




।১।
শ্বেতপুষ্পের মতো জ্যোৎস্না চারিদিক আচ্ছন্ন করে তুলেছে। স্নিগ্ধ আলোকমদিরায় ছেয়ে আছে নিস্তব্ধ পৃথিবী। প্রকৃতিতে এক অপার্থিব শান্তি বিরাজিত। তারই মাঝে উদ্ভ্রান্ত তমসা হেঁটে চলেছে। এখনও তার চরণদুটি অলক্তকরঞ্জিত। উপলব্যথিত পায়ে সে এগিয়ে চলেছে নগরপানে। চতুষ্পার্শের বৃক্ষরাজি, পাহাড় ও পর্বত সে ত্যাগ করে যাচ্ছে চিরদিনের মতো। আজ প্রভাতে তার বিদায় ঘটেছে দেবদাসীর জীবন থেকে। যদিও সমস্ত প্রথা ও নিয়ম সমাপন করে গুহাগহ্বর থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে বেলা ঢলে এল। সে যখন গুহার সোপান বেয়ে উপরের দিকে উঠছিল তখনও কানে আসছিল মন্ত্রোচ্চারণ। তারই আত্মজাকে দেবদাসীত্বে বরণের প্রক্রিয়া চলেছে।
চন্দ্রিকাবিধৌত চরাচরে বোঝা যাবে না আজ তমসার জীবনে কোন্ আঁধারগাথা লেখা হয়ে গেল। এর সূচনা হয়েছিল কয়েকদিন পূর্বেই যখন সে মগ্ন ছিল নৃত্যের অনুশীলনে। সেদিনও যথারীতি তমসার পদক্ষেপ ও মুদ্রায় যেন মুদ্রিত হয়ে উঠছিল অনুপম সৌন্দর্য। তার স্তনতরঙ্গ, স্পন্দমান কটিদেশ, কপিত্থবৎ নিতম্বের আন্দোলন ঈর্ষামিশ্রিত মুগ্ধচোখে দেখছিল অন্যান্য নতর্কীরা। তমসার কিশোরী কন্যাও অদূরে দাঁড়িয়ে বিভোর হয়ে দেখছিল মায়ের শিল্পসৃষ্টি। নৃত্যশিক্ষক ‘নাট্টুবান’ তাকে আরও ভালো করে শেখানোর অছিলায় বারংবার স্পর্শ করছিল তার বক্ষদেশ বা শরীরের পশ্চাৎভাগ। যদিও বহুভোগ্যা তমসা তাতে ভ্রূক্ষেপ না করে প্রতি পদপাতে ফুটিয়ে তুলছিল প্রস্ফুটিত পুষ্পের লাবণ্য। নৃত্যের এই অনুশীলন ও প্রদর্শনের মধ্যে সে অবশ্য বিশেষ আনন্দ পেত না। কেন না তা পরিণত হয়েছিল এক ধরণের যান্ত্রিকতায়, যেহেতু তার শিল্পবোধের উপযুক্ত দর্শক সে কখনোই পেত না।
অকস্মাৎ উপস্থিত হয়েছিলেন প্রধান পুরোহিত। তিনি প্রথমে অন্যান্য নর্তকীদের উদ্দেশে বলেছিলেন, “তোমরা প্রস্তুত হও। মাসান্তে দেবতার সম্মুখে বিশেষ নৃত্যানুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। সেখানে তোমরা দেহে কেবল পুষ্পাভরণের আচ্ছাদনমাত্র সম্বল করে নৃত্য পরিবেশন করবে। প্রতি বৎসরের এই বাসন্তিক নৃত্যের কথা আশা করি তোমাদের স্মরণে আছে।” পরক্ষণেই সহসা তমসার দিকে ঘুরে তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “তমসা, তোমার শরীরে আজ কয়মাস যাবৎ জোয়ার আসেনি?’’
তমসা এ প্রশ্নে একটুও বিস্মিত হয়নি। তাদের গুহাজীবনের প্রধানা পরিচারিকা অতসীর কাছে কোনও কিছুই গোপন করতে পারে না কোনও দেবদাসী। নির্ধারিত নিয়মানুসারে তাদের প্রত্যেককে নিয়মিত অতসীর অনুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ ও প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। তাই তমসা প্রধান পুরোহিত শুক্রভট্টের জিজ্ঞাসার উত্তরে নতমুখে জানিয়েছিল, “প্রায় ছয়মাস, প্রভু।’’
কথাগুলি বলার সময় তার মাদকতাময় কণ্ঠস্বর রুদ্ধপ্রায় হয়ে গিয়েছিল। যেদিন থেকে সে আর ঋতুমতী হয় না সেদিন থেকেই আপন ভবিতব্য তার নিজের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। যেন বলির ছাগকে যূপকাষ্ঠের একপাশে অনিবার্য ভবিষ্যতের প্রতীক্ষায় রাখা হয়েছে, এমনটাই নিজের সম্বন্ধে ভাবত সে। প্রধান পুরোহিত জলদমন্দ্র স্বরে ঘোষণা করার মতো বলেছিলেন, “কিন্তু ছয়মাস ঋতুকাল না এলেও তোমার শরীরে তো গর্ভলক্ষণও দেখা দেয়নি। তার মানে তুমি আর রজস্বলা হতে পারবে না।’’
একটু বিরতি নিয়ে তিনি এরপর অনিবার্য সিদ্ধান্ত জানিয়েছিলেন, “তা হলে তো তুমি এখন বিগতযৌবনা ‘তাইক্কিঝাবি’তে পরিণত হয়েছ। তার মানে তোমার দেবদাসী জীবনের এখানেই ইতি। দেবপূজা বা দেবতার সম্মুখে নৃত্য প্রদর্শনের অধিকার তুমি এখন থেকেই হারালে। প্রস্তুত হও। তুমি তো জানো সবই, তথাপি নিয়মমতো তোমাকে আমি জানাচ্ছি যে আর তোমার এখানে থাকার অধিকার নেই। গতযৌবনার নৃত্য বা সঙ্গীত দেবতা গ্রহণ করেন না, উপরন্তু তিনি অসন্তুষ্ট হন। আগামী মঙ্গলবার শুভ দিনে তোমাকে যথাযথ মর্যাদায় এখান থেকে বিদায় দেওয়া হবে।’’
কেঁপে উঠেছিল তমসার সমস্ত শরীর। তার মনে হল হাতের তালু ভয়ানক উষ্ণ, কর্ণমূল দিয়ে যেন লাভাস্রোত প্রবাহিত হচ্ছে। বেপথুমান দেহের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য সে গুহাগাত্রের অমসৃণ দেওয়াল আঁকড়ে ধরতে তার উপর হাত রাখল। প্রধান পুরোহিত অনন্যমনা হয়ে কী যেন ভাবছিলেন। বিপরীতে তমসা চিন্তা করছিল তার অস্বচ্ছ ভবিষ্যতের কথা। এবার সে আহার্য পাবে কিনা, কোথায় বা থাকবে! তার সন্তানেরই বা কী গতি হবে?
মনে পড়ল একদিনের কথা। সেদিন সে এক বিবাহের শোভাযাত্রার সামনে হাঁটছিল। এ কাজ দেবদাসীদের দিয়ে করানো হয় কেননা বিবাহে দেবদাসীর অংশগ্রহণ নাকি শুভ! দেবদাসীস্পর্শিত বধূ নাকি বৈধব্যযাতনা পায় না। কারণ দেবদাসী দেবপত্নী আর দেবতারা তো অমর। নাই বা পেল দেবদাসী রক্তমাংসের স্বামীস্পর্শ তথাপি সে দেববধূ রূপে সমাজে সম্মাননীয়। গুহার আলো-আঁধারি জীবনের সন্ধান সাধারণ মানুষ কী জানে! তবু সে আনন্দে, স্বস্তির সঙ্গে হাঁটছিল। কোন উৎসব হলে তবেই তারা গুহার বাইরে পদার্পণ করতে পারে। তাও কঠোর প্রহরার মধ্যে, যাতে কোন মানুষ তার প্রতি কামনাঘন চাহনি ছুঁড়ে দিতে না পারে, দেবদাসীরও যেন অন্য কোনো পুরুষকে দেখে কামেচ্ছা না জাগে। সেটা তো পাপ। সে যে দেবতার জন্য বলিপ্রদত্ত। পথে সে সমস্ত সত্তা দিয়ে যেন শুষে নিচ্ছিল বহির্বিশ্বের উদার প্রকৃতি। তাদের জীবন আলোহীন, এখানে আলো আছে। আলো আর মুক্ত বাতাস মানে নতুন প্রাণ, মুক্তির আরাম। যতই তা ক্ষণস্থায়ী হোক না কেন। তখনই সে তার সঙ্গে গুহায় থাকত এমন দুজন দেবদাসীকে দেখেছিল পথের ধারে ভিক্ষা করছে। কত সুন্দরী ছিল ওরা। এখন ওদের এ কী চেহারা! ওই দুজনকে কয়েক বৎসর পূর্বে ‘তাইক্কিঝাবি’ বা গতযৌবনা ঘোষণা করে গুহা থেকে বিদায় করা হয়েছে। তার বড় ইচ্ছা হয়েছিল একবার সে থেমে ওদের নিকটে গিয়ে খোঁজ নেয় ওরা কেমন আছে? বহুদিন একত্রে দেবতার সামনে তারা নৃত্য ও সঙ্গীত প্রদর্শন করেছে। মুহূর্তের জন্য তার দেহ যেন স্থবির হয়ে গিয়েছিল। তারও তো তাহলে একদিন এরকম অবস্থা হবে। কিন্তু শোভাযাত্রার গতির সঙ্গে তাল রেখে চলতে গিয়ে তার পক্ষে ওদের সামনে যাওয়া সম্ভবপর হয়নি। তারপর কয়েকদিন ধরে কেবলই ওদের কথা মনে পড়ছিল। এই তাহলে তারও আগামীর দিনলিপি?
কিন্তু সে তো ইচ্ছা করে এখানে আসেনি। তারও আর পাঁচজন নারীর মতো স্বামী ছিল, সংসার ছিল। হয়ত একদিন কালের নিয়মে বৃদ্ধা হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হলে সে সন্তানের হাতের আগুন নিয়ে স্বর্গে যেত! কিন্তু এখন! রাজপথে ভিক্ষা করে বাকি জীবন অতিবাহিত করাই ভবিতব্য। তার দেহসম্পদ এখনও অটুট, যতই না সে দেবভোগ্যা হবার অধিকার হারাক। হয়ত পথের লম্পট লুঠেরাদের লালসার শিকার হতে হবে তাকে। তাও সই। কিন্তু তার মেয়ে? শিউরে উঠল তমসা। ও যে সদ্যই যৌবন দর্শন করেছে। ওকে নিয়ে সে কোথায় যাবে? ও কি দুর্বৃত্তদের হাত এড়াতে পারবে? ও যে তার একমাত্র সন্তান। ওর কোনও ক্ষতি সে সহ্য করতে পারবে না।
পুরোহিত শুক্রভট্ট নিবিষ্টমনে কী যেন চিন্তায় মগ্ন ছিলেন বেশ কিছু সময়। অকস্মাৎ তাঁর কণ্ঠস্বর পুনরায় গমগম করে উঠল, “কী যেন নাম তোমার কন্যাটির?’’ “আলোকমঞ্জরী, প্রভু।’’ ঘোরের মধ্য থেকে কোনওক্রমে বলল তমসা। “হুঁ, তোমার কন্যাটি অতীব সুলক্ষণা। ওকে দেখেছি আমি।’’ তারপর কিছুটা আপনমনেই তিনি বললেন, “সর্বসুলক্ষণযুক্তা কন্যা পাওয়া অত্যন্ত দুষ্কর। এই কিশোরীটি সব দিক থেকেই দেবদাসী হওয়ার উপযুক্ত।’’ আবার আদেশের সুর বেজে উঠল তাঁর গলায়—“তোমার কন্যাটিকে ওই মঙ্গলবার অর্থাৎ তোমার নিষ্ক্রমণের দি
নই আমরা দেবদাসীত্বে বরণ করব। ইতিমধ্যে ওকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করো।’’
স্তম্ভিত তমসার মতামতের অপেক্ষা না করে কাষ্ঠপাদুকায় শব্দ তুলে গুহা থেকে নিষ্ক্রান্ত হলেন তিনি।
। ২ ।
গুহাভ্যন্তর হতে তমসা বহুদূর চলে এসেছে। এখান থেকে জ্যোৎস্নার আভায় পর্বতশীর্ষে অবস্থিত রাজপ্রাসাদটাকে বিরাটাকার হিংস্র বন্যপ্রাণীর মতো মনে হচ্ছে। তুমুল জ্যোৎস্না সত্ত্বেও শ্বেতপাথরের প্রাসাদে কালচে ছোপ। তমসা জানে আগামী সকালে আবার সূর্যালোকে তা ঝলমলিয়ে উঠবে। কিন্তু ওর এই রাতের চেহারা ক’জন দেখেছে?
এরকমই এক রাজপ্রাসাদের রক্ষী ছিলেন তমসার পিতা। সেই প্রাসাদেরই সৈনিক ছিল তার স্বামী। এখান থেকে তার দেশ বেশ কয়েকদিনের পথ। কত যোজন তা তমসা জানে না। এখানকার রাজা অর্কদেব তাদের রাজ্যে হানা দিয়েছিলেন। যুদ্ধে তমসার পিতা, স্বামী সবাই মারা যায়। অর্কদেব অবশ্য পুরোপুরি জয়লাভ করতে পারেননি। কিন্তু হরণ করে এনেছিলেন বহু সম্পদ আর...হ্যাঁ, নারী। তাদের মধ্যে ষোড়শী তমসাও ছিল। তার রূপমুগ্ধ পুরোহিত তাকে এই গুহায় দেবসেবায় উৎসর্গ করেন। দেবদাসী না হলেই বা কী হতো! সে রাজ-অন্তঃপুরের পরিচারিকা হয়ে সেই একই রকম ভোগ্যার জীবনযাপনে বাধ্য থাকত। সে ‘হৃতা’। যে অভাগিনীদের জোর করে ধরে এনে দেবদাসী করা হয়, তারাই হৃতা। হৃতা নারীরাই নাকি কালপরম্পরায় শ্রেষ্ঠ দেবদাসী রূপে গণ্য। দেবদাসীরা কোনও মানুষকে বিবাহ করতে পারে না, কারণ সে যে দেবতার স্ত্রী! দেবদাসী কোনো মানুষকে বিবাহ করলে তাকে বিধবা হতে হয়, তার পরিবারের উপর নেমে আসে দৈব অভিশাপ। সে দেবদাসী হবার পরই একথা জেনেছিল। পূর্বজীবনে সে যে এসব শোনেনি তা নয়, কিন্তু নিজের জীবনে যে তাকে এর অনুশীলন করতে হবে এ তার কল্পনারও অতীত ছিল। প্রধান পুরোহিত তাকে জানিয়েছিলেন, “শোনো নবীনা দেবদাসী, এবার তোমার দিনযাপন অন্য খাতে বইবে। কোনো দেবদাসী মর্ত্যের কোনও পুরুষের নর্মসহচরী হতে পারে না, কারণ সে দেবপত্নী, দেবভোগ্যা। আর জানবে, দেবতার প্রতিনিধি স্বয়ং রাজা। তাই তিনি শয্যায় আহ্বান করলে তাতে সাড়া দেওয়াই নিয়ম। হ্যাঁ, পুরোহিতরাও তোমাকে কামনা করলে তা মানতে হবে। কেননা, পুরোহিতরাই রাজা ও দেবতার একমাত্র যোগসূত্র। আশা করি, এ নির্দেশের তুমি অন্যথা করবে না। আরও জেনো, পলায়ন বা বিদ্রোহের চেষ্টার নামান্তর মৃত্যু।’’
শুনতে শুনতে তমসার দেহ হয়ে উঠেছিল শীতল, স্বেদসিক্ত। মনে হয়েছিল কেমন যেন শ্বাসরোধকারী পরিবেশ এই গুহার। শৈশবে ঘুমোবার সময় তার পিতামহীর কাছে স্বর্গ নরক, পাপ পুণ্য—এসবের গল্প শুনত। পিতামহী তাঁর গলিতদন্ত বিস্তার করে বলতেন, “নরক হলো গিয়ে তোর পাতালে।’’ যেদিন সদ্য পিতৃহারা এবং একই সঙ্গে বিধবা তমসাকে দেবদাসীত্বে বরণ করা হয়েছিল সেদিনই নিশীথে তার শয্যায় উপস্থিত হয়েছিলেন রাজা! তমসার তখন মনে হয়েছিল একটাই কথা—এ জায়গাটা তো মাটির নীচে। এটা গুহা। তাহলে এই কি তার পিতামহী বর্ণিত সেই নরক? ইতস্তত করে পরদিন প্রাতে সে সভয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল শুক্রভট্টকে, “প্রভু, কিন্তু গুহামধ্যে কেন আমাদের বাসস্থান? কেন গুহাভ্যন্তরেই আমাদের নৃত্যশৈলী প্রদর্শনের ব্যবস্থা?’’
ঈষৎ অনুকম্পার হাসিতে ভরে উঠেছিল শুক্রভট্টের আনন—“শোনো রমণী, দেবদাসী দেববধূ, তাই অসূর্যম্পশ্যা। তাকে নরলোকে দেখুক, এটা দেবতার ইচ্ছা নয়। তাছাড়া নারী স্বভাবতই অসতী। বহির্জগতে সুদর্শন পুরুষ সংস্পর্শে দেববধূর পক্ষে পাপাচারে লিপ্ত হওয়া দেশের পক্ষে অমঙ্গলকারক। তদুপরি আছে শত্রুরাজার ভয়। যে কোনও সময় আক্রান্ত হলে সে রাজ্যের সুন্দরীদের উপর শত্রুদেশের সেনা-সেনাপতি-রাজার দৃষ্টি পড়বে। এই তো, সমগ্র ভারতবর্ষ জুড়ে ত্রাহি রব উঠেছে, সুদূর সাগরপারের যবনরাজ বীর সেকেন্দার শাহ এশিয়ার বৃহৎ অংশ পদানত করে ভারতবর্ষে প্রবেশ করেছেন। অন্তঃপুরিকারাও তো অবরোধবাসিনী। আসলে নারীদের নিরাপদে রাখাই আমাদের উদ্দেশ্য।’’
বিস্মিত তমসা ভেবেছিল ওনার কথাগুলি। “নারী স্বভাবতই অসতী।’’ কই, এই অসতীজীবন তো তার নিজনির্বাচিত নয়। সে তো সত্যিই দেবতার নয়, অবস্থার দাসী। তাহলে? কেন শক্তিমান পুরুষ সর্বদা ইচ্ছামতো অপবাদ আর আপন লালসামিশ্রিত আকাঙ্ক্ষার বলি করবে স্ত্রীলোককে? গৃহে বিবাহিত স্ত্রীকে অন্তরীণ রেখে বাইরে লীলাবিলাসে কি পুরুষের নৈতিক ও জন্মগত অধিকার? উত্তর নেই জেনেও সে ভাবত।
এই ঘটনার কয়েকদিন পর থেকে শুরু হয়েছিল পঞ্চবর্ষব্যাপী তার নৃত্যগীতশিক্ষা। তবে এর পূর্বেই সূচনা হয়েছিল পালাক্রমে তার রাজা, অমাত্য, পুরোহিতবর্গের শয্যাসঙ্গিনী হওয়ার। ক্রমে সে উন্নীত হয় প্রধানা দেবদাসীতে। আর চলত নিরুপিত নৃত্য প্রদর্শন। গুহাগাত্রে খোদিত নৃত্যরতা মূর্তি দেখে তাদের নাচতে হয়। এতে ভুলের কোনো সম্ভাবনা থাকে না। কিন্তু কিছু সৃষ্টির আনন্দও যে তাতে নেই। শিল্প তো আসলেই এক সৃষ্টি হওয়া উচিত। কেবলই অনুকরণের পুনরাবৃত্তিতে কি শিল্পীর কোনো আনন্দ থাকে? এক বোধহীন নিরানন্দ জীবনের অংশীদার হতে বাধ্য থাকত সে। সকল দেবদাসীই। এখানে শিল্পের মধ্যেও মুক্তিসন্ধানের কোন সুযোগ নেই।
নির্জন রাত্রিতে হাঁটতে হাঁটতে সহসা তমসার মনে হল, পিতা-মাতা কেন তার নাম তমসা রেখেছিলেন? তাঁরা কি তখন জানতেন ভবিষ্যতে তাঁদের আত্মজার জীবন এরকম অন্ধকারাচ্ছন্ন হবে? তাঁরা কি তার নামকরণের সময় ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পেরেছিলেন যে কোনও উজ্জ্বল আলোকসম্ভব যাপন নয়, তাঁদের কন্যার জীবন কাটবে এক আলো-আঁধারিময় পাতালপুরে! সব মেয়েই চায় এক ছোট্ট সুন্দর সংসার। বেশিরভাগ নারীই স্বৈরিণী জীবন পছন্দ করে না। কেউ কেউ রাষ্ট্রের চাপে গণিকাবৃত্তি অবলম্বনে বাধ্য হয়। কেননা গণিকারা না থাকলে কে করবে চৌষট্টি কলার অনুশীলন? কারা রাজপুরুষ বা কবিদের সঙ্গে কাব্যালোচনায় রত হতে পারবে? অন্তঃপুরিকারা? তারা তো সন্তান পালনের জন্য নির্ধারিত। তাই তো সমাজে সৃষ্টি হয়েছে গণিকা আর দেবদাসীদের! দেবদাসী সুলভ নয় তো হরণ করে নিয়ে এসো, তাকে শ্রেষ্ঠত্বের নির্মোক পরিয়ে নাম দাও ‘হৃতা’। তারপর সুখে নিমগ্ন হও দেবদাসীদের সঙ্গীত ও নৃত্যে। কাব্যালোচনা এবং দৃশ্যকাব্য রসাস্বাদনের জন্য রইল গণিকারাও। কত কর্মভার ওঁদের! রাজ্য সামলাতে হয়, এটুকু বিশ্রাম বিলাস নাহলে চলে?
এত উদ্বেগ আর দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও হাসি আসে তমসার। এ জীবন তো সে চায়নি, চায়নি সার্থকনামা নারীতে পরিণত হতে। ‘তমসা’ শব্দের অর্থ অন্ধকার। তাই সে নিজের কন্যার নাম দিয়েছিল আলোকমঞ্জরী। নামকরণের সময় সে ভেবেছিল যেন তার মেয়ের জীবনে অন্তত আলোর উদ্ভাস ঘটে। কী বিসদৃশ কল্পনা! তার অনুভব করা উচিত ছিল দেবদাসীর কন্যার জীবনের ভবিতব্য দেবদাসীই হওয়া। অন্য কিছু হওয়া বা করা দূরস্থান, ভাবারও তাদের অধিকার নেই।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে তমসা। তার বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে সূচিত হচ্ছে নতুন অধ্যায়। সৃষ্টি হচ্ছে পরিবর্ত দেবদাসীর। তার কন্যাও কি তার মতো প্রধানা দেবদাসীর আসন পাবে? কী লাভ! পরিণাম তো সেই একই—রাজা, রাজ অমাত্য আর পুরোহিতবৃন্দের বাধ্যতামূলক অঙ্কশায়িনী হওয়া।
দেবদাসীদের বিদায় এবং অভিষেক--দুইই আড়ম্বরপূর্ণ। আজ প্রত্যুষে তার কর্ণাভরণ ‘পম্পাদাম’ তার দেহ থেকে নির্গলিত করে পরানো হয়েছে তারই কন্যাকে। তমসা এখন রূপলাবণ্যহীন তাইক্কিঝাবি। কেননা দেবতাদের চাই ‘আর্তুম পাত্র’ অর্থাৎ রূপযৌবনসম্পন্না নবীনা দাসী। সেই নবীনা দেবদাসীর বক্ষ এবং ঊরু হবে উলকিখচিত। তার কন্যার কোমল নগ্ন দেহে সেই কারুকার্য চলছিল গত দিবসের শেষ প্রহরে। আসলে দেবদাসী কোনোক্রমে পলায়ন করলেও যাতে তাকে সহজেই চিহ্নিত করা যায় তাই তার দেহে স্থায়ী অঙ্কনের ব্যবস্থা। তখনও সূর্য অস্তাচলে যায়নি, গুহার বিভিন্ন বিবরের মধ্য দিয়ে মরণোন্মুখ সূর্যরশ্মির শেষ প্রণিপাত লুটিয়ে পড়ছিল রুদ্রদেবের মূর্তির পদতলে, ঠিক সেই সময় প্রধান পুরোহিত শুক্রভট্ট তাঁর অধীন বিশ্বস্ত সহচর কুবেরশর্মাকে নিয়ে উপস্থিত হয়ে বলেছিলেন, “পরম সৌভাগ্য তোমার তমসা। তুমি হয়ত পদ হারাচ্ছ, কিন্তু সে আসন দিয়ে যাচ্ছ তোমারই আপন রক্তমাংস দিয়ে যার দেহে প্রাণ সঞ্চার করেছিলে, সেই আত্মজাকে।’’
তখনকার মতো তমসার মনে হয়েছিল এমন কোনও পদ কি নারীর কোনকালে করায়ত্ত হয়েছে যেটা তার কন্যা পেলে সেই মা আনন্দ পাবে? যদি সত্য তাই হতো কোনকালে! কন্যা তো আর মাতার প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। তার মনে তখন ঝঞ্ঝার ঘূর্ণিপাক। এ কোন আসন, কোন জীবন সে মেয়ের জন্য রেখে যাচ্ছে? দেবতার নামে প্রতিরাতে রাজা, রাজপুরুষ আর পূজারিদের সম্মুখে সঙ্গীত ও নৃত্য প্রদর্শন? তারপর তাদের লীলাবিলাসের পুত্তলিকা হওয়া? কোনও অজুহাতেই যা এড়ানো যায় না? অভিজাত পুরুষদের লালসার যূপকাষ্ঠে তার কন্যাকে রজ্জুবদ্ধ করে যাচ্ছে নিরুপায় এক মা। থরথরিয়ে উঠে সে রুদ্রদেবের মূর্তির সম্মুখে জানু পেতে বসে মনে মনে প্রার্থনা করেছিলন, “হে দেবাদিদেব রুদ্রদেব, হে মহারুদ্র, যদি কায়মনোবাক্যে এতকাল তোমার সামনে সঙ্গীত আর নৃত্য পরিবেশনে তোমাকে সন্তুষ্ট করতে পেরে থাকি, তাহলে এমন কিছু একটা করো, যাতে আমার নাড়িছেঁড়া ধন, আমার আদরের দুলালী এই পাষণ্ডদের হাত থেকে নিস্তার পায়।’’ সে চেয়েছিল কোনো অলৌকিক উপায়ে হোক, দেবতার রোষে হোক যদি এখনি এক তীব্র ভূমিকম্পে এই গুহার সকলে চাপা পড়ে, কেবল সে আর তার কন্যাই শুধু বার হতে পারে! মনোমধ্যে অত্যন্ত দ্রুতলয়ে অতিবাহিত প্রতিটি মুহূর্তে সে আশা করেছিল এরকমই কোন এক অঘটনের, বারে বারে বিচার চেয়েছিল সে দেবতার কাছে। এক এক পল অনুপল ধরে সে অনুভব করছিল ভয়ংকর মানসিক যাতনা, কন্যার সদ্য প্রস্ফুটিত পুষ্পসম মুখের দিকে চেয়ে তার কেবলই মনে হচ্ছিল-“বাছা আমার! এই দেবদাসীর জীবন ও সইতে পারবে তো?’’ এমনকী; বালাই ষাট, সে কখন যেন হয়ত নিজের অজান্তেই তার কন্যার মৃত্যুকামনাও করেছিল। মনে হয়েছিল এটাই বুঝি ওর রক্ষা পাবার একমাত্র উপায়।
না, দেবতার রোষ নেমে আসেনি রাজপুরুষ বা পুরোহিতদের উপর। সাড়া দেয়নি সেই প্রস্তরমূর্তি। এতটুকু চাঞ্চল্য ছিল না সেই বিগ্রহের। তবে কি দেবতা শুধুই পাথরের? কিন্তু সে যে নৃত্য আর সঙ্গীত পরিবেশনকালে অনুভব করেছে দেবাদিদেব রুদ্রদেব যেন সাড়া দিচ্ছেন, যেন স্বয়ং আবির্ভূত হয়ে তার দেওয়া শৈল্পিক উপচার মগ্ন হয়ে গ্রহণ করছেন। সব ভুল তাহলে! সবই তার কল্পনা?
সহসা কী এক অস্ফুট শব্দ কানে আসতে থমকে দাঁড়ায় তমসা। নারীকণ্ঠের ধ্বনি না? হুঁ, সে নিজে নারী হয়ে নারীর এই আনন্দধ্বনি চিনতে ভুল করতে পারে না। এতক্ষণে ঈষৎ সচকিত হয়ে সে চারিদিকে তাকায়। এ কী! সে রাতজ্যোৎস্নার কিরণে পথ ভুল করে পর্বতপাদদেশে এক গ্রামের উপান্তে উপস্থিত! অথচ তার গন্তব্য তো নগর, এ রাজ্যের রাজধানী।
তমসা শুনতে পাচ্ছে এক যুবতি বধূর শীৎকারধ্বনি। সঙ্গে মিশেছে সম্ভবত ওই নারীর স্বামীর যৌনকাতর গোঙানি। শয্যাপার্শ্বের শিশুটি কেঁদে উঠলে বধূ তাকে হয়ত স্নেহময় হাতের স্পর্শে পুনরায় ঘুমের দেশে নিয়ে যাচ্ছে। শিশুর ক্রন্দন ও নারী-পুরুষের মিলিত শরীরসুখধ্বনির মিশ্রণ তমসার শরীরে শিহরণ জাগাল। কতদিন সে এর স্বাদ পায়নি। সম্প্রতি নবীন যৌবনবতী দেবদাসীদের আগমনে রাজা, অমাত্য বা পুরোহিতরা তার শরীরের প্রতি আগ্রহ হারিয়েছিলেন। জ্যোৎস্নার মৃদু আলোয় সে লক্ষ্য করল গৃহের অঙ্গনে পিঞ্জরাবদ্ধ পাখি সুর তুলতে তুলতে বারংবার পিঞ্জরের লৌহশলাকায় তার তীক্ষ্ণ অধরোষ্ঠ দিয়ে আঘাত হানছে।
তবে কি গৃহবন্দি ওই বধূ অপেক্ষা সে, স্বৈরিণী তমসাই অধিকতর সুখী? কিন্তু নিজেকে স্বাধীনভর্তৃকা ভাবতে চেয়েও পরক্ষণেই পিছিয়ে আসে সে। সে তো কোনওভাবেই স্বাধীনা ছিল না। তাকে হতে হত বাধ্যতামূলক শয্যাসঙ্গিনী। ওই বধূটিও কি স্বাধীন? তাকেও তার স্বামীর বাধ্য অঙ্কশায়িনী হবার জীবন বেছে নিতে হয়েছে।
পাখিটি এবার সুর ভুলে কর্কশভাবে ডেকে উঠল। যেন কত যাতনায় ও আর্তনাদ করছে! অতি সন্তর্পণে সেখান থেকে সরে এসে গাছগাছালির আড়ালে আড়ালে তমসা এগোয়। কী তীব্র মানসিক যাতনা নিয়ে তমসাকে এগোতে হচ্ছে তা যদি কেউ বুঝত! শ্রান্তিতে তার শরীর অবসন্ন। কন্যা দেবদাসীত্বে অভিষিক্তা হওয়ার পর শেষ অপরাহ্নে বাধ্যতামূলক ‘দাসীবিদায়’ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে এবার সে চলেছে নগরাভিমুখে। রাত্রির মধ্যযাম পেরিয়েছে। তার আঁচলে বাঁধা আছে মন্দির কর্তৃপক্ষের দেওয়া শংসাপত্র, যেখানে তাকে ‘কলিযুগলক্ষ্মী’ রূপে অভিহিত করা হয়েছে। কিন্তু এরপর সে কী করবে? তার সামনে তিনটি পথ খোলা—পথের প্রান্তে দাঁড়ানো রূপাজীবার জীবন, সুতা কেটে জীবিকানির্বাহ অথবা ভিক্ষাবৃত্তি। সে যে নারী! কৃষিকাজ জানে না; যুদ্ধব্যাবসায়, পৌরোহিত্য বা বিপণি সাজিয়ে বসা তার পক্ষে সম্ভব নয়, কোনো পথই তার সামনে নেই। অন্যদিকে তারই স্নেহের পুত্তলিকে সেই গুহাজীবনেই রেখে আসতে হয়েছে। চকিতে তার মনে হল, আত্মহননই একমাত্র পথ। কিন্তু একবার, শুধু একটিবার ফিরে গিয়ে সে তার মেয়েকে দেখে আসবে। গুহার দ্বাররক্ষী কি তাকে প্রবেশ করতে দেবে? জীবনে ঝুঁকি তো নিতেই হয়।
।৩।
দ্বাররক্ষী তাকে দেখে কুৎসিতভাবে হাসছে। গতকালও ওর এ সাহস হতো না। কিন্তু এখন ওই প্রহরী জানে তমসা আর দেববধূ নয়, তাই ওর এই সাহস। আজ পথের বেশ্যা ও ভিখারিণীর সঙ্গে তমসাও একাসনে।
তমসা তার স্তনপট্ট ঈষৎ উন্মোচিত করে। মেঘাবৃত চাঁদ যেন চকিতে আত্মপ্রকাশ করল তার সকল লাবণ্য নিয়ে। তমসার পেশাজনিত অভ্যস্ততার নিপুণ প্রয়োগে চকচক করে ওঠে প্রহরীর চোখ। দীর্ঘকাল তমসা ‘সাদিরআট্যম’ নৃত্য শিক্ষা করেছে। তারই লাস্যভঙ্গিমা প্রয়োগে সে বিমোহিত দ্বাররক্ষীর ছুরিকা মুহূর্তে হরণ করে ওরই বক্ষে আমূল বিদ্ধ করে। তারপর আপন বস্ত্রাঞ্চল ঘর্মাক্ত মুখের উপর বুলিয়ে স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করল।
গুহায় অবতরণের পথ বক্র এবং পিচ্ছিল। সোপানগুলির পাশে গুহাগাত্র থেকে জল চুঁইয়ে পড়ে পথ পিচ্ছিল। সেই পথ অতি সতর্কতার সঙ্গে নামল তমসা। কারণ পুনরায় তাকে উঠে আসতে হবে কেউ দেখে ফেলার আগেই।
ওই তো শয্যায় নৃত্যশিক্ষক ‘নাট্টুবান’ নিদ্রিত। চারিদিকে অন্যান্য দেবদাসী আর পরিচারিকা অতসী শায়িত। একটু দূরে তার কন্যা। জাগরুক। নিঃশব্দে কাঁদছে। গুহাগাত্রের ছিদ্রপথে নেমে আসা চন্দ্রকিরণে আলোকমঞ্জরীকে অপূর্ব দেখাচ্ছে। ওর ঊরু এবং বুকের উলকিচিহ্নিত ক্ষতগুলি স্তিমিত দীপালোকেও তমসা বুঝতে পারল। তমসা কন্যার শয্যাপার্শ্বে দাঁড়িয়ে ওর মাথায় হাত রাখে।
“মা!’’ বিস্মিত আলোকমঞ্জরী কেঁদে ওঠার আগেই তমসা তার মুখ চেপে ধরে—“চুপ! চুপ করে থাক মা।’’
“মা, আমাকে এখান থেকে নিয়ে চল। আমি সব জানি। আমাকে এখানে কী কী করানো হবে! মা, না হয় আমরা অরণ্যে কুটির গড়ে থাকব।’’
“তা হয় না মা। এরা বড় নিষ্ঠুর। বড় ভয়ানক। পালিয়ে ধরা পড়ার শাস্তি হত্যা।’’
“সে এমন কী খারাপ মা? এই জীবন থেকেও কুৎসিত? তোমার অবস্থা আমি দেখেছি। আমিও সারাজীবন ওভাবে কাটাতে চাই না। দেখো, লৌহশৃঙ্খলে আমার পা বেঁধে রেখেছে। নচেৎ আমিই পালাতাম। মরব তো একবারই।’’
পশুর মতো শৃঙ্খলাবদ্ধ কন্যাকে দেখে ক্রোধ ঝলসে ওঠে তমসার মনে। কিন্তু এখন রুষ্ট হওয়ার সময় নয়। সত্যিই তো, মরতে হয় হবে, তবু এ জীবনে সে কন্যাকে রাখবে না। আপাতত কৌশলে কাজ সারতে হবে।
দ্রুতহস্তে কন্যার বন্ধনমুক্তি ঘটায় তমসা। তারপর সন্তর্পণে কিন্তু দ্রুততার সঙ্গে উপরে উঠতে থাকে।
ওদের কথা ও নড়াচড়ায় অতসীর বুঝি নিদ্রাভঙ্গ হয়েছিল। সে সোপান বেয়ে উঠতে থাকা দুই ছায়ামূর্তিকে দেখে তীক্ষ্ণকণ্ঠে চিৎকার করে উঠল।
।৪।
তমসা আর আলোকমঞ্জরী প্রাণপণে ছুটছে। তাদের পশ্চাতে ধাবমান রাজার সৈনিক ও শিকারী কুকুর। কতক্ষণ তারা পালিয়ে বাঁচবে! ব্যবধান ক্রমহ্রাসমান।
ছুটন্ত মাতা-কন্যার সমীপবর্তী সেনানীদের অধিপতি চিৎকার করে বললেন, “এখনও ধরা দাও তমসা, হত্যার অভিযোগ ও দেবদাসী হরণের অভিযোগ থাকলেও তোমার লঘু শাস্তির ব্যবস্থা করব, কথা দিলাম। কারণ তোমার কন্যা অতীব সুলক্ষণা।’’
উন্মাদিনীর মতো গর্জে ওঠে তমসা, “হরণ করা কন্যা তো হৃতা। দেখ সেনাপতি, আমি আমার কন্যাকে তোদের কবল থেকে হরণ করতে পেরেছি। আমাকে যা ভোগ করতে হয়েছে, আমার কন্যার জন্য যে দুর্বিষহ জীবন অপেক্ষা করছিল, তা থেকে ওকে মুক্ত করেছি। দেবদাসীর জীবন অপেক্ষা মৃত্যুও শ্রেয়।’’
সেনাধ্যক্ষ কয়েক পা এগোন শিকারী কুকুর ও সৈনিক নিয়ে। ক্ষিপ্ত তমসা বিকৃতকণ্ঠে বলে, “তোমরা আমাদের জীবন্ত ধরতে পারবে না। আমার হাতে নিহত দ্বাররক্ষীর কোমর থেকে হরণ করা ছুরিকা এখনও আমার কোমরবন্ধনীতে আছে।’’
“মূর্খ, দেবতার অভিশাপ নেমে আসবে তোমাদের উপর। সমগ্র রাজ্য তোমাদের অন্যায় আচরণের জন্য দৈব রোষে ছারখার হয়ে যাবে।’’
“আমরা অন্যায়কারী! কী বলছেন আপনি! যে রাজা; যে রাজ্য নারীর উপর অত্যাচার করে, দৈব অভিশাপ তাদের উপরই নেমে আসবে।’’
করাল দন্ত বিস্তারকারী হিংস্র সারমেয়কুলের সঙ্গে সেনাধ্যক্ষ আরও কয়েক পদ অগ্রসরমান হলেন।
তখন চরাচর জুড়ে দ্রুত ধাবমান সূর্যের কোমল রঙের রেখাগুলি। সেই আলোকলগ্ন গ্রাস করছে তাবৎ পৃথিবী। অন্ধকার ক্রমে অপসৃয়মান।
তমসা, আলোকমঞ্জরীকে আঁকড়ে ধরে পিছনে অতলস্পর্শ খাদের দিকে একবার তাকায়। তারপর প্রস্তুত হয় শেষ অসম সংগ্রামের জন্য।
আকাশ জুড়ে তখন ফুটে উঠছে আলোর রক্তপদ্ম।