• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৪ | অক্টোবর ২০২৬ | গল্প
    Share  
  • দু'টি অণুগল্প : অতিক্রম; ঠিকানা : পরমার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়

    হাসপাতাল ক্যান্টিনের এই কর্নার টেবিলটাই বরাবরের পছন্দ অয়নের। ক্যান্টিনে ঢুকে ইমতিয়াজকে কফির অর্ডার করে, চেয়ারে গা এলিয়ে দিল অয়ন।

    বসিরহাট হাসপাতালে বছর খানেক আগে পোস্টিং পাওয়ার পর থেকে, এটা ওর বাঁধা রুটিন। যে শিফ্টেই অয়নের ডিউটি পড়ুক, হাসপাতাল ক্যান্টিনে কফি না খেয়ে, সে হাসপাতালে ঢোকে না।

    ক্যান্টিনের টেলিভিশনটা যথারীতি নিজের মনে একটা খবরের চ্যানেলের গতানুগতিক খবর দেখিয়ে যাচ্ছিল, হঠাৎই সকাল সাতটা নাগাদ, গা ঝাড়া দিয়ে উঠে সেটা ব্রেকিং নিউজে কলকাতার সরকারি হাসপাতালের, গায়নোকোলজি ডিপার্টমেন্টের হাড় হিম করা খবরটা দেখাতে শুরু করল। আতঙ্কে অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল অয়নের।

    রঞ্জনা তো ওই ডিপার্টমেন্টেই গত রাতে ডিউটিতে ছিল। ওয়টসঅ‍্যাপ চেক করে অয়ন দেখল, ভোর চারটেয় রঞ্জনা শেষ বার ওয়টসঅ‍্যাপ দেখেছে। সিসিটিভি ফুটেজ বলছে, ওই সময় নাগাদই দুর্ঘটনাটা ঘটেছে; অথচ এতক্ষণ নাকি কেউ কিচ্ছু টের পায়নি! দ্রুত হাতে রঞ্জনাকে ডায়াল করে অয়ন, বারবার রঞ্জনার ফোনটা বেজে যেতে থাকে।

    কতবার, রঞ্জনাকে মনের কথাটা বলবে ভেবেছে অয়ন।

    না, সে কথা বলা হয়ে ওঠেনি কোনও দিন। আজ সব বলে দেবে সে। ওয়টসঅ‍্যাপে ও রঞ্জনাকে মেসেজ করে, “প্লিজ ফোনটা ধর রঞ্জনা, আমার খুব ভয় করছে।” ওদিকে হতচ্ছাড়া চ্যানেলটাও যেন আসল খবর ছেড়ে, রাজ্যের গল্প…।

    রঞ্জনা কতদিন ধরে অয়নের বুকের খুব গভীরে একটা নরম নদী হয়ে বয়ে চলেছে। কলকাতার এক পাড়ায় বাড়ি, এক শিক্ষাকেন্দ্র, জয়েন্টের গণ্ডি পেরিয়ে দু’জনে ডাক্তারি পাশ করেছে। এক বছর আগে কার্ডিয়োলজিস্ট ডা. অয়ন দাশগুপ্ত, বসিরহাটের এই মেডিক্যাল কলেজে পোস্টিং পেয়ে চলে এল আর গায়নোকলজিস্ট, ডা. রঞ্জনা সেন উত্তর কলকাতার এক মেডিক্যাল কলেজে।

    ক্যান্টিন ম্যানেজার ইমতিয়াজ, উত্তেজিত ভাবে ডাক্তারবাবুকে টিভির সামনে উঠে আসতে দেখেই বুঝল, কিছু একটা গোলমাল হয়েছে। ডা. দাশগুপ্তর প্রতি ইমতিয়াজের বিশেষ সম্ভ্রম আছে। ইমতিয়াজের বিবির হার্টে একটা ফুটো ধরা পড়েছিল, সেই সময়েই ডা. দাশগুপ্ত বসিরহাট হাসপাতালে পোস্টিং নিয়ে আসেন। নতুন ডাক্তারবাবু ওদের অভয় দিয়ে, নিজেই অপারেশন করেছিলেন। ইমতিয়াজের বিবি রেহানা, এখন সম্পূর্ণ সুস্থ।

    অয়নকে স্টিয়ারিং ধরতে দিল না ইমতিয়াজ, আড়াই ঘণ্টার পথ অতিক্রম করে ওরা যখন রঞ্জনার হাসপাতালে ঢুকল। তখন সেখানে লোকে লোকারণ্য। দিশাহারা অয়ন, ইমতিয়াজের ডাকে সংবিৎ ফিরে পায়। হঠাৎ বাজতে থাকা ফোনে সে দেখে, রঞ্জনা কলিং। এতক্ষণের ধরে রাখা বাঁধ ভেঙে যায়। হৃদযন্ত্রের বিশিষ্ট চিকিৎসকের সীমারেখা অতিক্রম করে, হৃদয়ের অন্তস্তল থেকে, রঞ্জনার কবেকার ছোটবেলার সাথি, অয়ন বলে ওঠে, “আমি তোকে খুব ভালবাসি রঞ্জু, কেন আমার ফোন তুলিসনি? কেন এত কষ্ট দিলি আমায়!”

    “কী করব বল, মাথার ঠিক ছিল না। একজন কলিগ অতক্ষণ লিফ্টে আটকে আছে, সেটা প্রথমে কেউ জানতেই পারেনি। ওই লিফ্টটা মেরামতির জন্য বন্ধ ছিল, ডা. মানসী সেন ভুল করে ওটায় ঢুকে আটকে পড়েন, মোবাইল ফোনটাও ডিপার্টমেন্টে ফেলে গেছিলেন বলে কাউকে ডাকতে পারেননি। পরে একটা ইমার্জেন্সি পেশেন্ট আসায় ওঁর খোঁজ পড়লে ব্যাপারটা জানাজানি হয়। খবরে যে গায়নোকলজি ডিপার্টমেন্টের মহিলা চিকিৎসক, ডা. সেনের লিফ্টে আটকে থাকার খবর দেখিয়েছে, সেটা তো জানি না; ফোনও দেখিনি। একটু আগে ওঁকে লিফ্ট থেকে উদ্ধার করার পর, ফোন চেক করতে গিয়ে দেখি তোর অসংখ্য মিস কল, মেসেজ। ভাগ্যিস ফোনটা আগে চেক করিনি, নয়তো তোর মনের কথা মুখ ফুটে বলতে কত জন্ম লাগিয়ে দিতিস বল তো অয়ন? আমি তো বুড়ি হয়ে যেতাম ততদিনে!”

    রঞ্জনাকে বাড়িতে নামিয়ে, অয়নকে নিয়ে বসিরহাট ফিরছে ইমতিয়াজ। স্যরেরও শিগগিরই তার মতো বিবি হবে; রেহানার কথা ভেবে ইমতিয়াজের ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে।

    ঠিকানা

    স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পরে প্রায় এক বছর সময় অতিক্রান্ত, বহু ইপ্সিত সোনালি চাকরিটির দেখা নেই। গোটা পাঁচেক চাকরির পরীক্ষায় বসা হয়ে গেছে, সেইসব পরীক্ষার ফল প্রকাশের জন্য হাপিত‍্যেশ আর নতুন পরীক্ষার প্রস্তুতির মাঝে হাইফেনের মতো জুটে গেছে একটা কাজ চালিয়ে নেওয়া গোছের টেম্পোরারি জব। ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হলেও স্বপ্ন দেখার ইচ্ছে তরুণ প্রাণের ধর্ম, আমিও তার ব্যতিক্রম নই।

    হাতের লক্ষ্মী সেই সাময়িক চাকরির সামান্য বেতনের টাকায় কেনা, সস্তার লাল সালোয়ার বুকে নিয়ে ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় পাড়ায় ঢুকছি, ফাঁকা পকেটেও নিজেকে ধনী মনে হচ্ছে।

    “ভালোবাসা পিঁড়ি পেতে রেখেছিল উঠোনের কোণে

    কিন্তু সে পিঁড়িতে এসে এখনও বসেনি

    কেউ, ধীর পায়ে এসে, ত্রস্ত একা একা…”

    বসেনি, তবে বসতে চায় কি না, আমাকে জানতেই হবে।

    আজ মনের কথাটা বলেই ফেলব। আত্রেয়ী মণ্ডপে বসে ছিল, দেখলাম হঠাৎ উঠে মণ্ডপের পিছনের দিকের রাস্তায় হাঁটা লাগাল। মনে হল, আমাকে দেখতে পায়নি।

    আমি ওকে ধরব বলে দৌড়ে গেলাম। পুজোমণ্ডপের পিছনের রাস্তায় একটা প্রাচীন তেঁতুল গাছ ছাড়িয়ে কিছুটা গেলে আত্রেয়ীদের বাড়ি। গাছটা পেরিয়ে যাওয়ার সময় আত্রেয়ীর গলা পেলাম, “শুধু তোকে ভালবাসি, শুধু তোকেই।” পা টিপে টিপে গিয়ে সন্তর্পণে গাছের পিছনে উঁকি দিতে, স্ট্রিট ল্যাম্পের আলোয় দেখলাম আত্রেয়ীর অপরূপ স্নিগ্ধ মুখখানি; কেবল প্রেমে পড়লেই নারীরা অমন স্নিগ্ধ হয়ে যায়। ছেলেটা কে দেখতে গেলে আড়াল থেকে বেরোতে হয়। কী লাভ আর তাতে! আমার পুজো হয়তো চিরদিনের মতো শেষ হয়ে গেল।

    পিছন ফিরতেই আত্রেয়ী ডাকল, “অ্যাই গাধা, চলে যাচ্ছিস যে? কথাগুলো তোকেই বলছিলাম, এখানে অন্য কেউ নেই। তোর বুক ফাটে, তবু মুখ ফোটে না। অগত্যা আমাকেই…, আর বাবু শহিদের মতো মুখ করে চলে যাচ্ছেন!” আমি কীরকম ভ্যাবলা হয়ে সালোয়ারটা শুধু ওর হাতে তুলে দিলাম, কপট রাগসহ আত্রেয়ীর রিটার্ন গিফ্টটা বড্ড ব্যক্তিগত, গল্পে লেখা যায় না।

    “গভীর গভীরতর রাত শেষ হলো…

    ছায়া ছিলো, মায়া ছিলো, মুছে সব ক্ষত।”

    তারপর পঁয়ত্রিশটা পুজো কেটে গেছে, আমার সেদিনের ভ্যাবলা ভাবটা আজও কাটেনি, আত্রেয়ীর দাপটও। শুধু ঠিকানা বদলে সে আমার ঠিকানাকে নিজের করে নিয়েছে।



    অলংকরণ (Artwork) : রাহুল মজুমদার
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  •   (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments