




চিঠিটা হাতে নিয়ে হাঁ করে বসে রইল কেকা। এইচ.এম. তখনও কিছু বলে যাচ্ছেন, ওর কিচ্ছু কানে যাচ্ছে না। ইভা আলতো করে কনুইয়ের ধাক্কা দিল। সে কেকার পাশেই বসে। দু’জনে সমবয়সী। হলায়-গলায় বন্ধুও। রিণাদি যথারীতি প্রশ্ন করতে শুরু করল, “এ আবার কি? আমাদের তো কখনও বি.এল.ও.-র ডিউটি পড়ে না। প্রিসাইডিং পড়ে।” ওপাশে ছেলেদের টেবিল থেকে অর্পণ খুনসুটি করল, “সমানাধিকার দিদি।” জীবন-বিজ্ঞানের পার্থজিৎ খুব বিরক্ত মুখে বলল, “একে তো লাইফ-সায়েন্সের আমি একাই আছি। উচ্চমাধ্যমিক স্কুল, তাতে একমাস ডিউটি করলে সিলেবাস শেষ করা অসম্ভব। তার ওপর এস.আই.আর.-এর কাজটা নাকি বেশ ক্রিটিকাল, একমাসেই শেষ হবে বলে মনে হয় না।”
ওদের স্কুলে আঠাশজন টিচারের মধ্যে সাতজনের বি.এল.ও. ডিউটি এসেছে। মেয়েদের মধ্যে কেকার একার। কেকার মনে হতে লাগল কেউ নিশ্চয়ই ওর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে। তাকে বাড়ির গাড়িতে স্কুলে যাতায়াত করতে হয়। আসলে সে অ্যাকিউট অ্যাজমার পেশেণ্ট, ধোঁয়া বা ধুলো তার সঙ্কুচিত ফুসফুসের পক্ষে ভীষণ ক্ষতিকারক। বাড়ির ড্রাইভার মিঠুন তাকে দিয়ে যায়, আবার নিয়ে যায়। কেকার চেহারা ভারী, খুব একটা পরিশ্রম করা অভ্যাস নেই। এমনিতে কেকা হাসিখুশি। ফেরার পথে মিঠুনের সঙ্গে কিছু খুচরো কথা হয়। আজ তার মুখ আষাঢ়ের মেঘের মত থমথমে। সে শুধু ভেবে চলেছে কিভাবে নামটা কাটানো যায়। তাদের স্কুলে মাত্র পাঁচজন লেডি-টিচার। তার মধ্যে অন্য মেয়েরা পেল না শুধু সেই পেল এই ডিউটিটা! এই কথাটা ভাবলেই মনের মধ্যে কেমন তোলপাড় হচ্ছে। ওর একবারও মনে পড়ল না দশবছরের চাকরি-জীবনে ওর কোন এধরনের ডিউটি পড়েনি। অন্বেষাদি আর রীণাদিই বরাবর প্রিসাইডিং অফিসারের কাজ করে গেছে।
***
হাঁটতে-হাঁটতে সারা শরীর কেমন যেন ঘেমে যাচ্ছে কেকার। তার ফরসা গোলগাল মুখে লালের ছোপ। অথচ নভেম্বর মাসের প্রথম। গরম মোটেই নেই। গত কয়েকদিনে সে এই এস.ডি.ও. অফিসের ঘাস মেরে দিয়েছে। কতজনের কাছে যে আবেদন জানিয়েছে তার নামটা কাটানোর জন্য। কোভিডের পর থেকে তার ফুসফুস একটু কম কাজ করে, সামান্য পরিশ্রমেই সে হাঁপায়। এর জন্য সে অনেক চিকিৎসা করিয়েছে। সেইসব চিকিৎসার কাগজপত্র সে নির্বাচন কমিশনে দাখিল করেছে। কিন্তু সব চেষ্টা এবং আশা ব্যর্থ হয়েছে। কিছু একটা উপায় নিশ্চয়ই হবে এই ভাবতে ভাবতেই সে দু’দিন ট্রেনিং নিয়ে ফেলেছে। আজ তাদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেওয়ার পালা। তার আবার মনে হোল কেউ নিশ্চয়ই তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
পরিস্থিতি যত ভয়ঙ্করই হোক মানুষ নামের জীবটি সবসময় সব পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেয়। কেকার বাড়িতে শাশুড়ি আছেন। বাতে প্রায় পঙ্গু। সঙ্গে তার আট বছরের অসম্ভব দুরন্ত ছেলে বিট্টু। এই দু’জনকে সামলে ঠিকসময়ে স্কুলে যাওয়াই তার কাছে চ্যালেঞ্জ ছিল। এরপর এই নিবিড় সংশোধন। তার মাঝেমধ্যে বিশ্বাস হচ্ছে না যে সে সত্যিই সবার বাড়ি গিয়ে ফর্ম দেবে। সে মুখ বেঁকিয়ে কে জানে কাকে ভেংচি কাটল। চল্লিশ ছুঁইছুঁই দিদিমনির পক্ষে কাজটা যে হাস্যকর সেটা তার মাথায় এল না।
***
বস্তিটার মধ্যে ঢুকতেই কেকার কেমন অনিচ্ছা হচ্ছে। গতকাল সে সুদীপ্তর সঙ্গে এসে জায়গাটা দেখে গেছে। সুদীপ্ত তার স্বামী, জি.এস.টি. অফিসার। মানুষের সঙ্গে কাজ করবার অভিজ্ঞতা আছে। বি.এল.এ.-দের ফোন আসাতে কেকা একটু ঘাবড়ে ছিল। তার রাজনীতিতে কোন আগ্রহ কোনদিন ছিল না, এখনও নেই। নিজের সংসার, স্কুল, টি.ভি.-র দু’একটা পছন্দের সিরিয়াল আর বান্ধবীদের সঙ্গে শাড়ি বা গয়নার ডিজাইন নিয়ে আলোচনাতেই তার জীবন চলছিল। তার জীবনপ্রবাহে কোন রাজনৈতিক দল বা তাদের কর্মসূচী কোনটাই গুরুত্ব পেত না। বরং যারা এসব নিয়ে গলা ফাটিয়ে তর্ক করে তাদেরকে সে ভয় পেত। এখন সেইসব দলের লোকেদের নিয়ে মিলেমিশে কাজ করতে হবে এটাই তাকে ভাবিয়ে তুলছিল। কেকার টেনশন সুদীপ্তর খারাপ লাগছিল। কেকা প্রথমে তার কাছেই কেঁদে পড়েছিল যে তার নামটা কাটিয়ে দিতে হবে। সুদীপ্ত নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জানে ভোটের ডিউটি কচ্ছপের কামড়ের মত, ছাড়ানো অসম্ভব। সে তাকে অন্য সবরকমভাবে সাহায্য করতে চাইছিল। তার বেচারা বৌটা ভোলেভালা, নরম মানুষ। কাজটা যে ওকে করতেই হবে সেটাই মানতে পারছে না। সুদীপ্ত কেকার মনের জোর বাড়াবার জন্যই ওকে জায়গাটা দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল।
সত্যি বলতে কি তার বাড়ির এক-দেড় কিলোমিটারের মধ্যে যে এরকম একটা বস্তি আছে তা কেকা আগে জানত না। অস্বস্তি নিয়েই সে কাজটা শুরু করে। প্রায় সাড়ে বারোশ’ মানুষের কাছে ফর্ম বিলি করতে হবে। প্রথম তার খুব বেশি সময় লাগছিল। ভয় পাচ্ছিল আসলে। বিশেষত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের এজেন্টদের। এঁদের পোষাকি নাম বি.এল.এ.। তারা নির্ভুল কাজ করার জন্য এত সাবধান করছিল যে সে মাঝে টেনশনে পড়ে যাচ্ছিল। ভোটারদের মনেও অনেক প্রশ্ন, তারা নিজের নাম যাতে ভোটার তালিকা থেকে বাদ না যায় তার জন্য মরীয়া। সবার প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তার সময় বেশি লাগছিল। ঘুমোতে পারছিল না রাতে। সুদীপ্তকে লুকিয়ে ঘুমের ওষুধ খাচ্ছিল। একই সঙ্গে কাজটাতে দক্ষ হয়ে উঠছিল সে। তার নরমসরম ব্যক্তিত্ব বদলে যাচ্ছিল।
সময় দাঁড়িয়ে থাকে না। একমাস শেষ হয়ে দু’মাসও শেষ হতে চলল। কাজের খুঁটিনাটি বিষয় বেড়েছে আর সেইসঙ্গে বেড়েছে কাজটা করার নির্ধারিত সময়। শীতটা এবার জাঁকিয়ে পড়েছে। কেকার মন আজকাল এস.আই.আর.-এর ভাবনা ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারছে না। ইদানীং রবিবারগুলোও ছুটতে হচ্ছে। সংসার সন্তান সবই পিছনের সারিতে চলে গেছে। স্কুলে যায় শুধু চাকরি বজায় রাখার তাগিদে, মন পড়ে থাকে কতক্ষণে কাজটা শেষ করতে পারবে সেদিকে। কাজটা যেন ফাঁসের মত ওর উপর এঁটে বসেছে। ফর্মগুলো তুলতে হবে ভোটারদের কাছ থেকে। তারমধ্যে মাঝেমাঝেই বি.এল.এ.-দের মোলায়েম শাসানি, “দেখবেন দিদিমনি, মৃত ভোটারের নাম যেন থেকে না যায়। সাঙ্ঘাতিক ঝামেলায় পড়ে যাবেন কিন্তু।” অন্য একজন লোভ দেখায়, “আমাকে কিছু ফর্ম দিয়ে দিতে পারেন, আমি দিয়ে দেব। এলাকাটা হাতের তালুর মত চিনি। আরে ওরা তো শেষ পর্যন্ত আমাকে দিয়েই ফর্মটা পূরণ করাবে।” কেকা সবাইকে সামলে চলে স্মিত হাসি দিয়ে, “আমি তো জানিই অসুবিধা হলে আপনারা আছেন। যতক্ষণ পারি করি।”
আজ শীতের দাপট বেশি, কেকার হাঁপানি বেশ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। তার সঙ্গে কাশিও হয়েছে। সুপারভাইজারের চাপে কাল অনেক রাত জেগে কাজ করেছে। বিদ্যাসাগর পল্লীর ফর্মগুলো তুলতে তুলতেই কাশির দমকে তার বুকটা ব্যথা করে উঠল। হৃৎপিণ্ডটা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে মনে হচ্ছে। সে রাস্তার ওপরই মাটিতে বসে পড়ল।
আশপাশের বাড়ি থেকে মানুষজন এসে কেকাকে ধরে তুলল। কেকা নিজের মধ্যে নেই। ওরা ওকে সামনের ঘরটাতে নিয়ে বসালো। একটি অল্পবয়সী বউ কাঁচের গ্লাসে জল এনে মুখের কাছে ধরল। কাশির দমকে ওর একবারও মনে পড়ল না যে ওর ঝোলাব্যাগেই জলের বোতল থাকে। সে বিনা প্রতিবাদে গ্লাসে চুমুক দিল।
“টুক দম লেন ক্যানে। ও শিখা এট্টু চা দে না ভোটদিদিকে।” বয়স্ক মহিলার আন্তরিক ডাক। কেকা হাত-পা নেড়ে বারণ করার মাঝেই একটা বছর পনেরোর কিশোর সস্তার কাপ-প্লেটে চা আর দুটো বিস্কুট নিয়ে সামনে দাঁড়াল। কেকা চায়ের কাপটা না নিয়ে পারল না। বিস্কুট দুটো কিশোরটির হাতে ফেরত দিয়ে চায়ে চুমুক দিল। সেই ফাঁকে ঘরটা সে খুঁটিয়ে দেখল। সিমেন্টের দেওয়াল, নীচু অ্যাসবেসটসের ছাদ। ঘরের ভেতর সস্তা স্টীলের আলমারি। সেটা আবার দুটো ইঁটের ওপরে রাখা, কেন সে বুঝতে পারল না। ঘরটি সেই সুমনের গানের মত – দশ ফুট বাই দশ ফুট। এর মধ্যেই বড় তক্তপোষের গা ঘেঁষে একটা টিভি রাখা হয়েছে।
একদম চুপ করে মানুষগুলোর যত্ন নেওয়াটা কেকার অভদ্রতা বলে মনে হোল। সে নিরীহ আলাপচারিতা শুরু করল। “এখানেই বরাবর আছেন?”
“হ্যাঁ দিদি, বিয়া থিক্যা ইখানেই। ইখানেই বিটা-বিটির জন্ম, বিটির বিয়াও কাছেই হছে। ই দ্যাখো ইটা লাতি আমার।”
বছর পাঁচেকের বাচ্চা একটা, নাক দিয়ে সর্দির ধারা, মাঝে বাঁ-হাতের পেছন দিয়ে মুছে সেই হাতটা প্যান্টে মুছে ফেলছে। কেকা তাদের সঙ্গে কথা বলছে দেখে আরও জনা ছয়-সাত মহিলা পুরুষ তাকে ঘিরে ভিড় করেছে। একটি বছর তিরিশের যুবক এগিয়ে এসে বলে, “আচ্ছা দিদি যদি কারোর স্ত্রী বা স্বামী অন্য দেশে জন্মে থাকে তাহলে …”
কেকা কথাটা শেষ করতে দেয় না। তাড়াতাড়ি উঠতে উঠতে বলে, “এগুলো আপনাকে অফিসে গিয়ে জানতে হবে ভাই। আমাদের দায়িত্ব শুধু ফর্মগুলো তুলে ঠিকঠাক অফিসে জমা করা। কাগজপত্র ঠিক থাকলে অসুবিধা হবার কথা নয়।”
এসবের উত্তর সত্যিই সে জানে না। সুদীপ্ত বলে দিয়েছে নিজে থেকে বেশি কিছু বলার দরকার নেই। সে কিছু মুখে প্রকাশ করে না কিন্তু নিজে অনুভব করে এই নীচুতলার মানূষগুলোকে নিয়ে একটা আবেগ তৈরি হয়েছে তার বুকের মধ্যে। নিজের অজান্তে তার একটা চেষ্টা তৈরি হয়েছে যাতে এদের নাম বাদ না যায়, অন্তত তার ভুলে যেন কেউ বঞ্চিত না হয়।
রাস্তায় বেরিয়ে কেকা বুঝতে পারল সে হাঁটতে পারছে না, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। তাকে এখনই বাড়ি যেতে হবে। কোনরকমে বড়রাস্তা পর্যন্ত এসে একটা অটো ধরে সোজা বাড়ি, তারপরই বিছানায়। শুয়ে শুয়েই নানারকম চিন্তা তার মনে ভিড় করে এল।
সে ভূগোল পড়ায়। ভারতবর্ষের সীমানা, জলবায়ু, প্রধান খনিজ সম্পদ -- এসব তার জানা। বিভিন্ন রাজ্যের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, অধিবাসীদের ভাষা, খাদ্যাভ্যাস সে ছাত্রছাত্রীদের শেখায়। কিন্তু এই নিবিড় সংশোধনের কাজ করতে এসে সে ভারতবর্ষকে নিবিড়ভাবে জানছে। তার এতদিনের জানাটা ছিল ওপর ওপর, জ্ঞান ছিল পুঁথিগত। রাজস্থান পড়াতে গিয়ে তার চোখে ভেসে উঠত ধু-ধু মরুভূমি, উট। ক্লাসে পড়াবার সময় সে ছাত্রছাত্রীদের তার নিজের রাজস্থান বেড়ানোর গল্পও বলে। জয়সলমীরে উটের পিঠে চেপে সে কী সুন্দর মরুভূমি দেখার স্বাদ পেয়েছে। কিন্তু আজ নিজের বিছানায় শুয়ে তার মনে হোল সে কি সত্যি জানে ঐ মরুভূমিতে সাধারণ মানুষগূলো তাদের রোজকার জীবনে কত কষ্ট করে? তাদের খাবার পাতে কি জোটে ডাল-বাটি-চূরমা না মোটা রুটি আর পাতলা ডাল? অথবা শুধু শুকনো আচার আর রুটি দিয়েই সারতে হয় দুপুর বা রাতের খাবার?
বস্তুত ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যে সে নানাসময় বেড়াতে গেছে, দেখেছে সেখানকার দ্রষ্টব্য জায়গা – কিন্তু সেই জায়গার সাধারণ মানুষ নিয়ে মাথা ঘামায়নি। ভারত আত্মা তাই অধরাই থেকে গেছে। বিহা্র, উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, রাজস্থান, পশ্চিমবঙ্গ সব রাজ্যের মানুষ বাস করে তার ১৭৮ নম্বর ওয়ার্ডের শ্রমিক কলোনিতে যা কিনা আদতে বস্তি। এদেরকে শুধু ভোটার হিসেবে ভেবেই কাজে নেমেছিল। নিজেকে রাখতে চেয়েছিল নিরাপদ দূরত্বে। অথচ আজ মাত্র দু’মাসে সে অনেক ঘনিষ্ঠভাবে জানতে পারছে তার নিজের দেশের মানুষকে। তাদের সমস্যা, তাদের দুঃখ-দুর্দশার বাস্তব কাহিনী।
সে ভাবতেও পারছিল না একটা ভোটার কার্ড শুধুমাত্র ভোট দেবার অধিকার নয়, আধার কার্ড নয় শুধু সামাজিক পরিচয়ের প্রমাণ -- এগুলো এদের বেঁচে থাকার রসদ পাবার জন্য ভীষণ প্রয়োজনীয়। সামাজিক প্রকল্পের মাধ্যমে টাকা, রেশন, চিকিৎসা-- বেঁচে থাকার এইসব উপাদান পাবার হাতিয়ার এই পরিচয়পত্রগুলো। আবার এই দুই অতি প্রয়োজনীয় কাগজও নাকি নাগরিকত্ব নির্দিষ্ট হবার পক্ষে যথেষ্ট নয়। কখনও ভাবেনি কেকা এসব নিয়ে, শুধু নিজের বৃত্তে ঘুরে মরেছে। তার মনে হতে থাকে এই নিবিড় সংশোধনের কাজটা ফাঁস নয়, এটা বরং একটা চেতনা বিকাশের পাঠক্রম। ভারত আত্মাকে খোঁজার বোধ তাকে দিয়েছে এই একদা অবাঞ্ছিত কাজটি। পাল্টে দিয়েছে তার জীবনদর্শন। তাকে জানতে হবে প্রতি রাজ্যের সাধারণ মানুষের কথা, তাদের জীবনযাপন, তাদের মনের কথা। সে নিজের বোধ দিয়ে বুঝতে পারছে তার এলাকায় সবাই মোটামুটি এই দেশেরই মানুষ। কাজের খোঁজে নিজ রাজ্যের বাইরে বেরোতে বাধ্য হয়েছে এরা। এদের স্বার্থহানি হয় এমন কোন ভুল সে করবে না।
অসুস্থ শরীরেও উঠে বসল কেকা। বাদবাকি কাজগুলো সারবে। যে এনুমারেশন ফর্মগুলো এখনও আপলোড করা বাকি করে নেবে সেগুলো। তারপর খুঁজে দেখতে হবে সংরক্ষিত জনজাতির তালিকা। ঐ বিষয়টাতেও কিছু কাজ বাকি। ল্যাপটপের ওপর আঙুল ঝড় তুলছে। দরজায় কলিং বেলের আওয়াজ। পর্মুহূর্তেই পর্দা সরিয়ে উদ্বিগ্ন মুখ, “এখন কেমন লাগছে? ইনহেলার ভুললে কী করে? একে তো তোমার এরিয়াটা একদম হাইজেনিক না।”
হাত থামে না, মুখও তোলে না কেকা। “কিন্তু ঐ আনহাইজেনিক এরিয়াতে বিট্টুর বয়সীরাও থাকে সুদীপ্ত। আমার অসুবিধা, আমার অসুখ নিয়েই এতদিন বিব্রত থেকেছি, ঐ ছ’-সাতশো লোকের অ-সুখ নিয়ে ভাবার চিন্তাও মাথায় আসেনি। এরাই আমার কাছে এখন ভারতবর্ষ, আমি আমার দেশকে জানতে চেষ্টা করছি।”
হতবাক সুদীপ্ত হঠাৎ খেয়াল করে তার নরম সাদামাটা বৌটা এই ক’মাসে বড্ড রোগা আর দুর্বল হয়ে গেছে। চোয়ালের হাড়গুলো যেন কেমন শক্ত-তীক্ষ্ণ। কেকা মুখ তুলে তাকায়, “ভাবছ কেকা কি এসব ভাবতে পারে? পারতাম না গো। নিবিড় সংশোধনের কাজটা করতে গিয়ে অনেক কিছুই নতুন করে জানছি । আমি তোমাদের কেকাই আছি শুধু একটু ভাবতে শিখেছি।”
সুদীপ্ত তাকিয়েই থাকে, পাল্টে গেছে মেয়েটা। কিন্তু তার ভালো লাগে। অল্পতেই ঘাবড়ে যাওয়া মেয়েটার বদলে দৃঢ়চেতা একজন পূর্ণাঙ্গ নাগরিককে দেখতে থাকে সে।