• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৪ | অক্টোবর ২০২৬ | ভ্রমণকাহিনি, প্রকৃতি, বাকিসব
    Share  
  • ফিরে এসে বলব কী দেখেছি — গোয়েচা লা অভিযানের একটি ভ্রমণকথা : চিন্ময় সাঁতরা
    পর্ব ১

    গোয়েচালা থেকে ফিরেছিলাম ১৪ অক্টোবর ২০২৪, সোমবার। যাওয়ার আগে টেবিলের উপর এক টুকরো কাগজে লিখে রেখে গিয়েছিলাম— যদি যেতে পারি, ফিরে এসে বলব কী দেখেছি। সেই কথাটাই যেন বহুদিন ধরে কোথাও মনের মধ্যে পড়ে ছিল। তারপর অনেকটা সময় কেটে গেল। অবশেষে বছর দুয়েক পর সেই পথের কথা লিখতে বসলাম।

    সেদিন রাত ১০টা ০৫ মিনিটের দার্জিলিং মেল ধরব। বাড়ি থেকে বেরোলাম রাত সাড়ে আটটার দিকে। পরিকল্পনা ছিল গড়িয়া স্টেশন থেকে শিয়ালদা পৌঁছে ট্রেন ধরব। বাইরে থেকে দেখলে এ ছিল আর পাঁচটা ভ্রমণের মতোই একটি যাত্রার শুরু। কিন্তু আমার ভিতরে তখন অন্যরকম কিছু চলছিল।

    যাওয়ার কয়েকদিন আগে থেকেই আমি যেন একটু ঘোরের মধ্যে ঢুকে গিয়েছিলাম। স্বাভাবিকের তুলনায় অনেকটাই চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলাম। তার কারণ শুধু সামনে এত বড় একটি ট্রেক ছিল, তা নয়। মাথার মধ্যে নানা চিন্তা ঘুরছিল। কয়েকটি বিষয় নিয়ে বেশ গভীরভাবে ভাবছিলাম। তার পাশাপাশি বারবার কল্পনায় পুরো ট্রেক রুটটা হাঁটার চেষ্টা করছিলাম—ইউকসাম থেকে শুরু করে একের পর এক ক্যাম্প, উঁচুতে ওঠা, দীর্ঘ পথ, আর শেষ পর্যন্ত গোয়েচা লা। যেন যাত্রা শুরু হওয়ার আগেই মনে মনে বহুবার সেই পথে হেঁটে ফেলেছি।

    আমাদের যাওয়ার টিকিট কনফার্ম ছিল। কিন্তু ফেরার টিকিট তখনও ওয়েটিং লিস্টে। তবু সেটা নিয়ে খুব একটা দুশ্চিন্তা করিনি। হাতে তখনও বেশ কিছুটা সময় ছিল। আমরা ধরেই নিয়েছিলাম, ফেরার আগেই টিকিট কনফার্ম হয়ে যাবে। কিন্তু আসল অনিশ্চয়তা ছিল অন্য জায়গায়।

    পুজোর ছুটি পড়তে তখনও কয়েকদিন বাকি। ঠিক সেই সময় বঙ্গোপসাগরে তৈরি হয়েছে গভীর নিম্নচাপ। গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় বন্যা পরিস্থিতি, আর পাহাড়ি এলাকায় টানা খারাপ আবহাওয়া। খবর আসছিল ধসের, রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার, যাতায়াত ব্যাহত হওয়ার। বিশেষ করে ১০ নম্বর জাতীয় সড়কের অবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল প্রবল। তিস্তার পাশ দিয়ে যাওয়া পাহাড়ি রাস্তাগুলো এই সময়ে এমনিতেই ধসপ্রবণ; তার উপর লাগাতার বৃষ্টি পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তুলেছিল। ফলে বাড়ি থেকে বেরোনোর মুহূর্ত পর্যন্ত আমাদের মাথায় একটা প্রশ্ন ঘুরছিল— আদৌ কি আমরা ইউকসাম পৌঁছতে পারব?

    সেই অনিশ্চয়তাই বোধহয় যাত্রাটাকে শুরু থেকেই অন্যরকম করে দিয়েছিল। সামনে কী আছে, তা আমরা কেউই নিশ্চিতভাবে জানতাম না। শুধু এটুকুই জানতাম—একবার পথ খুলে গেলে, আমাদের যেতে হবে।

    দু’তারিখ রাতেই মেজদা গ্রামের বাড়ি থেকে আমার এখানে চলে এসেছিল। তারপর থেকে আমাদের দু’জনেরই ব্যস্ততা বেড়ে গেল। রুকস্যাক খুলে আবার গুছিয়ে দেখা, কী আছে আর কী নেই তার হিসেব করা, কোনো দরকারি জিনিস বাদ পড়ে গেল কি না—সব মিলিয়ে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছিল পুরোদমে।

    আমরা ঠিক করেছিলাম, যা কিছু বাকি আছে পরদিন সকালে কিনে নেওয়া হবে। ডাক্তার বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলার পর মেজদা জানাল, সঙ্গে আরও কিছু ওষুধ রাখা দরকার। সেইমতো পরদিন সকালে প্রয়োজনীয় ওষুধ, কিছু শুকনো খাবার, চকলেট আর ব্যান্ডেজ কিনে নিলাম। সবকিছু ব্যাগে ঢুকে যাওয়ার পর মনে হল, এবার সত্যিই প্রস্তুতি প্রায় সম্পূর্ণ।

    সেদিন বিকেল থেকে আর বৃষ্টির দেখা ছিল না। এতদিনের খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে সেটুকুই আমাদের বেশ আশ্বস্ত করেছিল। মনে হচ্ছিল, হয়তো এবার আবহাওয়া একটু সহায় হবে। কিন্তু পাহাড়ের পথে রওনা হওয়ার আগে অনিশ্চয়তা যেন আমাদের ছাড়তে চাইছিল না। বাড়ি থেকে বেরোতে যাব, ঠিক সেই সময় আবার বৃষ্টি শুরু হল। বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুরা একের পর এক ফোন করছিল। আমরা যেমন রাস্তার অবস্থা আর আবহাওয়া নিয়ে চিন্তিত ছিলাম, তারাও তেমনই উদ্বিগ্ন। পাহাড়ে ধসের খবর, খারাপ আবহাওয়া, অনিশ্চিত রাস্তা—সব মিলিয়ে তাদের উৎকণ্ঠার কারণও যথেষ্ট ছিল। তবু একটা সময় আসে, যখন সমস্ত হিসেব-নিকেশ, আশঙ্কা আর প্রস্তুতির পর শুধু বেরিয়ে পড়াটাই বাকি থাকে।

    রুকস্যাক দুটো পিঠে তুলে নিলাম। বাইরে তখন বৃষ্টি। আর আমাদের সামনে অপেক্ষা করছিল অজানা এক পথ। অ্যাডভেঞ্চারের আশায় আমরা বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের দল মোট সাতজনের। আমি, পল্লবী আর মেজদা গড়িয়া স্টেশন থেকে ট্রেন ধরে শিয়ালদার উদ্দেশে রওনা দিলাম। ঠিক ছিল, শিয়ালদায় গিয়েই বাকিদের সঙ্গে দেখা হবে। স্টেশনে পৌঁছে একে একে সবাই জড়ো হলাম। তারপর নির্দিষ্ট কামরায় উঠে যে যার সিটে গিয়ে বসে পড়লাম। আমাদের সাতজনের দলে পল্লবী একমাত্র মেয়ে, বাকিরা সবাই ছেলে। এতদিন ধরে যে ট্রেক নিয়ে আলোচনা, পরিকল্পনা আর প্রস্তুতি চলছিল, এবার সেটাই সত্যি সত্যি শুরু হয়ে গেল। ট্রেন শিয়ালদা ছেড়ে কিছুটা এগোতেই আমরা রাতের খাবার সেরে নিলাম। তারপর দিনের ক্লান্তি আর সামনে অপেক্ষা করা দীর্ঘ যাত্রার কথা ভেবে যে যার মতো ঘুমিয়ে পড়লাম। পরদিন সকালে ঘুম ভাঙার সময় ট্রেন ডালখোলা ছাড়িয়ে গেছে। জানলার বাইরে তাকাতেই চোখে পড়ল একের পর এক চা-বাগান পিছিয়ে যাচ্ছে। বর্ষার পর চা-বাগানের রংটাই যেন অন্যরকম—ভেজা, গভীর সবুজ, চোখ জুড়িয়ে দেওয়া। কোথাও কোথাও দূরের ঢেউখেলানো জমি আর সবুজের স্তরগুলো দেখে হঠাৎ নীলগিরির উপত্যকার কথা মনে পড়ছিল। কিছুটা এগোতেই দৃশ্য আবার বদলে গেল। সারি সারি মাঠ। কোথাও ধানের চাষ, কোথাও আনারস। সবচেয়ে অবাক লাগছিল এমন কিছু জায়গা দেখে, যেখানে পাশাপাশি চা, আনারস আর ধান—তিন রকম চাষই চোখে পড়ছিল। দক্ষিণবঙ্গে বড় হওয়া আমার কাছে এই দৃশ্য একেবারেই নতুন। একই ভূদৃশ্যে এত ভিন্ন ধরনের চাষের এমন মেলবন্ধন আগে কখনও দেখিনি। ট্রেন তখন উত্তরের দিকে ছুটে চলেছে। আর জানলার বাইরের দৃশ্য যেন ধীরে ধীরে বলে দিচ্ছিল—আমরা পরিচিত ভূখণ্ড পেরিয়ে অন্য এক জগতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। ট্রেন নির্দিষ্ট সময়েই এনজিপি স্টেশনে পৌঁছল। আশার কথা, সারারাত আর বৃষ্টি হয়নি। সকালের আবহাওয়াও বেশ মনোরম ছিল। এতদিন ধরে আবহাওয়া আর রাস্তার অবস্থা নিয়ে যে দুশ্চিন্তা চলছিল, তার মধ্যে সেই পরিষ্কার সকালটা আমাদের কিছুটা স্বস্তি দিল।


    স্টেশনে নেমে আমরা ফ্রেশ হয়ে বাইরে অপেক্ষা করতে থাকা গাড়ির দিকে রওনা দিলাম। এনজিপি স্টেশনে তখন নির্মাণকাজ চলছিল, ফলে সঠিক জায়গায় পৌঁছতে একটু বেগ পেতে হল। বেশ খানিকটা ঘোরাঘুরির পর অবশেষে আমাদের ড্রাইভারের দেখা পেলাম। সবাইয়ের রুকস্যাক আর লাগেজ গাড়ির ছাদে ভালো করে বেঁধে দেওয়া হল। তারপর শুরু হল ইউকসামের উদ্দেশে আমাদের পাহাড়ি যাত্রা।

    গাড়ি ছাড়ার পর ড্রাইভারের কাছ থেকেই প্রথম আশার খবরটা পেলাম। সে জানাল, ১০ নম্বর জাতীয় সড়ক আপাতত খোলা আছে। তবে পথে বহু জায়গায় ধস নেমেছে এবং দিনরাত মেরামতির কাজ চলছে। কথাটা শুনে পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারলাম না, তবু অন্তত রাস্তা খোলা আছে—এইটুকুই তখন অনেক। কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না।


    আমরা তখন সবে সেবক রোডে পৌঁছেছি। এমন সময় ড্রাইভারের ফোন বেজে উঠল। কয়েক মুহূর্ত কথা বলে ফোনটা রেখে সে জানাল—ধসের কারণে ১০ নম্বর জাতীয় সড়ক আবার বন্ধ হয়ে গেছে। মুহূর্তের মধ্যেই আমাদের পরিকল্পনা বদলে গেল। যাওয়ার কথা ছিল জোরথাং হয়ে। কিন্তু এখন সেই পথ আর সম্ভব নয়। ড্রাইভার জানাল, আমাদের ঘুরে নামচি হয়ে ইউকসাম যেতে হবে। অর্থাৎ পাহাড়ে ঢোকার আগেই আমরা বুঝে গেলাম, এই সফরে পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছু চলবে—এমন আশা না রাখাই ভালো।

    তারপর দীর্ঘ পথ। কখনও পাহাড়ি বাঁক, কখনও মেঘে ঢাকা রাস্তা, কখনও দূরের উপত্যকা। আমরা ধীরে ধীরে ইউকসামের দিকে এগিয়ে চলেছি। গন্তব্যে পৌঁছতে তখনও প্রায় ঘণ্টা দুয়েক বাকি। ঠিক সেই সময় আবার শুরু হল বৃষ্টি। প্রথমে মনে হয়েছিল, হয়তো একটু পরেই থেমে যাবে। কিন্তু সে বৃষ্টি যেন থামার কোনো ইচ্ছাই রাখেনি। ক্রমে অন্ধকার নেমে এল, পাহাড়ি রাস্তা ভিজে চকচক করতে লাগল, আর গাড়ির কাচ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়তে থাকল অবিরাম। সেই বৃষ্টির মধ্যেই সন্ধ্যা প্রায় সাতটার সময় অবশেষে আমরা পৌঁছলাম ইউকসাম। দীর্ঘ অনিশ্চয়তা, বদলে যাওয়া রাস্তা আর একটানা বৃষ্টির পর গাড়ি থামতেই মনে হল—ট্রেক এখনও শুরুই হয়নি, অথচ অভিযান যেন ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।


    হোটেলে পৌঁছে সবাই আগে একটু ফ্রেশ হয়ে নিলাম। তারপর এক জায়গায় জড়ো হলাম। বাইরে তখনও বৃষ্টি চলছে। ঘরের মধ্যে বসে আমাদের আলোচনার বিষয় একটাই—কাল কী হবে? কেউই যেন সরাসরি উত্তর দিতে পারছিল না। সবাই সবার মুখের দিকে তাকাচ্ছিল। মুখে খুব বেশি কিছু না বললেও বোঝা যাচ্ছিল, প্রত্যেকের মনেই একই চিন্তা। এত দূর এসে যদি এই বৃষ্টির জন্য ট্রেক শুরুই না করা যায়?

    পল্লবী প্রথম কথাটা স্পষ্ট করে বলল। এমন বৃষ্টি যদি চলতেই থাকে, তাহলে পরদিনই সে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেবে। অকারণে কয়েকটা দিন ইউকসামে বসে নষ্ট করার চেয়ে কলকাতায় ফিরে অন্তত পুজোটা দেখা যাবে। কথাটা বাস্তবসম্মত ছিল, কিন্তু শুনে মনটা আরও একটু ভারী হয়ে গেল।

    শুভ আর রাজুও বিষয়টা নিয়ে যথেষ্ট চিন্তিত ছিল। বিশেষ করে রাজুর কথা ভাবলে ব্যাপারটা আরও আলাদা মনে হচ্ছিল। ও এর আগে জীবনে কোনো পাহাড়ই দেখেনি। পুরুলিয়ার পাহাড় পর্যন্ত নয়। আর এবার প্রথম পাহাড়-দেখাই সরাসরি হিমালয়—তাও আবার সাধারণ বেড়ানো নয়, ট্রেকিং। তাবুতে থাকা, স্লিপিং ব্যাগে রাত কাটানো, দিনের পর দিন হাঁটা, ক্রমশ উচ্চতায় ওঠা, অজানা আবহাওয়ার সঙ্গে লড়াই—সবকিছুই ওর কাছে একেবারে নতুন। তাই রাজু যদি শেষ পর্যন্ত এই পুরো যাত্রাটা সম্পূর্ণ করতে পারে, তাহলে সেটা শুধু একটা ট্রেক শেষ করা হবে না; ওর জীবনেরই এক কল্পনাতীত অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে।

    ঘরের মধ্যে কথাবার্তা চলছিল, আর বাইরে বৃষ্টির শব্দ যেন আমাদের প্রতিটি সিদ্ধান্তের উপর একটা করে প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিচ্ছিল। আমরা ইউকসামে পৌঁছে গিয়েছি ঠিকই, কিন্তু তখনও কেউ জানতাম না—পরদিন সকালে সত্যিই কি আমাদের পথচলা শুরু হবে, নাকি এই বৃষ্টিই এখানেই আমাদের থামিয়ে দেবে।

    আমরা গিয়েছিলাম বসন্ত অ্যাডভেঞ্চার-এর সঙ্গে। ওদের পক্ষ থেকে ফোন করে বলা হয়েছিল, রাত আটটার মধ্যে খাওয়া সেরে নিতে। তার আগে আমি আর শুভ ঠিক করলাম একটু বাইরে বেরোব। উদ্দেশ্য খুব সহজ—স্থানীয় কারও মুখে যদি দুটো আশার কথা শোনা যায়, তাহলে অন্তত মনটা একটু হালকা হবে। সেই ভরসা নিয়েই রাতে ঘুমোতে যেতে পারব। হোটেল থেকে বেরিয়ে আমরা মোনাস্ট্রির কাছের একটি পোশাকের দোকানে ঢুকলাম। দোকানদারকে জিজ্ঞাসা করলাম, এই রকম আবহাওয়ায় ট্রেক করা আদৌ সম্ভব কি না। উনি এমন একটা উত্তর দিলেন, যার মধ্যে আশা আর নিরাশা—দুটোই ছিল। কথায় পুরোপুরি ভরসা পাওয়া গেল না, আবার একেবারে নিরুৎসাহও করলেন না। দোকান থেকে বেরিয়ে এলাম, কিন্তু মনটা খচখচ করতেই থাকল। এরপর শুভ মোনাস্ট্রির উল্টো দিকে একটি ট্রেক সার্ভিস সেন্টারে গেল। সেখানে আমাদের পরিস্থিতিটা খুলে বলল—টানা বৃষ্টি, রাস্তার অবস্থা, ট্রেক শুরু করা উচিত কি না, এসব নিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তা।

    সবটা শুনে ভদ্রলোক খুব সহজভাবে বললেন, “তোমাদের সবার ভালো রেন জ্যাকেট আছে? রেন প্যান্ট আছে? তাহলে এত ভাবছ কেন?” কথাটা খুব সাধারণ, কিন্তু সেই মুহূর্তে অদ্ভুতভাবে ভালো লেগেছিল। যেন কেউ হঠাৎ আমাদের দুশ্চিন্তার জটটা একটু আলগা করে দিল। তারপর তিনি আরও বললেন, তাঁর ধারণা পরদিন থেকেই আবহাওয়ার উন্নতি হবে। এই রকম বৃষ্টি পাঁচ-ছয় দিন ধরে চলছে, এবার হয়তো পরিস্থিতি ঘুরবে। শেষে তিনি বললেন— “তোমরা চলে যাও।” কথাটা খুব বড় কোনো আশ্বাস ছিল না। আবহাওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়ার ক্ষমতা তাঁরও ছিল না। তবু সেই কয়েকটা শব্দের মধ্যে এমন একটা আত্মবিশ্বাস ছিল, যেটা আমরা তখন খুব দরকারে খুঁজছিলাম। আমি আর শুভ একে অপরের দিকে তাকালাম। মনে হল, অন্তত একজন তো বলল—যাও। সেদিন রাতে আমাদের দরকার ছিল ঠিক এইটুকুই।

    হোটেলে ফিরে আমরা বাইরে শোনা কথাগুলো সবাইকে বললাম। বিশেষ করে ট্রেক সার্ভিস সেন্টারের সেই ভদ্রলোকের আশ্বাস—আবহাওয়া হয়তো এবার একটু ভালো হবে, আর আমাদের যদি ঠিকঠাক রেন জ্যাকেট ও রেন প্যান্ট থাকে, তাহলে এতটা ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কথাগুলো শুনে কারও মন পুরোপুরি হালকা হল না। পল্লবীর মুখ তখনও ভার। রাতের খাবার সেরে ফিরে আমরা ঠিক করলাম, আর বেশি ভেবে লাভ নেই। আজকের রাতটা দেখা যাক। যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার, কাল সকালে নেওয়া যাবে। এই সিদ্ধান্তে যেন সাময়িক একটা বিরতি এল চিন্তার মধ্যে। কিন্তু সেই স্বস্তিটাও বেশিক্ষণ টিকল না।

    কিছুক্ষণ পর বাবা ফোন করল। বলল, রেডিওতে নাকি বারবার বলা হচ্ছে সিকিমের আবহাওয়া আরও খারাপ হতে পারে। খুব ভেবে-চিন্তে যেন আমরা ট্রেক শুরু করি। বাবার গলায় উদ্বেগ স্পষ্ট ছিল। ফোনটা রাখার পর আবার সেই পুরোনো দুশ্চিন্তাটা ফিরে এল—আমরা কি সত্যিই ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে চলেছি?

    এর মধ্যেই রাতে হোটেলে ফিরল আর-একটি ট্রেকিং দল। মুখ দেখে বোঝাই যাচ্ছিল, তাঁদের অভিজ্ঞতা খুব একটা ভালো হয়নি। কথা বলে জানলাম, তাঁরা কেরালা থেকে এসেছেন। গত সাত দিন ধরে প্রায় একটানা বৃষ্টির মধ্যেই ট্রেক করতে হয়েছে তাঁদের। ঠিকমতো কিছুই দেখতে পাননি। এমনকি তাঁবুতেও জল ঢুকে গিয়েছিল। ওঁদের কথা শুনে আমাদের মন আরও খারাপ হয়ে গেল। যে মানুষগুলো ঠিক সেই পথ থেকেই ফিরেছে, তাদের মুখে যখন শোনা যায়—“কিছুই দেখতে পাইনি, শুধু বৃষ্টি”—তখন নিজের মনকে আশ্বস্ত করা খুব সহজ নয়। রাত বাড়ছিল। আমরা প্রায় দশটার দিকে শুতে গেলাম। কিন্তু ঘুম আসার আগেই বাইরে বৃষ্টির শব্দ আরও জোরে শোনা যেতে শুরু করল। যত রাত বাড়ল, বৃষ্টির প্রকোপও যেন তত বাড়তে লাগল।

    অন্ধকার ঘরে শুয়ে শুধু সেই শব্দ শুনছিলাম। ছাদের উপর, জানলার কাচে, চারপাশে একটানা বৃষ্টি। আর মাথার মধ্যে ঘুরছিল একটাই প্রশ্ন— কাল সকালে কি সত্যিই আমরা রওনা দিতে পারব?

    ৫ অক্টোবর ২০২৪

    সকালে ঘুম ভাঙতেই প্রথম কাজ ছিল জানালার দিকে তাকানো। জানালার ফাঁক দিয়ে ভোরের ইউকসামের মোনাস্ট্রিটা দেখা যাচ্ছিল। আর সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার—বৃষ্টি একেবারেই নেই। গত রাতের সেই একটানা বৃষ্টি যেন হঠাৎ করেই থেমে গেছে। কিছুক্ষণ পর সূর্য উঠল। চারপাশের আলো বদলে গেল মুহূর্তে। মনে হচ্ছিল, রাতের অস্থিরতা আর দুশ্চিন্তার যেন কোনো অস্তিত্বই ছিল না। মোনাস্ট্রির পেছনে বরফে ঢাকা পর্বতশ্রেণি চোখে পড়তেই আমি কিছুক্ষণের জন্য স্থির হয়ে গেলাম। দৃশ্যটা এত সুন্দর ছিল যে মন যেন এক লাফে সমস্ত চিন্তার বাইরে চলে গেল।

    গত রাত পর্যন্ত যে পাহাড় আমাদের কাছে ছিল অনিশ্চয়তার প্রতীক, সেই পাহাড়ই ভোরের আলোয় যেন আমাদের ডেকে বলছিল— চলো। আমাদের সবার মনোভাব বদলে গেল। ঠিক হল, আজই ট্রেক শুরু করব। কিছুক্ষণ পর বসন্তজি এলেন। আমরা সবাই মিলে তাঁকে আবার জিজ্ঞাসা করলাম, এই পরিস্থিতিতে আমাদের যাওয়া ঠিক হবে কি না। তিনি আমাদের সাহস জোগালেন। তাঁর কথার ভঙ্গিতেই একটা ভরসা ছিল। মনে হল, দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে পথ চলার চেয়ে আত্মবিশ্বাস নিয়ে শুরু করাটাই ভালো।

    ব্রেকফাস্ট সেরে সকাল প্রায় ন’টার সময় আমরা ইউকসাম বাজার থেকে ট্রেক শুরু করলাম। প্রথম দিকের পথ মোটামুটি সহজই ছিল। শরীর তখনও ফ্রেশ, মন উৎসাহে ভরা। প্রায় তিরিশ মিনিট হাঁটার পর পৌঁছে গেলাম কাঞ্চনজঙ্ঘা ন্যাশনাল পার্ক (KNP)-এর প্রবেশদ্বারে। এখান থেকেই যেন সত্যিকারের ট্রেকের শুরু। এন্ট্রি গেট পেরোতেই পথ ধীরে ধীরে চড়াই হতে শুরু করল। সামনে লম্বা রাস্তা, অজানা আবহাওয়া আর একের পর এক ক্যাম্প। আমাদের ব্যক্তিগত কিছু লাগেজের সঙ্গে খাবার ও থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী বহন করার দায়িত্বে ছিল চারটি ইয়াক। ওদের পিঠে বাঁধা মালপত্র দেখে প্রথমবারের মতো উপলব্ধি হল, আগামী কয়েকটা দিন আমরা সত্যিই শহুরে আরামের বাইরে চলে যাচ্ছি। ইউকসাম পিছনে পড়ে যাচ্ছিল। আর আমরা ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ছিলাম কাঞ্চনজঙ্ঘা ন্যাশনাল পার্ক (KNP)-এর অরণ্যের ভিতর।


    এখন আমাদের দল এগারোজনের। আমরা সাতজন, আর বসন্ত অ্যাডভেঞ্চারের পক্ষ থেকে চারজন—একজন পোর্টার, একজন কুক, একজন সহায়ক এবং আমাদের গাইড সঞ্চামান লিম্বু। ট্রেকের শুরুতেই গাইড আমাদের প্রত্যেকের হাতে একটি করে বাঁশের লাঠি তুলে দিল। তখন হয়তো খুব সাধারণ একটা জিনিস বলেই মনে হয়েছিল, কিন্তু পরে বুঝেছিলাম—এই লাঠিই সামনের আট দিনের পথচলায় আমাদের প্রায় স্থায়ী সঙ্গী হয়ে উঠবে। কাঞ্চনজঙ্ঘা ন্যাশনাল পার্ক (KNP)-এর গহীন অরণ্যে ঢুকতেই চারপাশের দৃশ্য বদলে গেল। পথের দুই পাশে ছোট ছোট নানা রঙের ফুল ফুটে আছে। কোথাও গাছের ফাঁক দিয়ে ওপারের পাহাড় দেখা যাচ্ছে, আর সেই পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে সরু সরু ঝরনা। ভেজা মাটি, স্যাঁতসেঁতে বাতাস আর অরণ্যের নিজস্ব গন্ধ—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, ট্রেকের প্রথম দিনেই আমরা যেন পরিচিত পৃথিবী থেকে একটু একটু করে দূরে সরে যাচ্ছি। শুরুর দিকেই জোঁকের সঙ্গে আমাদের বেশ ঘনিষ্ঠ পরিচয় হল। কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে জোঁক ছিল প্রচুর। হাঁটতে হাঁটতে কখন যে একটা জোঁক আমার পায়ে বসে গেছে, টেরই পাইনি। হঠাৎ মনে হল মোজাটা কেমন যেন ভেজা ভেজা। ট্রাউজার তুলে দেখি, পা রক্তে ভেসে গেছে। প্রথম মুহূর্তে চমকে গেলেও ব্যাপারটা আমাদের কাছে ভয়ের থেকে বরং নতুন অভিজ্ঞতাই বেশি ছিল। মনে হচ্ছিল, পাহাড়ি পথ নিজের মতো করে আমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে।

    আরও কিছুটা এগোতেই বিপরীত দিক থেকে একের পর এক ট্রেকারের সঙ্গে দেখা হতে শুরু করল। কেউ জার্মানি থেকে, কেউ ইসরায়েল থেকে, আবার কেউ ভারতের অন্য রাজ্য থেকে এসেছেন। তাঁদের বেশিরভাগই ট্রেক সম্পূর্ণ করতে পারেননি। টানা খারাপ আবহাওয়া, বৃষ্টি আর প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে অনেককেই মাঝপথ থেকেই ফিরে আসতে হয়েছে। ফিরতি ট্রেকারদের আমরা প্রায় সবাইকেই একই প্রশ্ন করছিলাম— “ওপরের আবহাওয়া কেমন?” উত্তরও প্রায় এক—আবহাওয়া খুব খারাপ, তাঁরা প্রায় কিছুই দেখতে পাননি। কথাগুলো শুনে সামনের পথটা যেন আরও বাস্তব হয়ে উঠছিল। তবে সেই সঙ্গে আমাদের ভেতরের আগ্রহও কমছিল না। বরং মনে হচ্ছিল, আবহাওয়া যদি আমাদের একটু সুযোগ দেয়, তাহলে যতটা সম্ভব সামনে এগোতেই হবে। কিছুদূর যাওয়ার পর পড়ল আমাদের ট্রেকের প্রথম সাসপেনশন ব্রিজ—রথাং চু নদীর উপর। ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে নিচে তাকাতেই চোখ আটকে গেল। অনেক নীচে খরস্রোতা পাহাড়ি নদী প্রবল বেগে ছুটে চলেছে। কোথাও পাথরে আছড়ে পড়ছে, কোথাও সাদা ফেনা তুলে এগিয়ে যাচ্ছে। সেই শব্দ, সেই গতি, আর তার ওপর দুলতে থাকা সাসপেনশন ব্রিজ—প্রথম দিনের ট্রেকেই রোমাঞ্চটা যেন আরও বেড়ে গেল।

    আমরা সাতজন একসঙ্গে ট্রেক শুরু করলেও মেজদার হাঁটার গতি ছিল একেবারেই আলাদা। প্রথম দশ মিনিটের পরই আর ওকে চোখে পড়ল না। ও খুব ভালো ট্রেক করতে পারে, তাই শুরু থেকেই সবার আগে এগিয়ে গেল। অন্যদিকে পল্লবীর ক্ষেত্রে বিষয়টা ছিল একটু আলাদা। ওর কোমরের সমস্যা থাকায় এই ট্রেকে আসতেই প্রথমে চাইছিল না। ও জানত, গোয়েচা লা মোটেই সহজ ট্রেক নয়। শেষ পর্যন্ত অনেক বুঝিয়ে আমি ওকে রাজি করিয়েছিলাম। আমি তখন ওকে একটা কথাই বলেছিলাম— “আমরা তাড়াহুড়ো করব না। চার ঘণ্টার রাস্তা যদি আট ঘণ্টায়ও যেতে হয়, যাব। কিন্তু নিজেদের গতিতে হাঁটব, আর যতটা সম্ভব ট্রেকটা শেষ করার চেষ্টা করব।” সেই কথাটাই মাথায় রেখে আমরা হাঁটছিলাম। স্বাভাবিকভাবেই আমি আর পল্লবী দলের একেবারে শেষে পড়ে গেলাম। তবে রাজু আর শুভ আমাদের সঙ্গ দিল। সামনে যারা দ্রুত হাঁটতে পারে, তারা নিজেদের ছন্দে এগিয়ে যাচ্ছিল। আর আমরা চারজন ধীরে ধীরে, নিজেদের মতো করে পথটা উপভোগ করতে করতে এগোচ্ছিলাম। সেদিনই যেন একটা কথা বুঝে গিয়েছিলাম—পাহাড়ে সবার গতি এক হয় না। কেউ দ্রুত যায়, কেউ ধীরে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে জরুরি হল নিজের শরীর, নিজের ছন্দ আর নিজের সাহসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলা।

    চারপাশের প্রকৃতি তখন ক্রমশ আরও সুন্দর হয়ে উঠছে। গভীর জঙ্গলের ভিতর দিয়ে বাঁশের লাঠি ঠুকে ঠুকে হাঁটার মধ্যে আলাদা এক আনন্দ আছে। আমরা চারজন—আমি, পল্লবী, শুভ আর রাজু নিজেদের গতিতে বেশ মজা করেই এগোচ্ছিলাম। প্রথম সাসপেনশন ব্রিজটা পার হওয়ার কিছু পরেই আবার একটি তোরণ চোখে পড়ল। সেটি যেন আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের স্বাগত জানাচ্ছিল কাঞ্চনজঙ্ঘা ন্যাশনাল পার্ক (KNP)-এর আরও গভীরে। তোরণের গায়ে ইউনেস্কোর স্বীকৃতির কথাও লেখা ছিল। ২০১৬ সালে এই ন্যাশনাল পার্ক ইউনেস্কোর Mixed World Heritage Site হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

    সেখানে একজন ফরেস্ট অফিসার আমাদের গাইড সঞ্চামানের সঙ্গে স্থানীয় ভাষায় কিছুক্ষণ কথা বললেন। পরে সঞ্চামান আমাদের বুঝিয়ে বলল— জঙ্গলের কোনো গাছ বা গাছের অংশের ক্ষতি করা যাবে না, এখান থেকে কোনো পাথর বা প্রাকৃতিক জিনিস সঙ্গে নিয়ে যাওয়াও নিষেধ। নিয়ম ভাঙলে জরিমানা তো আছেই, এমনকি জেলও হতে পারে। কথাগুলো শুনে আরও একবার মনে হল, আমরা শুধু একটা ট্রেকিং রুট দিয়ে হাঁটছি না; আমরা এমন এক সংরক্ষিত অঞ্চলের ভিতর দিয়ে চলেছি, যার প্রতিটি গাছ, পাথর, ফুল, শ্যাওলা—সবকিছুরই নিজস্ব গুরুত্ব আছে। তোরণ পেরোনোর পর থেকেই রাস্তা আরও খাড়া হতে শুরু করল। এবার হাঁটতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল। শুভ আর রাজু কিছুটা এগিয়ে যাচ্ছে, আবার আমাদের জন্য দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। তারপর আমরা পৌঁছলে আবার সবাই মিলে কিছুটা পথ এগোচ্ছি। এইভাবেই আমাদের চারজনের একটা নিজস্ব হাঁটার ছন্দ তৈরি হয়ে গেল। পথের একটা জিনিস বারবার চোখে পড়ছিল। জঙ্গলের মাটিতে গোলাকার এক ধরনের ফল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। সঞ্চামানের কাছে জানতে চাইলাম, এগুলো কী? ও জানাল, এগুলো বাজারাট গাছের ফল। স্থানীয় মানুষ নাকি ফলটা সুপারির মতো মুখে রেখে খান। কৌতূহলবশত স্বাদ নিয়ে দেখলাম—স্বাদটা বেশ কষাটে ধরনের। এরপর থেকেই বাজারাট গাছগুলোর দিকে আরও ভালো করে নজর দিতে শুরু করলাম। একেকটা গাছ যেমন লম্বা, তেমনই মোটা। বহু পুরোনো গাছ বলে মনে হচ্ছিল। প্রায় প্রতিটি গাছের গা জুড়ে মোটা ও পুরু স্তরে লাইকেন জড়িয়ে আছে। কোথাও গাছের গায়ে, কোথাও ডালের ফাঁকে বিভিন্ন প্রজাতির অর্কিডও চোখে পড়ছিল।

    জঙ্গলটাকে শুধু সবুজ বললে যেন ঠিক বোঝানো যায় না। সেখানে সবুজেরই কত রকম ছায়া—গাঢ় সবুজ, শ্যাওলার সবুজ, ভেজা পাতার সবুজ। তার মধ্যে অর্কিড, ছোট ছোট ফুল, লাইকেনে ঢাকা বিশাল গাছ—হাঁটতে হাঁটতে বারবার থেমে চারপাশ দেখতে ইচ্ছে করছিল। প্রায় তিন ঘণ্টা হাঁটার পর অবশেষে এক জায়গায় একটু বসার সুযোগ পেলাম। এতক্ষণে খিদেটাও বেশ অনুভব হচ্ছিল। সঙ্গে করে কিছু শুকনো খাবার নিয়ে এসেছিলাম। সেগুলো বের করে সবাই মিলে খেয়ে নিলাম। পাহাড়ি পথে কয়েক ঘণ্টা হাঁটার পর সেই সামান্য শুকনো খাবারও তখন দারুণ তৃপ্তির মনে হচ্ছিল। কিছুটা বিশ্রাম হল, খিদেটাও মিটল। তারপর আবার বাঁশের লাঠিটা হাতে তুলে নিলাম। সামনে তখনও অনেকটা পথ বাকি।


    পথ যত এগোচ্ছিল, ততই তার স্বভাব বদলে যাচ্ছিল। কোথাও কোথাও রাস্তা এতটাই সরু হয়ে এল যে ঠিক রাস্তা বলেই মনে হয় না—দুই-একটা গাছের ডাল বা শিকড়ের উপর পা রেখে সাবধানে পার হতে হচ্ছিল। একদিকে খাড়া পাহাড়, অন্যদিকে গভীর খাদ। পা রাখার আগে বারবার দেখে নিতে হচ্ছে কোথায় ভর দেওয়া নিরাপদ। আমি বারবার পল্লবীকে বলছিলাম, “আস্তে, সাবধানে পা ফেলো।” এভাবে হাঁটতে হাঁটতে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা কেটে গেছে। আমরা তখন কাঞ্চনজঙ্ঘা ন্যাশনাল পার্ক (KNP)-এর অনেকটা গভীরে। চারপাশের জঙ্গল আরও ঘন, আর তার মধ্যেই ধীরে ধীরে আকাশের চেহারা বদলাতে শুরু করল। মেঘ জমছে। আমাদের সবারই প্রথম ভাবনা—আবার বৃষ্টি! কিছুক্ষণ আগেও গাছের ফাঁক দিয়ে দূরের পাহাড় দেখা যাচ্ছিল, ঝরনাগুলোও চোখে পড়ছিল। এবার মেঘ নামতে শুরু করতেই একে একে সব আড়াল হয়ে গেল। দূরের পাহাড় নেই, ঝরনা নেই— চারপাশ যেন ধীরে ধীরে ধূসর হয়ে আসছে। মনটাও একটু খারাপ হতে শুরু করল। গত কয়েক দিনের বৃষ্টি নিয়ে এত দুশ্চিন্তার পর সকালে পরিষ্কার আকাশ দেখে আমরা যে আনন্দ নিয়ে ট্রেক শুরু করেছিলাম, সেই আশার মধ্যে আবার যেন অনিশ্চয়তা ঢুকে পড়ল। শরীরও তখন ক্লান্ত হয়ে আসছে। সঞ্চামানকে জিজ্ঞেস করলাম, “আর কত দূর?” ও বলল, “আর ঘণ্টাখানেক।” ক্লান্ত শরীরে সেই এক ঘণ্টা তখন বেশ লম্বাই মনে হচ্ছিল।

    আমরা আবার হাঁটতে থাকলাম। একসময় মনে হচ্ছিল, শরীর আর এগোতে চাইছে না। পা ভারী হয়ে এসেছে। ঠিক তখনই ঝিরঝির করে বৃষ্টিও নামল। বড় বৃষ্টি নয়, কিন্তু ভেজা জঙ্গলের মধ্যে সেই হালকা বৃষ্টিতে পথটা যেন আরও ধীর হয়ে গেল। আমরা মাথা নিচু করে হাঁটছি। হঠাৎ সঞ্চামান আমাদের দিকে ফিরে হাসল। তারপর বলল, “চলে এসেছি। আজকের গন্তব্য এটাই।” সামনে তাকিয়ে দেখি জঙ্গলের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে সাচেনের ট্রেকার্স হাট। ঘড়িতে তখন দুপুর তিনটে। সকাল ন’টায় ইউকসাম থেকে যে পথচলা শুরু করেছিলাম, প্রায় ছয় ঘণ্টা পর অবশেষে আমরা পৌঁছে গেলাম সাচেনে।

    সাচেনে পৌঁছে ট্রেকার্স হাটটা চোখে পড়তেই মনটা খুশিতে ভরে গেল। এতক্ষণ ধরে খাড়া পথ, জঙ্গল, মেঘ আর ক্লান্তির পর অবশেষে প্রথম দিনের গন্তব্যে এসে পৌঁছেছি—এই অনুভূতিটাই তখন সবচেয়ে বড়। গিয়ে দেখি মেজদা, শোভন আর সূর্য অনেক আগেই পৌঁছে গেছে। আমরা চারজন— আমি, পল্লবী, শুভ আর রাজু—সবার শেষে এসে কাঠের বেড়া আর অ্যাসবেস্টসের ছাউনি দেওয়া একটি শেডের নীচে গিয়ে বসতেই আমাদের পোর্টার দিলাই রাই মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে গরম গরম চা এগিয়ে দিলেন। সেই চায়ের স্বাদ আজও আলাদা করে মনে আছে। ভেজা শরীর, ক্লান্ত পা, দীর্ঘ হাঁটার পর হাতে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা—মনে হল, নিমেষেই সমস্ত ক্লান্তি কোথায় যেন উড়ে গেল। পাহাড়ে খুব সাধারণ জিনিসও কখনও কখনও কত বড় আনন্দ হয়ে ওঠে, সেদিন প্রথম বুঝতে শুরু করেছিলাম।


    আমাদের কুক সানচাং জানাল, থাকার জায়গা এখান থেকে আরও কিছুটা উপরে। কিছুক্ষণ পরই আবার গরম গরম স্যুপি নুডলস আর চাওমিন এসে গেল। এতটা পথ হাঁটার পর সেই খাবারও তখন যেন বিশেষ কিছু। খাওয়া শেষ করে ব্যাগপত্র তাবুতে রেখে একটু ফ্রেশ হলাম। তারপর ক্লান্তি সত্ত্বেও আশপাশের জঙ্গলটা একটু ঘুরে দেখতে বেরোলাম। দিনের আলো তখন ধীরে ধীরে কমে আসছে। চারদিকে ঘন অরণ্য, ভেজা গাছপালা আর পাহাড়ি বিকেলের একটা আলাদা নীরবতা। আমার কাছে আর-একটা বিষয়ও সম্পূর্ণ নতুন ছিল—আমি এর আগে কখনও তাঁবুতে রাত কাটাইনি। রাতে থাকতে হবে স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে। শরীরটাকে ব্যাগের ভিতরে ঢুকিয়ে চেনটা টেনে দিলেই নিজের ছোট্ট উষ্ণ জগৎ তৈরি। আমাদের সাতজনের জন্য মোট তিনটি তাবু ছিল। প্রথমবার সেই তাবুর সামনে দাঁড়িয়ে বেশ একটা উত্তেজনাই হচ্ছিল—আজকের রাতটা একেবারে অন্যরকম হতে চলেছে। বিকেল প্রায় চারটের দিকে হঠাৎ চারপাশ অন্ধকার হয়ে এল। তারপর নামল বৃষ্টি। অঝোর বৃষ্টি। গহীন জঙ্গলের মধ্যে ছোট্ট একটা তাবু, বাইরে একটানা বৃষ্টি, আর তাবুর গায়ে টুপটাপ করে পড়ে চলেছে জলের ফোঁটা—আমার কাছে ব্যাপারটা মোটেই বিরক্তিকর লাগছিল না। বরং মনে হচ্ছিল, এত দূর এসেছি তো ঠিক এই অভিজ্ঞতাগুলোর জন্যই। এই না হলে অ্যাডভেঞ্চার!


    সারাদিনের হাঁটার ক্লান্তি এবার শরীরে ভালোভাবেই ধরা দিয়েছে। কখন যে চোখ বুজে আসছিল বুঝতে পারছিলাম না। সন্ধ্যা তখন সবে সাড়ে ছটা। ঠিক সেই সময় আমাদের সহায়ক পূর্ণা লিম্বু এসে ডাক দিল— “ডিনার রেডি।” একটা কথা আগেই বলে রাখা ভালো— ইউকসামের পর আর কোথাও বিদ্যুৎ ছিল না। দিনের ট্রেক শেষ করে তাই সন্ধ্যা নামার আগেই যতটা সম্ভব সব কাজ সেরে নিতে হত। সাধারণত সাতটার মধ্যেই রাতের খাবার খেয়ে নেওয়াই ছিল এখানে স্বাভাবিক নিয়ম। পূর্ণা লিম্বু এসে খেতে ডেকে গেলেন ঠিকই, কিন্তু বাইরে তখন এমন বৃষ্টি যে তাঁবু থেকে বেরোনোরই উপায় নেই। আমরা বললাম, আমাদের তাঁবুর কাছের ছোট হাটটাতেই যদি খাবার দিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে ভালো হয়। ওঁরা সেই অঝোর বৃষ্টির মধ্যেই রান্না করে একের পর এক খাবার এনে দিলেন। সঙ্গে দিলেন তিনটি মোমবাতি। তারপর শুরু হল সেই রাতের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। গভীর জঙ্গল। চারদিকে ঘন অন্ধকার। বাইরে একটানা বৃষ্টি পড়ছে। দূরে কোথাও অদ্ভুত সব পোকামাকড়ের ডাক শোনা যাচ্ছে। আর আমরা কয়েকজন একটি ছোট হাটের ভিতর মোমবাতির আলোয় বসে রাতের খাবার খাচ্ছি। সেই মুহূর্তটাকে ঠিক ভাষায় বোঝানো কঠিন।

    মোমবাতির ক্ষীণ আলোয় একে অপরের মুখ দেখা যাচ্ছে, বাইরে জঙ্গলের শব্দ, বৃষ্টির টুপটাপ, আর চারদিকে এমন অন্ধকার যে মনে হচ্ছে পৃথিবীতে যেন আমরা ছাড়া আর কেউ নেই। শহরের আলো, শব্দ, ব্যস্ততা—সব যেন বহু দূরে পড়ে আছে। সেদিন বুঝেছিলাম, অ্যাডভেঞ্চারের আনন্দ সবসময় বড় কোনো দৃশ্যের মধ্যে থাকে না। কখনও কখনও একটা মোমবাতি, একটু গরম খাবার আর গহীন জঙ্গলের রাতই সারাজীবনের স্মৃতি হয়ে যায়। খাওয়া শেষ করে আমরা আবার নিজেদের তাবুতে ফিরে এলাম। হেডলাইট জ্বেলে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র একটু গুছিয়ে নিলাম। তারপর স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। সারাদিনের ক্লান্তিতে খুব বেশি সময় লাগল না ঘুম আসতে। রাত প্রায় একটা নাগাদ হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। মনে হল, পায়ের দিকটা কেমন যেন ভেজা ভেজা। হেডলাইট জ্বেলে দেখি, বৃষ্টির জল তাবুর ভিতরে ঢুকে পড়েছে। ওদিকে রাজু আর শুভর তাবুতেও একই অবস্থা। ওরা ব্যাগ থেকে পঞ্চো আর রেনকোট বের করে স্লিপিং ম্যাটের উপর পেতে কোনো রকমে শুকনো জায়গা তৈরি করল। সেইভাবেই রাতটা কাটানোর ব্যবস্থা হল।

    এইসবের মধ্যেও মেজদা বেশ নিশ্চিন্ত গলায় বলল, “এত বৃষ্টি হচ্ছে যখন, দেখিস কাল ভোরে আবহাওয়া ভালো হয়ে যাবে।” কথাটা শুনে তখন খুব একটা যুক্তি খুঁজিনি। কিন্তু আশ্চর্যভাবে ওর কথাই সত্যি হল। ভোর প্রায় তিনটার দিকে বৃষ্টি থেমে গেল। সাড়ে চারটার দিকে আমার ঘুম ভাঙল। তাঁবু থেকে বাইরে বেরিয়ে দেখি, এখনও পুরো আলো ফোটেনি। চারদিকে হালকা অন্ধকার। মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকাতেই থমকে গেলাম। এক আকাশ তারা। গত রাতের অঝোর বৃষ্টির যেন কোনো চিহ্নই নেই। কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করল। আর সাচেনের জঙ্গলে আমাদের দ্বিতীয় দিনের সকাল শুরু হল একেবারে অন্যরকম আকাশ নিয়ে।



    অলংকরণ (Artwork) : ছবিঃ লেখক
  • পর্ব ১
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  •   (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments