




(১) নৃশংস
“রী-তেশ!”
“পূজা, তুই?”
“আমার দিদির বিয়ে তো! আর তুই, মনে হচ্ছে ভিডিওগ্রাফি টিমে?”
“হ্যাঁ। দেখিস, এমন ভিডিও করে দেব যে তোর বিয়েতেও আমাদের ডাক পড়বে।”
“ছাড়! অনেক দিন পরে দেখা, এখন বল অন্য বন্ধুরা কেমন আছে? অনীশ, রুপালী, ওদের সঙ্গে কন্টাক্ট আছে?”
এরপর কিছুক্ষণ পুরোনো দুই বন্ধু মেতে গেল গল্পে, স্মৃতিচারণে।
হঠাৎ পূজার চোখ পড়ল, কিছুদূরে দাঁড়িয়ে তার বাবা তাদের দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে। সে বাবাকে ভালোই চেনে। তাই ছিটকে সরে গিয়ে বলল, “চলি রে, রীতেশ। বাবা বোধহয় আমাকে খুঁজছে।”
***
কুবের ঠাকুরের কুপিত হওয়ার কারণ ছিল। তার বিরাট রিয়াল এস্টেটের কারবার, সঙ্গে আছে কাঠের ফলাও ব্যবসা। এই অঞ্চলের সে বলতে গেলে বাদশা। আর একটা ভিডিওগ্রাফার ছোঁড়ার এত সাহস প্রকাশ্যে তার মেয়ের সঙ্গে ফ্লার্ট করে?
এক সময় মেয়েরা যুগ্যিমন্ত হলেই তাদের বিয়ে দিয়ে শ্বশুরবাড়ি পাঠিয়ে দেবার একটা সুস্থ প্রথা ছিল। এখনকার নিয়ম, মেয়েদের স্কুল-কলেজে পাঠিয়ে বিদ্যেধরী করতে হবে আর আঠেরোর আগে বিয়ে দেওয়া চলবে না। এতে ঐ বাইরমুখী মেয়েগুলোর গা গরম হয়ে যায় আর সেই জ্বালা মেটাতে তারা নর্দমা, ভাগাড় যেখানে পারে শুয়ে পড়ে। তারপর সেই দুর্গন্ধ নিয়েই বাড়িতে ঢুকে প্রপার্টিতে ভাগ বসাবার চেষ্টা করে।
তার মেয়েরাও ব্যতিক্রম নয়। বড়টাকে অনেক কষ্টে শেষ মুহূর্তে চুলের ঝুঁটি ধরে টেনে এনে সৎপাত্রস্থ করা গেল। এখন আবার ছোটটার সম্বন্ধেও নানা কথা শোনা যাচ্ছে।
“বাবা, আমাকে খুঁজছিলে?”
“ঐ ভিডিওগ্রাফার ছেলেটার সঙ্গে তোর এত কীসের আড্ডা?”
“ওর সঙ্গে তো আমি কোচিংয়ে পড়তাম। অনেক দিন পর দেখা –”
“নাকি ও তোর আশিক আর একটা চালাকি করে বিয়েবাড়ি ডেকে এনেছিস?”
“না না, বাবা!” পূজা ভীতস্বরে বলল, “সত্যি বলছি, প্রায় পাঁচ বছর পর দেখা। তাই পুরোনো বন্ধুরা কে কেমন আছে, জিগ্যেস করছিলাম।”
“ঠিক আছে, আমি যা বোঝার বুঝে নিয়েছি। এবার ও টের পাবে ঠাকুর ফ্যামিলির মেয়ের ওপর নজর দেবার কী ফল। বিষ্ণু, তিলক –”
পূজার মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল। “না বাবা, না!” সে আকুলস্বরে বলল, “ও খুব ভালো ছেলে, নিরীহ ছেলে। কারো সাতেপাঁচে থাকে না। ওকে কিছু বোলো না।”
কুবের মেয়ের হাত ঠেলে সরিয়ে ছেলেদের খুঁজতে চলে গেল।
***
বিয়ে কিছুক্ষণ আগে শেষ হয়েছে। নিমন্ত্রিতরা আরো আগে বিদায় নিয়েছেন। ভিডিওগ্রাফাররা পাততাড়ি গুটিয়ে একে একে বাড়িমুখো। রীতেশ তার স্কুটিতে রওনা দিল। এমন সময় কুবের তার দুই ছেলেকে নিয়ে তাড়াতাড়ি পার্ক করা এক স্করপিওঁর দিকে এগিয়ে গেলেন। ছেলেদের হাতে লাঠি, রডের মতো কিছু সন্দেহজনক বস্তু।
হঠাৎ মিসেস ঠাকুর দৌড়ে এসে স্বামীর পায়ে পড়লেন, “ওগো, আজ শুভদিন। একটা রক্তারক্তি করে অমঙ্গল ডেকে এনো না।”
“এই জন্যেই শাস্ত্রে বলেছে, স্ত্রীবুদ্ধি ভয়ঙ্করী।” কুবের স্ত্রীকে ঠেলে সরিয়ে গাড়িতে উঠলেন।
ফাঁকা রাস্তায় জোরে স্কুটি চালাচ্ছিল রীতেশ। রাত অনেক, কিন্তু এ রাস্তায় কোনো ভয়ভীতির কারণ কখনো ঘটেনি। তাছাড়া তার আছেই বা কী? কেউ চাইলে, দিয়ে দেবে।
সে খেয়াল করেনি একটা স্করপিওঁ কিছুক্ষণ ধরেই তার পিছু নিয়েছে। হঠাৎ সেটা স্পীড বাড়িয়ে সামনে এসে ব্রেক কষল। রীতেশও বাধ্য হয়ে থামল। সে কিছু বোঝার আগেই যমদূতের মতো দুই জোয়ান এসে তার দু'হাত চেপে ধরল। আলো-আঁধারে তাদের ভালো চেনা না গেলেও এবার যে প্রৌঢ় নামলেন তাকে সে চিনেছে, কুবের ঠাকুর।
“অজাতটাকে ভালো করে বুঝিয়ে দে ঠাকুর ফ্যামিলির মেয়ের ওপর নজর দেবার কী শাস্তি!”
এরপর জোয়ান দুজন তাকে বেধড়ক পেটাতে লাগল, প্রথমে খালি হাতে তারপর ব্যাটন দিয়ে। “ভুল করছেন, আমি কিছু করিনি!” রীতেশের ক্ষীণ প্রতিবাদ তাদের তর্জনে ডুবে গেল। একটু পরে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, প্রতিবাদ ততক্ষণে পরিণত হয়েছে গোঙানিতে। আঘাত তবুও অব্যাহত রইল।
এক সময় একটা আঘাত মাথার পেছনে পড়ার পর ওদের মনে হল, ছেলেটা আর গোঙাচ্ছে না। তখন বাপ ছেলেদের বলল, “অনেক হয়েছে, এবার চল।”
(২) শপথ
“এটা কি সতীশ মাথুরের নম্বর?”
“হ্যাঁ, আপনি –”
“রীতেশ মাথুর আপনার ছেলে?”
“হ্যাঁ। ও তো এখনো বাড়ি ফেরেনি –”
“ওর একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। সিরিয়াস। এমকে হসপিটালে আছে। আপনারা কেউ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে আসুন।”
রাত দুটো। অটো পাওয়া দুষ্কর। সতীশ বাধ্য হয়ে ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী চৌধুরীকে জাগিয়ে তাঁর গাড়িতে বড় ছেলে দীপককে সঙ্গে নিয়ে চললেন।
হাসপাতালে গিয়ে দ্রুত নির্দিষ্ট ওয়ার্ডে পৌঁছোলে জুনিয়র ডাক্তার চোখ নিচু করে সাদা চাদরে ঢাকা একটা দেহ আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, “সরি, আমরা কিছু করার সুযোগ পাইনি। এখানে আসার আগেই –”
যখন চৌধুরী সদ্য পুত্রহারা সতীশকে সামলাতে ব্যস্ত, দীপকই শক্ত থেকে ঘটনার বিবরণ যথাসাধ্য জানার চেষ্টা করছিল।
“অ্যাকসিডেন্ট না। ছেলেটাকে নির্দয়ভাবে পেটানো হয়েছে। পোস্ট মর্টেমে নিশ্চিত বোঝা যাবে। তবে সম্ভবত গোটা দুই পাঁজর ভেঙেছে আর মাথার পেছনের একটা আঘাত প্রাণঘাতী হয়েছে। অত রাতে, বোধহয় ও কোনো ছিনতাই গ্যাংয়ের পাল্লায় পড়েছিল।” বলছিলেন ডাক্তার।
“কাজ সেরে ভাই প্রায়ই রাত করে ফেরে। এ অঞ্চলে ছিনতাইয়ের কথা আগে শোনা যায়নি। আর ছিনতাই গ্যাং মোবাইল, ওয়ালেট নিল না?”
“তাও বটে! তবে কি কেউ শত্রুতা করে –”
“আমার ভাই ছিল নির্বিরোধ, সদাহাসি। তার সঙ্গে শত্রুতা, ভাবাও যায় না।”
“যাক, পুলিশে জানানো হয়েছে। দুঃখিত, আমরা কিছু করার সুযোগ পেলাম না। এখন বাড়ি যান। কাল পোস্ট মর্টেমের পর বডি পাবেন।”
***
একটা হাসিখুশি, প্রাণোচ্ছল ছেলে, কয়েক ঘণ্টায় বডি! প্রতিবেশীরা এসেছেন বাড়ির লোকেদের সান্ত্বনা দিতে। মা'কে সামলানো যাচ্ছে না। শুধু একফোঁটা জল নেই রীতেশের দিদি বর্ষার চোখে।
ভাই তার প্রাণের চেয়ে প্রিয় ছিল। এই আকস্মিক আঘাত যেন তাকে পাথর করে দিয়েছে। কিন্তু কেউ ভালো করে লক্ষ করলে বুঝত, তার চোখে শীতল আগুন।
“আমার নির্বিরোধ, ভালোমানুষ ভাইকে যারা মেরেছে, তাদের শাস্তি পেতেই হবে।” সে ফিসিফিসিয়ে উচ্চারণ করছিল।
একটু বেলা হতেই বর্ষা একের পর এক ফোন করতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যে হাজির হল রীতেশের কিছু বন্ধু আর তার ভিডিওগ্রাফির অন্যতম সঙ্গী নীতিশ।
“তুই কিছু জানিস? রীতেশের সঙ্গে কারো কিছু হয়েছিল?”
“দিদি, পাশের ঘরে এস।” ফিসফিসিয়ে বলল নীতিশ।
“জানো তো, আমরা কুবের ঠাকুরের মেয়ের বিয়েয় ভিডিওগ্রাফি করতে গিয়েছিলাম। সেখানে বেরিয়ে গেল ঠাকুরের ছোট মেয়ে পূজা রীতেশের চেনা, বোধহয় একসঙ্গে কোচিংয়ে পড়ত। ওরা গল্প করছিল, হঠাৎ বাবা কটমট করে চাইছে দেখে পূজা ছিটকে সরে গেল।”
“তারপর?” বর্ষা রুদ্ধশ্বাসে জিগ্যেস করল।
“তারপর কাজ সেরে রীতেশ যখন বেরিয়ে গেছে, আমরাও যাবার তোড়জোড় করছি, দেখলাম কুবের তার দুই ছেলেকে নিয়ে স্করপিওঁতে উঠছে আর মিসেস ঠাকুর তার হাত ধরে বলছে, ‘ওগো, যেও না। আজ একটা শুভদিন –’ কিন্তু কুবের তাকে ঠেলে সরিয়ে বেরিয়ে গেল।”
“ওরাই মেরেছে রীতেশকে! ভেবেছে ও ওদের মেয়ের আশিক। আমার বেগুনাহ ভাইটা –” এতক্ষণে বর্ষা কান্নায় ভেঙে পড়ল।
একটু পরেই সে আবার আত্মস্থ হয়ে বলল, “ওদের শাস্তি পেতে হবে। কাউকে ছাড়ব না। আমি এক্ষুণি পুলিশে যাব।”
কিন্তু প্রস্তাবটা তুলতেই সে বাড়ির লোকের প্রবল বিরোধিতার সামনে পড়ল।
“ক্ষেপেছিস! ওদের অনেক ক্ষমতা। বিরাট রিয়াল এস্টেট বিজনেস প্লাস জঙ্গলের ইজারা। মুখ্যমন্ত্রী থেকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সবার সঙ্গে ওঠাবসা। যে গেছে সে তো ফিরবে না। কিন্তু স্রেফ সন্দেহের বশে ওদের দিকে আঙুল তুললে ওরা হাতটাই ভেঙে দেবে।”
“বেশ, তোমরা কেউ না গেলে আমি একাই যাচ্ছি।” বর্ষা চটপট তৈরি হয়ে নিল।
“চলো দিদি, আমিও আসছি।” নীতিশ বলল।
***
পুলিশ স্টেশনে গিয়ে বর্ষার খুব তিক্ত অভিজ্ঞতা হল।
“দেখুন, আপনি কতগুলো ছেঁড়া ছেঁড়া সন্দেহের বশে এক রইস ফ্যামিলির বিরুদ্ধে এফ আই আর করতে বলছেন। কিন্তু সেটা তো সম্ভব নয়, প্রুফ কই?”
“আমি যদ্দুর আইন জানি, আপনার কাজ আমার অভিযোগের ভিত্তিতে এফ আই আর ফাইল করে নেওয়া। তারপর প্রুফ জোগাড় করা আপনাদের দায়িত্ব। আরো শুনেছি, আইন ছোটবড় সবার জন্য এক। এখন আমি যদি বলতাম আমাদের পরিচারিকা টাকা চুরি করে পালিয়েছে, আপনি কি তাকে ধরে এনে পিটিয়ে প্রুফ বের করার চেষ্টা করতেন না?”
“সবই তো বোঝেন, তবে আর কথা বাড়ান কেন?” ইনস্পেকটর দেঁতো হেসে বললেন।
“তাহলে আপনি এফ আই আর নেবেন না?”
“না। বুঝতে পারছি, ভাই চলে যাওয়ায় আপনি ট্রমায় আছেন। কিন্তু আপনার কথামতো চললে তো আমাদের চলবে না। আপনার ভাই ছিনতাই গ্যাংয়ের হাতে খুন হয়েছে। পেছনে আরেকটা গাড়ি এসে পড়ায় ওরা কিছু নিতে পারেনি। আমরা কেস রেজিস্টার করেছি, অপরাধী দু-এক দিনেই ধরা পড়বে। এবার বাড়ি যান।”
“বেশ। তবে আমি আবার আসব আর আপনার ঐ প্রুফ নিয়ে। তখন যদি খবরটা ভাইরাল হয়, আমাকে দুষবেন না। চল, নীতিশ।”
বেরোতে বেরোতে নীতিশ বলল, “এই চৌবে ব্যাটাও কাল নিমন্ত্রিত ছিল। ঠাকুরদের সঙ্গে এদের খুব দহরম-মহরম।”
(৩) ফুটেজ
“কালকের তোলা ভিডিওগুলো কি তুই ঠাকুরদের হাতে তুলে দিয়েছিস?”
“এখন ওটা মালিক সুরজের কাছে। ও এডিট করে পেন ড্রাইভে ভরে দিয়ে আসবে।”
“তবে আর কী?” হতাশ বর্ষা বলল, “ওতে হয়তো কোনো ক্লু পাওয়া যেত।”
“সুরজ লোক ভালো। রীতেশকে ও খুব স্নেহ করত। ওকে বললে নিশ্চয়ই কো-অপারেট করবে। আর, অরিজিনালটা তো আমাদের কাছেই থাকবে।”
এক ঘণ্টা পর সুরজের এডিট রুমে তিনজন মিলে রুদ্ধশ্বাসে ভিডিও দেখছে। “এত রিলের মধ্যে কোনটা তোমার কাজে লাগবে কীভাবে বুঝব?” বলছিল দিশেহারা সুরজ।
“বড়ভাই – বরকনে, এটাওটা স্কিপ করে শুধু যেখানে কপিল, তার দুই ছেলে আর রীতেশ আছে, সেগুলি দেখাও।”
এবার লিস্টটা ছোট হয়ে গেল। “এই, এখানে থামাও।” এক সময় বর্ষা উত্তেজিতভাবে বলল। রীতেশ হাসিমুখে পূজার সঙ্গে কথা বলছে আর দূর থেকে অগ্নিদৃষ্টিতে চেয়ে কুবের। সেদিকে তাকিয়েই পূজা ছিটকে সরে গিয়ে রীতেশকে হাত নেড়ে বাবার দিকে চলে গেল। তারপর খুঁজতে খুঁজতে রীতেশ যখন বেরোচ্ছে, তখনকার ভিডিওটাও পাওয়া গেল – ভাগ্যিস নীতিশের ক্যামেরা তখনও চালু ছিল! রীতেশ চলে যাওয়ার পরই কুবের আর তার দুই ছেলে তাড়াতাড়ি এসে পাশে দাঁড় করানো এক স্করপিওঁতে উঠলেন। ছেলে দুজনের হাতে অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে লাঠি বা রডের মতো কিছু। হঠাৎ কুবেরের স্ত্রী বেরিয়ে এসে স্বামীর হাত ধরে অনুনয় করতে লাগলেন। কিন্তু কুবের তাকে ঠেলে সরিয়ে গাড়িতে উঠলেন।
“এ দুটোর রিল আমার চাই। তবে এগুলো বড়জোর সাপোর্টিং এভিডেন্স হতে পারে। মেইন এভিডেন্সের জন্য আমাদের রাস্তায় নামতে হবে। নীতিশ, তুই থাকবি?”
“শিওর। এছাড়া, আমার জিগরি দোস্ত শেখরকেও নিয়ে আসছি।”
***
কাজটা কঠিন ও সময়সাপেক্ষ – বিয়েবাড়ি থেকে ঘটনাস্থল দুই কিলোমটার রাস্তার পাশে সিসিটিভি ফুটেজ খোঁজ করা।
অত রাতে প্রায় সব দোকানই বন্ধ থাকে। তবে চুরিডাকাতির কথা ভেবে অনেকেই ক্যামেরা অন রাখে। একের পর এক জায়গায় চেষ্টা করে কিছু আশাজনক ফুটেজ মিলল, তবে তা এখনো যথেষ্ট নয়। শেষে ওদের কথা শুনে এক ভদ্রলোক এগিয়ে এসে বললেন, “আপনারা কি পুলিশ? ঐ মার্ডার কেসটার জন্য ফুটেজ খুঁজছেন?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, সেরকমই।” শেখর স্মার্টলি বলল, “পুলিশ বলল – আমাদের সময় নেই, আপনারাই একটু খোঁজভিজ করে ফুটেজ নিয়ে আসুন।”
“আপনারা কি রোকড়া দিয়েছিলেন?”
“না তো!” অবাক বর্ষা বলল।
“তাহলে ওদের সময় কীভাবে হবে?” ভদ্রলোক তির্যক হেসে বললেন, “যাক, আমার সঙ্গে আসুন। আমাদের হাউজিং সোসাইটি মার্ডার স্পটটার খুব কাছে। দেখুন আমাদের গেটের সিসিটিভি ফুটেজ থেকে কিছু পাওয়া যায় কিনা।”
পাওয়া গেল, একেবারে জ্যাকপট! ফুটেজটা নিয়ে তিনজন এবার চলল, সংগৃহীত ফুটেজগুলি সুরজের অফিসে গিয়ে এডিট করতে।
(৪) গ্রেফতার
রীতেশ মাথুরের মার্ডার কেসটা এতদিন ছিল তাদের ছোট শহর ভরতপুরের স্থানীয় সংবাদ। হঠাৎ কাগজের কোণের এক ছোট্ট খবরের থেকে এক ইনফ্লুয়েন্সারের দৌলতে প্রথমে সেটা জেলায়, তারপর রাজ্যে ভাইরাল হল।
বর্ষাকে যেতে হল না, ইনস্পেক্টর চৌবেই একদিন তাদের দরজায় বেল বাজালেন।
“এটা ঠিক হল না, বর্ষাজী! আপনাকে বলেছিলাম প্রুফ পেলে আমাদের কাছে আসতে আর আপনি সেটা আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় দিয়ে দিলেন?”
“আমি কী আর দিয়েছি?” বর্ষা নিরীহ মুখ করে বলল, “এই মিডিয়ার লোকগুলো ভীষণ ধড়িবাজ। আমাকে তো পাঁচজনের সাহায্য নিয়ে ফুটেজগুলি কালেক্ট করতে হয়েছে। তাদের কাউকে ভোগা দিয়ে হাতিয়ে নিয়েছে। তা, আপনি আমাকে ডেকে না পাঠিয়ে যে বড় নিজে এলেন?”
“না এসে উপায়!” কাঁদো কাঁদো চৌবে বললেন, “খোদ সি-এমের ফোন এসেছিল। ভোট আসছে, এসব ঘটনায় পার্টির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। তাই তিনি বললেন – ধনী-নির্ধন, পার্টি রং না দেখে অপরাধীদের ধরো। কই, দিন আপনার ফুটেজগুলো।”
“এই যে, দেখুন।” বর্ষা তারপর তার সংগ্গৃহীত রিলগুলি পরপর দেখাতে লাগল: বিবাহমণ্ডপে কুবেরের ক্রুদ্ধ দৃষ্টি। রীতেশের গাড়ি অনুসরণ করে স্করপিওঁতে বাপ-ব্যাটাদের লাঠি, রড নিয়ে বেরিয়ে যাওয়া। বিভিন্ন জায়গায় স্করপিওঁর স্কুটিকে অনুসরণ। আর সবশেষে সেই হাউজিং সোসাইটির ফুটেজে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে কালান্তক স্করপিওঁ আর দুই যুবক একজনকে বেধড়ক পেটাচ্ছে। সেটা হুবহু মার্ডার স্পটের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।
“ব্রেভো, এটাই তো চাইছিলাম! এবার শয়তানগুলোকে জেলে পুরতে পারব।”
বর্ষা একটা পেন ড্রাইভ চৌবের হাতে দিয়ে বলল, “এটায় সব আছে। চিন্তা করবেন না, এটা যদি দৈবাৎ হারিয়ে যায় বা ইরেজ হয়ে যায়, আমাদের কাছে কপি আছে। আর আপনি এখন থানায় যাচ্ছেন তো? চলুন, আমি গিয়ে এফ আই আরটা লিখে দিয়ে আসি। এবার নিশ্চয়ই আপনার আপত্তি হবে না?”
***
পরদিন সকালেই ব্রেকিং নিউজে দেখাল, রীতেশ মাথুর হত্যাকাণ্ডে বিখ্যাত ব্যবসায়ী কুবের ঠাকুর আর তার দুই ছেলে গ্রেফতার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে যে সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে তাতে তাদের উপযুক্ত শাস্তি দিতে কোনো অসুবিধা হবে না।
সেদিনই ঠাকুরদের কোর্টে তোলা হল। অভিযুক্তদের উকিল বললেন, তাঁর ক্লায়েন্টরা নির্দোষ, ফেক ভিডিও দিয়ে তাদের ফাঁসানো হয়েছে আর এর পেছনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যবসায়ীর হাত থাকা সম্ভব। সরকারি উকিল বললেন, ভিডিওগুলি যে এ-আই জেনারেটেড নয়, সেটা প্রাথমিকভাবে দেখা হয়েছে। ডিফেন্স চাইলে এ নিয়ে প্রতিষ্ঠিত কোনো সংস্থার সার্টিফিকেট এনে দেওয়া হবে, তবে তার জন্য দিন দশেক সময় দরকার। অভিযুক্তদের বেলের আবেদনের বিরোধিতা করে তিনি বললেন, এটা একটা অনার কিলিং। এই ঘৃণ্য অপরাধে অভিযুক্তরা ছাড়া পেলে সেটা হবে মানবতার অপমান। আর একবার ছাড়া পেলে এই দাপুটে অপরাধীরা ভয় দেখিয়ে সাক্ষিদের বিগড়ে দেবে।
দেখা গেল, মৃতের বোন বর্ষা আদালতের অনুমোদন নিয়ে দেবিকা শুক্লা নামে একজন উকিলকে নিয়োগ করেছেন। তিনি বললেন, “পাবলিক প্রসিকিউটারের সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত। শুধু এই জঘন্য অপরাধকে ‘অনার কিলিং’ বলায় আমার তীব্র আপত্তি। দুজন প্রাপ্তবয়স্কের পরস্পরের সম্মতিতে প্রেম করার বা বিয়ে করার অধিকার আইনস্বীকৃত। জাতপাত, ধর্ম বা স্টেটাসের দোহাই দিয়ে খুন করে এই অধিকার ধ্বংসের চেষ্টা আদতে জঘন্য ডিসঅনার কিলিং। তাছাড়া, খুনি কুবেরের মেয়ের সঙ্গে মৃত রীতেশের কোনো প্রেমের সম্পর্ক ছিল না। বাতিকগ্রস্ত পিতা স্রেফ সন্দেহের বশে একটি তরতাজা প্রাণকে পৃথিবী থেকে মুছে দিল। এদের চরম শাস্তি দাবি করছি।”
প্রাথমিক সওয়ালের পর ম্যাজিস্ট্রেট অভিযুক্তদের সাতদিন পুলিশ হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিলেন। পরের হিয়ারিংয়ে সেটা আরো সাতদিন বাড়াবার পর তারা জেল হেফাজতে গেল।
(৫) কোর্টরুমে
“গণতান্ত্রিক পথে ভোট আসে যায়। সরকার খায় ভোট, ভোটার কী খায়?”
ভোট এল, গেল। মুখ্যমন্ত্রী আবার জনাদেশে মুখ্যমন্ত্রী হলেন। জনজীবন চলতে লাগল ভালোমন্দ মিশিয়ে।
শুধু রীতেশ মাথুরের হত্যার মামলায় সুবিচারের আশা একটু একটু করে ফিকে হতে লাগল। এই নয় যে সরকার ঠাকুরদের মদত দিতে লাগলেন। কিন্তু তাঁদের ভোটের আগের সক্রিয়তাটা এখন থিতিয়ে যাওয়ায় সমাজের সহজাত নিয়মে দুর্বলের বিরুদ্ধে সবলের প্রাধান্য একটু একটু করে প্রতিষ্ঠিত হতে লাগল।
ঠাকুরদের উকিলের জোরালো সওয়ালের পাশে পিপি'র সওয়াল ক্রমে নিষ্প্রভ হতে লাগল। কিন্তু আশার আলো জাগিয়ে রাখলেন বর্ষা নিয়োজিত দেবিকা শুক্লা।
ঠাকুরদের উকিল চেষ্টা করছিল ফুটেজগুলির ত্রুটি বের করতে, তার সঙ্গে সাক্ষিদের কোর্টে অবিরাম জেরা করে আর কোর্টের বাইরে ভয় ও প্রলোভন দেখিয়ে বিগড়ে দিতে। তাতে তারা কিছুটা সফলও হচ্ছিল। এরপর তারা নানা অজুহাতে লম্বা লম্বা তারিখ নিয়ে বর্ষাদের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙার চেষ্টা করছিল আর প্রত্যেক তারিখেই অভিযুক্তদের বেলের জন্য জোরালো দাবি জানাচ্ছিল। দেবিকা শুক্লার পাল্টা সওয়াল এখন অবধি তা ঠেকিয়ে রেখেছে।
লম্বা তারিখ পড়ায় অবশ্য ঠাকুরদের কারাবাসও দীর্ঘতর হতে লাগল। কিন্তু বর্ষা শুনেছে, অঢেল অর্থ থাকলে জেলেও রাজার হালে থাকা যায়। ঠাকুররা ভেতরে বসেই তাদের সাম্রাজ্য পরিচালনা করতে লাগলেন।
আর বর্ষা পেতে শুরু করল থ্রেট কল – অশ্লীল ইচ্ছার প্রকাশ আর সরে দাঁড়াবার জন্য হুমকি। নিয়মিত পুলিশ ও সাইবার পুলিশে রিপোর্ট করেও ব্যাপারটার বিশেষ সুরাহা হল না। বর্ষা এবার পরিস্থিতি জানিয়ে পয়েন্ট টু-টু বোরের রিভলভারের লাইসেন্সের দরখাস্ত করল আর পেলও।
দিন জমে মাস, মাস জমে বছর। ব্যাপারটা দ্বিতীয় বছরে গড়ালে বর্ষা বুঝল এই সহনশক্তির দ্বৈরথে সে তিলে তিলে পিছু হঠছে। তবু সে আরো কিছু দৃঢ়পণ মানুষের মদতে লড়াই জারি রাখল। এই লড়াইয়ে প্রতিপক্ষের আপাত উদ্দেশ্য হচ্ছে ঠাকুরদের বেল, যেটাকে ওরা জয় বলে প্রচার করবে। আর আদতেও ঠাকুররা বেরোলে তাদের ভয়ে অনেক সাক্ষি পিছু হঠতে পারে। এদিকে, বর্ষাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চার্জশিট পেশ করিয়ে কেসটাকে ট্রায়ালে পাঠানো।
কিন্তু কোনোটাই হচ্ছে না। “আমার ভাইয়ের খুনিদের শাস্তি দিতেই হবে” এই প্রতিজ্ঞা বুকে দৃঢ়পণ বর্ষা এই অসম যুদ্ধে বীরের মতো লড়ে যাচ্ছে আর লড়াইতে ধরে রেখেছে তার দৃষ্টান্তে অনুপ্রাণিত ডজন কয়েক মানুষকে। বুঝতে পারছে আশঙ্কা আর হতাশা শুধু তাদের নয়, তাদের প্রতিপক্ষকেও কুরে কুরে খাচ্ছে। যত সময় এগোচ্ছে, দুই পক্ষই অস্থির হয়ে উঠছে। আশঙ্কা হচ্ছে স্থিতাবস্থা ভাঙার বেপরোয়া চেষ্টায় কেউ কিছু অঘটন ঘটাবে।
অবশ্য বর্ষা নিজের খুন হয়ে যাবার সম্ভাবনাকে বিশেষ আমল দিচ্ছে না। প্রথমত, এখন সে আর জীবনের পরোয়া করে না। দ্বিতীয়ত, তার অন্তর্দৃষ্টি বলছে, ওরা তাকে এখন কিছু করবে না। ওরা জানে, তাহলে খুনির বিরুদ্ধে যে গণরোষ ধীরে ধীরে ঝিমিয়ে পড়ছে, তা আবার দ্বিগুণ শক্তিতে জেগে উঠে ওদের ছারখার করে দেবে।
তবু রাতে ঘুমোতে যাবার আগে যখন বর্ষা একা, তার মনে হয় – আর পারছি না! কবে যে একটা কিছু ঘটে আমাকে রেহাই দেবে!
তারপর একদিন সেই ‘একটা কিছু’ ঘটল। একটা কল এল, যেটা ঠিক থ্রেট কল নয়।
(৬) ডিল
“বর্ষা মাথুর?”
“বলছি। বলুন?”
“আমি ঠাকুর ফ্যামিলির কেসটা নিয়ে বলছিলাম।” লোকটা সরাসরি কাজের কথায় এল, “ওরা চাইছে আপনার সঙ্গে একটা আউট অফ কোর্ট সেটলমেন্ট করতে। অফারটা আপনার অপছন্দ হবে না।”
রাগে বর্ষার গা রি-রি করে উঠল। একটা কুকথা বলতে গিয়েও কী ভেবে নিজেকে সামলে বলল, “বেশ। তবে এসব কথা তো ফোনে হয় না।”
“ঠিক আছে। কবে, কোথায় দেখা করবেন?”
অনেক ভেবেচিন্তে বর্ষা তাদের বাড়ির কাছের এক রেস্তোরাঁয় পরদিন বেলা এগারোটায় দেখা করার কথা বলল। লোকটা রাজি হল। কীভাবে পরস্পরকে চিনবে, সেটাও ঠিক হল। পরদিন বর্ষা যথাসময়ে সেই রেস্তোরাঁয় গিয়ে ঠাকুরের প্রতিনিধির সঙ্গে দেখা করল। নীতিশ আর শেখরকে পুরো কেসটা না জানিয়ে শুধু বলেছিল, ঐ সময়ে রেস্তোরাঁর বাইরে মজুত থাকতে। যদি দেখে কেউ তাকে জোর করে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছে তবে যেন লোকজন ডেকে বাধা দেয়। আর তার নিজের কাছেও রাখল তার ক্ষুদ্র লাইসেন্সড সুরক্ষা। এক নিরালা কেবিনে বসে কথাবার্তা শুরু হল।
“ওরা আপনাকে দশ কোটি অফার করছে। আপনি শুধু কেসটা তুলে নেবেন।”
বর্ষা একটু ভেবে বলল, “আরো দুই উঠুন।”
সকৌতুকে বর্ষার দিকে তাকিয়ে লোকটা বলল, “হয়ে যাবে। আর কিছু?”
“দেখুন, আমি তো সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে। হঠাৎ অত টাকা অ্যাকাউন্টে ঢুকলে ইনকাম ট্যাক্স থেকে শুরু করে পত্রকার সবার নজরে পড়বে।”
“তারও ব্যবস্থা আছে, তবে সেটা একটু প্যাঁচালো। আপনার কোনো সাজেশন আছে?”
“সোনা। কতগুলো ব্যাঙ্ক চব্বিশ ক্যারাট গোল্ড কয়েন বা বার বিক্রি করে। হিসেব করে তাতেই পেমেন্টটা দেবেন। দশ কেজিও হবে না, লুকিয়ে রাখার সমস্যা নেই। তারপর দরকারমতো একটু একটু করে খরচ করতে পারব।”
“আপনাকে দেখছি আর অবাক হচ্ছি। বেশ, তাই হবে। মালটা পাওয়ার পর আপনি আপনার বিশ্বাসী জুয়েলারকে দিয়ে চেক করাতে চান তো কয়েক দিন সময় নেবেন। কিন্তু তার পরই কোর্টে কেস উইথড্র করার দরখাস্ত করবেন।”
“ডিল! আপনারা দরখাস্তের একটা ড্রাফট পাঠিয়ে দেবেন। তবে এখানে আমার প্রশ্ন – এটা মার্ডার কেস, কগনিজেবল অফেন্স। কাজেই এখন আপনাদের প্রতিপক্ষ তো আমি নই, স্টেট। আমি সরে গেলেই কি কিছু সুরাহা হবে?”
“সেখানে সমস্যা নেই। আটকে যাচ্ছে আপনার আর আপনার সাঙ্গপাঙ্গদের অ্যাকটিভিজমের জন্য। আপনি সরে দাঁড়ালে সেসব ধসে পড়বে, বাকিটা আমরা বুঝে নেব।”
“বেশ। তবে ফাইনালি, এসব কথা যেন ঘুণাক্ষরেও পাঁচকান না হয়।”
“হবে না। কিন্তু মনে রাখবেন, বেইমানির চেষ্টা করলে –”
“আপনারা আমায় রেপ-মার্ডার করে গঙ্গায় ভাসিয়ে দেবেন তো? বেশ, এবার চলুন।”
***
অবশ্য ব্যাপারটা শেষ অবধি পাঁচকান হল।
ঐ ডিলের কয়েক সপ্তাহ পরই বর্ষা মাথুর কোর্টে দরখাস্ত করে জানাল, প্রাথমিক অনুসন্ধানের পর তার মনে হয়েছিল কুবের ঠাকুর ও তার দুই ছেলে তার ভাইয়ের খুনি। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, তার মনে এ নিয়ে সংশয় দানা বাঁধছে। মেয়ের বিয়ের মতো এক মহত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান ছেড়ে বাবা তার দুই ছেলেকে নিয়ে এক গুরুতর অপরাধ ঘটাতে যাবে, এটা কেমন যেন লাগে। যত মামলা এগোচ্ছে, সাক্ষ্যপ্রমাণ দেখে তার মনে হচ্ছে তাকে সম্ভবত কেউ ভুল তথ্য দিয়ে ভুল পথে চালিত করেছিল। হয়তো ঠাকুরদের কোনো শত্রু। তাই বিবেকের কাছে স্বচ্ছ থাকতে সে এই কেস থেকে নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছে। তবে সরকার ও মহামান্য আদালতের ওপর তার আস্থা আছে, তথ্যপ্রমাণ মোতাবেক তাঁরা তার ভাইয়ের প্রকৃত হত্যাকারীদের উপযুক্ত শাস্তি দিতে পারবেন।
এই ঘটনার প্রতিক্রিয়া হল তাৎক্ষণিক। টেলি-মিডিয়া থেকে সোশ্যাল মিডিয়া ফলাও করে প্রচার করতে লাগল – দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ক্লান্ত বর্ষা মাথুর অবশেষে ভাইয়ের হত্যার বিচার পাবার লড়াই থেকে সরে দাঁড়ালেন। প্রথমে জনমত ছিল বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা ও অপরাধীদের লাগাতার ভীতিপ্রদর্শনের বিরুদ্ধে। মনে করা হচ্ছিল, একজন অসহায় যুবতী শেষে ভয়ের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। কিন্তু হঠাৎ এক সাংবাদিক আবিষ্কার করলেন, বর্ষার সঙ্গে ঠাকুরদের এক মোটা টাকার ডিল হয়েছে। কবে, কোথায়, সেটাও তিনি মোটামুটি বলে দিলেন। শুধু ডিলটা কত টাকার আর সে টাকা কোথায় গেল, সে প্রসঙ্গে তিনি নীরব রইলেন।
কিন্তু এই প্রতিবেদনের পর জনমত সম্পূর্ণ পাল্টে গেল। সবাই বলতে লাগল – ছি ছি, মেয়েটা শেষে টাকার লোভে ভাইকে বিক্রি করে দিল! তাহলে কি দর বাড়ানোর জন্যই অ্যাদ্দিন এত লম্ফঝম্ফ করছিল? সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রলিংয়ের বন্যা বয়ে গেল। বর্ষা আগেই নিজেকে গৃহবন্দী করে ফেলেছিল। এখন সোশ্যাল মিডিয়া ও ফোনও বন্ধ করল।
এমনকি ঘরেও শান্তি নেই। সে যখন ভাইয়ের জন্য লড়াই শুরু করেছিল, বাবা, মা, দাদা সবাই ভয় পেয়ে বিরোধিতা করেছিল। এখন বাবা ও দাদা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসছে, “এই তাহলে বীরাঙ্গনার যুদ্ধ!”
মা আরো সাংঘাতিক। চোখে আগুন ঝরিয়ে বলেছিল, “সর্বনাশী, কত টাকায় ভাইকে বিক্রি করে এলি? এর আগে তোর মরণ হল না কেন!”
ধরা গলায় বর্ষা বলেছিল, “আমি পারব না। ওদের অনেক হাই কানেকশন, আমার লাইফ হেল করে দেবে। ভাই তো ফিরে আসবে না। আমারও বয়স বাড়ছে। আমার জীবনটা শুধুশুধু কেন নষ্ট করব?”
সবশেষে শীতল দৃষ্টিতে মা'র মুখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “তবে যার কেউ নেই তার ভগবান সহায়।”
বর্ষার দলবল এমনিতেই ঠাকুরদের বেল ঠেকিয়ে রাখতে হিমসিম খাচ্ছিল। বর্ষা সরে দাঁড়ানোর কিছুদিন পর কুবের ও তার দুই ছেলে প্রায় বিনা বাধায় বেল পেয়ে অনুগামীদের কাঁধে চড়ে জেল থেকে বেরিয়ে এল। বিজয় মিছিল গোটা শহর পরিক্রমা করল। কিন্তু কুবের ঔদার্য দেখিয়ে সমর্থকদের বর্ষার বাড়ির সামনে দিয়ে যেতে বারণ করে দিলেন।
(৭) ড্রপসীন
মাস দুয়েক পরের কথা। মা একদিন উত্তেজিতভাবে এসে বর্ষাকে বললেন, “বর্ষা, এইমাত্র খবরে বলল বিখ্যাত ব্যবসায়ী কুবের ঠাকুর ও তার দুই ছেলে এক ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছে। তারা যখন পাহাড়ি রাস্তায় একটা প্রপার্টি ইন্সপেক্ট করতে যাচ্ছিল, তাদের স্করপিওঁ এক কঠিন বাঁকের মুখে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিচে পড়ে যায়।”
বর্ষার মুখ বিচিত্র হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। বলল, “বলেছিলাম না, যার কেউ নেই তার ভগবান সহায়।”
(৮) ফ্ল্যাশব্যাক
মাস ছয়েক আগের কথা। লাগাতার থ্রেট আর ‘তারিখ পে তারিখ’ উপেক্ষা করে লড়াই জারি রেখেও মুজরিমদের আর আটকে রাখা যাচ্ছে না বুঝতে পেরে বেপরোয়া বর্ষা শেষে আন্ডারওয়ার্লডের সাহায্য নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। সাবধানে খোঁজখবর করে কিছুটা ঝুঁকি নিয়েই সে যোগাযোগ করতে পেরেছিল এক সুপার কিলারের ডান হাত তথা সেক্রেটারির সঙ্গে। কিন্তু কেসের বৃত্তান্ত শুনে লোকটা যে দর হেঁকেছিল তাতে বর্ষা ছিটকে বেরিয়ে এসেছিল।
“বা-রো কোটি, এই কাজের জন্য! আমরা সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষ অত টাকা কোথায় পাব! সর্বস্ব বেচেও তো দেড়, বড়জোর দুই –”
“সেটা বুঝলেন আর এটা দেখলেন না যে আপনি কোনো চুন্নু-মুন্নু নয়, তিন মহাত্মার কন্ট্রাক্ট দিচ্ছেন! ওদের অনেক হাই কানেকশন – মার্ডার হলে রাজ্য তোলপাড় হবে, সিবিআই, এনআইএ লেগে যাবে। তাই বিস্তর রেকি করে, ভেতর-বাইরে অনেক খবরিকে লাগিয়ে ওদের চলাফেরা ট্র্যাক করে এক মোক্ষম টাইমে এমনভাবে কাজ সারতে হবে যাতে সেটা মার্ডার বলে কারো সন্দেহ না হয়। তার পরও হয়তো এখানে-সেখানে খাওয়াতে হবে। সব মিলিয়ে, এই রিক্সি জবের জন্য আপনাকে কনসেশন রেটই দিয়েছি।”
বর্ষা হতাশ দীর্ঘশ্বাস ছেড়েছিল। শুনে লোকটা বলেছিল, “শুনুন বহেনজি, আপনার কেসটা আমি জানি। আপনার ওপর আমার রেসপেক আছে। কিন্তু একজন ভাই হিসেবে বলছি, আপনি পারবেন না। ওদের অনেক হাই কানেকশন, আপনার লাইফ হেল করে দেবে। ভাই তো ফিরে আসবে না। আপনারও বয়স বাড়ছে। আরেকটা জীবন খালিবিলি কেন নষ্ট করছেন?
“এবার আপনাকে চুপিচুপি বলি – এসব লাইন খুব নোংরা। এখানে যেমন কাজিয়া আছে তেমন ভাইচারাও আছে। আপনি যে বসকে সুপারি দিতে এসেছেন এই খবর এতক্ষণে ঠাকুরদের কাছে পৌঁছে যেত। কিন্তু ঐ কমবখত ফেমিলি না জেনে সাপের লেজে পা দিয়েছে। বসের ছেলের সঙ্গে কুবেরের বড় মেয়ের লভ হয়েছিল। জানতে পেরে ওরা ছেলেটার ওপর চড়াও হয়েছিল, বেচারা কোনোমতে পালিয়ে বেঁচেছে। সেই থেকে বস গুম মেরে আছে, শুধু হাতে রেস্ত শর্ট থাকায় এক্ষুণি কোনো প্ল্যান করতে পারছে না। এখন দেখুন আপনি যদি কোনোভাবে পেমেন্টটা করতে পারেন – ক্যাশে না হলে গোল্ডে – তবে আপনিও তুরন্ত খুশ হয়ে যাবেন আর বেঅকুফ ঠাকুরগুলিও বুঝে যাবে ভগবান সহায়ের ফেমিলির গায়ে হাত তোলার কী ফল।”
“দেখি, যদি লটারি পাই!” তিক্ত হেসে বর্ষা লাইন ছেড়েছিল।