• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৪ | অক্টোবর ২০২৬ | গল্প
    Share  
  • থ্যাংকসগিভিং : আনন্দিতা চৌধুরী

    ১৯৯৫

    “ইচ্ছে করে হেরে গেলেন?”

    কানের কাছে নীচু গলায় করা প্রশ্নটা শুনে চমকে ওঠে সোমা। এই যাহ, ধরা পড়ে গেছে!

    ফিরে দেখে, উফফ, সেই বেড়ে পাকা ছেলেটা! আমেরিকার অর্থনীতি থেকে ভারতের রাজনীতি, এবং আমেরিকার রাজনীতি থেকে ভারতের অর্থনীতি, সব বিষয়েই নাকি সে সবকিছু জানে। মানে, লোকের হাবভাব দেখে তো তাই মনে হয়। সব ব্যাপারে দেখা যাচ্ছে সবাই এর কাছেই জ্ঞান চাইছে, বাবু ঢেলে ঢেলে দিচ্ছেনও সেই জ্ঞান। এখন আবার তাকে নিয়ে পড়লো কেন!

    “কী বলছেন?"

    “না, মানে, খেলতে এত বাজে লাগছিল?"

    ঠিক বুঝেছে তো ! সত্যিই, এইসব পার্টি গেমস তার একেবারেই পোষায় না। আরে বাবা, সারাদিন লাইব্রেরিতে ক্লাসে কাজ, বাড়ি ফিরে রান্না করো কাপড় কাচো ঘর ঝাঁট দাও পরের দিনের জন্য তৈরি হও। একটা দিন কারো বাড়িতে নেমন্তন্ন থাকলে তার ইচ্ছে করে একটু শান্তিতে বসে ভালোমন্দ খায়, নির্ভেজাল আড্ডা দেয়। কিন্তু কিছু লোকের বাতিক আছে, নানা রকম পার্টি গেমস-এর আয়োজন করা, এবং জোরজার করে সবাইকে খেলতে বাধ্য করা। খুব একটা কথা বাড়াতে সোমা কোনদিনই স্বচ্ছন্দ নয়। তাই ইচ্ছে করেই সে মিউজিক্যাল চেয়ারের প্রথম রাউন্ডেই হেরে বেরিয়ে এসে আরেক দফা চিকেন পকোড়া নিয়ে আরামসে এক কোনায় এসে বসেছে। এ দেখি তার প্ল্যান ধরে ফেলেছে!

    “কাউকে বলবেন না প্লিজ! খাবেন?” প্লেটটা বাড়িয়ে ধরে সোমা।

    “ঘুষ? ও কে!”একটা পকোড়া তুলে নিয়ে সম্বিত বলে, “আপনি শুনলাম ঘ্যামা ইউনিভার্সিটিতে ঘ্যামা রিসার্চ করছেন। সাবজেক্ট কী আপনার?”

    “অ্যাপ্লাইড ম্যাথস।” (ঘ্যামা! কী কথার ছিরি!)

    হাঁ করে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে সম্বিত প্রশ্ন করে, ”আপনার বাবা কি খুব কড়া মানুষ, উনি যা বলবেন তাই আপনাকে করতে হয় নাহলে ত্যাজ্য করে দেবেন?"

    নিজের নিপাট ভালোমানুষ শান্তশিষ্ট বাবার কথা মনে করে অবাক হয়ে সোমা বলে, ”না তো, কেন?"

    “মানে, কেউ জোর করেনি, চাপ দেয়নি, আপনি নিজে নিজে শখ করে অংক নিয়ে পড়ছেন, পড়েই চলেছেন পড়েই চলেছেন? পায়ের ধুলো দিন মাইরি, আমি মাধ্যমিকে অংকে টেনে টুনে উনপঞ্চাশ পেয়েছিলাম!"

    আর পারে না সোমা, দমকা হাসি হাসতে হাসতে বিষমটিসম খেয়ে একাকার। ”ষাট ষাট”বলে একটা কাগজের প্লেট তুলে তার মাথায় বাতাস করছে সম্বিত, কোনরকমে মুখ তুলে চেয়ে এটা দেখেই আবার হাসিতে ফেটে পড়ে সোমা।

    তাদের এই হাসি আড্ডার দৃশ্য যে লোকের চোখ এড়ায় না, বরং বেশ কিছু মুচকি হাসি ফিসফিস কথার জন্ম দেয়, সোমা সেটা খেয়াল করে না।

    পার্টির শেষে সোমা যখন বাড়ি ফেরার তোড়জোড় করছে, সুমিতাবৌদি বলে, ”শ্যামল একটু বেশি টায়ার্ড আছে আজ সোমা, তোমাকে নাহয় সম্বিত ড্রপ করে দিক, কি সম্বিত, পারবে না?"

    সোমা একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। ইউনিভার্সিটি টাউনে থাকার দরুণ সে মোটামুটি পাবলিক ট্রান্সপোর্ট পেয়েই যায় রোজকার কাজের জন্য। খরচ বাঁচাতে তাই গাড়ি কেনেনি আর। কিন্তু সমস্যা হয় সাবার্বে এইসব পার্টিতে এলে, গাড়ির অভাবটা খুব বুঝতে পারে তখন। দাদার বন্ধু শ্যামলদা সুমিতাবৌদি তার এদেশে আসা থেকেই খুব খেয়াল রেখেছে সোমার, এরা ডাকলে না করাও যায় না। কিন্তু ফেরাটা তো সমস্যা হয়ে গেল, হঠাৎ একটা সদ্যপরিচিত লোককে এত রাতে রাইড দিতে বলতেও তার খারাপ লাগছে।

    “আমি বরং একটা ক্যাব ডেকে নিই বৌদি।"

    “নাহয় আমাকে গুণ্ডার মত দেখতে, তাই বলে উনি এই রাতবিরেতে ক্যাব ড্রাইভারকে ভরসা করছেন কিন্তু আমাকে নয়, এই অপমান কিন্তু আমি মেনে নিতে পারছি না সুমিতাবৌদি!"

    উফফ, ছেলেটা এত কথা বলে কেন!

    “যাও যাও সোমা, আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি, ছেলেটা পাগল হলেও পাজি নয়,” বৌদি হাসতে হাসতে বলে।

    বেরিয়ে পড়ে দুজন। বৌদির মিটি-মিটি হাসি সোমার চোখ এড়িয়ে যায়।

    এপার্টমেন্টে পৌঁছে সোমা বলে, ”থ্যাংক ইউ! সরি আপনার তো অনেক রাত হয়ে যাবে বাড়ি ফিরতে।”

    “তা নাহয় একটু হবে। তাই বলে বৌদির এত কষ্ট করে করা প্ল্যানটা তো আর ভেস্তে দিতে পারি না।"

    “প্ল্যান মানে?"

    “এই হচ্ছে অংকের লোকের জ্বালা। ফর্মুলা ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না। আমাকে আপনার সঙ্গে পাঠানোটা আগাগোড়াই বৌদির প্ল্যান ছিল, বোঝেননি? নাহলে ওই ঘোষ না বোস কী যেন ফ্যামিলিটা, ওরা তো আপনার কাছাকাছিই থাকে, ওদের সঙ্গেই তো আপনি ফিরতে পারতেন।"

    মুখটা লাল হয়ে যায় সোমার। ইশ, ছি ছি, বৌদি যে কেন এমন ম্যাচমেকিং শুরু করলো! ভদ্রলোক না জানি কী ভাবছেন!

    তাকিয়ে দেখে, সম্বিতের মুখে মৃদু মৃদু হাসি। “বৌদির প্ল্যানটা কি খুবই খারাপ? না আমি লোকটা একেবারেই বাজে? আরেকবার দেখা করে যাচাই করবেন নাকি?"


    ১৯৯৬

    “সোমা, এই বছরও থ্যাংকসগিভিং পার্টিতে আসছ তো? শ্যামল গিয়ে তোমাকে নিয়ে আসবে, কেমন?"

    “হ্যাঁ বৌদি, আসব। তবে শ্যামলদাকে আসতে হবে না। আমি, মানে, আমরা, একসঙ্গে চলে আসব। মানে, মানে, আমি আর সম্বিত।"

    “ও মা তাই!"

    একগাল হেসে দরজা খোলে বৌদি, জড়িয়ে ধরে সোমাকে। “উফফ, কী ভালো যে লাগছে তোমাদের দুজনকে একসাথে দেখে।"

    “সারা জীবন যাতে একসাথে থাকতে পারি তার জন্য আমার হয়ে একটু সুপারিশ করুন না বৌদি। এ মেয়ে তো বিয়েতে হ্যাঁ বলছেই না, আমি নাকি ইতিহাসের লোক, অংক বুঝি না, আর বেশি কথা বলি, তাই জন্য।"

    “ও বাবা, একেবারে বিয়ে অবধি পৌঁছে গেছে ব্যাপারস্যাপার! শুনলে শ্যামল?"

    লজ্জা পেয়ে সোমা বলে, “না গো বৌদি, ও বেশি বেশি বলছে!"

    “ও! ও বলে ডাকছ যখন তখন আর কিচ্ছু বলতে হবে না, বুঝে গেছি সব!” হাসতে হাসতে সোমাকে টেনে অন্য মহিলাদের কাছে নিয়ে যায় সুমিতা, তাকে ঘিরে হইহই শুরু হয়ে যায়।

    “All the best brother,” সম্বিতকে জড়িয়ে ধরে শ্যামল।

    ২০২৬

    “শোনো, আমি এই সবুজ কাঞ্জিভরমটা পরব। তোমার যে হালকা সবুজ পাঞ্জাবিটা এনে দিলাম এবার, সেটা পরো কিন্তু।"

    “যেমন বলবেন সোমা ম্যাডাম। আপনি যেমন রাখেন তেমনই তো থাকি, এই তিরিশ বছর।"

    “উফফ, আবার যত বাজে কথা! এই, শোনো না সম্বিত, বলছি, তোমার কলেজে যে নতুন বাঙালি মেয়েটা জয়েন করেছে, ওই যে গো, রাই, ওকে আমাদের পার্টিতে ডেকো, কেমন? আমার যে নতুন রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট এসেছে, কলকাতার ছেলে সায়ন, তুমি তো দেখেছো ওকে, বেচারা নতুন দেশে একা একা মনমরা হয়ে ঘোরে, ভাবছি দুজনকে আলাপ করিয়ে দেব।"

    “আরে সোমা, তুমিও তো দেখি সেই সুমিতাবৌদির মত ম্যাচমাকিং শুরু করে দিলে..."

    সম্বিতের হাতটা ধরে সোমা।” কেমন সুন্দর তিরিশ বছর একসঙ্গে কাটিয়ে দিলাম আমরা, বলো। বৌদির জন্যই তো। সায়ন-রাইও যদি বন্ধু হয়ে যায় তাহলেই তো সত্যি সত্যি দাদাবৌদিকে থ্যাংকস জানানো হবে, তাই না ! আমাদের সত্যিকারের থ্যাংকসগিভিং !"



    অলংকরণ (Artwork) : কল্লোল রায়
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  •   (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments