




কালো-সাদা প্রিন্ট মুর্শিদাবাদী সিল্কের ঘোমটা শঙ্খের মতো ফ্যাকাশে মুখমণ্ডল ঘিরেছে। শীর্ণ শুভ্র দুহাতে ভারী সোনার চুড়ি, বাঁ-নাকের পাটায় সলিটেয়ার জ্বলজ্বলে। সদ্য সত্তর ছুঁয়েছেন। একদার নম্র কোমলতা মরে গিয়ে অভেদ্য আভিজাত্য। চশমা-ঢাকা স্তিমিতচোখে ক্লান্ত কাজলরেখায় বয়সের স্পষ্ট দাগ। চেক্-ইন্ করে উত্তরা লাউঞ্জের চেয়ারে বসলেন। ফ্লাইটের খানিক দেরি আছে। পায়ের কাছে কেবিন লাগেজ। কোলের ছোটো ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে পিংক লিপস্টিক বের করে শুকনো ঠোঁটে বুলিয়ে নিলেন।
কাচের বাইরে রোদে দাঁড়ানো বিমান। সেদিকে তাঁর বিমনা দৃষ্টি অনুসরণ করলে বোঝা যেত চোখে অজস্র চিন্তা ও উদ্বেগের কাটাকুটি। দায়িত্বভার একমাত্র সন্তানবিয়োগের শোকও পাথরচাপা দিয়ে রাখে।
গিয়েছিলেন বীরভূমে—নাতিকে শান্তিনিকেতন কলাভবনে ভর্তি করতে। ভর্তির সময় পেরিয়েছে। তিনি কর্তৃপক্ষকে সনির্বন্ধ অনুরোধ করেছেন যাতে স্পেশাল কেস বলে ধরা হয়। জন্মেজয়ের স্কুলের ও ভর্তি-পরীক্ষার রেজাল্ট দেখে কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দিয়েছেন। জয় তাঁর বংশের শেষ প্রদীপ, শেষ আঁকড়ে-থাকা দুর্বলতা। হেতমপুরের কাছে উত্তরার মামাশ্বশুরের বাড়ি। এঁরা একদার সম্পন্ন বনেদী জোতদার। ক্রমশঃ অবস্থায় ভাঙন ধরেছে, সনাতনী ঠাটবাট প্রায় অস্তমিত। প্রকাণ্ড বাড়ির কিয়দংশ অযত্নে, অব্যবহারে জীর্ণ। হয়তো সাপখোপের আস্তানাও! অস্বস্তি বয়ে ওখানে রেখে এলেন নাতিকে। কী অসহ্য কষ্ট হচ্ছিল আসার সময়ে, বুক মুচড়ে উঠছিল। প্রকাশ করেননি। চুপিচুপি বলেছিলেন,
—সাবধানে থেকো জয়। আমি আবার আসবো। শিগ্গিরই হস্টেল পেয়ে যাবে, তখন আর ভাবনা নেই।
সম্মতিতে মাথা নেড়েছিল জন্মেজয়। চোদ্দো বছরের উচ্ছল চঞ্চল কিশোর ঘটনার আকস্মিকতায় অন্যরকম হয়ে গেছে। বয়সের আন্দাজে ধীর, পরিণত। বিনা প্রশ্নে মেনে নিয়েছে ঠাকুমার সমস্ত সিদ্ধান্ত। প্রায় অচেনা মানুষজনের মধ্যে থাকতে আপত্তি করে বলেনি,
—ঠামি তোমার সঙ্গে ফিরে যাবো।
চোখের গোপন জল অজান্তে কাজল গলে নামছিল, তাড়াতাড়ি আঁচলে মুছলেন। বাগডোগরাগামী বিমানের যাত্রীদের নামডাকা শুরু হয়েছে। মাঝারি সাইজের ডাফল ব্যাগ কাঁধে তুলে লাইনে দাঁড়ালেন।
স্বকথনপর্ব:-
(১)
“আমার বাড়ির দোতালার বারান্দায় কাঠের রেলিং। এখানে একা কাটাতে ভালোবাসি। কথা বলার লোক না থাকলেও দিব্য কেটে যায়। সন্ধ্যেগুলো নিঝুম। দিনশেষের আকাশ, পশ্চিমগামী সূর্যের অবর্ণনীয় রঙ, ঝাঁকে-ঝাঁকে ফিরতি পাখির ডানা ঝাপটানো, ডাকাডাকি, সন্ধ্যে পেরোলে ঝিঁঝিঁর সমবেত বিচিত্র ডাক। এখানে সাবিত্রী চায়ের সরঞ্জাম রেখে দিয়ে যায়। সাবিত্রী-দিনেশ নীচে আউটহাউসে থাকে, আমার দেখাশোনা করে।
সামনে পাকা রাস্তাটি পেরিয়ে খানিক গেলে সবুজ চা-বাগান। চা-বাগান, আমার এই বাসা— বাবার উপহার, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া। লেখার জন্যে চামড়া-মোড়া ডায়েরি আর দামি পেন দিয়েছিল— থাক্ আপাতত।
বাবার কথা মনে পড়ে। একরাশ রঙিন পৃষ্ঠা বুকের ভেতরে উড়তে থাকে। আজন্মের এই ঠাঁই – শৈশব, বয়ঃসন্ধি, যৌবন যাপন। অতি প্রিয় এখানকার দিগন্তব্যাপী চা-বাগান, অঝোর রোদ-বৃষ্টির উজ্জ্বল দিন। মনে পড়ে আমাদের ভাইবোনের অমলিন দিনপাত, বাড়ির গাড়িতে মিশনারি স্কুল, যখন-তখন বুনো হাতীর সাক্ষাৎ, বর্ষায় বাংলোর পাশের নালায় সদ্য-জন্মানো চিতাবাঘের শিশু-শাবক, বারান্দার কাঠের খুঁটিতে পেঁচিয়ে-থাকা সাঙ্ঘাতিক বিষধর— এসব প্রাকৃত জন্মগতভাবে মিশে গেছে আমার রক্ত ও মজ্জায়। বড়ো ভালোবাসতাম দাদাকেও।
দাদা চলে গেছেন কবে, মৃত্যুর আগে ক-টি বছর পুলিশী অত্যাচারে জীবন্মৃত হয়ে ছিলেন। অভিশপ্ত বছরটা না ঘুরতে চলে গেলেন বাবাও।
অনতিদূরে বাবার মূল বাংলোটি। একাংশ কেয়ার-টেকারের দায়িত্বে রেখে বাকিটা সাজিয়ে-গুছিয়ে ‘হোম-স্টে’ করেছে দাদার ছেলেরা। পর্যটকের ভিড় লেগে থাকে। চা-বাগানের সিংহভাগ বিক্রি করে বহুদিন তারা শহরবাসী। ভালোই করেছে, আমার মতামত নেই এখানে।
(২)
—বেশ বেশ। শেখো কোথাও?
সেই মন্দ্রকণ্ঠ আজও আচমকা আমার কানে বাজে। আমার আঠারো বছরের জন্মদিনে বাবার উদ্যোগে অতিথি সমভিব্যহারে পিকনিক করতে গিয়েছিলাম জঙ্গলে, অনামা ঝোরার পাশে। বাবা আমোদ-উল্লাস পছন্দ করতেন। আমাকে আদেশ করলেন,
--অতিথিদের তোমার গান শোনাও উত্তরা।
সেবারে বাবার অতিথি তিন ভাই— সত্যসিন্ধু, সমীরণ ও সব্যসাচী। কলকাতার বিখ্যাত, অভিজাত ব্যবসায়ী। বাবা তেমনটাই পরিচয় দিলেন। এঁরা বিশেষ কাজে এসেছেন চা-বাগানে। তিন প্রৌঢ়ই সুদর্শন। তৃতীয়জন যে বেশ আলাদা, সেই বয়সেও বুঝতে পারছিলাম। ছিপছিপে সুঠাম চেহারা, এলোমেলো ঘন চুল, উদাসী দৃষ্টি, ঠোঁটের কোণে হাসি। ঝুলন্ত ক্যামেরা বারবার চোখের সামনে এনে ছবি তুলছিলেন।
প্রথাগত সঙ্গীত-শিক্ষার সুযোগ আমি পাইনি। রেডিও, রেকর্ড শুনে গান অভ্যাস করতাম। অপরিচিতদের সামনে সঙ্কোচ নিয়ে শুরু করলেও ক্রমে আপন আনন্দে গলা খুলে দিলাম। একটু পরে আমার সঙ্গে তিনি গলা মেলালেন, থেমে গেলাম আমি। উন্মুক্ত আকাশ-প্রান্তর জুড়ে বাজতে লাগল গভীর উদাত্ত সুর। কারো মুখে কোনও কথা নেই। বাবা মুগ্ধ, বাকরুদ্ধ। আমি বাবার গা-ঘেঁষে দাঁড়ানো, সম্মোহিতের মতো তাকিয়ে আছি ওঁর দিকে। বাবা বললেন,
—অসাধারণ সব্যসাচীবাবু! আপনি এমন গুণী মানুষ—!
বড়ো ভাই সত্যসিন্ধু অল্প হেসে বলেছিলেন,
—ওর অনেক গুণ পরমেশবাবু। শান্তিনিকেতনের ছাত্র ছিল। ওখানে কাটিয়েছে, কিছুদিন কবিসান্নিধ্যও পেয়েছে। ওর গানের রেকর্ড আছে ‘কিরীটি মিত্র’ নামে। ফোটোও তোলে অসাধারণ। বেশ ক-খানা বিদেশের ম্যাগাজিনে ছাপাও হয়েছে।
--বলেন কী? কিরীটি মিত্র—আপনিই?
--কিছু না কিছু না। আমি শিকারীমাত্র। বড়দা’ স্নেহবশত বেশি বলছেন—।
তাঁদের কথপোকথন আর শুনতে পাচ্ছিলাম না। চারহাত দূরে দাঁড়িয়ে কিরীটি মিত্র— ইনিই! এঁর রেকর্ড আছে আমার কাছে। কত যে প্রিয় আমার আর আমার দাদার! গা শিরশির করছে। দাদা আমার কানের কাছে ফিসফিস করে কী যেন বলল, খেয়াল করতে পারছি না। বাবা সবিনয়ে অনুরোধ করেন,
—সত্যবাবু, আপনাদের পারিবারিক মকদ্দমার ঝঞ্ঝাট না মেটা পর্যন্ত আমাদের এখানে নিশ্চিন্তে থাকুন। আমদের এখানে স্থানাভাব বা অন্য কোনোরকমের অসুবিধে হবে না, প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। আপনাদের টী-এস্টেট-সংক্রান্ত ডিলস্ আমি নিজে দেখব। একমাত্র অনুরোধ, যদ্দিন আছেন আমার কন্যাটিকে গানের তালিম দিতে হবে। বড়ো ভালোবাসে গান।
শুরু হল আমার গান-শেখা, প্রথম অনাত্মীয় পুরুষ-সান্নিধ্য। প্রাথমিক সঙ্কোচ পেরিয়ে ছাত্রী-শিক্ষকের বন্ধুতা। পিতৃসম পুরুষটির চোখে হাসিতে, স্বরে গোপন ভাষা—। কেন শিহরণ অনুভব করি? কেন লজ্জা পাই নিজের কাছে? এ কোন অচেনা অনুভূতির খেলা? ভয় পেতে শুরু করলাম নিজেকে। আমি কী তাহলে তাঁকে— কাকে বা বলি একথা? হয়তো মা লক্ষ করতেন আমাকে, জানি না। একসন্ধ্যায় ডেকে পাঠালেন। সে-ঘরে বাবা, মা ও মাস্টারমশাই। আমার বুক-দুরুদুরু। পায়ের দিকে তাকিয়ে কাঠ হয়ে বসে আছি। বাবা আমাকে যতই ভালোবাসুন, তাঁর কোনো নির্দেশ অমান্য করার শক্তি আমার নেই। বাবা ভণিতাবিহীন সরাসরি প্রস্তাব রাখলেন,
—আমরা আপনার গুণমুগ্ধ। আমার উত্তরাকে পরিবারে গ্রহণ করতে আপত্তি আছে?
আমি জানি উনি বিপত্নীক, দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গেও তত সম্পর্ক নেই। জানি না কী ভেবে অনুরোধ করেছিলেন বাবা, কিন্তু সে-মুহূর্তে আমি যেন পালাতে পারলে বাঁচি। মনে মনে বলছি, পৃথিবী দু-ভাগ হও।
সব্যসাচী আশ্চর্য সৌম্য সংযত হয়ে শুনলেন। সংক্ষেপে বিনীতভাবে বাবাকে বললেন,
—পরমেশবাবু অকপটে ক-টি কথা বলি। আমার অনেক ‘গুণ’ আপনাদের অজানা— শহরে কান পাতলেই ওসব শোনা যায়। অনেক বিচিত্র নাম আমার! সে-সব জটিলতা জেনে কাজ নেই, সহজ মানুষ আপনারা। কন্যাসম সরল ছোট্ট মেয়েটির সামনে নিজেকে অপমান করতে চাই না। আপনারা সম্মত হলে ওঁকে আমার পুত্রবধূ করে নেবো।
(৩)
আমার মতামত কেউ চাননি, আমি চাই কি না জিজ্ঞেস করেননি। বাবার অভিরুচি, বাবার কৃতজ্ঞতার ঋণশোধ— দিনক্ষণ মিলিয়ে মিত্র-পরিবারে সব্যসাচী মিত্রের পুত্র অভিমন্যু মিত্রের হাতে বাবা তাঁর অষ্টাদশী সবস্ত্রা-সালঙ্কারা কন্যাকে সম্প্রদান করলেন। আমার মন বিদ্রোহ করে উঠে আপনা-আপনি স্তব্ধ হয়ে গেল। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও অধিকার আমার ছিল না, আমি মেনে নিলাম।
ঈশ্বর সহায়, বাবার সিদ্ধান্তে কোনো ভুল ছিল না।
অভিমন্যুর সঙ্গে হনিমুনে দার্জিলিং-এর দশদিন আমার স্মৃতিতে আজও সোনা-ঝলমল কাঞ্চনজঙ্ঘা। সে এক শোভন-সুন্দর প্রেমিক পুরুষ। তার বাবার মতোও বটে, আবার নাও বটে। শিবপুরের ইঞ্জিনিয়র অভিমন্যু ছিলেন আমার চেয়ে প্রায় দশ-বছরের বড়ো, আমার দাদা ঈশানের সমসাময়িক। মেধা-বুদ্ধি-রূপ এবং নির্মল চরিত্রে আলোকিত মানুষ। এমন সৌভাগ্য হবে, আমি কল্পনা করিনি। বাবার প্রতি আমার শ্রদ্ধা বেড়ে গেল। আমি অভিমন্যুতে ডুবে গেলাম। স্বপ্নের মতো প্রেমাচ্ছন্ন আমাদের দিনরাত— প্রত্যহ বদলে যেতে থাকলাম, প্রতিপলে আবিষ্কার করলাম নিজেকে।
মাস দুই যাতায়াতের পরে কলকাতায় শ্বশুরঘরে পাকাপাকিভাবে এলাম। বড়ো শহর, তাঁদের ব্যবসা, প্রাসাদের মতো বাড়ি, কত শরিক, মামলা-মকদ্দমা, বিবিধ মানুষের এখানে নিত্য আসা-যাওয়া। আগে কয়েকবার বেড়াতে এসেছিলাম মাত্র, এবারের আসা অন্যরকম। চা-বাগানের নিরিবিলি সহজ সবুজ প্রকৃতির কোলে অভ্যস্ত মেয়ে আমি, জটিলতায় বড় ভয়। অথচ এবাড়ির এত মানুষ, এতরকম কথার আবাদ! কাউকে বুঝে উঠতে পারি না, শুধু ভয় করে। অভিমন্যু যখন থাকেন নিরাপদ লাগে। কিন্তু উনি ইদানিং ভারী ব্যস্ত, রাতে শোওয়ার আগে দেখাও হয় না।
আজকাল যেন ভারী অন্যমনস্ক— রাত জেগে পড়াশোনা করেন। কী হয়েছে জানতে চাইলে সস্নেহে এড়িয়ে যান, বলেন চিন্তা না করতে। দুশ্চিন্তায়, সংশয়ে আমার বুক কাঁপে। বড় অস্থির সেই সময়— ১৯৭০, উপর্যুপরি নানা ঘটনার প্রবাহে কলকাতা উত্তাল, তোলপাড়, লণ্ডভণ্ড। অশান্তির খবর কানে আসে। আমি শুনেছি আমাদের ওদিকে চা-বাগানের কাছাকাছি জায়গা থেকে গোলমালের সূচনা। রাজনীতির কিছু বুঝতে পারি না, তবু কিসের আশঙ্কায় অভিমন্যু বেরিয়ে গেলে ওঁর বইগুলো খুঁজতে থাকি, পাই না।
অভিমন্যু আমাকে বলেছিলেন, কলকাতায় এসে নতুন সেশন শুরু হলে আমাকে কলেজে ভর্তি করে দেবেন। কিন্তু, আমাদের গভীর প্রেম ইতিমধ্যে আমার দেহে নতুন চারা রোপন করেছে। আমি বুঝিনি প্রথমে, বুঝেও অস্বস্তির কথা কাউকে বলতে পারিনি। অভিজাত এই বাড়ির সকলে আমার কাছে অনেক দূরের মানুষ।
অনুপায় হয়ে শেষ পর্যন্ত লজ্জা ঠেলে রেখে অভিমন্যুকেই জানাতে হল। শুনে অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন, খানিক পরে উচ্ছ্বাসে অসংযত হয়ে পড়লেন। তাঁর আকুলতা দেখে হঠাৎ আমার মন কেমন করে উঠল, চোখে জল এল। উনি কী বুঝলেন জানি না। সস্নেহে বললেন,
—চলো তোমাকে বরং তোমার বাবা-মায়ের কাছে রেখে আসি, অভ্যস্ত পরিবেশে আনন্দে থাকবে। ডেলিভারির আগে এখানে নিয়ে আসব।
ফিরে গেলাম চা-বাগানে। সেখান থেকে চোখের জলে অভিমন্যুকে বিদায় দিলাম। দিন কাটতে লাগল। উনি ফোন করতেন, আমাদের এখানে এসে ঘুরে গেলেন। কী জানি কেন মনে হত ভেতরে অসম্ভব অস্থির, অশান্ত, দ্বিধান্বিত হয়ে আছেন। হয়ত কিছু বলতে চাইতেন, পারতেন না। আর অতি সাধারণ মেয়ে আমি, জিজ্ঞেস করতে ভয় করত, অতি ভীতু ছিলাম। শেষ যে-বারে এলেন, আমার সাতমাস চলছে। উনি পরম আদরে কান পেতে দীর্ঘক্ষণ ধরে গর্ভের সন্তানের অস্তিত্ব অনুভব করলেন। বললেন,
—ছেলে হলে নাম রাখবো পরীক্ষিৎ। এমাসের শেষে এসে তোমাকে কলকাতায় নিয়ে যাবো, নার্সিংহোম বুক করে রেখেছি।
চলে যাওয়ার সময়ে অসম্ভব একটা আশঙ্কায় হু-হু করে উঠছিল আমার বুক। ওঁকে বারবার সতর্ক করেছিলাম,
—সাবধানে থেকো, খুব সাবধানে।
(৪)
জ্ঞান হতে দেখলাম আমার মুখের ওপরে আমার মায়ের মুখ ঝুঁকে আছে । অদূরে ঝাপসা-ঝাপসা ক-জন মানুষ। মনে হল বাড়িতে নয়, নার্সিংহোমের বেডে শুয়ে আছি। আমার দু-কব্জি ছুঁচ ফোটানো নল। ডক্টর পার্থসারথি যাদব খুব নামকরা গাইনোকলোজিস্ট, শ্বশুরমশাইয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কাছে এসে আমার কপালে হাত রেখে আশ্বাস দিয়ে বললেন,
—এইতো চোখ খুলেছে। ভয় নেই আর, সঙ্কট কেটে গেছে। যদিও বাচ্চা অন্তত টু-উইক্স ইনকিউবটরে থাকবে।
—তুমি ছিলে বলে আজ মা-বাচ্চা দু-জনকে ফিরে পেলাম!
আমি শ্বশুরমশাইয়ের অস্পষ্ট ঘরঘরে স্বর শুনতে পেলাম।
আমার কোমরের নীচটা অসাড়মতো, পা নাড়ানোর চেষ্টা করতে গিয়ে টনটন করে উঠল। আশ্চর্য, আমার প্রসারিত মধ্যদেশ আবার আগের মতো ক্ষীণ। মা-কে ইশারায় ডাকলাম। কী বললাম ফিসফিস করে মনে নেই। মা বললেন,
—তোর সুন্দর ছেলে হয়েছে বুড়ি।
শুনে কোনো আগ্রহ জাগল না। আনমনে বললাম,
—কিন্তু সে কই? ছেলে দেখতে এল না!
মা যে অতিকষ্টে কান্না সামলাচ্ছেন, ঘোরের মধ্যে বুঝতে পারিনি। ওষুধ, ইঞ্জেকশনে প্রায়-অচেতনভাবে কতগুলো দিন পেরিয়ে গেল। নার্সদের কানাঘুষো শুনতে পেয়েছিলাম, ডাক্তার যাদবের হাতযশের তুলনা নেই। আমার প্রায় মরে যাওয়া বাচ্চা নাকি বেঁচে উঠেছে! বিছানায় শুয়ে যা যা কানে আসে শুনি, প্রতিক্রিয়া হয় না। অনেক কথা বুঝতে পারি না। অবসাদ আর অন্ধকার আমাকে ঘিরে রেখে দিয়েছে। তিন সপ্তাহ পরে ছেলে-কোলে শ্বশুরবাড়িতে ফিরে এলাম, ওঁরা সাড়ম্বরে নিয়ে এলেন আমাকে। সব কিছু বড় অপরিচিত ঠেকছিল। ওঁদের আচার-অনুষ্ঠান শেষ হলে আমাদের শোওয়ার ঘরে এলাম। দেখলাম দেওয়ালে অভিমন্যুর বিশাল ফোটো, মালা-পরানো। ফুলের গন্ধে ঘর ভরে আছে। টানা-টানা গভীর চোখে মৃদু হাসি। আমাদের দেড় বছরের দাম্পত্য, পল্লবিত স্বপ্ন এসে জট পাকিয়ে ভিড় করে সামনে দাঁড়াল। তারপর বুঝলাম, সে আর নেই! আমার জীবনের চরম ক্ষতির সেই প্রথম উপলব্ধি হল।
সময়ের আগে ভূমিষ্ঠ পিতৃহীন ক্ষুদ্রকায় আমাদের শিশু আমার কোলে। তাকে জড়িয়ে নিয়ে অঝোর চোখের জলে ভাসছিলাম। ধীরে-ধীরে মনে পড়ল, উনি চা-বাগান থেকে কলকাতায় ফেরার ঠিক দু-দিন পরে দুঃসংবাদ পেয়ে বাবা অবিলম্বে আমাকে নিয়ে এসেছিলেন কলকাতায়। তারপর সোজা লালবাজার— অভিমন্যুর রক্তাক্ত দেহ আমার চোখের সামনে পড়ে আছে। এরপরে আর মনে নেই। ওখানে দাঁড়ানো অবস্থায় আমি অচৈতন্য হয়ে মাটিতে পড়ে গিয়েছিলাম— একথা মা-র কাছে শুনেছি।
(৫)
আমি পরীক্ষিৎকে নিয়ে বাবা-মা-র সঙ্গে চা-বাগানে চলে গেলাম। শুনলাম দাদাকে কলকাতায় পুলিশ এ্যারেস্ট করেছে। আমার বৌদি সন্তানসম্ভবা। বাবা-মা-বৌদির মুখ চেয়ে নিজের শোক গোপন করতে শিখলাম। আমার অভ্যন্তরে দৃঢ় ও কঠিন হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল। দিন কাটতে লাগল। ক্রমশ রাজনৈতিক পরিস্থিতি বাহ্যিকরূপে খানিক থিতু হয়ে এল। পরীক্ষিৎ বড়ো হতে লাগল সজীব প্রকৃতির মধ্যে। সময়মতো কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি করে দিলাম।
কলকাতার আমার শ্বশুরকুল আমাদের ফিরিয়ে নিতে চাইছিলেন। বুঝতে পারছিলাম ওঁদের বংশধরকে ওঁরা কাছে রাখতে চান। নিজেকে শক্ত রেখে সংক্ষেপে নম্রভাবে বলেছিলাম, যাবো, আর কিছুদিন যাক।
অন্যায় করেছিলাম হয়ত! আসলে আমিও মন প্রস্তুত করছিলাম। প্রচণ্ড ঝড় পেরিয়ে পরীক্ষিৎ সুস্থ, স্বাভাবিক এবং জীবিত আছে, এইতো ঈশ্বরের আশীর্বাদ। ডাক্তার পার্থসারথির কৃতিত্বও অনস্বীকার্য।
বাবা ক্ষয়ে যাচ্ছিলেন দ্রুত। অনেক অজানা কথা জানার বাকি থেকে গেছে আমার। একদিন জিজ্ঞেস করলাম,
—কোন অপরাধে তাঁকে এভাবে মরতে হল বাবা?
বাবার ব্যথিত, বিষণ্ণ চোখ আমার বুকে বিঁধে গেল। অন্যদিকে চেয়ে উদাসভাবে বললেন,
—তার অপরাধ? কিছুই না! বড়ো ভালো মানুষ ছিল সে, এই হয়ত অপরাধ।
আমি নিঃস্পন্দ রইলাম। বাবা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তত্ব বোঝাতে লাগলেন আমাকে—শ্রেণীশত্রু, বুর্জোয়া, সাব-অল্টার্ন শব্দ এবং সেসবের অর্থ। তত্ব অনুযায়ী অভিমন্যু বুর্জোয়া। অথচ পরোক্ষে গণ-আন্দোলনকে সমর্থন করতেন, অর্থসাহায্য করতেন।
কী বুঝলাম জানি না।
তবে একথা অন্তরে বুঝলাম অভিমন্যুর মতো উজ্জ্বল এবং উদার আর একজন তাঁর প্রজন্মে তাঁদের বংশে নেই। শুনেছি, শত্রুপক্ষ অর্থাৎ শ্বশুরমশাইয়ের জ্ঞাতি অন্য শরিকপক্ষ থেকে অভিমন্যুর সামগ্রিক কাজকর্ম ও গতিবিধির ওপরে খুব গোপনে নজর রাখার জন্যে লোক মোতায়েন করা হয়েছিল। পাকেচক্রে অদৃশ্য কোন চক্রব্যূহের ফাঁদে পড়েছিলেন অভিমন্যু। যখন পরিস্থিতি বুঝলেন, তখন মেরুদণ্ড সোজা রেখে সেখান থেকে বেরোনো তাঁর পক্ষে প্রায় অসম্ভব ছিল। নিজের আদর্শে একক ও নীরব লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ওই অবস্থায় সাহায্য করা হয়ত তাঁর স্নেহপরায়ণ পিতা-পিতৃব্যের সাধ্যাতীত ছিল। আমি ষড়যন্ত্র, জটিলতা, চক্রান্ত, কিছুই বুঝিনি। তবে মনে হয়েছিল একজন শক্তিশালী প্রতিযোগী সরিয়ে দিতে সফল হওয়াতে অবধারিতভাবে বিরোধীরা স্বস্তি পেয়েছে।
অভিমন্যুর বাবা-জ্যাঠারা মিলে জ্ঞাতি শরিকদের বিরুদ্ধে কেস লড়ছেন— হয়ত জয়ী হবেন। কিন্তু কোনো কিছু সহজে হওয়ার নয়। সেই রক্তাক্ত চেহারার ছবি আমার স্মৃতিতে গভীর ক্ষতের মতো গেঁথে আছে।
ক্রমশ সকলের ওপরে বিশ্বাস ও আস্থা হারিয়ে ফেলেছি। শুধু নীরব প্রার্থনা করি তাঁর প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ ষড়যন্ত্রী ও হত্যাকারীদের যেন কঠিনতম শাস্তি হয়।
ধীরে-ধীরে জানতে পেরেছি অভিমন্যুর সেসব কাজে আমার দাদাও দোসর ছিলেন। দু-জনের ভারী ভাব দেখেছি— আত্মিক যোগ।
(৬)
চারদিকে অনেক পরিজন ঘিরে থাকলেও আমি আলোহীন একক সাধারণ মা। মাঝে-মাঝে নিশুতি রাতে স্বপ্ন দেখি, কারা যেন আমার শ্বশুরকুলের শেষ জীবিত মানুষটিকেও ধ্বংস করে দিতে চায়। অভিমন্যুর রক্তাক্ত চেহারা কয়েক সেকেন্ড দেখেছিলাম, ছবিটা আবছা হয়ে গেছে। আর জ্বলজ্বলে একজোড়া অপরিচিত চোখ আমার দিকে হিংস্রভাবে তাকিয়ে আছে, সজোরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিচ্ছে আমাকে— অস্পষ্টভাবে এমন দুঃস্বপ্ন দেখি। কার চোখ? কতরকমের মানুষ আসতেন ও-বাড়িতে—যতদূর মনে পড়ে ওই দৃষ্টি দু-চারবার দেখেছিলাম, শ্বশুরমশাইদের কোন গুরুপুত্র। নাম জানতাম না। কেমন হতশ্রী, পরিশ্রমী, উদাস চেহারা। উনি কি থানায় ছিলেন সেদিন? না আমার দৃষ্টিবিভ্রম? কেন এমন অদ্ভুত স্বপ্ন আসে? প্রবল ভয়ে ঘুম ভেঙে উঠে বসি, একা-একা মনে করার চেষ্টা করি।
জীবন থেকে কী পেলাম ভাবলে অসাড় লাগে। যৌবনের শুরুতে আছড়ে-পড়া বিপর্যয়ে আমি চুরমার হয়ে গেছি। ছেলেকে নিয়ে বিরাট কোনো স্বপ্ন দেখতে ভয় পেয়েছি, তেমনভাবে আগলেও রাখিনি। চেয়েছি নিজের মতো করে সে বেড়ে উঠুক— সহজ, স্বাভাবিক, সৎ মানুষ হয়ে। ছোটোবেলা থেকে ছেলে সুস্থির, বাধ্য। খেলাধুলো করেছে, পায়ে হেঁটে আশেপাশে একা ঘুরে বেড়িয়েছে। আমাদের এদিকের প্রান্তিক দরিদ্র মানুষের সঙ্গে মিশেছে। বাধা দিইনি।
পরীক্ষিতকে পিতৃপরিচয়ের অধিক আর কী-ই বা দিতে পারলাম? অভিমন্যু তাঁর পুত্রের কাছে অদেখা লিজেন্ড হয়ে আছেন। বাবার গভীর মেধা না পেলেও সে পাঠে আগ্রহী, পরিশ্রমী। সবচেয়ে বেশি দেখেছি পরিবেশ-সচেতনতা এবং এখানকার খেটে-খাওয়া মানুষের প্রতি অঢেল সহমর্মিতা। আমার প্রতি তার শ্রদ্ধা স্নেহ আমার সকল অন্ধকার মুছে নিয়েছে। আমার শূন্য অংশ আমি ওর কাছ থেকে সাবধানে আড়াল করে রেখেছি, অবসাদ থেকে সরে থাকার চেষ্টা করি।
আই-সি-এস্-ই পরীক্ষা শেষ হলে উদ্যোগী হয়ে ছেলেকে কলকাতা পাঠিয়ে দিলাম— ওঁদের এবার ওকে প্রয়োজন। উপযুক্ত উত্তরাধিকারী হিসাবে ওরও নিজের দায়িত্ব বুঝে নেওয়া কর্তব্য।
ওঁদের অনেক অনুরোধ-উপরোধ সত্ত্বেও আমি স্বেচ্ছায় রয়ে গেলাম চা-বাগানে। আমার একক শান্ত দুনিয়ায় অভ্যস্ত। এখানে ছোটো হলেও আমার প্রপার্টি আছে, তার তদারকির দরকার আছে। কিন্তু কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগ, যাতায়াত বজায় রাখলাম। আসলে গত ক-বছরে আমার শ্বশুর-পরিবারে ক্রমাগত দুর্যোগ ঘটে গেছে— শরিকী অশান্তি, অঘটন, ভাঙচুর। তবু সম্মিলিতভাবে ওঁরা দাঁড়িয়ে আছেন, ব্যবসারও শ্রীবৃদ্ধি ঘটছে। কিশোর পরীক্ষিতকে পেয়ে যেন প্রাণ ফিরে পেলেন। বৃদ্ধ সত্যসিন্ধু আপ্লুত হয়ে বললেন,
--কতকাল ধরে আমরা তোমার অপেক্ষায় আছি দাদাভাই!
মহাসমারোহে ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারীকে দু-হাতে বরণ করে নিলেন স্নেহময় পিতামহেরা।
হায়ার সেকেণ্ডারির পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরীক্ষিৎ গ্র্যাজুয়েশন করল। তারপর আই-আই-এম থেকে ম্যানেজমেন্টে ডিপ্লোমা— স্বেচ্ছায় পারিবারিক ব্যবসায় যুক্ত হয়ে কাজ শিখতে লাগল। আমি নিশ্চিন্ত নিশ্বাস ফেললাম।
অসমাপিকাপর্ব:-
পরিণত বয়সে নিজের পছন্দে মালবিকাকে বিয়ে করেছিল পরীক্ষিৎ। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সুশ্রী, ভদ্র, সুশীল মেয়ে মালবিকা। উত্তরা আপত্তি করেননি। কিছুদিন আগে হার্ট-এ্যাটাকে বিদায় নিয়েছেন সব্যসাচী। প্রিয় ভাইয়ের শোকে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিলেন সত্যসিন্ধু ও সমীরণ। সকলের অনেক বারণ সত্ত্বেও প্রায়-অথর্ব দুই ভাই স্ত্রী-সহ পাকাপাকিভাবে চলে গেলেন কঙ্খলে— ওখানে আশ্রমের কাছে বাড়ি কেনা ছিল। আগেও যেতেন, মাঝে-মাঝে অবসর কাটিয়ে আসতেন।
তাঁদের গড়ে-তোলা নিরঙ্কুশ সাম্রাজ্যের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিল পরীক্ষিৎ।
একটু দেরি করে তাদের সন্তান এল— জন্মেজয়। পরীক্ষিৎ তখন তুমুল ব্যস্ত, মালবিকা যোগ্য সঙ্গী। উত্তরার মনে হচ্ছিল তাঁর কাছে এলে ভালো থাকবে বাচ্চাটি। তিনি নিজেও যে, সে-কথা বলা বাহুল্য। সেই মর্মে অনুমতি চাইলেন পুত্র ও পুত্রবধূর কাছে। মালবিকা আন্তরিক খুশি হয়েছিল,
—আমিও চেয়েছিলাম মা। আপনার ছেলের সঙ্গে আলোচনাও করেছি। শুধু ভাবছিলাম আপনি রাজি হবেন কিনা!
নির্মল হেসেছিলেন উত্তরা। নাতিকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন,
—আমার সোনার চাঁদ! তবে দায়িত্ব কি চাইলেই এড়ানো যায় মালা? তোমরা ভেবো না, আমি সর্বক্ষণ তোমাদের পাশে আছি।
সঙ্গে করে নিয়ে এলেন নাতিকে, তাঁর নিস্তরঙ্গ একাকিত্ব নাতির দুরন্তপনায় কচি সবুজে ভরে উঠল নতুন করে।
কিছুদিন ধরে চা-বাগান জুড়ে শুরু হয়েছিল চাপা শ্রমিক অসন্তোষ। বাড়তে বাড়তে ক্রমশ বিক্ষোভের আকার। বন্ধ হয়ে-যাওয়া বাগানের অনাহারী, কর্মহীন শ্রমিক এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের উদ্দেশ্যমূলক ইন্ধনে পরিস্থিতি ক্রমাগত জটিল হয়ে উঠছিল। পরীক্ষিৎ খবর পেয়ে উত্তরাকে জানাল, অনতিবিলম্বে সে আসছে। উত্তরা বারণ করলেন। আশ্বাস দিয়ে বললেন তেমন চিন্তার কিছু নয়, তিনি ঠিক সামলে নেবেন। তবু এল পরীক্ষিৎ, কোনো আবেগ কাজ করছিল হয়তো। আশৈশব চেনা জায়গা, মাটির গন্ধমাখা সেই আপন মানুষেরা! সে এসেছিল বোঝাপড়া করতে নয়, ঠান্ডা মাথায় বোঝাতে, আলোচনা করতে। ধুলোমাটির বিক্ষুব্ধ মানুষের কাছে একা গিয়েছিল।
তার আর ফেরা হয়নি।
আবার সেই উৎকণ্ঠা, উৎকণ্ঠা— কাঁটা হয়ে রইলেন উত্তরা। দু-দিন পরে পুলিশ তৎপর তল্লাশি চালিয়ে পরিত্যক্ত জঙ্গলে পরিণত কোনো চা-বাগান থেকে নিরুদ্দিষ্ট পরীক্ষিতের মৃতদেহ উদ্ধার করল। কীভাবে ঘটল, কারা জড়িত আছে সঠিক জানা যায়নি। পোস্ট-মর্টেম রিপোর্টে পাকস্থলীতে কড়া দেশী মদ ও বিষাক্ত সাপের বিষ পাওয়া গেছে। অথচ তাঁর ছেলে কখনো মদ্যপান করত না। অনুসন্ধান ও তদন্ত আরম্ভ হয়েছে, কতবছর চলবে জানেন না উত্তরা।
সেই ডায়েরি আর দামি কলম পরীক্ষিৎ তার নিজের কোনো জন্মদিনে মা-কে উপহার দিয়েছিল। বলেছিল,
—তুমি সময় পেলে যা মনে হয় লিখো মা।
খালিই পড়ে আছে উত্তরার ডায়েরিখানা, এত বছরে এক-কলমও লেখেননি। তিনি সন্ধ্যে ঘনিয়ে-আসা চরাচরের দিকে অপলক চেয়ে আছেন। সমবেত ঘন্টাধ্বনির মতো অপূর্ব একপ্রকার ঝিঁঝিঁর ডাক অলৌকিকতা বয়ে আনে। সায়াহ্নের অন্ধকারে সারি-সারি অশরীরী মুখ তাঁর দিকে চেয়ে আছে। সামনে খোলা ডায়েরি খানায় অদৃশ্য কালিতে লেখা হয়ে যাচ্ছে তাঁর কাহিনি—কেউ কখনো খুঁজে দেখবে না।
হঠাৎ পেছন থেকে কে ফিসফিসিয়ে ডাকে,
--মা!
ঘুরে দেখেন অন্ধকারে দাঁড়িয়ে শান্ত, পরিণত, মধ্যবয়স্ক তাঁর পুত্রবধূ মালবিকা। প্রচ্ছন্ন, তাঁর চেয়েও অবিশিষ্ট, তাঁর চেয়েও দুঃখী হয়ত, অতি সাধারণ মেয়ে— দেশ জুড়ে কতজন এমন!
মায়ায় ভরে উঠল বুকের ভেতর। উত্তরা দু-হাত বাড়িয়ে অবরুদ্ধস্বরে ডাকলেন, এসো মালা—।