




কেউ ছিল
ঘুম ভাঙার পরে কিছুক্ষণ চোখ বুজে চুপ করে শুয়ে রইল অনির্বাণ। গত ছয় মাসে ঘুম থেকে ওঠার প্রতিটি সকাল তার কাছে একটু বেশি অপরিচিত লাগে। বিছানা ছেড়ে পাশের খোলা জানালার সামনে দাঁড়িয়ে ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ শুরু করতে যাবে, ঠিক তখনই পেছনে--”খস খস”। থেমে গেল সে। শব্দটা বিছানা থেকে এসেছে। ধীরে ধীরে ঘুরল।
ছেড়ে আসা বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখল তার গায়ে দেবার চাদরটা নিজের থেকেই একটু একটু করে পাশে সরে যাচ্ছে। বিছানায় পাতা বেডশিটটা কুঁচকে গেছে।
নিজে ঘুম থেকে ওঠার সময় সে সবসময় খেয়াল করে যেন চাদর ইত্যাদি পরিপাটি থাকে। আজও তাই ছিল। তাহলে তার বিছানা ছাড়ার কয়েক মুহূর্ত পরে বেডশিটটা নিজের থেকেই কিভাবে কুঁচকে গেল আর গায়ে দেবার চাদরটাই বা খানিকটা সরে গেল কী করে?
যেন এই মুহূর্তে একজন কেউ ঠিক তার শোওয়ার জায়গা থেকে উঠে বসেছে। অসম্ভব। তা কী করে হবে? সে নিজেই তো একটু আগে ওখান থেকে উঠে বিছানা ছাড়ল।
অনির্বাণ তাকিয়ে রইল।
কেউ নেই।
তবু চাদরটা যেন আরও একটু সরে গেল। বেডশিট কুঁচকে খাটের পাশে অনেকটা ঝুলে পড়ল। কেউ যেন বিছানা ছাড়ল।
অনির্বাণের বুকের ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে গেল।
কাল রাতে ভালো ঘুম হয়নি। এটা কি হ্যালুসিনেসন? সকালে উঠেই এইরকম একটা দৃশ্য, যেটাকে মনের ভুল হিসেবে গণ্য করতে বেশ অসুবিধা হচ্ছিল।
রিয়া অনেক আগেই বিছানা ছেড়েছে। এখন বোধহয় মর্নিংওয়াকে গেছে।
হঠাৎ একটা গন্ধ। ঠিক কী গন্ধ বলতে পারবে না। পোড়া রবারের মতো। অথবা ভেজা মাটির। অথবা — কিছু না। শুধু একটা অনুভূতি যে এই গন্ধ সে আগে পেয়েছে।
মনে পড়ল--কবে যেন রিয়াকে একটা কথা বলবে বলেছিল। সেই কথাটা আর বলা হয়নি।
মোবাইলে একটা ম্যাসেজ ঢুকল। তার অ্যাসিস্ট্যান্ট ডক্টর সেন একটা সংক্ষিপ্ত রিমাইন্ডার পাঠিয়েছে--আজ তিনটি অপারেশন আছে। সেই ব্যাপারে। অপারেশনগুলো কমপ্লিকেটেড কিছু নয়, তবে তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে। মাঝে একবার নিজের ক্লিনিকেও যেতে হবে।
একটা বিরাট খটকা মনের মধ্যে নিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেল অনির্বাণ।
আঁচিলটা ছোঁবে না
অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে এসে রোগীর আত্মীয়ের সাথে কথা বলে ওয়াশরুমে ঢুকে আয়নার সামনে দাঁড়াল ডক্টর অনির্বাণ ব্যানার্জি। অনেকদিন নিজের দিকে তাকানো হয়নি। বেশ অবিন্যস্ত লাগছে নিজেকে। তার ফিটফাট চেহারায় চোখের নিচের কালিটা বেশ বেমানান। এত ব্যস্ততা সত্যিই গোছানো লোককেও বেশ অগোছালো করে তোলে।
নিজের কপালের পাশে আঁচিলটাকে অভ্যাসবশে আঙুল দিয়ে স্পর্শ করল সে। রিয়া এক সময় বলতো এটাই নাকি তার বিউটি সিক্রেট। অসীম মমতায় আঙ্গুল বুলিয়ে দেখল--কোন অনুভূতি নেই। এটাই স্বাভাবিক। আঙুলেই অনুভূতিটা আসে। সেভাবেই স্পর্শের অনুভূতি পেল সে।
হঠাৎ আয়নায় লক্ষ করল, সে আঁচিল স্পর্শ করলেও আয়নায় তার প্রতিবিম্ব আঁচিল স্পর্শ করছে না। সেখানে তার আঙুল বুকের কাছে রুমালে স্থির। এটা কী করে হয়? তার আঙ্গুল আঁচিলের উপর ঘুরে বেড়াচ্ছে অথচ তার প্রতিবিম্ব তা করছে না। আঁচিলের বদলে কান স্পর্শ করল। এবারে প্রতিবিম্ব আবার তাকে অনুকরণ করছে। কিন্তু যতবার সে আঁচিল স্পর্শ করছে প্রতিবিম্বের আঙ্গুল অন্য জায়গায় স্থির হয়ে যাচ্ছে। যেন ও কিছুতেই আঁচিলটাকে ছোঁবে না ।
চিন্তিত মনে ওয়াশরুম থেকে বের হবার সময় হঠাৎ মনে পড়ল--অপারেশনের পর তার অ্যাসিস্ট্যান্ট ডা. সেন বলছিল--
“স্যার, আপনার কি ঠান্ডা লেগেছে? গলার আওয়াজটা বেশ অন্যরকম লাগছে? ভাঙ্গা ভাঙ্গা।”
কিন্তু তার তো ঠান্ডা লাগেনি। গলার আওয়াজেও বদল আসেনি।
চেয়ার খালি
পায়ের কাছে পোষা বিড়ালের মতো শুয়ে থাকা রোদটা আস্তে আস্তে কোলের উপর উঠে এসেছে। লনের চেয়ারে বেশ আরাম। জঙ্গলের ভেতর থেকে একটা পাখির ডাক আসছে। কিন্তু পাখিটা দেখা যাচ্ছে না। অনির্বাণ সেদিকে তাকাল। খোঁজার চেষ্টা করল পাখিটাকে। বাতাস বইছে না।
মনে হল জঙ্গলটা যেন একটু থেমে গিয়ে দেখছে তাকে।
চারদিকে জঙ্গলের মাঝে এই গেস্ট হাউজের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল তারই এক পেশেন্ট। ডাক্তারদের এই এক সুবিধা। পেশেন্টরাই মাঝে মাঝে সব ব্যবস্থা করে দেয়। যদিও আর্থিক সুবিধা ও নেয় না।
অনেকদিন পরে দুদিনের কর্মবিরতি নিয়ে অনির্বাণ এই জঙ্গলে এসেছে। নানারকম মানসিক ও শারীরিক চাপের থেকে অব্যাহতি পেতে এই অবসরগুলো খুব কাজের। রিয়া আসেনি। অনেকগুলো কাজ এসে গেছে তার। কাজেই অনির্বাণ একা।
মাঝে মাঝে সে ভাবে এইরকম যৌথ জীবনযাপনের অর্থ কী? দুজনেই এত ব্যস্ত যে নিজেদের দেওয়ার মতো সময় কারো কাছে নেই। হয়ত আজকাল এটাই স্বাভাবিক।
বছর সাতেক তারা বিবাহিত, কিন্তু আজ পর্যন্ত নতুন কোন সদস্য আসেনি তাদের সংসারে। কারণ কারো কাছে সময় নেই। এক অদ্ভুত জীবন। মেনে নিয়েছে অনির্বাণ।
তবে যখন জীবনের চাপ অসহ্য হয়ে ওঠে, তখন সে পালিয়ে আসে কোন নির্জনতায়।
রোদের তাপ বাড়াতে লন থেকে উঠে গেস্ট হাউসের বারান্দায় এসে বসে একটা সিগারেট ধরালো সে।
“আরে স্যার আপনি এখানে বসে? তবে লন-এর চেয়ারে কে বসে আছে? এইমাত্র দেখলাম।” মালী উত্তেজিত।
“মানে? কী বলছ?”
“হ্যাঁ ডাক্তারবাবু। ভেবেছিলাম আপনি উঠলে ওখানকার ঘাসে মেশিন চালাবো। কিন্তু দূর থেকে দেখলাম আপনি বসে সিগারেট খাচ্ছেন।”
“আমাকে দেখেছিলে, ঠিক?”
“না মানে দেখলাম আপনার ছায়া পড়েছে, সিগারেট খাওয়ার ছায়া।”
“আমি তো এইমাত্র সিগারেট ধরালাম। আর এখানে বসে আছি বেশ খানিকক্ষণ হলো। তবে কোথায় আমার ছায়া দেখলে দেখাও তো।”
তারা দুজন লনে গিয়ে খালি চেয়ার ছাড়া আর কিছু দেখতে পেল না।
“তবে কী দেখলাম আমি? বোধহয় আমারই চোখের ভুল,” মালী লজ্জিত হল।
অনির্বাণের বুকের ভেতরটা শক্ত হয়ে গেল। সে জানে মালি ভুল দেখেনি। কী যে হচ্ছে?
সেদিন অপারেশনের পরে তার প্রতিবিম্ব তাকে অনুকরণ করেনি। এবারে কি ছায়াও বিদ্রোহ ঘোষণা করল? নিজের পাশের ছায়ার দিকে তাকিয়ে রইল অনির্বাণ।
সে লন থেকে চলে আসার পরেও তার ছায়া তার সাথে ফেরেনি কিন্তু তার করা কাজটা ছায়া করছিল। সিগারেট খাওয়া। সে দ্রুত পেছনে তাকাল। জঙ্গল নিস্তব্ধ। সে অনুভব করল — এই মুহূর্তে জঙ্গলে একটা জিনিস তার চেয়ে বেশি উপস্থিত। তার ছায়া।
হঠাৎ একটা এম্বুলেন্সের সাদা ছাদ আর হুটারের আওয়াজ তার স্মৃতিতে ভসে উঠেই মিলিয়ে গেল। ইদানীং মাঝে মাঝে হচ্ছে এরকম।
আজ একটা পাহাড় আবিষ্কার করার কথা। তাড়াতাড়ি ব্রেকফাস্ট করতে হবে। মনে প্রশ্ন এল, তার ছায়া কি পাহাড়ে যাবে তার সাথে?
পাহাড়টা কি তাকে চিনবে? নাকি তার ছায়াকে?
ছায়ার ভেতরে
“দাদাবাবু আমি একবার দেশে যাবো পরের মাসে। নাতিটা হাঁটতে শিখেছে, একবার দেখে আসবো। তোমার অসুখের জন্য অন্নপ্রাশনে যাওয়া হয়নি।”
কোন উত্তর এল না।
“দাদাবাবু শুনছ কি?” এবারও উত্তর নেই।
এইমাত্র তো দেখল দাদাবাবুকে। তবে কি ভুল দেখল মধু? একটু পিছিয়ে আবার আয়নার দিকে তাকাল। আয়নায় দাদাবাবুর প্রতিবিম্ব এখনও তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। কিন্তু দাদাবাবু কোথায়? আয়নায় কিভাবে দেখতে পাচ্ছে তাকে? মধু পাশের বারান্দায় গিয়ে দেখল। সেখানে এখনও সিগারেটের গন্ধ রয়েছে। তার মানে দাদাবাবু এখান দিয়ে এইমাত্র গেছে। আবার ঘরে গিয়ে আয়না দেখল মধু।
কারো ছবি নেই সেখানে।
ভীষণ অবাক হল। তবে কি ভুল দেখল সে? তাই-ই হবে বোধ হয়।
খটকাটা রয়েই গেল। আয়নায় ছায়াটা কার?
মধু পুরনো মানুষ। অনির্বাণের বাবার সময় থেকেই আছে। অনির্বাণকে ছোটবেলা থেকে দেখভাল করছে। ও জানে দাদাবাবু আর বউদিমনি দুজনেই ব্যস্ত। কারো সময় নেই। কে জানে কেন দাদাবাবুর জন্য কষ্ট হয় তার। এই কিছুদিন আগেই একটা বড় বিপদ গেল মানুষটার। গাড়ি দুর্ঘটনা। ডাক্তাররা বলেছিল কয়েক মিনিটের জন্য হৃদযন্ত্র নাকি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এরপর ভালো করে বিশ্রামও পায়নি মানুষটা, আবার রোগী দেখা শুরু করে দিয়েছে।
আয়নার ব্যাপারটা অদ্ভুত লাগল তার। দাদাবাবু ঘরের মধ্যে যখন ছিল তখন না হয় তাকে আয়নাতে দেখা যেতে পারে, কিন্তু ঘর থেকে চলে যাবার পরেও কী করে আয়নায় তার ছবি ভেসে থাকবে?
কয়েকদিনে ব্যাপারটা মধু প্রায় ভুলেই গিয়েছিল, তখনই আবার একদিন এরকম ঘটল। দেখল সকালে দাদাবাবু বারান্দার সোফা থেকে চলে যাবার পর বেশ কিছুটা সময় অবধি তার ছায়াটা দেওয়ালে আটকে রইল। এবারে কিন্তু ভীষণ ভয় পেয়ে গেল মধু। ব্রেকফাস্ট টেবিলে অনির্বাণকে একা পেয়ে বলেই ফেলল, “দাদাবাবু কয়েকদিন ধরে তোমাকে অন্যমনস্ক লাগছে। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করছ না? এখনও তো খাবার পড়ে রইল দেখছি। কী হয়েছে বল তো?”
“আমি ঠিকই আছি মধুদা, তুমি চিন্তা করো না।”
অনির্বাণ বুঝল মধুদা নিশ্চয়ই কোথাও কোন অসংগতি দেখেছে।
মধুদা আর থাকতে না পেরে সরাসরি বলল, “দাদাবাবু তোমাকে আমাদের গ্রামের একটা পুরনো কথা বলি-- ছায়া যদি মানুষের চেয়ে বেশি সময় নেয়, বুঝবে মানুষটা অন্য কোথাও আছে। শরীরে পুরোপুরি ফেরেনি।”
“ফেরেনি মানে?”
“মানুষটা ছায়ার ভেতরে রয়ে গেছে কিছুটা।” এই অবস্থায় পুরো শক্তি পায় না মানুষটা।”
“কী যা তা বলছ মধুদা? তা আবার হয় নাকি?”
“হ্যাঁ গো। বিরাট অসুখবিসুখ থেকে উঠলে এই ব্যাপার হয়। তোমার মনটাও তো অন্য কোথাও থাকছে।”
“তুমি ভেবো না। আমার কিছু হয়নি।”
মধু তবু নিশ্চিন্ত হতে পারল না। রিয়াকে জানাল ব্যাপারটা। রিয়া বিশ্বাস করল কিনা বুঝল না।
স্থাণু
কিছুদিনের মধ্যে ব্যাপারটা নিয়ে অবসেসড হয়ে পড়ল অনির্বাণ। সে এখন নিজের প্রতিফলন এড়িয়ে চলতে শুরু করেছে—সব আয়না ঢেকে দেয়, রাতে আলো নিভিয়ে রাখে, যাতে ছায়া তৈরি না হয়। কিন্তু এতে সমস্যা আরও বাড়ে—অন্ধকারেও সে অনুভব করে কিছু একটা তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, অপেক্ষা করছে আলোর জন্য।
একদিন ভোরবেলা মর্নিংওয়াক সেরে রিয়াকে ঘুম থেকে তুলতে গিয়ে থমকে গেল অনির্বাণ। হালকা রোদ ঢুকেছে ঘরের মধ্যে। জানালার পাশে তাদের বিছানাতে উঠে এসেছে সে। পর্দাটা অনির্বাণ আগেই একটু সরিয়ে দিয়েছিল। সকালের রোদ তার খুব প্রিয়। একটা শুরুর ইঙ্গিত যেন লুকিয়ে থাকে সেই আলো আর তাপের মধ্যে। আজ আলোটা যেন একটু বেশি হলদেটে।
সেই আলোতেই অনির্বাণ দেখল একটা পাতলা ছায়া পাশ থেকে জড়িয়ে আছে রিয়াকে। এসি চলছে। হালকা হিমানী ঝরে পড়ছে ঘরটাতে। রিয়াও যেন হাত রেখেছে ছায়াটার শরীরে। যেন পারস্পরিক ওম শুষে নিচ্ছে দুটো শরীর।
স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে থাকল সে। ঘরে ঢুকল না।
কে আগে নড়ে
রবিবার সকালটা অনির্বাণ নিজের জন্য রাখে। ইমারজেন্সি ছাড়া রোগী দেখে না। বাড়িতে গ্রাউন্ড ফ্লোরে তার একটা রোগী দেখার চেম্বার আছে। গত দুই রবিবার সকালে সে একা সেই চেম্বারে আয়না ও আলো দিয়ে নিজের ছায়া পরীক্ষা করতে শুরু করেছে। কিন্তু পুরোটাই গোপনে।
আজকাল রবিবারের সকালের রোদ অন্যরকম মনে হয়। যেন কোন নতুন রহস্যের ইঙ্গিত দেয় তা।
চেম্বারের জানলা থেকে রোদ আসছে। পেছনের দেওয়ালে একটা গাঢ় অবয়ব।
মানুষের মতো।
কিন্তু মানুষ নয় ছায়া।
অনির্বাণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। অবয়বটাও স্থির।
ঘরে আর কেউ নেই। কার ছায়া? তার ছায়া তো ওখানে পড়ার কথা নয়। একটু যেন সরে গেছে সে।
সে ডান হাতটা সামান্য তুলল।
কিছুই হল না।
তারপর হাত নামিয়ে নিল।
কয়েক সেকেন্ড কেটে গেল।
হঠাৎ—
দেওয়ালে সেই কালো অবয়বটা ধীরে ধীরে হাত তুলল। ঠিক তাঁর মতো করে। অনির্বাণের হাত তখন শরীরের পাশে। সে জমে গেল।
অবয়বটাও থেমে গেল। ঘর নিস্তব্ধ। অনির্বাণ আরেকবার হাত তুলল। এবার অপেক্ষা করল।
এক...দুই...তিন...চার...
তারপর অবয়বটা নড়ল। ঠিক একইভাবে। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত দেরিতে।
অনির্বাণের চোখ ধীরে ধীরে জানালার দিকে গেল। সকালের আলোয় তার ছায়া মেঝেতে পড়ে আছে।
কিন্তু—
ছায়াটা তার পায়ের সঙ্গে নেই।
আরও ভয়ঙ্কর ব্যাপার—
ছায়াটা তখনও হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছে।
অনির্বাণ হাত নামিয়ে ফেলেছে অনেকক্ষণ।
ছায়াটা নামায়নি।
পরের রবিবার লক্ষ করল, প্রতিটি পরীক্ষায় ছায়ার বিলম্ব বাড়ছে। লক্ষ করল, মাঝে মাঝে ছায়াটি তার হাত নাড়ানোর আগেই নড়ে উঠছে — যেন এটা তাকে অনুকরণ করছে না, বরং নেতৃত্ব দিচ্ছে।
সে রাতে আর ঘুম এল না তার।
আয়নায় কেউ নেই
রিয়া কিছুদিন ধরে লক্ষ করে অনির্বাণের আচরণ বদলে যাচ্ছে—কিছু মুহূর্তে সে যেন চেনা মানুষের মতো নয়, কথার সুর অন্যরকম, পুরনো অভ্যাস ভুলে যাচ্ছে।
যেমন তার প্রিয় চা সে কীভাবে খেত--গরম চা সে খেতে পারত না। অনেকক্ষণ ধরে চা পান করার অভ্যাস ছিল তার।
কিন্তু আজকাল মুহূর্তে গরম চা শেষ হয়ে যাচ্ছে।
রিয়ার মনে সন্দেহ জাগে—এটা কি সেই ট্রমা, নাকি অন্য কিছু?
এক দুপুরে রিয়া স্টোররুমে ঢুকেছে কিছু খুঁজতে। একটা ছবির ক্যানভাসের সামনেটা দেওয়ালের দিকে মুখ করে রাখা। এখানে অনির্বাণের আঁকা কয়েকটা অসম্পূর্ণ ছবি অনেকদিন ধরে রাখা ছিল। সেগুলো সব একই ভাবে পাশে রাখা আছে। এখন আর ছবি আঁকে না সে।
তাহলে এই দেওয়ালে হেলান দিয়ে রাখা ছবিটা? নতুন? ঘুরিয়ে দেখল। ছবিটা সম্পূর্ণ। অনির্বাণ তবে আবার ছবি আঁকছে?
কিন্তু ছবিতে এটা কী আঁকা?
একটা মানুষ দাঁড়িয়ে আছে আয়নার সামনে। কিন্তু আয়নায় তার প্রতিবিম্ব নেই। আয়না খালি।
নিচে সই আছে। অনির্বাণের হাতের সই।
তারিখ — দুর্ঘটনার পরের মাসের। তা কী করে সম্ভব? তখন তো বেশ অসুস্থ ছিল অনির্বাণ।
একটা বিভ্রান্তি যেন ঘিরে ধরল রিয়াকে।
কিছুদিন পর আরেক রাতে আর একটা ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটল। পূর্ণিমার আলোয় শোবার ঘরে অস্বাভাবিক উজ্জ্বলতা তৈরি হল। কী একটা শব্দে রিয়া জেগে উঠল। দেখল অনির্বাণ ঘুমিয়ে আছে, কিন্তু মায়াবী জ্যোৎস্নায় তার ছায়া বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের মধ্যে হাঁটছে—দরজার দিকে এগোচ্ছে।
রিয়া চিৎকার করে উঠল। অনির্বাণের ঘুম ভেঙে গেল, কিন্তু তৎক্ষণাৎ নড়তে পারল না। দেখল আবার তার শরীর আর ছায়ার মধ্যে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
“বউদিমণি কী হয়েছে?” মধুদা ছুটে আসে পাশের ঘর থেকে। ঘটনা শুনে তাদের গ্রামের একটি পুরনো রীতির কথা বলে সে—
“দাদাবাবু গো, আমাদের গ্রামে বলে- যে মানুষ নিজের ছায়াকে ভয় পায়, সে নিজেকেই ভয় পায়। একবার ছায়ার সামনে দাঁড়িয়ে সরাসরি তাকাও।”
অনির্বাণ কাঁপতে কাঁপতে আয়নার সামনে দাঁড়ায়, নিজের ছায়ার দিকে চেয়ে কী যেন বিড়বিড় করতে থাকে সে।
আর ঘুম এল না রিয়ার। ভোরের দিকে বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়াল সে। নিজের মুখের দিকে তাকাল। চোখের নিচে ক্লান্তি। বেশ কয়েকদিন হল, ঠিকমতো ঘুম হচ্ছে না।
সে নিজেকে বলল — এটা ট্রমা। দুর্ঘটনার পরে মানুষ বদলায়। ডাক্তাররাও বলেছে। এটাই স্বাভাবিক।
তারপর আয়না থেকে চোখ সরিয়ে নিল।
কারণ আয়নায় তাকালে একটা প্রশ্ন আসে যেটা সে ভাবতে চায় না।
মাঝখানের সময়টা
রাত তিনটে।
ঘুমটা হঠাৎ ভেঙে গেল অনির্বাণের।
একটা ভয়ঙ্কর স্মৃতি ঘিরে ধরল তাকে।
মেদিনীপুরের রাস্তা। রাত। গাড়ির হেডলাইট। তারপর একটা বিকট শব্দ। তারপর — কিছু না। শূন্য।
তারপর হঠাৎ আবার সব ফিরল— আলো, শব্দ, ব্যথা। সুমিতের মুখ। অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরের সাদা ছাদ। হুটারের শব্দ।
মাঝখানের সময়টা কোথায় গেল?
চালক রঘু সেই রাতেই মারা গিয়েছিল। পাশে বসা ডাক্তার বন্ধু সুমিত বলেছিল — “তোর হার্ট বন্ধ ছিল কয়েক মিনিট। CPR-এও কাজ হচ্ছিল না। তারপর হঠাৎ নিজেই চালু হয়ে গেল।” নিজে নিজেই।
কেন?
অনির্বাণ পাশ ফিরল। রিয়া ঘুমাচ্ছে।
তার ঘুম আসছে না।
আগের দিন বিকেলে ডা. মিত্রের চেম্বারে ওনার অদ্ভুত প্রশ্নগুলো মনে পড়ল। -
"হার্ট বন্ধ থাকার কাছাকাছি সময়ের কথা কিছু মনে পড়ে অনির্বাণ? মানে কোনো দৃশ্য? কোনো অনুভূতি? অনেকে বলে আলো দেখেছে। টানেল দেখেছে।"
"না।"
"কিছুই না?"
"শূন্য।"
"কিন্তু শূন্যতাও তো একটা অনুভূতি। আর শূন্য কি থাকে কোন জায়গা?"
অনির্বাণ জানালার দিকে তাকাল।
"মানে — আমি ছিলাম না। হয়ত অন্য কিছু একটা ছিল আমার জায়গায়। মাঝখানের শূন্য সময়ে।"
ডা. মিত্র কলম নামিয়ে রাখলেন।
সেই সময় সত্যিই কি কিছু ছিল? কেউ ছিল?
সেই শূন্যতা থেকে কিছু একটা কি তার সঙ্গে ফিরে এসেছে? নাকি শূন্যতাটাই সাথে করে নিয়ে এসেছে সে?
এসি-র ঠান্ডাতেও সারা শরীর ঘেমে উঠল তার।
ঘড়ি কোন হাতে
আজ রিয়ার জন্মদিন। টেবিলে বসে ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের ব্যবস্থা হয়েছে মুম্বাইয়ের এক অভিজাত হোটেলের স্যুইটে। সুস্বাদু সমস্ত পছন্দের খাবার রয়েছে রিয়া আর অনির্বাণের সামনে। সোফাতে দুজনে বসে খাওয়া হচ্ছে। মাঝে মাঝে সার্ভিসবয় এসে খাবার সার্ভ করে দিয়ে যাচ্ছে। সামনে রয়েছে উন্মুক্ত সমুদ্র। অনেক উপর থেকে সমুদ্র দেখার মজাই আলাদা। মুম্বাই-এর আকাশচুম্বী সাততারা হোটেলের একেবারে টপ ফ্লোর। খাওয়া শেষ হয়ে আসছে। নানারকম খোশগল্পে কেটে গেছে সারাটা দিন। এখানেই তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল। অনির্বাণের একটা মেডিকেল কনফারেন্স ছিল আর রিয়া এসেছিল তার কলেজ থেকে এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে পেপার পড়তে। সেই স্মৃতি রোমন্থন চলছে সারা দিন। সমুদ্রকে সাক্ষী রেখে তৈরি হচ্ছে তাদের আগামী দিনগুলোর পরিকল্পনা।
“তুই তো একসময় ক্যানভাস আর রং-তুলি নিয়ে পাগল ছিলি। আবার তো শুরু করতে পারিস।” রিয়া হাসতে হাসতে বলে।
অনির্বাণ শুধু কাঁধ ঝাঁকায়।
“সে তো অনেকদিন আগের কথা। এখন সখ থাকলেও সময় নেই।”
মনে ভাবে, মানুষ তো কতকিছুই চায় জীবনে। সব কি হয়?
রিয়া চুপ করে থাকে। স্টোররুমে দেখা ছবিটার ব্যাপারে কিছু বলে না সে।
হোটেলের ঘরের দেওয়ালে মোমবাতির কাঁপা কাঁপা আলোতে ঘুরে বেড়াচ্ছে একটা ছায়া। অনির্বাণের পেছনের দেয়াল থেকে ধীরে ধীরে ছায়াটা পাশের দেওয়ালে এল অনির্বাণের চোখের সামনে। রিয়া দেখল, অনির্বাণ হঠাৎ সোফা থেকে উঠে একেবারে দেওয়ালের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। পায়ে পায়ে। যেন ঘুমের মধ্যে হাঁটছে। ছায়াটাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করল।
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস। তারপর বিড়বিড় করল — "হ্যাঁ আমি ফিরে এসেছি।"
রিয়া দেখল অনির্বাণ খালি দেওয়াল জড়িয়ে ধরে কথা বলছে।
ঘরে ছায়া নেই।
মোমবাতির শিখাটা নিভু নিভু হয়ে আবার জ্বলে উঠল। আলোটা একটু অন্যরকম।
সেই আলোয় অনির্বাণের পেছনে একটাও ছায়া পড়ছে না।
রিয়া ডাকল না।
কারণ অনির্বাণের ডান হাতে ঘড়ি ছিল। সে সবসময় ডান হাতে পরে।
এখন বাঁ-হাতে।
অনির্বাণ সোফায় ফিরে গেল। রিয়ার পাশে বসল। হাত ধরল।
রিয়া হাত সরাল না। রিয়া জানে। এই হাতের উত্তাপটা সত্যি। এই স্পর্শটা সত্যি। এতদিন পরে কেউ পাশে বসে হাত ধরেছে — এটাও সত্যি।
বাইরে সমুদ্রে তখন অঝোরে বৃষ্টি নেমেছে।
চেনা চেনা
উপরের স্টুডিও থেকে নামতে দেরি হয়ে গেল রিয়ার। বিকেলের পর অন্ধকার নামছে। আজ অনির্বাণ তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরেছে। বোধহয় বেরোবে কোথাও। কোন পার্টিতে যাবে। সোফায় বসে চা খাচ্ছে। পরনে বাইরে বের হবার পোশাক। এক ঝলক দেখে রিয়ার মনে হল সেই পুরনো অনির্বাণ যেন। ঝকমকে, চিন্তামুক্ত, উদ্দাম। যেন এক্ষুনি এগিয়ে এসে আলিঙ্গন করবে তাকে। বলবে, “চলো রিয়া, বেরিয়ে পড়ি লং ড্রাইভে।” কোথায় যে চলে গেছে সে সব দিনগুলো? বিয়ের বছর তিনেকের মধ্যেই হসপিটাল নার্সিংহোম নিয়ে বিজি হয়ে পড়ল অনির্বাণ। তারও নিজেরও কাজ আসতে লাগল ভুরি ভুরি। একই বাড়িতে জেগে উঠল দুটো বালুচর। মাঝে মাঝে ভাটার টানে জল অনেকটা নেমে গেলে বালুচর দুটো এক হয়। শেষ কবে এরকম হয়েছে চট করে মনে করতে পারে না রিয়া।
কী ভেবে পাশের সিঙ্গেল সোফাতে বসলো রিয়া। জিজ্ঞেস করল “তুই কি বেরচ্ছিস?”
“হ্যাঁ একটা পার্টি আছে। তোর কাজ কী রকম চলছে?”
যেন দুটি মানুষের অনেকদিন পরে দেখা। রিয়া অনির্বাণের হাতে হাত রাখল।
“সেদিন স্টোররুমে রাখা তোর অসমাপ্ত ছবিগুলোর পাশে একটা নতুন ছবি দেখলাম। একেবারে সম্পূর্ণ করে রেখেছিস। তোর ভাবনা আর ব্রাশের স্ট্রোক ভীষণ সুররিয়ালিস্টিক একটা মেজাজ এনে দিয়েছে। তোর অন্যান্য ছবিগুলোর থেকে একেবারে অন্যরকম।”
“তুই দেখেছিস?”
“হ্যাঁ কী একটা খুঁজতে সেদিন স্টোররুমে ঢুকেছিলাম। তখন দেখলাম।”
একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল শিরদাঁড়া বেয়ে। ছবিটা দেখেছে অনির্বাণ। এরকম ছবি সে আঁকে না। সে জানে কার ভাবনা, কে ছবিটা এঁকেছে।
বাইরে গাড়ির হর্নের শব্দ শোনা গেল। সোফা ছেড়ে উঠে পোর্টিকোতে চলে গেল অনির্বাণ। গাড়ির শব্দ মিলিয়ে গিয়ে এক অপার্থিব নিস্তব্ধতা ছেয়ে ফেলল ঘরটাকে।
হঠাৎ ঘরের আয়নায় একটা প্রতিবিম্ব ভেসে উঠল রিয়ার চোখের সামনে।
অনির্বাণ ঘর ছেড়ে চলে গেছে এইমাত্র। কিন্তু সোফাতে বসা তার প্রতিবিম্ব আয়নাতে রয়ে গেছে। কী যেন বলার চেষ্টা করছে রিয়াকে।
রিয়ার কানের কাছে সেই গুঞ্জন জেগে উঠল- “চলো রিয়া, আজ লং ড্রাইভে বেরিয়ে পড়ি। বৃষ্টি শুরু হয়েছে দেখছো না।” সেই বৃষ্টিপাগল মানুষটা কি ফিরে এসেছে প্রতিবিম্বে?
মধুদা চায়ের কাপ নিয়ে ঘরে ঢুকল। রিয়ার সামনে কাপটা রাখল।
তারপর একবার আয়নার দিকে তাকাল। আয়নায় তখনও কিছু একটা আছে কিনা দেখার চেষ্টা করল। তারপর নীরব হেসে রিয়ার দিকে তাকাল। দুজনের চোখাচোখি হল। কেউ কিছু বলল না। মধুদা চলে গেল।
রিয়া সোফায় বসে রইল। হাতের তালুর দিকে তাকাল — যেখানে একটু আগে অনির্বাণের হাত ছিল। উত্তাপটা এখনও আছে। কিন্তু একটা খটকা। সেই স্পর্শটা কি সত্যিই পরিচিত ছিল? নাকি পরিচিত মনে হচ্ছিল?
রিয়া চোখ বন্ধ করল। দুর্ঘটনার আগের রাতের কথা মনে পড়ল। অনির্বাণ বলেছিল — "রিয়া, তোর সঙ্গে আমার একটা কথা আছে। কাল ফিরে এসে বলব।"
কালটা আর আসেনি। অনির্বাণ ফিরে আর সে কথাটার কথা তোলেনি। রিয়াও কখনো জিজ্ঞেস করেনি।
চোখ খুলল। সামনে আয়না। নিঝুম ঘরে সেই আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল রিয়া। নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাল। প্রতিবিম্ব তাকে দেখে হাসল।
রিয়া জানে না সত্যি তার স্বামী পুরোপুরি ফিরে এসেছে কিনা। হয়তো, ছায়াটাই শিখে গেছে কীভাবে মানুষের মতো লুকিয়ে থাকতে হয়। আর তারা বাকি জীবন একটা এমন কারো সাথে কাটাবে, যাকে দেখতে তাদের চেনা মানুষের মতোই লাগে।