




নতুন বই হাতে নিয়ে তার গন্ধ শোঁকার অভ্যাস ছিল আমার দাদার। চোখ বন্ধ করে, ঠোঁটের কোনায় হালকা হাসি টেনে বইয়ের সঙ্গে পরিচয়ের প্রথম পর্ব শেষ করে সে মন দিতো তার প্রচ্ছদে। দাদা বলতো ‘প্রচ্ছদটি আকর্ষণীয় হবে, আবার বইয়ের বিষয়বস্তুর সঙ্গে তার সাযুজ্যও থাকবে।’ তাই, ছোটবেলা থেকে আমি যেকোনও বই পড়বার আগে তার প্রচ্ছদটি যত্ন করে দেখি। একটু বড় হয়ে দাদার দেখাদেখি আমিও প্রচ্ছদ দেখে চিনতে চেষ্টা করতে থাকি প্রচ্ছদশিল্পীদের। সেইভাবেই পরিচিত হই বিখ্যাত শিল্পীদের নামের সঙ্গে, তাঁদের আঁকা ছবির বিশেষত্বের সঙ্গে। আমার ছোটবেলার এক আদরণীয় পত্রিকা ছিল সন্দেশ। তার আকর্ষণীয় প্রচ্ছদের মাধ্যমে আমি প্রথম জানতে পারি সত্যজিৎ রায় শুধু চিত্রপরিচালক ও লেখক নন, তিনি একজন চিত্রশিল্পীও বটেন। বড় হয়ে জেনেছিলাম প্রচ্ছদ তৈরিতে তাঁর অবদানের কথা। সংক্ষেপে সেকথা বলি:
১৯৪৩ সালে কমার্শিয়াল আর্টিস্ট হিসেবে সত্যজিৎ রায়ের কর্মজীবন শুরু হয় এক বিজ্ঞাপন সংস্থায়। সেই বছরেই বইয়ের প্রচ্ছদ তৈরির দায়িত্ব নিয়ে তিনি যুক্ত হন প্রকাশনা সংস্থা সিগনেট প্রেস-এর সঙ্গে। বলা হয়, অক্ষর বিন্যাসের বিশেষ শৈলী ও প্রেক্ষাপটের বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবহারের মাধ্যমে অল্প দিনেই তিনি ঐ বিষয়ে আধুনিকতা ও অভিনবত্ব নিয়ে আসেন। সেই সময়ে সত্যজিৎ রায় যে বইগুলোর প্রচ্ছদ নির্মাণ করেছিলেন তার মধ্যে আছে জওয়াহরলাল নেহরু রচিত The Discovery of India, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের চাঁদের পাহাড় এবং জীবনানন্দ দাশের রূপসী বাংলা ও বনলতা সেন । প্রসঙ্গত, বনলতা সেন-এর প্রচ্ছদটি বহুচর্চিত কিন্তু কবি নিজে তাই নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘আমার বনলতা সেন দেখে আমি অত্যন্ত হতাশ হয়েছি। এত খারাপ প্রচ্ছদপট আমি জীবনে দেখিনি।’
যাহোক, পরবর্তী জীবনে সত্যজিৎ রায় নিজের লেখা বই ছাড়াও অন্যান্য বই ও বিভিন্ন সাহিত্য-পত্রিকার প্রচ্ছদ আর নিজের চলচ্চিত্রের পোস্টার ও পরিচয়-লিপিতে তাঁর অনবদ্য শিল্পীসত্তার পরিচয় রেখে গিয়েছেন। ১৯৪৫ সালে বিভূতিভূষণের উপন্যাস পথের পাঁচালি-র কিশোর সংস্করণ আম আঁটির ভেঁপু-র প্রচ্ছদ ও তার ভেতরের অলংকরণ নিয়ে কাজ করবার সময় সত্যজিৎ রায় অনুভব করেন কাহিনিটির মধ্যে চলচ্চিত্রে রূপায়িত হবার উপাদান রয়েছে। সেই বোধ এমন গভীর ছিল যে চলচ্চিত্র-নির্মাণ বিষয়ে কোনো অভিজ্ঞতা না থাকলেও একসময় পথের পাঁচালি-র কাহিনি নিয়ে তিনি একটি চলচ্চিত্র তৈরি করা শুরু করেন। নানা ঝড়ঝঞ্ঝা কাটিয়ে অবশেষে ১৯৫৫ সালে পথের পাঁচালি মুক্তি পায়; সূচনা হয় প্রচ্ছদশিল্পী সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রকার হিসেবে জয়যাত্রার।
এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে পূর্ণেন্দু পত্রীর কথা। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই মানুষটি পরিচিত ছিলেন কবি, লেখক, সম্পাদক, চলচ্চিত্র পরিচালক এবং বিশেষ করে প্রচ্ছদশিল্পী হিসেবে।
এবার আসি প্রচ্ছদের ব্যবহারিক প্রয়োগের প্রসঙ্গে। আমি যখন স্কুলে পড়তাম, বইখাতার স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য তাতে আমাদের মলাট দিতে হতো কিন্তু স্কুল থেকে তার জন্য দামি ব্রাউন পেপার কিনতে হবে এমন কোনও অনুশাসন ছিল না। আমার ক্লাসের বামপন্থী পরিবারের মেয়ে মানসীর বাড়িতে সোভিয়েত দেশ নামে এক সাময়িক পত্রিকা আসতো। মানসী সোভিয়েত দেশ-এর প্রচ্ছদ দিয়ে ওর বইখাতায় মলাট দিতো। সেইসব মলাটের দৌলতে আমরা সোভিয়েত রাশিয়ার নেতা থেকে সেখানকার নানা অঞ্চলের লোকশিল্পের সঙ্গে পরিচিত হতাম। আরেক বান্ধবী মহুয়ার অভ্যাস ছিল দেশ পত্রিকার প্রচ্ছদ দিয়ে মলাট দেওয়ার। রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়, ইন্দ্র দুগার ইত্যাদি নামকরা শিল্পীদের আঁকা ছবি বছর-ভর শোভা পেত ওর ইতিহাস বই বা ইংরিজি রচনার খাতায়। এক বিখ্যাত প্রবন্ধকারের কথা জানি যিনি প্রচ্ছদের এই ধরনের ব্যবহারিক প্রয়োগের ভয়ে বইয়ের ওপর নিজের ছবি দিতেন না। তাঁর আশঙ্কা ছিল যে পাঠক সেই বইটিকে চায়ের কাপ রাখবার জন্য ব্যবহার করবেন ও অল্পদিনেই গোল গোল চায়ের দাগে তাঁর ছবি ভরে যাবে!
বর্তমানে যেকোনো পণ্যের বহিরঙ্গের রূপকে আকর্ষণীয় করে তুলতে নির্মাতারা বিশেষ মনোযোগী। ধূপকাঠি থেকে ফ্ল্যাটবাড়ি, সব কিছুরই মোড়ক হতে হবে নয়ন-ভোলানো আর তাইতো বিজ্ঞাপনের সঙ্গে সঙ্গে ‘প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রি’-রও আজকাল এমন রমরমা। সেদিন আমার এক শৌখীন আত্মীয়া আমাকে ছোটখাট একটি ব্রিফকেস উপহার দিয়ে বললেন, ‘তোমার জন্য ভেষজ চা এনেছি’। আমি হাঁ হাঁ করে বলতে যাচ্ছিলাম ‘এত চা এনেছো! এ আমি কতদিনে শেষ করবো!’ ভাগ্যিস বলিনি কারণ উপহারটি খুলে দেখি তাতে বারোটি খোপে রয়েছে মাত্র বারো খানা টী ব্যাগ!
নাট্যশাস্ত্রে যথাযথ সাজসজ্জাকে ভাব প্রকাশের মাধ্যম করার কথা বলা আছে। কিন্তু সংগীতের জগতে এতদিন বহিরঙ্গের রূপ নিয়ে মাতামাতি দেখিনি। পপ্-জ্যাজ ধারার সংগীত পরিবেশন করবার সময়েও ঊষা উত্থুপ বা আশা ভোঁসলেকে কখনও শাড়ি ছাড়া অন্য পোশাকে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। তেমনই লোকগীতি-শিল্পী নির্মলেন্দু চৌধুরী বা অমর পালকে চিরকাল ধুতি-পাঞ্জাবি পরাই দেখেছি। অথচ আজকাল দু’ কলি গাইতে শিখেই লোকগীতির শিল্পীরা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মাথায় পাগড়ি বাঁধছেন, কীর্তন গাইলে তাঁরা আসরে আসছেন ধড়া-চূড়া পরে আর বাউল-গান পরিবেশন করতে হলে কেউ মাথায় রাখছেন লম্বা জটা আবার কেউ বা পরছেন তালি দেওয়া জোব্বা।
অগত্যা নিজেই এখন নিজেকে বোঝাই, বর্তমান যুগের অতিব্যস্ত জীবনযাত্রায় আস্তে-ধীরে রূপ থেকে গুণে পৌঁছনোর সময় গিয়েছে কমে আর তাই প্রেম থেকে শিল্প সব কিছুরই গুণাগুণ বিচার হয় এক লহমায়। ফলে, এখন বহিরঙ্গকে আকর্ষণীয় করে তোলার দিকে সবাই মনোযোগী আর সময়ের ঘূর্ণিপাকে অনেকেরই জীবনের মূলমন্ত্র হয়ে উঠেছে ‘আমি রূপেই তোমায় ভোলাবো…!’