




“এসব শুনে বুক ভেঙে যায়। আবার আশা জাগে এই ভেবে যে অবুঝ প্রেম আজও মুছে যায়নি। কী, ভাবছেন লোকটা পারভার্ট?”
“ন্-না।” অপ্রস্তুত হয়ে বললাম, “কথাটার গভীরতা উপলব্ধির চেষ্টা করছি।”
“ধন্যবাদ, ঐটুকুই যথেষ্ট।” ভদ্রলোক মৃদু হেসে আবার তাঁর দ্বিপ্রাহরিক সংবাদপত্রে ফিরে গেলেন।
আমরা মুম্বই-পুণে ডেকান কুইন এক্সপ্রেসের চেয়ার কারে পাশাপাশি সিটের যাত্রী। ট্রেন বিকেল পাঁচটা দশে ছত্রপতি শিবাজি টার্মিনাস ছাড়ে, পুণে যেতে নেয় সোয়া তিন ঘণ্টা। দিনের কাজ সেরে পুণে যাবার এটা আদর্শ ট্রেন। আজকাল অবশ্য বন্দে ভারত হয়েছে। তবে অনেকেই এখনো অপেক্ষাকৃত সস্তায় ঐতিহ্যময়, ছিমছাম ডেকান রানিতে যাত্রা পছন্দ করেন।
সহযাত্রী ভদ্রলোক মাঝবয়সী, সৌম্যদর্শন। হাতে আজকের ‘মিড-ডে’। একটা খবরের দিকে উদাস দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন দেখে কৌতূহলে উঁকি মেরে আমিও স্তম্ভিত। এই ট্রেনটার যাত্রাপথের কোথাও সমাজের অনুমোদন প্রাপ্তিতে ব্যর্থ এক যুগল এমন এক লৌহদানবের সামনে ঝাঁপিয়ে নিজেদের নিঃশেষ করে দিয়েছে। আমার ব্যথিত দৃষ্টি লক্ষ করে ভদ্রলোকের ঐ উক্তি।
যাত্রা নাতিদীর্ঘ। কিন্তু ভদ্রলোক আলাপি, তাই চট করে পরিচয় হয়ে গেল। তিনি সদাশিব পরাঞ্জপে, একটা কনসালটেন্সি ফার্মের পার্টনার।
দাদর এলে কিছু নতুন যাত্রী উঠলেন। তাঁদের একজন মধ্যবয়সী ভদ্রমহিলা, কালচার ও গ্রেসের প্রতিমূর্তি। আমাদের পাশ দিয়ে যেতে যেতে তিনি একবার পরাঞ্জপের দিকে তাকালেন, পরাঞ্জপেও যেন এক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে। পূর্বপরিচিত? বোধহয় না। ভদ্রমহিলা আবার ট্রলি ব্যাগ টানতে টানতে এগিয়ে গেলেন, অবশেষে কয়েক রো পেছনে নিজের সিটে থিতু হলেন।
আমার একটা বদভ্যেস, পথেঘাটে কোনো উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বের অচেনা মানুষ দেখলে মনে মনে তাঁর একটা নাম দিয়ে ফেলি। এই ব্যক্তিত্ববান মহিলা তাই আমার কাছে এখন সুচেতনা।
***
“মিঃ বোস, আপনি কি মুম্বই থাকেন?”
“হ্যাঁ, বান্দ্রায়। আসলে, আমাদের একটা সফটওয়্যার স্টার্ট আপ আছে, তার অফিস বি-কে-সিতে। তারই কাজে পুণে যাচ্ছি।”
“ভালো।”
পরাঞ্জপে বিশেষ আগ্রহ দেখাচ্ছেন না দেখে মনে হল কনসাল্টেন্সি মানে তো ঐ গৌরবে কেনাবেচা, সে আর সফটওয়্যার স্টার্ট-আপের মর্ম কতটা বুঝবে? তাই একটু ভাও নেবার চেষ্টায় বললাম, “আর হয়তো শুনেছেন, আজকাল এ-আই বলে একটা সর্বগ্রাসী নতুন প্রাণী এসেছে। তাকে ক্লাউড ধরেই এখন সমস্ত বিজনেস অ্যাপ্লিকেশন রি-ওরিয়েন্ট করতে হবে। আমরাও অমন একটা অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপ করছি।”
“বাঃ, বেশ।”
ভদ্রলোকের মনোযোগ আকর্ষণের শেষ চেষ্টায় আমি দৃপ্ত ভঙ্গীতে বললাম, “আসলে এ-আই আগামি দিনে এত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে যে এ ব্যাপারে স্বনির্ভর না হলে আমরা কার্যত পরের গোলাম হয়ে থাকব। আমাদের দেশ তাই চেষ্টা করছে এ-আইয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে আর সেই চেষ্টার সামান্য অংশীদার আমাদের এই স্টার্ট-আপ।”
“কঠিন কাজ।” পরাঞ্জপে এতক্ষণে ঘুরে তাকালেন, “এ-আই ছাড়ুন, বলুন তো ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্মে কি আমরা স্বনির্ভর হতে পেরেছি? ধরুন গুগল, জিমেইল, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব – এদের বিকল্প কি আমাদের আছে?”
“আজ গর্ব করে বলতে পারি, আছে – জোহো!”
“শ্রীধর ভেম্বু ব্রাইট, এন্টারপ্রাইজিং কিন্তু ব্যাপারটা অত সহজ নয়।” অসহিষ্ণু হাত নাড়লেন পরাঞ্জপে, “ও-এস, কার্নেল ও কোত্থেকে নিচ্ছে? তাছাড়া, আমাদের ওপেন ইন্টারনেট সিস্টেমে ও পারবে আলফাবেট, মেটার সঙ্গে লড়ে দাঁড়াতে? পারছেও না। আর এত দেরিতে এখন বিদেশিদের রেস্ট্রিক্ট করাও অসম্ভব। ধরুন, ইউটিউব আজ অনেকের রুজিরোজগার। বন্ধ করা ছাড়ুন, নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেই দেশে অভ্যুত্থান ঘটবে।”
দুর্বলভাবে বললাম, “তাহলে কি এসব প্রচেষ্টার কোনো দাম নেই?”
“অবশ্যই আছে। আজ যদি কোনো মহাশক্তি আমাদের চাপে ফেলার জন্য ঐ প্ল্যাটফর্মগুলি বন্ধ করে দেয়, তবে আমাদের হাতের পাঁচ তো রইল।
এবার আপনার এ-আইয়ে আসি। একটা কমপ্লিট এ-আই সিস্টেমের জন্য কী কী দরকার? স্ট্যাক, ফ্রেমওয়ার্ক, ক্লাউড আর্কিটেকচার, লাইব্রেরি, হার্ডওয়্যার এঞ্জিন। এর কোনটা আমরা নিজে তৈরি করতে পারছি?“
বাপ রে, ভুল জায়গায় খাপ খুলতে গিয়েছিলাম! আমতা আমতা করে বললাম, ”না, মানে আমরা –“
“কোর এ-আইকে ফর গ্র্যান্টেড ধরে নিয়ে তার ওপর কোনো জনহিতকর অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করবেন? করুন না, ভালো কথা। কিন্তু দয়া করে স্বনির্ভরতার বেলুন ওড়াবেন না।”
“কিন্তু আমরা কি কোনোদিন প্রকৃত অর্থে স্বনির্ভর হতে পারব না?”
“কাজটা শক্ত। তবে ভরসা রাখতে হবে, চেষ্টা জারি রাখতে হবে। আর আশা করতে হবে, একদিন মহাশক্তিগুলি পরস্পরের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বা নিজেদের ক্ষমতার ভারে জীর্ণ হয়ে নাগপাশ শিথিল করে আমাদের সামনে সুযোগের দরজা খুলে দেবে। যেমন দিয়েছিল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জীর্ণ ব্রিটিশ সিংহ।”
“আপনি –“
পরাঞ্জপে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গীতে বললেন, “ঐ আপনারা যাকে বলেন ইন্ডিয়ার প্রাইম ইনস্টিটিউট, তাদের থেকে কিছু ডিগ্রি নিয়েছিলাম। কিন্তু তারপর আমরা ক'জন বন্ধু মিলে বিদেশ পাড়ির চেষ্টা না করে দেশেই কিছু করার উদ্যোগ নিলাম। অনেক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে আজ একটা স্থিতিশীল অবস্থায় এসেছি। দেশি, বিদেশি বিভিন্ন কর্পোরেটকে সফটওয়্যার কলসাল্টেন্সি দিচ্ছি। তবে ঐ যে বলছিলেন না এ-আইর ছাপ না থাকলে আজকাল কেউ পোঁছে না, তাই বার্কলে থেকে একটা শর্ট কোর্সও করে এলাম।”
***
একটু পরে কথা ঘোরাবার চেষ্টায় বললাম, “আপনার ফ্যামিলি?”
সলজ্জ হেসে ভদ্রলোক বললেন, “করা হয়নি।”
“কিন্তু আপনি তো –“
“হ্যাঁ, যা রোজগার করি তাতে অবশ্যই একটা উচ্চ মধ্যবিত্ত ফ্যামিলিকে অনায়াসে পোষণ করা যায়। তবে কী জানেন, এই অবস্থায় পৌঁছোতে অন্তত দু'দশক এত স্ট্রাগল করতে হয়েছে যে সত্যিই কখনো ভরসা পাইনি।”
“বাড়ির থেকে চাপ আসেনি?”
“আসেনি আবার! একবার তো কনে ঠিক করে আমাকে এত্তেলা। বাধ্য হয়ে জানালাম, আমি এখনই বিয়ের জন্য প্রস্তুত নই। এমনকি, চাপ এড়াতে বছরখানেক বাড়ির ছায়া মাড়ালাম না।”
“কেন, কনে পছন্দ হয়নি?”
“ওরে বাবা, না। কিন্তু তখন আমি বলতে গেলে বোহেমিয়ান লাইফ লিড করছি। প্রজেক্ট ধরি আবার কিছুদিন বেকার বসে গান, সাহিত্যের নেশায় মজে থাকি। আবার কিছু রোজগার করে হয়তো বেরিয়ে পড়ি দেশভ্রমণে। ঐ ‘কমফোর্ট জোন’টার থেকে আর বেরোতে পারলাম না।”
মধ্যে একবার পেছনে ঘাড় ঘুরিয়েছিলাম। মনে হল, সুচেতনা আড়চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে। আমরা কি খুব জোরে কথা বলছি? নাকি মনের ভুল?
***
“তবে কী জানেন, গোড়ার থেকেই সমস্ত উত্থান-পতনের মধ্যেও, আমি মুম্বই-পুণে যাতায়াতের জন্য এই ডেকান রানিকেই পছন্দ করি। অবশ্য লাগেজ বেশি না থাকলে।
আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, ডেকান মানে দাক্ষিণাত্য? হ্যাঁ আবার না। মরাঠিতে ‘দক্ষণ’’ বলতে আমরা বুঝি দক্ষিণের মালভূমি। সংকীর্ণ অর্থে, তাতে বোঝায় লোনাভলা থেকে শুরু করে পুণে অবধি অঞ্চল। এই তো একটু পরে কারজাত আসবে, তারপর শুরু হবে ঐ মালভূমিতে উত্তরণ।”
কারজাত এল ও গেল। এখান থেকে শুরু ঘাটের পাহাড়ি পথের চড়াই। পর্যাপ্ত শক্তি জোগানোর জন্য তাই এখানে পেছনে একটা বাড়তি ইঞ্জিন জোড়া হয়। ঘাটের দৃশ্য অপরূপ। পাহাড়, জঙ্গল, কখনো অনেক নিচে সমতল। কোথাও অন্ধকারের ছায়া নেমেছে, কোথাও কনে দেখা আলো। কখনো বা জানালার পাশে ভেসে বেড়াচ্ছে মেঘ।
একটু আগে আমাদের স্বল্পাহার সমাপ্ত হয়েছে। হাতমুখ ধুয়ে বেসিন থেকে ফেরার সময় মনে হল, সুচেতনা আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসছেন।
উঁচুনিচু পথ, অজস্র বাঁক ও টানেলের মধ্য দিয়ে উঠতে উঠতে ট্রেনের আধঘণ্টার বেশি সময় লাগবে। কী মনে হল, পরাঞ্জপেকে জিগ্যেস করলাম, “কিছু মনে করবেন না – তখন যে আপনি অবুঝ প্রেমের কথা বলছিলেন, অমন কোনো ঘটনা কি আপনি প্রত্যক্ষ করেছেন? মিলনান্ত বা বিয়োগান্ত?”
“এক নয়, বলতে পারেন অনেক। জানি না আমাদের সময় ওটাই ধারা ছিল কিনা। এখনকার ছেলেমেয়েদের দেখি, অনেক হিসেবি। ভেবেচিন্তে এগোয়, চট করে স্থায়ী সম্পর্কে যেতে চায় না, গেলেও দরকারে পেছিয়ে আসে ইমোশনালি আপসেট না হয়ে।
সবই ভালো। এই বাস্তবমুখি অ্যাটিচিউড আজকের সমস্যাসঙ্কুল পৃথিবীতে সুস্থ থাকার জন্য হয়তো অপরিহার্য। তবু মনে হয় এত হিসেবিয়ানায় কী যেন একটা হারিয়ে যাচ্ছে। বোধহয়, মন।”
পরাঞ্জপে যেন একটু উদাস হয়ে গেলেন। গাড়ি তখন একটা টানেলে ঢুকেছে। একটু সময় দিয়ে বললাম, “কী একটা ঘটনার কথা বলছিলেন?”
“ও, হ্যাঁ। তবে একটা নয়, ধরুন যদি আমার জানা গোটা তিন ঘটনাকে সংক্ষেপে বর্ণনা করে দশক দুই আগের একটা খণ্ডচিত্র আঁকার চেষ্টা করি, চলবে?”
“চলবে না, দৌড়োবে। বলুন।”
“এই কাহিনিগুলি সত্যভিত্তিক। শুধু বর্ণনার সুবিধার্থে কিছু লিবার্টি নিচ্ছি আর পাত্রপাত্রীর নামগুলো বদলে দিচ্ছি।
প্রথম কাহিনি ভরত আর শুভাঙ্গীর। ভরত আমাদের পাড়ার একটি প্রায় বাউণ্ডুলে ছেলে। মা-বাবাকে হারিয়েছে অল্প বয়সে। তাঁরা একমাত্র সন্তানের জন্য বিশেষ কিছুই রেখে যেতে পারেননি, শুধু সঙ্গীতের উত্তরাধিকার ছাড়া। ভরতের গলা ভালো, সঙ্গীতের জ্ঞান গভীর। তাকে ভিত্তি করে সে এখানে সেখানে গান শিখিয়ে কোনোমতে দিন গুজরান করে। সঙ্গীত শিক্ষক হিসেবে তার এলাকায় খুব নাম।
শুভাঙ্গী এক সম্পন্ন পরিবারের বৌ, তার খুব ইচ্ছে গান শেখে। এর ওর কাছে খোঁজ করে সে ভরতের কাছে গান শিখতে শুরু করল। আর অচিরেই এই বাউণ্ডুলেটার প্রেমে পড়ে গেল।
বয়সে বড় হলেও ভরত আমাকে মাঝে মাঝেই তার মনের কথা খুলে বলত। একদিন হঠাৎ বলল, ‘জানিস, একটা বিচ্ছিরি ব্যাপার ঘটে গেছে। মানে, আমি আর শুভাঙ্গী – একে অপরকে ছাড়া বাঁচব না।’
‘কী সর্বনাশ!’ বলেছিলাম, ‘যেভাবে হয় কেটে বেরিয়ে এস। ও কোথায় আর তুমি কোথায়! তাছাড়া ও তোমার চেয়ে বছর দশেকের বড়, একটা বাচ্চা আছে।’
’বুঝি, কিন্তু মন যে মানে না।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল ভরত।
আমি আশঙ্কায় কাঁটা হয়ে থাকতাম, এই বুঝি বিচ্ছিরি কিছু একটা ঘটে। ঘটলও। হঠাৎ একদিন শুনলাম, ভরত আর শুভাঙ্গী উধাও। শুভাঙ্গীর পরিবার প্রভাবশালী। প্রকাশ্যে বেশি শোরগোল না করেও পুলিশ ও বাহুবলি লাগাল মুজরিমদের ধরে এনে উপযুক্ত শিক্ষা দেবার জন্য। কিছুদিন বাদে তাদের খবর পাওয়া গেল। নাসিকে গোদাবরীর এক নিরালা উপকূলে পড়ে আছে ওদের দুজনের চপ্পল আর কিছু ব্যবহারসামগ্রী। তার মধ্যে রয়েছে শুভাঙ্গীর এক চিঠি, ‘জানি, আমরা পাপ করেছি। কিন্তু আমরা একে অপরকে ছাড়া থাকতে পারব না। তাই এই পুণ্যতোয়া গোদাবরীর জলে আত্মবিসর্জন দিয়ে পাপক্ষালনের কিছুটা চেষ্টা করলাম।’
অনেক চেষ্টায়ও খরস্রোতা গোদবরীর থেকে কোনো দেহ উদ্ধার করা যায়নি। পুলিশ কিছুদিন দেখে কেস ক্লোজড করে দিয়েছিল।”
“সুইসাইড, না অনার কিলিং?” রুদ্ধশ্বাসে জিগ্যেস করলাম।
মৃদু হেসে পরাঞ্জপে বললেন, “বেশ ক'বছর পর ভরতের সঙ্গে আমার ঘটনাচক্রে দেখা হয়ে গিয়েছিল আপনাদের কলকাতার লোকাল ট্রেনে – ও আর শুভাঙ্গী ক্যারাওকে গেয়ে পয়সা চাইছে। আমাকে দেখে চমকে উঠলেও ভরত পরমুহূর্তে পরিচিতির হাসি ছড়িয়ে বলল, ‘ভালো আছিস?’
বললাম, ‘হ্যাঁ। কিন্তু তোমাদের এ কী হাল? একটু কথা বলা যাবে?’
ভরত বলল, ‘বেশ। একটু পরে দমদম এলে আমরা নামব। তোর যদি সময় হয় –’
দমদমে নেমে চা-নাস্তা সেরে এক নিরালা বেঞ্চে বসে কথা হল।
‘পালাতে পালাতে শেষে এখানে এসেই থিতু হলাম। জানিস, শহরটায় এখনো গানবাজনার কদর আছে। আর সবকিছু খুব সস্তা। খুচখাচ টিউশন, তারপর এমন কিছু খেপ, বেশ চলে যাচ্ছে।’
‘কিন্তু থাকো কি –’
‘না রে, বস্তিতে নয়। এক রিফিউজি কলোনির একটা ছোট ঘরে। কোনো অসুবিধে নেই।’
‘কিন্তু শুভাঙ্গী – কত বড় ঘরের মেয়ে –’
‘ও, অভ্যেস হয়ে গেছে। আর – একসঙ্গে তো আছি।’ মিষ্টি হেসে বলল শুভাঙ্গী।
এবার মিঃ বোস, আপনিই বলুন, কাহিনিটা মিলনান্ত, না বিয়োগান্ত?”
উত্তরে আমিও শুধু মৃদু হাসলাম।
***
টানেলের গমগম আওয়াজে একটু বিরতি। তারপর পরাঞ্জপে বললেন, “বোর হচ্ছেন তো? থামি?”
“আরে না না, দারুণ লাগছে। বলুন পরের কাহিনি।”
পরাঞ্জপের দৃষ্টি একটু উদাস হয়ে গেল। তারপর শুরু করলেন, “ধীমান শর্মা কেমিস্ট্রির প্রফেসার। উচ্চবংশজাত, মেধাবী মানুষ। কিন্তু মফস্বলের এক শহরের কলেজে অধ্যাপনার সময় তিনি এক আদিবাসী ক্রিশ্চিয়ান মেয়ে পামেলার প্রেমে পড়লেন।
কী, ভাবছেন আদিবাসী রমণীর প্রতি ভব্য যুবকের প্রেম মূলত সুঠাম দেহের প্রতি টান? কখনো তা হয় না এমন নয়। তবে অন্তত ধীমানের ক্ষেত্রে টানটা দেহ ছাড়িয়ে অনেক গভীরে চলে গেছিল। শেষে ঐ, একে অপরকে ছাড়া থাকতে পারে না।
স্থানীয় বন্ধুরা তাকে সাবধান করেছিল, এই মফস্বলে এসব চলে না, বিশেষ করে ট্রাইবাল কমিউনিটির মধ্যে নানা প্রতিক্রিয়া হতে পারে। ধীমান তাদের দৃঢ়ভাবে বলেছিল, ‘কিন্তু ওকে ছেড়ে তো আমি বাঁচব না।’ তখন বন্ধুরা বলেছিল, ‘তাহলে তোরা বিয়ে করে নে, হিন্দু বা ক্রিশ্চিয়ান মতে।’ ধীমান অবশ্য সে পথে না গিয়ে সিভিল ম্যারেজ অ্যাক্টে পামেলাকে বিয়ে করে তারপর বৌয়ের কিছু আত্মীয়বন্ধু ও ধীমানের স্থানীয় বন্ধুদের একটা ছোট্ট অনুষ্ঠানে আপ্যায়িত করেছিল। ধীমানের পরিবারের কেউ এই বিয়ে মেনে নেবে না আর বিয়ে হলে ধীমানের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখবে না বলে আগেই জানিয়েছিল।
বছরখানেক পর ধীমান ভালো অফার পেয়ে মুম্বইয়ের এক কলেজে জয়েন করল। তাদের বাড়ি বেশি দূরে নয় কিন্তু তার দরজা বন্ধ। সুতরাং ধীমান কলেজের কাছে এক ছোট্ট বাসা ভাড়া নিল। ছোট কিন্তু সুখের সংসার। ধীমান চেষ্টা করছে পামেলাকে একটা নার্সিং কোর্স করাতে। বাড়ির থেকে কেউ তার বাসায় পা দেয় না। শুধু বিবাহিত বোন মাঝে মাঝে কলেজে এসে দাদার সঙ্গে দেখা করে। বোঝায়, সে যেন সময় পেলে বাড়ি গিয়ে বৃদ্ধ বাবা-মা'র সঙ্গে দেখা করে। আর পারে তো কথাবার্তা বলে ব্যাপারটা মিটিয়ে নেয় – অর্থাৎ যা হয়েছে হয়েছে, এখন বৌকে ডিভোর্স দিয়ে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যায়। ধীমান সবিনয়ে জানায়, সেটা সম্ভব নয় আর বোনকে অনুরোধ করে তার বাড়িতে ঘুরে যেতে। বোন আমড়াগাছি করে এড়িয়ে যায়।
কিন্তু একদিন ধীমান বাড়ি ফিরতেই পামেলা উদ্ভাসিত মুখে বলল, ‘জানো, মা-বাবা এসেছিলেন।’
‘আ-মার মা-বাবা?’
‘হ্যাঁ। আমাকে আশীর্বাদ করে প্রসাদ খাইয়ে গেলেন। বললেন, তাঁরা ব্যাপারটা এবার মিটিয়ে নিতে চান। তোমাকে বললেন বাড়ি ফিরে যেতে। আমাকে তাঁরা মেনে নেবেন। শুধু আমরা বাড়ির আলাদা এক অংশে থাকব।’
স্বামী-স্ত্রী দুজনেই খুব খুশি। এই অপ্রত্যাশিত খুশি কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী হল না। একটু পরেই পামেলা খুব অসুস্থ হয়ে পড়ল। পেটব্যথা, বমি। বিপদ বুঝে ধীমান তাকে নিয়ে হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে ছুটল। সেখানে ভর্তি করার পর ডাক্তার বললেন, পয়জনিং। ‘দুপুরে কী খেয়েছিলেন?’ পামেলা কোনোমতে বলল, ‘ম-মাংস।’ স্টমাক পাম্প করা হল কিন্তু ততক্ষণে বড্ড দেরি হয়ে গেছে। বিষ সিস্টেমে চলে গেছে। ঘণ্টা দুয়েক যুঝবার পর পামেলা মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণ করল।
খবর পেয়েই ধীমানের পরিজন ছুটে এসে ছেলের পাশে দাঁড়ালেন। সে তখন পাথর, চোখে একফোঁটা জল নেই। ধীমানের পরিবার প্রভাবশালী। মৃত্যুর কারণ পয়জনিং নয়, বাসি মাংসের থেকে ফুড পয়জনিং লিখিয়ে ছেলেকে তাঁরা পুলিশি ঝামেলার থেকে রেহাই দিলেন। পামেলারও নিকটজন বলতে এমন কেউ ছিল না যে এই নিয়ে কোর্টকাছারি করবে।
প্রাণসমাকে হারিয়ে ধীমানের কী প্রতিক্রিয়া হয় ভেবে আত্মীয়বন্ধুরা খুব চিন্তিত ছিল। মা ও বোন মাঝে মাঝেই গিয়ে তাকে সান্ত্বনা দিয়ে এবার বাড়ি ফিরে আসতে বলত। সবাইকে অবাক করে ধীমান কিন্তু দু-একদিন গুম মেরে থাকার পর আবার স্বাভাবিক হয়ে কলেজে জয়েন করল। তারপর একদিন প্রিয়ার স্মৃতিবিজড়িত ভাড়াবাড়ির পাট চুকিয়ে বাড়ি ফিরে গেল।
সময় বোধহয় সব ভুলিয়ে দেয়। ধীমানের চালচলন দেখে আশ্বস্ত হয়ে মা একটু একটু করে আবার বিয়ের প্রস্তাবও পাড়তে শুরু করলেন। কিন্তু এক রাতে সবকিছু তছনছ হয়ে গেল। বোন কোনো কারণে বাপের বাড়ি এসে রাতে ছিল। ভোরে কারো সাড়াশব্দ নেই দেখে পড়শিরা হৈ-চৈ করে পুলিশ ডাকিয়ে দরজা ভাঙিয়ে দেখল, ভেতরে ধীমান আর তার বাবা, মা, ভাই ও বোনের পাঁচটি নিথর দেহ। সায়নাইড পয়জনিং।”
***
কিছুক্ষণ গুম মেরে থাকার পর বললাম, “আর একটা বোধহয় বাকি রইল?”
আমরা ঘাট এলাকা প্রায় পেরিয়ে এসেছি। এরপর কিছু দূরত্ব সমতলে ছুটে ট্রেন লোনাভলায় কিছুক্ষণ থামবে। তারপর সোজা পুণের শিবাজিনগর। পরাঞ্জপে মৃদু হেসে বললেন, “হ্যাঁ। তবে এটা খুব সাদামাটা কাহিনি। উদিত এক সাধারণ পরিবারের ছেলে। তার একমাত্র সম্বল মেধা আর মগজে কিলবিল করা নানা উদ্ভট স্বপ্ন। আর ঊষা সেই এলাকারই এক মেয়ে। তাদের পরিবার বিত্তবান, উচ্চশিক্ষিত, সুসংস্কৃত। আর ঊষা? প্রভাতের প্রথম আলোর মতো – যার দীপ্তি আছে কিন্তু নেই প্রখরতা।
উদিত ঊষাকে দূর থেকে দেখত আর চোখ ফেরাতে পারত না। বলা শক্ত, তাকে সে ভালোবাসত না ভক্তি করত। কিন্তু ঊষা ছাড়া কোনো নারীকে সে নিজের জীবনে কল্পনা করতে পারত না। অথচ সে জানত এ দূর আকাশের তারা, তার ধরাছোঁয়ার সীমানার ওপারে। এই অবুঝ চাওয়ার দ্বন্দ্বে সে অহর্নিশি ক্ষতবিক্ষত হত।
এমন নয় যে ঊষার সঙ্গে তার কখনো দেখা হয়নি। কোনো অনুষ্ঠানে বা পথেঘাটেও এক ঝলক তাদের দেখা, এমনকি চোখাচুখি হয়েছে। তদ্দিনে ‘ভালো ছেলে’ বলে উদিতের এলাকায় হালকা খ্যাতি হয়েছে। ঊষা তার দিকে চেয়ে মৃদু হাসত। সে হাসিতে প্রশ্রয় নয়, থাকত পরিচিতির স্বীকৃতি।
স্রেফ মেধার জোরে একের পর এক শিক্ষাগত সাফল্যের চূড়ায় আরোহণ করে উদিত একদিন সামাজিক সংজ্ঞামাফিক ‘এলিজিবল বেচেলর’ হল। তদ্দিনে ঊষাও তার নিজস্ব পথে বিকশিত হচ্ছে। এটুকুর বেশি খোঁজ রাখার দুঃসাহস উদিতের হয়নি। কিন্তু তার বাড়ির থেকে যখন বিয়ের জন্য চাপাচাপি শুরু করল, সে সোজা বলে দিল এই মুহূর্তে তা সম্ভব নয়। ঊষাকে সে কোনোদিন পাবে না কিন্তু তার জায়গায় কাউকে বসাতেও পারবে না।
এভাবেই হয়তো চলত। কিন্তু একদিন ব্যাপারটা এক অপ্রত্যাশিত মোড় নিল। উদিত তখন দূর কর্মস্থলে। মা চিঠিতে লিখলেন, ‘তোমার জন্য একজন কন্যা ঠিক করেছি। আশা করি তোমার অপছন্দ হবে না। চিন্তা কোরো না, আমাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা সম্বন্ধে ওরা সচেতন, তবু সবাই রাজি হয়েছে। ব্যবস্থা-বন্দোবস্ত প্রায় সারা। এবার তোমার সম্মতি পেলেই দিন ঠিক করে ফেলতে পারি। মেয়েটির ফটো পাঠালাম।’
ফটো দেখে উদিত চমকে উঠল – ঊষা! কী, মুচকি মুচকি হাসছেন, ভাবছেন সেই গৎবাঁধা ফেয়ারি-টেল এন্ডিং? না, আর একটু ট্যুইস্ট আছে।
চিঠি পেয়ে উদিত তো সপ্তম স্বর্গে। কী করে এই অলৌকিক সংঘটনটা হল? সে তো ঊষার প্রতি তার মনোভাব ঊষাকে দূরের কথা, কোনো ঘনিষ্ঠ আত্মীয়বন্ধুকেও ঘুণাক্ষরেও জানায়নি! তাহলে কি যোগাযোগটা নিতান্তই কাকতালীয়? নাকি ভাইয়ের হাবভাব লক্ষ করে, তার গোপন খাতাপত্র ঘেঁটে গোয়েন্দা দিদি কিছু অনুমান করতে পেরেছে?
কিন্তু উদিতের খুশি খুশি ভাবটায় একটু পরেই পড়ল এক সংশয়ের ছায়া। ঊষা তার মতো সাধারণ পরিবারের এক ছেলেকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে কেন? নিশ্চয়ই তার স্বর্ণপ্রসূ শিক্ষাগত তকমাগুলি দেখে? কিন্তু ঊষা জানে না, জীবনজুয়াড়ি উদিতের এখনই ঐ তকমাগুলি ভাঙিয়ে আর্থিক সচ্ছলতা অর্জনের কোনো পরিকল্পনা নেই। সে এখন ছুটছে তার স্বপ্নের রামধনুর ওপারের স্বর্ণকলসের সন্ধানে।
যদি সে বিফল হয়? ঊষাকে যতটা জানে, সে তখনও উদিতের হাত ছাড়বে না, পাশে থেকে নীরবে সব সহ্য করবে।
যাকে এত গভীরভাবে ভালোবাসি, যার পায়ে কাঁটা ফুটলে আমার হৃদয় রক্তাক্ত হয়, তাকে কি কষ্ট, অনিশ্চয়তায় টানা যায়? গভীর মানসিক দ্বন্দ্বে উদিত সারা রাত বিছানায় ছটফট করল। তারপর –“
“তারপর?” উত্তেজনা দমন না করতে পেরে বলে উঠলাম।
“তারপর সে পালাল।”
***
গাড়ি লোনাভলা ঢুকছে। যে যাত্রীরা এখানে নামবেন, তাঁরা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সুচেতনা।
যাবার আগে দেখি, সুচেতনা পরাঞ্জপের মুখের দিকে নির্নিমেষে তাকিয়ে। পরাঞ্জপের দৃষ্টিতেও যেন এক অদ্ভুত আলো। তারপর ভদ্রমহিলা আবার ট্রলিব্যাগ টানতে টানতে এগিয়ে গেলেন দরজার দিকে।
হঠাৎ কী সন্দেহ হল, বললাম, “আপনি কি ঐ ভদ্রমহিলাকে চেনেন?”
পরাঞ্জপের মুখে মুহূর্তে অজস্র বিচিত্র ভাবধারার তরঙ্গ। তারপর মৃদু হেসে বললেন, “হ্যাঁ। ওর সঙ্গে আমার বিয়ে হবার কথা ছিল।”
উনি যেন আরো কিছু বলবেন। হঠাৎ মনে হল, সুচেতনার গলায় মঙ্গলসূত্র ছিল না। অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে বলে উঠলাম, “করছেন কী? গাড়ি ছেড়ে দেবে, এক্ষুনি গিয়ে ওঁকে ধরুন। ইট'স নেভার টু লেট।”
পরাঞ্জপে স্মিত হেসে অ্যাটচিটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। আমার কাঁধ চাপড়ে বললেন, “কমফোর্ট জোন থেকে আমায় ঠেলে বের করার জন্য ধন্যবাদ, যুবক।” তারপর দ্রুতপায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।
গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে। জোড়া কাঁচের জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরের স্বল্পালোকিত প্ল্যাটফর্মের দৃশ্য বিশেষ মালুম হয় না। বুঝলাম, কাহিনির শেষটা আর জানা হল না।
তবে এই তো জীবন – যেখানে অনেক কাহিনির শেষটাই অধরা থেকে যায়।