• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৮৬ | এপ্রিল ২০২২ | রম্যরচনা
    Share
  • সে (৭) : সমরেন্দ্র নারায়ণ রায়
    | | | | | | ৭



    আমাদের ওই বত্রিশটি বাংলোর জন্যে ছিলো চারটি বেশ বড় কুয়ো। সেগুলোর নম্বর ছিলো সবচেয়ে কাছের বাংলোটির নম্বরে। এমনভাবে ছড়ানো ছিলো কুয়োগুলো যে প্রত্যেকটি বাংলোই জলটুকু ঠিক পেয়ে যেতো কাছাকাছির মধ্যে।

    আপনাদের কাজে লাগতে পারে বলে নীচেয় কুয়ো নম্বরের পাশে সংশ্লিষ্ট বাংলো/জোড়াবাংলোর নম্বরগুলো দিলাম -
    ৩ - ১/২ ৩ ৪/৫ ৩২ ১৯/২০
    ৮ - ৬/৭ ৮/৯ ২১/২২ ২৩/২৪ ২৫/২৬
    ১২ - ১১/১২ ৩১ ৩০/২৯ ১৪/১৩
    ১৬ - ১৫ ১৬ ১৭ ১৮ ২৮/২৭
    কি? ঠিক আছে তো?

    ৩ নং কুয়োর দিলীপের কথা তো আগেই অন্যত্র পড়ে ফেলেছেন।

    ১২ নং কুয়োর অর্দ্ধেকটা ছিলো বাংলো এলাকার বাইরে, যাতে অন্যেরাও জল নিতে পারে।

    বাংলো নং ১০ ভেঙে গিয়েছিলো। একজোড়া শঙ্খচূড় থাকতো, অন্য সাপ ধরে খেতো, মাঝে মাঝে খোলস ছাড়তো, কাউকে কিছু বলতো না, ওদের ছানাপোনাও ছিলো না। ওদিকে বল পাঠালে ব্যাটসম্যান আউট উইথ জরিমানা ওয়ান বল। পরে বাংলোসমেত ঐ এলাকাটা লাইট কোম্পানি লীজ নিয়ে নেয়।

    আমরা মাস ছয়েক ২৯ নম্বরে থেকে ১৫ নম্বরে উঠে আসি। পাশের ১৬ নং ছিলো স্থানীয় আবগারি দফ্তর।

    তিতাস-পারের হাটখোলার দত্ত পরিবার লীজ নিয়েছিলেন ১৭ নং বাংলো। ১৬ আর ১৭ নং বাংলোর মাঝখানে ছিলো আমাদের ১৬ নং কুয়ো।

    কাছাকাছির মধ্যে একটি সাঁতার শেখবার পুকুর ও একটি সাঁতার কাটবার দীঘিও ছিলো। দুটোতেই ল্যাটা, পুঁটি, মিরগেল ইত্যাদি পাওয়া যেতো। কুয়ো ছাড়া ওগুলোতেও কাপড় কাচা, বাসন মাজা, চান এসব করা হতো। পুকুরটিতে অবিশ্যি শ্যাওলা হাতে ঠেলে সরিয়ে।

    জলকে কোনো কোনো জায়গায় ফানি বলা হয় বটে কিন্ত কুয়োর জলকে বিলিতি ভাষায় বলা হয় ভেরি ফানি। গায়ে ঢাললে গ্ৰীষ্মে ঠান্ডা ঠান্ডা লাগে, আর শীতে লাগে অল্প গরম। আমাদের ওদিকে গ্ৰীষ্মে লু ছুটতো, আর শীত ছিলো হাড় কাঁপানো, ভোরের শিশির প্রায়ই ঠাণ্ডায় জমে যেতো; আর ওই সব কারণেই চানের জন্য কুয়োতলাগুলো খুব পপুলার ছিলো। ওই টেনে জল তোলার খাটনিটাই যা।

    তা আমরা ঠিক করলাম যে চান আমরাও কুয়োতলাতেই করবো।

    প্রথমেই বারণ হয়ে গেলো পাড়ার দু'তিন জন দিদির। সঙ্গত কারণেই, কারণ তারা যে ছিলো "ধুমসী, ধিঙ্গি, বে হলে যে ছেলেপুলের মা হয়ে যেতো" ইত্যাদি। তা তাদের হয়ে অনেক কমবয়সী একজন এলো দাদুর কাছে ফরিয়াদ নিয়ে। দাদু বেঁধে দিলেন টাইম - দুপুর ১২টা পর্য্যন্ত ছেলেদের টাইম, তারপর থেকে মেয়েদের।

    এইখানে একটা কথা চুপি চুপি বলে রাখি - পাড়ার বেশীর ভাগ বাড়িতেই তখন ঘড়ি, রেডিও এসব কিস্যু ছিলো না। কোন ট্রেন পাস করলো তাই দেখে লোকে সাধারণতঃ সময় ঠিক করতো। আর সেই ট্রেন যদি ধরতেই হতো তাহলে আমাদের মতো কোনো বাড়ী থেকে টাইম জেনে যেতো। আমার মামাবাবু ঘন ঘন দেশের বাইরে কাজে যেতেন বলে আমার একটি হাতঘড়ি ছিলো, তা সেটিও প্রায়ই পরগৃহে রাত্রিযাপন করতো।

    এই ধরণের অবস্থাতে রোজ কুয়োতলা নিয়ে ঝগড়া হতে লাগলো। অবশেষে মীমাংসা করলো অপেক্ষাকৃত কমবয়সী একজন। সেই যে উকিলটি দাদুর কাছ থেকে চানের সময়ের ফরমান বার করে এনেছিলো।

    ১৬ নং কুয়োর পাশে একটা কাঁঠালগাছ ছিলো। ঠিক হলো যে সেটার ছায়া যখন কুয়োতলার বাঁধানো শানটা ছোঁবে তখন ধরে নেওয়া হবে যে ১২টা বাজলো। তা সে ঋতু বদলালে বা গাছ বড় হয়ে গেলেও তাই।

    এরই মধ্যে ব্যাপার স্যাপার দেখে কুয়োর মালিকরা পাড় সংলগ্ন একটা ছোট চৌবাচ্চা আর বেশ খানিকটা ঘেরা জায়গা বাঁধিয়ে দিলেন মেয়েদের সুবিধার জন্য। টাইম স্লট আলাদা, তাই আমরা ছেলেরাও সেটার সদব্যবহার করতুম।

    শীত কাটলো। বসন্ত পেরিয়ে গরমকাল এসে গেলো। একদিন বিকেলে

    - এই, লাল বরফ খাবি?
    - আজ আমার পকেট ফাঁকা, আরেকদিন হবে
    - আরে এই দেখ আমি চল্লিশ পয়সা জমিয়েছি
    - তুই? তুই কোত্থেকে জোটালি?
    - আরে দিদিদের নাম করে ছোটম্যানেজারবাবুকে তো আমিই ওই চানঘরটা বানাতে বললাম, আমিই দিদিদের জল তুলে দিই তো ওই চৌবাচ্চায়, ওরা কি করে জল তুলতে পারবে বল, তা ওরা মাঝে মাঝে বখশিস দেয় যে...

    আমি তো হাঁ!



    অলংকরণ (Artwork) : দীপঙ্কর ঘোষ
  • | | | | | | ৭
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)