• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৩ | জুলাই ২০২৬ | প্রবন্ধ
    Share
  • রূপসী বাংলায় পারসিক মিঠাই : শুভময় রায়

    অবশেষে হাফেজের সমাধি দেখতে বেরলুম।... এই সমাধির পাশে বসে আমার মনের মধ্যে একটা চমক এসে পৌঁছল, এখানকার এই বসন্ত প্রভাতে সূর্যের আলোতে দূরকালের বসন্তদিন থেকে কবির হাস্যোজ্জ্বল চোখের সংকেত। মনে হল আমরা দুজনে একই পানশালার বন্ধু, অনেকবার নানা রসের অনেক পেয়ালা ভরতি করেছি।... নিশ্চিত মনে হল আজ কত শত বছর পরে জীবনমৃত্যুর ব্যবধান পেরিয়ে এই কবরের পাশে এমন একজন মুসাফির এসেছে যে মানুষ হাফেজের চিরকালের জানা লোক।

    (‘পারস্যে’: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

    ইরানের শিরাজ় শহর যে ‘দুটি চিরজীবী মানুষের গৌরবে গৌরবান্বিত’ সেই শেখ সাদি শিরাজ়ি আর খ্বাজা শামসুদ্দিন মোহাম্মদ হাফিজ় শিরাজ়ি যেখানে ‘চিরবিশ্রামে শয়ান’ সেখানে সশরীরে উপস্থিত হয়েছিলেন বাংলার শ্রেষ্ঠ কবি। ভাষণে বলেছিলেন:

    বঙ্গাধিপতি একদা কবি হাফেজকে বাংলায় নিমন্ত্রণ করেছিলেন, তিনি যেতে পারেন নি। বাংলার কবি পারস্যাধিপের নিমন্ত্রণ পেলে, সে নিমন্ত্রণ রক্ষাও করলে এবং পারস্যকে তার প্রীতি ও শুভকামনা প্রত্যক্ষ জানিয়ে কৃতার্থ হল।

    কোনও এক বঙ্গাধিপতির একদা কবি হাফিজ়কে বাংলায় নিমন্ত্রণ এ নিবন্ধের আলোচ্য বিষয়। রবীন্দ্রনাথের এই সংক্ষিপ্ত ভাষণ থেকেই অনুমান করা যায় যে বাংলার সঙ্গে পারস্যের সম্পর্ক, বিশেষত সে দেশের ভাষা ও কাব্য-সাহিত্যের অনেক খুঁটিনাটি বিষয়ের সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ পরিচয় ছিল। বস্তুত, ওই ভাষণে প্রতিফলন ঘটেছে সহস্রাধিক বছরব্যাপী সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের। যে লেনদেনের গভীর প্রভাব পড়েছিল বাংলার ভাষা, সাহিত্য আর জীবন দর্শনে।

    ত্রয়োদশ থেকে ষোড়শ শতাব্দের শেষভাগ পর্যন্ত বাংলার স্বাধীন সুলতানদের আমলে আরবি ছিল বাংলার মুসলমানদের ধর্মীয় ভাষা। আর ফারসি ছিল রাজ-সরকারের ভাষা। ফারসি রাজভাষা হলেও গৌড়ের স্বাধীন সুলতানরা দেশজ ভাষা বাংলার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। শাসকের উদারনীতির ফলে হিন্দুরা উচ্চ রাজপদে চাকরি নেন এবং তাঁদের অনেকেই ফারসি শেখেন। সেই সময় থেকেই মুসলমান শাসনের প্রভাবে বাংলায় আরবি-ফারসি ও তুর্কি শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটতে থাকে। মধ্যযুগের কবি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে লিখছেন:

    মানসিংহ পাতশায় হৈল যে বাণী।
    উচিত যে আরবী পারসী হিন্দুস্থানী॥
    পড়িয়াছি সেই মত বর্ণিবারে পারি।
    কিন্তু সে সকল লোকে বুঝিবারে ভারি॥
    না রবে প্রসাদ গুণ না হবে রসাল।
    অতএব কহি ভাষা যাবনী মিশাল॥

    ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যের ভাষা আরবি-ফারসির মিশেলে হয়ে উঠেছিল ‘যাবনী মিশাল’!

    পাঠান যুগের অবসানের পরে মোগল রাজত্বে প্রায় ১৮০ বছর ধরে বাংলায় রাজভাষা ফারসি চর্চার ব্যাপক প্রসার ঘটে। ড. মুহাম্মদ এনামুল হক ‘মুসলিম বাংলা সাহিত্য’ কেতাবে লিখছেন:

    মুদ্রার পৃষ্ঠে ফারসী, মসজিদ-গাত্রে ফারসী, গৃহ নির্মাণ লিপিতে ফারসী, শাহী ফরমানে ফারসী, আদালতে ফারসী, রাজস্ব বিভাগে ফারসী, শিক্ষা-দীক্ষা ও আলাপ-আলোচনায় ফারসী দেদার চলিতে লাগিল। বিদ্যাবত্তা, চাকরি-বাকরি এমনকি সভ্যতা-ভব্যতার মাপকাঠিও অচিরেই ফারসী হইয়া উঠিল। অগত্যা বাংলার হিন্দু-মুসলমান সকলেই ফারসী শিখিতে শুরু করিলেন।

    ১৮৩৭-এ আইন করে ফারসির বদলে ইংরেজিকে সরকারি কাজকর্মের ভাষা ঘোষণা না করা পর্যন্ত কোম্পানির শাসনের প্রথম ৮০ বছর সরকারি কাজে, বিশেষত স্থানীয় জনগণের সঙ্গে যোগাযোগের ভাষা হিসেবে, ফারসির প্রভাব অক্ষুণ্ণ ছিল। মুসলমান আলিম-ফাজ়িলরা ছাড়াও রামরাম বসু, রামমোহন রায়, তারিণীচরণ মিত্র, রামকমল সেন, রাধাকান্ত দেব, দ্বারকানাথ ঠাকুর, রাজনারায়ণ বসুর মত উচ্চবংশীয় হিন্দুরাও উত্তম ফারসি জানতেন। ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। প্রিন্স দ্বারকানাথ সব নথিপত্রে ফারসিতে নাম সই করতেন। রবীন্দ্রনাথের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর হাফিজ়ের কাব্যের গুণগ্রাহী ছিলেন। কবি হাফিজ়ের সম্পূর্ণ ‘দিওয়ান’ নাকি তাঁর কণ্ঠস্থ ছিল। মৃত্যুশয্যায় তিনি হাফিজ়ের একটি বিখ্যাত গজ়লের লাইন অস্ফুটে বলতে বলতে মারা যান। ‘আলাইয়্যা আইয়োহাস্‌ সঘি আদির কাস্‌সান ভা নভিল্‌হা’ ( الا یا ایها الساقی ادر کأساً و ناولها) – সে গজ়লটিই কবি নজরুল ইসলামের অনুবাদে পড়ি – ‘হাঁ, এয়্‌ সাকি শরাব ভর লাও বোলাও পেয়ালী চালাও হরদম্‌’।

    তবে, বাংলার সঙ্গে ফারসি কাব্য-সাহিত্যের যোগাযোগ নিয়ে সবচেয়ে চিত্রাকর্ষক যে কাহিনীটি আছে তার বর্ণনা দিতে গিয়ে উর্দু কবি-সমালোচক আলি সরদার জাফরি লিখছেন ইরান থেকে বাংলায় পৌঁছোতে ফারসি কাব্যজগতের খ্যাতনামা কবি হাফিজ় শিরাজ়ির ৬০০ বছর লেগেছিল। বাংলায় ইলিয়াস শাহী সুলতানদের মধ্যে তৃতীয় সিকান্দার শাহের পুত্র গ়িয়াসউদ্দিন আজ়ম শাহ ১৩৬৬-৬৭-তে সিংহাসনে বসে নাকি পারস্যের কবি হাফিজ়কে তাঁর দরবারে আসার আমন্ত্রণ পাঠিয়েছিলেন। হাফিজ় এর আগে দাক্ষিণাত্যের সুলতান মাহমুদ শাহ বাহমানির নিমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করলেও এবং এই দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করে আসার ব্যাপারে কোনও আগ্রহ না দেখালেও বাংলার সুলতানের আমন্ত্রণের উত্তরে তিনি যে একটি গজ়ল লিখে পাঠিয়েছিলেন তা কিন্তু মোটামুটি স্বীকৃত। সরদার জাফরি আরও বলেছেন যে বাংলার তৎকালীন সুলতান এবং তাঁর সভাসদদের মধ্যে অনেকেরই হয়তো ফারসি ভাষায় ব্যুৎপত্তি থাকার কারণে তাঁরা সে গজ়ল পাঠ করে আনন্দ পেয়েছিলেন। তবে বাংলার জনসাধারণের কাছে হাফিজ় শিরাজ়ির গজ়লের মিষ্টি স্বাদ তখনই পৌঁছোল যখন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় হাফিজ়ের কাব্যের নির্বাচিত সংকলনের বাংলা অনুবাদ করলেন এবং তা প্রকাশিত হল। স্থান কালের দূরত্ব ঘুচিয়ে পারস্য আর বাংলার দুই কবির আত্মিক মিলন সম্পন্ন হল। তা হলে কি আরও বহু বছর আগে ১৯৩০-এ কাজী নজরুল ইসলাম অনূদিত ‘দীওয়ান-এ হাফিজ়়’ অথবা ব্রাহ্ম সমাজের বিশিষ্ট পণ্ডিত গিরিশচন্দ্র সেনের হাফিজ়ের কবিতার অনুবাদ সরদার জাফরির নজর এড়িয়ে গিয়েছিল?

    হোসেন শাহী বাংলার বর্ণনা দিতে গিয়ে মোমতাজুর রহমান তরফদার লিখেছেন যে ফারসি ভাষার সঙ্গে সুলতান-নবাবদের দরবারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রইলেও বাংলার সাধারণ মানুষের জীবনে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব তেমন পড়েছিল বলে মনে হয় না। গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যসৃষ্টিতেও তার কোনও অবদান পরিলক্ষিত হয়নি। বাংলার ইতিহাস চর্চায় ফারসির উল্লেখ একদিকে পরিব্রাজক, সুফিসন্ত, ভাষাবিদ পণ্ডিত আর একদা রাজনীতির শীর্ষস্থানে থাকা ব্যক্তিত্বদের দেওয়া বর্ণনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আর এর অপরদিকে আছে বাংলায় পারসিক সাংস্কৃতিক সত্তার প্রকাশের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিরোধের আখ্যান। কিন্তু এ সত্ত্বেও সম্ভবত সুলতানি আর মোগল আমলের বাংলায় শাসকবর্গ ফারসি সাংস্কৃতিক আধিপত্য জারি করার প্রয়াসের ফলস্বরূপ বাংলা ভাষায় বহু ফারসি শব্দের আমদানি ঘটে।

    এই প্রেক্ষাপটে ভাবলে অবাক হতে হয় যে দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমান শাসকদের দরবারের ফারসিয়ানার দ্যোতক হয়ে উঠবে হাফিজ় শিরাজ়ির এই শেরটি:

    شِکَّرشِکن شَوَند همه طوطیانِ هند
    زین قندِ پارسی که به بَنگاله می‌رود

    শক্কর শিকন্‌ শভন্দ হমে তুতিয়ন-ই-হিন্দ
    জ়ি-ন ক়ন্দ-ই ফারসি কে বে বংগলে মি রভাদ

    ভারতবর্ষে আছে যত তোতা
    সবাই মধুর রসের রসিক
    কেননা চালান যায় বাংলায়
    যে মিষ্টান্ন সব পারসিক।

    বিষয়টির মধ্যে অবশ্যই অপ্রত্যাশিত এক চমক আছে। এটা বলাই বাহুল্য যে হয়ত তারই আকর্ষণে প্রায় সমসাময়িক ইতিহাসবেত্তা আর সাহিত্য সমালোচকেরা হাফিজ় শিরাজ়ির গজ়লটি রচনার নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নির্ধারণের প্রয়াসে ব্রতী হন। বাংলার সুলতানি যুগে পারসিক সংস্কৃতির প্রভাব এবং এই অঞ্চলের শাসকের দরবারে ফারসি সাহিত্যের গুরুত্বের প্রেক্ষাপটে হাফিজ়ের কবিতাটি বাংলার সঙ্গে পারস্যের যোগাযোগের সূত্র প্রতিষ্ঠায় একটি মাইলফলক হিসেবে গুরুত্ব পেতে থাকে। শুধু বাংলায় ফারসি ভাষা-সাহিত্যের চর্চাই নয়, বরং ভারতবর্ষে পারস্যের কবিদের পৃষ্ঠপোষণের ভৌগোলিক পরিধির সম্প্রসারণ এবং তাতে বাংলার সংযুক্তিতে এই একটি কবিতা এবং সংশ্লিষ্ট ভাষ্যের প্রতি আগ্রহ যে দিকনির্দেশক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল তা নিয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই।

    বিভিন্ন যুগে ইতিহাসবেত্তারা হাফিজ়ের এই গজ়লটির প্রেক্ষাপট নির্ধারণে যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তার ইতিহাসটাও বেশ জটিল। সে জটিলতার মধ্যে না ঢুকে আগে ওই গজ়লের ‘মক্‌তা’ (গজ়লের অন্তিম শের যেখানে কবির তখল্লুস, অর্থাৎ ছদ্মনাম উল্লেখ করা হয়) অংশে কবি কী বলছেন তা একবার পড়ে নেওয়া যাক:

    حافظ ز شوقِ مجلس سلطان غیاثِ دین
    غافل مشو که کارِ تو از ناله می ‌رود

    হাফিজ় জ় শৌঘ-এ মজলিস্‌ সুলতান গ়িয়াস দিন
    গ়াফিল মশভ কে কার-এ তো আজ় নালে মি রভাদ

    হায় সুলতান গিয়াসুদ্দিন!
    হাফিজ়, তোমার বড় অভিলাষ
    তাঁর দরবার। নীরব থেকো না;
    কান্নাই জেনো মেটাবে সে আশ।

    কে এই সুলতান গ়িয়াসউদ্দিন? এক রাশ আরবি আর ফারসি নথিপত্র থেকে জানা যায় যে গ়িয়াসউদ্দিন আজ়ম শাহ ১৪১০-এ মক্কায় ‘মাদ্রাসা আল-বাঙ্গালিয়া’ নামে চিরাচরিত আরবি শিক্ষার বিদ্যালয় স্থাপন করেন। বাংলার সুলতান হিসেবে বহুদূর দেশে আরবি শিক্ষার পৃষ্ঠপোষণ সম্ভবত বৃহত্তর ইসলাম সমাজে গ়িয়াসউদ্দিনের মর্যাদা বাড়িয়ে তুলেছিল। বস্তুত, গোলাম আলি আজ়াদ বিলগ্রামি (১৭০৪-৮৪) ফারসি-আরবি ঐতিহাসিক নথিপত্র থেকে অঢেল তথ্য সংগ্রহ করে দেখিয়েছেন যে মক্কার মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা গ়িয়াসউদ্দিন আজ়ম শাহের সঙ্গে ফারসি কবি হাফিজ় শিরাজ়ির চিঠিপত্রের আদান প্রদান হয়েছিল। বিলগ্রামি ‘খাজ়ানা-ই-আমিরা’ নামে বিখ্যাত মনীষীদের জীবনীর যে অভিধানটি সংকলন করেছিলেন তাতে ‘ভারতীয় তোতা’ (তুতিয়ান-এ-হিন্দ) সম্পর্কিত শেরটি উদ্ধৃত করে বাংলার সুলতান গ়িয়াসউদ্দিনের উল্লেখ করেছেন। আরবি ভাষায় রচিত মক্কার ইতিহাসে (তারিখ-এ-মক্কা) মাদ্রাসা আল-বাঙালিয়া বিষয়ক অংশটির ফারসি অনুবাদও তিনি দিয়েছেন।

    হাফিজ়ের গজ়লটি শুরু হচ্ছে মনোরম একটি বাগানের দৃশ্য দিয়ে:

    ساقی حدیثِ سرو و گل و لاله می‌رود
    وین بحث با ثَلاثهٔ غَسّاله می‌رود

    সঘি হদিস্‌-এ সরভ ও গুল ও লালে মি রভাদ
    ভিন্‌ বেহস্‌ ব সালাসেই গ়সালে মি রভাদ

    শোন সাকি, বলি তাদের গল্প
    সরুঝাউ, গজসুন্দী, গোলাপ --
    স্নান করানোর তিন মেয়ে; চলে
    তাদের সঙ্গে এ নিয়ে আলাপ

    দ্বিতীয় স্তবকের নববধূই আসলে হাফিজ়ের লেখা কবিতাটি। আর তাকে গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দেবে যে বার্তাবাহক সেই হল ‘ঘটক’:

    مِی ده که نوعروسِ چمن حَدِّ حُسن یافت
    کار این زمان ز صنعتِ دَلّاله می‌رود

    মি দেহ্‌ কে নও অরুস্‌-এ চমন হদ্‌দে হুসন ইয়াফ্‌ত
    কার ইন জ়মান জ় সনাত দল্লালে মি রভাদ

    গোষ্ঠের নববধূটির রূপ
    ফেটে পড়ে, দেখ! ঢালো সুধারস।
    জেনে রেখো, এই জমানায় বেশ
    কাজে লাগে ঘটকের হাতযশ।

    নিবন্ধে পূর্বেই উদ্ধৃত তৃতীয় স্তবকে হাফিজ় বলছেন যে ভারতের কবিরা সব ফারসি সাহিত্যরসিক, না হলে কেনই বা তাঁর কবিতা সুদূর বাংলায় গিয়ে পৌঁছোবে?

    আর বাংলার সুলতান গ়িয়াসউদ্দিনই বা কেন সুদূর পারস্যে এক কবিকে চিঠি লিখতে গেলেন? মুঘল আমলের নথি ও কেতাবে হাফিজ়ের গজ়লটির দুটি উল্লেখ পাওয়া যায়। আবুল ফজ়ল (১৫৫১-১৬০২) আইন-ই-আকবরি-তে বাংলার শাসকদের পর্যালোচনা করতে গিয়ে হাফিজ়ের গজলের সংক্ষিপ্ত উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন। এছাড়াও আল্লাহ্‌দাদ ফয়জ়ি সিরহিন্দি তাঁর ‘মদার-আল আফাজ়িল’ (১৫৯৫) অভিধানে হাফিজ়ের ‘সলাসে গ়সালা’-র ব্যাখ্যা করেছেন। সেই ব্যাখ্যায় সুলতান মুহম্মদ ইবন মুহম্মদ হারাউই ‘ফখ়রি’ সংকলিত ‘রওজ়ার-আল সালাতিন’ (১৫৫১-৫৫) থেকে একটি কাহিনীর উল্লেখ করা হয়েছে। সেটি এই রকম:

    ‘বাংলার সুলতান গ়িয়াসউদ্দিন রাজদরবারের বহু কবির পৃষ্ঠপোষক এবং শিল্পসাহিত্যের রক্ষাকর্তা ছিলেন। তাঁর এক মন্ত্রীর তিন পুত্রের নাম ছিল সরভ, গুল আর লালে। সুলতান যুবকদের অত্যন্ত স্নেহ করতেন। তাদের সৌন্দর্য এবং মেধা ক্রমশই আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে দেখে একদিন সুলতান এই বয়েৎটি লিখে ফেললেন – ‘সঘি হদিস্‌ সরভ ও গুল ও লালে মি রভাদ’ – ‘শোনো সাকি, বলি তাদের গল্প / সরুঝাউ, গজসুন্দী, গোলাপ’। লিখে ফেলে সুলতানের সেটি খুব পছন্দ হয় এবং তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন যে গজ়লটি সম্পূর্ণ করার অনুরোধ জানিয়ে তাঁর এক মন্ত্রীকে শিরাজ়ে কবি হাফিজ়ের কাছে পাঠাবেন। বার্তাবাহক জাহাজে চেপে সমুদ্রযাত্রা করলেও ঝড়ের মধ্যে পড়ে এবং জাহাজটি হওয়ার ঝাপটায় পথ হারায়। বছরভর সমুদ্র ভ্রমণের পরে অবশ্য সুলতান গ়িয়াসউদ্দিনের দূত শেষ পর্যন্ত শিরাজ়ে পৌঁছে কবি হাফিজ়ের হাতে উপহার তুলে দিয়ে সুলতানের অনুরোধটি পেশ করেন। পরদিন সকালে কবি হাফিজ় গজ়লটি সম্পূর্ণ করে তাঁকে দিলে সুলতানের দূত বাংলায় ফিরে আসেন।’

    উপরোক্ত বর্ণনাটি পাঠ করলে সহজেই অনুমান করা যায় হাফিজ় কেন এমন একটি গজ়ল লিখেছিলেন। তবে লেখার পশ্চাৎপটের কাহিনী -- যা গজ়লে ব্যবহৃত দৃশ্যাবলীকে আরও স্পষ্ট করে তুলতে পারে -- জানার কৌতূহল নতুন নয়। চিরহরিৎ সাইপ্রাস, গোলাপ আর টিউলিপসহ বসন্তের বাগানের যে চিরাচরিত দৃশ্য দিয়ে কবিতার সূচনা তার পিছনে আসলে আছে বাস্তব এক কাহিনী যেখানে বাগানের গাছ-ফুল-পাতা হল সুদূর বঙ্গদেশে রাজদরবারের মানুষজন।

    উপরোক্ত বর্ণনাটির আরেকটি রূপ পাওয়া যায় হাফিজ়ের ‘দিওয়ান’ এর খাতমি লাহওরি-কৃত ব্যাখ্যানে:

    ‘হিন্দ এর শাসক সুলতান গ়িয়াসউদ্দিন বাংলা জয় করার পরে অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাজদরবারের হাকিমদের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও শরীর যেন আর কিছুতেই সারে না। হতাশাগ্রস্ত সুলতান হারেমের তিন প্রিয় রক্ষিতাকে আদেশ করলেন যাতে তাঁকে উত্তমরূপে স্নান করানো হয়। সরভ, গুল আর লালে নামের সেই তিন বাঁদী তাঁকে স্নান করানোর পরে সুলতান বাস্তবিকই সুস্থ বোধ করলেন। স্বাভাবিকভাবেই ওই তিন রমণী সুলতানের নয়নের মনি হয়ে উঠল। পরিণামে হারেমের অন্যান্য মেয়েরা ঈর্ষাবশত ওই তিনজনকে ‘গ়সালে’ (স্নান-সহায়িকা) বলে ডেকে ঠাট্টা করত। বিষয়টি সুলতানের কানে এলে তিনি তৎক্ষণাৎ ‘সঘি হদিস্‌ সরভ ও গুল ও লালে মি রভাদ’ বয়েৎটি লিখে ফেলেও শেরটি সম্পূর্ণ করতে পারেননি। তখন সুলতান সভাকবিদের ডেকে ওই বয়েতের আদলে একটি গজ়ল লেখার আদেশ দেন। তবে সভাকবিকুল সুলতানকে সন্তুষ্ট করতে অপারগ হলে তিনি প্রভূত উপঢৌকনসহ সিরাজের তৎকালীন খ্যাতনামা কবি হাফিজ়ের কাছে দূতের মাধ্যমে এই অনুরোধ পাঠান যে কবি যেন তাঁর দরবারে এসে শেরের দ্বিতীয় লাইনটি লিখে দিয়ে যান! হাফিজ় অবশ্য ‘সোনারগাঁ’য় আসেননি, তিনি সুলতান রচিত বয়েতের সঙ্গে একটি দ্বিতীয় লাইন – ‘ভিন্‌ বেহস্‌ ব সলাসেই গ়সালে মি রভাদ’ -- অর্থাৎ, শোনাই তবে স্নান করানোর তিন মেয়ের গল্প -- জুড়ে দেন। এই শেরটিকে মিস্‌রা-এ-তরাহ্‌ (অর্থাৎ সেই পঙ্‌ক্তি দুটি যাদের আধার ধরে গজ়ল বা কবিতার বাকি পঙ্‌ক্তিগুলি রচিত হয়) ধরে নিয়ে কবি হাফিজ় একটি সম্পূর্ণ গজ়ল রচনা করে দূতের হাতে দিয়ে তাঁকে সুলতানের দরবারে ফিরে যেতে বলেন।’

    এই দ্বিতীয় কাহিনীটি পড়লে মনে হবে যে কবি অজান্তেই সরভ্‌, গুল আর লালেকে স্নান করানোর মেয়ে ‘সলাসে-এ-গ়সালে’ ধরে নিয়েই গজ়লটি রচনা করে ফেলেন যেখানে প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে কোনও ধারণা তাঁর থাকার কথা নয়। সুলতানকে উপহার হিসেবে পাঠানো এই পদ্যকে তাই অনেকে শিরাজ়ের অমর মরমিয়া কবির অলৌকিক আত্মিক সিদ্ধির প্রমাণ হিসেবে গণ্য করেন। তাঁর কাব্যের গভীর আধ্যাত্মিক অর্থ এবং এই অতীন্দ্রিয় জ্ঞানের জন্যই হাফিজ়কে আরবিতে লিসান আল-গ়াইব (لسان الغیب), অর্থাৎ ‘অদৃশ্যের কণ্ঠস্বর’ বলে অভিহিত করা হয়েছে।

    এক রাতের মধ্যে ফরমায়েশি গজ়ল লিখে সুলতানের দূতের হাতে দিয়েছিলেন কবি হাফিজ়। গজ়লের একটি শের-এ তিনি বলছেন:

    طِیِّ مکان ببین و زمان در سلوکِ شعر
    کاین طفل یک شبه رَهِ یک ساله می ‌رود

    তই-এ মকান বেবিন ভা জ়মান দর সুলুক-এ শের
    কিন তফ্‌ল ইক শবে রাহ্‌ ইক সালে মি রভাদ

    অর্থাৎ দেখো, স্থান কালের বাধা অতিক্রম করে কবিতা কত দ্রুত ধায়! এই এক রাতের শিশুটি এখন ভ্রমণ করে চলবে বছরভর! এখানে এক রাতের শিশু হল হাফিজ়ের লেখা গজ়ল আর বছরভরের ভ্রমণ শিরাজ় থেকে বঙ্গদেশের দূরত্ব নির্দেশ করছে।

    হাফিজ়ের গজ়লটির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নির্ধারণের তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ হল তৎকালীন পারসিক সংস্কৃতির সম্প্রসারণ আর নতুনতর ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করে তার দিকবিদিকে ছড়িয়ে পড়া। বৃহত্তর ভৌগোলিক পরিধি জুড়ে ফারসি ভাষায় রচিত কাব্যের আদান-প্রদান সম্পর্কে এই কবিতাটি আমাদের সচেতন করে তোলে। চতুর্দশ শতাব্দের শেষার্ধ্ব থেকে পঞ্চদশ শতাব্দের প্রথমার্ধ্ব পর্যন্ত বঙ্গদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সত্তার স্বীকৃতি হিসেবে গণ্য করতে হবে সুদূর পারস্য দেশের কবির পদ্যে ‘বঙগলা’-র উল্লেখ। আর পারস্পরিক সেই সম্পর্কের উত্তরাধিকারী আমাদের আ-মরি বাংলা ভাষা আজও হাফিজ়ের পারসিক মিঠাইয়ের রসে সিক্ত।


    [এই নিবন্ধে হাফিজ়ের গজ়লের বাংলা অনুবাদ কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘হাফিজের কবিতা’ (১৯৮৪) থেকে গৃহীত।

    সূত্র নির্দেশ:

    ১) বাংলা ভাষায় আরবী ফার্‌সী তুর্কী হিন্দী উর্দু শব্দের অভিধান: কাজী রফিকুল হক

    ২) মুসলিম বাংলা সাহিত্য: ড. মুহাম্মদ এনামুল হক

    ৩) Hafiz Shirazi: Sardar Jafri

    ৪) Hafiz Shirazi and Bengal: Prof. M Kalim

    ৫) Persian at the Court or in the Village? The Elusive Presence of Persian in Bengal: Thibaut d’Hubert

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments