




হাওড়া থেকে ট্রেন ছেড়েছে এক ঘন্টা আগে। অনেক সবুজ মাঠ আর খেত দেখার পর, ট্রেন এখন বর্ধমান স্টেশনে ঢুকছে। সোমনাথ ঘড়িটা একবার দেখল। সকাল এগারোটা। একটু আগে শক্তিগড় পেরোনোর সময় থেকেই সোমনাথের খিদে পাচ্ছে।
স্টেশনে ট্রেন থামতেই একটা ঝালমুড়ি-ওয়ালা ট্রেনে উঠল। সোমনাথ এক ঠোঙা উপাদেয় শসা-পেঁয়াজ-মাখা মুড়ি কিনল। তাতে নারকোল, আলুসেদ্ধ, লংকা, ধনেপাতা, তেঁতুলের চমৎকার মিলন। খেতে খেতেই কয়েক মিনিটের মধ্যে আবার ট্রেন ছেড়ে দিল। সবুজ পৃথিবী আবার দেখা দিল জানলা দিয়ে। কলকাতার দৈনন্দিন জীবনের পর এই সবুজে চোখ আরাম পায়।
সোমনাথ ভাবল যে অনসূয়া বোধহয় এখনো ঘুমোচ্ছে কলকাতার বাড়িতে। বারোটার আগে সাধারণত ওঠে না। সারা রাত টিভি দেখে। ঘুমোয় শেষরাতে। সোমনাথ যখন ভোরবেলা বেরিয়েছে তখন অনসূয়া বাইরের ঘরে আরামকেদারায় ঘুমোচ্ছিল। কোনো শব্দ না করে সোমনাথ ছোট একটা ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে এসেছে।
সারা রাত ঘুম হয়নি সোমনাথের। একটা অসহ্য ভার ওর বুকের উপর চেপে বসেছিল যেন। ব্যথাটা মূলে মানসিক। কিন্তু তার একটা শারীরিক প্রকাশ আছে। কীসের ব্যথা সেটা বলে বোঝানো যাবে না। বা বলতে গেলে অনেক সময় লাগবে, অনেক উদ্যম লাগবে। সোমনাথের আজকাল এত ক্লান্ত লাগে যে বুকের উপর এই ভার-বোধটা কেন, সেই কারণটা না বোঝাই শ্রেয় মনে হয়। সোমনাথ সারা রাত শোবার ঘরে দরজা ভেজিয়ে অন্ধকারে শুয়েছিল। ফ্যানের ঘর্ঘর্ শব্দে বাইরের ঘরের টিভির আওয়াজ শোনা যায় না।
যখন ঘড়ির কাঁটা চার পেরোলো, তখন থেকেই ও অপেক্ষা করছিল প্রথম আলো ফোটার জন্য। আর স্ত্রী অনসূয়া ঘুমিয়ে পড়ার জন্য। আমাদের যখন মনে হয় সময় থেমে গেছে, তখনও সময় আসলে থামে না। শুধু খুব ঢিমে গতিতে চলে, ধৈর্যের খুরে ধার দিতে দিতে।
খুব ভোরে সোমনাথ বিছানা ছেড়ে বাথরুম গেল। বাইরের ঘরে উঁকি মেরে দেখল অনসূয়া আস্তে আস্তে নাক ডাকছে। তারপর একটা ছোট ব্যাগে অল্প জামাকাপড় টুথব্রাশ চটি নিয়ে, জুতো পরে, বাড়ির সদর দরজা খুলে বেরোলো। পেছনে টেনে দিতেই দরজা লক্ হয়ে গেল। তারপর হাওড়া স্টেশন।
এখন ট্রেনে যেতে যেতে সোমনাথ ভাবল - দিনটা মনে হচ্ছে গরম হবে। পঁচিশে বৈশাখ আসছে কয়েকদিনের মধ্যে। বাইরের দিকে তাকালে আকাশে কোনো মেঘ দেখা যাচ্ছে না। এ বছর একটাও কালবৈশাখী হয়নি এখনো অবধি। আজ যদি হয় তাহলে খুব ভালো হবে। আজ কি হবে? আসুক না একটা কালবৈশাখী আজ বিকেলে! ধুলোর ঝড় উঠুক বোলপুরে আর শান্তিনিকেতনের খোয়াইতে। তারপর প্রবল বর্ষায় সব ধুয়ে মুছে যাক্! হবে কি?
অনেকদিন আগের এক কালবৈশাখীর কথা মনে পড়ল সোমনাথের। সেটাও শান্তিনিকেতনে। কত বছর আগে? পঁচিশ বছর?
একটা ফিরিওয়ালা ট্রেনের মধ্যে লজেন্স বিক্রী করতে করতে যাচ্ছে।
টক! ঝাল! মিষ্টি!
এতে কোনো প্রব্লেমের সমাধান নেই!
শুধু আপনার খানিকক্ষণের বন্ধু আছে!
সোমনাথ হিসেব করে দেখল সেইবার শান্তিনিকেতন যাওয়া তার বিয়ের বছর দুই পর। তার মানে পঁচিশ নয়, চব্বিশ বছর আগেকার ঘটনা।
সেবার ওরা চারজন এক সাথে শান্তিনিকেতন বেড়াতে গিয়েছিল গরম কালে, যখন কলকাতার সুস্থমস্তিষ্কের লোকেরা বীরভূম মাড়ায় না। দীপঙ্করের এক মাসতুতো না মামাতো বোনের বাড়ি ছিল গুরুপল্লীতে। বাড়িতে কেউ ছিল না। দীপঙ্কর আর ইন্দ্রাণীর তখন বিয়ে হয়েছে দু’তিন মাস হল। দীপঙ্কর আর সোমনাথ কলেজের বন্ধু। কারুর হাতেই বিশেষ পয়সাকড়ি নেই। কী কারণে মনে নেই – দুজনেরই অফিসে বরাদ্দ ছুটি ছিল। তাই বিনি পয়সায় থাকার সুযোগটা ওরা উপেক্ষা করতে পারেনি।
দু’তিন রাত ছিল ওরা গুরুপল্লীর সেই বাড়িতে। দুটো শোবার ঘর ছিল – কাজেই কোনো অসুবিধা হয়নি। তবে গরম ছিল মারাত্মক আর সন্ধের পর ছিল মশা।
একদিন বিকেলে ওরা বসেছিল গুরুপল্লীর সেই বাড়ির বসার ঘরে। ইন্দ্রাণী সব দরজা জানলা খুলে দিয়েছিল অকারণ খুশিতে। লু-এর মত গরম হাওয়া দিচ্ছিল। তারপর আড্ডা মারতে মারতে কখন জানি হাওয়া থেমে গিয়ে একরাশ কালো মেঘ জড়ো হয়েছিল আকাশে। তারপর উঠল ধুলোর ঝড়। তাড়াতাড়ি জানলাগুলো বন্ধ করতে না করতেই প্রথম কয়েকটা জলের ফোঁটা পড়তে শুরু করেছিল। বাচ্চা মেয়ের মত ইন্দ্রাণী নেচে উঠেছিল। উঠে দাঁড়িয়ে দীপঙ্করের হাত ধরে টেনে বলেছিল, “চলো, বৃষ্টিতে ভিজব।”
ইন্দ্রাণী যখন দীপঙ্করকে টেনে দরজা দিয়ে বার করছিল, দীপঙ্কর সোমনাথকে বলেছিল, “তুইও চল্।”
খুব সম্ভবত অনসূয়াকেও বলেছিল, “তুমিও চলো।”
অনসূয়া রাজী হয়নি। ঠিক কী বলেছিল এত বছর পর আর সে কথা মনে নেই।
সোমনাথের চিরকালই বৃষ্টিতে ভিজতে ভালো লাগে। ও খুশিতে ডগমগ হয়ে দীপঙ্করের পেছনে পা বাড়িয়ে ছিল।
এমন সময় অনসূয়া হঠাৎ সোমনাথের দিকে একটা আধো-অভিমান আর আধো-রাগ মাখা তীক্ষ্ণ গলায় চেঁচিয়ে উঠেছিল, “তাহলে আমি কী করব?”
সবাই থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। সোমনাথ বলেছিল… – কি জানি কী বলেছিল – আর মনে নেই। সঠিক কোনো উত্তর দিতে পারেনি অনসূয়াকে।
ইন্দ্রাণী তাকিয়েছিল সোমনাথের দিকে একটা করুণ সমবেদনা নিয়ে। দুয়েক মিনিট ইতস্তত করে ইন্দ্রাণী আর দীপঙ্কর বেরিয়ে গেছিল কালবৈশাখীর তুমুল বর্ষণে। বাগানের গেট দিয়ে বেরোনোর সময় দীপঙ্কর ইন্দ্রাণীর কোমর জড়িয়ে ধরেছিল। ইন্দ্রাণীর আঁচল ঝড়ের হাওয়ায় উড়ছিল।
সোমনাথ বসে পড়েছিল বারান্দার একটা বেতের চেয়ারে। বসার ঘর থেকে অনসূয়া নড়েনি। বৃষ্টির ছাঁট এসে সোমনাথের পায়ে পড়ছিল। গায় ভিজে হাওয়া লাগছিল। কিন্তু সে সব উপভোগ করার মত মানসিক অবস্থা বোধহয় তখন ছিল না। মন যা চাইছিল তাতে এই অনাবশ্যক বাধা পড়ায় সোমনাথ খানিকটা হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। রাগ হয়েছিল, অভিমান হয়েছিল, সব চেয়ে বেশি হয়েছিল দুঃখ। অনসূয়ার সাথে তখন, বা পরে, এই ঘটনা নিয়ে আর কোনো কথা হয়েছিল কিনা মনে নেই। তাতে এখন আর কিছু যায় আসে না। পৃথিবীতে যখন কালবৈশাখীর অবাধ আনন্দ নেমে এসেছিল, তখন সোমনাথকে ঘিরে ছিল একটা বিষাদ।
শুধু সেই বিকেলটা নয়। আরো অনেক দিন, অনেক মাস, অনেক বছর। সেই রকমই একটা বিষাদ বোধহয় এত বছর ধরে আস্তে আস্তে সোমনাথের দম বন্ধ করে আনছিল। কাল রাতে সেটাই এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছল যে মনে হল এই ভাবে আর বেঁচে থাকা যাবে না।
কতক্ষণ পরে সেদিন দীপঙ্কররা ফিরেছিল মনে নেই। শুধু মনে আছে ওরা ফিরেছিল আপাদমস্তক ভিজে। দুজনেই খুব হাসছিল। ইন্দ্রাণী খিলখিল করে আর দীপঙ্কর মুচকি মুচকি।
ট্রেনের সীটে বসে বসে সোমনাথ ভাবল – কত বছর সেই ঘটনার কথা মনে পড়েনি ওর! কিন্তু ভোলেনি। মস্তিষ্কের মধ্যে কোনো এক ধূসর কোণে স্মৃতিটা সযত্নে রাখা ছিল। দীপঙ্কর মারা গেছে সেও বছর দশেক হল। কারুর সাথেই তখন সোমনাথের বিশেষ যোগাযোগ নেই। তবু কলেজের বন্ধু অতনু ফোন করে খবর দিয়েছিল। সোমনাথ ওদের বাড়ি গিয়েছিল। সেটাই ইন্দ্রাণীর সাথে শেষ দেখা। দু’দিন পর ফোন করে ইন্দ্রাণী শ্রাদ্ধে আসতে বলেছিল। সোমনাথ বলেছিল যাবে। যায়নি।
আহা! আজ যদি আবার কালবৈশাখী নামে বোলপুরের রাস্তায় তাহলে সোমনাথ ভিজবে। চুপচুপে হয়ে ভিজবে মাথা থেকে পা পর্যন্ত। ওকে থামানোর কেউ থাকবে না।
একজন বাউল ঢুকেছে ট্রেনের কামরায়। জোরে জোরে গান গাইছে –
আমার হাত বান্ধিবি
পা বান্ধিবি
মন বান্ধিবি কেমনে
সোমনাথের খুব পছন্দের গান। কিন্তু সমস্যাটা হল লোকটার গলায় একদম সুর নেই। কিচ্ছু করার নেই। যতক্ষণ না লোকটা কামরা অতিক্রম করে পরের কামরায় যাচ্ছে, ততক্ষণ সহ্য করতে হবে। অনেকেরই হয়তো অসহ্য লাগছে। সবাই চুপ করে আছে। দু’ একজন বাউলকে পয়সাও দিল। সোমনাথ অবাক হয়ে ভাবল যারা পয়সা দিল তাদের কি কোনো সুরজ্ঞান নেই? নাকি যাতে বেসুরো লোকটা তাড়াতাড়ি এগিয়ে যায় সেই আশায় পয়সা দিল? বা হয়তো নেহাতই দিল যে ভাবে কোনো ভিখিরিকে পয়সা দেওয়া হয়।
পরান বান্ধিবি কেমনে।
একটু পর ট্রেনটা আবার থামল। সোমনাথ বাইরের দিকে তাকিয়ে স্টেশনের নাম পড়ল – গুসকরা। বোলপুর আর আধঘন্টা মত বাকি।
একটা ফিরিওয়ালা উঠল জল আর কোল্ড ড্রিন্ক্স নিয়ে। সোমনাথ একটা জলের বোতল কিনে এক ঢোকে অর্ধেকটা খেয়ে ফেলল। তারপর বোতলে ছিপি লাগিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকল। ট্রেনটা আবার চলতে শুরু করল। সোমনাথ মনে মনে বলল, যদি ট্যুরিস্ট লজে ঘর না পাওয়া যায়, তাহলে অন্য কোথাও বন্দোবস্ত করতে হবে। তার মানে এই গরমের মধ্যে ঘুরে ঘুরে।
দেখতে দেখতে বোলপুর স্টেশনে ট্রেন থেমে গেল। মানুষের ভিড় ঠেলে প্রথমে ট্রেন থেকে নামা। তারপর ভিড় ঠেলে স্টেশনের বাইরে গিয়ে টোটো ভাড়া করা। তারপর শান্তিনিকেতনের উদ্দেশ্য যাত্রা।
টোটো স্টেশনের বাইরে বেরোতেই সোমনাথ দেখল রাস্তায় বেজায় জ্যাম। অনেক টোটো, অসংখ্য সাইকেল, বিস্তর ঠেলাগাড়ি, কিছু গাড়ি, প্রচুর ছোট ভ্যান, কয়েকটা গরু আর কুকুর – আর এই সবকিছুর মধ্যে বহু পদাতিক মানুষ। টোটোর ভেতর থেকে এক এক সময়ে মনে হচ্ছিল যেন একটা ধাতব অথচ তরল প্রবাহ চলেছে রাস্তা দিয়ে। সোমনাথ সেই স্রোতের একটা অংশ। টোটো বা ভ্যানের লোহার শরীর জীবন্ত মানুষের রক্তের শরীরের খুব কাছাকাছি দিয়ে চলে যাচ্ছে, স্পর্শ করছে না। ঠেলাগাড়ি আর সাইকেলের মাঝখান দিয়ে কুকুর গলে যাচ্ছে। সাবধানী ধাতব গাড়ি আর নির্বিকার মাংসল গরু পাশাপাশি চলেছে কেউ কাউকে না ছুঁয়ে। অনেক আওয়াজ, মানুষের অনেক কথা, গাড়ির হর্ন। কিন্তু আশ্চর্য হল এই যে কারুর কোনো আঘাত লাগছে না। যেন সবার অনেক ধৈর্য! অলৌকিক ভাবে যে যার গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এই গ্রীষ্মের শ্বাস-রোধ-করা দুপুরে।
স্টেশন থেকে একটু দূরে আসার পর ভিড়টা কমে এল। এবার টোটো জোরে ছুটছে। গরম হলেও একটা হাওয়া লাগছে সোমনাথের গায়। মন্দ না। কলকাতার অসহ্য আর্দ্রতা এই হাওয়ায় নেই।
ট্যুরিস্ট লজ এসে গেল। গেট দিয়ে টোটো ঢুকল ভেতরে। ভাড়া মিটিয়ে, ব্যাগ নিয়ে, সোমনাথ রিসেপশনে গেল। ভাগ্য ভালো। একটা ঘর পেয়ে গেল।
ঘরে গিয়ে সোমনাথ ব্যাগ নামিয়ে বাথরুমে গেল। সেখানে মুখ ধুতে ধুতে শুনল ফোন বাজছে। ফোনটা খাটের ওপর রেখে এসেছে। ভালো করে মুখ হাত পা ধুলো সোমনাথ। তারপর মুছল।
ঘরে এসে ফোন তুলে দেখল যে অনসূয়া ফোন করেছিল। ফোনটা আবার খাটে রেখে সোমনাথ ঘর বন্ধ করে বেরোলো। ঘরের বাইরে বারোয়ারি বারান্দা। সেখানে বসার জন্য চেয়ার টেবিল পাতা আছে। গরম বটে, কিন্তু বারান্দায় ফ্যান আছে। তবু তক্ষুণি না বসে, হেঁটে হেঁটে সোমনাথ ট্যুরিস্ট লজ থেকে রাস্তায় বেরিয়ে গেল।
অনেক দিন সিগারেট খায়নি সোমনাথ। একটু হাঁটার পরই দোকান পেয়ে গেল একটা। এক প্যাকেট সিগারেট কিনল আর এক বাক্স দেশলাই। কিন্তু সিগারেট ধরালো না। আস্তে আস্তে হেঁটে ট্যুরিস্ট লজে ফিরে এল। ঘরের দরজা খুলে ঘরের ল্যান্ড লাইন থেকে রুম সার্ভিসে ফোন করে এক কাপ চা চাইল। তারপর বারান্দায় এসে ফ্যান চালিয়ে চেয়ারে বসল।
একটু পর চা নিয়ে এল একজন। টেবিলে চা নামিয়ে রেখে লোকটা জিজ্ঞেস করল, “দুপুরে খাবেন তো? কিচেন আর এক ঘন্টা পরে বন্ধ হয়ে যাবে কিন্তু।”
“একটু পরে আসছি।”
লোকটা চলে গেল। এক চুমুক চা খেয়ে একটা সিগারেট ধরালো সোমনাথ। দু’টো টান দেবার পরই অনুভব করল সারা শরীরের রক্তে নিকোটিনের আমেজ। মাথায় একটা সামান্য ঘুর-লাগা ভাব। আরেক চুমুক চা খেয়ে আরামে চোখ বন্ধ করল। আঃ!
খানিক পরে সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে নেবানোর সময়ে সোমনাথের মনে পড়ল ফোনটা সেই খাটের ওপরই পড়ে আছে এখনো। উঠে গিয়ে ফোনটা তুলে নিয়ে দেখল দুটো মিস্ড্ কল্। দুটোই অনসূয়ার। ফোনটা আবার বিছানায় ফেলে দিল সোমনাথ। বারান্দায় এসে চেয়ারে বসল আবার। চা’য় চুমুক দিল।
চা শেষ হয়ে গেল। সারা রাত না ঘুমোনোর ক্লান্তিটা এবার শরীরে জানান দিচ্ছে। একটু একটু খিদেও পাচ্ছে। সবে ভাবছে এবার দুপুরের খাবারের খোঁজে যাবে এমন সময় শুনল ঘরে ফোনটা বাজছে। উঠে দাঁড়াল। ঘরে গিয়ে দেখল অনসূয়া ফোন করছে। ধরল না। বেজে যাওয়া ফোনটা বিছানায় ফেলে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। দরজা বন্ধ করে দেবার পর ফোনের শব্দটা ক্ষীণ হয়ে গেল। ডাইনিং রুমের সন্ধানে রওনা হল সোমনাথ।
মেনু দেখে কিছুই তেমন খেতে ইচ্ছে করল না। তবু ভাত, ডাল, আলুপোস্ত আর মাছভাজা অর্ডার করল। সাথে ঠাণ্ডা জল।
খাবারের অপেক্ষায় বসে বসে সোমনাথ নিজেই লক্ষ্য করল যে ও ভুলে গেছে ও কী চায়। মানে, কী খেতে চায়, বা খাবার পর কী করতে চায়, বা আগামী কাল কোথায় যেতে চায়। জীবনের দৈনন্দিন সামান্য চাওয়াগুলো কবে যেন হারিয়ে গেছে। আর কি কখনো ফিরে আসবে তারা? যেই সব ছোট ছোট সাধ নিয়ে মানুষ বেঁচে থাকে?
খাবার এল। আলুপোস্ত-তে পোস্তর পরিমাণ নাম-কে-ওয়াস্তে। মাছভাজাটা ভালো।
পেট ভরে খেল সোমনাথ। তারপর বারান্দায় ফিরে এসে বসল। সিগারেট ধরালো আরেকটা। বন্ধ করা ঘরের মধ্যে থেকে ক্ষীণ ফোন বাজার আওয়াজ এল। উপেক্ষা করল সোমনাথ। কিন্তু শান্তি পেল না। বুকের মধ্যে একটা ভার। কাল রাতের মত চরম না হলেও, যথেষ্ট অস্বস্তিজনক। বেশ কয়েকবার বেজে ফোনটা থেমে গেল। এই বার শান্তি। সিগারেটটা উপভোগ করার চেষ্টা করল সোমনাথ। আবার ফোন বেজে উঠল।
“ধূর!” বিরক্তিতে স্বগতোক্তি করল সোমনাথ।
সিগারেটটা অ্যাশট্রের খাঁজে গচ্ছিত রেখে উঠে দাঁড়াল। দরজা খুলে ধীরে সুস্থে যখন ফোনের কাছে পৌঁছল, ফোন বাজার শব্দটা থেমে গেল। তুলে দেখল অনসূয়া ফোন করছিল। ভাবল ফোনটা এবার অফ্ করে দেবে। তারপর মনে হল – না। ফোনটা পরে কাজে লাগতে পারে। ফোন আনলক্ করে অনসূয়াকে ব্লক্ করে দিল সোমনাথ। অনসূয়া আর ওকে ফোন করতে পারবে না।
বারান্দায় ফিরে এসে চেয়ারে বসে সিগারেটটা শেষ করল সোমনাথ। তারপর চোখ বুজে বসে রইল। একে সারা রাত ঘুম হয়নি, তার উপর পেটে পোস্ত পড়েছে – তা সে যত সামান্য পরিমাণই হোক না কেন – আর ভাত। দুপরের প্রচণ্ড গরমে বারান্দার চেয়ারে নিজের অজান্তে সোমনাথ তলিয়ে গেল বিস্মৃতির কালো নিদ্রায়।
হঠাৎ যখন ঘুম ভাঙল দেখল ঝড় উঠেছে। ঘড়ি দেখল। সাড়ে তিনটে বাজে। মনে পড়ে গেল ও এখন শান্তিনিকেতনে। পেছনে ওর ঘরের দরজা খোলা। বন্ধ না করেই ঘুমিয়ে পড়েছে। সামনে এক ফালি আকাশে কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে। না, না, জমতে না। আসতে শুরু করেছে। না, আসতেও না, যেতে শুরু করেছে। এক দিক থেকে আরেক দিকে ঝড়ের বেগে মেঘের শোভাযাত্রা। হাওয়ায় ধুলো উড়ছে।
সোমনাথের মুখে আজ এই প্রথম হাসি ফুটে উঠল। ওর গোপন ইচ্ছা সত্যি হতে চলেছে। কালবৈশাখী এসেছে। প্রবল বিদ্রোহে। এসেছ প্রেম, এসেছ আজ কী মহা সমারোহে!
তড়াক করে চেয়ার থেকে উঠে পড়ল সোমনাথ। ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। তারপর ব্যাগ হাতড়ে হাতড়ে একটা সাদা সূতির পাঞ্জাবি বার করল। সাথে সাদা পাজামা। শার্ট প্যান্ট ছেড়ে তা-ই চটপট পড়ে নিল। যেন ওর অনেক তাড়া। এই কালবৈশাখীর এক মুহূর্তও অপব্যয় করা যাবে না।
পাঞ্জাবির পকেটে কয়েকটা টাকার নোট রেখে দিল। যদি ঝড়ে উড়ে যায়, যাবে। যদি বৃষ্টিতে ভিজে যায়, যাবে। পায়ে হাওয়াই চপ্পল পরে, ঘরের দরজা খুলে, বারন্দায় বেরোলো সোমনাথ। দরজা লক্ করে দিল। ফোন, ব্যাগ, ছাড়া-জামাকাপড়, টাকার ব্যাগ, সিগারেট – সব পড়ে রইল ঘরের মধ্যে। রিসেপশনে ঘরের চাবি জমা দিয়ে, জিজ্ঞেস করল ক্যাম্পাস কোন্ দিকে ও কত দূরে। জানতে পারল যে হেঁটে যেতে প্রায় আধঘন্টা লাগবে।
সোমনাথ বেরিয়ে পড়ল ট্যুরিস্ট লজ থেকে। ধুলোর ঝড়ের মধ্যে রাস্তায় এসে একটা টোটোর খোঁজ করল। চোখে-মুখে ধুলো ঢুকে যাচ্ছে। চুলের অবস্থা শোচনীয়। কিন্তু সোমনাথ হাসছে। ভেতরে, বাইরে, সোমনাথ হাসছে একটা বাচ্চার মত।
একটা খালি টোটো বিশ্বভারতীর দিকেই যাচ্ছিল। সোমনাথ উঠে পড়ল। দশ মিনিটও লাগল না বড় রাস্তা দিয়ে ক্যাম্পাসে পৌঁছতে। বাড়ি-ঘর আর গাছের ফাঁকে ফাঁকে যেখানে আকাশ দেখা যাচ্ছে সেখানে দৃষ্টিগোচর হচ্ছে আকাশের বিরাট স্টেজে পাগলা হাওয়ায় ক্ষ্যাপা মেঘের উত্তাল নাটক। রাস্তায় একটা বাঁ-দিক ঘুরে একটু গেলেই ছাতিমতলা। সেখানে টোটো থেকে নেমে গেল সোমনাথ। তখনও ঝড় চলেছে। মাঝে মাঝে দুয়েক ফোঁটা জল পড়ছে গায়। কিন্তু পুরো বৃষ্টি নামেনি।
এইবার সোমনাথ মোটামুটি জায়গাটা চেনে। হেঁটে হেঁটে একটু এগিয়ে গিয়ে ঢুকে পড়ল বিশ্বভারতীর মাঠে। আকাশ থেকে জল পড়া আস্তে আস্তে বাড়ছে। ধুলো কমছে। রাস্তার যত মানুষ, মাঠের যত লোক, উঠোনে আর সিঁড়িতে যারা যারা ছিল, সবাই উধাও হয়ে যাচ্ছে। সবাই আশ্রয় নিচ্ছে বাড়ির মধ্যে বা চালের তলায়। ছাত্র ছাত্রীরা সব ছুটে পালিয়েছে। এমন কি যারা মাঠে খেলছিল তারাও নিরুদ্দেশ।
বৃষ্টি বাড়ছে। হাওয়া দিচ্ছে শন শন, শন শন। সারা শান্তিনিকেতনে এখন যেন আর কেউ নেই। সোমনাথই এখন একমাত্র জীব এই পৃথিবীতে। ও হেঁটে যাচ্ছে এখান থেকে ওখানে। চলে যাচ্ছে, ফিরে আসছে। দু হাত প্রসারিত করে মাঝে মাঝে ঠাণ্ডা জলের স্পর্শ নিচ্ছে হাতের তেলোতে। আস্তে আস্তে হাঁটছে, ধীর গতিতে। ওর সময়ের কোনো অভাব নেই। কোথাও যাবার তাড়া নেই। ভেতরে ভেতরে, ওর অন্তরের মধ্যে, তীব্র গতিতে চলছে ওর প্রাণ। পাজামা-পাঞ্জাবি সম্পূর্ণ ভিজে। চুল চুপচুপে। সারা শরীরের একটা অংশও বাকি নেই যা জল থেকে বেঁচেছে।
বৃষ্টি জোরে হচ্ছে এখন। বালতি বালতি জল আকাশ থেকে ঢালছে কেউ। গ্রীষ্মের তাপ মুছে দেওয়া, ক্লান্তি ভাসিয়ে দেওয়া অসীম শান্তি নেমে আসছে এই অশান্ত অনন্ত স্রোতে।
কতগুলো খুব বড় বড় গাছের নীচ দিয়ে যাবার সময় সোমনাথের মনে হল যে যা জোরে হাওয়া দিচ্ছে এখন, এই সব কোনো একটা গাছ যে কোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে ওর মাথার উপর। এক একটা গাছ চারতলা পাঁচতলা বাড়ির সমান। যদি ভেঙে পড়ে – আহা যদি ভেঙে পড়ে! – কী সুন্দর হবে সেই মৃত্যু! বাংলাদেশের প্রথম, আদি যে নটরাজ, তার আঙুলের সামান্য টোকায় পড়ে যাবে বাংলাদেশের ব্যর্থ সন্তান তার অন্তিম শয্যায়। নটরাজ তো শুধু পুরোনোকে ধ্বংস করে না। নতুনকেও প্রাণ দেয়। কত লক্ষ লক্ষ পাতা তেষ্টায় শুকিয়ে গিয়েছিল। এখন তারা অমৃত পান করছে তৃষ্ণার্ত শিশুদের মত। নটরাজের তরল আশীর্বাদে আরো কত অযুত পাতা জন্ম নেবে কাল, নতুন সকালে।
কালো দুরন্ত আকাশের নিচে, ফাঁকা মাঠে, নির্জন রাস্তায়, একটা দুর্নিবার বন্যায় খড়কুটোর মত চরম বাস্তুহারা স্বাধীনতায় ভেসে চলল সোমনাথ।
একটা প্রতারণার নাম ’সময়’
এখন তার জোর খাটবে না
একটা রসিকতার নাম ’মধ্যবিত্ত’
এখন তার বাধা টিঁকবে না
একটা প্রতিশ্রুতি-ভঙ্গের নাম ’ভালোবাসা’
এখন তার মুখোশ রইবে না
ভালোবাসা পঙ্গু। ভালোবাসা অসম্পূর্ণ। ভালোবাসা ব্যাধিগ্রস্ত। ভালোবাসা আধখেঁচড়া। ভালোবাসা যথেষ্ট নয়।
হাঁটতে হাঁটতে সোমনাথ একটা বড় রাস্তায় চলে এল। গাড়িঘোড়া প্রায় নেই বললেই চলে। বেশ কিছু মানুষ রাস্তার ধারে ধারে বিভিন্ন বাড়ির কার্ণিশের তলায় দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কেউ খোলা বারান্দার নিচে। রাস্তার ওপর এখানে ওখানে জল জমে আছে। সোমনাথ আন্দাজ করে টুরিস্ট লজের দিকে হাঁটতে শুরু করল। বৃষ্টির বেগে এখনো কোনো কমবার লক্ষণ পাওয়া যাচ্ছে না। একটু শীত শীত করছে।
একটু পরেই দেখল একটা বিরাট কালো ছাতা। ফুটপাতের এক পাশে ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে আছে একটা মিশমিশে লোক। লোকটার পাশে একটা চাকা-লাগানো কাঁচ-ঢাকা শো-কেস। শো-কেসের সাথে খোলা ছাতাটা শক্ত করে বাঁধা। লোকটার সামনে, ছাতার নিচে, তেল-ভর্তি বিরাট কড়াই। তার নিচে আগুন জ্বলছে। শো-কেসে রাখা আছে নানা রকম চপ জাতীয় বস্তু। বললেই গরম গরম ভেজে দেবে। ছাতার বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। ছাতার নিচে একটাও খদ্দের নেই।
সোমনাথ এগিয়ে গেল। বিশাল ছাতার নিচে ঢুকে জিজ্ঞেস করল, “কী আছে?”
“মাংসের চপ, মাছের চপ, ডিমের চপ, ভেজিটেবিল চপ।”
একটু ভেবে সোমনাথ বলল, “একটা মাংসের চপ দিন।”
শো-কেস থেকে একটা বড় সাইজের চপ নিয়ে লোকটা কড়াইতে ছেড়ে দিল। টগবগ করে উঠল ফুটন্ত তেল। সুগন্ধ বেরোলো।
একটু পর একটা শালপাতার প্লেটে লোকটা ভাজা চপ তুলে দিল। সাথে কাঁচা পেঁয়াজ আর শসা। পাশে কাসুন্দি। প্রচণ্ড গরম চপটাতে ছোট কামড় দিয়ে, ফুঁ দিয়ে ঠাণ্ডা করে, আস্তে আস্তে খেল সোমনাথ। আহাঃ অমৃত!
চপ শেষ করে বলল, “এবার একটা ডিমের চপ দিন।”
যথা সময়ে ডিমের চপও খাওয়া হয়ে গেল। পেট ভরে আসছে। তবু এই কালবৈশাখীর আবহাওয়ায় এই বিরাট কালো ছাতার নিচে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে গরম গরম চপ খাওয়ার মধ্যে একটা মায়াবী ব্যাপার আছে। সোমনাথ তিন নম্বর একটা চপ খেল। এইবার মাছের চপ।
তিনটে চপ খাওয়ার পর দাম মিটিয়ে ছাতার তলা থেকে বেরিয়ে এল সোমনাথ। বৃষ্টি থামেনি, কিন্তু ধরে এসেছে। এইবার তাড়াতাড়ি ট্যুরিস্ট লজে ফিরে জামাকাপড় বদলানো দরকার। অন্ধকার নেমে এসেছে। শীত করছে। তার উপর রাস্তায় জল কাদা। কোথায় গর্ত আছে হয়তো দেখাও যাবে না।
সোমনাথ একটা টোটো ধরল। চলন্ত টোটোয় বসে ঠাণ্ডা হাওয়ায় অল্প শীতে কাঁপতে কাঁপতে পৌঁছে গেল ট্যুরিস্ট লজ। রিসেপশন থেকে চাবি নিয়ে ঘরে গেল। ঘরের দরজাটা চাবি দিয়ে খোলার চেষ্টা করছে, এমন সময় কেউ বলল, “সোমনাথ?”
মহিলার গলা। পেছন ফিরে দেখল এক শাড়ি-পরা মহিলা দাঁড়িয়ে, ওর দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। পাশে ট্যুরিস্ট লজের এক কর্মচারীর হাতে ওনার ছোট স্যুটকেস।
চিনতে এক মুহূর্তও লাগল না সোমনাথের।
“ইন্দ্রাণী!”
“কত যুগ পর! কেমন আছো?”
“আমি ভালো। তুমি?”
“দিব্যি! তুমি তো দেখছি পুরো ভিজে গেছ। কালবৈশাখীতে?”
এক গাল হেসে সোমনাথ বলল, “হ্যাঁ।”
“ইশ্! আমার মিস্ হয়ে গেল। আমি ট্রেনে বসে দেখছিলাম হাওয়ার তাণ্ডব।”
“আর আমি হেঁটে হেঁটে বিশ্বভারতী চষে বেড়ালাম!”
হঠাৎ খেয়াল হল ইন্দ্রাণীর। বলল, “তুমি ভিজে চুপসে গেছ। তাড়াতাড়ি জামাকাপড় চেন্জ্ করে নাও। তারপর চা খাব। লাগেজ রেখে আমি আসছি একটু পরে।”
ট্যুরিস্ট লজের কর্মচারীর দিকে তাকিয়ে ইন্দ্রাণী বলল, “ভাই, এখন চা পাওয়া যাবে?”
“নিশ্চই যাবে।”
বারান্দার টেবিলের দিকে নির্দেশ করে ইন্দ্রাণী বলল, “তাহলে এখানে দুটো চা…”
বাক্যটা শেষ না করে, সোমনাথের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “অনসূয়া আছে?”
“না।”
ইন্দ্রাণী আবার টেবিলের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, “এখানে দুটো চা দিও।”
তারপর “একটু পরেই দেখা হবে” বলে ইন্দ্রাণী ওর ঘরের উদ্দেশ্যে রওনা হল কর্মচারীটির পেছন পেছন।
সোমনাথ নিজের দরজা খুলে ঢুকে পড়ল। ভেজা পাজামা-পাঞ্জাবি ছেড়ে স্নান করল। তারপর শুকনো শার্ট-প্যান্ট পরে সিগারেটের প্যাকেট নিয়ে বারান্দায় বেরিয়ে এল। চেয়ারে বসে চায়ের জন্য অপেক্ষা করতে করতে সিগারেট ধরালো।
কয়েক মিনিট পর চা আর ইন্দ্রাণী প্রায় একই সময়ে উপস্থিত হল – ইন্দ্রাণী এল বারান্দার বাঁ দিক থেকে, চা এল ডানদিক থেকে।
চেয়ারে বসে ইন্দ্রাণী সোমনাথের দিকে তাকিয়ে হাসল। চায়ে একটা চুমুক দিয়ে বলল, “তুমি অনেক বছর আগে সিগারেট ছেড়ে দিয়েছিলে না? অবশ্য তোমার সাথে অনেক দিন পর আজ দেখা হচ্ছে।”
সোমনাথ বলল, “হ্যাঁ, ছেড়ে দিয়েছিলাম। আজ আবার শুরু করলাম।”
সোমনাথ সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে বুজিয়ে দিল।
ইন্দ্রাণী বলল, “সেই কবেকার কালবৈশাখী মনে আছে?”
“মনে থাকবে না!”
সোমনাথ হাসল।
ইন্দ্রাণী বলল, “কি ভেজান্ না ভিজেছিলাম সেদিন!”
“আর আজ আমি ভিজলাম।”
“তুমি শান্তিনিকেতনে কী করছ একা একা?”
“তোমার চশমা কবে হল?”
“চল্লিশ পেরোলেই চালশে! অবশ্য তোমার তো এখনো চশমা দেখছি না।”
“অনর্জিত ভাগ্য বলতে পারো।”
“তুমি ভালো আছো?”
মনের অন্ধকারে এই কঠিন প্রশ্নটার উত্তরটা খুঁজতে খুঁজতে সোমনাথের ভুরু কুঁচকে গেল। জবাবের অপেক্ষায় ইন্দ্রাণী ওর দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে রইল যে বোঝা গেল সময়ের কোনো অভাব নেই। সচেতন ভাবে আঙুল দিয়ে নিজের কপালের ত্বক থেকে সব কুঁচকানো মুছে দিল সোমনাথ। তারপর প্যাকেট থেকে আরেকটা সিগারেট বার করল। ইন্দ্রাণী বলল, “আমাকে একটা দেবে?”