• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৩ | জুলাই ২০২৬ | গল্প
    Share
  • পলাশঝোর : সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়


    “বললে বিশ্বাস করবেন না স্যর, গত দশ-বারো বছরে এই গ্রামে যত বাচ্চা জন্মেছে তারা সবাই আগের জন্মের কথা হুবহু মনে করতে পারে,” কেটলি থেকে চা ঢালতে ঢালতে বিপত্তারণ সাধু বলল। বোঝা গেল কোনও নতুন মানুষ দেখলে সে দায়িত্ব নিয়ে এই অভূতপূর্ব সংবাদটি দিয়ে থাকে। পলাশঝোর বলে একটা ছোট নদী পার হয়ে গ্রামে ঢুকতে হয়। নদীর ধারে গ্রামে ঢোকার ঠিক মুখটাতে একটা মহুয়া গাছের নিচে বিপত্তারণের চায়ের গুমটি। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দুর্জয় ঘোষালের শখ হয়েছিল মাটির ভাঁড়ে চা খাবার। এই অঞ্চলে শাল, সেগুন, মহুয়া, পলাশ আকাশমণির বেশি ভিড়। ঘোষালের ছোটবেলা কেটেছে পশ্চিমবঙ্গের অন্য প্রান্তে, মফসসলে। সেখানে আম জাম জামরুলই বেশি চোখে পড়ত। সাইকেল চড়ে বন্ধুদের সঙ্গে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ানো, গঙ্গার ধারে আড্ডা, মোড়ের মাথার তেলেভাজার দোকান থেকে চপ, ফুলুরি… পুরনো ইচ্ছে-অনিচ্ছাগুলো আজকাল মাঝেমধ্যে বুড়বুড়ি কেটে ভেসে ওঠে।

    গাড়ি থামাতে বলেছিল। যথারীতি পিছনের জিপটাও থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। দলবল ছাড়া ইদানীং বড় একটা বেরোনো হয় না। পিছনের জিপ থেকে নেমে এসে বলরাম খোঁজ নিয়েছিল, “কী হল দাদা? গাড়ি থামালেন কেন? পেচ্ছাপ-টেচ্ছাপ যাবেন নাকি?”

    নির্বাচনের আগে ঘোরাঘুরি বেড়েছে, শত্রুও। প্রচারের চাপ কম নয়। রাস্তাই যখন ঘরবাড়ি, স্বাভাবিক ভাবে প্রাকৃতিক প্রয়োজনও অনেক সময় রাস্তার ধারেই মেটাতে হয়। বাহ্যে-পেচ্ছাপের জন্য কখনও ঝোপঝাড়ে বসার দরকার পড়লে জলের বোতল হাতে নিয়ে বলরাম পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। অন্য দিকে তাকিয়ে থাকে বটে কিন্তু কোমরের ছ’-ঘরাটার ওপর হাত রাখা থাকে। সাবধানের মার নেই। গাড়ি থেকে নেমে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে ঘোষাল বলেছিল, “কাক ভোরে বেরিয়েছি, গলাটা শুকিয়ে গেছে, চা খাব।”

    সবাই নেমে পড়েছিল। ঘোষাল, বলরাম ছাড়াও আরও চারটে ছেলে, দু’জন ড্রাইভার, বিপত্তারণের গুমটির সামনে পেতে রাখা কাঠের বেঞ্চে বসেছিল গিয়ে। উনুনে চায়ের জল চাপিয়ে বিপত্তারণ জনসংযোগে মন দিয়েছিল। এরকম গণ্যমান্য লোকজন তো আর রোজ-দিন তার দোকানে চা খেতে আসে না। বকবক করে কানের পোকা নড়িয়ে দিয়েছিল। শেষে গ্রামের জাতিস্মর বালক-বালিকা সংক্রান্ত রোমাঞ্চকর সংবাদটা পরিবেশন করেছিল। বলেছিল, কোথায় জন্মেছিল, বাপের নাম, মায়ের নাম, এমনকি কে কীভাবে মরেছিল পর্যন্ত পরিষ্কার বলতে পারে।

    হাত বাড়িয়ে চা নিয়ে বলরাম বলল, “এমন আজগুবি কথা বাপের জন্মে শুনিনি। কী যেন নাম তোর, বিপত্তারণ… শোন ভাই, সকাল সকাল ঢপ দিস না। পেটে সইবে না।”

    বিপত্তারণ বলল, “মাইরি বলছি স্যর, মা কালীর দিব্যি! বাচ্চাগুলোর বাপ-দাদারা তাদের বলা জায়গায় গিয়ে পরখ করে দেখে এসেছে, যা যা বলছে নির্জলা সত্যি।”

    পুজো আসছে। এ বছর বৃষ্টি যাই যাই করেও যাচ্ছে না। মাঝেমাঝেই আকাশ কালো করে মেঘ ভাঙছে। কাছেপিঠের নদী-নালাগুলো বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছে। এমনকি শান্তশিষ্ট পলাশঝোরের জলও সড়ক ছুঁই-ছুঁই। বাঁধ থেকে জল ছাড়লে দু’-চারটে গ্রাম ভাসবে। তাতে অবশ্য আপত্তি নেই। বন্যাত্রাণের টাকা এলে যারা বণ্টন করবে তাদের পকেটও ভারী হবে। পরিবার-পরিজনের জন্য আশ মিটিয়ে পুজোর বাজার করতে পারবে। আপাতত আকাশে ছেঁড়া-ছেঁড়া মেঘ, সোনা রঙের আলো। হাওয়ায় ঠান্ডা আমেজ। জামরুল গাছের ছায়ায় বসে চায়ে চুমুক দিতে ভাল লাগছিল ঘোষালের। এইরকম একটা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে এরা কী কাঁই-কিচির শুরু করল! হাত নেড়ে বলেছিল, “আঃ! তোরা একটু থামবি?”

    এর আগে কোনওদিন নিবারণপুরে আসেনি ঘোষাল। দরকার পড়েনি। ছোট গ্রাম। সাকুল্যে চল্লিশ-পঞ্চাশটা পরিবারের বাস। নির্বিরোধী মানুষজন। নেতার চ্যালা এসে যে নামের পাশে ছাপ দিতে বলে, দিয়ে আসে। তার জন্য নেতার নিজে এসে হাতজোড় করে ভোটভিক্ষা করার দরকার পড়ে না। নেহাত পঞ্চায়েত প্রধান সুকুমার কাহার খুব করে ধরে পড়েছিল। নতুন একটা স্কুল বিল্ডিং তৈরি হয়েছে, ঘোষাল সেটার উদ্বোধন করতে এলে গ্রামের মর্যাদা বাড়বে। ঘোষাল নিমরাজি হয়েছিল। আসলে নির্বাচনী প্রচারের ঠেলায় ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। ভেবেছিল একটা দিন আরাম করা যাবে। তাছাড়া ওই যে… আজকাল মাঝেমধ্যেই মনে পড়ে যায় নিজের ছোটবেলার কথা। বাংলা মিডিয়ামে পড়াশুনো, পুরনো স্কুলঘর, একবার ক্লাস চলাকালীন ছাদ থেকে চাঙড় খসে পড়েছিল একটা ছেলের মাথায়। তিনটে সেলাই দিতে হয়েছিল। ঘোষাল বলরামের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী নাম রে স্কুলটার?”

    বলরাম বলল, “সুখময় উচ্চ বিদ্যালয়, সুকুমার কাহারের বাপের নামে।”

    স্কুল শেষ করে ঘোষাল কলেজে ঢুকেছিল বটে কিন্তু গ্র্যাজ্যুয়েশনের চৌকাট ডিঙিয়ে বেরোতে পারেনি। চেহারাটা হ্যান্ডু-মার্কা ছিল, ফর্সা রং, ঘন কোঁকড়ানো চুল… ছোটকাকার পরিচিত নামকরা এক চলচিত্র পরিচালক এসেছিলেন মফসসলের বন্ধুর বাড়িতে আড্ডা দিতে, ঘোষাললের চেহারা দেখে পরের ছবির জন্য পছন্দ হয়েছিল, অডিশন দিতে বলেছিলেন। কলেজে শখ করে নাটক-টাটক করত। স্টেজে ওঠার ভয় ছিল না। অডিশনে উতরে গিয়েছিল। প্রথম ছবিটাই ব্যাপক হিট। তারপর আর ঘোষালকে ফিরে তাকাতে হয়নি। একটার পর একটা ছবিতে ডাক পেয়েছে। চুটিয়ে অভিনয় করেছে। সবাই জানত ডিরেক্টররা যেমন চাইবে ঠিক সেই রকম পারফরম্যান্স দেবে ঘোষাল, নাচন-কোঁদন অভিব্যক্তিতে এক চুল এদিক-ওদিক ওপর-নিচে হবে না। কিছু দিনের মধ্যেই সিনেমা পাড়ায় এক নম্বর না-হলেও দুই-তিন নম্বরে নাম উঠে এসেছিল ঘোষালের।

    খ্যাতির হাত ধরে বিড়ম্বনাও আসে। বাইরে বেরোলে লোকে ভিড় করে আসত, দু’-তিনটে ছবি রিলিজ হতে না হতেই পাড়ায় পাড়ায় সাইকেল নিয়ে টহল দেওয়া, বন্ধুদের বাড়ি যাওয়া বন্ধ হল। কাজের সুবিধার জন্য কোলকাতায় একটা বাসা ভাড়া নিতে হল। রান্না করার জন্য একটা লোক ছিল বটে কিন্তু বেশির ভাগ দিনই সন্ধেবেলা কোনও ইয়ার-দোস্ত জুটে যেত, হোটেল-রেস্তোরাঁয় খেয়ে ফিরত। তাছাড়া প্রোমো-পার্টি লেগেই থাকত। গোদের ওপর বিষফোঁড়া—দৈনন্দিন মদ্যপানটাও অভ্যাস হয়ে গেল। ফলত চার-পাঁচ বছর যেতে না-যেতেই একই সঙ্গে ঘোষালের মধ্যপ্রদেশ এবং পশ্চাদ্দেশ স্ফীত হতে শুরু করল। ঘাড়েও লাগাতার চর্বি জমল। তখনও শহরে ব্যাঙের ছাতার মতো এত মাল্টিজিম গজিয়ে ওঠেনি। ময়দানে বা লেকের ধারে লোকজনের নজর এড়িয়ে হাঁটাহাঁটি করা এক প্রকার অসম্ভব। ঘোষাল ঘরের মধ্যেই কিছুদিন শরীরচর্চার চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিল।

    বাবা ছোটবেলায় গত হয়েছিলেন, মাও চলে গেলেন। কাকাদের সঙ্গে বনিবনা হচ্ছিল না। পৈতৃক সম্পত্তির ভাগ বুঝে নিয়ে, মফসসলের পাট চুকিয়ে, নিউটাউনে ফ্ল্যাট কিনে পাকাপাকি কোলকাতায় চলে এল দুর্জয় ঘোষাল। মনে আছে তখন পাপিয়া বলে একটা মেয়ে, টলি-পাড়ায় এক্সট্রার কাজ করত… ডাকলেই ফ্ল্যাটে চলে আসত। মেয়েটা কাজ পাওয়ার জন্য একটু ঘ্যানঘ্যান করত বটে কিন্তু কামকলায় পারদর্শী ছিল। তার জন্য দু’-এক জায়গায় বলেও দিয়েছিল ঘোষাল। তবে সেসব বদান্যতা উসুল করে নিত। সবই ঠিক ছিল, কেবল নিজের কাজের জায়গাটা নড়ে যাচ্ছিল। নায়ক থেকে খলনায়ক, শেষের দিকে পার্শ্বচরিত্রে ডাক পাচ্ছিল। কাজ কমতেই মদ খাওয়া বাড়ল, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মেদ। রাজনৈতিক দলগুলো এই ধরণের লোক চায়, ফুরিয়ে যাওয়া কবি-সাহিত্যিক, বাতিল অভিনেতা… প্রস্তাব এসেছিল শাসক দলে যোগ দেওয়ার। ঘোষাল ভেবেছিল—মন্দ কী! আগে ডাইরেক্টদের কথায় ওঠাবসা করত। এখন না-হয় ওপর তলার নেতাদের কথায় উঠবে বসবে।

    রোদটা কেমন মিইয়ে আসছিল। বলরাম বলল, “দাদা, এবার উঠলে হয় না? বৃষ্টি-বাদলার দিন। অনেকটা রাস্তা, তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে... সন্ধেবেলা তোমার আবার ডিএম-এর সঙ্গে মিটিং আছে।”

    বিপত্তারণ আকাশের দিকে তাকিয়ে চিন্তিত মুখে বলল, “কোদালে মেঘ উঠেছে, আবার না ঢালে!”

    পাপিয়া এখন কোথায় কে জানে? অনেক দিন যোগাযোগ নেই। ঘোষাল চায়ের ভাঁড়টা গাছের গোড়ায় ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলল, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, চল।”

    মাটির ভাঁড়টা ভাঙল না। এক পাশে গড়িয়ে গেল।


    পঞ্চায়েত অফিসের সামনে সুকুমার কাহার মালা হাতে অপেক্ষা করছিল। ঘোষাল গাড়ি থেকে নামতেই গলায় পরিয়ে দিল। পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন চটাপট হাততালি দিয়ে উঠল। ভোঁতা নাক, ছুঁচলো মুখ, সুকুমার কাহারের চাহনি দেখলেই মনে হয় লোকটা ধূর্ত, বিগলিত কণ্ঠে বলল, “আসুন স্যর! একটু জলযোগ সেরে নিয়ে অনুষ্ঠানে যাবেন।”

    তা সেই জলযোগ সারতে সারতে বেলা গড়িয়ে গেল। আসলে জলযোগ একটা অজুহাত মাত্র। গ্রামের লোক অভাব-অভিযোগের ঝাঁপি খুলে বসল। নেতারা ডুমুরের ফুল, তাদের সামনা-সামনি পাওয়া আর হাতে স্বর্গ পাওয়া মোটামুটি একই ব্যাপার। ঘেনিয়ে ঘেনিয়ে নিজেদের সমস্যার কথা বলে যাচ্ছিল, পাকা রাস্তা নেই, পানীয় জলের বন্দোবস্ত নেই, হেলথ সেন্টারে ডাক্তার নেই… শুধু নেই আর নেই। পরের দিকে ঘোষাল আর মন দিয়ে শুনছিল না। খাওয়ার পর একটা লোক কচি ডাব কেটে স্ট্র গুঁজে হাতে ধরিয়ে দিয়ে গিয়েছিল, তাতেই টান দিচ্ছিল। স্ট্র-য়ের ভিতর শোঁ-শোঁ করে হাওয়া কাটার শব্দ হতে ডাবটা চেয়ারের পাশে নামিয়ে রেখে বলল, “এবার যাওয়া যাক।”

    সুকুমার শশব্যস্ত হয়ে বলল, “নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই…”

    বলল বটে কিন্তু যাওয়ার কোনও উদ্যোগ দেখাল না। তার গড়মসি দেখে ঘোষাল বুঝল এই জনতা-দরবারের ঘটনাটায় সুকুমারের যথেষ্ট প্রশ্রয় আছে। বলা যায় না হয়তো সে নিজেই আয়োজন করেছে। এক ঢিলে দুই পাখি মারার চেষ্টা। উচ্চ বিদ্যালয়ের ফিতে কাটাও হল আবার নেতার কাছে নিজেদের দুঃখ-দুর্দশা সাত কাহন করে শোনানোও হল। যদি কিছু সুরাহা হয়! সুকুমারের মুখ দেখে মনে হয় ভাজা মাছটি উলটে খেতে জানে না। কিন্তু ব্যাটা ভিতরে ভিতরে ঘুঘু মাল, ঘোষাল ভাবল। অবশ্য কে না জানে ভাল অভিনেতা না হলে নেতা হওয়া যায় না! ওই জন্যই বোধহয় রাজনীতির আঙিনায় অভিনেতাদের এত কদর।

    রাজনীতি একটা অদ্ভুত পরিসর। তার নিয়ম-কানুন সম্পূর্ণ আলাদা। যে যত তাড়াতাড়ি সেগুলো শিখে নিতে পারে সে তত তাড়াতাড়ি ওপরে ওঠে। পার্টির খাতায় নাম লেখানোর পরে ঘোষালের মাথায় ভূত চেপেছিল বড় নেতা হতে হবে। সে যেমন ওপর মহলের হুকুম তামিল করবে, নিচের লোকেও তার কথায় উঠবে বসবে, সে যা বলবে তাই শুনবে। মুশকিল হল রাজার নেক নজরে না পড়লে ওপরে ওঠা যায় না। উপযুক্ত নজরানা পেলে তবেই রাজা তাকিয়ে দেখবে, ঘেঁটি ধরে তুলে এনে ক্ষমতার কুর্সিতে বসিয়ে দেবে। সে সব সওগাত জোগাড় করার দায়িত্ব উমেদারের। তবে হ্যাঁ, রাজার জন্য খাজনা তুলছে খবর থাকলে রাজার পেয়াদারা চোখ বুজে থাকবে। তখন তুমি তোমার নিজস্ব লেঠেল বাহিনী বানাও, নিরীহ প্রজা-সাধারণের ওপর যথেচ্ছ উপদ্রব করো, অসুবিধে নেই, সাত-সাত্তে ঊনপঞ্চাশ খুন মাপ।

    খুন-জখম করলে লোকে ভয় পায়। ভয়ের থেকে আসে ভক্তি। আর কে না জানে ভক্তরা নিজে থেকেই লাইন দিয়ে এসে পায়ে মাথা ঠুকে প্রণামী দিয়ে যায়। প্রথম দিকে বলরাম একাই সব সামলাত। কাকে ঠিকানা লাগাতে হবে, কাকে অল্প মালিশ করে ছেড়ে দেওয়া যাবে… আস্তে আস্তে দল বাড়ল। অপরাধের সংখ্যা এবং গুরুত্বও সেই অনুপাতে বাড়ল। মাঝখানে একটা রেপ কেসে ফেঁসে গিয়ে বলরাম ছ’-মাস জেলে গিয়ে ঘানি টেনে এল। ধর্ষিতা মেয়েটা মহা টেটিয়া ছিল, কী যেন নাম ছিল… দিশা না নিশা? নিজেই গিয়ে লোকাল থানায় অভিযোগ দায়ের করেছিল। ডাক্তারি পরীক্ষায় জবরদস্তি, ধর্ষণের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। মিডিয়া-ফিডিয়া এসে সে এল কেলেঙ্কারি! এফ আই আর না করে পুলিশের কোনও উপায় ছিল না। দুর্জয় ঘোষালের উদ্দেশ্য ছিল মেয়েটার বাপটাকে টাইট দেওয়া। মেয়েটা উপলক্ষ্য মাত্র। কোর্ট-কাছারির ঝামেলা সামলাতে সামলাতে নাওয়া-খাওয়া মাথায় উঠেছিল ঘোষালের। বলরাম অবশ্য মুখ খোলেনি। তবু বলা তো যায় না। শেষ পর্যন্ত লোক লাগিয়ে মেয়েটাকে সরিয়ে দিতে হয়েছিল। মেয়ের খুন হয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে বাপটা নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিল। পরে সাক্ষীর অভাবে বলরাম বেকসুর খালাস হয়ে যায়।

    বলরাম পাশেই বসেছিল। লক্ষ করেছিল ঘোষাল ধৈর্য্য হারাচ্ছে। চেয়ার ছেড়ে উঠে ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনের দিকে হাত তুলে বলল, “ব্যস, ব্যস, অনেক হয়েছে।”

    একটা লোক সবিস্তারে শোনাচ্ছিল গত বছর বন্যায় গ্রামের মানুষের কী কী ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আচমকা বাধা পেয়ে সে চুপ করে গেল। বলরাম ঘোষালের দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল, “চলেন দাদা।”

    পঞ্চায়েত অফিস থেকে বেরিয়ে গাড়িতে ওঠার সময় ঘোষাল দেখল, আকাশ কালো, টিপ-টিপ করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সুকুমার ঘোষালের গাড়িতেই উঠল। ড্রাইভারের পাশের সীটে বসল, রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে যাবে বলে। স্কুলবাড়িটা গ্রামের এক প্রান্তে। পৌঁছোতে মিনিট দশেক লাগল। খোয়া ওঠা রাস্তা, নাচতে নাচতে পৌঁছে দেখল সেখানে ইতিমধ্যেই বেশ কিছু লোক জমা হয়েছে। তিনতলা বিল্ডিং, স্কুলের সামনের মাঠে স্টেজ বেঁধে ত্রিপলের ছাউনি দিয়ে সামিয়ানা টাঙিয়ে লোকজনের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সুকুমার অবশ্য ঘোষালকে সেখানে নিয়ে গেল না। স্কুলের গেটের সামনে গাড়ি থামাল। ঘোষাল নেমে দেখল বৃষ্টির তেজ বাড়ছে। প্রধান শিক্ষক তারাপদ কর্মকার এক হাতে ছাতা অন্য হাতে একগোছা রজনীগন্ধা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ঘোষালের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল সুকুমার। তারাপদ রজনীগন্ধার গোছা ঘোষালের হাতে ধরিয়ে দিয়ে মাথায় ছাতা ধরল।

    ফিতে কাটার পর সুকুমার বলল, “চলুন স্যর, আপনাকে স্কুল বিল্ডিংটা ঘুরিয়ে দেখাই।”

    স্কুল বিল্ডিং পরিদর্শন করে বেরিয়ে ঘোষাল যখন স্টেজে উঠল তখন মুশলধারায় বৃষ্টি নেমেছে। পঞ্চপ্রদীপ জ্বালিয়ে ঘোষাল তার জন্য নির্দিষ্ট সিংহাসনে গিয়ে বসল। বলরাম পিছনে দাঁড়িয়ে রইল। প্রায় শ-দুয়েক লোক ঝড়-বৃষ্টি মাথায় করে সামিয়ানার নিচে জমা হয়েছে। ঘোষালের মনে হল শুধু নিবারণপুর নয়, আশপাশের দু’-চারটে গ্রাম থেকে লোক ভাড়া করে এনেছে সুকুমার। প্রথমে তারাপদ উঠে সকলকে স্বাগত জানাল। তারপর ভাষণ দিতে উঠল সুকুমার। কিছু কিছু মানুষ আছে যারা একবার মাইক হাতে পেলে ছাড়ার নাম করে না। সুকুমার সেই গোত্রের। ঘোষালের প্রতি তার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। প্রশস্তি শুনে ঘোষালের মতো পোড় খাওয়া লোকেরও লজ্জা করছিল। সুকুমারের গদগদ আবেগ-বিহ্বল কণ্ঠ ধারাপাতের আওয়াজ ছাপিয়ে ঘাটে-মাঠে ছড়িয়ে পড়ছিল। মোটামুটি আধ ঘণ্টা পরে ঘোষালের নিবারণপুরে পা রাখা যে একটা মহান ঐতিহাসিক ঘটনা সে ব্যাপারে সমবেত জনতার বিন্দুমাত্র সন্দেহ রইল না। ঘোষাল তার সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রেখে যখন ফিরে এসে বসল, বলরাম পিছন থেকে তার কানের কাছে মুখ নামিয়ে দুঃসংবাদটা দিল। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে বাঁধ থেকে জল ছেড়েছে। পলাশঝোর পাড় ভেঙে ভেসে গেছে। পুরো অঞ্চল জলমগ্ন। নিবারণপুর থেকে বেরোবার রাস্তা চার-পাঁচ হাত জলের নিচে।

    উপায় নেই। অন্তত আজকের রাত্তিরটা নিবারণপুরেই কাটাতে হবে। দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার পর সুকুমার মালিকে দিয়ে তোষক-কম্বল আনিয়ে নতুন স্কুলবাড়ির দোতলার হল ঘরে সবার থাকার ব্যবস্থা করে দিল। গ্রামে কারো বাড়িতে থাকার চেয়ে স্কুলবাড়িতে থাকা ভাল। উৎপাত কম হবে। আকাশে মেঘের আড়ম্বর দেখে ভয় হচ্ছিল আবার হুড়মুড়িয়ে বৃষ্টি নামবে। বিকেলবেলাই সন্ধের অন্ধকার নেমেছে। বিপত্তারণ ফ্লাস্কে করে চা এনেছিল। তাকে দেখে বলরাম রসিকতা করে বলল, “ভরা আশ্বিনে সকাল-সকাল আষাঢ়ে গল্প শোনালি, তাই এমন দুর্যোগ নামল।”

    তারাপদ তদারকি করছিল। সে কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী গল্প শুনিয়েছিলি রে?”

    দোষটা যেন তারই, বিপত্তারণ মুখ চুন করে বলল, “কিছু না, গ্রামের বাচ্চারা আগের জন্মের কথা বলে, সেই গল্প করেছিলাম।”

    তারাপদ বলল, “গল্প কোথায়? ডাহা সত্যি। জানি না একটা কথা বিপত্তারণ আপনাদের বলেছে কি না, সব বাচ্চাগুলোই বলে কোনও না কোনও অপঘাতে তাদের মৃত্যু হয়েছিল।”

    ঘোষাল বারান্দার রেলিঙে ভর দিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিল। ভুরু তুলে জিজ্ঞেস করল, “অপঘাত মানে? কী ধরনের অপঘাত?”

    তারাপদ বলল, “ওরা কেউ নাকি রোগে ভুগে মরেনি। কেউ খুন হয়েছে তো কেউ পরিস্থিতির চাপে পড়ে আত্মহত্যা করেছে। বাসুর ছেলেটা তো বলে ওদের বাড়িতে নাকি এক দল গুণ্ডা রাতের বেলা আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। পুরো পরিবার পুড়ে মরেছিল।”

    বলরাম মুখ ভেংচে বলল, “পুরো পরিবারই নিবারণপুরে এসে টপকেছে নাকি?”

    তারাপদ সরাসরি সে কথার জবাব দিল না, বলল, “আর একটা আশ্চর্য ব্যাপার হল বাচ্চারা যে জায়গাগুলোর কথা বলে সেগুলো সব পশ্চিমবঙ্গে। সোনার কেল্লার মতো রাজস্থান-টাজস্থানে নয়।”

    গ্রামের লোকেরা অতিপ্রাকৃত গল্প পেলে আর কিছু চায় না। ঘোষালের আর সহ্য হচ্ছিল না, বলল, “ছাড়ুন ভাই। যত সব ফালতু কথা! সকালে তো পোনা মাছের ঝোল খাওয়ালেন, রাত্তিরে কী খাওয়াচ্ছেন বলুন।”

    তারাপদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “দেখি চিকেনের বন্দোবস্ত করতে পারি কি না।”


    এক জন দু’জন করে তারা আসছিল। বাচ্চাগুলো আর তাদের বাবা-মা-কাকা-দাদারা। সন্ধের পর থেকে বৃষ্টিটা একটু ধরেছে। যদিও মেঘেদের গজরানি কমেনি, মাঝেমাঝেই আকাশ চৌচির করে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। পঞ্চায়েত অফিসের সামনে তারা জড়ো হচ্ছিল। বাচ্চাগুলোর চোখ জ্বলছিল ধিকিধিকি করে। অন্ধকারে তারা দেখতে পায়, বন্য প্রাণীদের মতো, যদিও দিনের বেলা এসে তারা তাদের পূর্ব জন্মের খুনি ও ধর্ষকদের শনাক্ত করে গেছে। বাপ-দাদাদের চিনিয়ে দিয়ে গেছে।

    “ওই যে ওই গুঁফো ছেলেটা, ওর নাম বিজন, পিছন থেকে ছুরি চালিয়ে আমার গলার নলী কেটেছিল,” গণা প্রামাণিকের ভাইপো সজল বলেছিল। জমি দখলের ঝগড়ায় বেচারার প্রাণ গিয়েছিল। আগের জন্মের বাদল এই জন্মে সজল। তার চোখ ছলছল করে উঠেছিল।

    “লাল চেক-কাটা কলারওলা গেঞ্জি পরে, ষণ্ডামার্কা ছেলেটা… ওই যে দুর্জয় ঘোষালের পাশে দাঁড়িয়ে আছে, ও বলরাম, আমার ওপর অকথ্য অত্যাচার করেছিল, তারপর গলা টিপে…" বলতে বলতে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিল বসন্ত দাঁ-র মেয়ে জুঁই, যার আগের জন্মে নাম ছিল নিশা।

    “নীল জিনস আর সাদা ফতুয়া পরা ছেলেটার নাম রাধু। রাত্তিরে রাস্তা থেকে জোর করে তুলে নিয়ে গিয়েছিল আমায়,” বরুণ সামন্তর মেয়ে বিশাখা বলেছিল, “একটা বন্ধ গ্যারেজের মধ্যে চারজন মিলে শরীরটা ছিঁড়েখুঁড়ে খেয়েছিল। দেহ থেকে প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার পরও ছাড়েনি। ওরা মানুষ নয় পিশাচ।”

    বিশাখা, গত জন্মের পাপিয়া, দুর্জয় ঘোষালকেও চিনতে পেরেছিল। কতবার গেছে ওর নিউটাউনের বাড়িতে।

    “বাইরে থেকে দরজা আটকে ওরা সবাই মিলে আমাদের ঘরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল, আমরা যখন জ্বলে-পুড়ে মরছিলাম ওরা উল্লাসে চিৎকার করছিল” বাসুর ছেলে বলেছিল। রাগে ছেলেটার মুখ দিয়ে ফেনা বেরচ্ছিল। ওর আগের জন্মের বোন রুমা এই জন্মে জয়দেব হাঁড়ার ছোট মেয়ে। সেও বাবার হাত ধরে এসে দাঁড়িয়েছে।

    কোন দৈব নির্দেশে দুর্জয় ঘোষাল আর তার দলবল গ্রামে আটকা পড়েছে কেউ জানে না। বাচ্চাগুলো শুধু জানে নিবারণপুরে তাদের পুনর্জন্ম নিয়তি-নির্ধারিত। যে কাজের জন্য তারা জন্ম নিয়েছে সেই কাজ সুষ্ঠু ভাবে শেষ করতে হবে। তবেই তাদের মুক্তি।

    ভিড় বাড়ছিল। শুধু বাচ্চাগুলোর পরিবার-পরিজন নয় অন্যরাও আসছিল। সুকুমার আগে থেকেই মজুত ছিল। জমায়েতটা এবার নতুন স্কুল বাড়ির দিকে এগোল। অন্ধকারে বাচ্চাগুলো পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সবাই তাদের অনুসরণ করছে। বাচ্চাগুলোর খালি হাত। বড়দের হাতে দা, বঁটি, কাটারি… যার ঘরে যা অস্ত্র ছিল উঠিয়ে নিয়ে এসেছে। খুনিগুলোর আজ রেহাই নেই।

    বলরামের ঘুম আসছিল না। ঝিঁ-ঝিঁর ডাকে কানের পর্দা ফাটার উপক্রম। তার ওপর হঠাৎ একটা উৎকট জান্তব চিৎকার শুরু হল। বিজন বলল, “সাপে ব্যাং ধরেছে।”

    বলরাম একটা সিগারেট ধরিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। হাওয়ায় এখনও দু’-চারটে জলকণা উড়ে আসছে। গা শিরশির করে উঠছে। বিল্ডিং চত্বরের এক কোণে মালির ঘর। টিমটিম করে একটা বাল্ব জ্বলছে। আলো ছড়ানোর বদলে অন্ধকার ঘন করছে বেশি। অন্য দিকে চোখ ফেরালে নিরেট নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থাকলে ভয় লাগে। মনে হয় হাঁ করে গিলে খেতে আসছে।

    কয়েকটা জোনাকি এদিক ওদিক উড়ছিল। আচমকা সেগুলো একত্র হল, যেন একে অন্যের বন্ধু। বলরাম দেখল জোনাকির ঝাঁকটা দল বেঁধে এগিয়ে আসছে। সে গলা তুলে ডাকল, “বিজন, রাধু… একবার এদিকে আয়। দেখে যা।”

    বিজন বিরক্ত হয়ে বলল, “কী হল আবার ? চেল্লাচ্ছিস কেন? এমনিতেই শালা মশার কামড়ে ঘুম আসছে না।”

    “আরে আয় না একবার…” বলরাম খিঁচিয়ে উঠল।

    জোনাকির ঝাঁকটা আরও কাছে এগিয়ে এসেছে। বিজন আর রাধু উঠে এসেছিল। রাধু বলল, “মনে হচ্ছে শিয়ালের পাল। চোখ জ্বলছে।”

    বিজন বলল, “শিয়ালগুলো লাইন বেঁধে মার্চ করে আসছে নাকি?”

    বলরাম বলল, “হেডমাস্টারটা বলছিল না - খুব সেফ। ভাম, উদবিড়ালও ঢুকবে না। এক বার ফোন কর তো মালটাকে। বলছিল না কাছাকাছি বাড়ি!”

    বিজন নম্বর টিপে ফোন কানে লাগাল। একটু পরে ফোন নামিয়ে বলল, “খানকির ছেলে ফোন ধরছে না।”

    কথাবার্তার শব্দ পেয়ে দুর্জয় ঘোষাল উঠে এসেছিল, বলল, “মুখ খারাপ করিস না বেজা। বর্ষার রাত, বউ ধামসে বেচারা ঘুমিয়ে পড়েছে হয়তো।”

    বিজন বিড়বিড় করে ঘোষালের কান বাঁচিয়ে বলল, “আর আমরা ছিঁড়ছি।"

    বলরাম বিজনের দিকে কটমট করে তাকাল। কিছু বলল না। মুখ ফিরিয়ে দেখল, উজ্জ্বল আলোর বিন্দুগুলো স্কুল কম্পাউন্ডের ভিতর ঢুকে আসছে। ঘোষাল বলল, “বারান্দার লাইটটা জ্বালিয়ে দে। জন্তু-জানোয়ার হলে ভয় পাবে।”

    রাধু গিয়ে সুইচ টিপে আলো জ্বালাল। দোতলার বারান্দা থেকে আবছা আলো ঠিকরে পড়ল নিচে। সেই অস্পষ্ট আলোয় সবাই দেখল কালো-কালো মানুষের অবয়ব। বাচ্চা-বুড়ো-মাগী-মদ্দা এক দল মানুষ এগিয়ে আসছে। অন্তত শ-খানেক হবেই। কেন আসছে ওরা? দুর্জয় ঘোষালের কাছে আবার কোনও আর্জি নিয়ে? এই মাঝরাত্তিরে? বলরাম ভিতরে দৌড়ল, আগ্নেয়াস্ত্রটা বালিশের নিচে গুজে রেখে এসেছিল। যদি দরকার পড়ে।

    দোতলায় ওঠার সিঁড়িতে পায়ের শব্দ হচ্ছে। ওরা ওপরে উঠে আসছে। কারা ওরা?

    মুখের কোনও মিল নেই। যারা মরেছিল তার পূর্ণ-বয়স্ক বা বয়স্কা। এরা নিতান্তই বালক-বালিকা। তবু ওরা চিনতে পারল, বাদল, নিশা, পাপিয়া, রুমা… চিনতে পেরে বলরাম বিজনদের চোখ ঠেলে বেরিয়ে এল। কিন্তু মানুষগুলো তো মরে গিয়েছিল। খুন হয়েছিল। বেঁচে ফিরল কী ভাবে? তবে কি... ভয়ে হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে এল। তার মানে বিপত্তারণ যা বলছিল, সব সত্যি!

    নিশা বলরামের সামনে এসে দাঁড়াল। বলরামের হাত কাঁপছিল। ধাতব যন্ত্রটা হাত থেকে ঠনঠন করে খসে পড়ল। কাকে মারবে? কতবার মারবে? যতবার মারবে ততবার নিশা-বিদিশারা সামনে এসে দাঁড়াবে। কোনওমতে বারান্দার রেলিং ধরে টাল সামলাল বলরাম। ঝুঁকে পড়েছিল কিছুটা। নিশার এই জন্মের মায়ের হাতের আঁশবঁটির কোপ পড়ল গলায়। গলগল করে রক্ত বেরিয়ে এল।

    ষড়যন্ত্র, গভীর ষড়যন্ত্র! সুকুমার লোকটা বিশেষ সুবিধের নয়, ঘোষালের সকালেই মনে হয়েছিল। এই ঘটনার পিছনে নিশ্চয়ই শয়তানটার হাত আছে। লোকটার সঙ্গে বিরোধী দলের যোগসাজশ নেই তো? মাথাটা খালি-খালি লাগছিল, ঘোষাল একবার যুক্তি সাজাবার চেষ্টা করল, বাচ্চাগুলো যদি মৃত্যু পেরিয়ে উঠেই এসে থাকে এদের মধ্যে পাপিয়া কেন? পাপিয়া তো দিব্যি বেঁচে-বর্তে ছিল? আচমকা বুকের বাঁদিক ঘেঁষে একটা যন্ত্রণা উঠে এল। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। ঘোষাল বুকে হাত চেপে মাটিতে বসে পড়ল।


    *

    আটটা মৃতদেহ পাশাপাশি পড়ে আছে। ঘোষাল হার্টফেল করে মরেছে। একটা ছেলে দোতলার বারান্দা থেকে লাফ দিয়েছিল। বেকায়দায় জানলার কার্নিশে মাথা ঠুকে মরেছে। বাকিরা মরেছে কোনও না কোনও মরচে ধরা ভোঁতা অস্ত্রের ঘা খেয়ে। বাচ্চাগুলোকে নিয়ে তাদের বাড়ির লোকজন ফিরে গেছে। বাচ্চাগুলোর চোখ নিভে গেছে। আগের জন্মের কথাও তারা সম্ভবত বিস্মৃত হয়েছে। যাওয়ার সময় মৃতদেহগুলোর দিকে আঙুল দেখিয়ে জিজ্ঞেস করছিল, এরা কারা? মরে গেল কী করে?

    সুকুমার তারাপদকে বলল, “দেরি কোরো না, বডিগুলো গাড়িতে তোলার ব্যবস্থা করো।”

    অন্য যে ক’জন স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল তাদের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমরাও হাত লাগাও।”

    তারাপদ জিজ্ঞেস করল, “কোথায় নিয়ে যাব?”

    সুকুমার বলল, “পলাশঝোরের পাড় থেকে ধাক্কা দিয়ে নদীর জলে ফেলে দেবে। ভাসতে ভাসতে যে চুলোয় যায় যাক। উদ্ধার হতে হতে বডিগুলো পচে-গলে যাবে। কেউ কিছু সন্দেহ করবে না। পরে পুলিশ-টুলিশ এলে না-হয় বলা যাবে ওরা আমাদের বারণ না শুনে সন্ধেবেলা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। তারপর আমরা আর কিছু জানি না। কাল সকালে সবাই পঞ্চায়েত অফিসে এসো, কাকে কী বলতে হবে সে আমি সবাইকে শিখিয়ে দেব।”

    সুকুমার লোকটা যে সত্যিই ধূর্ত সে ব্যাপারে কারো মনেই সন্দেহের অবকাশ রইল না।



    অলংকরণ (Artwork) : রাহুল মজুমদার
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments