• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৪ | অক্টোবর ২০২৬ | ভ্রমণকাহিনি, প্রকৃতি, বাকিসব
    Share  
  • তিন বাঁক থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা (৩) : রাহুল মজুমদার
    পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩


    চা-বাগানে ঘেরা গুমবাদাঁড়া

    সকাল ৬টার সুপারস্টারের ঝকমকে রূপও বুড়োবুড়ির বুকে ততটা খুশির তুফান তুলল না; আজ মারিয়াকে বিদায় জানানোর পালা। আজ বুড়োবুড়ি যাবে পেশকের গুমবাদাঁড়ায়। সে-ও নিশ্চয়ই খুব সুন্দর, কিন্তু এই আপন করা আতিথেয়তা কি সেখানে মিলবে?

    রোদ মেখে ব্রেকফাস্ট খাওয়ার আনন্দেও একটুখানি মন খারাপের ছায়া। কিন্তু সব ভালোই একসময় শেষ হয়। ১০টার সময় এলো সেই সময়। খাদা পরিয়ে বিদায় জানাল দু দিনের আত্মীয়রা। মারিয়া পর্ব শেষ হলো। দশ মিনিটে রিশপ প্রবেশ, আরও আড়াই মিনিটে রিশপ ত্যাগ। পাক খেতে খেতে পথ চলেছে নেমে। যতক্ষণ পারল সুপারস্টার সঙ্গ দিয়ে গেল। শান্ত গ্রামের থেকে কোলাহলে আর ট্র্যাফিক জ্যামে ভরা কালিম্পং অবধি। পথের দ্রুত অবনমনের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া সুপারস্টারের পক্ষেও সম্ভব হলো না।


    সোয়া বারোটায় অচঞ্চল ম্রিয়মান তিস্তাকে পার করে পেশক রোডের চড়াই ধরল রথ। এতক্ষণের চা-হীন অবস্থায় থাকার শাস্তি থেকে মুক্তি মিলল লোয়ার পেশক পার করে, ঘড়ির একটা দশে এক চায়ের দোকানে। অর্ধচন্দ্রাকারে তিন দোকানের সামনে অনেকখানি খোলা জায়গা মনে খুশির লহর বইয়ে দিল বুড়োবুড়ির, আর চা এবং টা খুশির ফুল ফোটাল পেটে। সেই আনন্দে চা-পানান্তে বুড়োবুড়ি রথারোহণ করল, আর পৌনে দুটো বাজার সুযোগ না দিয়েই রথ ওদের পৌঁছে দিল গুমবাদাঁড়ার হুইসপারিং মাউন্টেনস রিসর্টের আঙিনায়। রিসর্টের ঘর বাড়ানোর কাজ চলছে বলে ঢোকার মুখে খানিক আলগা মাটির জমিদারি। তার সঙ্গে কোস্তাকুস্তির মহড়া দিয়ে ছোট্ট লনসমেত চমৎকার ঘরে ঢুকতে বুড়োবুড়ির টুকুস বেশি সময় লাগল বটে, তবে ঘর দেখে ওই দেরিটুকু উসুল হয়ে অনেকটা ভালোলাগা উপচে পড়ল। সামনের দিকের দেয়ালটা আগাপাশতলা কাচের; তাই দরজা না খুলেই আকাশে সুপারস্টারের সানব্রাইট শো দেখতে কোনও অসুবিধেই হলো না বুড়োবুড়ির। যেমন চমৎকার রিসর্ট, তেমনই তাদের আন্তরিক পরিষেবা। বুড়োবুড়ির দিল খুশ হয়ে গেল। সামনে ধাপে ধাপে চা বাগান নেমে গিয়েছে নদীর দিকে। সেই সবুজ ঢালের কার্পেটের বুকে কালো রাস্তার বারে বারে বাঁক খাওয়া ফিতের ধারে ধারে কিছু রঙীন ফুলের মতো বাড়ি। দিনভর সুপারস্টারের ঝকমকে উপস্থিতিতে সাক্ষী রেখে লাঞ্চ করল বুড়োবুড়ি। সারাদিন সুপারস্টারের ইমেজ ঝকঝকে রাখার দায়িত্ব পালন করে সন্ধ্যের সময় তাকে প্রথমে লাল তারপর ছাই রংয়ের জামা পরিয়ে সূর্য এদিনের মতো বিদায় নিলেন। সুযোগ পেয়ে শনশনে কনকনে হাওয়া দখল নিয়ে নিল চারপাশের। তার দাপটে তাপমাত্রা পাঁচে নেমে বসল ঘরের বাইরে। রাত আটটায় ডিনার সেরে বুড়োবুড়ি সোজা লেপল্যান্ডে। আকাশে হিমমাখা চাঁদ ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রইল।

    ভোর, মানে প্রায় সকালে ৬টায় বুড়োর ঘুম লেপ ছেড়ে পালাল; তাই বুড়োকেও গরম বিছানা ছাড়তে হলো। ঘুম সরে বসতেই বুড়োর মন জুড়ে বসল সুপারস্টার। সামনের দেয়ালের পর্দা সরাতেই আকাশ জুড়ে সুপারস্টার হাতছানি দিয়ে ডাক দিল — আমিও উঠে পড়েছি, এবার আলো দিয়ে মুখ ধোব। সেই ডাক শুনে বুড়ো মুখ না ধুয়েই দরজা খুলে বাইরে। কিন্তু ও ভাবতেই পারেনি বাইরে ওকে জড়িয়ে ধরবে বলে অপেক্ষা করছে ৩ ডিগ্রির ঠান্ডা। বাপস্ বলে ভিতরে ঢুকে গরম জ্যাকেটখানা চাপিয়ে জাম্বুবান সেজে মোবাইল বাগিয়ে আবার বাইরে। সামনের আকাশের দেয়ালে সুপারস্টার থেকে ডানদিকে দূরে সুন্দর সিনিওল চু-র ছবি টাঙানো। সুয্যিঠাকুর খুব যত্নে ওদের সাদা রঙের ওপর সোনালী রং বোলাতে লাগলেন। রংটা পুরোপুরি লালচে সোনালী হতেই ৩ ডিগ্রি নিজেকে ৫ ডিগ্রিতে পালটে নিল। বুড়ো ঘরে ঢুকে পর্দা সরিয়ে বুড়িকে ডেকে তুলে ইলেকট্রিক কেটলে চায়ের জল বসিয়ে দিল। চায়ে চুমুক দিতে দিতে সুপারস্টারের সুপার শো দেখা — আহাহা।


    অসাধারণ অবস্থান এই রিসর্টের। সবুজ পাহাড়ের ঢালে ধাপে ধাপে নেমে আসা চা বাগানের কার্পেটের মাঝে বসে থাকা রিসর্টের সামনের দিকের কাচের দেওয়ালে দিনভর মুখ দেখে সুপারস্টার। আহ্, এখানে যদি আরও একটা দিন কাটাতে পারত বুড়োবুড়ি। কিন্তু হায়, এখানকার জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্তর একটাই দিন। আজই গুমবাদাঁড়া ছেড়ে চলে যেতে হবে এবারের সফরের শেষ গন্তব্য তাকভর চা বাগানের এক হোম স্টে-তে। মন খারাপ নিয়েই ব্রেকফাস্টের টেবিলে বসল বুড়োবুড়ি।


    অলংকরণ (Artwork) : স্কেচঃ লেখক
  • পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  •   (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments