




টেবিলের ল্যাম্পের মৃদু আলোয় পরীক্ষার খাতায় লাল কালিতে ঠিক আর কাটা চিহ্ন দিচ্ছিলেন অমিত। সমাজ তাকে একডাকে চেনে—‘আদর্শ শিক্ষক’, ‘ভালো মানুষ’। কিন্তু এই নিস্তব্ধ মাঝরাতে নিজের মুখোমুখি বসতেই তার ভেতরের ভীরু পুরুষটা লজ্জায় অসম্মানে অপরাধবোধে কুঁকড়ে যায়। সে আজ হাড়ে হাড়ে বোঝে, তার এই বহুপ্রশংসিত ‘ভালোমানুষি’ আসলে কোনো সততা বা চারিত্রিক দৃঢ়তা নয়; ওটা সমাজের চাবুক আর লোকলজ্জার ভয়ে সিঁটিয়ে থাকা এক পরম কাপুরুষতা। খাতার ওপরের লাল কালির দাগগুলো হঠাৎ করেই যেন পাহাড়ি ঝরনার ধারালো স্রোত হয়ে তার বিবেককে কেটেকুটে দেয়। আর ঠিক তখনই পিঠের ওপর এসে পড়ে চাবুকের মতো একটা শেষ চাউনি। জলভেজা, তীব্র ঘৃণায় মাখানো সেই চোখদুটো তাকে প্রতি মুহূর্তে বিদ্রূপ করে চলেছে—তুমি পুণ্যবান নও অমিত, তুমি স্রেফ একটা নীতিবাগিশ জীবন্ত লাশ!
লাল কালির দাগটা যেন হঠাৎ খাতার ওপর থেকে সরে গিয়ে পনেরো বছর আগের এক বিকেলে গিয়ে থামল। অমিত কলমটা নামিয়ে রাখল। জানলার বাইরে গাঢ় অন্ধকার, কিন্তু তার চোখের সামনে ভেসে উঠল অন্য এক বিকেল, অন্য এক আকাশ, অন্য এক সময়। তখন সে ছাত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া চলছে, পকেট প্রায় শূন্য। সংসারের টানাটানিতে বইয়ের পাতার পাশাপাশি তাকে টিউশনির খাতাও বয়ে বেড়াতে হতো। বিকেলের পর বিকেল সে মফস্বলের গলিঘুপচি পেরিয়ে পৌঁছে যেত ছাত্রছাত্রীদের বাড়িতে। তাদেরই একজন ছিল মিতা।
মিতার খাতাগুলো ছিল যেন তার নিজেরই একটা গোপন জগৎ। অঙ্কের সূত্র আর হিসেবের ভিড়ে পাতার কোণে কোণে ফুটে উঠত ছোট ছোট ফুল, পাখি, মেঘের ছবি। কোথাও কোনো কবিতার অর্ধেক লাইন, কোথাও বা একটি নামের প্রথম অক্ষর লিখে আবার কেটে দেওয়া। খাতার প্রতিটি পাতায় ছিল এক কিশোরী মনের অজস্র না-বলা কথা। কিন্তু অমিত সেসব কিছুই দেখত না। তার চোখ থামত শুধু অঙ্কের ভুলে, সূত্রের ফাঁকে, সমাধানের পথে। সে এমন মনোযোগ দিয়ে কঠিন সমস্যাগুলো বুঝিয়ে দিত যে অসম্ভব জটিল সমীকরণও মুহূর্তে সহজ হয়ে যেত। যেন বহুদিনের গিঁট পড়া সুতোয় সে শুধু সঠিক জায়গাটায় আলতো আঙুল ছুঁইয়ে দিত, আর সব জট নিজে থেকেই খুলে যেত।
আর মিতা? সে অঙ্কের চেয়ে বেশি মন দিয়ে দেখত মানুষটাকে। বিকেলের আলো জানলা দিয়ে ঢুকে অমিতের মুখে পড়লে তার মনে হতো, মানুষটা যেন পৃথিবীর অন্য সবার চেয়ে আলাদা। তার কথা বলার ভঙ্গি, বোঝানোর ধৈর্য, ভুল করলে রাগ না করে আবার শুরু করার ক্ষমতা—সব মিলিয়ে অমিত তার কাছে রক্তমাংসের কোনো যুবক ছিল না। সে ছিল ‘স্যার’। সেই বয়সে ভালোবাসা শব্দটা মিতার অভিধানে ছিল না। ছিল শুধু অপেক্ষা। বিকেল নামার অপেক্ষা। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দের অপেক্ষা। আর স্যারের চলে যাওয়ার পর খাতার পাতায় হাত বুলিয়ে বসে থাকার এক অদ্ভুত অভ্যাস।
তারপর সময় নিজের নিয়মে বদলে দিল সব। মিতার বিয়ে হয়ে গেল। ট্রেনচালক স্বামী, নতুন সংসার, নতুন শহর। অমিতও উচ্চশিক্ষা শেষ করে স্কুলশিক্ষক হলো। তারও সংসার হলো, সন্তান হলো, দায়িত্ব বাড়ল। জীবন দুইজনকে দুই বিপরীত দিকে বয়ে নিয়ে গেল।
তবু কিছু কিছু অনুভূতি মাটির নিচের জলের মতো। ওপরে শুকনো ধুলো উড়ে, কিন্তু গভীরে তারা রয়ে যায়। পনেরো বছর পর নিয়তি আবার তাদের মুখোমুখি দাঁড় করাল। পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের কোলে এক সরকারি পর্যটন লজে। অমিত এসেছে তার পরিপাটি, সুসংগঠিত পরিবার নিয়ে। তার স্ত্রী ভ্রমণের আগেই ব্যাগের তালিকা বানিয়েছেন, ওষুধ আলাদা পাউচে রেখেছেন, সন্তানের জামাকাপড় রঙ অনুযায়ী গুছিয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে মিতার স্বামী অরূপ—একজন ট্রেনচালক—জীবনটাকেই যেন এক চলন্ত ইঞ্জিনের মতো চালান। কোথায় যাবেন, কখন ফিরবেন, তার নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। রাস্তা ভালো লাগলে গাড়ি থামে, পাহাড় ডাকলে পথ বদলায়। দুটি পরিবার সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ ধরে বেরিয়েছিল। সন্ধ্যার পর এসে মিলল একই ডাইনিং হলে।
পাহাড়ি রাত তখন দ্রুত নেমে এসেছে। লজের পুরোনো ডাইনিং রুমে হলদেটে বাল্বের আলো। জানলার বাইরে অন্ধকার পাহাড়গুলো বিশাল কালো জন্তুর মতো চুপচাপ বসে আছে। দূরে কোথাও ঝিঁঝির ডাক। টেবিলের ওপর ধোঁয়া ওঠা ভাত, সর্ষে-ইলিশ, ডাল আর স্যালাড। সেই টেবিলেই মুখোমুখি বসেছিল অমিত আর মিতা। প্রথমে কেউ কাউকে চিনতে পারেনি। তারপর হঠাৎ একটি দৃষ্টি। আরেকটি দৃষ্টি। সময়ের ধুলো গেল সরে । অমিতের বুকের ভেতর কেমন ঠান্ডা হয়ে এল। এই মুখ সে আগে দেখেছে। বয়স তার চোখের কোণে কয়েকটি সূক্ষ্ম রেখা এঁকেছে, কিন্তু হাসির ভাঁজটা একই রয়ে গেছে। আর মিতার মনে হলো, এই মানুষটার চুলে পাক ধরেছে, চোখে চশমা এসেছে, তবু অঙ্ক বোঝানোর সময় যেমন শান্ত গলায় কথা বলত, ঠিক তেমনভাবেই সে এখন নিজের মেয়েকে মাছের কাঁটা বেছে দিচ্ছে।
চেনার মুহূর্তটা এসেছিল। কিন্তু আশ্চর্যভাবে কেউ কিছু বলল না। “আপনাকে কোথায় যেন দেখেছি...” — এই সহজ বাক্যটুকুও নয়। বরং তারা দুজনেই ভদ্র অপরিচিতের অভিনয় চালিয়ে গেল। স্ত্রীরা কথা বলল। স্বামীরা হাসল। বাচ্চারা মোবাইলে ছবি দেখাল। আর মাঝখানে বসে রইল দুটো মানুষ, যাদের মধ্যে একসময় খাতা, অঙ্ক আর বিকেলের আলো ছাড়া আর কিছু ছিল না। কেন তারা নিজেদের পরিচয় গোপন করল? সম্ভবত তারা নিজেরাও জানত না। হয়তো কিছু সম্পর্কের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হলো অসম্পূর্ণতা। হয়তো তারা ভয় পেয়েছিল। অথবা হয়তো দুজনেই বুঝেছিল—একবার যদি বলা হয়, “আমি তোমাকে চিনেছি”—তাহলে পনেরো বছরের নিখুঁতভাবে সাজানো জীবনটার কোথাও একটা সূক্ষ্ম ফাটল দেখা দিতে পারে। তাই তারা চুপ করে রইল। আর অযোধ্যা পাহাড়ের কালো অন্ধকারের মধ্যে, ঝিঁঝির একঘেয়ে ডাকের আড়ালে, তাদের আসল পরিচয়টা অনুক্তই থেকে গেল—যেন তারা কোনোদিনই কেউ কাউকে জানত না। অথচ দুজনেরই মনে হচ্ছিল, এই ডাইনিং টেবিলের নিচে কোথাও এক অদৃশ্য নদী বয়ে চলেছে, যার উৎস পনেরো বছর আগের এক মফস্বলি বিকেলে।
বামনি ঝরনার সেই পাহাড়ি খাঁজটায় তখন মেঘ জমেছে। সুবর্ণরেখার এক অশান্ত উৎসনদী বামনি ঝর্ণার পাথরে মাথা কুটে ফেনা ছড়াচ্ছে, যার বুনো গর্জনে চারপাশের ফিসফিসানিও হারিয়ে যায়। জংলী ফুল আর ভেজা মাটির স্যাঁতসেঁতে গন্ধ বাতাসে এক অদ্ভুত মাদকতা ছড়াচ্ছিল, যা অমিতের চেনা ব্যাকরণের পৃথিবীর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।
সুযোগটা মিতাই তৈরি করেছিল। পায়ে কাঁটা ফোটার বাহানায় সে ভিড় থেকে কিছুটা পিছিয়ে যায়, আর অমিত—তার স্বভাবসুলভ ভদ্রতায়—তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসে বাকিদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
ঝরনার ঠিক মুখে এসে মিতা দাঁড়াল। তার ভেজা শাড়ির আঁচলটা বাতাসে উড়ছে। পনেরো বছর ধরে ট্রেনের চাকার ঘড়ঘড়ানি শোনা কানের ভেতর তখন এক আদিম সুর বাজছে। সে অমিতের চোখের দিকে তাকিয়ে আচমকা বলে উঠল, “সিনেমার নায়কদের দেখেননি স্যার? কেমন করে নায়িকাকে আলতো করে কোলে তুলে নিয়ে উত্তাল ঝরনার জলে নেমে যায়? আজ আপনি আমাকে ঠিক ওভাবে কোলে তুলে ওই শীতল স্রোতে নামিয়ে দেবেন? আমার বড্ড ইচ্ছে...”
মিতার ঠোঁট কাঁপছিল। সে মনে মনে বলছিল—আজ অন্তত একটা অন্যায় করুন স্যার, আজ অন্তত এই খাঁচায় বন্দী ভদ্দরলোকটার খোলস ছেড়ে একটা আস্ত পুরুষ হয়ে উঠুন।
ঝরনার জল তখন পাহাড়ের বুক চিরে এমন উন্মত্ত বেগে নেমে আসছিল, যেন বহু শতাব্দীর জমে থাকা কোনো অভিমান আজ একসঙ্গে ফেটে বেরিয়েছে। চারপাশে কুয়াশার মতো জলকণা উড়ছিল। পাথরগুলো ভিজে কালো হয়ে আছে। দূরে শাল-পিয়ালের বন স্থির, অথচ ঝরনার গর্জনের মধ্যে সেই স্থিরতাও যেন কাঁপছে। মিতা দাঁড়িয়ে ছিল জলের কিনারে। তার চোখে সেই চেনা দুষ্টুমি ছিল না, ছিল না মধ্যবয়সী গৃহবধূর কোনো সংকোচও। বরং সেখানে ছিল এক অদ্ভুত দৃঢ়তা—পনেরো-ষোলো বছর ধরে বুকে পুষে রাখা একটা অসমাপ্ত দৃশ্যকে শেষ পর্যন্ত বাস্তব করার জেদ।
সে ধীরে ধীরে বলল,
— মনে আছে স্যার, একদিন পড়াতে পড়াতে বলেছিলেন, মানুষের সব ইচ্ছে পূরণ হয় না?
অমিত হেসে ফেলতে চেয়েছিল, কিন্তু গলাটা শুকিয়ে গেল।
— হয়তো বলেছিলাম।
— আজ বুঝলাম, কিছু ইচ্ছে মানুষ নিজেই পূরণ হতে দেয় না।
তারপর এক পা এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল,
— একবার... শুধু একবার আমাকে কোলে তুলে নিয়ে ওই জলের নিচে নিয়ে চলুন। একটাও কথা বলবেন না। কোনো সম্পর্ক বদলাবে না। কোনো পাপ হবে না। শুধু একটা স্মৃতি হবে।
অমিতের বুকের ভেতরটা ধকধক করছিল। এত বছর পরেও মিতার চোখে সে নিজেকে সেই পুরোনো দিনের তরুণ গৃহশিক্ষক হিসেবেই দেখতে পেল। মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, পৃথিবীতে তারা ছাড়া আর কেউ নেই। না স্ত্রী, না সন্তান, না সমাজ, না নীতি, না দায়িত্ব। কিন্তু ঠিক পরের মুহূর্তেই অদৃশ্য কত শত মুখ তার চারপাশে ভিড় করে দাঁড়াল। স্কুলের সহকর্মী, ছাত্রছাত্রী, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী—এমনকি নিজের তৈরি করা আদর্শ মানুষটার মুখও। তার পা দুটো যেন পাথরের সঙ্গে আটকে গেল। সে মৃদু কাঁপা গলায় বলল,
— জলটা খুব ঠান্ডা, মিতা... পাথরগুলোও ভীষণ পিছল...
কথাটা শেষ করেই সে বুঝতে পারল, পৃথিবীর ইতিহাসে এর চেয়ে হাস্যকর অজুহাত খুব কম মানুষই দিয়েছে।
মিতা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তার দিকে। তারপর ধীরে ধীরে ঠোঁটের কোণে একটা হাসি ফুটল। হাসি নয়—বরং একটা রায়। যে রায়ে কোনো চিৎকার নেই, কোনো রাগ নেই, শুধু চূড়ান্ত হতাশা আছে। সে মাথা নাড়ল।
— জানেন স্যার, ছোটবেলায় ভাবতাম আপনি খুব সহজ সরল মানুষ।
অমিত কিছু বলার আগেই সে যোগ করল,
— আজ বুঝলাম, আপনি খুব ভালো মানুষ। আর এই দুটো জিনিস এক নয়, পরস্পরের বিপরীত।
তারপর সে ঘুরে দাঁড়াল। পা পিছলে যাওয়ার মতো অছিলায় একটা অনায়াস ভঙ্গিতে নিজেকে ছেড়ে দিল উচ্ছ্বসিত জলধারার ভেতর। মুহূর্তে তার শাড়ি, চুল, শরীর সব ভিজে উঠল। পাহাড়ি রোদ ভাঙা জলের ফোঁটায় রংধনুর মতো ঝিলিক দিল।
অমিত দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যটা এইমাত্র তার সামনে জন্ম নিল—অথচ সে চোখ তুলে তাকানোর সাহসও পেল না। কোনো কোনো গভীর রাতে, যখন স্ত্রী ঘুমিয়ে পড়ে, ঘরের আলো নিভে যায়, আর জানলার বাইরে বৃষ্টি নামে, তখন সেই ঝরনার শব্দ ফিরে আসে। অমিত ভাবে, সেদিন মিতা তাকে ভালোবাসার প্রস্তাব দেয়নি। পাপের আমন্ত্রণও জানায়নি। সে শুধু চেয়েছিল জীবনের এক অপূর্ণ দৃশ্য পূর্ণ করতে। কৈশোরের এক অসমাপ্ত স্বপ্নকে এক মুহূর্তের জন্য ছুঁয়ে দেখতে। সে শুধু জানতে চেয়েছিল, মানুষটা আদৌ মানুষ কিনা। নাকি সারাজীবন ধরে নিজের চারপাশে নীতি, ভদ্রতা, ভালো মানুষের ইট গেঁথে এমন এক দেয়াল তুলেছে, যার ভেতরে হৃদয় বলে আর কিছুই বেঁচে নেই। সেদিন ঝরনার ধারে কোনো প্রেমের মৃত্যু হয়নি। মারা গিয়েছিল আরও দুর্লভ কিছু। একজন নারীর বিশ্বাস।
সেই রাতে হোটেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে পাহাড়ের অন্ধকার দেখছিল অমিত। দূরে কোথাও ঝরনার শব্দ আসছিল। অদ্ভুতভাবে মনে হচ্ছিল, শব্দটা জলের নয়—ভেঙে যাওয়া একটা স্বপ্নের। আর সেই দিন থেকেই অমিত বুঝেছিল, অতিরিক্ত ভালো মানুষ হওয়া কোনো গুণ নয়। অনেক সময় ওটা সাহসের বিপরীত নাম। ওটা এমন এক মুখোশ, যার আড়ালে মানুষ নিজের সমস্ত আকাঙ্ক্ষা, সমস্ত দুর্বলতা, সমস্ত মানবিকতাকে বন্দি করে রাখে।