
[দিল্লী, ১৯৮৩]
১ম পর্ব            ২য় পর্ব            ৩য় পর্ব
নেউলেদার দুল পিসি
রবিবার এসে পড়ল। ঘুম ভেঙে গিয়েছিল লুচির গন্ধে। ভাবলাম স্বপ্নের ভিতর এসেছে, স্বপ্নেই খেয়ে শেষ করতে হবে। নইলে উঠে দেখব আজ আসলে সোমবার এবং পম্পা আমাকে তার নাটকের দলের সঙ্গে কাজ করাতে নিয়ে যাচ্ছে। মনে হল মা বলছে — গন্ধ পেয়ে এক মাইল দূর থেকে নেউলে এসে হাজির। এবার তুই যদি না উঠিস তাহলে ও একাই সব খেয়ে নেবে।
তাও আবার ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুমটা দ্বিতীয়বার ভাঙল যখন দাঁত ফাঁক করে কার মোটা মোটা আঙুল আমার মুখে একটা আধখাওয়া ময়দার টুকরো ঢোকাবার চেষ্টা করছিল।
দলাটা গিলে বললাম — নেউলেদা, তুমি এ বাড়িতে কেন এসেছ? আমার নামে চতুর্দিকে মিথ্যে গুজব রটাবার পর এখন আমার লুচিগুলো খাবে বসে বসে?
লুচি আমাদের বাড়িতে একটু বেশি হয়, এবং সব সময়ে ভালো না লাগলেও আমরা যতগুলো পারি খাই, কারণ মামা কোত্থেকে জানতে পেরেছে যে একাদশ না দ্বাদশ শতাব্দীতে আমাদের এক পূর্বপুরুষ লুচি আবিষ্কার করেছিলেন। নিজেদের জিনিস যদি নিজেরা কদর না করি তো কে করবে?
নেউলেদা কানের জুলপি ধরে টেনেও আমাকে তুলতে না পেরে বলল — কয়েকটা তোর জন্য রেখে দেব যদি তুই এক্ষুণি উঠে পড়ে আমার একটা কাজ করে দিস।
আস্তে আস্তে ওঠার পর দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসি। এই বদের ব্যারিস্টারের মাথায় কোনো নতুন দুর্বুদ্ধি এসেছে। নইলে সাত সকালে আমার কাছে ছুটে আসত না। যেভাবে হোক ঠেকাতে হবে। ভিজে গামছার মতো শিষ্টাচারের শেষ আচ্ছাদনটাও ছুঁড়ে ফেলে দিতে হয়। ঠাণ্ডা গলায় বললাম — আমাকে দিয়ে কার সর্বনাশ করাতে এসেছ আজ?
নেউলেদা আমার অভদ্রতায় একটু বিমর্ষ হয়ে যায়। যদিও তার লুচি খাওয়া থামেনি। তার ফাঁকে সে একটু সময় পেয়ে বলল — তুই আমাকে আজীবন ভুলই বুঝে এলি, জয়। জার্নালিজমে শুধু নেগেটিভ হলে চলে নাকি? সময়, সীজন, এসবের সঙ্গে প্রতিদিন বদলাতে হয়।
— তুমি পজিটিভ হয়ে গেছো? তোমার আক্কেল দাঁত গজিয়েছে এতদিন পর?
জলখাবার নিয়ে ব্যস্ত নেউলেদা আমার দিকে তাকায় অবধি না। লুচিতে ফুঁ দেবার ফাঁকে ফাঁকে সে বলল — পজিটিভ শব্দটা বড্ডো সেকেলে শোনায়। নেগেটিভের নেগেটিভ বল। গোটা শহর একটা বাঘ শিকার করতে নেমেছে। আমি সেটাকে বাঁচাব।
— বাঘ? গাছের সঙ্গে বাঁধা ছাগলের মতো শব্দটার পুনরাবৃত্তি করলাম।
এতক্ষণ পরে যেন নেউলেদা আমার মধ্যে একটা প্রতিভার স্ফুলিঙ্গ দেখতে পায়। সেটা আরো ভালো করে দেখার জন্য দু-পা এগিয়ে এবং চোখে চোখ রেখে সে বলল — বাঘ মানে বগ্গা, মানে রঘুবীর, মানে বেতাল, মানে যে লোকটাকে তোর বন্ধু অক্কির মাসি যমুনার ধারে খুঁজে পেয়ে নিজের ভাই বলে ঘরে এনে ঢুকিয়েছে। যার ফলে সে এখন অক্কির মামা।
এখানেও বেতাল! বেতালের ভূত আমার পিছু ছাড়ছে না। পালাব বলে উঠে পড়লাম বিছানা ছেড়ে।
মা আমার জন্য লুচি আলাদা করে রেখে দিয়েছিল। তার সঙ্গে সরু সরু করে কাটা আলুর তরকারি আর চা। রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে তার একটা খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলাম — নেউলেদা তোমাকে আমার বিষয়ে খারাপ কিছু বলেছে?
— বলেছে তুই একটা কাঁচা হীরে। তোকে ও ঘষা-মাজা করে রত্ন বানিয়ে দেবে। লুচি ভাজতে ভাজতে বলল মা।
ইচ্ছে হল কড়াইটাতে ঝাঁপিয়ে পড়ি। জননীর প্রায় চোখের সামনে নিজের মাথাটা নিয়ে গিয়ে বললাম — মা, কখনো এই মিথ্যেবাদীকে বিশ্বাস কোরো না। পরের ক্ষতি করা ছাড়া নেউলেদার কোনো উদ্দেশ্য নেই জীবনে।
— তাহলে ওর সঙ্গে যাচ্ছিস কেন?
— কে বলেছে আমি যাচ্ছি? জোর করে কোথাও নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তুমি আটকাও।
খানিকক্ষণ চুপচাপ লুচি ভাজার পর মা বলে — ঠিক আছে তুই ঘরে গিয়ে বোস। আমি ওকে দেখাচ্ছি মজা।
একটু নিশ্চিন্ত হয়ে ঘরে এসে বসি। নেউলেদার পাতে তখনো গোটা দুয়েক লুচি পড়ে আছে। খাচ্ছেও না, রেখেও আসছে না।
আমার প্লেটটা দেখে শিমলিপুরের একমাত্র এবং নিকৃষ্টতম সাংবাদিক আরো হতোদ্যম হয়ে যায়। একটা প্রলম্বিত দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বলল — দুল পিসি বড্ডো বেশি লুচি বানায়।
অর্থাৎ নিজেরগুলোই খেয়ে শেষ করতে পারছে না তো আমারটা কী খাবে। বললাম — জোর করে খেও না। যা পারবে না রেখে যাও, আমি বিকেলে খেয়ে নেব।
— পারব না কেন? একটু আস্তে আস্তে খেতে হবে। তোর সঙ্গে কথাগুলোও বলা হয়ে যাবে।
দূরে জানালার কাছে সরে যাওয়ার সময়ে মনে মনে বললাম ‘স্টাফ ইট’। মুখে বললাম — লুচি খেয়ে বাড়ি যাও। আমি তোমার কোনো ফাঁদে পা দিচ্ছি না। আমার অন্য কাজ আছে।
— তোর বন্ধুর লাইফ তুই বাঁচাবি না? নেউলেদা মর্মাহত হবার ভান করে।
— কার লাইফ?
— অক্কন কুমার তওয়াতিয়া। ওরফে অক্কি। চোখ পাকিয়ে ভয় দেখায় নেউলেদা। — পুলিশের খাতায় যার অলরেডি নাম। তার মাসি তো থানায়। বাকি পরিবারও ঢুকব ঢুকব করছে। মাসিটা থানায় বলেছে অক্কন কুমার অমাবস্যার রাতে ভেড়িয়ার আওয়াজ শুনলেই গলা ফুলিয়ে জানালা দিয়ে বেরিয়ে যায়।
কী রাবিশ! তড়াং করে মেজাজের পারা চড়ে গেল। লোকাল কাগজগুলো খবরের নামে বাঁদরের বক্ওয়াস ছাপায়। এটাও বাস্তবিক ছাপিয়ে দেবে। দাঁত কিড়মিড় করে বললাম — নেউলেদা, তুমি আবার মিথ্যে রটানো শুরু করেছ?
— আরে, আলুর দম, থানায় আমার ইনফর্মার সেট করা আছে। কালকের মধ্যে টপ নিউজ হয়ে যাবে। নেউলেদা একটা চেশায়ার বেড়ালের মতো হাসির ফাঁক দিয়ে শব্দগুলো উগরে দেয়। — তখন দেখে নিস আমি সত্যি বলছি না মিথ্যে। দুনিয়ায় যত রিপোর্টার সব এখন দিল্লীর এই সন্সনী খেজ কেসটাকে ঘেঁটে দিতে নেমে পড়েছে। পাবলিক যত ক্ষেপবে তত সেল। আজকের স্কুপ, বেতালটার পূর্ব পরিচয় জানা গেছে। আগে ছিল গরীব স্কুল মাস্টার রঘুবীর চৌহান। সেখান থেকে হয়ে গেল জনতা পার্টির গুণ্ডা সদস্য বগ্গা। সেই বগ্গা অন্য দলের গুণ্ডাদের হাতে খুন হয়ে যাওয়ার পর এখন হয়েছে বেতাল।
গুড গড!
এগুলো সত্যি, না নেউলদা আর তার মতো শহরের আরো আধ ডজন লোকাল কাগজের ধুর্রা স্টাফ পরস্পরের সঙ্গে গুল মারার প্রতিযোগিতায় নেমেছে? এত খবর এক সঙ্গে কোথায় পেল এরা?
— বু-ল্-ল্-ল্-শিট! আমি এক চড়ে গুজবের মাছিগুলো মেরে ফেলার চেষ্টা করি।
নেউলেদা আমার মুখের কাছে মুখ এনে বলল — কাল অবধি অপেক্ষা করলে ন্যাশানাল ডেইলিতেই দেখতে পাবি, নির্বোধ। পাবলিক এরকম বহুরূপীদের পছন্দ করে না। তারা এই গিরিগিটির রক্ত দেখতে চাইছে। ওর সঙ্গে জড়িয়ে গিয়ে অক্কির পাগলা মাসিটা তার পুরো ফ্যামিলিকে ডোবাবে।
নেউলেদার আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আমার উদ্বেগ তুঙ্গে উঠে গিয়েছিল। অক্কির মাসি যে তার ফ্যামিলিকে ডোবাবে সেটা কেউ বলার আগেই আমি জানতাম। শিমলিপুর না হয়ে অন্য কোনো জায়গা হলে এরা সবাই এতদিনে জেলে গিয়ে বসে থাকত। এখানকার পুলিশ কোনো কাজের নয় বলে দেরি হচ্ছে। ভিতরটা চুরমার হয়ে গেলেও উপরে সেটা না দেখিয়ে বলি — শাবাস! ডাহা মিথ্যের আগুনে আরো পেট্রল ঢালাই তো তোমার ব্যবসা।
নেউলেদা যেন প্রশংসা শুনেছে এমনভাবে খুশি হয়ে যায়। — আরে আমার চিনির সেপাই, মূলোর ক্ষেত, মঙ্গলবারের লাড্ডু, সে আনন্দে ডগমগ হয়ে বলল — ওরা ডাল-ডাল তো আমি পাত-পাত। সব সময়ে এক স্টেপ আগে থাকি। দিল্লীর দশটা কাগজ যদি বলে বেতাল মুজরিম হ্যায় তো আমার কাগজ বলবে বেতাল বেকসুর হ্যায় মাই লার্ড! আমরা কেস পুরো উলটে দেব। ওদের সাজানো সেট লণ্ডভণ্ড করে দেব আমি।
— তুমি একা? এত ক্ষমতা তোমার?
— পাওয়ার অফ ট্রুথ! উৎসাহের চোটে এক গরাসে একটা লুচি সাবাড় করে নেউলেদা। তার চোখ ধর্মযুদ্ধের উদ্দীপনায় চক চক করে উঠেছে। ক্ষিদেও ফিরে এসেছে আবার। ‘দাঁড়া’, বলে আরেকটা লুচি আনার জন্য সে রওনা দিল।
***
পরে নাক সিঁটকে আমি নেউলেদাকে বলেছিলাম — পাওয়ার অফ ট্রুথ? হাসিও না। তোমার চিতাভস্ম ঘেঁটে কেউ এক আউন্স সততা বের করতে পারবে? হাফ গ্রেন এথিক্স্? লোকে তোমাকে মিথ্যেবাদী ধীমান রায় বলেই চিনবে। পুরো কাণ্ডটা তুমি করছ অক্কির বা বেতালের ভালোর জন্য নয়। নিজের ভালোর জন্য।
নেউলেদা কোনো কারণে একটু দমে গিয়ে বা হয়তো ক্ষিদের অভাবে পরের লুচিটা আর খেতে পারেনি। সে বলে — ঠিক আছে। ধরে নেওয়া যাক আমি পয়সার জন্য বেতালের পক্ষ নিচ্ছি। কিন্তু তাহলেও তুই আর আমি এখন এক টীমে। তুই নিজের বন্ধুকে বাঁচাবার জন্য আর সত্যের জন্য খেলবি। আমি পেশাদার। টাকার জন্য লড়ব। হাত মেলা।
উত্তরে হাত আরো গুটিয়ে নিয়েছিলাম আমি। নেউলেদার কথায় তিন-আনা যুক্তি যদি বা থাকে, তেরো আনা কাঁকড়। বললাম — তোমাদের কাগজটাকে কোনোভাবে বুঝিয়ে দিয়েছ বেতালকে সাপোর্ট করলে কাটতি বাড়াবে। কিন্তু তাতে তোমার লাভ কী? খাটনি অনেক বেশি। পয়সা মোটেও তেমন বাড়বে না। এটা তোমার নিজের আইডিয়া বলে মনে হচ্ছে না। কেউ তোমাকে দিয়ে করাচ্ছে।
নেউলেদাকে যা বলেছিলাম সেটা একটা পেটেন্ট করা ট্রুথ সেরাম। গোপন কথা বার করার এই কৌশল টোটোদা শিখিয়ে দিয়েছিল। বলতে হয় অন্য কেউ তোমাকে দিয়ে কাজটা করাচ্ছে। লেগে গেলে লোকেরা ভাবে তার গুপ্ত কথাগুলো ফাঁস হয়ে গেছে। আর না লাগলে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টায় অনেক সময়ে নিজের আসল মোটিভ ফাঁস করে দেয়।
সেরামটা দেবার পর আরাম-সে লুচির ছোট শিঙার মধ্যে অর্ধ-তরল তরকারি ভরে মুখে পুরি। চোখ বন্ধ। যেন আর কোনো দিকে মন নেই।
ফুলকো হয়ে এসেছিল নেউলেদা। হঠাৎ অনেকটা চুপসে গিয়েছে। শেষ লুচিটাকে ছেঁড়াছিঁড়ি করতে করতে বলল — শিমলিপুরের দিক্পালরা কেসটাতে ইন্টারেস্ট দেখিয়েছে। তুইও চিনিস।
শিমলিপুরে দিক্পাল এল কোথা থেকে? জিজ্ঞেস করি - যেমন?
— যেমন ডাক্তার বাজাজ...।
মুখের খাবার চিবোতে ভুলে গেলাম। এই বাজাজের নামে নেউলেদা কী না অকথ্য ক্রাইম স্টোরি রটিয়ে বেড়াত! নেউলেদাকে মনে করিয়ে দিই। - এই মানুষটার নামে তুমি জঘন্য সব অপবাদ ছড়িয়েছ। তিনি এখন তোমার কাছে দিক্পাল হয়ে গেছেন?
নেউলেদা বলে — ওসব পুরোনো খবর। বাজাজের দেশভক্তির উপর আর্টিকেল বেরিয়েছে আমার।
চায়ে একটা চুমুক দিয়ে ঝুঁকে পড়ে বললাম — তিনি তোমায় টাকা দিয়েছিলেন লেখার জন্য। তাই না?
— মা কালীর দিব্যি। তা নয়। কথাটা বলার সময় নেউলেদার চোখ ডাইনে বাঁয়ে চট করে একবার ঘুরে কাছাকাছি কোথাও মা কালী আছেন কিনা দেখে নিল।
মাথায় ঢুকছিল না। গুলজারীলালজী বেতালকে বাঁচাতে চাইছেন? হোয়াই? আর নেউলেদাই বা সেটা আমাকে জানাতে এত ব্যগ্র কেন? ট্রুথ সেরাম দিতে না দিতেই বেরিয়ে এসেছে।
নেউলেদা কাছে চলে আসে। — বাজাজ আমাদের সাহায্য করতে রাজি হয়েছে। সত্যের খাতিরে। সেইজন্য আমাদের তিনজনকে এককাট্টা হতে হবে। তোর বন্ধু আর বন্ধুর মামা, দুজনকেই আমরা বাঁচাব, জয়।
— আমি কেন তোমাদের মতো দুটো উন্মাদ সাইকোপ্যাথের মধ্যে ঢুকব?
নেউলেদার চোখ আবার আমার চোখ থেকে সরে গিয়েছিল। সে একটু ভেবে বলল — কারণ পায়ে চামড়ার জুতো আর সঙ্গে তুই না থাকলে ব্যাটা আমাকে ঘরে ঢুকতে দেবে না।
যতবার নেউলেদার সাথে কথা হয়, ততবার আমার মাথাটা বোঁ বোঁ ঘুরিয়ে ছাড়ে সে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। খাওয়ার বারোটা বেজে গেল। প্লেট প্লেট রইল না, কাপ কাপ রইল না। দুটো ডাম্ববেল হয়ে গেছে। মাটিতে নামিয়ে রাখতে হল।
— কোন ঘরের কথা বলছ, নেউলেদা? কী গুল খিলিয়ে এসেছ তুমি?
— কোনো গুল খিলাইনি। সিম্পল্ ব্যাপার। নেউলেদাও নিজের প্লেটটা মাটিতে নামিয়ে দিয়ে বলল। — আজ রবিবার। হাসপাতাল খালি থাকে। পুলিশের কাজগুলো হয়। মন্দিরের যে পুরুতটা মরেছিল, অ্যাডমিনিস্ট্রেশানের রিকোয়েস্টে বাজাজ তার পোস্ট মর্টেম করতে রাজি হয়েছে। আমরা পুরো ব্যাপারটা কাছ থেকে দেখতে পাব যদি তুই আমার সঙ্গে যেতে রাজি হোস। আরে, আমার সালগিরহের তোহ্ফা, বিয়ের সানাই, পদ্মবিভূষণের গুলদস্তা, এরকম স্কুপ দিল্লীতে তোর গোটা জন্মে কেউ পায়নি!
***
বাইরে থেকে মা’য়ের গলা পাওয়া গেল — নেউলে তুই জয়কে নিয়ে বেরোস না! তার আগে আমি তোর সাথে একটু কথা বলব।
নেউলেদা “ঠিক আছে!” বলে হাঁক দিয়ে আমার দিকে ঝুঁকে পড়ে। — মা’কে বলিস না। খামোখা চিন্তা করবে। বাজাজ জানিয়েছে মুর্দাটাকে গলা টিপে মারা হয়নি। খুব সম্ভবত কোনো জংলী জন্তুর হাতে মরেছে সেটা। ভেড়িয়া ছাড়া আর কি? বেতালের ইতিহাস নিয়ে যে যা ইচ্ছে লিখুক। পোস্ট মর্টেমের পর এমন রিপোর্ট বেরোবে যে বেতাল-মামার টিকিও ছুঁতে পারবে না পুলিশ। স্কুপটা পেয়ে গেলে বিকেলের কাগজেই প্রমাণ করে দেব সে নির্দোষ। কোনো কেস দাঁড়াবে না।
— ধরো তোমার সঙ্গে গেলাম আর তুমি অক্কির মামার সপক্ষে একটা ভালো লেখা দিলে না! মিথ্যে বলা তো তোমার পক্ষে নতুন না?
নেউলেদা এক লাফে আমার কাছে চলে আসার পর জামার কলারটা খিমচে ধরে পাকাতে থাকে। — লোকে তোকে বুদ্ধিমান ভাবার ভুল করে কেন রে? একটু ভেবেচিন্তে কথা বল। স্কুপ যদি পাই তাহলে কি সেটাকে বাড়িতে বসিয়ে ডিম পাড়াব? অন্যের হাতে লেগে যাওয়ার আগে ছাপিয়ে দেব না?
মা এক কাপ চা নিয়ে ঝড়ের মতো ঘরে ঢুকে পড়ে বলল — নেউলে, তুই আমার ছেলেকে এত কষ্ট দিয়েছিস কেন? ও তোর সঙ্গে কোথাও যাবে না।
নেউলেদা থতমত খেয়ে কলার ছেড়ে দেয়। তারপর হাত-টাত ঝেড়ে সে বলল — দুল পিসি, জয়কে আমি নিয়ে যাচ্ছি না কোথাও। তুমিই জিজ্ঞেস করো। ও নিজে যদি কোথাও যেতে চায় তো স্কুটারে লিফ্ট দিতে পারি।
মা নেউলেদার কথাটা শুনতেও পায়নি। নিজেরটাই বলে চলল। — ছেলেটা ভীষণ খাটছে। রাত জেগে পড়াশোনা করে। কম্পিটিটিভ পরীক্ষাগুলো দিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে। ওর ঘুম দরকার।
নেউলেদা অমনি ধুয়ো ধরে ফেলে। — চেহারা দেখেই বুঝতে পারছি ভালো ঘুমোয় না। চোখের কোণে কালি। কিন্তু এত রোগা হল কী করে? মাঝে মাঝে চিকেন খাওয়াও না তোমার ছেলেটাকে?
হয়ে গেল বিজয়া দশমী। মা’য়ের দুঃখের সলতে জ্বলে উঠেছে। জননী চা খাওয়া ভুলে গিয়ে গলা নামিয়ে বলল — এ বাড়িতে চিকেন ঢোকে না, নেউলে। তুই জানতিস না? বৌদি হরিবাড়ির মেয়ে। কৃষ্ণের মাথায় পালক থাকে বলে বাড়িতে পাখি রান্না করার উপায় নেই। এদিকে সবাই বলে খুব দরকার ওটা খাওয়ানো। কী যে করি?
আর কী! নেউলেদার ভুরুও কপালে উঠে যায়। — সর্বনাশ!! এরকম ব্রিলিয়ান্ট একটা ছেলে চিকেন খেতে পাচ্ছে না? আমি আজই খাইয়ে আনছি। স্কুটার আছে সঙ্গে। সোজা কাকেদা’য় নিয়ে যাব।
— কিন্তু আজ যে বাড়িতে ভালো রান্না হচ্ছে।
— ও...। তাহলে না হয় অন্য এক দিন।
মা হঠাৎ টপ করে ভিতরে চলে গিয়ে গোটা চল্লিশেক টাকা এনে নেউলেদার হাতে দিয়ে বলল — তুই ওকে কালকে নিয়ে গিয়ে খাইয়ে দে তো। দুজনে মিলে ভালো করে খেয়ে আয়।
টাকাটা অম্লানবদনে পকেটে পুরে নেউলেদা আমাকে বলল — তন্দুরী খাব বুঝলি? বেশি মশলা হবে না। পুরোটা গায়ে লাগবে। ব্রিলিয়ান্ট ছেলেদের এইরকম ব্রেন ফুড দরকার।
মা’কে ঠকিয়ে টাকাটা আত্মসাৎ করার পর নেউলেদা আমাকে বলল — কি রে? কোথাও ড্রপ করে দেব তোকে?
উঠে পড়লাম। যতক্ষণ বসে থাকব নেউলেদা নির্লজ্জভাবে মা’য়ের ব্যাগ খালি করে যাবে। মা বলল — তুই নিজের ইচ্ছেয় যাচ্ছিস তো জয়? ও জোর করছে না তো?
— না, মা। এটা নিজের কাজে যাচ্ছি। কোনো চিন্তা কোরো না।
মা হঠাৎ নেউলেদার দিকে ফিরে বলল — নেউলে, তোর ঠাকুরদা একটা কত বড়ো লোক ছিলেন জানিস? এখানে যত দুস্থ বাঙালি পরিবার পার্টিশানের পর এসে হাজির হত তিনি তাদের বিনে পয়সায় দিনের পর দিন খাওয়াতেন। সপরিবারে তোদের বাড়িতে উঠেছে কত লোক! দয়ার সাগর বলতে যা বোঝায় তাই ছিলেন। কাউকে ঠকাননি, কোনোদিন মিথ্যে বলেননি। শুধু দিয়ে গেছেন। নিজে তদ্বির করে নতুনদের চাকরি খুঁজে দিতেন। প্রায়ই তাঁকে দেখেছি আমার বাবার কাছে একটা কাউকে এনে বলছেন — ব্রজেন, একেও একটা কোথাও লাগিয়ে দে লক্ষ্মী ভাই। ওনার আগে কিম্বা পরে শিমলিপুরে এরকম একটা মানুষ আসেনি।
এতটা গড়গড় করে বলার পর একটু থেমে গিয়ে মা যোগ করল — তোর মুখশ্রীতে আমি তাঁর সেই সাগরের মতো চোখদুটো দেখতে পাই।
নেউলেদার হাসিহাসি মুখচন্দ্রমা হঠাৎ মঙ্গল গ্রহের মতো থমথমে লাল। সাগর না হলেও চোখের খিড়কি পুকুরে জল। সেটা না পারছে ঢাকতে, না পারছে ফেলতে। নিঃশব্দে আস্তে আস্তে বেরিয়ে যাচ্ছে নিজের স্কুটারের কাছে। আমাকে সে মুখ ফুটে ডাকতেও পারল না। পিছন থেকে চেঁচিয়ে বললাম — বসে যাও। বেশিক্ষণ লাগবে না আমার।
***
যাওয়ার পথে একটা থলে তুলে নিতে হল। তানিয়ার ফ্লাস্ক আর একটা স্টিলের গ্লাস সঙ্গে না নিয়ে সকালে বাড়ি থেকে বেরোই না। নেউলেদা আমাকে জোর করে চামড়ার জুতো পরিয়েছে। গুলজারীলালের নির্দেশ।
পম্পার সুপার-পাওয়ারওয়ালী বন্ধু তানিয়া বলেছিল এগারো দিন তার হয়ে শিবের মাথায় জল দিতে পারলে আমারও একটা ফাঁড়া কাটবে। সবে তৃতীয় দিন হল। এদিকে রাহুর মতো হাঁ করা বাজাজের গ্রাসের দিকে আমি আরো এগিয়ে চলেছি। তানিয়া সঙ্গে থাকলে আজ ভালো হত। জিজ্ঞেস করতাম — কোথায় তোমার সুপার-পাওয়ার একটু দেখাও।
স্কুটারে ওঠার আগে নেউলেদাকে বললাম — পোস্টমর্টেমের ধারে কাছে যাওয়ার আগে আমাকে একটু দুর্গামন্দিরে যেতে হবে। তোমার কি অসুবিধে হবে সেখানে দাঁড়াতে?
— নো প্রবলেম জয়। আজ তুই বস্, আমি তোর মোস্ট ওবিডিয়েন্ট সারভেন্ট।
কাল আমার দেখাদেখি দুফিও শিবের মাথায় জল দিয়ে গেছে। আজ নেউলেদা আমার পিছু পিছু হেঁটে শিবলিঙ্গ প্রদক্ষিণ করল। আজব এই দুনিয়া। গজব তার লোক। একটা খ্রীষ্টান মেয়ের কল্যাণে আমি কমিউনিস্ট বাবার ছেলে হয়ে সবান্ধবে মন্দিরে ঢুকেছি। মসৃণ আর লম্বা পাথরের টুকরোটার উপর জল ঢালার সময়েও আমি মনে মনে পম্পার উরু দেখছিলাম। যেন সেটাকে বেয়ে একটা কালো ইলাস্টিকের ব্যাণ্ড উঠে আসবে। সারাদিন ধরে মিনিটে একবার করে আমার মাথায় এই সব লেস আর নাইলনে শোভিত দৃশ্য। থামাবার কোনো উপায় যখন নেই তখন দু-চোখ বন্ধ করে থাকি দৃশ্যটাকে ধরে রাখব বলে। এদিকে আমাকে চোখ বুজতে দেখে ভক্তির জোয়ার আসছে আশে পাশে অন্যদের মনে।
কী রাবিশ!
নেউলেদা একবার প্রদক্ষিণ করে থামল না। গদগদ ভঙ্গিতে বিড়বিড় করে কী সব বলেও যাচ্ছে। দুর্গার মূর্তির সামনে গিয়ে একবার দাঁড়াল। আরেক প্রস্থ বিড়বিড়। তারপর একটা ভগবদ্প্রীতির ভূমিকম্প এসে ধাক্কা দিয়ে তাকে মাটিতে শুইয়ে দিল। সাষ্টাঙ্গ প্রণামের ভঙ্গিতে শোওয়া নেউলেদা হুঙ্কার দিয়ে বলল — শক্তি দে শক্তিরূপিনী!
এদিক ওদিক যে সব অন্যান্য ভক্তরা ছিল (যারা কেউই বাঙালি নয়), মানুষটাকে পাগল কুকুরে কামড়েছে ভেবে ভয়ে সরে গেছে। নেউলেদা আড়চোখে সেটা দেখতে পেয়ে বোধহয় ঠিক করল বাড়াবাড়িটা বেশি হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ তার হুঁশ ফিরে এসেছে এরকম ভাব দেখিয়ে সে জামা ঝেড়ে উঠে পড়ল মাটি থেকে।
একটু পরে একটা পয়সাও দক্ষিণা না দিয়ে বীরের মতো বিদায় নিচ্ছিল নেউলেদা। আমি প্রত্যেকবারের মতো কাঠের বাক্সে সিকি ফেলে দিয়ে পিছু পিছু বেরোলাম। নেউলেদার মাথায় হেলমেট। আমার মাথায় ঋতুওয়ালীকে স্পর্শ করার অভিশাপ।
একই গন্তব্যের যাত্রী হলেও দুজনের পথ কত আলাদা! একজনকে ধরেছে স্কুপের ভুত। আর একজনের কল্পনার দৌড় শকুন্তলার কালো প্যান্টিজ আর নীল স্কার্টের তটরেখা অবধি! এর বাইরে যা কিছু ঘটছে তা থেকে বিন্দুমাত্র কিছু পাওয়ার লোভ বা আকাঙ্ক্ষা নেই আমার।
তাহলে বাজাজকে ভয় করব কেন?
***
বালকবাবা হাসপাতালের সামনে পুরোনো ভেস্পা স্কুটারটাকে দাঁড় করিয়ে নেউলেদা বলল — ডাক্তার বলেছিল ন’টায় আসতে। আমাদের দেরী হয়ে গেছে কছুয়া।
আমার হাতে ঘড়ি নেই। জিজ্ঞেস করলাম — কটা বাজে?
— নটা চার।
চার মিনিটের দেরীর জন্য নেউলেদার হাওয়া ফুস্। মুখের ভাব দেখে মনে হল গুলজারীলাল বেচারাকে নিয়মিত জুতো বা পেপারওয়েট ছুঁড়ে মারছেন। পিঠে একটা হাত রেখে বললাম — ভয়ের কিছু নেই। তৈরি থাকব। যাই আসুক, আমরা ক্যাচ করে নেব।
— তুই আগে থাক তাহলে।
এক তলার সবচেয়ে দূরের হল ঘরটা বাজাজের ল্যাবরেটরি। টোকা দেবার পরে ওয়ার্ড বয় এসে দরজা খুলেছে। আমাদের দাঁড়াতে বলে সে গেল বাজাজকে ডাকতে। আরো একটু পরে একটা মাস্ক পরা গরিলা দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দেয়।
— ওয়্যালকম্ টু দ্য হাউস আফ দ্য ড্যাড্। গরিলাটা আমাদের অভ্যর্থনা করে বলল। — এখানে একবার যে আসে তার আর অন্য কোথাও মন লাগে না।
বধির গরিলা, মুখর শব
সার দিয়ে কাঁচের পাল্লা লাগানো আলমারিতে অসঙ্খ্য ফর্ম্যালডিহাইডের জার। মানব প্রত্যঙ্গের আচার বানানো হচ্ছে তার মধ্যে। কোথাও একটা কান। কোথাও টেনিস বলের মতো পাকানো চোখ। আলমারির বাইরে ছটা মানবদেহের স্পেসিমেন। তার পাঁচটা এখনো বাঁচার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
গুলজারীলাল বাজাজ একা ছিলেন না। সঙ্গে দুজন জুনিয়ার এবং দুটো ওয়ার্ড বয়। মাঝখানে একটা স্টিলের টেবিলের উপর ক্যাডাভর। দূর থেকে বুঝলাম দরজার দিকে পা করে শোয়ানো ছোটখাটো চেহারার একটা মানুষ। মাথায় সাদা চুল। শরীরের উপর দিকটা কালসিটের মতো নীল। সেই নীল ক্যানভাসের উপর যেখানে সেখানে বেগুনি রঙের জমাট রক্তের ছোপ এঁকেছে কোনো উন্মাদ আর্টিস্ট। বাজাজ হাতে সাদা ল্যাটেক্সের গ্লাভ্স্ পরছিলেন। একজন জুনিয়ার একটা পাউডার ভর্তি ছোট ট্রে নিয়ে এল। বাজাজ সেটাতে হাত ডুবিয়ে দিলেন।
কাজ করতে করতেই গুলজারীলালের গুরুগম্ভীর মাইকের মতো গলা অভ্যর্থনা জানাচ্ছিল আমাদের। — টেবিলের আট ফুটের মধ্যে আসার পর্মিশন্ নেই। ফুল লেংথ ফিচার ফিলম্ দেখবি তো মাস্ক পরে দূরের ওই চেয়ারটাতে বসে যা। সাড়ে তিন ঘন্টা লাগবে।
— হেঁ হেঁ হেঁ হেঁ হেঁ। নেউলেদা চেয়ারের দিকে এগোচ্ছিল। বাজাজের মাইক আবার গর্জে উঠে বলল — হ্যাল্লো, হ্যাল্লো। রুক যা। তোকে থাকতে বলিনি ছুছুন্দর। শুধু লড়কাটা থাকতে পারে। তুই বাইরে গিয়ে বোস। এখানে শুধু পর্সনল্ সহকারীর বসার ইজাজত আছে। এই ছেলেটা আমাকে আপ্রেশনে সাহায্য করে। তাছাড়া ন্যাকেড ড্যাড বাডি সবার দেখার জন্য নয়। তোর মতো লোকেরা প্রেমে পড়ে যায়।
নেউলেদার মুখ দর্শনীয়। মুর্দা আর ফর্ম্যাল্ডিহাইডের যুগলবন্দি থেকে আমরা দুজনেই মুক্তির পথ খুঁজছি। দুজনেরই ভয় বমি না হয়ে যায়। কিন্তু নেউলেদার তার চেয়েও বড়ো ভয় তার স্কুপ হাতছাড়া হয়ে যাবে।
রোবটের মতো পা ঘষে ঘষে দরজার দিকে খানিকটা ফিরে গিয়ে নেউলেদা ক্যাবলার মতো দঁড়িয়ে পড়ে। গলা দিয়ে একটা ছুছুন্দরের মতো কিচ কিচ স্বরই বেরোল বেচারার। — লেকিন স্যার, আপনি যে বলেছেন...।
গুলজারীলাল আর তার দুই জুনিয়ার মিলে বডিটাকে ইঞ্চি টেপ দিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মাপছিলেন। বাজাজ ভুরু কুঁচকে ক্যাডাভরের যৌনাঙ্গ ধরে উপর দিকে তুলে মেপে বললেন থ্রী অ্যাণ্ড আ কোয়ার্টর। তারপর নেউলেদাকে বললেন — এদিকে আয় ধীমান। তোকে ললিপপ খাওয়াই।
নেউলেদা অসহায়ের মতো আমার দিকে চাইছে। বাজাজ ওয়ার্ড বয়দের আদেশ করলেন — যা, পকড়কে লা। তারা হাতের বালতিগুলো নামিয়ে ছুটে আসছিল। নেউলেদা দ্বিরুক্তি না করে তাড়াতাড়ি দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল।
একটু পরে ওয়ার্ড বয়দের একজন আমাকে কাপড়ের একটা মাস্ক দিয়ে গিয়েছিল। ছেলেটার বয়স বড়োজোর আমার চেয়ে এক কি দু বছর বেশি। বাজাজ শরীরের প্রত্যেকটা মাপ নিজে যাচাই করার পর মাস্টার দর্জির মতো ঘোষণা করছিলেন। চেস্ট থার্টি সেভেন, শোলডার সিক্সটিন, রাইট আর্ম থার্টি ওয়ান...। তারপর আমার দিকে ফিরে — বমি পেয়ে গেলে করিডরে বাথরুম, কিন্তু ফিলম্ থামবে না...।
আগে জানলে সকাল সকাল এতগুলো লুচি না খেলেও চলত। স্কুলের কেমিস্ট্রি ল্যাবরেটরির মতো গন্ধটা এখন পর্যন্ত ম্যানেজ করা যায়। এর পর কী হবে? আমার ভিতরে আমার ওয়েট লিফ্টার দাদু বললেন — এই ওয়ার্ড বয় যেটা অনায়াসে করতে পারে সেটা তোর না করতে পারার কোনো ক্ষমা নেই। বুক টান করে বসে থাক। বমি হলে আবার সেটাকে গিলে ফেলবি।
বহুদিন আগে কেউ শিখিয়ে দিয়েছিল, গা গুলিয়ে উঠলে নাক দিয়ে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে হয়। মাস্কটা বেঁধে ফেললাম। প্রয়োজনে তার উপরে জামার হাতা দিয়ে ঢেকে নিঃশ্বাস নেব।
দাদুকে জিজ্ঞেস করলাম — কেন বাজাজ আমাকে এখানে বসিয়ে রেখেছেন তুমি জানো?
দাদুর কাছে উত্তর নেই। বা জানলেও আমাকে বলবে না।
লাশের ঘাড় আমার দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিল কেউ। ফুলে যাওয়ার দরুণ দু-চোখ প্রায় বোজা। যেন বলছে — ছোটু, গুলজারীলাল এক মাস ধরে একটা গল্পের গোলকধাঁধার মধ্যে তোকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে, যা থেকে বেরোবার পথ সে নিজেই জানে না। তো এত ভাবছিস কী? আমার মতো চোখ বুজে ঢুকে পড়।
ক্যাডাভরের কনুই থেকে দুই বাহু ভাঁজ করে সবাইকে দেখাচ্ছিলেন সাদা চুলওয়ালা শকুনের মতো গুলজারীলাল। বুঝতে পারলাম বাজাজের আসল কাজ হল জুনিয়ারদের ট্রেনিং। ডানার মতো বিরাট দুটো হাত নাড়িয়ে সেই গৃধ্ররাজ বলছিল — নো রাইগার মর্টিস। সময় পার হয়ে গেছে। বকরা আর মানুষের মধ্যে এই একটা নিরর্থক তফাৎ। বকরা কাটতে হয় রাইগর মর্টিস সেট করার আগে। মানুষ কাটে সেটা ছেড়ে যাবার পর। আর একটা তফাৎ এই যে মানুষরা বচ্চা ড্যালিভর্ করাবার জন্য আমাদের মতো ডাক্তারের কাছে ছুটে আসে। বকরিরা মাঠের ধারে নিজের ড্যালিভরি নিজেই করে প্রাইজ হিসেবে প্লসেন্টাটা চিবিয়ে খেয়ে নেয়।
গুলজারীলালের হাতে মুণ্ডুটা এদিক ওদিক ঘুরল। নাক মুখ দিয়ে বেরোনো জমাট রক্ত পরিষ্কার করেনি কেউ। মৃত্যুর গ্যাসে ফোলা একটা মানুষের খোল। চামড়া ঢিলে হয়ে গিয়ে নিজের জায়গা থেকে সরে যাচ্ছে। এই লাশটা যখন একটা জ্যান্ত মানুষ ছিল তখন তাকে মুখোমুখি দেখেছি মাত্র একবার। কিন্তু আমি জানতাম এর হলুদ চোখ দুটো বন্ধ দরজার ফাঁক থেকে মন্দিরের প্রতিটি মানুষকে লক্ষ্য করত। পম্পাকে এই ষাটোর্ধ বৃদ্ধ একটা লোলুপ হায়নার দৃষ্টি দিয়ে দেখছিল। আমার বান্ধবীও সেটা ধরে ফেলেছিল হয়তো। গোলাপি সালোয়ার কামিজ পরে বিগ্রহের উলটোদিকের দরজার সামনে সে যখন এসেছিল তখন আমরা পাল্লার ফাঁকটাকে আস্তে আস্তে বাড়তে দেখেছিলাম।
বাজাজের হাতে এবার একটা বড়ো আতস কাঁচ। জুনিয়াররা শরীরটাকে উলটে পালটে চামড়ার খুঁতগুলো খাতায় টুকে নিচ্ছে। অটপ্সি সার্জেন কমেন্ট্রি দিয়ে চললেন। — মুখে, গলায়, কাঁধে সায়ানোসিস। অক্সিজেনের অভাবে নীলাঈ হয়ে গেছে। আপার বডি সুজা হুয়া। ঠোঁট, গাল, চোখের দুপাশ, জবড়া, সব ফোলা। এডিমা এভরিহোয়্যার। মড়ার পক্ষে এগুলো সব নার্মল্। তবে এবার একটা ইন্ট্র্যাস্টিং জিনিস দেখতে পাচ্ছি। মুখে আর গলাতে চামড়ার নিচে তেইশটা ছোট ছোট লাল স্পট। ইন্টর্নল ব্লীডিং, কিন্তু পরস্পর থেকে বিযুক্ত। চোখের পাতার উপরেও। পিট্যাকিয়াল হ্যাম্রেজ। নোট করলে?
— নোটেড। বলল একজন জুনিয়ার।
— ল্যাট আস্ প্রসীড। মুখে কোনো বিটর্ অ্যালমণ্ডের গন্ধ নেই। ফ্র্যাশ সায়নাইড নয়। রসুনের বাস মারছে না। জোরদার আর্সনিক পায়জনিং-এর সম্ভাবনা কম। ক্যারোসিনের বু-ও পাচ্ছি না। তার মানে ফাস্ফরস কম্পাউণ্ড অনুপস্থিত। বাডি আবিষ্কৃত হয় সকাল সাড়ে ছটায়। পুলিশ পৌঁছোয় সাড়ে সাতটায়। রাইগর্ মর্টিস শুরু হয়ে গিয়েছিল। গরমকাল, তাই দু-ঘন্টার মধ্যে রাইগর্ স্যাট্ হয়ে গিয়েছে ধরে নিচ্ছি। তাহলে মওত হয় সকাল সাড়ে পাঁচটার আগে। ট্যাল মী মাই ডিয়ার ফেলোজ, হোয়াট ইজ দা কাজ্ আফ্ ড্যাথ?
জুনিয়ারদের মধ্যে একজনের বয়স পঁয়তিরিশ-টঁয়তিরিশ হবে। বেঁটেখাটো, বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। অন্যজন ছ-ফুট লম্বা। কিন্তু বয়স তিরিশ বা তার চেয়েও কম।
বেঁটে জুনিয়ারটি বলল — স্যর, লাল স্পটগুলো দেখে অ্যাস্ফিক্সিয়েশন্ মনে হচ্ছে। যদিও আপনি বলবেন প্যাথলজির রিপোর্ট না আসা অবধি কিছু বলা যায় না।
বাজাজ তাঁর বাঘাড়ে গলায় হেঁকে বললেন — অ্যাস্--ফিক্--সিয়ে—শন্--!
দুটো ওয়ার্ড বয় ঘরের মেঝে কাঠের ডাণ্ডার উপর লাগানো ভেজা ডাস্টারের কাপড় দিয়ে মুছছিল। তারাও চমকে গিয়ে ঘুরে তাকাল।
বাজাজ বলে চলেছেন — অ্যাস্ফিক্সিয়েশন্! ইয়ানি সাঁস কা রুক জানা। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়াতে মৃত্যু। কীভাবে ঘটল সেটা, একটু বুঝিয়ে বলো প্রদীপ কুমার!
প্রদীপ কুমার ওরফে বেঁটে জুনিয়ার বলল — গলায় কোনো চোট নেই, নাখুনের খরোঁচ নেই। যেটুকু হ্যাম্রেজ হয়েছে সবটাই পিট্যাকিয়াল। স্কিনের নিচে ক্যাপিলারিগুলো ফেটে গেছে। প্রথমে ভেবেছিলাম গলায় কাপড়ের ফাঁস জড়িয়ে শ্বাসরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু বিশেষ এভিডেন্স পাচ্ছি না তার। সেরকম ফাঁসের কোনো দাগ নেই। কীভাবে নিঃশ্বাস বন্ধ হল সেটা ক্লিয়র নয়। আপনার কোনো অবজার্ভেশন আছে?
— নো স্ট্র্যাঙ্গুলেশন্ মার্ক্স আইদর্। বাজাজ বললেন। — আঙুল দিয়ে দাবিয়েছে সেরকম কোনো চিহ্ন নেই। ঘাড় ভাঙেনি। নেক ইজ স্ট্রেঞ্জলি ইন্ট্যাক্ট, আলমোস্ট স্ক্র্যাচলেস্। এই লোকটার সমস্ত ট্রমা গিয়েছে টর্সোর উপর দিয়ে। অ্যাটাক হয়েছিল গলার নিচে আর নাভির উপর। সেভাবে কেউ সুইসাইড করে?
— শুনিনি স্যর। আপনি জানেন কোনো কেস?
— সবকিছুই আগে একবার না একবার হয়েছে। নত্থিং ইজ নিউ। টর্সোর এগ্জামিনেশন্ থেকে কী পাচ্ছ? শঙ্কর কিছু বাণী দাও।
লম্বা জুনিয়ার গভীর মনোযোগ দিয়ে দুজনের কথা শুনছিল। সে বলল — স্যর ইন্জুরির মার্ক তো আছে। সোয়েলিং আছে অনেকটা। হাড় ভেঙেছে বলে সন্দেহ করছি, কিন্তু না কাটলে বাকিটা বোঝা যাবে না। এর উপরে কোনো ভারি গাছ-টাছ পড়ে যায়নি তো?
— তুই অনেক আগে এগিয়ে গেছিস শঙ্কর! যমুনার বালির উপর পড়ে ছিল লোকটা। ধারে কাছে শরবনের ঘাস ছাড়া আর কিছু ছিল না। গাছ আসবে কোত্থেকে? বাহ্রী চোট, এক্সটর্নল ইন্জুরিও মিনিমল্। প্রায় নেই বললেই চলে। ইয়ে থিওরি জমতা নহীঁ।
বাজাজ কথা বলতে বলতেই নিপুণ হাতে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বুক, পিঠ আর পেটের প্রতিটি ইঞ্চি খুঁজছিলেন। মাঝে মাঝে থেমে যাচ্ছে হাত। একটা একশো কিলো ওজনের ভারি বুলডগ ভুক্ ভুক্ করে হাঁটতে হাঁটতে ক্যাডাভরের দর্শনীয় স্থানগুলোতে মন্তব্যের হিসি ছিটিয়ে চলেছে। — এখানে ব্রুইজগুলো দেখছো? দেড় দেড় ইঞ্চি লম্বা। রিব কেজে কটা এডিমা গোনো। এগুলো কি ব্যাক টু ব্যাক? না র্যানডম?
— পা দুটো দেখা যাক। পরে বুলডগ গুরুগম্ভীর গলায় বলে উঠল। — অ্যাজ ইউজুয়াল ত্বকে কোনো কাটা-ছেঁড়া নেই। থাকলেই অবশ্য অবাক হতাম। লক্ষ করো পায়ের শিরাগুলো বেরিয়ে আছে। সেটা কোনো অণ্ডরলাইং ম্যাডিকল কণ্ডিশন্ হতে পারে। হাঁটু দুটো ভাঁজ হচ্ছে সহজভাবে। জায়েন্টে কোনো ফ্র্যাকচার নেই। হাঁটুর উপরে বা নিচে ন্যুনতম ফোলাভাব। পায়ের পাতার জোড় স্বাভাবিক। জায়েন্ট দুটো সহজভাবে খুলছে আর বন্ধ হচ্ছে। আঙুলগুলোর কী অবস্থা? ডান পায়ের বুড়ো আঙুলটা ফুলেছে। চামড়ায় নীল দাগ। বাকি আঙ্গুলগুলো বঁটছে কি ঠিকঠাক? এক-দু-তিন-চার...। বাঁ পায়ের আঙুলে কোনো অ্যাবনর্মালিটি নেই। ডান পায়ে? এক-দুই-তিন-চার... ফ্র্যাকচর! ডান পায়ের বুড়ো আঙুল ভাঙা। তোমরা আর কী দেখতে পেলে?
প্রদীপ কুমার নামের বেঁটে জুনিয়ার বলল — স্যর পায়ে এমনিতে কোনো ট্রমা হয়নি। কিন্তু একটা লড়াইয়ের আভাস আছে। দুটো হাঁটুর উপরে মাইনর সায়ানোসিস আর ইন্টারনাল ব্লীডিং দেখতে পাচ্ছি। বুড়ো আঙুলে ফ্র্যাকচারটা হয়েছিল খুব সম্ভবত ডান পা দিয়ে কিক্ করতে গিয়ে।
— শাব্বাস্! বাহ্রী মুআইনা কি তাহলে কামপ্লীট? কিছু কি বাদ গেল?
— স্যর, আপনি স্ক্যাল্পের বিষয়ে কিছু বললেন না? চুলের নিচটা একটু দেখব কি আমরা?
— নোটে আগেই কী লিখে রেখেছি দ্যাখো। চুলটা গুছিয়ে আঁচাড়ানো আছে। প্রদীপ ঠিক ঘেঁটে দেবে।
প্রদীপ কুমার আর শঙ্কর নামের জুনিয়াররা যখন চুলগুলো সরিয়ে সরিয়ে নিচের চামড়া পরীক্ষা করছিল তখন ওয়ার্ড বয়রা সার্জারির ট্রে সাজানো একটা চলমান টুল ঠেলে নিয়ে আসে। এতক্ষণে আমি লক্ষ করলাম পোস্ট মর্টেমের টেবিলের উপর একটা বড়ো সার্জারির ল্যাম্প থাকলেও ঘরের ছটা বিরাট কাঁচের জানলা দিয়ে আসা অপর্যাপ্ত সূর্যের আলোতেই এতক্ষণ কাজ হচ্ছিল। প্রতিটা জানলার উপর ছাদের কাছে একটা করে একজস্ট লাগানো ভেন্টিলেটার। এগুলো আমাদের কেমিস্ট্রি ল্যাবরেটরিতেও দেখেছি। শুধু হাসপাতালেরগুলো আকারে বড়ো।
বাজাজ বিরাট দুটো জলের সিঙ্ক চালিয়ে কী যেন দেখে এলেন। টেবিলের এপাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমায় ভুরু নাচিয়ে বললেন — কী রে? কাজ্ আফ্ ড্যাথ কী সেটা ধরতে পারলি?
— আপনারাই পারেননি তো আমি কী করে পারব?
গুলজারীলাল একটা গরিলার মতো আস্তে আস্তে চারদিকে তাঁর গ্লাভ্স্ পরা মোটা আঙুল দেখিয়ে বললেন — লাইফের সব মিস্ট্রি এই ঘরের দেয়াল আর আলমারিগুলোর ভিতরে চলে বেড়ায়। ডাকে। আমরা শুধু চোখ দিয়ে যতটা দেখা যায় দেখি। নাক দিয়ে শুঁকি। কিন্তু তাদের কথাগুলো শোনার মতো কান আমাদের নেই। এই ক্যাডাভরটা চিৎকার করে করে আমাকে বলে দিচ্ছে ওর সঙ্গে কী করা হয়েছিল। কিস নে কিয়া ইয়ে জুল্ম্। আমি কালা বলে সেটা শুনতে পাচ্ছি না। আমার গাফিলতির জন্য এই মানুষটার সঙ্গে যে সুলুক করা হয়েছে তার কোনো ইন্সাফ্ হবে না?
— আপনি পারবেন না মৃত্যুর কারণ বার করতে?
— নাত্থিং ইজ গারন্টীড। বট্ গুলজারীলাল ডজ নাট্ লাইক টু ফেইল। ফিলম্ তো অভী শুরু হুয়া হ্যায়। দিল্ থাম-কে বসে থাক। দ্যাখ কী কী হয়।
বাজাজ টেবিলে ফিরে যাওয়ার আগেই সার্জারির আলোটা জ্বালিয়ে দিয়েছিল কেউ। গুলজারীলাল হাতের ল্যাটেক্স দস্তানা ছেড়ে একটা নতুন জোড়া তুলে নিয়ে বলতে শুরু করলেন।
— ইয়র্স অগো… যখন বয়স শঙ্করের চেয়েও কম, আমি একটা পায়জনিং-এর কেসে সিনিয়র সর্জনকে আটপ্সিতে সাহায্য করতে গিয়েছিলাম। বুড়োর নাম রহীমী। লাহোরের জুন মাস। সুনসান দুপুর। ভয়ঙ্কর গরমে অধিকাংশ স্টাফ কেটে পড়েছে। ল্যাবরেটরির ধারে কাছে কেউ কোথাও নেই। সর্জনের নানারকম ক্ষ্যাপামির মধ্যে অন্যতম ছিল ফুল ফরমাল ড্রেসে আটপ্সি করা। এই গরমেও সেদিন লোকটা টাই পরেছিল। আমাকে একটা ফুল শার্ট আর লেদার শুজ পরিয়েছে। ঘামছি আর বুড়োকে গাল দিচ্ছি, এমন সময়ে…।
এতক্ষণে নজর করলাম গুলজারীলাল নিজেও সাদা ডাক্তারি কোটের নিচে একটা সবুজ রঙের টাই পরে ছিলেন, আর তাঁর জুনিয়ারদের পায়ে পালিশ করা জুতো দেখতে পাচ্ছিলাম। বাজাজ একটু থেমে চারদিক ঘুরে দেখে নিলেন যাতে আখ্যানের এই অংশটা বুঝতে না পেরে থাকলে আমরা প্রশ্ন করতে পারি। সবাই মূক হয়ে অপেক্ষা করছি। বাজাজ আবার খেই ধরলেন।
— বাইরের কাজ শেষ করে এবার বাডির ভিতরে ঢোকার পালা। ক্যাডাভরটা আরামসে টেবিলের উপর শুয়ে ছিল। নবাব ফ্যামিলির মানুষ। প্রিন্সের মতো চেহারা। এমন সময়ে আস্তে আস্তে ঘরের দরজা খুলে একটা লোক ঢোকে। সাদা লিনেনের শার্ট, খাকি প্লীটেড প্যান্ট, ব্রাউন আক্সফোর্ড জুতো, ল্যাদর ব্যাল্ট। চুল পাট করে আঁচড়ানো। ঠোঁটের উপরে সরু গোঁফ। আমি আর রহীমী দুজনেই শুয়ে থাকা ক্যাডাভরটার সাথে মিলিয়ে দেখছি। এগ্জ্যাক্টলি সেম ফেস। সেম হাইট, বিল্ড। সেম গোঁফ। এমন কী সেম হেয়র-কট্! এই মুলাজিম আমাদের পর্মিশন্ ছাড়াই প্রায় নিঃশব্দে ঢুকে ঘরের দূর প্রান্তে একটা অন্ধকার কোণায় সেঁধিয়ে গেল। সেখানে আমি শুধু তার জুতোর চকচকে ডগাটা দেখতে পাচ্ছিলাম। লোকটাকে আটপ্সি রুম থেকে বেরিয়ে যেতে বলব ভেবে মাস্ক খুলে সেদিকে যাচ্ছি এমন সময়ে বুড়ো রহীমী ল্যাব কোটের ল্যাপল ধরে আমাকে টেনে নিয়ে নিচু গলায় বললেন — বাটন্ আপ। চেয়ে দেখলাম গরমের জন্য আমার বুকের কাছে কোটের বোতামগুলো সব খোলা। অনিচ্ছাসত্ত্বেও সেগুলো লাগাই। তারপর… আবার মাস্ক পরে ফেলতে হয়। কারণ লাশ কাটা শুরু হয়ে গিয়েছিল।
বাজাজ একটু বিরতি দিলেন। সেই ফাঁকে প্রদীপ আর শঙ্কর চট করে নিজেদের বোতামগুলো চেক করে নেয়। সিলিং-য়ে ফ্যান চলছে। এখনও বেলা তেমন বাড়েনি বলে গরম কম। বোতাম লাগানোই ছিল। জুনিয়ারদের দৃষ্টি লাশকাটা সার্জেনের উপর ফিরে গেলে তিনি আবার আরম্ভ করলেন।
— রহীমীর প্রত্যেকটা কাট নিপুণভাবে প্রফেশানাল। লাইনগুলো নিখুঁত সোজা। লক্ষ করলাম, লাশের বাজু ফোল্ড করার সময়ে বুড়ো সেটাকে দু-হাতে ধরে এমন রেস্পেক্টফুলি তুলছে যেন কাউকে একটা মেডেল পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। অ্যাভরি মুভ ওয়জ লাইক আ মিলিটারি সেরিমানি। সব শেষে যখন আমরা বডি সেলাই করে মর্গে ফেরত নিয়ে যাচ্ছি তখনও ঘরের অন্ধকার কোণে জুতোজোড়া দেখা যাচ্ছিল। পরে আমি জিজ্ঞেস করি — আপনি ভয় পেয়েছিলেন? কোনোদিন জ্যান্ত পেশেন্টদের এতটা সম্মান দিচ্ছেন দেখিনি। তো বুড়ো বলল — জ্যান্ত পেশেন্ট এত ওয়েল ম্যানার্ডও হয় না। ক্যাডাভররা জীবনে অনেকবার ফিরে আসে। তাদের গলায় স্বর থাকে না, কিন্তু তারা কখনো আমায় ঠকায়নি। জীবনে যতটুকু জানি সব তারাই শিখিয়েছিল।
গল্প শেষের বিরতি। গুলজারীলাল বাজাজ আমাদের উদ্দেশ্য করে বললেন — স্টোরির মারল্টা কী? কে বলতে পারবে?
পরস্পরের দিকে চাইছি। সবাই বুঝেছি গুলজারীলালের লাশ কাটা ঘরে মরা মানুষের মর্যাদা জ্যান্ত মানুষের চেয়ে বেশি। তবু কেউ ভুল বোঝার ভয়ে উত্তর দিচ্ছে না। অবশেষে প্রদীপ কুমার বলল — স্যর, শিক্ষাটা কী আপনিই মেহরবানী করে বলে দিন।
গুলজারীলাল বললেন — শিক্ষা হল এই যে অপঘাতে না মরাই ভালো। আর সেটা সম্ভব না হলে মেক শিয়োর টু অট্যাণ্ড ইয়োর ওন আটপ্সি। ডাক্তারের কল্চর্ কী, তার শিষ্টাচার কতদূর সে ভরসায় কেউ থেকো না। রহীমীর যুগ পেরিয়ে গেছে। সেই লোকগুলোও নেই, সে জমানাও নেই।
নতুন মাস্ক পরা হয়ে গেছে। কাঁচি আর চিমটে তুলে নিয়ে বাজাজ ক্যাডাভরের দিকে যাত্রা করলেন।
***
— ওকে, এবার তাহলে কাজ শুরু করা যাক? একটা ড্যাড ম্যান্স্ বাডি থেকে আমরা কী শিক্ষা পেতে পারি? দ্য ব্যাস্ট টীচর ওয়ন ক্যান হ্যাভ!
বলতে বলতে বাজাজ লাশের কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন। প্রথমেই গায়ের জোরে ফুটো করার পর ধীরেসুস্থে আর গভীরভাবে বাঁদিকের কাঁধ থেকে চামড়াটা কাটতে শুরু করলেন তিনি। নিখুঁত সোজা লাইন কাকে বলে দেখতে পাচ্ছিলাম। বুকের মাঝামাঝি অবধি আসার আগে মড়ার উপর এই লাহোরী গরিলার জুলুম থামল না। সে ঘুরে টেবিলের অন্যদিকে চলে গেল এবং বডির মাথার কাছে দাঁড়িয়ে ডান কাঁধ থেকে ঠিক একই রকম গভীরভাবে কাঁচিকাটা হয়ে গেল শিমলিপুরের হেড পুরোহিত। ক্যাডাভরের দুদিক দিয়ে জমাট রক্ত আর জল বেরিয়ে আসছিল। স্টিলের টেবিলের একদিকে এসে সেগুলো জমা হওয়ার পর একটা ফুটো দিয়ে নিচের বালতিতে জমা হচ্ছে। ওয়ার্ড বয়দের কাজ কী এবার বোঝা যায়। পাশে আরেকটা খালি বালতি রেখে দিয়েছে তারা। একটা ভরে উঠলেই অন্যটা লাগিয়ে দেবে।
বাজাজ আমাকে দেখিয়ে বললেন — লাইভর্ মার্টিসের সময়ে সমস্ত রক্ত বাডির নিচের দিকে চলে যায়। তার থেকে বুঝবি লাশ কোন পজিশানে ছিল।
দুই কাঁধ থেকে বুকের মাঝখান অবধি দুটো কাটা দাগ এক বিন্দুতে মিলিত হবার পর একটা ইংরেজি ‘ভি’ অক্ষর তৈরি হয়েছে। সেটা দেখার পর উন্মাদ গরিলা যা শুরু করেছিল তাতে আমাকে কয়েক সেকেণ্ডের জন্য চোখ বুজতে হয়। বডির মাথার কাছে দাঁড়িয়ে চামড়ার এই ত্রিভুজ ঢাকনাটাকে সে হাত দিয়ে উপড়ে খোলার চেষ্টা করছে। খানিকক্ষণ পরে চোখের কোণ দিয়ে দেখি রক্ত আর চর্বি মাখা সেই ত্রিভুজটা জানালার পাল্লার মতো খুলে হেড পুরোহিতের মুখের উপর চলে এসেছে।
এবার কাঁচি তলপেটের কাছে গিয়ে আবার চামড়া ফুঁড়েছিল। অভিজ্ঞ দর্জির মতো ত্বকের জীর্ণ কাপড় কেটে চলল গরিলা। নিখুঁত সরল রেখা বরাবর যন্ত্রটা পেটের মাঝখান দিয়ে চলেছে। নাভি এড়াবার জন্য একটা অর্ধবৃত্তের মতো পথে ঘুরে সেটা আবার পেটের মাঝখানে ফিরে এল। রক্তের সঙ্গে গল গল করে আরো একটা কালো পদার্থ বেরিয়ে আসছিল। ছটা একজস্ট থাকা সত্ত্বেও গন্ধ আর আটকানো যাচ্ছে না। যাত্রার শেষে তলপেট থেকে আসা কাটা দাগটাকে বাঁ কাঁধ থেকে ডান কাঁধ পর্যন্ত বিস্তৃত ‘ভি’য়ের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে গরিলার কাঁচি একটা ‘ওয়াই’ অক্ষর বানাল। দুই জুনিয়ার এটারই যেন অপেক্ষা করছিল। দুদিক থেকে পেটের দুদিকের চামড়া হ্যাঁচকা টান মেরে খুলে বুকের পাঁজর আর পেটের সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গের দোকান খুলে দিল তারা।
— কটা পাঁজর ভাঙা গুনে বলো। গরিলা চাপা গলায় গর্জে ওঠে।
— স্যর, ইট্স্ ডিজাস্টর জোন হিয়র। চব্বিশটার মধ্যে বারোটা ভাঙা দেখছি। শঙ্কর নামের লম্বা জুনিয়ার বলল।
— প্রদীপ তুমি কী দেখছ?
— আমিও বারোটা গুনছি। ফোর্থ্ থেকে নাইন্থ্ পর্যন্ত দুদিকেরই সবকটা রিব ভেঙে গেছে। সিমেট্রিকালি ছটা এদিকে আর ছটা ওদিকে।
— ফাঁসের দাগ নেই, স্ট্র্যাঙ্গুলেশন মার্ক নেই, রিব কেজ গুঁড়িয়ে গেছে। গলা দাবিয়ে মারা হয়নি তার মানে। পুলিশ সেটা বলল কেন?
— স্যর, আপার বডির সায়ানোসিস, পিটেকিয়াল হ্যাম্রেজ, আর মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসা রক্ত, এই সিম্প্টমগুলো ওদের চেনা। এগুলো দেখে গেস্ করেছে।
— মৃত্যুর কারণ তাহলে কী?
— স্যর, আমার ওপিনিয়ান একটু পরে দিচ্ছি । তার আগে শঙ্কর যদি কিছু বলতে চায় তো বলুক।
গরিলা ঘুরে শঙ্করের দিকে চাইল। শঙ্কর একটু ঘাবড়ে গেছে মনে হল। সে বলল — ল্যাটেরাল ট্রমা। কাত করে শোয়ানো অবস্থায় চাপ পড়েছে। ভারী কিছু দিয়ে চেপে দেওয়া হয়েছিল। ফলে শ্বাসরোধ হয়ে যায়।
— হুম্ম্। চাপটা কে দিল? সেটা কি একটা জন্তু হতে পারে?
— এটা বলতে পারব না। হাতি যদি হত তাহলে কি বডিতে আরো ইন্জুরি থাকত না?
গরিলা টেবিলের উপর ঝুঁকে ছিল। এবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে। — মাই ডিয়ার ইয়াং ফ্রেণ্ড, এ হাথী ইজ এ মোস্ট ভিশিয়াস্ ফেলো। হাতি হলে লোকটাকে চেনা যেত না। মাথা গুঁড়িয়ে যেত। মানুষ মারতে পারে এমন কোনো জন্তু গলায় বা মাথায় আঘাত না করে ছাড়ে না। হাতি হলে পাঁজর ভেঙে চূরে পেট না ফাটিয়ে যেত না। অন্য যে কোনো জন্তু হলেও অন্তত এক আধটা নখের আঁচড় পেতাম। সে সব কিছু নেই। সবচেয়ে অদ্ভুত হল এই যে গলার উপরের অংশে কোনো আঘাতের চিহ্নমাত্র নেই। এতগুলো রহস্যের একটা ইউনিক সমাধান লুকিয়ে আছে। সেটা কী?
দুই জুনিয়ারই চুপ। গরিলা বলল — দশটা বাজতে এখনো পনেরো মিনিট বাকি। বেশ তাড়াতাড়িই এগোচ্ছি আমরা। ডাইসেকশন্ শুরু করা যাক?
***
পরে শঙ্কর বলল — স্যর্, তাহলে এটা কি নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে মর্ডরই হয়েছে? এমন হতে পারে কি যে অন্য কোথাও মেশিন জাতীয় কিছু চাপা পড়ে লোকটা অ্যাক্সিডেন্টালি মারা যায়? তারপর বডিটা এখানে ডিস্পোজ করা হয়েছিল?
— আফ্ সাইট কম্প্রেশন্ অ্যাস্ফিক্সিয়া? বাজাজ মাথার চুলে হাত বুলিয়ে বললেন — ট্যাকনিকলি ইয়স্। কিন্তু নদীর এত কাছে এনে কেউ জমীনে বডি ডিস্পোজ্ করেছে এটা আমি ফর্টি ইয়ার্স্-এ দেখিনি। জলের এত কাছে এসে ঘোড়া জল খেল না কেন? তাহলে বডিটা যমনাজীতেই যাওয়ার কথা। আর একটা ব্যাপার আছে। লাশের নিচের রক্ত যেভাবে জমেছে তার প্যাটর্ন লক্ষ্য করেছিলে? ঘাসের প্যাটর্ন। লাইভর্ মার্টিস শুরু হওয়ার আগে, মানে মৃত্যুর এক ঘন্টার মধ্যে, দেহটাকে চিৎ করে যমুনার ধারে ফেলা হয়েছিল। সেইজন্য চামড়ায় ঘাসের দাগ বসে গেছে। অন্য কোথাও মারা হয়ে থাকলে খুব তাড়াতাড়ি বাডি ট্রান্সপোর্ট করা হয়েছে বলতে হবে। এনিওয়ে, ইত্ওয়ার কে দিন তোমাদের বিছানা থেকে সকাল সকাল তুলে এনেছি জোর করে। কী গিফ্ট্ চাই আজ বলো? রাকিটান্স্কি না অন্-মাস্?
— স্যর, আজকে অন্-মাস্ হয়ে যাক। প্রদীপ কুমার বলল। আপনি অরগ্যানগুলো বার করুন। আমরা দুজন মিলে ফটাফট্ ডাইসেক্ট করে দেব। কাজটাও তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে। বিকেলে মিসেসের সঙ্গে একটা পার্টিতে যাওয়ার আছে।
— তার মানে সুপার-ফাস্ট্ কাজ হবে আজ। স্টমক্ কে নেবে? শঙ্কর তুমি? পেট থেকে কী বেরোয় সেটা এই ফিল্লমের ক্লাইম্যাক্স্। ন্যাভর্ সিজ্স টু অমেজ।
বাজাজ আমার কাছে চলে এসে গলা নামিয়ে বললেন — আস্লি সীন এতক্ষণে শুরু হচ্ছে। রাকিটান্স্কি হল আটপ্সির একটা তক্নীক্। বাডির এক একটা ফংশন্ ধরে তার প্রত্যঙ্গগুলো কেটে বার করে নিতে হয়। যেমন ধর স্টমক্ আর ইন্ট্যাস্টাইন একসঙ্গে বেরিয়ে আসবে। তার কাজ হয়ে গেলে লং বেরোবে। হার্ট বেরোবে। এইভাবে এক একটা সিস্টম্ ধরে তার আর্গন্গুলোকে ডাইস্যাক্ট্ করি আমরা। স্যাম্পল্ নিই প্যাথলজি ল্যাবের জন্য। আর অন্-মাস্ হল আর একটা তক্নীক্। তাতে সব আর্গন্ এক সঙ্গে বের করে নিতে হয়। তারপর লগে হাথোঁ এক সঙ্গে সব ডাইস্যাক্ট্ হয়ে যায়।
এতক্ষণে সত্যিই গা গুলোতে শুরু করেছিল আমার। ডাইসেকশানটা কী করে থামানো যায় ভাবছি। বললাম — ডাক্টর সাব, এর পর জানার কি কিছু বাকি রইল? স্টমাকে কী আছে সেটা দেখে তো আর বোঝা যাবে না কীভাবে লোকটার উপর প্রেশর্ দেওয়া হয়েছিল।
বাজাজ আমার বিধর্মী যুক্তিতে শিউরে ওঠেন। — প্রসিজর ইজ প্রসিজর। প্রায় ধমকে বললেন তিনি আমায়। — এটা একটা ক্রিমিনাল কেসের বা-কায়দা আটপ্সি। দেয়র্ আর নো শার্ট্কট্স্ টু ট্রুথ। সায়েন্সে আমাদের অ্যাণ্ডল্যাস্লি কিউরিয়স্ হতে হয়। যে সব জানার চেষ্টা করে না, সে কিচ্ছু জানতে পারে না। এখনো অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা বাকি। লোকটা কী খেয়েছিল? কখন খেয়েছিল? ওকে কি স্লো পায়জনিং করা হয়েছিল? কোনো ইন্কিউর্যাবল্ রোগ ছিল কি? ক্রিমনল্কে ধরতে কোন ইন্ফারমেশন্ কাজে লাগবে সেটা কে বলতে পারে?
— আই সী।
— ঘাবড়াস না। আর্গন্গুলো পরে আমরা আবার বাডির মধ্যে ঢুকিয়ে চামড়া সিলাই করে দিই। লাশটা যখন সৎকারের জন্য যাবে তখন বাইরে থেকে খুব খারাপ দেখাবে না। তোর যদি ভয় লাগে বা সহ্য না হয় তাহলে যে কোনো সময়ে উঠে বাইরে চলে যেতে পারিস।
— ভয় করবে না আমার।
বাজাজ টেবিলে ফিরে গেলেন এবং দেয়ালঘড়ি অনুযায়ী প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট ধরে আস্তে আস্তে পেটের ভিতর থেকে এক এক করে ভাইটাল অরগ্যানগুলো সাবধানে কেটে বার করে বাইরে রাখলেন। এক একটা প্রত্যঙ্গের সঙ্গে প্রচুর তরল পদার্থ বেরিয়ে আসছিল। ঠিক মাছের দোকানের মতো ওয়ার্ড বয়রা জল দিয়ে টেবিলের পাশটা একবার ধুয়ে পরিষ্কার করে দিল। বালতি বালতি সেই তরলগুলো সিঙ্ক্-এ ফেলে দেওয়া হচ্ছে। গোটা পাকস্থলীটাকে ট্রে-তে রেখে খুব সাবধানে একটুখানি কাটল শঙ্কর। চিমটে দিয়ে তারপর সে ভিতরটা নেড়েচেড়ে পদার্থগুলো চিনবার চেষ্টা করছিল।
— স্যর, এগুলো তো রুটির টুকরো। চানা রয়েছে। পেঁয়াজের গন্ধ পাচ্ছি। রসুনও। আপনারা পাচ্ছেন? পুরোহিতরা পেঁয়াজ-টেঁয়াজ খায়?
বাজাজ বললেন — আরে আমি কত পণ্ডিতের পেট থেকে আমলেট বের করেছি। ভগ্ওয়ান আমাদের পেট তো এয়রটাইট এই জন্যই বানিয়েছে। যাতে কেউ আস্লি রূপটা জানতে না পারে।
— জানলে কী হত, স্যর?
— কেউ ইন্সান হয়ে থাকতে পারত না। সবাইকে ভগওয়ান হতে হত। তাহলে ভগ্ওয়ানের কি ভ্যালু থাকত কিছু? থাকত না। তাই সেটার পর্মিশন্ নেই। যাই হোক, স্টমকের এই কান্টেন্ট্ থেকে কী জানতে পারছি আমরা?
দুই জুনিয়ার একসঙ্গে বলল — খুন সকালে হয়নি। হয়েছে রাত্রিবেলা।
প্রদীপ কুমার বলল — ওর ডিনরের এক থেকে দেড় ঘন্টার মধ্যে। খাবার অর্ধেকের চেয়ে কম হজম হয়েছে। দেরিতে খেয়ে থাকলেও মিডনাইটের আগেই মওত এসেছিল। নদীর ধার তত গরম নয়। তবে যতই ঠাণ্ডা হোক, সাড়ে ছ ঘন্টার মধ্যে রাইগর্ সেট্ না হয়ে কোনো উপায় ছিল না। আমি তো প্রায় নিশ্চিত যে সকালে যখন লাশ খুঁজে পাওয়া যায় তখন রাইগর্ হওয়া অবস্থাতেই ছিল সেটা।
বাজাজ আমার দিকে ফিরে দুটো হাত ছড়িয়ে দিয়ে বললেন — লে বেটা কেস সাল্ভ্ড্। রাত বারোটার মধ্যে যদি খুন হয়ে থাকে তাহলে বেতাল সেটা করবে কী করে? সে তো টিভি দেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল। সুবহ্ চার সাঢ়ে চার বেজে যাওয়ার পরে সে নদীর ধারে গিয়েছিল।
কেস সাল্ভ্ড্!? এত সোজা? উত্তেজনায় আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েছিলাম। গোটা শহরের পুলিশ যে প্রশ্নগুলো নিয়ে হিমসিম খাচ্ছিল আর যার জন্য অক্কির জীবন নষ্ট হতে চলেছিল সেই সমস্যাগুলো এক ফুঁয়ে এই তিনটে ডাক্তার উড়িয়ে দিল নাকি? যদি জানা যায় পুরুতটা নটার মধ্যে রাতের খাবার খেয়ে নিয়েছিল, তার মানে সে খুন হয়েছে সাড়ে দশটার আগে। তাহলে কি অক্কিদের পরিবারের সবাই নির্দোষ বলে প্রমাণ হয়ে যাবে? টিভির প্রোগ্রামই তো তখনো শেষ হয়নি।
— মজা আয়া? বাজাজ আমায় উঠে পড়তে দেখে জিজ্ঞেস করলেন।
— স্যর্, এরকম মজা আগে কোনোদিনও আসেনি কিছুতে। ম্যাজিকের চেয়ে বেশি।
— কিন্তু কাজ শেষ হয়নি। আরো দেড়-দু ঘন্টার ফিলম্ বাকি আছে। প্রসিজর ইজ কিং। বলতে বলতে বাজাজ সন্তর্পনে গোটা অন্ত্রটাকে কেটে সাপের মতো বার করে এনেছিলেন। দুদিক থেকে হড় হড় করে অবর্ণনীয় সব জিনিস ঝরছে। বাজাজ একা সেই পেটের নিঃসরণ মাখা সাপটাকে সামলাতে পারছিলেন না। ওয়ার্ডবয়রা ছুটে এসে দুটো দিক ধরে তাড়াতাড়ি সিঙ্ক্-এ নিয়ে গিয়ে ফেলেছে। পাইপ পরিষ্কার করার মতো একদিক দিয়ে তোড়ে জল ঢুকিয়ে সেটাকে ধুয়ে খালি করা শুরু হল।
ইতিমধ্যে দুই জুনিয়ার পাকস্থলী আর তার ভিতরে যা ছিল সব সমেত একটা বড়ো বোতলে ভরে তাতে নুন জল দিয়ে সীল করছিল। ওয়ার্ড বয়রা অন্ত্রটাকে ভালো করে ধুয়ে একটা ওয়েট মেশিনে চাপিয়ে দিয়েছে। শঙ্কর সেটাকে ওজন করার পর একটা ফিতে নিয়ে এসে তার দৈর্ঘ্য-প্রস্থ মাপতে শুরু করে।
অন্ত্রের পর বাজাজ যকৃৎ বের করলেন। প্রদীপের জিম্মায় সেটাকে অন্য সিঙ্ক্টাতে দিয়ে আসার পর আমাকে এসে বললেন — বাকিটা লম্বা কিন্তু স্ট্রেট ফারোয়ার্ড্। পেট আর বুকের ভিতর যা আছে সব একটা একটা করে বার করব আর ওরা দুজন সিঙ্ক্-এ ফেলে ডাইসেক্ট করে স্যাম্পল্ নিয়ে নেবে। লিভারটা শুধু একটু ঘেঁটে দেখব আমি। তারপর ব্রেন বার করব। খুব একটা মজা নেই আর। তুই এক কাজ কর। ঘন্টাখানেক একটু বাইরে থেকে ঘুরে আয়। ততক্ষণে আমার কাজ প্রায় শেষ হয়ে যাবে। তারপর রিপোর্ট দেখে নিস।
বাইরে গেলেই তো নেউলেদা ঘাড়ে চেপে লাফাবে। বাজাজকে শুধোলাম — ধীমান রায় কিছু জিজ্ঞেস করলে তার জবাব দিতে পারি?
— দিতে পারিস। বাজাজ একটু থেমে বললেন। — ও আমাকে না দেখিয়ে কিছু ছাপায় না।
ঘর থেকে বেরোবার আগে শেষবারের মতো মৃত লোকটাকে দেখলাম। রাধা কৃষ্ণের বিগ্রহের উলটোদিকে একটা ঘরে থাকত মানুষটা। বহু কুখ্যাতির পদক সংগ্রহ করেছিল। লোকটাকে আমি বোঝার চেষ্টা করতাম। ছেলেবেলা ওর পম্পার মতো একজন প্রিয় সুন্দরী ছিল কি? হয়তো সে পরে হারিয়ে যায়। পম্পার মধ্যে কি ও নিজের হারানো অতীতকে খুঁজছিল?
দরজার আড়ালে থাকা লোকটার পেটের পরদা আজ সরানো। কোনো প্রণালী, কোনো যন্ত্র লুকোনো নেই। এক এক করে শরীরের ব্যক্তিগত সম্পদগুলো হরণ করছে বাজাজের নির্মম ছুরি। কয়েক ঘন্টার মধ্যে আর কিছু পড়ে থাকবে না। ঘর থেকে বেরোবার সময়ে আমি নিজেকে এই লাশটার জায়গায় কল্পনা করলাম। জয় নামের ভাইটাল অরগ্যান ভর্তি চামড়ার থলেটাকে যখন সিঙ্ক্-এ খালি করা হবে তখন নিশ্চয়ই এই শহরের পুরোনো পাথরগুলোর মধ্যে প্রেত-বয় হয়ে আমি কারো অপেক্ষায় বসে থাকব।
পিছনে গুলজারীলাল বাজাজ নিজের জুনিয়ারদের বলছিলেন — হোয়াট্ ইজ দ্য একজ্যাক্ট কাজ আফ্ ড্যাথ মাই ফ্রেণ্ড্স্? বাই নাও আই শুড হ্যাভ ফাউণ্ড ইট। কেন সেটা এখনো সামনে আসছে না?
নেউলেদার ঠাকুর্দা আর আমার দাদু
রিসেপশানের বেঞ্চিতে নেউলেদা চিৎপাত হয়ে শুয়ে হিপোর মতো নাক ডাকাচ্ছে। বারোটা লুচি খাওয়ার ফল। কাঁধ ধরে ঠেলে জাগালাম। মৃত্যু যে সকালের অনেক আগেই হয়েছিল সেই খবরটা শোনার পর তির তির করে কাঁপতে কাঁপতে নেউলেদা বলল — বাই গড জয়, যেদিনই তোর মুখ দেখি সেদিনই আমার বিরাট একটা কিছু লাভ হয়। তুই কোনো শাপভ্রষ্ট ঋষি-টিষি নয়তো?
— কী যে বলো! বিনয়ের সঙ্গে মাথা নাড়াই। — আমি তো নিজেকে ভেড়িয়া ভাবতাম। নরখাদক নেকড়ে বাঘ। কে যেন চারদিকে রটিয়েছিল? ও, হ্যাঁ… ধীমান রায়।
— রাগ পুষে রাখিস না। নেউলেদা আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে। — আমাদের মতো প্রবাসী বাঙালিদের সবসময়ে পরস্পরকে সাহায্য করতে হয়। আমি তোর বন্ধুকে বাঁচাতে কীরকম সাহায্য করলাম দ্যাখ। আচ্ছা, বাজাজ তোকে এত পছন্দ করে কেন বলতো? সিক্রেটটা কী? আমাকে তো মানুষ বলে গণ্য করে না।
— আমিও বুঝি না। তোমার মতো একটা পরোপকারী ভদ্রলোককে ছেড়ে...।
— বাদ দে, বাদ দে। যা হয়ে গেছে, হয়ে গেছে। সীজনের সঙ্গে আমি পালটাই। পালটে গেছি অলরেডি। কাল কখন নিতে আসব তোকে বল। কাকেদা’র শেফকে আমি চিনি। স্পেশাল দেসী চিকেন খাওয়াব।
আজ রবিবার। পম্পার বাবা কাঁচকলার কোফ্তা বানাচ্ছেন। বলা আছে আমার জন্য তোলা থাকবে। কাল গেলে পাব। পম্পাদের বাড়িতে বসে তার আর মাসিমার সঙ্গে গল্প করতে করতে সেটা খাওয়া ছাড়া জীবনে আপাতত আমার আর কোনো উদ্দেশ্য নেই। নেউলেদাকে বললাম — কাল আমার অন্য কাজ আছে। তোমার সঙ্গে যেতে পারব না।
— সে কী? দুল পিসি যে বলে দিল?
— মা’কে কিছু জানাবার দরকার নেই। জিজ্ঞেস করলে আমি বলে দেব চিকেন খাইয়ে দিয়েছ। তুমি আমার অংশটাও খেয়ে নিও।
— তা কী করে হয়? দুল পিসি তোর কথা ভেবে টাকা দিয়েছে।
— বললাম তো মা জানতে পারবে না! তোমার কোনো চিন্তা নেই। তুমি নিশ্চিন্তে টাকাটা রাখো।
নেউলেদা এক মিনিট অন্যমনস্ক হয়ে অন্যদিকে চেয়ে রইল। তারপর হঠাৎ পকেট থেকে চল্লিশ টাকা বার করে আমার হাতে দিয়ে বলল — জয়, টাকা তোর কাছেই থাকুক। যখন পারিস গিয়ে চিকেন খেয়ে নিস। এটা আমার রাখা উচিত না।
বেবাক তাজ্জব হয়ে যাই। ভূতের মুখে রামনাম! নেউলেদা কি সত্যিই পালটে গেল নাকি? দোকানে গিয়ে চিকেন তো আমি খাবও না। তাও নেউলেদা পালটাতে চাইলে সেই সুযোগ তাকে দেওয়া উচিত। বললাম — আচ্ছা নেউলেদা, আমি অর্ধেক রাখছি। তুমি অর্ধেক রাখো। মা বোধহয় সেটাই চেয়েছিল।
নেউলেদা একটু ভেবে — হ্যাঁ, সেটা চলতে পারে — বলে কুড়ি টাকা তুলে নিল।
মা সকালে এমন একটা ডোজ দিয়েছে যে নেউলেদা আর আমাকে ঠকাতে পারছে না। ধীমান রায়ের মুখশ্রীতে আমি তার ঠাকুর্দাকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কোনোদিন মানুষটাকে দেখিইনি। কিন্তু সেই মহাপুরুষটি আছেন কোথাও এখানে। মা দেখতে পায়। আজ সকালে সেই পঁচিশ বছর আগের অশরীরী ছায়ামানুষকে মা কোথা থেকে ধরে এনে নেউলেদার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে। এবার সেই প্রেতপুরুষ নেউলেদার উপর ভর করে তাকে চালাবে।
নিজেকে প্রশ্ন করি। বাজাজও কি দাদুকে সেরকম কোনো ফর্ম্যাল্ডিহাইডের তেলচিটে কাঁচের বোয়েমে পুরে রেখেছেন? সুযোগ বুঝে আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার জন্য?
সকাল থেকে আরেকটা সংশয়ের ভূত ঘাড়ে নিয়ে ঘুরছি। নেউলেদার কাছে প্রকাশ করলাম। — বেতালকে কি গুলজারীলালজী সত্যি বাঁচাতে চান? কী লাভ তাতে ওনার? দুদিন পর তো ক্যানাডা পালাবেন শুনেছিলাম।
নেউলেদা বলে — সেটা একটা রহস্য। আমার সন্দেহ যে বাজাজ বেতালের পোস্টমর্টেম করার আশায় ক্যানাডা যাওয়া পিছিয়ে দিয়েছে। বেতাল জেলে গিয়ে বসে থাকলে সমূহ ক্ষতি। কারণ তাহলে সে হাতের বাইরে হয়ে যায়। তাকে শিমলিপুরে থেকে অপঘাতে মরতে হবে।
— কী আবোলতাবোল থিওরি! বেতালের পোস্টমর্টেম করে ডক্টর বাজাজ কী পাবেন?
নেউলেদা আমার দিকে ঝুঁকে পড়ে ফিস ফিস করে ষড়যন্ত্র করার মতো বলল — বাজাজের বিশ্বাস এই বেতালটাকে সে আগেও একবার লাশ কাটার টেবিলে কেটেছিল। কীভাবে যেন বডিটা জুড়ে গিয়ে আবার ফিরে এসেছে।
***
ঘন্টা দেড়েক পরে লাশকাটা ঘরে গিয়ে টোকা দিই আবার। ওয়ার্ডবয়দের একজন এসে খুলেছিল দরজাটা। সামনেই টেবিলের উপর স্যাম্পল্গুলো সাজানো। পাকস্থলীর পাশে একটা জারে দুটো কিডনির অর্ধেকটা করে অংশ বোধহয় নুনজলে ডুবিয়ে রাখা। বাজাজ বডির খোলের ভিতর কেটে আনা প্রত্যঙ্গগুলো স্যুটকেস প্যাক করার মতো আবার ভরছিলেন। আমাকে দেখে কেউ কোনো কথা বলল না। পা টিপে টিপে গিয়ে নিজের চেয়ার দখল করলাম।
পণ্ডিতজীর দেহ থেকে যতটা ধার করা হয়েছিল, তার চেয়ে কম ফেরানো হচ্ছে। পাকস্থলীর শূন্য জায়গাটায় থার্মোকল আর পলিথিন জাতীয় কিছু দিয়ে দ্রুতহাতে ভরাট করে দিলেন গুলজারীলাল। লিভারের যে অংশটা জুনিয়ারদের হাত ঘুরে ফিরেছে সেটা যথাস্থানে ঢুকতে চাইছিল না। পাতলা এক টুকরো রবার ব্যাণ্ড দিয়ে তাকে বাগে আনা হল। এক একটা অরগ্যান ঢোকানোর সাথে সাথে প্রদীপ খাতায় টিক মেরে যাচ্ছে। সবকটা ঢুকে যাওয়ার পর বাজাজ স্বয়ং সিঙ্ক্দুটো খালি কিনা চেক করে খাতায় একটা সই মেরে দিলেন।
সেলাইয়ের কাজটাও বাজাজ নিজের হাতে করলেন। ‘ওয়াই’ আকারের লম্বা কাটা দাগের উপর মাছের কাঁটার মতো কালো সুতোর স্টিচগুলো দেখে আমার ফুটবলের সেলাইয়ের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। বডিটাকে শেষবার ওজন করাবার পর তার মাথার চুল আঁচড়ে দিয়ে তবে সেদিন দস্তানা খুলেছিলেন শিমলিপুরের প্রবীন লাশকাটা ডাক্তার।
— ফিলম্ খতম্। দি এণ্ড্!
কেতাবি, প্রসিজর মেনে চলা কাজ। কোনো আলস্য নেই, গাফিলতি নেই। হুইস্কির চিহ্নমাত্র নেই।
কোথায় লুকিয়ে থাকে এই লোকটা?
***
কোণের একটা টেবিলে বসে রিপোর্ট লেখা হল। প্রদীপ কুমার প্রথম খসড়াটা করে। গুলজারীলাল সেটাকে কাটাকুটি করে আবার প্রদীপকে দিলেন। প্রদীপ আরো কিছু সংশোধন করে ফিরিয়ে আনল। বাজাজ শেষবার দেখে নিয়ে শঙ্করকে বললেন — অ্যাপ্রুভ্ড্। ফেয়ার কপি হয়ে যাক তাহলে?
ফেয়ার কপি করার সময় রিপোর্ট পড়তে পড়তে শঙ্করের ভুরু কুঁচকে যাচ্ছিল। সে বলল — কনক্লুশন কেমন ধোঁয়াটে শোনাচ্ছে না? কম্প্রেশান অ্যাস্ফিকসিয়েশন্ কি একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ কারণ? কে, কীভাবে বডিতে প্রেশার অ্যাপ্লাই করল সেটা কোর্টে শিওরলি আমাদের জিজ্ঞেস করবে। তখন কী উত্তর দেব?
— ইনকনক্লুসিভ। গমগম করে বললেন গুলজারীলাল বাজাজ। — কজন লোক কীভাবে এই লোকটাকে পিষে মারে সেটা পুলিশের হাতে ছেড়ে দিচ্ছে করোনার। তারা যদি বার করতে পারে তো বার করুক।
— শঙ্কর হ্যাজ আ পয়েন্ট। বলল প্রদীপ কুমার। — অন্তত জংলী জানোয়ার তো রুল আউট করতে পারতাম আমরা। তাও করিনি।
বাজাজ চেয়ারটা একটু পিছিয়ে হেলান দিয়ে বসলেন। — সত্যি কি পারতাম সেটা?
প্রদীপ বলল — আপনার কথাগুলোই রিপিট করছি। মাথায় কোনো ইনজুরি নেই। একটাও নখের দাগ নেই সারা শরীরে। স্নেক বাইট নেই। ওয়াইল্ড অ্যানিমাল রুল আউট করার জন্য এগুলো যথেষ্ট এভিডেন্স্ নয়? জংলী জানোয়ার কি ফিঙ্গারপ্রিন্ট রাখবে না বলে গ্লাভ্স্ পরে আসে? লজিকালি এটা মানুষ ছাড়া কারো পক্ষে করা সম্ভব না।
বাজাজ প্রদীপের উপর একটুও না রেগে চুপ করে তাকিয়ে রইলেন।
প্রদীপ বলল — পালটে দেব নাকি, স্যর? মানুষই বলে দিই তাহলে?
গরিলাটা দেখা দিল আবার। চেয়ার থেকে উঠে লম্বা লম্বা পা ফেলে সেটা ফিরে চলেছে লাশের দিকে। ওয়ার্ডবয়রা বডি মুছে পরিষ্কার করছিল। তারা মুখ তুলে তাকিয়েছে। গরিলা তার মোটা তর্জনি লাশের বুকের দু-দিকে ইঙ্গিত করে বলল — কালসিটেগুলো দেখেছ তোমরা?
— দেখেছি। বলল প্রদীপ। — দেড় ইঞ্চি এক একটা ব্রুইজ। প্রায় সিমেট্রিকালি বুকের দুদিকে।
— এরকম আমি আগেও দেখেছি একবার। থুতনিতে একটা হাত দিয়ে আলতো করে বলল গরিলা।
জুনিয়াররা চুপ।
— তোমাদের বলেছিলাম না, কোনো কেসই নতুন নয়? আজ যা দেখছি তা আগেও ঘটেছে। পরেও ঘটবে। বিলীভ ইট অর নট, ঠিক এরকম একটা কর্প্স্ আমার টেবিলে আগে একবার এসেছিল।
গুলজারীলালের দিকে সবাই চেয়ে আছে। কেউ কিছু বলার সাহস পাচ্ছে না।
— থর্টি সেভেন ইয়ার্স্ ব্যাক। হৃষীকেশে। এরকমই পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চির একটা বয়স্ক লোক। কম্প্রেশান অ্যাস্ফিকসিয়েশনের সমস্ত লক্ষণ তার দেহে। বুকের দুদিকে ব্রুইজ স্পট্স্। মুখ নীল। আর কোনো স্ক্র্যাচ্ নেই সারা শরীরে। আমরা বুঝতে পারছিলাম না রিপোর্টে কী লিখব। গ্রামের লোকেরা এসে বলে দিল সেটা।
— কে মেরেছিল, স্যর? থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করল শঙ্কর।
— কোনো মানুষ নয়। তোমরা আন্দাজ করতে পারো?
— ল্যাণ্ড্ফল কী? পাহাড়ি ধস-টস?
— একটা ময়াল সাপ। এ পাইথন। আই-ডেন্-টি-কল্ বডি। বললেন বাজাজ। — একই লাশ ফিরে এসেছে যেন। অথচ সেই জানোয়ারটা এই তল্লাটে কোনোদিন দেখা গেছে বলে শুনিনি।
ঘড়ির কাঁটা টিক টিক করে বারোটা কুড়ির দাগ পেরিয়ে ডায়ালের স্টেডিয়ামে তার ম্যারাথন দৌড় প্র্যাকটিস করে যাচ্ছে। ঘরে একটা অদ্ভুত বিষন্নতার শব্দ। টেবিলে শোওয়ানো লাশ চিৎকার করে করে যে গল্পটা বলে যাচ্ছিল সেটা ডাক্তাররা কেউ শুনতে পায়নি।
গুলজারীলাল একটু বিরতির পর বললেন — দ্যাট্ রিপোর্ট ইজ ফাইনল্।
***
পরে ক্যান্টিনে লাহোরের সেকেণ্ড বেস্ট সার্জেন আমাকে ফ্রি খাবার খাওয়াতে চেয়েছিলেন। আমি বললাম — নো, থাঙ্কস্। ছুটির দিনে মা দেরি করে রান্না করে। সেটা খেতে বাড়িতে যাওয়া বাধ্যতামূলক।
নেউলেদা জাঁকিয়ে বসে শুরু করেছিল — স্যর, রিপোর্টের একটা শার্প জেরক্স কপি …।
বাজাজ চোখ কপালে তুলে বললেন — ইয়ারকি হচ্ছে নাকি?
নেউলেদা প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে যায়। — আপনি যে বলেছিলেন বিকেলের খবরে ছাপাতে…?
— ছেলেটাকে কেন বসিয়ে রেখেছিলাম? সব তো দেখেছে। ওকে জিজ্ঞেস করে লিখবি এবার। করোনারের রিপোর্ট কোর্টে পেশ হবে। প্যাথলজিও থাকবে। তার আগে কেউ কোনো কপি পায় না। লিখবি বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গিয়েছে।
— স্যর, একটা ছবি টবি ছাড়া এডিটরকে রাজি করানো মুশকিল।
— রুটি আর চানার ছবি যাবে। পুরোহিতটার কোন ইমিডিয়েট ফ্যামিলি মেম্বার নেই। মন্দিরের পরমিশন নিয়ে আটপ্সি হয়েছে। মন্দিরে গিয়ে জিজ্ঞেস কর রাত্রে কটায় খাবার খেয়েছিল। লিখবি তার দেড় ঘন্টার মধ্যে মরেছে। যা এবার গাড়িতে গিয়ে অপেক্ষা কর।
নেউলেদাকে তাড়াবার পর বাজাজ বললেন — সঙ্গে যে দুজন ডাক্তার আর ওয়ার্ড বয় ছিল তারা আমার নিজের লোক। মুখ বন্ধ রাখতে জানে। কিন্তু হাসপাতালে প্রচুর পুলিশের লোক আসে যায়। সেগুলোকে পুরোপুরি বিশ্বাস করি না। সেইজন্য এই চুহাটা আমার কাছে যত কম আসে ততই ভালো।
— ডাক্টর সাহব, আপনি ক্যানাডায় যাচ্ছেন না আর?
— গেলে ভালো হয় তোর?
— আমরাই তো শিমলিপুর ছেড়ে চলে যাব শীগ্গীর। চিরকাল কে থাকবে এখানে?
বাজাজকে একটা থালি দিয়ে গেল ক্যান্টিনের ছেলেটা। রুটি, ডাল, ভাত, তরকারি, আচার। বাজাজ রুটি হাতে নিয়ে অন্যমনস্কভাবে বললেন — ওয়ন্স্ আপন্ আ টাইম এখানকার জল আর হাওয়া এত সাফ আর আকাশ এমন উজালা ছিল যে সবাই এই কলোনিতেই মরতে চাইত। কত বড়ো বড়ো মানুষ এখানে তার শেষ দিন কাটিয়েছে। আর্টিস্ট। সিঙ্গর্। সর্জন্। পোয়েট।
— শিমলিপুরে থেকে আমি হাইস্কুল বয় অবস্থাতেই চাকু খেয়ে মরতে চাই না। অন্য কোথাও গিয়ে কয়েকটা দিন নির্ভয়ে বাঁচতে চাই। দশ বছর পেলেও চলবে।
— আমরাও বাঁচব বলে পাঞ্জাব থেকে পালিয়ে এখানে এসেছিলাম। এখন আমার পালানোর দিন শেষ।
গুলজারীলালের কোন কথার কী মানে করব আমি বুঝতে পারি না। — আপনি ফরেন্সিক ছেড়ে ডাক্তারি শুরু করলেন কেন? যাওয়ার আগে মনের কৌতূহল প্রকাশ করি।
— প্রাইভেট প্র্যাকটিস না শুরু করলে খেতাম কী? ফরেন্সিকের কাজ প্রথম প্রথম বিনে পয়সায় করতে হত। কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল না। আর এখন সরকারি চাকরি থেকে রিটায়ার্ড। প্যানেলে আছি বলে বছরে কয়েকটা মাত্র মড়া কাটতে ডাকে। তাও প্রদীপের মতো কাউকে সঙ্গে রাখতে হয়। সব মড়ার আটপ্সিও হয় না। কোর্ট পর্মিশন্ দিলে তবে করা হয়। পরিবারের লোকজনেরও পর্মিশন্ লাগে, যা এদেশে প্রায়ই পাওয়া যায় না।
মনে মনে আমি ভাবছিলাম শিমলিপুরে ভালো ডাক্তারের খুব অভাব। গুলজারীলাল এখানে আরো কিছুদিন থাকলে সবার মঙ্গল। কিন্তু এই দুর্মুখ আর আজানুলম্বিত হাতওয়ালা রোমশ পুরুষকে সেটা বলতে সাহস হল না। তার উপস্থিতিতে মানুষের উপকার হচ্ছে শুনলে গরিলা নিজেই ক্ষেপে যাবে।
— যা তুই। যা বাড়িতে। মুখ বন্ধ রাখিস। বাজাজ বললেন আমায়।
— আপনি কি আমার দাদুর গল্পটা বলবেন কোনোদিন? হাথগোলাটা তিনি আপনাকে দিয়ে থাকলেও অবশ্য আমি সেটা নিতে পারব না।
— বলব একদিন। শিমলিপুরে যে সব পুরোনো দিনের মানুষরা মরেছে তাদের কেন্দ্র করে একটা রহস্য ছিল। কোনোদিন সমাধান করতে পারব ভাবিনি। হঠাৎ একটা আশার আলো এসে হাজির হয়েছে।
বাহাত্তুরে লাহোরীরা আনতাবড়ি বকতে শুরু করলে কেটে পড়া ভালো। সীটের উপর সরতে সরতে টুক করে একসময়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললাম — পুরোনো অটপ্সির রিপোর্টগুলো থেকে কি কিছু পেলেন?
— একটা রহস্যের চাবি। রুটি ছিঁড়তে ছিঁড়তে বললেন গুলজারীলাল বাজাজ।
কোন রহস্যের কথা বলছিলেন গুলজারীলাল তা আমার মাথায় ঢোকেনি। আমায় আজ এখানে ধরে আনানো হয়েছিল কেন সেই প্রশ্নটাই ধোঁয়ার কুণ্ডলীর মতো চারদিকে পাক দিয়ে চলেছে। সেটা কি শুধু নেউলেদাকে সাহায্য করার জন্য?
যাওয়ার পথে বাজাজকে একটা প্রাগৈতিহাসিক জন্তুর মতো অচেনা গলায় গুড়গুড় করে বলতে শুনলাম — বেতাল ইজ… দ্য কীই…। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি গুলজারীলালের চোখ মুখের ভঙ্গীতে যেন একটা জান্তব উল্লাস ফেটে পড়ছে। মুখ একটু অন্যদিকে ফিরিয়ে বাজাজ নিজের ভুল করে বেরিয়ে আসা চাপা উত্তেজনা গোপন করার চেষ্টা করছিলেন।
একটা বাজতে চলল। কয়েক ঘন্টার স্মৃতি পিছনে ফেলে টিলার ঢালু রাস্তা ধরে নামতে শুরু করি।
প্রহরটা ছিল গরিলার। নেউলেদা রিপোর্টার হয়েও জানতে পারেনি।
(অপ্রকাশিত উপন্যাস থেকে)
১ম পর্ব            ২য় পর্ব            ৩য় পর্ব