




অটো থেকে নেমে ভাড়া জি-পে করতে না করতেই ফোনটা বেজে ওঠে। স্ক্রিনে 'মাদার' দেখেই নিকিতার ভুরু কুঁচকে যায়। বিরক্তিতে। কতবার বলেছে যেন সকালে অফিস যাওয়ার সময় ফোন না করে, তবু করবেই। বড় রাস্তা থেকে কম্পাউন্ড ডিঙিয়ে বিল্ডিং-এর লবির দিকে দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে ফোন কানে ঠেকাতেই, "একটা সুখবর আছে, বুঝলি..." নিকিতার মা'র উত্তেজিত স্বর।
"উফ, না কিছুই বুঝলাম না। এখন রাখো, অফিসে ঢুকছি। আমি পরে করছি..."
"আরে শোন না, গতকাল নাকি বৈভবের এনগেজমেন্ট হয়ে গেল! আজকাল প্রায়ই দেখতাম বটে একটা মেয়েকে বাইকে করে..."
"আমি শুনে কী করব? নাচব?" কথা শেষ করতে না দিয়েই নিকিতা ফোন কেটে দেয়। লিফ্টের সামনে এসে কিউয়ে দাঁড়ায়।
পুনে শহরের এক নামী কলেজ থেকে এমবিএ করে মাত্র এক মাস আগে নিকিতা পুনেতেই একটা লজিস্টিক কোম্পানির রিজিওনাল অফিসে জয়েন করেছে। নেটওয়ার্ক ম্যানেজার। এমবিএ করার আগে মুম্বাইয়ে ওর চার বছরের ডাইরেক্ট সেলসের চাকরির অভিজ্ঞতা এক্ষেত্রে কাজে লেগেছে। ফিরে গিয়ে মুম্বাইয়েও চাকরি খুঁজতে পারত, হয়তো পেয়েও যেত, কিন্তু ও মুম্বাই ফিরতে চায়নি। ফেরা মানেই তো ওই গোরেগাঁওয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকা। আর ওখানে থাকা মানেই দুবেলা বৈভবের সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়া।
সেভেন্থ ফ্লোরে নিজের অফিসে, নিজের কিউবিকলে বসে নিকিতা চোখ বন্ধ করে একটা লম্বা শ্বাস নেয়। তখনও মাথার ভেতরে বিড়বিড় করছে বিরক্তি। তারপর এক গ্লাস জল খেয়ে প্রতিদিনের রুটিন মাফিক ডেস্কটপে লগ-ইন করে মেইল চেক করতে যাবে, আবার মোবাইলটা বেজে ওঠে।
'ইনকরিজেবল,' স্বগতোক্তি করে ফোন তুলে দেখে মা নয়, রিয়া। ওর বেস্ট ফ্রেন্ড। মুম্বাইয়ে ওদের পাশের ফ্ল্যাটে থাকে।
"শুনেছিস? দ্যাট বাস্টার্ড গট এনগেজড লাস্ট নাইট, আ গুজ্জু-ডাম্ব। চাবি চাবি টাইপ..."
"একটা সত্যি কথা বলবি?"
"কী কথা?"
"আমাকে এখন ফোন করতে মা শিখিয়ে দিয়েছে, না রে?" নিকিতা নিচু স্বরে সরাসরি প্রশ্ন করে।
রিয়া থতমত খায়, "না, মানে, তোর জানা দরকার। নাউ ইউ ক্যান কাম ব্যাক ডিয়ার, আঙ্কল আন্টি একা থাকে, দে মিস ইউ..."
"শোন আমার এখন গ্যাঁজানোর সময় নেই, রাখছি। অফিস থেকে ফিরে রাতে কথা বলব," প্রায় ফিসফিস করে কথাগুলো বলে ফোন কেটে দেয় নিকিতা।
মেইলের ইনবক্সে দ্রুত চোখ বোলাতে গিয়ে রিজিওনাল ম্যানেজার মদন রাণের মেইলে চোখ আটকে যায়। মদন। মদনা। নামটায় ওর হাসি পায়। এত বিরক্তির মধ্যেও নিকিতার ঠোঁটের কোণ বঙ্কিম হয়ে ওঠে। ডান গালে টোল পড়ে।
মেইলের সাবজেক্ট 'ফার্স্ট কোয়ার্টার রিভিউ মিটিং অ্যান্ড রিজিওনাল গেটটুগেদার'। এই প্রথম মিটিং হবে অফিসের বাইরে; পুনে থেকে প্রায় একশ কিলোমিটার দূরের একটা ছোটো রেসর্টে। মহারাষ্ট্রের সব ব্রাঞ্চ ম্যানেজাররা আসবে। থাকবে মার্কেটিং টিম। নিকিতার দায়িত্ব নেটওয়ার্ক এনহ্যান্সিং; ফ্র্যাঞ্চাইজির সংখ্যা বাড়ানোর জন্য পোটেনশিয়াল জায়গা খুঁজে বের করা। তার প্রেজেন্টেশন বানানো।
"হ্যাভ ইউ রেড দ্য মেইল? বসের মেইলটা দেখেছ?" এক্সটেনশনে এইচ আরের মিসের রায়।
"ইয়া! জাস্ট গোয়িং থ্রু দ্য লিস্ট অফ পার্টিসিপ্যান্টস," নিকিতা সামনের ডেস্কটপ থেকে চোখ না সরিয়েই বলে।
"হিপ্পো-ও যাচ্ছে..." মিসেস রায়ের স্বরে চাপা কৌতুক।
"আমি একটু পরে কথা বলছি," মিসের রায়কে কথা বাড়াতে না দিয়ে নিকিতা এক্সটেনশনের রিসিভারটা নামিয়ে রাখে। নিকিতা জানে হিপ্পো বলতে হিপোপটেমাস; অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার মিসেস সোলাঙ্কি। ওর নজরকাড়া গুরু-নিতম্বের জন্য মিসেস রায়ের দেওয়া নাম।
কোম্পানিটার দুটো বৈশিষ্ট্য নিকিতার ভাল লেগেছে। বেশি পুরনো না হলেও খুব দ্রুত কোম্পানিটা মার্কেট শেয়ার বাড়িয়ে চলেছে। আর কোম্পানির ফাউন্ডার চেয়ারম্যান বাঙালি হওয়াতে সারা দেশ জুড়েই প্রচুর বাঙালি স্টাফ কাজ করে। মুম্বাইয়েই জন্ম ও বড় হলেও নিকিতা বাড়িতে বাংলাতেই কথা বলে। আর দশটা প্রবাসী বাঙালির মতো ওর বাবা-মাও যত্ন করে ওকে বাংলা সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী করে তোলার চেষ্টা করেছে। বাংলা লিখতে পড়তে শিখিয়েছে। গান শিখিয়েছে। আর এত কিছু সত্ত্বেও ও কি না প্রেমে পড়েছিল ঠিক সামনের বিল্ডিং-এ থাকা, ওর সমবয়সী মারাঠি ছেলে বৈভব পাওয়ারের!
"খুব সাবধান! মদন ইজ গ্রেট ফ্লার্ট," প্রায় ফিসফিস করে বলে মিসেস রায়। কখন নিঃশব্দে ওর কিউবিকলে এসে চেয়ারের পেছনে দাঁড়িয়েছেন নিকিতা টেরও পাইনি। ইন্টারভিউয়ের সময় থেকেই ও লক্ষ করেছে শুধু বাঙালি হওয়ার সুবাদেই মধ্যবয়সী মিসেস রায় নিজেকে যেন নিকিতার লোকাল অভিভাবক ভেবে নিয়েছেন। নিকিতা উত্তর না দিয়ে ডেস্কটপের মনিটরেই দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখে। এবার মিসেস রায় নিকিতার কাঁধে হাত রেখে ঝুঁকে পড়ে গলা নামিয়ে বলেন, "রেসর্টে রাতে সবার থাকার ব্যবস্থা হচ্ছে। রাণের মাথায় নতুন আইডিয়া গিজগিজ করে। অফিসের কনফারেন্স রুম ছেড়ে রেসর্ট ভাড়া করে রিভিউ মিটিং করাও তেমনই এক নতুন আইডিয়া। এনিওয়ে আই অ্যাম নট গোয়িং টু স্টে ওভার দেয়ার। আমি নিজের গাড়ি নিয়ে যাব, রাতে ফিরে আসব। অ্যান্ড ওয়ান্ট ইউ টু কাম ব্যাক ট্যু।" কথাগুলো বলেই কিউবিকল থেকে বেরিয়ে যান। আবার পরমুহূর্তে ফিরে এসে বলেন, "তোমার কাছে যে ছোট ব্লু-টুথ স্পিকারটা আছে ওটা সঙ্গে নিয়ে নিও।"
"ব্লু-টুথ!" নিকিতা এতক্ষণে অবাক হয়ে মিসেস রায়ের মুখের দিকে তাকায়।
"ইয়েস! যেটায় তানপুরা চালিয়ে গান শুনিয়েছিলে, যেদিন তোমার ফ্ল্যাটে গিয়েছিলাম।"
"ওটা দিয়ে রিভিউ মিটিং-এ কী হবে?"
"ওখানে সন্ধ্যায় ক্যাম্পফায়ার এবং বিকেলে একটু ক্যারাওকের ব্যবস্থা করব। অবশ্য ডিনারের পরে আমরা ফিরে আসব। ইট উইল নট টেক মোর দ্যান ট্যু আওয়ার্স। আশা করা যায় রাতে বেশি ট্র্যাফিক থাকবে না।" এবার গটগট করে বেরিয়ে যান নিজের কেবিনের দিকে। নিকিতাও গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। প্যান্ট্রিতে গিয়ে এক কাপ কড়া চা খেয়ে এসে কাজে লেগে পড়তে হবে।
***
ননস্টিক কড়াইয়ে সামান্য তেলে দুটো কাঁচা লঙ্কা আর এক চামচ কালোজিরে ফোড়ন দিয়ে মাঝারি মাপে কাটা পাঁচমিশালি সবজি একটু নাড়াচাড়া করে লিডটা চাপা দিয়ে গ্যাস সিম করে দেয় নিকিতা। পুনের শিবাজীনগরে ভাড়া নেওয়া স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টে ওর একার খেলনা-সংসার। এই ওর রাতের খাবার, সঙ্গে চার পিস ব্রাউন ব্রেড টোস্ট করে নেবে। ব্যস। আপাতত তরকারিগুলো সেদ্ধ হওয়ার ফাঁকে ও সোফায় গা এলিয়ে বসতেই মনে পড়ে যায় রিয়াকে বাড়ি ফিরে ফোন করবে বলেছিল। ফোন করতেই রিয়া বলে, "এবার তুইও একটা বিয়ে কর, নিক্..."
"অন্য কথা বল।"
"কেন? আঙ্কল বলছিলেন ম্যাট্রিমোনিয়াল অ্যাপ থেকে তোকে নাকি অনেকগুলো প্রোফাইল ফরোয়ার্ড করেছেন, তুই কোনও রেসপন্স করছিস না..."
"বাবাকে বলেছি তো বিয়ে করব না। তাও পাঠায় কেন? পুরুষ ছাড়াও জীবন কাটানো যায়..." নিকিতার স্বরে বিরক্তি।
"তাহলে একটা পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছিলিস কেন?"
"কেন জড়িয়েছিলাম? প্রেম! ওই যে স্কুলে পড়ার সময় থেকে মা শিখিয়েছিল রবি ঠাকুরের গান, 'আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী,' তারপর 'প্রেম এসেছিল নিঃশব্দচরণে', সর্বনাশ করে দিয়েছিল। বুঝলি জাস্ট সর্বনাশ! প্রেমকে রোমান্টিসাইজ করাই হয়েছিল আমার কাল... প্রেম... মাই ফুট!" নিকিতার স্বর ভেঙেচুরে যায়। ক্রোধে না কান্নায় রিয়া বুঝতে পারে না। নিকিতা কানে ফোন ধরেই উঠে এসে লিড খুলে বাঁধাকপির পাতা কয়েকটা ছড়িয়ে কাঠের খুন্তি দিয়ে নাড়াচাড়া করে আবার ঢাকনা দিয়ে দেয়। রিয়া বলে, "আমি কিন্তু প্রথমেই সন্দেহ করেছিলাম যে ছেলেটা ভালো না। তোকে বলেওছিলাম সে কথা... কেন যে ডাকলেই চলে যেতিস!"
"হ্যাঁ, রাসকেলটা ডাকলেই দৌড়ে দৌড়ে যেতাম কারণ প্রেম ছাড়াও ছিল আমার ফটোগ্রাফির নেশা। আর লম্পটটা সেটাই কাজে লাগাত। তাই কোলাবা কজওয়ে থেকে কানহেরি কেভস, কালাঘোড়া থেকে কালাম বীচ, কখনো বা ভসাই ফোর্ট। একবার তো সোপারায় এক প্রাচীন বৌদ্ধ-স্তূপাও দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল। কত ফটো তুলেছিলাম সেই সময়...কত রকমের মানুষের। তুই তো জানিস সব।"
"ইয়েস আই নো অ্যান্ড ইউ হ্যাড টু পে ফর দ্যাট," রিয়ার স্বরেও ক্রোধ বিনবিন করে, "দ্যাট বাস্টার্ড ইউজড্ টু ডিমান্ড দ্য প্রাইস ফর ইট, মূল্য চাইতো তোর কাছে..."
"রাইট! প্রেম ট্রেম কিছু নয়। ওর শুধু একটাই ধান্দা ছিল। প্রেমের নামে ডেকে নিয়ে গিয়ে কাম। ব্লাডি ফাকার! তুই জানিস, যে ছেলেটা আমার চোখের প্রশংসা করত, পায়ের পাতার পর্যন্ত প্রশংসা করত, যাকে ভাবতাম, আহা কী রোমান্টিক, সেই ছেলেটাই কিনা প্রতিবার ঘন্টা হিসেবে ভাড়া নেওয়া ঘরে ঢুকিয়ে আমার শরীরের উপর হামলে পড়তো। তখন আর চোখ নয়, পায়ের পাতা নয়, শুধু বুকের দিকে নজর, আরও..."
"তবু তুই যেতিস! বারণ করেছিলাম বলে, ভেবেছিলিস আমি নাকি জেলাস!"
"কাম অন রিয়া, গিম্মি আ ব্রেক!" ফোনটা বাঁ কান আর কাঁধের ফাঁকে চেপে ধরে নিকিতা ঢাকনা তুলে একটু দুধ প্রায় সেদ্ধ হয়ে আসা তরকারির ওপর চামচে করে ছড়িয়ে দিতে দিতে বলে, "হ্যাঁ যেতাম কারণ প্রতিবার ভাবতাম ও শুধরে যাবে, কিন্তু... জানিস, দরজা বন্ধ সেই ঘরে আমাদের প্রেমও হতো না, আর ওর ইচ্ছেমত কামও হতে দিতাম না। তাই যেটা হতো সেটা ছিল বিশুদ্ধ ঝগড়া। আমার নতুন ক্যানন ক্যামেরাটা পর্যন্ত আছড়ে ভেঙে ফেলেছিল, জামা খুলতে রাজি হইনি বলে। অ্যান্ড দ্যাট ওয়াজ দ্য এন্ড অফ ইট।"
"তাই তো বলছি এবার মুম্বাই ফিরে আয়। বিয়ে কর। উই আর এজিং ডিয়ার... আমাদের বয়সও তো হচ্ছে, আঙ্কল-আন্টির চিন্তা তো হবেই..."
"শোন, আমার এখন অনেক কাজ। শনিবার রিভিউ মিটিং, প্রেজেন্টেশন রেডি করতে হবে। ফোন রাখছি, গুডনাইট।"
"গুডনাইট। স্লীপ টাইট," বলেই খিলখিল করে ফোনে হেসে ওঠে রিয়া।
***
শনিবার সকাল আটটা নাগাদ মিসেস রায়ের গাড়িতে যখন নিকিতারা রওনা দেয়, মধ্য জুলাইয়ের আকাশ মেঘলা। আগের রাতে বৃষ্টি হয়ে গেছে এক পশলা। শহরের সীমানা ছাড়িয়ে পুনে-সোলাপুর হাইওয়ে ধরে এগিয়ে যেতেই নিকিতার চোখে পড়ে রাস্তার ধার ঘেঁষে সারিবদ্ধ মানুষ চলেছে পায়ে হেঁটে। রঙিন কাপড় পরা গ্রাম্য মহিলারা মাথায় করে বয়ে নিয়ে চলেছে টবে বসানো তুলসি গাছ। সাদা পোশাক-টুপি পরা পুরুষরা কেউ কেউ গাইছে সন্ত তুকারামের ভজন। কাঁধে করে বয়ে নিয়ে চলেছে রঙিন কাগজে, ফুলে সাজানো পালকি। একের পর এক মানুষের মিছিল। নিকিতা জানলার কাচ নামিয়ে ওর 'রেনো সিক্সটিন এফ ফিফটিসিক্স' মোবাইলে ফটো তুলতে থাকে অবাক বিস্ময়ে।
"এত মানুষ পায়ে হেঁটে কোথায় যাচ্ছে, জানেন?"
"পান্ধারপুর। সামনে আষাঢ় একাদশী, এই সময় ভিট্ঠল দেবের ভক্তরা পায়ে হেঁটে পান্ধারপুরে যায়, সেখানে বিরাট জমায়েত হয়," মিসেস রায় বলেন।
একজন দেহাতি মানুষকে বিচিত্রসাজে রাস্তার ধারে বসে মনোযোগের সঙ্গে তীর্থযাত্রীদের কপালে চন্দন হলুদের তিলক লাগাতে দেখে শিশুর উত্তেজনায় চেঁচিয়ে ওঠে নিকিতা, "এক মিনিটের জন্য গাড়িটা দাঁড় করান প্লিজ। আমি কয়েকটা ক্লোজ শট নিতে চাই।"
গুগল ম্যাপ দেখে ঠিক দশটায় ওরা রেসর্টে গিয়ে পৌঁছায়। মেইন রোড থেকে ডান দিকে ছোট ছোট আদিবাসী গ্রামের মধ্যে দিয়ে একটা সরু রাস্তা ওদের যে লোকেশনে নিয়ে যায় সেটা নামেই রেসর্ট। বরং কোন অবস্থাপন্ন কৃষকের হোম-স্টে বললেই চলে। গাড়ি থেকে নামতে নামতেই দেখে প্রশস্ত উঠোনে প্রায় ষোল-সতেরো জন নারী-পুরুষ প্লাস্টিকের চেয়ারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে রয়েছে। উঠোনের বাম দিকে একটি ইমারত। যার একতলায় এয়ার কন্ডিশন লাগানো একটা বড় হল। সেখানেই আজকের কনফারেন্স হবে। পাশ দিয়ে সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলায়, সেখানে টানা বারান্দা ঘেঁষে ছটি ঘর। উঠোনের অন্যদিকে কিচেন ও খাওয়ার জন্য আলাদা ছাউনি। ওদের গাড়ি থেকে নামতে দেখেই মদন রাণে হেসে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসে, "গুড মর্নিং নিকিতা, গুড মর্নিং মিসেস রায়। আপনারা তো আমার সঙ্গে, আমার গাড়িতেই আসতে পারতেন।"
"ফেরার সময় অসুবিধা হতো... আমরা দুজন আজ রাতেই ফিরে যাব," মিসেস রায় উত্তর দেন।
"হোয়াই সো? নিকিতা, ইউ আর নেটওয়ার্ক ম্যানেজার, আপনার আজ রাতে থেকে যাওয়া উচিত, ব্রাঞ্চ ম্যানেজারদের প্রত্যেকের সঙ্গে আলাদা করে কথা বলা উচিত। এতে পার্সোনাল রিলেশন তৈরি হয়। একচুয়ালি এটাকে একটা অপরচুনিটি হিসেবে কনসিডার করা দরকার..." রাণে কনভিন্স করার চেষ্টা করে।
"ইয়েস! ইউ আর রাইট। তবে ওটা অফিসে বসেও করতে পারবে," নিকিতা উত্তর দেবার আগেই মিসেস রায় বলেন।
"অ্যাজ ইউ উইশ। চলুন, চা-ব্রেক ফাস্ট করে নিন। ঠিক সাড়ে দশটা থেকে আমরা মিটিং শুরু করব।"
"ইয়েস স্যার। আমি সব অ্যারেঞ্জমেন্ট দেখে নিচ্ছি। দেড়টায় এক ঘন্টার লাঞ্চ ব্রেক। এবং আশা করি চারটের মধ্যে মিটিং শেষ হয়ে যাবে। তখন চা এবং একটু গান বাজনা ও ফান। ইজ ইট ওকে?" মিসের রায় সানগ্লাসের ওপর থেকে ভ্রু উঁচু করে প্রশ্ন ছুড়ে দেন।
"অ্যাবসলিউটলি..." রাণে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে এগিয়ে যায়।
নিকিতা নিজেই ঘুরে ঘুরে প্রত্যেক ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের সঙ্গে আলাপ করে। অনেকে গতকাল রাতেই এসে পৌঁছেছে। কোলাপুর আর নাসিকের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার বাঙালি। সাঙলির ব্রাঞ্চ ম্যানেজার একজন মহিলা, প্রভা কুলকার্নি।
রেসর্টটার পেছনেই চাষের জমি। আর তার গা ঘেঁষে কাঁটা-তারের বেড়া। যার ওপাশে দিগন্তবিস্তৃত সরকারি খাসজমি; গ্রাসল্যান্ড। ঢেউ খেলানো রুক্ষ পাথুরে জমিতে বিক্ষিপ্তভাবে নানারকম গুল্মের ঝাড়। কোথাও নিম, কুল, বাবলা, কোথাও বা মানুষ-সমান উঁচু ফণীমনসা। আর নানান রঙের বুনো ফুল ফুটে আছে। বর্ষার জল পেয়ে ঘন সবুজ ঝোপঝাড়। নিকিতা দেখে চাষের জমির সীমানা ধরে এদিকে আসছে এক যুবক। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, প্রায় ছ ফুট উচ্চতার, পেটানো চেহারা। গলায় ঝুলছে একটা ক্যামেরা।
পাশে বসা মিসেস রায়ের দিকে কৌতূহলী চোখে তাকাতেই তিনি বলেন, "বারামতীর ব্রাঞ্চ ম্যানেজার এস দত্তা।"
"দত্তা সারনেম, পাঞ্জাবি নাকি মারাঠি?"
"আরে না না, সৌরভ দত্ত, বাঙালি। তবে দুই প্রজন্মের প্রবাসী বাঙালি। বারামতীতেই জন্ম।"
"কী ব্যাপার দত্তা, হোয়ার হ্যাভ ইউ বিন?" রাণে প্রশ্ন করে যুবকটির উদ্দেশে, "শুনলাম সকাল সাড়ে আটটাতেই পৌঁছে গেছ, কোথায় ছিলে এতক্ষণ?"
"একটু ফটোগ্রাফি করে এলাম। একজোড়া জ্যাকলের দর্শন পেলাম। কয়েকটা চিঙ্কারা। বেশ কিছু পাখিরও ছবি তুললাম। মিটিংয়ের পরে যেতে হবে আবার..."
"চলো, লেটস স্টার্ট দ্য মিটিং। মিসের রায়, সবাইকে কনফারেন্স রুমে আসতে বলুন। মিসেস সোলাঙ্কি, চলুন যাওয়া যাক।"
মিসেস সোলাঙ্কি উঠোনেই নিজের ল্যাপটপ খুলে কিছু দেখছিলেন, তাড়াতাড়ি বন্ধ করে চেয়ার থেকে ভারী চেহারা টেনে তুলতে গেলেন। প্রভা এগিয়ে গিয়ে ওর হাত থেকে ল্যাপটপটা নেয়। সবাই এগিয়ে যায় কনফারেন্স রুমের দিকে।
***
মিটিংয়ের পর আবার যখন সবাই উঠোনে চেয়ার পেতে বসে চা-পকোড়া খাচ্ছে তখনই মিঃ রাণে গানের কথাটা তোলে, "পারফরম্যান্স রিভিউ হলো, নেক্সট কোয়ার্টারের প্রোজেকশন হলো, বাজেট হলো... আ লট অফ বোরিং নাম্বার্স। ওয়াজন'ট ইট? নাউ লেট আস এনজয় সাম পপুলার নাম্বারস। মিসেস রায়, আপনি কিছু এন্টারটেইনমেন্টের অ্যারেঞ্জমেন্ট করুন। বলেছিলেন ক্যারাওকে হবে..." কথাটা রাণে শেষ করে নিকিতার দিকে তাকিয়ে।
মিসেস সোলাঙ্কি বলেন, "আমি হাউজি খেলার ব্যবস্থা করে এনেছি।" তাই শুনে বাচ্চাদের মতো হাততালি দিয়ে ওঠে প্রভা। সেই উচ্ছ্বাসটুকু মুহূর্তে নিকিতা মোবাইলে বন্দী করে ফেলে।
নিকিতা নিজের ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে ছোট্ট ব্লু-টুথ স্পিকারটা বের করে মোবাইলে কানেক্ট করে। ক্যারাওকে চালিয়ে গায়, "বোল রে পাপীহারা..."
গাইতে গাইতে লক্ষ করে ঠিক ওর উল্টো দিকে বসা সৌরভ দত্তর মুখে যেন আষাঢ়ের মেঘ জমে ওঠে। এবং সৌরভের মুখটা নিকিতার খুব চেনা বলে মনে হয়। গানটা গাইতে গাইতেই ওর মস্তিষ্কের সার্চ বাটন টিপে মেমারি স্ক্যান করতে শুরু করে দেয়, কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারে না এই মুখটা আগে কোথায় দেখেছে। কঠিন চিবুকের মুখটা যেন গানটা শুনতে শুনতে কঠিনতর হয়ে উঠছিল। গান শেষ হলে সবাই হাততালি দিয়ে উঠলো। কিন্তু সৌরভের নিশ্চল বসে থাকাটা নিকিতার দৃষ্টি এড়ায় না। সাতারার গণেশ গর্গ গাইল "ছু কর মেরে মন কো..." এবং শেষে মদন রাণে নিজে গাইল, "কভি কভি মেরে দিল মে..."। নিকিতার হাসি পাচ্ছিল সেই বেসুরো গান শুনে। আর ওর হাসি পেলে ডান গালে টোল পড়ে। নিকিতার দৃষ্টি যায় গম্ভীর মুখে বসে থাকা সৌরভের দিকে। আর সেই মুখ দেখে হঠাৎ মাথায় একটা সন্দেহ ঝিলিক দিয়ে ওঠতেই হোয়াটসঅ্যাপে ওর বাবার পাঠানো মেসেজগুলো স্ক্রল করতে থাকে। নানান দরকারি মেসেজের মাঝে বাবার পাঠানো ম্যাট্রিমোনিয়াল সাইটের বেশ কিছু ছেলের প্রফাইল। আর সেখানেই পেয়ে গেল সৌরভ দত্ত। বাবার নাম, কুশল দত্ত। কোয়ালিফিকেশন, এম কম। উচ্চতা পাঁচ এগারো। গণ- নর। গোত্র- কাশ্যপ। প্রফেশন- লজিস্টিক কোম্পানির ব্রাঞ্চ ম্যানেজার। যোগাযোগে দেওয়া আছে বাবা কুশল দত্তের ফোন নম্বর। ফটোও একটা রয়েছে। নিকিতার ডান গালে টোল পড়ে।
গান শেষ হতেই প্রভা বলল, "এবার হাউজি খেলা হোক, প্লিজ।"
মিসেস সোলাঙ্কি চেয়ার ছেড়ে ওঠার উপক্রম করতেই নিকিতা দেখে সৌরভ ওর 'নিকন কুলপিক্স ওয়ান থ্যাউজেন্ড' ক্যামেরার ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে রেসর্টের পেছন দিকে হাঁটা লাগাল। নিকিতাও ওর ব্লু-টুথ স্পিকারটা ব্যাগে ভরে, উঠে দাঁড়ায়।
'হোয়ার আর ইউ গোয়িং?' মিসেস রায়ের স্বরে উৎকন্ঠা।
উফ এখানে এসেও আরেক মায়ের পাল্লায় পড়লাম, মনে মনে বলে নিকিতা। মুখে বলে, “ডোন্ট ওয়ারি। আমিও একটু ফটোগ্রাফি করে আসি।”
সৌরভ যে দিকে গেছে সেদিকে দ্রুত পা চালায় নিকিতা। সামনে থাকা সৌরভের উদ্দেশে উচ্চস্বরে বলে, "এক্সকিউজ মি!"
সৌরভ দাঁড়িয়ে পড়ে। পেছন ফেরে। নিকিতাকে দেখে ওর মুখে বিস্ময়। নিকিতা তখনও হাঁপাচ্ছে। সৌরভ বলে, "এ কি আপনি?"
"হাউজি খেলার চেয়ে আপনার সঙ্গে যাওয়াটা বেটার অপশন মনে হলো।"
"অনেকটা হাঁটতে হবে কিন্তু।"
"ভয় দেখাচ্ছেন? আপনি বলছিলেন ফটোগ্রাফি করবেন..."
"আপনিও কি ফটোগ্রাফি করেন?"
"করি, তবে আমার শখ পোর্ট্রেটে। মানুষের মুখের নানান অভিব্যক্তি। আসলে সকালে কী সব পাখি দেখেছেন বললেন, ভাবলাম... এই সুযোগে যদি।"
"হ্যাঁ, সকালে এক জোড়া রেইন কোয়েল, বায়া, স্পটেড মুনিয়ার ফটো তুলেছি। এখানে এসব পাখি আনএক্সপেক্টেড, জানেন? একটা মালকোয়াও দেখেছি, কিন্তু ক্যামেরা রেডি করতে করতেই উড়ে গেল। ওটার ছবি তুলতে হবে।"
"মালকোয়া, বায়া... এসব পাখির নাম বুঝি? আমার কাছে হিব্রু মনে হচ্ছে।" নিজের রসিকতায় নিকিতা নিজেই হেসে ওঠে।
চাষের জমির ধার ঘেঁষে বেশ কিছুটা যাওয়ার পরে কাঁটাতারের খানিকটা অংশ খুলে মাটিতে পড়ে আছে। সেখান থেকে গ্রামের মানুষের পায়েহাঁটা পথের চিহ্ন চলে গেছে বিস্তৃত ঠেউখেলানো তৃণভূমির মধ্যে দিয়ে। অনেকটা এগিয়ে যাওয়ার পরে ওরা দেখতে পায় দুই বৃদ্ধা মহিলা অন্তত একশটা ছাগলকে সারবেঁধে ফেরত নিয়ে আসছে। নিকিতা সেই দুই বৃদ্ধার মুখের ক্লোজ-আপ নেয়।
"আপনি খুব সুন্দর গান করেন," সৌরভ নীরবতা ভাঙে।
"তোমার ভাল লেগেছে? একমাত্র তুমিই কিন্তু হাততালি দাওনি," নিকিতা বলে। আর বলেই বুঝতে পারে আপনি নয়, ও তুমি করে সম্বোধন করে ফেলেছে। আসলে ও বেশিক্ষণ আপনি সম্বোধনে কারো সাথে কথা বলতে পারে না। কিন্তু সৌরভ কিছু খেয়াল করেছে বলে মনে হয় না। ও নিজের মনেই বলে, "আমার মা গাইত এই গানটা।"
"গাইত কেন বলছ? এখন গান না?"
"জানি না। আমার মা নেই," সৌরভ নির্লিপ্তভাবে উচ্চারণ করে।
"দুঃখিত, সরি!"
"ইউ ডোন্ট নীড টু বি..., মা মারা যায়নি। বেঁচেই আছে," ঘাড় ঘুরিয়ে একবার নিকিতাকে দেখে নিয়ে বলতে থাকে, "মা প্রফেশনালি গান গাইত। মহারাষ্ট্র, গুজরাটের বিভিন্ন স্টেজে শো করত। কিন্তু বাবার পছন্দ ছিল না। আমার যখন ন বছর বয়স, তখন মা আমাদের ছেড়ে একজন গুজরাটি শো-কন্ডাকটারের সঙ্গে চলে যায়। শুনেছি এখন মুম্বাইয়ে থাকে। আমি আমার বাবার সঙ্গে থাকি... বাবা বারামতী অ্যাগ্রোতে কাজ করত, ইঞ্জিনিয়ার। আমার জন্মও বারামতীতে।"
ওরা হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে আসে। দূরে একটা জলাশয়ে পশ্চিমের সোনালী রোদ ঝিলিক দিচ্ছে। নিকিতা এখানকার অনুচ্চ ঝাঁকড়া-মাথার গাছগুলো লক্ষ করে, গতকালের বৃষ্টিতে ধুয়ে সব উজ্জ্বল।
"জানেন এই গ্রাসল্যান্ডের বৈশিষ্ট্য দেখলে বোঝা যায় যে এশিয়া এবং আফ্রিকা মহাদেশ একসময় যুক্ত ছিল। পরে সমুদ্রের জল উঁচু হয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। যে কারণে মাদাগাস্কার আর এখানকার ভূপ্রকৃতি ও গাছপালার চরিত্র নাকি একই রকম।"
"তুমি তো দেখছি অনেক কিছু খবর রাখ এই বিষয়ে... বেশ ইন্টারেস্টিং ..."
"হাউজির চেয়ে?" সৌরভ বলে।
নিকিতা হেসে ওঠে আর সঙ্গে সঙ্গেই ঠোঁটে তর্জনী ঠেকিয়ে সৌরভ চুপ করার ইশারা করে। ফিসফিস করে বলে, "ওই দেখুন, মালকোয়া!" একটা গাছ থেকে মুহূর্তে উড়ে যায় লম্বা লেজের এক ধূসর পাখি।
"ইশ! আবার উড়ে গেল..." সৌরভের স্বরে হতাশা। তারপরেই ও নিকিতার দিকে ফিরে বলে, "আপনার ব্লু-টুথ স্পিকারটা বের করুন তো। আমার মোবাইলে একটু কানেক্ট করে দিন।"
"কেন? তুমিও গাইবে?" নিকিতা রসিকতা করে। সৌরভ হাসে না। শুধু বলে, "দিন না। দেখুন, কী করি। আর এখন কথা বলবেন না। যান, ওই উঁচু পাথরটায় গিয়ে বসুন।"
নিকিতা দেখে সৌরভ ওই গাছটার নিচে ব্লু-টুথ স্পিকারটা রেখে গাছের পাতা দিয়ে ঢেকে দেয়। তারপর আরেকটা গাছের আড়ালে এক হাতে ক্যামেরা ফোকাস করে অন্য হাতে নিজের মোবাইল থেকে একটা পাখির ডাক বাজায়। ব্লু-টুথ স্পিকার থেকে আসা সেই আওয়াজ শুনে নিকিতার মনে হয় খুব কাছেই কোন আসল পাখি যেন কাতর স্বরে ডেকে যাচ্ছে। নিকিতাও ওর মোবাইল ফোন তাক করে সৌরভের একাগ্র, মুখের দিকে। ঘন চুলের, দৃঢ়বদ্ধ চিবুকের, প্রত্যয়ী মুখটি দেখে নিকিতার মহাভারতের কর্ণের কথা মনে পড়ে যায়।
সত্যি সত্যিই ওই স্পিকারের কৃত্রিম আওয়াজ শুনে উড়ে যাওয়া মালকোয়াটা ফিরে আসে। পাগলের মতো ঘুরপাক খেতে থাকে গাছের পাতার স্তূপে অদৃশ্য স্পিকারটাকে ঘিরে। আর সৌরভ তুলে চলে একের পর এক ফটো।
ফটো তোলা হয়ে গেলে, স্পিকারটা তুলে এনে পরিষ্কার করে ফেরত দেয় নিকিতার হাতে।
"কাউকে বলবেন না যেন। এটা কিন্তু অবৈধ," সৌরভ বলে।
"কী?"
"এই মোবাইলে 'মেটিং কল’ বাজিয়ে পাখি ডেকে আনা। আমি তো ফটো তুললাম শুধু। অনেকে এভাবেই এসব পাখি ধরে গোপনে বিক্রি করে দেয়..."
"মেটিং কল! ইশ আপনারা সব পুরুষরাই কি প্রবঞ্চক?" নিকিতা আপনি-তে ফেরে।
"প্রবঞ্চক! এর মানে কী? আমি প্রবাসী বাঙালি, এত ভালো বাংলা জানি না," সৌরভ বলে।
"ট্রিক-স্টার। চিট। ইশ পাখিটা কেমন পাগলের মত প্রেমিকাকে খুঁজছিল। ভেরি ব্যাড... এটা আপনার খুব অন্যায়!" নিকিতা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে উত্তর দেয়।
হা-হা করে হেসে উঠে সৌরভ বলে, "একটা ভালো ফটোর জন্য এটুকু চিট করাই যায়। একি! তোমার চোখ ভিজে!"
নিকিতা প্রসঙ্গ ঘোরানোর জন্য বলে, "আপনি বিয়ে করেননি?"
"না! মানুষ তো আর পাখি নয়! সামান্য খড়কুটোর বাসা আর একটা পার্টনার পেলেই সারা জীবনের জন্য সংসার বাঁধতে পারবে। তাদের অনেক চাহিদা। জানো, অধিকাংশ পাখিই নাকি মনোগ্যামাস।"
"তাই!" নিকিতা অবাক হয়।
ওরা যখন প্রায় ঘন্টা দেড়েক পর ফিরে আসে তখন মদন রাণের ঝুলে পড়া চোয়াল আর মিসেস রায়ের কৌতূহলী চোখ দেখে নিকিতার ডান গালে আরেকবার টোল পড়ে।
***
মিটিংয়ের পরের সপ্তাহ নিকিতার অত্যন্ত ব্যস্ততায় কাটে। প্রতিদিন সকাল থেকে কন-কলে বিভিন্ন ম্যানেজারদের সঙ্গে দফায় দফায় মিটিং করে। কোথায় কোথায় নতুন ফ্রাঞ্চাইজি দেওয়া যাবে, কী শর্তে, কোথায় হাব বা ওয়ারহাউজ হবে এই সব আলোচনা চলে দিনভর। শুধু পরের শনিবার ও অফিসেই ডেকে পাঠায় শিরুর, সাতারা আর বারামতীর ব্রাঞ্চ ম্যানেজারকে। প্রথমে শিরুর, তারপর সাতারা এবং সবার শেষে মিটিংয়ে বসে বারামতীর ম্যানেজার সৌরভের সঙ্গে। সাড়ে ছটায় মিটিংয়ের শেষ হলে নিকিতা বলে, "সেদিন অনেক নতুন পাখি দেখিয়েছিলে। আমি রিয়েলি গ্রেটফুল। চলো, আজ আমি তোমাকে ট্রীট দেব।"
এমন অপ্রত্যাশিত প্রস্তাবে সৌরভ বিস্মিত হলেও সম্মতি জানায়। সৌরভের মোটর বাইকেই পিলিয়ন রাইড করে পুনে শহরের সান্ধ্য ট্রাফিক পেরিয়ে যখন ওর ফ্ল্যাটে এসে পৌঁছায় তখন ঘড়ির কাঁটা প্রায় আটটায়। নিকিতার ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে গোপনীয়তার সুযোগ খুব কম। তাই পোশাক পরিবর্তন না করেই ও দ্রুত হাতমুখ ধুয়ে লিভিংরুমের নানান কোণে জ্বালিয়ে দেয় সুগন্ধী মোমবাতি। টেবিলে এনে রাখে একটা রেড ওয়াইনের বোতল আর দুটি সুদৃশ্য গবলেট।
"আমার এক ক্রিশ্চিয়ান ক্লাশমেট গিফ্ট করেছিল। ওর চেনা একজন চার্চের ফাদারের কাছ থেকে সংগ্রহ করা। স্যাক্রামেন্টাল ওয়াইন। আশাকরি ভাল লাগবে।" কিচেনে গিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই নিয়ে আসে সল্টেড কাজু আর ঘিয়ে রোস্ট করা সালামি।
"আজ গান শোনাবে না?" সৌরভ প্রশ্ন করে। বোধহয় কথা শুরু করার জন্যই।
"তোমার বাবা তো গান পছন্দ করেন না, তুমি করো?" নিকিতা জানতে চায়।
"ট্যাগোর'স সং জানো?"
"চিয়ার্স!" নিকিতা প্রথমে পানপাত্র উঁচু করে ধরে। তারপর একটা ছোট চুমুক দিয়ে টেবিলে রেখে, মাথার ক্লাচটা খুলে ফেলতেই কাঁধে-পিঠে ঝাঁপিয়ে পড়ে রেশমি চুলের গোছা। গুনগুন করে ধরে, "আমার অঙ্গে অঙ্গে কে বাজায় বাঁশি..."
"দিজ ওয়াজ মাই মাদার'স ফেভারিট সং। আমার মনে আছে, আরেকটা গানও মা খুব গাইত। কী যেন, মেঘের পরে মেঘ..."
"তোমার মা তো অর্কেস্ট্রায় হিন্দি ফিল্মি গান গাইতেন বলেছিলে..."
"হ্যাঁ, সেটা ছিল পেশা। মায়ের উচ্চাশা ছিল একদিন প্লে-ব্যাকের সুযোগ পাবে। কিন্তু বাড়িতে গাইত ট্যাগোর'স সং। আমাকেও শেখানোর চেষ্টা করেছিল, 'আমরা সবাই রাজা...'” বলে হাসে।
দুটো গবলেটে আবার ওয়াইন ঢেলে, নিকিতা "মেঘের পরে মেঘ করেছে..." গাইতে গাইতে লক্ষ করে সৌরভের কঠিন মুখটা যেন নরম হয়ে আসছে, উদাসীন চোখে কোমল উষ্ণতা। ওর উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ কপালে জমে উঠছে স্বেদবাষ্প। গান বন্ধ না করেই উঠে গিয়ে নিকিতা এসির টেম্পারেচার কম করে এসে আবার মুখোমুখি বসে। চোখ রাখে সৌরভের চোখে। গান শেষ হলে সৌরভ বলে ওঠে, "কতদিন পরে এসব গান শুনলাম।"
"কেন? ইচ্ছে করলেই ইউটিউবে অনেক বড় শিল্পীর গলায় শুনতে পাওয়া যায়।"
"এতদিন ইচ্ছে করেনি..." পকেট থেকে রুমাল বের করে সৌরভ ঘাড়-গলা মোছে। জামার ওপরের দুটো বোতাম খুলে দেয়। নিকিতার চোখ যায় ওর পেশল বুকের দিকে। নিকিতা চোখে ফুটে ওঠে এক মোহময় আমন্ত্রণ। সৌরভ একটু ঝুঁকে আসে সামনের দিকে, ওর নাসা স্ফুরিত, চোখ মদির, হাত রাখতে যায় নিকিতার হাতের ওপর। নিকিতা তড়াক করে উঠেই পাশে রাখা নিজের ক্যামেরায় ফটো তুলতে থাকে সৌরভের। হতভম্ব হয়ে যায় সৌরভ।
"এ কি! হঠাৎ আমার ফটো তুলছ কেন?"
"হঠাৎ কেন হবে? ফটো তুলব বলেই তো আজ ডেকেছি এখানে।"
"রিয়েলি! আমার ফটো তুলবে বলেই এত সব অ্যারেঞ্জমেন্ট!"
"ইয়েস। সেদিনও তুলেছিলাম। একজন অ্যাটেনটিভ ফটোগ্রাফারের। একজন কঠিন মুখের পুরুষের। নির্জন প্রকৃতির বুকেও একজন একা যুবতী যে পুরুষের একটি ফটোগ্রাফিরও বিষয় হতে পারে না, হেরে যায় কতগুলো ধূসর খয়েরি রঙের পাখির কাছে। আজ ডেকে এনেছিলাম সেই কঠিন পুরুষের মুখের অন্য এক অভিব্যক্তির ফটো তুলব বলে," নিকিতা হাসতে হাসতে বলে, "এবং একটা ভালো ফটোগ্রাফির জন্য এটুকু কৌশল তো জায়েজ, তাই না?"
"দিজ ইজ নট ফেয়ার। এটা ঠিক নয়..." সৌরভের মুখ ব্যথায় কুঞ্চিত, চোখ বিষণ্ণ হয়ে ওঠে। নিকিতা এক মুহূর্ত সেই মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে ঝুঁকে দু হাত বাড়িয়ে সৌরভের মুষ্টিবদ্ধ ডান হাত চেপে ধরে বলে, "সরি। তোমাকে আঘাত করতে চাইনি..."
সৌরভ নিজের হাত টেনে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়, সটান, ঋজু।
"আই মাস্ট পুশ অফ। বাইকে ফিরতে হবে। রাত হয়ে যাবে। গুডনাইট।"
"ডিনার করে যাও, প্লিজ। আমি পাস্তা বানাচ্ছি।"
"নো, থ্যাঙ্কস।" সৌরভ দ্রুত বেরিয়ে যায় মাথা নিচু করে।
***
নিকিতার মনটা খারাপ হয়ে যায়। অনেকক্ষণ সোফায় বসে থাকে চুপ করে। তারপর হোয়াটসঅ্যাপ করে, "আই অ্যাম রিয়েলি সরি। ডিন্ট ইনটেন্ড টু হার্ট ইউ। সত্যিই। এত রাতে বাইক নিয়ে ফিরবে, চিন্তায় থাকব। পৌঁছে একটা মেসেজ করে জানিও প্লিজ।"
বার বার হোয়াটসঅ্যাপ চেক করতে থাকে।
রাত সাড়ে বারোটা নাগাদ ওর পাঠানো মেসেজে ব্লু টিক পড়ে। নিকিতা রাতে আর কিছু খাবে না ঠিক করে। ইচ্ছে করে না। টেবিল থেকে প্লেট, গবলেট সব তুলে নিয়ে কিচেনের সিঙ্কে নামিয়ে রাখে। আর তখনই হোয়াটসঅ্যাপে নোটিফিকেশন আসে। রোমান হরফে লেখা।
"আমি দুঃখিত। ওভাবে চলে আসা উচিত হয়নি, কিছু মনে করো না।"
নিকিতা মেসেজটা বারবার পড়ে। চোখ আর্দ্র হয়ে ওঠে। ও উত্তরে লেখে, "উইল ইউ টেক মি অন আ ডেট? সেই গ্রাসল্যান্ডে? আরেকবার?"
"ইয়েস ম্যাম। মাই প্লেজার। তবে এবার নো ক্যামেরা, নো ফটোগ্রাফি।"
তারপর ওর বাবার পাঠানো সৌরভের প্রোফাইলটা সৌরভকেই ফরোয়ার্ড করে লেখে, "পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য কি শ্রী কুশল দত্তের নম্বরেই যোগাযোগ করতে হবে, নাকি সরাসরি তোমার সঙ্গেই করা যাবে?"
মুহূর্তে প্রত্যুত্তরে একটি গোল গোল চোখের বিস্মিত মুখের ইমোজি আসে। এবং পরক্ষণেই অনেক, অনেকগুলো লাল হৃদয়ের ইমোজি।
নিকিতা ডান গালে গভীর টোল ফেলে গুনতে থাকে সেই হৃদয়চিহ্নের মোট সংখ্যা।