিহাসিক রচনা লেখার ব্যাপারে আমার হাত মকশো করার একটা সুযোগ করে দিয়েছে। সবশুদ্ধ আমি প্রায় ডজনখানেক ইতিহাসের বই লিখেছি। এমনকি, আমার অনেক বিজ্ঞানভিত্তিক লেখার মধ্যেও ইতিহাসের বহু অনুষঙ্গ রয়েছে।
আর সব শেষে, এই নিবন্ধটা আমার ইতিহাসের অদ্ভুত কাকতালীয় ঘটনাগুলো খুঁজে বের করার আগ্রহকে যথোচিত প্রশ্রয় দিয়েছে, আর এই কথাটা জোর দিয়ে বলার সুযোগ করে দিয়েছে, যে এগুলো নিছক কাকতালীয় ঘটনাই — এগুলোকে জোর করে একটা রহস্যময়, অপার্থিব ঘটনার ‘কারণ’ প্রতিপন্ন করার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা একান্তই অনুচিত। আর পম্পেইয়ের জীবনের এই আকস্মিক ওলটপালট যে এই ধরনের যাবতীয় উদাহরণের মধ্যে আমার দেখা সবচেয়ে চমকপ্রদ উদাহরণ — এ কথা বলাই বাহুল্য।
২) যদি এখানে পাঠকের মনে সন্দেহ হয় যে আমি হয়তো রহস্যবাদী হয়ে পড়ছি, তাহলে দয়া করে এই নিবন্ধের শুরুর অংশটা আরেকবার পড়ে নিন।
প্রথম প্রকাশঃ The Magazine of Fantasy and science fiction (May 1971), পরে সংকলিত হয়েছে “Asimov on Science: A 30-year retrospective” (Pinnacle books, 1989) বইতে।