• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৪ | অক্টোবর ২০২৬ | বিবিধ
    Share  
  • একটি দিনের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি : স্বাতী পারেখ

    আসাম থেকে আমার খুড়তুতো বোন এসেছে কলকাতায়। উদ্দেশ্য ডাক্তার দেখানো। চিকিৎসা সংক্রান্ত পরীক্ষানিরীক্ষা করে সে এল আমার সঙ্গে দেখা করতে। কথা প্রসঙ্গে জানা গেল কলকাতায় যখন সে এসেছে কাঁকুড়গাছি অঞ্চলে মা মনসার দর্শন করতে যাবে। তিনি নাকি খুব জাগ্রত দেবী। সকলের মনোবাঞ্ছা পূরণ করেন।

    শ্রাবণমাস এলে আমার ঠাকুমা পুরো মাস পদ্মপুরাণ পাঠ করতেন। পূর্ববঙ্গে মা মনসার পূজার খুব প্রচলন। খাল-বিল-পুকুরে ভরা দেশে সর্পের আধিক্য। গ্রামে-গঞ্জে সর্পাঘাতে মৃত্যু খুব স্বাভাবিক ঘটনা। সাপের কামড়ে ওঝাকে ডাকাই দস্তুর। ওঝা ঝাড়ফুঁক করে সাপের বিষ নামাতো। এখন গ্রামাঞ্চলেও চিকিৎসার উন্নতি হয়েছে। সাপে কামড়ালে কাছাকাছি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং যত শীঘ্র চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। গরজ বড়ো বালাই। নিম্নবর্গের মানুষের মধ্যে মা মনসার পূজার প্রচলন খুব বেশি। মা মনসার থানে মঙ্গলার্থে পুজো দেয়, মানত করে।

    কলকাতা শহরে মা মনসার পুজোর কথা শুনিনি। ঠাকুমাকেই দেখতাম বর্ষাকালে পদ্মপুরাণ পড়তে। ঠাকুরমার মুখে শোনা চাঁদ সদাগর ও মনসা দেবীর কাহিনি। পুরাণে মা মনসার কাহিনি আছে। তিনি সর্পের দেবী। মঙ্গলকাব্যে তিনি শিবদুহিতা বলে অভিহিতা। পুরাণানুসারে তিনি ঋষি কাশপ্যের কন্যা। মনসা সর্বাঙ্গে সর্পের দ্বারা ভূষিতা। তিনি পদ্ম অথবা নাগপৃষ্ঠে আরুঢ়া। তাঁর মস্তকের উপর সপ্তফণাযুক্ত নাগছত্র। কথিত আছে যে মনসার সঙ্গে জরুৎকারু মুনির বিবাহ হয়, তাঁদের সন্তান হলেন আস্তিক মুনি। রাজা জনমেজয় সর্পজাতির বিনাশের জন্য সর্পনিধন যজ্ঞ শুরু করলে আস্তিক মুনি নাগদের রক্ষা করেন। বাংলার লৌকিক জীবনে বেহুলা-লক্ষিন্দরের কাহিনি বিখ্যাত। শিব ও চণ্ডীর পরম ভক্ত চাঁদ সদাগর “চ্যাংমুড়ি কানী” মা মনসার পুজো করতে রাজি হননি। আর চাঁদ সদাগর পুজো না করলে পৃথিবীতে মা মনসার পুজোর প্রচার হবে না। চাঁদের কাছ থেকে পুজো আদায়ের জন্য তিনি নানাভাবে চাঁদ সদাগরের ক্ষতি করেন, এমনকি ছয় পুত্রের মৃত্যু ঘটান। লক্ষিন্দর বিয়ের রাতে সাপের ছোবলে মারা গেলে স্ত্রী লক্ষিন্দরের মৃতদেহ নিয়ে স্বয়ং স্বর্গে চলে যান বলে লোককথা আছে। বেহুলার কথায় চাঁদ সদাগর মা মনসার পুজো শুরু করেন। সন্তুষ্ট দেবী চাঁদ সদাগরের পুত্রদের জীবন দান করেন। ধনে-জনে চাঁদ সদাগর সুখে দিন যাপন করলেন এবং দেবী মনসা মর্ত্যে পূজিত হতে থাকলেন।

    পিত্রালয়ের কাছে কাঁকুড়গাছিতে এরকম জনপ্রিয় মনসা পূজার তীর্থস্থান আছে তা কখনোই শুনিনি। বিশ্বসংসারে কত অজানা জিনিস আছে, কত অলৌকিক ঘটনা আছে যা ব্যাখ্যার অতীত। আমার কৌতূহল হল। মা মনসার মন্দির দেখার বাসনা জাগল। কিসের টানে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ কষ্ট করে ছুটে আসে মা মনসার কাছে পুজো দিতে। রাত থাকতে লোকে লাইন দেয়। মন্দিরের দরজা খোলে সকাল সাতটায়।

    ঠিক করলাম ভগিনীর সঙ্গে তীর্থ দর্শনে যাব। সকাল ছটার মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম গন্তব্যস্থলে মানে কাঁকুড়গাছিতে। জায়গাটা যোগোদ্যানের কাছে, যোগোদ্যানে পরমহংস রামকৃষ্ণদেব আসতেন, ধ্যান করতেন। তাঁর পদধূলিধন্য যোগোদ্যান। খুব শান্ত, নিরিবিলি, পরিচ্ছন্ন স্থান। গুগল ম্যাপ দেখে কাঁকুড়গাছি অঞ্চলে পৌঁছে গেলাম, মন্দির দেখাচ্ছে কাছে কিন্তু খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। একজনকে জিজ্ঞেস করাতে বললেন মন্দিরটি একটি বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার পরিত্যক্ত অঞ্চলে, গুগলে কাছাকাছি দেখালেও রাস্তা এখানে বন্ধ। ঘুরে যেতে হবে। খানিক ঘুরে যেতেই পথে অনেক গাড়ি দেখা গেল, এই সকালে লোকজন‌ও বিস্তর। ঐ অঞ্চলের আরেকজনকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল, গাড়ি সরুগলিতে যাবে না। এখানেই গাড়ি রাখতে হবে, মন্দির পর্যন্ত হেঁটে যেতে হবে। ভদ্রলোক একটু বিরক্ত হয়েই বলল, “এখানে কেন? কালীঘাটে গেলেই তো পারেন।”

    অত ভোরবেলায় জায়গাটা জমজমাট। ছোটো গলি, সেখানে মন্দিরে পুজো দেবার উপকরণ বিক্রির দোকান বসে গেছে। দোকান থেকে সব উপকরণ সহ জবাফুলের মালা, ধূপ, বাতাসা, কলা, দুধ, আলতা, সিঁদুর ও পদ্মফুল ডালা পাওয়া যায়। ডালাপিছু দাম একশো-একান্ন টাকা। গাড়ি থেকে নামতেই এক মহিলা আমাদের পাকড়াও করে ওনার দোকানে নিয়ে গেলেন। আমরা চারজন ছিলাম। সবাই পুজোর ডালা নিলাম। জুতো দোকানে রেখে পায়ে হেঁটে চললাম। সেদিন ছিল মঙ্গলবার। শনি-মঙ্গল খুব ভিড় হয়। অনেকে জলের বোতল কিনছেন। ভাবলাম লাইনে বহুক্ষণ দাঁড়াতে হয়, তাই বোধহয় সঙ্গে জলের বোতল রাখে। আসলে ঘটনা তা নয়। জলের বোতল‌ও মায়ের পায়ে ছোঁয়াতে হয়। মায়ের পায়ে ছোঁয়ানো জল মহৌষধির মতো। সেই জল অসুস্থ মানুষকে খাওয়ালে রোগ যন্ত্রণা সেরে যাবে বলে বিশ্বাস। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে দেখলাম এক ভদ্রলোক বাইকে করে প্রচুর জলের বোতল নিয়ে মন্দিরে রাখতে যাচ্ছেন।

    মন্দিরের গেটের বাইরে লাইনে দাঁড়ালাম। মন্দির বলতে যা বোঝায় ঠিক তা নয়। গেট পেরিয়ে বড়ো খোলা জায়গা, এখানেই বোধহয় কারখানা ছিল, কিসের কারখানা জানি না। লাইনে দাঁড়িয়ে মন্দির বুঝতে পারছিলাম না। প্রায় একঘন্টা এক‌ই জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। লাইনে দাঁড়িয়ে নানাজনের নানা কথা, নানা অভিজ্ঞতার কথা শুনছিলাম। আমার মনে প্রশ্ন জাগছিল সাম্প্রতিক কালে এখানকার মা মনসার মন্দিরের কথা এত প্রচার পেল কীভাবে? কাতারে কাতারে লোক এসে যাচ্ছে, বিশাল লাইন। একটি দল এসেছিল ছত্তিশগড় থেকে। শিয়ালদহের কাছে হোটেলে উঠেছে। পুজো হয়ে গেলে সন্ধ্যের ট্রেনে ফিরে যাবে। দলে বয়স্ক মহিলা ছিলেন, দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলেন না। বসার জায়গাও সেরকম নেই। জিজ্ঞেস করে জানলাম ওনারা ফেসবুকে মা মনসার ভিডিও দেখে এসেছেন। আরও কয়েক জনও তাই বললেন, ওনাদের মোবাইলে মায়ের ভিডিও আসে। আমার বোনও সুদূর শিলচরে বসে মোবাইলে দেখেছিল। অনেক অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদেরও লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। কয়েক জন বেশ অসুস্থ মহিলা ছিলেন, বাড়ির লোকজন ধরে রেখেছেন। জানলাম ক্যান্সার রোগাক্রান্ত অনেক রোগী আসেন, কিডনির অসুখ, অনেক কঠিন রোগাক্রান্ত মানুষ যারা আর ডাক্তারের চিকিৎসায় ভরসা পাচ্ছে না, শেষ ভরসাস্থল মায়ের থানে এসেছে অনেক শারীরিক কষ্ট সহ্য করে। শুনলাম ফলও পায় মায়ের আশীর্বাদী ফুলে। সত্যমিথ্যা জানি না। বাস্তবে যা দেখতে পারছি তা হল ছোটোবড়ো নানাবয়সী ও নানা শ্রেণীর মানুষের ভিড়। ফল পায় বলেই লোকে ভিড় করে আসছে। মনে হল হাসপাতালের সমান্তরালে চলছে কাঁকুড়গাছির মা মনসার মন্দির। ডাক্তারের ওষুধ থেকেও মায়ের পায়ে ছোঁয়ানো বোতলবন্দি জল বেশি ফলদায়ক।

    অনেকক্ষণ কেটে গেছে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ গোল শুনে তাকালাম, দেখি একজন শাড়ি পরিহিতা মাঝবয়সী মহিলা আসছেন, সামনে কয়েক জন ভদ্রমহিলার আসার পথ করে দিচ্ছে, অন্যদের সরে যেতে বলছে, লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকেরা জানালো ইনিই পুজো করেন, মহিলা পুরোহিত। সাতটা বেজে গেছে গেট খুলে দিয়েছে। অনেকে লাইন থেকে বেরিয়ে মায়ের মূর্তি দর্শন করে আবার লাইনে দাঁড়াচ্ছে। আমিও দেখতে গেলাম। অনেকটা খোলা জায়গা পেরিয়ে একটি চাতাল। গাছে ঢাকা খোলা ঘর, বেদিতে মায়ের সুন্দর মূর্তি যা ফেসবুকে বা ইউটিউবে দেখতে পাওয়া যায়। মূর্তির মাথায় অনেক সাপের মূর্তি দিয়ে ছাতার মতো। মায়ের গলায় মালা পরাতে চেষ্টা করছেন মহিলা পুরোহিত। যারা রাত দুটো থেকে লাইন দিয়েছেন, তারা একেবারে প্রথমে দাঁড়িয়ে আছেন। মালা পরানো হয়ে গেলে ভক্তদের কাছ থেকে ডালা নেওয়া হবে। জবাফুলের মালা রেখে বাকি উপকরণ ভক্তদের ফিরিয়ে দেওয়া হবে। জলের বোতল মায়ের কাছে দিলে পরে সংগ্রহ করতে হবে। মানত করলে আলাদা ব্যবস্থা। ধাগা নিলে একশো টাকা দিতে হবে। লাইন ছাড়াও খালি চাতালে অনেকে ভিড় করছে মায়ের দর্শনের জন্য। এখানে মোবাইলে ছবি তোলা নিষেধ। তবু লোকে ফাঁকফোকরে ছবি তুলেই নিচ্ছে। একজন মন্দিরের লোক কয়েকজনকে খুব ধমক দিল, মোবাইল নিয়ে নিতে চাইল। মহিলা পুরোহিত বেরিয়ে এসে সেই ভদ্রলোক যে ছবি তুলছিল, তাকে ধমক দিলেন, বললেন এখানে ছবি তুলে মোবাইলে পোস্ট করে টাকা রোজগার করবেন, পুজো দিতে তো আসেননি। মাকে দর্শন করে আরও অনেক কিছু দেখে লাইনে দাঁড়িয়ে পড়লাম। পুজোর ডালা নেওয়া শুরু হতে লাইন এগিয়ে চলল। লাইনে দাঁড়িয়েই দেখলাম অনেক মহিলা সামনের পুকুরে স্নান করে দণ্ডী কাটছেন। লাইনে দাঁড়ানো অনেকেই, দণ্ডী যারা কাটছেন, তাদের গা ছুঁয়ে প্রণাম করছে। মানত পূর্ণ হলে, মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হলে কিংবা মায়ের দয়া পেতে ওনারা দণ্ডী কাটছেন। একজন খুব অসুস্থ মহিলাকেও দণ্ডী কাটতে দেখে খুব কষ্ট হল। মানুষের বিশ্বাস মানুষকে দেবতার কাছে পৌঁছে দেয়, তর্ক-বিতর্ক থাকে বহুদূরে।

    একসময়ে আমরাও এগিয়ে গিয়ে একেবারে মায়ের মূর্তির সামনে। কিন্তু এক সেকেন্ডও লাগল না। হাত থেকে ডালা নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে সরে যেতে বলল। আমার বোনের বরের প্রত্যাশা পূরণ হল না। ভক্তিমনে পুজো দিতে এসেছিল, যাদের জন্য পুজো দিতে আসা তাদের নামগোত্র জানতে চাইলেন না ওনারা। এতক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে মায়ের মূর্তিই ভালো করে দেখা গেল না।

    কতদিন এই মন্দির হয়েছে তা জানি না। তবে ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই আরও বড়ো, আরও সুন্দর মন্দির হবে, যেমন সিরডির সাঁইবাবার মন্দির। লোকে বেশিক্ষণ লাইন দিলেও মাঝে মাঝে বসতে পারবে। জায়গাটার চেহারাই হয়তো পালটে যাবে। মা মনসার মন্দিরকে কেন্দ্র করে কত লোকের আয়ের পথ খুলে যাবে। আমার কৌতূহল মিটল।

    বাড়ি ফেরার পথে যোগোদ্যানে আমরা ঢুকলাম। শান্ত, সুন্দর পরিবেশ, নানা বর্ণের ফুলের সমারোহ, পুকুরে হাঁস খেলে বেড়াচ্ছে, দেখে মন প্রশান্ত হল। মন্দিরে শ্রী রামকৃষ্ণ, সারদা মা ও স্বামী বিবেকানন্দের ছবি। নীরব ঘর, কেউ কেউ ধ্যান করছেন। আমরাও পাঁচ-দশ মিনিট শান্ত চিত্তে বসলাম। মনের মধ্যে অন্যরকম অনুভূতি হল। এখানে যেন নিজেকে খুঁজছি। মা মনসার মন্দিরে অনুভব হল আমরা সকলে প্রার্থী, চাইতে এসেছি, ছেলেমেয়েদের চাকরি, বিয়ে, রোগমুক্তি ইত্যাদি নানা চাওয়া-পাওয়া। দেবতার কাছে কিছু পাওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছি মা মনসার মন্দিরে আর আত্মার শান্তি পেতে যুগমানব শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে। দুরকমের‌ই অনুভূতি হল আজ। দুটোই সত্য।

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  •   (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments