• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৪ | অক্টোবর ২০২৬ | গ্রন্থ-সমালোচনা
    Share  
  • গ্রন্থ-সমালোচনা : ভবভূতি ভট্টাচার্য

    || নদী যাদের কোনদিন একা হতে দেয়নি... ||

    বাংলার কাব্য ও মানচিত্রে উত্তর চব্বিশ পরগণা ও হুগলি জেলার গঙ্গা-তীরবর্তী জনপদ (১৮৯৫-১৮২৩)—তন্ময় ভট্টাচার্য। মাস্তুল প্রকাশনা, ভদ্রকালী, হুগলি-৭১২২৩২. প্রথম প্রকাশ ডিসেম্বর ২০২৩, দ্বিতীয় মুদ্রণ ফেব্রুয়ারি ২০২৪. ISBN 978-81-967863-2-8

    যুবক মার্কো যখন মহাপরাক্রমশালী চীনসম্রাট কুবলাই খানের সভায় এসে তাঁর দেখা এক ডজন আশ্চর্য শহরের গল্প শুনিয়েছিলেন, বৃদ্ধ সম্রাট তন্ময় হয়ে যাচ্ছিলেন কোন্‌ সে স্মৃতির শহর বা কোন্‌ আকাঙ্খার বা কোন্‌ মৃতের বা আশমানের শহরের কথায় কথায়!

    না, এ’গল্প মার্কো পোলোর ভ্রমণবৃত্তান্তে লেখা নেই; এ’গল্প স্বপ্নিল ঔপন্যাসিক ইটালো ক্যালভিনো-র যাদু-উপন্যাস ‘ইনভিজিবল সিটিজ’ (১৯৭২)-এ আছে। মনে পড়ে গেল বর্তমান গ্রন্থটির এক যাদু-মুখবন্ধে কিংবদন্তী ম্যাপমেকার ফ্রা মাউরো-র উল্লেখে, যা দিয়ে তন্ময়ের বর্তমান যাদু-গ্রন্থটির শুরুয়াৎ।

    এত যাদু?

    যাদু নয়?

    পঞ্চদশ শতকের ভেনিসে বসে প্রায়ান্ধ বৃদ্ধ কার্টোগ্রাফার ফ্রা মাউরো এর-ওর-তার মুখে গল্প শুনে শুনে বিশ্বের ম্যাপ এঁকে এঁকে গিয়েছিলেন—দক্ষিণ মেরুর অবস্থান যেখানে পৃষ্ঠার উপরের দিকে, নিচ-পানে নয়। ভারতভ্রমণান্তে ইটালিদেশের ঘরে ফিরে বিজয়নগরের জামাই নিকোলো কন্টি ভারত-যাত্রাপথের যে গল্প ফ্রা-মাউরোকে শুনিয়েছিলেন তা থেকে আঁকা ম্যাপ দেখে নাকি পরে ভাস্কো-ডা-গামার ভারতে আসা সহজতর হয়েছিল! আর আশ্চর্য এই কেতাবে তরুণ লেখক বিপ্রদাস পিপলাই-এর ‘মনসামঙ্গল’-এর বঙ্গদেশের বর্ণনার সঙ্গে অনায়াসে মিলিয়ে দিয়েছেন পর্তুগীজ ডি-ব্যারোজের প্রথম বঙ্গ-মানচিত্র (১৫৫০ খৃ.)!

    মানচিত্র ও কাব্যের যুগলবন্দীতে সমাহিত এমন গ্রন্থ বাংলাভাষায় আগে লেখা হয়েছে বলে জানি না।

    উল্লেখ্য, কাব্যে, সাহিত্যে ভারতের পারঙ্গমতা সেই রামায়ণের কাল থেকেই সুপ্রতিষ্ঠিত হলেও, মানচিত্রবিদ্যা তার তুলনায় আধুনিক কালের একটি বিষয়। বাদশাহ্‌ জাহাঙ্গীরের সভায় এসে স্যর টমাস রো অনেক-অনেক উপহারের মধ্যে একখানি ম্যাপও দিয়েছিলেন বটে, যেটি ঘেঁটেঘুঁটে দু’দিন পরে ফেরত দিল সভাসদ্‌রা। মুঘল দরবারে ঐ বস্তুটি ‘পড়া’-র জ্ঞান কারোরই ছিল না।

    তাই বর্তমান গ্রন্থটিতে যখন একই অধ্যায়ের মধ্যে ডি ব্যারোজ থেকে জেমস রেনেল থেকে থুইলার-সাহেবের ম্যাপের কথা পড়তে পাই সেটা যথেষ্ট প্রাপ্তি বৈকি! কারণ আজকের উইকিপিডিয়ার যুগে যদিও এই তথ্যগুলি খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়, কিন্তু দুই মলাটের মধ্যে তাদের তুল্যমূল্য পাঠ অতি উপাদেয়, উপরন্তু যদি তা মঙ্গলকাব্য-চৈতন্যভাগবত-সত্যপাঁচালির পরতে পরতে মিশে থাকে।

    আবারও বলি, বাংলাভাষায় এমন বই আগে লেখা হয়নি। লেখক-প্রকাশক যে এটির সৃষ্টি ও নির্মাণে সচেষ্ট হয়েছেন সেটাই এক পরম প্রাপ্তি।

    ***

    ১৭৫৭-এ যখন পলাশীর প্রান্তরে ‘সূর্যাস্ত’ হচ্ছে, তখনই লন্ডনের প্রখ্যাত ‘The Gentleman’s Magazine’-এ গঙ্গাতীরবর্তী জনপদের ভূগোল নিয়ে এক ল্যান্ডমার্ক প্রবন্ধ প্রকাশিত হচ্ছে, ফ্যাকসিমিলিতে যেটি হুবহু তুলে দেওয়া হয়েছে এখানে। চমৎকার প্রাপ্তি বটে।

    পলাশীর যুদ্ধ জেতার পরে লর্ড ক্লাইভ প্রথম যে কয়টি প্রধান কাজে হাত দিয়েছিলেন তার একটি হল জেমস রেনেলকে দিয়ে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির জরিপ করানো। ভারতীয় জরিপবিদ্যার এই জনকের আঁকা হুগলী নদীর দুইটি ম্যাপ রয়েছে এখানে, তবে তার চেয়েও বড় প্রাপ্তি চার্লস জোসেফের আঁকা (১৮৪১ খৃ.) ব্যাণ্ডেল থেকে গার্ডেনরিচের একখানি রঙিন মানচিত্র, ভাঁজ করে রাখা। বইখানির মূল্য যাঁদের কাছে অত্যুচ্চ মনে হবে তাঁরা যেন এই রকম কাজগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখেন।

    পাশাপাশি মঙ্গলকাব্যগুলিতে ও চৈতন্যসাহিত্যে উল্লেখিত গঙ্গাতীরবর্তী জনপদগুলির কথা শোনাতে শোনাতে গিয়েছেন লেখক—কাব্য থেকে উদ্ধৃতি দিতে দিতে। প্রথম অধ্যায়েই বিশ পৃষ্ঠা ধরে হুগলী ও ২৪-পরগনার ত্রিবেণী-চুঁচুড়া-হালিশহর-ইছাপুর প্রভৃতি জনপদগুলির কথা বলেছেন।

    বইটিতে তিনশতাধিক রঙিন ও সাদাকালো ম্যাপ ও প্রাচীন পুথির ছবি বা ফ্যাকসিমিলি সংযোজিত হয়েছে। এবং কাব্য থেকে টেক্সটের উদ্ধৃতি। এতে কতটা পরিশ্রম, দরদ ও পাণ্ডিত্যের সমাহার ঘটেছে তা পাঠকমাত্রই অনুভব করবেন।

    ***

    তিন সংখ্যা আগে ‘সাতগাঁ’-র রিভিউয়ে সেই বইয়ের উৎসর্গপত্রটির ভূয়সী প্রশংসা করেছিলাম। এটিরও কম যায় না—ঐ দেখুন না, শীর্ষনামে দিয়েছি।

    আর এই বইটির ‘মুখবন্ধ’! অধ্যাপক বিশ্বজিৎ রায়-কৃত। এত সুলিখিত ও উপযুক্ত ভূমিকা বেশি পড়িনি।

    বইটির সামগ্রিক উপস্থাপনা, তার প্রচ্ছদ (আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়-কৃত), ছাপাই-বাঁধাই—সব বিভাগে দশে দশ পাচ্ছে। এমন বই খুব বেশি পড়িনি।

    ইতিহাসের কথা বলেছে এ’বই! ইটালো ক্যালভিনোর কথা দিয়েই শেষ করিঃ ...শহর কোনো অতীতের কথা বলে না, তা তাকে হস্তরেখার মতো অঙ্গীভূত করে রাখে।

    পুনঃ- সদ্য-যুবক লেখককে উৎসাহ দিতে নামী কোনো সাহিত্য-পুরস্কার দেওয়া উচিত, কারণ ওঁর মতো করে তো কৈ আগে কেউ ভাবেনি। পাশাপাশি, ঘাট-গির্জা-বন্দর নিয়ে লেখা ওঁর আরেকটি নন-ফিকশন বই পড়েও অভিভূত হয়েছি। এমনটা সচরাচর হয় না।

    || সাড়ে চারজন পাঠকের একজন বলছি… ||

    খদিরবনের তারা ও অন্যান্য কাহিনি—অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়; জয়ঢাক প্রকাশন, কলকাতা; জুন ২০২৬; ISBN 978-93-48707-97-0

    এই বইয়ের রিভিউয়ে সাদা পৃষ্ঠা জমা দেব ভেবেছিলাম।

    ভাববেন না যেন সাদা শূন্যতার দ্যোতক, রামধনুর সাতটি রঙ মিশে যেমন সাদা হয়ে যায় তেমন কত কত অব্যক্ত কথা যে ঐ সাদা পাতায় লুকিয়ে আছে তার থৈ কে রাখে?

    বিশেষত, ভাষাহারা হলে ভাবের পৃষ্ঠা সাদা না হয়ে যায় না!

    ***

    গল্প নয়, কবিতার কথা দিয়ে শুরু করি।

    আজ থেকে ১৭ বছর আগে ‘পরবাস’-এর ৪৩-তম সংখ্যায় (জুলাই, ২০০৯ ) সর্বজনশ্রদ্ধেয়া কেতকী কুশারী ডাইসন-কৃত একখানি বুক-রিভিউয়ে চোখ আটকে গিয়েছিল, কারণ প্রখ্যাতা কবি যে গ্রন্থ-সমালোচনাও লেখেন সেটা আগে জানতাম না। প্রকাশ, এক তরুণ কবির কাব্যগ্রন্থ পড়ে কেতকীদি এতটাই মুগ্ধ হয়েছেন যে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ঐ দীর্ঘ পাঠ-প্রতিক্রিয়া লিখে পাঠিয়েছেন।

    এর চাইতে বড় পুরস্কার এক নবীন লেখকের কাছে আর কী হতে পারে, ভেবেছি।

    অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে সে-ই পরিচয়—কবিতার মাধ্যমে।

    অতঃপর আর্কাইভ ঘেঁটে ওঁর যে ছোটগল্পটি পড়েছিলাম তার ঘোর যেন আজও কাটেনি—এখন পুনঃপাঠে উপলব্ধি (এবং, সেটি বর্তমান সংকলনে না পেয়ে দুখী), যদিও অরিন্দমের যে গল্পটিকে আজও ওঁর শ্রেষ্ঠকৃতি বলে মানি সেটি আজও পড়ে মনে হল, —এ’ যদি ‘মধ্যমান’ হয়, শ্রেষ্ঠমান তবে কী? কিন্তু, না, লেখক এখানে তুল্যমূল্য মান-এর কথা বলেননি, সঙ্গীতের মধ্যমান-তাল কে রবিঠাকুরের ‘এ পরবাসে রবে কে…’ গানের সঙ্গে যে মুন্সীয়ানায় বেঁধেছেন পাঠককে হতচকিত করে তা।

    আসবো এ’ প্রসঙ্গে পরে আবার।

    ***

    বর্তমান সংকলনখানিতে অন্তর্মুখী কবি অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়ের বিগত বিশ-বাইশ বছরের লেখার মধ্যে থেকে বেছে বেছে ১৮টি ছোটগল্প সন্নিবিষ্ট হয়েছে। এখানে ওঁর পরিচিতি-বিশেষণে ‘কবি’ লিখলাম ভেবেচিন্তেই, কারণ অরিন্দমের গল্পগুলি শেষবিচারে একেকটি কবিতা-ই বটে। কবিতার পরিচিতি তো আর তার ছন্দ বা ফরম্যাট বা বহিরাঙ্গে নয়, তার ভাবে ও সুরে—যাতে অরিন্দমের প্রতিটি গল্পই রসোত্তীর্ণ। তা-ও তো ওঁর ‘আরশীনগরের পড়শী’ ও ‘রাধাকিশোরবাটির কথা’-র মতো দুইটি অসাধারণ গল্প এই সংকলনে নেই। উৎসাহী পাঠক পরবাস-আর্কাইভ থেকে পড়ে নিতে পারেন। সংকলনটির সিংহভাগ গল্প প্রকাশিত হয়েছিল ‘পরবাস’ পত্রিকাতেই, দু’একটি ‘দেশ’, ‘পশ্চিমঘাট’ ও ‘বম্বে Duck’-এ’।

    ***

    সূচিপত্রটির দিকে তাকাতে তাকাতে ভাবছিলাম শীর্ষনাম বাছাইটি সুপ্রযুক্ত হয়েছে কিনা—‘মাজু’ ও ‘মাথুর’-ও তো অনবদ্য গল্প! পুনঃবিবেচনায় ভাবি, ‘খদিরবনের তারা’ সত্যই একটি লাখে-এক গল্প, সেটি থাকতে অন্য কোনো গল্প বোধহয় শিরোনামে আসে না। জলা-জঙ্গল-বেদে-ওষধি ঘিরে এ’গল্পের যা পরিধি, অবয়ব ও পৌঁছ্‌ — তাতে মনে হয় অরিন্দম বোধহয় বি ই কলেজের এঞ্জিনিয়র নন, না তিনি আজীবন মুম্বাই মহানগরীতে উচ্চপদে আসীন রয়েছেন। তিনি নিশ্চয়ই সোঁদরবনের বাদাতে হাতুড়ে-বদ্যিগিরি করেই দিন কাটিয়েছেন। এই ‘তারা’ কি মলিন সালোয়ার-পরা সেই তেজস্বী কন্যেটি, না ‘কোন্‌ কাননের ফুল কোন্‌ কাননের তারা’….ভাবতে বসি (বিশেষত শেষ দুটি প্যারা বারবার পড়ি)। আসলে কবিদের অন্তর্দৃষ্টি অতি মর্মভেদী হয় কিনা, যেটা না থাকলে এই মানের গদ্য লেখা যায় না।

    ভূমিকায় আজকের আরেক প্রখ্যাত কথাশিল্পী সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায় তাই যথার্থই লিখেছেন, ‘মনে হয় যেন এ’গল্পটা আমি কোনদিন লিখতে পারতাম না’!

    এটাই বর্তমান সংকলনটির সম্বন্ধে অনেক কথা বলে দেয়।

    ***

    প্রায় ষাটে পৌঁছে অরিন্দমের মানের কথাকারের প্রথম গল্পসংকলন বেরোচ্ছে—এটাও অনেক কথা বলে দেয়। ঢক্কানিনাদী হলে অনেক অনেক বই ছাপানো যায় বটে কিন্তু ‘তামাদি’ বা ‘কলমের গাছ’ এর মতো ছোটগল্প লেখা যায় না। এমন এমন গল্প লিখতে লাগে প্রতিভা, নিরলস সাধনা ও নিবেদিতপ্রাণতা—যার স্পর্শ পাঠককে ছুঁয়ে দিয়ে যায়। পাঠক ভরে ওঠে এক সফল সাহিত্যকীর্তির যাদুস্পর্শেঃ…

    স্বরলিপিতে পূর্ণ ষোলমাত্রা-ভিত্তিক বিভাগ লেখা থাকলেও তালটা যেন চলে সম্পূর্ণ ভিন্নচালে, কিন্তু চলতে চলতে একে অন্যের হাত ছাড়ে না কখনই, গানের সঙ্গে মধ্যমানের ঠেকায় যেন সেই লুকোচুরি চলতেই থাকে এবং প্রতি আবর্তনের সমে তাদের দেখা হয়, এবং এইভাবেই শেষ যখন সম আসে সেই সমাপ্তির প্রশান্তি অন্যরকম।

    (‘মধ্যমান’)

    পুনঃ ... মা, বাচ্চু, খুকুপিসি প্রমুখ হরেক ঈশ্বরীদের সঙ্গে তাঁর ‘সাড়ে চারজন পাঠককে’-ও উৎসর্গ করেছেন লেখক এই বইটি। তাদেরই একজন হয়ে রিভিউটি লিখলাম, তাই ঐ শীর্ষনাম।

    || কলকাতার লিবারম্যান ও তাঁর আশ্চর্য পত্রিকা! ||

    ১৭৭৮-গ্রন্থচর্চা—সম্পাদকঃ ইন্দ্রজিৎ চৌধুরী; চার্বাক, কলকাতা ৩৯; নবপর্যায়-২, ২০২৩; ISSN 2349-6843

    মানুষটি আসলে ছিলেন একজন সাধক!

    গ্রন্থের সাধক!

    তন্নিষ্ঠ, নিরহংকার, প্রচারবিমুখ একজন ‘অতিমানব’ যিনি কেবল বইয়ের প্রতি ভালোবাসার জোরে এক ‘জীবন্ত গুগল’ হয়ে উঠেছিলেন গবেষক-মহলে—তবে থেকে যখন ‘গুগল’ শব্দটিরই জন্ম হয়নি।

    পঁয়ষট্টি বছর ধরে প্রধানত কলিকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ পাঠগৃহে, এছাড়া অন্য লাইব্রেরিতেও, সাময়িকপত্রের রেফারেন্সের শেষ কথা ছিলেন শ্রদ্ধেয় অশোক উপাধ্যায়, (১৯৪৪-২০২৩) যাঁর কাছে সাহায্য পাননি ও যাঁর দ্বারা উপকৃত হননি—এমন গবেষক মেলা ভার হবে। জীবৎকালেই তাই কিংবদন্তী হয়ে উঠেছিলেন শ্রী দেবপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়, কলম-নাম যাঁর ঐ ‘অশোক উপাধ্যায়’! (মহামতি অশোক ‘দেবানাম্‌ প্রিয়’ ছিলেন না কি?)

    ***

    কলম্বিয়ার প্রবাদপ্রতিম অধ্যাপক জেকব লিবারম্যান (১৯১৪-১৯৮৪ খৃ.) ১৯৭০-এর দশকে যে প্রিন্টিং হিস্ট্রি জার্নাল শুরু করেছিলেন আজও তা এই গোত্রের একখানি বিশ্বশ্রেষ্ঠ পত্রিকা হিসেবে স্বীকৃত।

    আমাদের এখানে কলকাতাতে সন ২০১৩-তে অশোকবাবু যে পত্রিকাটি শুরু করেছিলেন বাংলা সাময়িকপত্রের ইতিহাসে তা হয়ে উঠেছে এক মাইলফলক, কারণ শুধু ‘বই, মুদ্রণশিল্প, মুদ্রণ-ইতিহাস, প্রচ্ছদশিল্প’কে কেন্দ্র করে যে এমন বিশ্বমানের ছাপাই-বাঁধাই-কাগজ দিয়ে একখানি বাংলা-পত্রিকা করা যায় হাতে নিয়ে না পড়ে দেখলে তা বিশ্বাস করা যাবে না। এঁরা আজ পর্যন্ত কয়টি সংখ্যায় পুস্তক ও মুদ্রণসংক্রান্ত কী কী বিষয় নিয়ে কেমন কেমন সব সংখ্যা বের করেছেন তা-ই এক দীর্ঘ নিবন্ধের বিষয় হতে পারে, তবে বর্তমানে সেটি না করে যে সংখ্যাটি হাতে এসেছে তার সম্পর্কেই দু’কথা লিখি (বাক্যিহারা হলে দোষ দিয়েন না যেন!)

    ***

    প্রথম চমক তো নামেই।

    ১৭৭৮ খৃষ্টাব্দে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড হুগলি থেকে ছেপে বের করেন Grammar of the Bengali Language. এই প্রথম বাংলা হরফ দেখা গেল ছাপা অক্ষরে। এই ঐতিহাসিক ঘটনার স্মরণার্থে পত্রিকাটির নাম দেওয়া হল ‘১৭৭৮-গ্রন্থচর্চা’. ইন্দ্রজিৎ চৌধুরী, নারায়ণ ঘোষ, নেপালচন্দ্র ঘোষ, ডাঃ দেবাশিস বসু, তরুণ পাইন প্রমুখের মতো গুণীজন শুরু থেকে যুক্ত ছিলেন ও আছেন অসাধারণ এই পত্রিকাটির সঙ্গে।

    বর্তমান সংখ্যাটি প্রায় তিন শত পৃষ্ঠার একখানি স্বয়ংসম্পূর্ণ কেতাব বটে, ‘পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা’ মাত্র বলতে বাধে, যদিও ওঁরা বছর একখানিই নিবেদিত-সংখ্যা বের করে থাকেন।

    ***

    মুখ্য ও পৃষ্ঠ-প্রচ্ছদের ছবি দেখে এবং মলাটের ও বইয়ের প্রতি পৃষ্ঠার কাগজের কোয়ালিটি ছুঁয়ে দেখলে প্রথমেই আপনার সম্ভ্রম হবে। হবেই। আর, প্রথম পাতা উল্টিয়ে ‘সূচিপত্র’-টি দেখলে ক্লিন বোল্ড হয়ে যাবেন। যে-ভাবে ও রঙের পরিমিত ব্যবহারে ‘অক্ষর-শিল্প’, ‘লিখন-শিল্প’, ‘স্মরণ’, ‘বই-সংবাদ’ প্রভৃতি উপ-বিভাগগুলি উপস্থাপিত হয়েছে—ও তার পাশে পাশে নিবন্ধগুলির নাম (ও লেখক-নাম) তাতে এই পাতাটিকেই এক শিল্পকৃতি বলতে হবে।

    ***

    কী আছে এই সংখ্যায়?

    • আরবী শব্দ ‘কাতিব’—অর্থ হয় লিপিকার/ calligrapher. বর্ষীয়ান সত্যশ্রী উকিল মহাশয় ‘উর্দুবাজারের কাতিব’ প্রবন্ধে ১৫-১৬ পৃষ্ঠার মধ্যে অন্যূন দশ-বারোটি চিত্রের সাহায্যে যে মুন্সীয়ানায় ইসলামী লিপিশিল্পের আলোচনা করেছেন— তা মনে করিয়ে দেয় নমস্যা অধ্যাপিকা আনমেরী শিমেলের ‘Calligraphy and Islamic Culture’ বইটির (সেটি, অবশ্যি, ৩০০ পৃষ্ঠাব্যাপী এক বিস্তারিত আলোচনা ছিল)। অধ্যা. অশোককুমার দাস মহাশয় এ’ বিষয়ের উপরে এক মান্য বিশারদ, ‘মুঘল পুথি’-র উপরে তাঁর বর্তমান প্রবন্ধটি মনোজ্ঞ, যদিও এত স্বল্প পরিসরে এ’বিষয়ের উপরে লেখা দুরূহ। (‘পরবাস’-এর এই সংখ্যাতেই বিষয়টির উপরে একটি লেখা রয়েছে; উৎসাহী পাঠক দেখতে পারেন।)

    কোন্‌টা ছেড়ে কোন্‌ লেখাটার কথা বলব?

    • শতবর্ষ-পেরোনো উত্তর কলকাতার পুস্তকালয় ‘ডি এম লাইব্রেরি’ নিয়ে লিখেছেন বর্তমান কর্ণধার আশিসগোপাল।

    • কৃত্তিবাস-কাশীরাম থেকে আলাওল—মধ্যযুগের ছয়জন বাঙালি অনুবাদককে নিয়ে লিখেছেন রামকুমার মুখোপাধ্যায়।

    • বাল্যকালে সংক্ষিপ্ত বঙ্গানুবাদে ‘কাউন্ট অব্‌ মন্টিক্রিস্টো’, ‘হাঞ্চব্যাক অব্‌ নোতরদাম’ থেকে ‘রব রয়’ কে না পড়েছে? দেব সাহিত্য কুটীর থেকে বেরোত আনপুটডাউনেবল বইগুলো। এখন ভাবলে অবাক লাগে সুধীন্দ্রনাথ রাহা মহাশয় কী করে অত বড় বড় উপন্যাসগুলিকে সহজবোধ্য কিশোরপাঠ্যরূপে প্রকাশ করতেন? দীর্ঘ এক নিবন্ধে ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় নমস্য শিশুসাহিত্যিকের সম্পূর্ণ গ্রন্থতালিকা সহ এক মনোজ্ঞ জীবনকাহিনী লিখেছেন। স্যালুট!

    • শেষে ‘স্মরণ’ অংশে চারজন বরেণ্য মানুষের স্মৃতিচারণা করা হয়েছেঃ রবীন্দ্রগ্রন্থক সুবিমল লাহিড়ী, মার্ক্সীয়-প্রাবন্ধিক রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য, শিল্প-গবেষক প্রভাতকুমার দাস ও অধ্যা. স্বপন চক্রবর্তী।

    আরও কত লেখার উল্লেখ যে করা হল না!

    • সখা পত্রিকা নিয়ে বিশ্বভারতীর অধ্যাপক বিশ্বজিৎ রায়ের চমৎকার রচনাটি।

    • টেগোর ফ্যামিলি নিয়ে কলকাতা-বিশেষজ্ঞ ডাঃ দেবাশিস বসুর লেখা।

    আর দ্বিতীয় প্রবন্ধটি?

    • টাইপোগ্রাফির উপরে সব্যসাচী হাজরার প্রবন্ধটি দু’বার পড়েছি। আরও একবার পড়ব, নৈলে এক লাইনও লেখবার ভরসা পাচ্ছি না।

    পুনঃ এ’খানি ‘গ্রন্থ-সমালোচনা’ লেখা হল না। মুগ্ধ ভঙ্গিতে একখানি ‘সূচিপত্র’ পেশ করা হল মাত্র। (আহা! এমন সূচিপত্র যেন আবার লিখতে পাই) ।


    || ঔদ ও একতারার সুর এসে মিলে গেল…. ||

    বৃষ্টিজাতক—জোহা কাজেমি; অনুবাদঃ অনুষ্টুপ শেঠ; কল্পবিশ্ব পাবলিকেশন্স, কলকাতা-৭৪; জানুয়ারি ২০২৫; ISBN 978-81-983230-1-9

    আজ থেকে প্রা-য় দু’শো বছর আগে —ঋষি বঙ্কিমের ইঙ্গ-উপন্যাস ‘Rajmohan’s Wife’ (1864) তার তিন দশক পরে লেখা হবে— রামবাগানের দত্তবাড়ির ১৭-বছর বয়সী হিন্দুকালেজী ছাত্র কৈলাসচন্দ্র ডাট্‌ এক ইঙ্গ-রচনা প্রতিযোগিতার গল্পে লিখেছিল কীভাবে ইংরেজ বড়লাট লর্ড ফেল-বুচারের অত্যাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়ে ফোর্ট উইলিয়ম দখল করতে বাঙালি যুবক ভুবনমোহনের নেতৃত্বে হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল ভারতবাসী—যদিও অমিতবিক্রমে দুই দিন ব্যাপী যুদ্ধের পরেও অনভিজ্ঞতার কারণে শেষাবধি পরাজয় ঘটে দেশীয় বাহিনীর, এবং ভুবন হলেন শহীদ!

    ১৮৩৫-এ’ প্রকাশিত এই রচনার নাম ছিল A Journal of Forty-eight hours of the year 1945.

    দ্য ক্যালকাটা লিটারারি গেজেট-এর জুন-১৮৩৫ সংখ্যায় কৈলাসের এই রচনা প্রকাশিত হলে ঢি-ঢি পড়ে গেল! রাজভক্ত ক্যালকাটা ক্যুরিয়র লিখল, এমন রাজদ্রোহিতাকে প্রশ্রয় দেবার জন্যেই কি কোম্পানি বছর বছর এক লক্ষ টাকা ঢালছে শিক্ষাখাতে?

    নিজের ছাত্র কৈলাসকে বুক পেতে আগলাতে এগিয়ে এসেছিলেন হিন্দুকালেজের প্রবাদপ্রতিম প্রিন্সিপাল তথা ঐ ক্যালকাটা লিটারারি গেজেট-এর সম্পাদক ক্যাপটেন ডেভিড লেস্টার রিচার্ডসন! বলেছিলেন, “আরে, এ’তো একটি ‘ফিউচারিস্টিক স্পেকুলেটিভ ফিকশন’-মাত্র। গপ্পকথা। তা-ও, ভবিষ্যৎ ধর্মী।”

    বেঁচে গিয়েছিল ছাত্র কৈলাসচন্দ্র ডাট্‌।

    ***

    তাহলে, ‘স্পেকুলেটিভ ফিকশন’ দিয়ে অনেক কিছুই হয়, করা যায়!

    এই যেমন বর্তমান বইটির নবীনা লেখিকা জোহা কাজেমি (জ. ১৯৮২) যখন জন্মেছেন তার তিন বছর আগেই ইরানদেশে আয়াতুল্লাহ্‌ খোমেইনির কড়া মৌলবাদী শাসন শুরু হয়ে গিয়েছে, যার সমালোচনায় প্রাণ চলে যেতে পারে। গেছেও।

    এঞ্জিনিয়রিং-গ্রাজুয়েট জোহা তাই এই ‘Rain Born’ লিখতে নিলেন ‘স্পেকুলেটিভ ফিকশন’-এর পথটিঃ মহাপ্রলয়ের পরে পৃথিবীর মানুষ বেঁচে আছে কয়েকটি দ্বীপকে সম্বল করে, জাহাজে জাহাজে। স্বঘোষিত কড়া ধর্মীয় নেতারাই এখানে সর্বশক্তিমান শাসক—তাদের অনাচার দেখেও চোখ বন্ধ করে থাকতে হয়। জন্ম হয় দুর্নীতিগ্রস্ত ধর্মীয় নেতাকুলের যাদের কুচক্রে সাধারণ মানুষ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। আবার এখানে পাই উপন্যাসটির নায়িকা ডালিয়া-কে, যার চুল-নখ নেই—জলে থাকবার উপযোগী হয়ে অভিযোজিত হয়ে গেছে। ডালিয়ার মা আসিন-ও তেমনই অভিযোজিত (প্রচ্ছদচিত্রটি দেখুন)।

    নায়ক টিরাড হল ঐ পরিত্রাণকারী নেতৃকুলের শিষ্য, যদিও অনেকটা নিচু তৃতীয়স্তরের। কিন্তু সে ঐ ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরোধী …

    গল্পটি এমন ধীরে ধীরে ও পরতে পরতে খুলে যায়—মনে হয় গোয়েন্দা গল্প পড়ছি। যেমন, গল্পের গোড়াতেই ঐ যে মৃতার জলে ডোবা দেহের উদ্ধার, বা দুষ্টু ছেলেটার আনা সাপকে মেরে ফেলে অপরাধবোধে ভোগে নায়ক টিরাড, যা থেকে তার পূর্বপুরুষ পরিত্রাতাদের কথা শোনান লেখিকা কথায় কথায়...

    আর স্পয়লার না করে স্বীকার করে নেওয়া যাক্‌ যে এই প্রথম অরিজিনাল বইটি না পড়েই অনুবাদের পাঠ-প্রতিক্রিয়া লিখতে বসেছি (কারণ মূল গ্রন্থটি এখন আর ভারতে উপলভ্য নয়)। এতে সমালোচকের খামতি প্রকট হলেও অনুবাদিকার মুন্সিয়ানা প্রমাণিত হয়, কারণ তরতরে অনুবাদে কখনই ভাষান্তরের নিগড়টা বুঝতে দেননি। ছোট ছোট বাক্যে, প্যারাগ্রাফ ভাগ করে করে সুললিত গতিতে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন কাহিনীর নাও। সুখপাঠ।

    ***

    ইরানী সাহিত্যের ধারা তো সেই প্রাক্‌-ইসলামী কাল থেকে! প্রাচীন পার্সিপোলিস শহরে ছিল এক বৃহৎ গ্রন্থাগার। আধুনিক ইরানেও সিমিন দানেসভর, শার্নুস পার্সিপুর, সিমিন বেহ্‌ভানির মতো শক্তিশালী লেখিকা ও কবি এসেছেন, কিন্তু শ্রীমতি জোহা কাজেমির আগে সাই-ফি বা স্পেকুলেটিভ ফিকশন ইরানে কোনো লেখিকা লিখেছেন বলে জানি না। বড় আনন্দ পাওয়া গেল উপন্যাসটি পাঠ করে—তার শ্রেয়ঃ হয়ত জোহার চাইতে অনুষ্টুপের প্রতি যায় বেশি কারণ, ঐ যে বললাম, অরিজিনালটি আমি পড়িনি। অনুবাদের স্বতঃস্ফূর্ততা দিয়ে সে খামতি ভরাট হয়ে যায়।

    ইউটিউবে দেখলাম/শুনলাম উনি বাক্যালাপ করছেন জোহা-র সাথে, সঙ্গী কবি যশোধরা রায়চৌধুরী (যিনি জোহার ছোটগল্পের বঙ্গানুবাদ করেছেন, এই ‘কল্পবিশ্ব’ থেকেই বেরিয়েছে)।

    না, জোহার মাথায় হিজাব দেখা গেল না।

    ***

    গল্পের শেষদিকপানে দেখি নায়ক টিরাড প্যারাডাইস দ্বীপে এসে বাজাতে শিখছে ‘ঔদ’—মধ্যপ্রাচ্যের প্রিয় তারবাদ্য—যেন একতারা। সফল অনুবাদে তাই এখানে ঔদ ও একতারার সুর যেন মিলে মিশে একাকার হয়ে গেল।

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  •   (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments