




গতকাল রাত্রে কন্ফারেন্সে ব্যান্কোয়েট ছিল, বিরাট খাবার-দাবারের বন্দোবস্ত। খাওয়া শেষ করে হোটেলের ঘরে যাবার সময় পকেটে করে একটা প্লাম ফল তুলে নিয়ে গেছিলাম। আজ সকালে সেটা হাতে নিয়ে রেমব্রান্টপ্লাইনের দিকে হাঁটা লাগালাম। বেশি দূর না, কাছেই। মিনিট পনেরো লাগবে পৌঁছতে। শহরের নাম আমস্টারডাম।
প্লামটা ভারি মিষ্টি। বাংলায় কি বলে জানি?
আলুবোখরা।
বাংলা শব্দটা মনে পড়তেই আলুর কথা মনে পড়ল। বহু বছর দেখা হয়নি। এক কালে কাছাকাছি থাকতাম, সান ফ্রান্সিস্কোর এক শহরতলীতে। আসল নাম অমরেশ। আমরা, মানে বন্ধুরা, সবাই ওকে আলু বলে ডাকতাম। হঠাৎ কিছু একটা ঘটলে – যেমন কাপ থেকে চা চলকে পড়লে বা ফোন বিল দেওয়া হয়নি হঠাৎ মনে পড়লে – সবাই যখন “এই যাঃ” কিম্বা “ধূর তেরিকি” বলে, অমরেশ চেঁচিয়ে উঠে বলত “আলুবোখরা!” কে জানে কেন।
আলুর একটা ছেলে ছিল, প্রচুর বুদ্ধি। যতদূর মনে পড়ছে নাম ছিল সমীরণ। খুব ছোটবেলা থেকেই বোঝা যেত বড় হয়ে কিছু একটা হবে। আমেরিকায় জন্মে আর মানুষ হয়েও পরিষ্কার বাংলা বলত। যখন ওর স্কুলে পড়ার বয়স, তখন বাঙালি জমায়েতে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইত। পিয়ানো বাজাত, কারাটে শিখত, আরো কত কি! অমরেশ গর্ব করে বলত, “আমি ডাক্তার হতে পারলাম না। ও ডাক্তার হবে।” বাপ-মা’র ন্যাওটা ছিল ছেলেটা। বাধ্য ও সুশীল। আমরা সবাই আমাদের ছেলেমেয়েদের বলতাম, “ওর মত হতে পারিস না?”
তারপর আমি সান ফ্রান্সিস্কো ছেড়েছি অনেক বছর হল। দু’এক বছর ফোনে যোগাযোগ ছিল। তারপর যা হয় – যে যার জীবন নিয়ে ব্যস্ত। ক্ষীণ হতে হতে এক সময় যোগাযোগ একেবারেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। যতদূর মনে পড়ছে শেষ শুনেছি অমরেশের ছেলে হাই স্কুল পাশ করে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে ঢুকেছিল।
এই সব ভাবতে ভাবতেই রেমব্রান্টপ্লাইন পৌঁছে গেলাম। এই চত্বরটা আমার খুব প্রিয়। কয়েক বছর পর পর যখনই আমস্টারডামে আসি, একবার ঘুরে যাই। মাঝখানে একটা ছোট পার্কের মত। চারপাশে গাড়ির রাস্তা। সেই পরিধিতে বিভিন্ন জায়গায় এসে মিশেছে ছ’-সাতটা রাস্তা।
পার্কে অনেকগুলো বসার বেঞ্চি আর দুটো স্ট্যাচু।
একটা স্ট্যাচু রেমব্রান্টের প্রতিমূর্তি। রেমব্রান্ট ছিলেন সপ্তদশ শতাব্দীর বিখ্যাত চিত্রকর। তাঁর স্ট্যাচুটা দেড়শ বছরের বেশি পুরোনো।

আর অন্য স্ট্যাচুটা থিংকার (চিন্তাবিদ) – বছর তিনেক আগে বানানো। ফরাসী ভাস্কর রদাঁ’র বিখ্যাত ভাস্কর্য থিংকার নয়। সেটার একটা আধুনিক সংস্করণ। এটাতে একজন আস্ট্রোনট (মহাকাশচারী মানুষ) রঁদা’র ভাস্কর্যের মত একই চিন্তাশীল ভঙ্গিতে বসে রয়েছে।
রেমব্রান্টপ্লাইনে আধুনিক ও প্রাচীনের এই বিচিত্র সমাবেশ আমার খুব পছন্দ। রেমব্রান্টের জন্ম ১৬০৬, তাঁর স্ট্যাচুটা ১৮৫২, রদাঁর থিংকার ১৯০৪, আস্ট্রোনট থিংকার ২০২৩।

পার্কের চার পাশে যে রাস্তা, তার অন্য পারে, ফুটপাতে বিভিন্ন কাফে ও রেস্তোরাঁ। দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে একটা রাস্তা বেরিয়ে গেছে যার দু’পাশে চওড়া ফুটপাত। সেইদিকে এগোলাম।
এই রাস্তার ফুটপাতে একটার পর একটা কাফে। তারই মধ্যে একটাতে ফাঁকা টেবিল বেছে নিয়ে বসে পড়লাম।
আমি রাস্তার দিকে মুখ করে বসেছি। আমার বাঁ-দিকে একটা টেবিলে একজন বয়স্কা মহিলা বসে কফি আর কেক জাতীয় কিছু একটা খাচ্ছেন। তাঁর পায়ের কাছে বসে আছে অতি বাধ্য ও শান্ত একটা বিরাট কুকুর। আমি লক্ষ করেছি যে এই দেশে কুকুরদের ট্রেনিং দিয়ে এতই বাধ্য ও সুশীল করে দেয়, যে তাদের আর নিজস্ব কোনো চরিত্র থাকে না।
আমার ঠিক ডান দিকের ও সামনের টেবিলে কেউ নেই। খানিকটা দূরে ডান দিকে আরেকটা টেবিলে এক অল্পবয়স্ক দম্পতি বসে বসে যে যার নিজের মোবাইল দেখছে। কেউ কারোর দিকে তাকাচ্ছে না, কথাও বলছে না। আমার অন্যদিকে আরেকটা টেবিলে একটি বছর তিরিশেকের মেয়ে বসে বই পড়ছে। মেয়েটিকে একটা কাপ পরিবেশন করে, পরিচারিকা আমার কাছে এল।
আমি একটা ডাবল্ এস্প্রেসো অর্ডার করলাম। পরিচারিকা চলে গেল।
এপ্রিলের শেষ। গরম এখনো পড়েনি। ঠান্ডাও চলে গেছে। খুব মনোরম আবহাওয়া। মৃদুমন্দ বাতাস দিচ্ছে। রাস্তা দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে মাঝে মাঝে। সাইকেল যাচ্ছে ঘন ঘন। রেমব্রান্টপ্লাইনের পার্কের ধারের রাস্তায় বাস-ট্রামও যাচ্ছে নিশ্চয়ই – আমার এখান থেকে দেখা যাচ্ছে না।
তিনটে ছেলে (বা লোক) সাইকেল চালিয়ে এল একসঙ্গে। কাছেই বাইক র্যাকে সাইকেল পার্ক করে আমার ডান দিকের খালি টেবিলে এসে বসল।
তিনজনেরই বয়স তিরিশ বা পঁয়তিরিশ হবে। সুন্দর ছিমছাম চেহারা। সাইক্লিস্টের আঁটসাঁট জামা প্যান্ট। দু’জনের হাতে হেলমেট। একজনের হাতে একটা স্টীলের জলের বোতল।
জলের বোতল হাতে ছেলেটাকে দেখে ভারতীয় মনে হল। তার ঝাঁকড়া কালো চুল।
বাকি দুজন শ্বেতাঙ্গ। তাদের খাটো করে কাটা চুলের রঙ খয়েরী, সাদা আর হলুদ মেশানো। একজন ছ’ফুটের ওপর লম্বা ও রোগা। অন্যজন পেশীবহুল।
ভারতীয় ছেলেটা ইংরিজিতে বলল, “আজকের রাইডটা ভালো ছিল!” রাইড বলতে আমি বুঝলাম সাইকেল ভ্রমণ।
লম্বা ছেলেটা বলল, “হ্যাঁ, স্যাম্!”
তিনজনে তিনটে চেয়ারে বসে চতুর্থ একটা চেয়ারে হেলমেটদুটো রাখল। হাতের জলের বোতলটা স্যাম টেবিলে রাখল।
লম্বা ছেলেটা বলল, “ম্যাক্স্, আজ তুই একটুর জন্য বেঁচে গেছিস। ফনডেলপার্কে ওই দুটো-বাচ্চা-ওয়ালা বাকফীট্স্-চালানো মহিলা আজ তোকে প্রায় মেরে দিয়েছিল!”
ম্যাক্স বলল, “দুটো না, তিনটে বাচ্চা! ওই বাকফীট্স্-গুলো ভয়ঙ্কর!”
আমস্টারডামে হাজার হাজার সাইকেল চলে। তার মধ্যে কিছু সাইকেল হল বাকফীট্স্, যার আক্ষরিক অর্থ হল বাক্স-সাইকেল। সেখানে চালক আর সামনের চাকার মাঝখানে একটা বিরাট খোলা বাক্সের মত জায়গা থাকে — সেখানে মাল নেওয়া যায়, বাচ্চা নেওয়া তো সচরাচর প্রতিদিনের ব্যাপার, এমন কি মাঝে মাঝে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষও দেখা যায়।
স্যাম বলল, “আরো বিপজ্জনক হল ওই ডাচ্ মা’রা যারা ওগুলো চালায়।”

(Source: https://black-bikes.com/rent-a-bike/e-cargo/)
তিনজনেই ইংরিজিতে কথা বলছিল। স্যামের উচ্চারণভঙ্গী মার্কিন, ভারতীয় নয়। শুধু চেহারাটা আর মুখটা ভারতীয়। পল আর ম্যাক্সের অ্যাক্সেন্ট ইউরোপীয়, তবে ডাচ্ বলে মনে হল না। আমার আন্দাজ পেশীবহুল ম্যাক্স হয় ইতালীয় নয়তো স্প্যানিশ। লম্বু পল জার্মান বা অস্ট্রিয়ান।
ইংরিজিতে তুই-তুমি’র প্রভেদ নেই। কিন্তু তিন বন্ধুর অন্তরঙ্গতার জন্য আমি ’তুই’ করেই লিখছি।
স্যাম জিগ্যেস করল, “কাল রাত্রে তোদের ঘুম কেমন হল?”
এরকম প্রশ্ন শুনে পল হা হা করে হেসে উঠল।
ম্যাক্স বলল, “হ্যাঁ, সেই সব দিন খুব মনে পড়ে। আট ঘন্টা টানা ঘুম। সে সব সুখের দিন ছিল।”
পল বলল, “যা বলেছিস! কাল রাতে আমার চার ঘন্টা ঘুম হয়েছে। আমি বলব ভালো রাত কেটেছে।”
স্যাম বলল, “আমি বোধহয় দুটো খেপে দু’ঘন্টা করে ঘুমিয়েছি।”
ম্যাক্স - “আমি কত ঘুমিয়েছি ভগবানও জানে না। বাচ্চাটা সারা রাত জেগে ছিল।”
তিনজনে টেবিলে রাখা মেনু দেখতে শুরু করল। একটু পর স্যাম, যাকে আমার ভারতীয় মনে হচ্ছিল, বলল, “আমরা হয়তো মাস দুই পর কিনডারডাখভেরব্লেইফ পেয়ে যাব। প্রায় এক বছর আগে অ্যাপ্লাই করেছিলাম।”
ওই খটমট ডাচ্ শব্দটার মানে – দিনের বেলা বাচ্চা রাখার জায়গা, যেখানে বাচ্চাদের দেখাশোনা হয়, ক্রেশ-এর মত। এই সংস্থানগুলো সাধারণত সরকারি তত্ত্বাবধানে চলে।
স্যামের কথা শুনে পল একটা ব্যঙ্গাত্মক “গুড লাক” জানাল। আন্দাজ করলাম যে সরকারি ক্রেশে জায়গা পাওয়া হয়তো সহজ নয়।
ম্যাক্স বলল, “আমাদেরটা কিন্তু মোটামুটি ভালোই চলছে। প্রত্যেক সোমবার আর বৃহস্পতিবার।”
স্যাম বলল, “আমরা কি কখনো আর সেই পুরোনো দিনগুলোতে ফিরে যাব? সেই রাত-পোহানো পার্টি আর সুরাপান? এখন তো বিকেল বেলা একটু পার্কে হাঁটার সুযোগ পেলেই নিজেকে ধন্য মনে হয়।”
পল - “আর রেমব্রান্ট পার্কে বাচ্চাদের খেলার জায়গায় গিয়ে বসা!”
আমস্টারডামের অনেক সুন্দর সুন্দর পার্কের মধ্যে একটা হল রেমব্রান্ট পার্ক। আমরা যে রেমব্রান্টপ্লাইনে বসে আছি, সেটা অন্য জায়গা।
পল - “কিরণের তো পুরো পার্সোনালিটিই পাল্টে গেছে। এখন ও একশো ভাগ মা।”
আন্দাজ করলাম পলের স্ত্রী ভারতীয়, নাম কিরণ।
স্যাম বলল, “আমি লক্ষ করেছি অফিসের কাজে আমার ফোকাস এখন আগের থেকে ভালো। কারণ – জানি, যাই হোক না কেন, পাঁচটা বাজলেই আমাকে কাজ বন্ধ করতে হবে।”
পল - “আমি সারাক্ষণ খুঁজে বেড়াই কোথায় ফ্যামিলি-ফ্রেন্ডলি (পরিবার-ভাবাপন্ন) কাফে আছে, যেখানে বড় সাইকেল সহজে পার্ক করা যায়।”
ওয়েট্রেস মেয়েটি ওদের কাছে এসে দাঁড়াল। তিনজনে কফি আর বিভিন্ন ব্রেকফাস্টের খাবার অর্ডার করল। পরিবেশিকা চলে গেলে, পল বলল, “স্যাম, তোর সেই বাচ্চা-শেয়ার করার ক্লাব কেমন চলছে?”
ম্যাক্স বলল, “সেটা আবার কী?”
আমি এমনিতেই সব কথা শুনতে পাচ্ছিলাম। এখন কৌতূহলে কান দুটো আরো খাড়া করলাম।
পল - “তুই জানিস না? ওরা কয়েকজন মিলে একটা দল বানিয়েছে। সবারই ছোট ছোট বাচ্চা। ওরা পালা করে এক একদিন এক একজন সব বাচ্চাগুলোকে একসাথে দেখাশোনা করে।”
ম্যাক্স - “ও হ্যাঁ, শুনেছি। এক জোড়া বাবা-মা দেখে আর অন্য বাবা-মাদের তখন ছুটি।”
স্যাম - “ক্লাব ভালোই চলছে। তোরাও ওরকম ক্লাব বানিয়ে চেষ্টা করে দেখতে পারিস। আমাদেরটা কাল আছে। দুপুর বারোটায় বাচ্চাকে নাবিয়ে দিয়ে ঘন্টা দুয়েকের জন্য ঝাড়া হাত-পা। তবে হ্যাঁ, যখন আমাদের পালা হয়, তখন বেশ ব্যথা থাকে। অতগুলো বাচ্চার একসাথে কান্নাকাটি আর ঝামেলা।”
ম্যাক্স দুটো হাত আদ্ধেক তুলে, বুকটা সামনের দিকে সামান্য ঝাঁকাল। একই সাথে দু’হাতের আঙুলগুলো বাইরের দিকে ঘুরিয়ে, মুখ থেকে “অ্যাঁঃ” গোছের একটা মৃদু শব্দ বার করল। এটা নির্ভুল ভাবে একটা ইতালীয় অঙ্গভঙ্গী। এই জেসচারটা আমার খুব ভালো লাগে। ম্যাক্স যে ইতালীয় তা নিয়ে আমার মনে আর কোনো সন্দেহ রইল না।
পালা করে বাচ্চা দেখার আইডিয়াটা আমার যুক্তিযুক্ত মনে হল। নতুন বাবা-মা’রা শিশুদের নিয়ে নাজেহাল। সাহায্য করার বা ভরসা দেবার কেউ নেই। কারুরই বাবা-মা মাসি-পিসি কাছাকাছি নেই। তাই নিজেরাই নিজেদের সহায়। আজকের এই ব্যক্তি-স্বাধীনতা ও নিঃসঙ্গতার যুগে নতুন একটা গঠনমূলক সামাজিক উন্নয়ন।
ভাবতে ভাবতে মনে পড়ল কিছুদিন আগেই পড়ছিলাম যে আজকাল নানান রকম অ্যাপ্ হয়েছে যার মাধ্যমে সন্তান বড় করার পার্টনার বা অংশীদার খোঁজা যায়। বিয়ে করার দরকার নেই, এমন কি যৌন সম্পর্কেরও প্রয়োজন নেই। শুধু দুজন একে অন্যকে খোঁজে একসাথে সন্তানপালন করবে বলে। তার মধ্যে দুটো অ্যাপ – মোড্যামিলি (modamily) আর কোপেরেন্ট্স্ (CoParents) – আমেরিকায় খুব জনপ্রিয় হয়েছে। এই নতুন ব্যাপারটার নাম দেওয়া হয়েছে Platonic Co-Parenting, অর্থাৎ অ-রোমান্টিক যৌথ সন্তান-পালন।
সমাজ কী রকম পাল্টে যাচ্ছে! মানুষ বেঁচে থাকার নিত্য নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করছে। বাচ্চা-দেখার ক্লাব তো সেই হিসেবে কিছুই না।
এইসব ভাবতে ভাবতে ছেলেগুলোর কথা খানিকক্ষণ শুনিনি।
পরিচারিকা খাবার নিয়ে এল। ওদের টেবিলে খাবার রেখে আমাকে জিগ্যেস করল আমি আর কিছু চাই কিনা। আমি বললাম, না।
পল বলল, “আর তোর ভাড়া-করা দাদু-দিদার কী খবর?”
ম্যাক্স আঁতকে উঠল, “কি?!”
পল - “স্যাম ওর বাচ্চার জন্য দাদু-দিদা খুঁজছে, ঘন্টা হিসেবে যদি ভাড়া পাওয়া যায়।”
ম্যাক্স - “সত্যি?”
স্যাম - “হ্যাঁ, ওই ধরণেরই কিছু একটা। মানে, তোরা তো জানিস আমার বাবা-মা আমেরিকায় থাকে। ওদের সাথে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। আর সীমার বাবা-মা ভারতবর্ষে থাকে। তাই ভাবছিলাম যদি কোনো বিকল্প দাদু-দিদা পাওয়া যায়। পার্ট-টাইম।”
বুঝলাম স্যামের স্ত্রীর নাম সীমা।
ম্যাক্স - “বাবা রে! তা, পেলি না কি? কোনো বিকল্প ভাড়াটে দাদু-দিদা পেলি না কি?”
স্যাম - “কি আর বলব, খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলাম। অনলাইনেও। কিন্ত এখনো কিছু পাইনি। মনে হচ্ছে পাবো না।”
ওরা নিঃশব্দে খেতে লাগল।
আধুনিক সভ্যতার এই ক্রমবিকাশমান নিত্য-নতুন সামাজিক কাঠামো ও রীতিনীতির কথা শুনে আমি একটু হকচকিয়ে গেছিলাম। আস্তে আস্তে কথাগুলো হজম করার চেষ্টা করছিলাম।
আমার মোবাইল বাজল। আমার এক সহকর্মী ফোন করছে কনফারেন্স থেকে। খোঁজ নিচ্ছে আমি কনফারেন্স থেকে হাওয়া হয়ে গেলাম কোথায়। ওর সাথে একটু কথা বললাম।
কথা বলতে বলতে তিন-মূর্তির কথোপকথন আবার খানিকটা শোনা হল না। যখন ফোন রাখলাম, ওদের খাওয়া হয়ে গেছে। স্যাম কিছু একটা বলছিল, আমি শুধু তার শেষ অংশটা শুনতে পেলাম।
স্যাম - “...তারা যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী রক্ষণশীল সনাতন ভারতীয়। আমার থেকেও সেইরকম যথাযথ ভারতীয় ব্যবহার আশা করে। ভেবে দ্যাখ্! আমি জন্মেছি আমেরিকায়, বড় হয়েছি আমেরিকায়, পড়াশুনো করেছি আমেরিকায়। ভারতবর্ষে গেছি অনেকবার, বিশেষ করে ছোটবেলায়। কিন্তু এক মাসের বেশি কখনো থাকিওনি। ওরা আশা করে আমি ওদের মত পাক্কা ভারতীয় হয়ে যাব। পাসপোর্ট কিন্তু আমেরিকান! আমার পক্ষে ওই নাটকটা আর করা সম্ভব হল না।”
সবাই খানিকক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর পল বলল, “যাক গে।”
ম্যাক্স - “আমাকে এবার উঠতে হবে। আজকের সাইকেল রাইডের জন্য ধন্যবাদ!”
পল - “হ্যাঁ, আমাকেও যেতে হবে ডায়পার কিনতে।”
স্যাম - “আমার তো কাল রাত থেকে সীমার সাথে ঝগড়া চলছে। এক্ষুনি আমি বাড়ি যাব না। আমার আরো এক ঘন্টা বরাদ্দ আছে নিজের জন্য। কো-ওয়ার্কিং স্পেসে গিয়ে এক ঘন্টা হাল্কা মনে কাটাব।”
আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লাম। রেস্তোরাঁর ভেতরে গিয়ে বিল চুকালাম। যখন আবার ফুটপাতে বেরিয়ে এলাম, দেখি ছেলেগুলো যাবার তোড়জোড় করছে।
আমি রেমব্রান্টপ্লাইনের মোড়ের দিকে হাঁটা লাগালাম।
কয়েক পা যেতেই শুনতে পেলাম পেছনে ঠং করে কিছু একটা পড়ার শব্দ হল।
তার সাথে শুনতে পেলাম স্যামের উচ্চস্বরের গলা – ইংরিজিতে নয়, পরিষ্কার বাংলায় – “আলুবোখরা!”
পেছন ফিরে দেখি স্যামের হাত থেকে স্টীলের জলের বোতলটা পড়ে গেছে।