• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৩ | জুলাই ২০২৬ | গল্প
    Share
  • চৌঠা মে ও মাধবপুকুর : অর্ঘ্য দত্ত

    ঝিম-ধরা দুপুরে একটানা আওয়াজ হচ্ছিল। ল্যাপটপ নামিয়ে রেখে দোতলার বারান্দায় বেরিয়ে এসে দেখি একটা ঠেলা-গাড়ি থেকে মাধবপুকুরের বাঁধানো ঘাটে বাঁশ ফেলে জমা করছে পঞ্চাদা। পঞ্চাদা নিজে নয়, ওর কর্মচারীরা। পঞ্চাদা দাঁড়িয়ে তদারকি করছে। পিসিও বোধহয় এই আওয়াজ শুনেই দোতলার বারান্দায় এসে থাকবে, দেখি রেলিংএ ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে পুকুরের জলের দিকে। মে মাস শুরু, প্রখর রোদের তেজ। মাধবপুকুরের ধূসর জল‌ও এই সময়ে রূপালি লাগে। পুকুরের পূবপারে আমাদের বাড়ির বারান্দায় আমাকে দেখে পঞ্চাদা ওপার থেকেই হাত নাড়ে। মুখে একগাল হাসি।

    "বৌভাতের প্যান্ডেল হবে, না রে?" পিসি আমার দিকে না তাকিয়েই প্রশ্ন করে।

    "আগে ক্লাবের ফাংশান হবে। রবীন্দ্রজয়ন্তী। তারপর ওই প্যান্ডেলে‌ই বৌভাত। আর বৌভাতের দিন ওই উত্তর দিকের রাস্তাটা ঘিরে নেবে বলেছে, ওখানে গোল টেবিল-চেয়ার পেতে খাওয়ার ব্যবস্থা। হল ভাড়ার চেয়ে অনেক সস্তায় হয়ে যাবে, পঞ্চাদাই আইডিয়াটা দিল..." উৎসাহের সঙ্গে পিসিকে বলি।

    "আর জায়গা পেলি না, এই পুকুরের ওপর‌ই তোর বৌভাত করতে হবে..." বিড়বিড় করে পিসি।

    চৌকো মাধবপুকুরকে মধ্যে রেখে ঘন হয়ে উঠেছে এই মাধব মিত্র কলোনি। পুকুরের চার পাশে পিচের রাস্তা। রাস্তার অন্য ধারে সারিবদ্ধ বাড়ি। একসময়ে রিফিউজিদের টালি বা টিনের চাল ও দরমার বাড়ি ছিল। ক্রমে সব পাকা হয়ে গেছে। দু-একটি বহুতল আবাসন‌ও তৈরি হয়েছে ইদানিং। আমার ঠাকুরদা প্রায় তেত্রিশ বছর আগে, নিউব্যারাকপুরের বাড়ি বিক্রি করে, আড়াই কাটা জমির ওপর এই বাড়িটা কিনে সপরিবারে উঠে এসেছিলেন। আমি তখন মায়ের পেটে।

    “কোথায় করব? পাড়ায় কোনও ফাঁকা জমি আছে? হলগুলো কত ভাড়া নেয় জানো? আর বাড়ির ছাদে প্যান্ডেল বেঁধে করলে ঘর বাড়িতে বাইরের লোকজন জুতো পরে থইথই করবে, এ ঘরে ও ঘরে ঢুকে পড়বে, সে সব ভাল লাগবে!” পিসি কিছু বলে না।

    পঞ্চাদার পৈতৃক ব্যবসা, 'মা ডেকরেটর'। কিন্তু সারা বছর পাড়ার লোকে হল বা অনুষ্ঠানবাড়ি ভাড়া করে উৎসব করলে সে বেচারার সংসার চলে কী করে! অথচ প্যান্ডেল বাঁধার জায়গা নেই। তাই পাড়ার ক্লাবের পুজো বা অন্যান্য অনুষ্ঠান এখন হয় এই মাধবপুকুরের‌ই এক কোনে জলের ওপর ভাসন্ত পাটাতন পেতে প্যান্ডেল করে। পঞ্চাদা ক'মাস আগে ক্লাবের বাইরে ডেকে এনে আমাকে নিচু গলায় বলেছিল, "এমন ভাবে বিয়ের দিন ফেল, ক্লাবের রবীন্দ্রজয়ন্তীর প্যান্ডেল আমি খুলব না, ওখানেই তোর বৌভাতের অনুষ্ঠান করিস। আমি সস্তায় সব করে দেব। উইন উইন সিচুয়েশন।"

    পাড়ার ক্লাবের‌ মাতব্বর পঞ্চাদা বোধহয় স্কুলের গণ্ডিও ডেঙায়নি, তার মুখে 'উইন-উইন সিচুয়েশন' শুনে চমকে উঠে বলি, "কী বললে?"

    "ছাড় ওসব। মোদ্দা কথা, তোর খরচ বাঁচবে। আমারও কিছু আমদানি হবে,” বলেই খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে উঠেছিল পঞ্চাদা।

    "সব নেমন্তন্ন হয়ে গেছে রে?" পুকুরের দিকে তাকিয়েই পিসি এবার নিচুস্বরে প্রশ্ন করে।

    "হ্যাঁ," আমি বলি, "খুব বেশি লোক তো বলছি না।"

    "সুমনকে বলবি না?"

    "কে?" আমি পিসির দিকে অবাক হয়ে তাকাই।

    পিসিও মাধবপুকুর থেকে মুখ ঘুরিয়ে এবার আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, "সুমন। ছেলেটা এত করেছিল..."

    "তোর পিসি ঠিকই তো বলেছে। সুমনের কথা আমার‌ও যে কেন মনে পড়েনি! ওকে অবশ্যই বলা উচিত," মা যে কখন আমাদের পেছনে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল‌ও করিনি।

    "ঠিক আছে, পরশু গিয়ে নেমন্তন্ন করে আসব। রবিবার, ট্রেনে ভিড় কম থাকবে... ওর পুরোনো নম্বর‌টাও তো আর নেই যে ফোনে কথা বলব," বলে আবার ঘরে গিয়ে ল্যাপটপের সামনে বসি। ওয়ার্ক ফ্রম হোম চলছিল।

    ***

    প্রায় দশ বছর আগের কথা। বাবা মারা যাওয়ার বছর খানেক পরে। রবিবার। মায়ের স্কুল ছুটি। দুপুর গড়িয়ে গেছে। এমন সময় কলিং-বেল। একতলার বারান্দায় বেরিয়ে দেখি একটি শ্যামলা, সুশ্রী তরুণী দাঁড়িয়ে আছে। পরনে সাধারণ ফুলছাপ সালোয়ার কামিজ। কিছু বিক্রি করতে এসেছে ভেবে বিরক্তির স্বরে প্রশ্ন করি, "কাকে চাই?"

    "মামা আছেন?" মেয়েটির দ্বিধান্বিত স্বর।

    "কে মামা? কোথা থেকে এসেছেন?" আবার প্রশ্ন করি।

    "কে রে? কে এসেছে?" ততক্ষণে মা-ও ঘর থেকে বারান্দায় বেরিয়ে এসেছে।

    "আমার নাম করুণা। হরিণঘাটায় থাকি। আমি..."

    "তুমি তো জয়ি মানে জয়িতার মেয়ে, তাই না?" মেয়েটি কথা শেষ করার আগেই মা অবাক গলায় প্রশ্ন করে।

    মেয়েটি সম্মতিসূচক মাথা নাড়লে, মা বলে, "মুখ দেখেই বুঝেছি। ভেতরে এসো। অমিত, দরজা খুলে দে।"

    মেয়েটি আমার পিসির মেয়ে, যে পিসির অস্তিত্ব সম্বন্ধে আমি কিছুই জানতাম না। পিসি করুণার হাত দিয়ে একটা চিঠি লিখে পাঠিয়েছিল আমার বাবার উদ্দেশে। চিঠিটা মা আমাকে পড়িয়েছিল। "দাদাভাই, তোর মণিদা মনে হয় বাঁচবে না। তুই ছাড়া আমার তো নিজের আর কেউ নেই। একবার আসবি? -- জয়ি"

    মেয়েটি বেশিক্ষণ বসেনি। মা অনেককরে খেয়ে যেতে বলেছিল, কিন্তু তাও কিছু খেতে রাজি হয়নি। আমার বাবা যে মারা গেছে তাও সে জানত না। মা শুধু অবাক হয়ে প্রশ্ন করেছিল, "এ বাড়ির ঠিকানা কোথায় পেলে?"

    "বছর তিনেক আগে মামা একবার এসেছিলেন আমাদের বাড়ি। ভাইফোঁটার দিনে। ওই একবার‌ই। তখন বলেছিলেন এই বাড়ির কথা, মাধব মিত্র কলোনির কথা। বাকিটা খুঁজে নিয়েছি‌," মেয়েটি ম্লান মুখে বলেছিল।

    "আশ্চর্য, তোমার মামা যে গিয়েছিল সেকথা আমাকেও কখন‌ও বলেনি! মণিদা, মানে তোমার বাবার ঠিক কী হয়েছে?" মা প্রশ্ন করেছিল।

    "অনেক বছর ধরেই সুগারে ভুগছে। কিন্তু একদম নিয়ম মেনে চলে না। তাই নিয়েই খুব পরিশ্রম করত। দুটো কিডনিও খারাপ হয়ে গেল। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা চলছিল, কিন্তু সে সবেও তো আসলে স্টেরয়েড থাকত। আর‌ও ক্ষতি করেছে। এখন ঘনঘন ডায়ালিসিস, তাতেও আর সামলানো যাচ্ছে না, হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে, না হলে..."

    "মাকে বলো যে কাল সকালে আমি আর অমিত তোমাদের বাড়ি আসব।" এই প্রথম মেয়েটির মুখ উজ্জ্বল হল। বাড়ির ঠিকানা, কীভাবে যেতে হবে সব বুঝিয়ে বলল। তারপর মাকে প্রণাম করে আমার দিকে তাকিয়ে একটা কৃতজ্ঞতার হাসি হাসল। সেই হাসিতে একরকমের সারল্য‌ও ছিল।

    "আমি এখন আসি, মাইমা‌," বলে মেয়েটি মাথা নিচু করে বেরিয়ে গেল।

    করুণা চলে যাওয়ার পর মার মুখে সব শুনি। মায়ের বিয়ের‌ও বহু আগে আমার ঠাকুমার ভাইয়ের ছেলে বাংলাদেশ থেকে এসে আশ্রয় নিয়েছিল তার পিসির নিউ ব্যারাকপুরের বাড়িতে। আমার বাবা ও পিসি তাকে মণিদা বলে ডাকত। মা বিয়ের পরে এসেও শ্বশুরবাড়িতে তাকে দেখেছে। আমার জন্মের কমাস আগে হঠাৎ পিসি নিরুদ্দেশ হয়ে যায় সেই মণিদার সঙ্গে। ঠাকুরদা লজ্জায়, অপমানে রাতারাতি জলের দামে সেই বাড়ি বিক্রি করে ছেলে, ব‌উ এবং গর্ভবতী পুত্রবধূকে নিয়ে মাধব মিত্র কলোনির এই বাড়িটি কিনে উঠে আসেন। তখন অবশ্য একতলা ছিল। দুটি ঘর, বারান্দা, রান্নাঘর আর কলতলা। যে কবছর বেঁচেছিলেন, ঠাকুমাকে অহরহ ঠাকুরদার গঞ্জনা সহ্য করে যেতে হয়েছে‌। তবে বেশিদিন নয়, কারণ ঠাকুমা খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে প্রায় স্বেচ্ছামৃত্যু ডেকে এনেছিলেন। ঠাকুমার কথা আমার মনেও পড়ে না। এ বাড়িতে আমার সামনে অন্তত কেউ কখনও পিসির নাম‌ও উচ্চারণ করেনি। আমি সারাজীবন জেনে এসেছি আমার বাবাও ছিল আমার মতোই একমাত্র সন্তান।

    করুণা যেদিন এসেছিল তার পরের দিন মা স্কুলে না গিয়ে আমাকে নিয়ে হরিণঘাটায় পিসির বাড়ি এসেছিল। আমার বাইশ বছর বয়সে সেই প্রথম পিসিকে দেখা। সেই মাটির আটচালা ঘরের দাওয়ায় মৃতপ্রায়, কঙ্কালের মতো শরীরের এক ভদ্রলোক শুয়ে ছিলেন। শুনলাম তার চিকিৎসার প্রয়োজনে ঐ সামান্য বসতভিটাটুকুও বন্ধক দিতে হয়েছে। আমরাই হলাম পিসির শেষ আশ্রয়। করুণার মুখে আমার বাবার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে পিসি যেন বোবা হয়ে গিয়েছিল। আমার মা এসে স্বেচ্ছায় সব দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়। বাবার পেনশন ছাড়াও আমার মা সরকারি স্কুলের শিক্ষিকা হিসেবে বেতন‌ও পেত। আমাদের আর্থিক অবস্থা তখন মোটের ওপর সচ্ছল।

    সেই অসুস্থ মানুষটিকে, যিনি সম্পর্কে আমার মণি জেঠা, আবার পিসেমশাইও, যখন সরকারি হাসপাতালে নিয়ে আসি, অনভিজ্ঞ আমি একা যে কীভাবে সবদিক সামলাব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। একটা খোলা ম্যাটাডোর ভ্যানের ওপর গদি-সতরঞ্চি বিছিয়ে গ্রাম থেকে আনা হয়েছিল নিকটবর্তী শহরের এক হাসপাতালে। সঙ্গে পিসি আর করুণা। গ্রামের কোনও প্রতিবেশীকেও সঙ্গে পাওয়া যায়নি। বোধহয় কারো সঙ্গেই ওদের বিশেষ সম্পর্ক ছিল না। গাড়ি থেকে নামিয়ে ভদ্রলোককে স্ট্রেচারে তোলার সময় যখন ভাবছি কার সাহায্য চাইব, তখন‌ই সুমন এগিয়ে এসেছিল। বাইশ-তেইশের এক যুবক, প্রায় পাঁজাকোলা করে ম্যাটাডোর থেকে নামিয়ে ভদ্রলোককে স্ট্রেচারে তুলেছিল। ভিড় সরিয়ে ট্রলি যাওয়ার পথ করে দিচ্ছিল। ডাক্তার দেখানো, কাগজপত্র রেডি করে হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করা, এমনকি ট্রলি থেকে মানুষটাকে বেডে তুলতে পর্যন্ত সাহায্য করেছিল। আমাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে ছোটাছুটি করে তালিকা মিলিয়ে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র জোগাড় করে দিয়েছিল সুমন।‌

    "তুমি কে বাবা? অমিতের বন্ধু বুঝি?" মণি জেঠার বেডের পাশে পাথর হয়ে বসে থাকা কিংকর্তব্যবিমূঢ় পিসি সেই প্রথম কথা বলেছিল।

    "না, মাসীমা। এখানে একজনকে রক্ত দিতে এসেছিলাম। ফিরে যাওয়ার সময় ও একা সামলাতে পারছে না দেখে সঙ্গে হাত লাগিয়েছিলাম," আমাকে ইশারায় দেখিয়ে সুমন উত্তর দিয়েছিল।

    "তুমি আমাদের অনেক উপকার করলে বাবা। তোমার নাম কী? কোথায় থাক?" পিসি প্রশ্ন করে।

    "সুমন। স্টেশন থেকে আসার সময়ে বাঁদিকে যে জলের উঁচু ট্যাঙ্কটা দেখেছেন, তার ঠিক পাশেই আমাদের বাড়ি।"

    সেদিন বিকেলে সুমন আবার এসেছিল। পরের দিন সকালেও। আর তারপর হাসপাতালে যে দশ দিন যমে আর মণি জেঠার মধ্যে টানাটানি চলল তার প্রতিটি দিন। দুইবেলা করে। যম তো একা ছিল না, তার সঙ্গে ছিল ওদের দারিদ্র্য, পিসি আর করুণার ভবিষ্যত নিয়ে মণি জেঠার দুশ্চিন্তাও। শুধু আমার মা বলেছিল, "অমিত, তোর বাবা বেঁচে থাকলে এই সময়ে তার বোনের জন্য যা করত, তোকেই এখন সেটা করতে হবে।"

    চেষ্টা করেছিলাম। অনিচ্ছুক করুণাকে মায়ের সঙ্গে মাধব মিত্র কলোনীর বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে আমি নিজে পিসির সঙ্গে হাসপাতালে থাকতাম।

    সেইসময় সুমন আমাকে সঙ্গ দিয়েছিল। রোজ দুবেলা হাসপাতালে আসত আমাদের খোঁজখবর নিতে। মাটির ভাঁড়ে বাইরের দোকান থেকে চা নিয়ে হাসপাতালের ভেতরে গিয়ে পিসিকে দিয়ে আসত। আমরা বন্ধু হয়ে উঠছিলাম। পরোপকার করাই ছিল ওর নেশার মতন।

    সুমনের উচ্চতা খুব বেশি হলে পাঁচ ফুট দুইঞ্চি। শ্যামলা। মেদহীন, পাকানো শরীর। সরু কোমর, চ‌ওড়া চ্যাটালো বুক। ভাঙা গাল। কোটরের মধ্যে গভীর জ্বলজ্বলে দুটো চোখ। মাথা ভর্তি ঘন কালো ঝাঁকড়া চুল। আর হাসিটা ছিল ভারি উজ্জ্বল।

    যেহেতু ওই মফস্সল থেকে বারবার মাধব মিত্র কলোনির বাড়িতে আসা যাওয়া সম্ভব ছিল না তাই দুপুর বেলায় সুমন জোর করে আমাকে খেতে নিয়ে যেত ওদের বাড়িতে। টালির চাল দেওয়া দরমার দুটো ঘর। সামনে টানা বারান্দার এক ধারে রান্নার ব্যবস্থা। দুটি ঘরের একটিতে থাকত ও, অন্যটাতে দুই মেয়েকে নিয়ে ওর বিধবা মা। কী যে আন্তরিক ব্যবহার ওর মা আর বোনেদের! ওই কদিনের মধ্যেই এমন সহজ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল যেন কতদিনের পরিচয়। দুপুর বেলায় সাধারণ দুটো ডাল ভাত খেয়ে ওর ঘরে, ছোটো তক্তপোশে দু-এক ঘন্টা ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে আবার হাসপাতালে ফিরে যেতাম।

    করুণা প্রতিদিন বিকেলে কিছুক্ষণের জন্য আসত। দশ দিন পরে অবস্থার একটু উন্নতি হলে, আমি সুমনের কাছে জানতে চাই ও এক রাত হাসপাতালে পিসির কাছে থাকতে পারবে কিনা। ও সানন্দে রাজি হয়। যেদিন বিপদমুক্ত ভেবে বাড়ি ফিরে যাই, সেদিন‌ই গভীর রাতে মণি জ্যাঠা মারা যায়। সারারাত মৃতদেহের পাশে শোকস্তব্ধ পিসিকে সামলে রেখেছিল এই সুমন। হাসপাতাল থেকে মণি জেঠার মৃতদেহ শ্মশানে নিয়ে যাওয়া ও সৎকার করা সমস্ত কিছুই হয়েছিল সুমনের তত্ত্বাবধানে। আমার চেয়ে যে সুমন অনেক বেশি করিতকর্মা পিসিও সেটা বুঝতে পারত।

    পিসির ইচ্ছায় এগারো দিনের কাজ হয়েছিল হরিণঘাটার ওই গ্রামের বাড়িতেই। সেখানেও সুমন আমার সঙ্গী। তারপর সেই বাড়ির পাট চুকিয়ে আমার মা ওদের নিয়ে আসে আমাদের মাধব মিত্র কলোনির বাড়িতে। পিসির হরিণঘাটার বাড়ি এমনিতেও ছাড়তেই হত কারণ তার দলিল ছিল মহাজনের কাছে বাঁধা। পিসির না ছিল সঞ্চয় না স্ত্রীধন। তবু মাকে বলেছিল, "বৌদি, দাদা নেই, তোমার পরে কোন অধিকারে এতবড় বোঝা চাপাব?"

    "মাধব মিত্র কলোনির বাড়ি আমার শ্বশুরমশাই কিনেছিলেন। হ্যাঁ, দোতলাটা অবশ্য পরে তোমার দাদাই করেছিল। তবু, ওই বাড়িতে তোমার‌ও অধিকার আছে জয়ি। তোমার‌ও বাবার বাড়ি ওটা। তোমরা ওখানেই থাকবে," মা বলেছিল।

    পিসি এ বাড়িতে এসেই নীরবে সংসারের যাবতীয় কাজ নিজে করা শুরু করেছিল। করুণা ছিল আমার চেয়ে বছর দুয়েকের ছোট। ওর হায়ার সেকেন্ডারির রেজাল্ট বেরলো মণি জেঠা মারা যাওয়ার পরের মাসে। সেকেন্ড ডিভিশন। মা ওকেও উত্তর কলকাতার এক মেয়েদের কলেজে বাংলায় অনার্স নিয়ে ভর্তি করে দিল।‌

    সুমন যেদিন প্রথম আমাদের এই মাধব মিত্র কলোনির বাড়িতে আসে, করুণা পিসিকে বলেছিল, "বাবার ঘড়িটা সুমনদাকে দিয়ে দাও মা।" পিসি তাই দিয়েছিল। ফেভার ল্যুভার কোম্পানির ঘড়ি। তারপর থেকে সুমন আসত মাঝে মাঝেই। কিন্তু বিপদের দিনে ওকে যেমন সহজ ভাবে বন্ধু বলে গ্রহণ করতে পেরেছিলাম, পরে আমাদের জীবন স্বাভাবিক হয়ে এলে ও ক্রমে শুধুমাত্র ওই কদিনের স্মৃতিচিহ্ন হয়ে উঠছিল। সামান্য পড়াশোনা করা সুমনের সঙ্গে কুশল বিনিময়ের পরেই কথা ফুরিয়ে যেত। তবু ও আসত। ওর বাঁ হাতের সরু কবজিতে সোনালি ব্যান্ডের ঘড়িটা বেমানান লাগতো। ও এলে পিসি একাই ওর সঙ্গে বসে কথা বলত, বাড়ির অন্যদের খোঁজ খবর নিত। জোর করে ভাত খাইয়ে দিত। পিসি ও সুমন কেউই বেশি কথা বলত না অথচ ঘন্টার পর ঘন্টা নীরবে কাটিয়ে দিতে পারত। বেশির ভাগ সময়েই আমি, 'সুমন, এসেছ যখন খেয়ে যেও' বলে হয় ইউনিভার্সিটি চলে যেতাম নয়তো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে বেরিয়ে যেতাম। পরের মাসে ও আবার আসত। ও কোনোদিন‌ও আমাদের কাছে কিছু চাইত না। কখন‌ও চায়নি।

    পিসি আর করুণা থাকত আমাদের এক তলার ঘরে। রান্না ও খাওয়ার ঘর‌ও ছিল একতলাতেই। দোতলার দুটো ঘরে মা আর আমি। একুশ বছর বয়সে এসে প্রথম দেখা একজন মধ্যবয়স্কা মহিলাকে পিসি বলে যদিও বা মেনে নিতে পেরেছিলাম কিন্তু করুণার মতো এক অচেনা তরুণীর প্রতি বোনের মতো কোনো অনুভূতি জাগাতে পারিনি। করুণাও প্রথম থেকেই নিজেকে যথাসম্ভব সঙ্কুচিত করে রাখত। তবে এখানে আসার পর ওর চেহারা ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল। ওর সরল মুখে এক স্বাভাবিক লাবণ্য ছিল। হঠাৎ এক সুশ্রী তরুণীর উপস্থিতিতে পাড়ার যুবকদের মধ্যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছিল। আমাদের বারান্দার সামনের পুকুর পাড়ে ছেলেদের জটলা বাড়ছিল। সে বছর দুর্গা পূজার বিসর্জনে বাড়ির সামনে তুবড়ি কিছু বেশি পুড়ল, ছেলেরা দলবেঁধে অনেকক্ষণ ধরে নাচল 'তু চিজ বড়ি হ্যায় মস্ত্ মস্ত্'-এর সুরে বাজা ব্যাঞ্জোর সঙ্গে।

    একবার বিশ্বকর্মা পুজোয় ছাতে ঘুড়ি ওড়াচ্ছিলাম। একা ঠিকমত বাড়তে না পারায় ঘুড়িটা কেটে গেল। লাটাই রেখে চিলেকোঠার ভেজানো দরজা খুলে নিচে নামতে গিয়ে সজোরে করুণার সঙ্গে ধাক্কা। বোধহয় ভেজানো দরজার আড়াল থেকে দেখছিল। আচমকা ধাক্কায় তাল রাখতে না পেরে পড়েই যাচ্ছিল।

    "তুই এখানে দাঁড়িয়ে কী করছিলিস?" আমি দুহাতে ওর কাঁধ খামচে ধরে পড়ে যাওয়া থেকে আটকাই। ওর চোখ বোজা, ঠোঁট স্ফুরিত। কপালে, নাকে ও গ্রীবায় বিন্দু বিন্দু ঘাম।

    "এই, এখানে কী করছিস রে তোরা?" পিসিও ঠিক তখনই সিঁড়ির বাঁকে এসে দাঁড়িয়েছে।

    "দেখ না, এখানে চুপ করে দাঁড়িয়েছিল, আমি দরজা খুলে নামতে গিয়েই ধাক্কা.., না ধরে ফেললে ঠিক পেছনে পড়ে চোট পেত..." অস্বস্থির সঙ্গে বলি।

    "করুণা, নিচে আয় এখনি..." বলে পিসি পায়ের আওয়াজ তুলে নেমে গিয়েছিল। এর পর থেকে করুণা ওপরে এলেই পিসি কোনো কাজের অছিলায় ডেকে নিয়ে যেত। আমার সঙ্গে ওর কথাই হত না। শুধু রাতের বেলায় কোনোদিন আড্ডা মেরে ফিরতে একটু বেশি রাত হয়ে গেলে দোতলার বারান্দায় মাকে আর একতলার বারান্দায় করুণাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতাম। আমি বেল টেপার আগেই নীরবে এসে দরজাটা খুলে দিয়ে সরে দাঁড়াত।

    এভাবেই দেখতে দেখতে প্রায় দুটো বছর কেটে গেল। ততদিনে পিসি সংসারের সব কাজকর্মের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। সকাল নটা নাগাদ মা বেরিয়ে যেত স্কুলে। করুণাও কলেজে। আমি ততদিনে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করে ঘরে বসে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করছি। একদিন সকালে উঠে দেখা গেল বাড়ির মেইন দরজা ভেজানো, করুণা নেই। পিসি কঠিন মুখ করে সারাদিন বসে থাকল। মা চিন্তিত মুখে স্কুলে গেল। আমি বাড়িতেই ছিলাম। মা স্কুল থেকে ঘন ঘন ফোন করছিল করুণা ফিরেছে কিনা জানতে। সুমনের কাছে তখন সস্তা, সেকেন্ড হ্যান্ড মোটোরোলার মোবাইল। দুপুরে ফোন করলাম। ও আমাকে হঠাৎ ফোন করতে দেখে অবাক হয়েছিল। ওর সঙ্গে দুয়েকটা সাধারণ কথা বলে ফোন রেখে দিয়েছিলাম। আমি করুণার নিরুদ্দেশ হ‌ওয়ার প্রসঙ্গ তুলিনি, কারণ বুঝতে পেরেছিলাম করুণা ওখানে যায়নি। মা সন্ধ্যায় স্কুল থেকে ফিরে পুলিশে খবর দিতে বলেছিল।

    "কোনো দরকার নেই, আমার‌ই তো মেয়ে, জেদি, গোঁয়ার। তেজ পড়ে গেলে ঠিক ফিরে আসবে," পিসি বলেছিল।

    সেদিন‌ই রাতের বেলায় ভরা জ্যোৎস্নায় মাধবপুকুরের উত্তর-পশ্চিম কোনে জলের ওপর ভেসে উঠেছিল করুণা। তখন‌ও মাধবপুকুরের চারদিক বাঁধিয়ে এমন সৌন্দর্যায়ন করা হয়নি। জলে কচুরিপানা বা ডাবের খোলা ভাসত। গরমকালে পুকুর পাড়ে ছেলে-পুলেরা রাত করে বসে গুলতানি মারত। পঞ্চাদার চোখেই প্রথম পড়ে। পঞ্চাদাই জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই ফুলে ওঠা শব পাড়ে তুলেছিল। তারপর ডেথ সার্টিফিকেট, থানা-পুলিস, লোকাল কর্পোরেটর সব সামলিয়ে রাতারাতি দাহকার্য সম্পন্ন করিয়েছিল। পিসি নিজের ঘরে থম মেরে বসেছিল। মধ্যবিত্তের কলোনিতে যত চাপা গুঞ্জন বেড়েছিল, পিসির কথা বলা তত কমে গিয়েছিল।

    মৃত্যুর তিন দিনের মাথায় সামান্য আয়োজনে পারলৌকিক কাজ করা হয়েছিল। সেদিনও সুমন এসে আবার সারাটাদিন বসে থাকল। নীরবে সমস্ত কাজে সাহায্য করে গেল। সেই শেষ। সুমন‌ বোধহয় বুঝতে পেরেছিল যে আমাদের সম্পর্কের মধ্যে আমার সৌজন্য ও কৃতজ্ঞতাটুকু টিকে থাকলেও সেই বিপদের সময়ে তৈরি হ‌ওয়া সখ্য ক্ষয়ে গেছে। আসা বন্ধ করে দিয়েছিল। ফোন করাও।

    ***

    আবার সেই রেল স্টেশন। প্রায় দশ বছর বাদে পথ চিনে হেঁটে সুমনদের বাড়ির উঠোনে গিয়ে দাঁড়ালাম। অস্বস্তি হচ্ছিল। ওর ছোট বোন বারান্দায় বসে কিছু কাজ করছিল। বড় হয়ে গেছে। মুখ তুলে আমার দিকে দু সেকেন্ড তাকিয়ে চিনতে পেরেই, "মা দেখ, কে এসেছে," বলে এমন চেঁচামেচি শুরু করে দিল যে মুহূর্তে সব অস্বস্তি দূর হয়ে গেল। ওর মাও ঘর থেকে বেরিয়ে এসে আগের মতোই সাদরে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে বসালেন। তাড়াতাড়ি ফিরে যেতে হবে শুনে বললেন, "সেকি! দুপুরে এসেছ, খেয়ে যেতেই হবে। ঝিঙে পোস্ত আর ডিমের ডালনা রেঁধেছি। পোস্ত তো তুমি খুব ভালোবাসো।"

    "আপনার এখন‌ও মনে আছে, মাসিমা? কত বছর আগের কথা!"

    "তুমি ভুললে কী হবে, আমরা তোমাকে ভুলিনি বাবা।" জানালেন, বড়মেয়ে কোনো হাসপাতালে নার্সের কাজ করে। এখনও বিয়ে হয়নি। ছোটোজন বিএ ফাইনাল দেবে।

    "আর সুমন? আজ রবিবারেও কাজে যেতে হয়?" প্রশ্ন করি।

    "কী আর করবে? পড়াশোনাটাও তো করেনি। এখন কাছেই একটা ওষুধের স্টকিষ্টের কাছে সামান্য কাজ করে। দুপুর দুটোয় বাড়িতে খেতে আসে। তখন দেখা হয়ে যাবে।"

    "দাদা আজ যা চমকে যাবে না!" সুমনের বোন মুচকি হেসে বলে।

    "মাসিমা, আমি বরং ততক্ষণ একটু সুমনের ঘরে গিয়ে বসি?"

    "হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই যাও বাবা।"

    চেনা ঘর। সেই তক্তপোশ। চেক কাটা মোটা চাদর পাতা। দেওয়াল-আলনায় ঝুলছে সুমনের দুচারটে জামা, গেঞ্জি। কোনের টেবিলটার দিকে তাকাতেই চোখে পড়ল, একটা ছোট সিডিপ্লেয়ার, থাক দিয়ে রাখা কটা সিডি আর তার পাশেই ফুলের মালা পরানো একটা ফটো ফ্রেম। তাতে একটা ফটো। করুণার। গলার ফুলের মালাটা বোধহয়, দু-তিন দিনের বাসি। আমি কিছুক্ষণ সেই ছবির দিকে বিমূঢ় তাকিয়ে থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসি। বারান্দায় বসে মাসিমার সঙ্গে এটা সেটা বলতে থাকি। ভেতরে ভেতরে ছটফট করি। ঘড়ি দেখি বারবার। সুমন আসে দুটো নাগাদ। আমাকে দেখে একটু থমকায়, ভালো করে তাকায়, তারপর চিনতে পেরে সত্যিই যেন চমকে ওঠে। বারান্দাতেই আসন পেতে বসে খাওয়া দাওয়া করার পর, কার্ডটা মাসিমার হাতে দিয়ে বলি, "মাসিমা, আর বসব না। জানেন‌ই তো একা হাতেই সব করতে হচ্ছে। আপনাদের সবাইকে কিন্তু আসতে হবে। মা বলে দিয়েছে।"

    "আমি অতদূর যাব না বাবা, সুমন বরং পম্পাকে নিয়ে যাবেখন।" পম্পা সুমনের ছোটো বোন।

    "আমি ঠিক যাব। এই দাদা একা একা যাবি না। আমাকে নিয়ে যাবি কিন্তু," পম্পা হেসে বলে।

    সুমন চুপ করে থাকে। ওর মুখের দিকে ভালো করে তাকাই। চোখ দুটো যেন আরও কোটরে ঢুকে গেছে। হাসিতে সেই ঔজ্জ্বল্য আর নেই। লক্ষ করি ওর বাঁ হাতে এখনও মণি জেঠার ঘড়িটা। ভালো লাগে, তবু তো কারও কাজে লাগছে।

    আমি যাওয়ার জন্য উঠোনে নেমে দাঁড়াই।

    "চলো, তোমাকে স্টেশন পর্যন্ত ছেড়ে দিয়ে আসি" সুমন বলে। দুজনে পাশাপাশি হাঁটতে থাকি। চুপচাপ।

    "করুণার ছবিটা তোমার কাছে কী করে এল? ও নিজেই দিয়েছিল?" আমিই নীরবতা ভাঙি।

    "না না। ও তো আমার সঙ্গে ভালো করে কথাই বলতো না। আর কদিন‌ই বা দেখা হয়েছে!" নিচু স্বরে, থেমে থেমে কথাগুলো বলল।

    "তবে?"

    "ওর কাজের দিন সকালে যখন তোমাদের বাড়িতে যাই তখন দেখেছিলাম এই ছবিটার কয়েকটা কপি রাখা ছিল তোমার টেবিলে।"

    "হ্যাঁ, পাসপোর্ট সাইজের ছবি ছিল। কাজের আগে তাড়াতাড়ি করে দয়াময়ী স্টুডিও থেকে ছ কপি পোস্টকার্ড সাইজের বানিয়ে এনেছিলাম," আমি বলি।

    "সেখান থেকেই এক কপি পকেটে করে নিয়ে এসেছিলাম।"

    চুপ করে থাকি। স্টেশন এসে গেছে। প্লাটফর্মে ঢুকব। বলি, "অ্যাকসিডেন্টটা ঘটার পরে তুমি তো আর আমাদের বাড়িতে আসাই ছেড়ে দিলে..."

    ও আমায় থামিয়ে দিয়ে বলল, "অ্যাকসিডেন্ট বলছ কেন? বলো আত্মহত্যা।" তখন‌ই সশব্দে একটা ডাউন ট্রেন ঢুকল প্লাটফর্মে।

    আমি ওর হাত ধরে রাস্তা ছেড়ে সরে দাঁড়াই। বলি, "তুমি তো ঘটনার আগের দিন বিকেলে আমাদের বাড়িতে এসেছিলে। অনেকক্ষণ ছিলে। তোমার সঙ্গে কিছু..."

    ও আমার চোখে চোখ রাখল। মৃত ইলিশের চোখের মতো। তারপর যেন একটা ঘোরের মধ্যে বলে গেল, "সেদিন ঝিরঝির বৃষ্টি হচ্ছিল। তোমার সঙ্গে দোতলার ঘরে টিভিতে টি-টোয়েন্টি ম্যাচ দেখছিলাম। কলকাতা নাইট রাইডার্সের ম্যাচ ছিল। রাত হয়ে যাচ্ছে বলে ফেরার জন্য নিচে নামছি, করুণার ঘর থেকে তোমার পিসির কথা কানে আসে..."

    "কী কথা?" আমি প্রশ্ন করি।

    "পিসি চাপাস্বরে বকছিল করুণাকে, বলছিল, 'না, একদম দোতলায় যাবি না। আমি সুমনকে নিচে ডেকে পাঠাচ্ছি, ও এখানে তোর ঘরে বসে খাক। অমিতের জলখাবার আমি গিয়ে ওপরে দিয়ে আসব।' করুণা কাঁদছিল, বলছিল, 'কেন আমি গিয়ে দিয়ে এলে কী হবে?' পিসি হিসহিস করে উঠেছিল, 'আমি কিছু বুঝি না ভেবেছিস, না? আমি যে ভুল করেছি, তুইও তাই করলি? এর চেয়ে মরলি না কেন? ডুবে মরতে পারিস না!' আমি আবার সিঁড়ি থেকে নিঃশব্দে ওপরে উঠে এসেছিলাম।"

    "হ্যাঁ, মনে পড়েছে। তুমি ফিরে এসে বলেছিলে, 'মনে হচ্ছে এখন‌ও বৃষ্টি হচ্ছে, আর কটা ওভার দেখেই যাই বরং,'" আমি বিড়বিড় করে স্মৃতিচারণ করি।

    "করুণা আমাকে নয়, তোমাকে ভালবেসেছিল..."

    আমি বিদ্যুৎপৃষ্টের মতো চমকে উঠি। তারপর হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলি, "যাই, বিয়েতে এসো কিন্তু।"

    ও হাত বাড়ায় না। চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে ধীর স্বরে বলে, "ফটোটা দেখে তোমার খারাপ লেগেছে? আমি তো শুধু মাঝে মাঝে একটা ফুলের মালা পরিয়ে দিই। গত পরশু, চৌঠা মে ওর চলে যাওয়ার দিন ছিল, সেদিন‌ও পরিয়েছিলাম।"

    আমি উত্তর না দিয়ে প্লাটফর্মে ঢুকে যাই। একটা ফাঁকা বেঞ্চ দেখে চুপ করে বসে থাকি। অনেকক্ষণ। চোখের সামনে সন্ধ্যা নামে। একের পর এক ট্রেন চলে যায়। মায়ের ফোন এলে জানিয়ে দিই ফিরতে রাত হবে। শুয়ে পড়ে যেন। আমি চাবি দিয়ে নিজে দরজা খুলে ঢুকে যাব। পঞ্চাদাকেও ফোন করে বলে দিই যে মাধব পুকুরের ওপর করা প্যান্ডেলে আমার বৌভাত হবে না। অন্য ব্যবস্থা করতে হবে। বিস্মিত পঞ্চাদাকে কথা বাড়াতে না দিয়েই ফোন রেখে দিই। তারপর বেশি রাতে ট্রেন ধরে দমদম স্টেশনে নামি। সেখান থেকে দুবার শেয়ারের অটো পাল্টে যখন মাধব মিত্র কলোনিতে এসে পৌঁছা‌ই তখন রাস্তায় আর লোকজন নেই। অনেক বাড়ির আলো নিভে গেছে। কোনো কোনো বাড়ির জানলা দিয়ে টিভির রঙিন আলোর আভাস আসছে। লাইট পোস্টের নিচে কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকা কুকুর মুখ তুলে চেনা মানুষ দেখে আবার শুয়ে পড়ে। আমি বাড়ি না ঢুকে মাধবপুকুরের পাড়ে বাঁধানো বেঞ্চে গিয়ে বসি। পুকুরের নিস্তরঙ্গ জলে চাঁদের ছায়া স্থির হয়ে আছে। মনে পড়ে যায় দুদিন আগে দুপুরে পঞ্চাদা যখন প্যান্ডেলের বাঁশগুলো ফেলাচ্ছিল, পিসি বারান্দায় একা মাধবপুকুরের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেদিন‌ই ছিল চৌঠা মে। পিসির কি মনে পড়েছিল করুণার কথা?

    হঠাৎ কাঁধে হাতের স্পর্শে চমকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি, পঞ্চাদা।

    "যা, বাড়ি যা। এত রাতে একা এখানে বসে থাকিস না," অভিভাবকের স্নেহ পঞ্চাদার গলায়।

    "পঞ্চা দা, আমি এই প্যান্ডেলে আর..."

    "থাক, বলতে হবে না। আমি বুঝেছি। যে পুকুরের জলে তোর বোন এক বুক অভিমান নিয়ে ডুবে মরেছে, ঠিকই তো, সেই জলের ওপরে মাঁচা বেঁধে কি আর নতুন ব‌উকে বসানো যায়..."

    "হ্যাঁ, পঞ্চাদা, পরশুই ওর মৃত্যুর দিন গেছে। এত বছর বাদে আজ আবার ওর কথা খুব মনে পড়ছে..." আমি কোলের ওপর চিত করে রাখা আমার নিজের করতলের দিকে তাকিয়ে বলি।

    "বড় ভাল মেয়ে ছিল তোর বোনটা। ওর নজরে পড়ার জন্য তখন কম চেষ্টা করিনি, কিন্তু মাথা নিচু করে কলেজে যেত আর ফিরে আসত। কোনোদিন‌ও চোখ তুলে তাকায়নি। কেন যে মরতে গেল!" পঞ্চাদা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে চলে, "তখন আমার‌ও বয়স অল্প, একটু কথা বলার, একবার কাছে পাওয়ার কত স্বপ্ন দেখতাম। সেই কোলে করে পুকুর থেকে টেনে তুললাম, কিন্তু ফুলে যাওয়া মরা দেহটা..." বলতে বলতে পঞ্চাদা নিজেও আমার পাশে বসে পড়ে।

    ঘাড় ঘুরিয়ে আবার পঞ্চাদার মুখের দিকে তাকাই। পঞ্চাদার দুচোখের কোনে জ্যোৎস্নার বাষ্প জমেছে। দুজনে পাশাপাশি নীরবে মাধব পুকুরের জলের দিকে তাকিয়ে বসে থাকি।



    অলংকরণ (Artwork) : রাহুল মজুমদার
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments