




‘অসীর চেয়ে মসি বড়’ — কথাটি আমাদের মুখে মুখে এমন সাবলীলভাবে ফেরে যে এর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যেন এক ধরনের ধৃষ্টতা। বাক্যটির জন্ম ১৮৩৯ সালে, ইংরেজ নাট্যকার এডওয়ার্ড বুলওয়ার-লিটনের নাটক রিশল্যু-তে। কার্ডিনাল রিশল্যুর মুখে বসানো এই সংলাপ আদতে রাজনীতির কূটকৌশলের জয়গান ছিল — অস্ত্রের চেয়ে চতুরতা যে বেশি কার্যকর, সেই বার্তাই দিতে চেয়েছিলেন লেখক। কিন্তু সময়ের স্রোতে বাক্যটি তার আসল প্রসঙ্গ হারিয়ে ফেলেছে। বদলে হয়েছে- ‘জ্ঞান আর মুক্তচিন্তার কাছে ক্ষমতা চির নতজানু’ এমন এক অলীক বিশ্বাসে। আমরা ভুলে যাই, একটি প্রবাদ যত সুন্দর শোনায়, ইতিহাস তত সহজে তার পক্ষে সাক্ষ্য দেয় না। কারণ ইতিহাসের পাতা উল্টালে অন্য এক ছবি ভেসে ওঠে। সক্রেটিসকে হেমলক পান করতে হয়েছিল একটি প্রশ্ন করার অপরাধে। গ্যালিলেওকে নতজানু হয়ে নিজের আবিষ্কার প্রত্যাহার করতে হয়েছিল, নইলে যে আগুন অপেক্ষা করছিল। জিওর্দানো ব্রুনো সেই আগুনেই পুড়ে মরেছিলেন রোমের এক চত্বরে, নিজের বিশ্বাস প্রত্যাহার করতে অস্বীকার করার মূল্য হিসেবে। আর আমাদের নিজেদের বিদ্রোহী কবিকে যেতে হয়েছিল কারাগারে, কেবল একটি পত্রিকায় সত্য লেখার অপরাধে। কলম বহু ক্ষেত্রেই হার মেনেছে তরবারির কাছে — অন্তত তাৎক্ষণিকভাবে, অন্তত সেই মুহূর্তে যখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল কার কণ্ঠ স্তব্ধ করা হবে।
এই প্রবন্ধ সেই ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকানোর একটি প্রয়াস — জ্ঞান আর ক্ষমতার সম্পর্ককে বিজয়ীর গৌরবগাথা হিসেবে না দেখে, বরং একটি দীর্ঘ, রক্তাক্ত, এখনও অসমাপ্ত দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখার চেষ্টা। প্রশ্নটি সহজ নয়: যদি কলম সত্যিই তরবারির চেয়ে শক্তিশালী হতো, তবে ইতিহাস জুড়ে এত বিজ্ঞানী, দার্শনিক আর কবিকে কেন মূল্য দিতে হলো নিজেদের স্বাধীনতা, এমনকি জীবন দিয়ে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিভিন্ন যুগ আর ভূগোল থেকে বেছে নেওয়া হয়েছে কিছু প্রতিনিধিত্বমূলক ঘটনা — প্রাচীন গ্রিসের রাজপথ থেকে বিশ শতকের শ্রমশিবির পর্যন্ত, রোমান তরবারির নিচে পিষ্ট এক গণিতবিদ থেকে ঔপনিবেশিক কারাগারে বন্দি এক বিদ্রোহী বাঙালি কবি পর্যন্ত। এই তালিকা নিঃসন্দেহে সম্পূর্ণ নয়, হতেও পারে না — আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা বা পূর্ব এশিয়ার অসংখ্য অনুরূপ ঘটনা এখানে অনালোচিত থেকে গেছে। তবু প্রতিটি নির্বাচিত ঘটনা একই সত্যের দিকে আঙুল তোলে — জ্ঞান যখন প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে অস্বীকার করে, তখনই তার ওপর নেমে আসে সবচেয়ে কঠোর আঘাত।
জ্ঞান-ক্ষমতা দ্বন্দ্বের তত্ত্বঃ
এই দ্বন্দ্বকে বুঝতে সাহায্য করে তিনজন চিন্তাবিদের কাজ, যাঁরা বিশ শতকে জ্ঞান ও ক্ষমতার সম্পর্ককে নতুন করে ভেবেছিলেন। ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো দেখিয়েছেন, জ্ঞান কখনও নিরপেক্ষ থাকে না। ক্ষমতার কাঠামোর ভেতরেই তার জন্ম, আর সেই জ্ঞান আবার ক্ষমতাকে বৈধতা জোগায় — শিক্ষা, চিকিৎসা, আইন কিংবা ধর্মের মতো প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। ফুকোর ভাষায় ক্ষমতা আর জ্ঞান ‘পারস্পরিকভাবে গঠনমূলক’ — একে অপরকে জন্ম দেয়, একে অপরকে শক্তিশালী করে (Foucault, 1980)। যখনই জ্ঞানচর্চা প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তখনই সেই জ্ঞানকে দমন করার প্রবণতা দেখা দেয়।
ইতালীয় মার্ক্সবাদী চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামশি এই ধারণাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে বলেন, শাসকশ্রেণি কেবল অস্ত্র বা অর্থের জোরে নয়, শিক্ষা-সাহিত্য-গণমাধ্যম আর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে একটি ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’ তৈরি করেই সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করে (Gramsci, 1971)। শাসকের মতাদর্শ যখন সমাজে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘সাধারণ সত্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, তখন সেই মতাদর্শের বাইরে গিয়ে চিন্তা করা মানুষটিই হয়ে ওঠেন ক্ষমতার জন্য এক সম্ভাব্য হুমকি। গ্রামশি বুদ্ধিজীবীদের দুই ভাগে ভাগ করেছিলেন — যাঁরা প্রচলিত কাঠামোকে সমর্থন করেন, আর যাঁরা নিপীড়িত মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে সেই কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করেন। ইতিহাসে দমন-পীড়নের শিকার হন মূলত দ্বিতীয় দলটিই। আর ফিলিস্তিনি-আমেরিকান চিন্তাবিদ এডওয়ার্ড সাঈদ মনে করিয়ে দেন, প্রকৃত বুদ্ধিজীবীর কাজ ক্ষমতার মুখের ওপর সত্য উচ্চারণ করা — ‘speaking truth to power’ (Said, 1994)। সাঈদের মতে, বুদ্ধিজীবী যদি ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে অতিরিক্ত আপস করে ফেলেন, তবে তিনি তাঁর নৈতিক দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হন। কিন্তু সেই সত্য উচ্চারণের মূল্য প্রায়ই তাঁকে নিজের নিরাপত্তা, এমনকি জীবন দিয়ে চোকাতে হয়। এই তিনটি ধারণা মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, কলম আর তরবারির লড়াই আসলে কোনো একরৈখিক প্রতিযোগিতা নয়। এ এক জটিল, বহুমুখী সম্পর্ক, যেখানে জ্ঞান কখনও ক্ষমতার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, কখনও তার প্রতিপক্ষ — আর ইতিহাস সেই দ্বন্দ্বেরই এক দীর্ঘ সাক্ষ্য।
বিজ্ঞান ও তরবারিঃ
খ্রিস্টপূর্ব ২১২ সালে রোমান সৈন্যরা যখন সিরাকিউজ নগরী দখল করে, তখন গ্রিক গণিতবিদ ও পদার্থবিদ আর্কিমিডিস মগ্ন ছিলেন এক জ্যামিতিক সমস্যার সমাধানে, মাটিতে আঁকা বৃত্তের ওপর। কথিত আছে, এক রোমান সেনা তাঁকে হত্যা করে, যদিও সেনাপতি মার্সেলাস স্বয়ং তাঁকে জীবিত ধরে আনার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ‘আমার বৃত্তে হাত দিও না’ — আর্কিমিডিসের এই শেষ উক্তি এই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে (Plutarch, trans. 2001)। যুদ্ধের নির্মম যুক্তির সামনে বৌদ্ধিক অবদানের কোনো মূল্য ছিল না; সামরিক শক্তির সামনে একজন মহান বিজ্ঞানীর জীবনও নিরাপদ ছিল না। ছয় শতাব্দী পরে আলেকজান্দ্রিয়ায় হাইপেশিয়া — প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম শিক্ষিত নারী, গণিতবিদ ও দার্শনিক — এক ধর্মান্ধ জনতার হাতে নৃশংসভাবে নিহত হন ৪১৫ খ্রিস্টাব্দে। ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী তাঁকে রাস্তায় টেনে এনে পাথর ও ধারালো বস্তু দিয়ে হত্যা করা হয় (Watts, 2017)। ধর্মীয় উগ্রতা আর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার এক চরম উদাহরণ হয়ে আছে এই হত্যাকাণ্ড, যেখানে যুক্তি আর সহনশীলতার পক্ষে দাঁড়ানোই ছিল হাইপেশিয়ার একমাত্র ‘অপরাধ’।
সতেরো শতকে ইতালীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্যালিলেও গ্যালিলেই দূরবীনে চোখ রেখে দেখেছিলেন, কোপার্নিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্বই সত্য — পৃথিবী নয়, সূর্যই এই সৌরজগতের কেন্দ্র। কিন্তু তৎকালীন ক্যাথলিক চার্চ পৃথিবীকেন্দ্রিক মহাবিশ্ব-ধারণাকে ধর্মীয় সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে রেখেছিল। ১৬৩৩ সালে রোমান ইনকুইজিশন আদালতে তাঁর বিচার হয়, নিজের মতবাদ প্রত্যাহারে বাধ্য করা হয়, আর বিচারের শেষে তাঁকে আজীবন গৃহবন্দি করে রাখা হয় (Finocchiaro, 1989)। বিজ্ঞান ও ধর্মীয় ক্ষমতার সংঘর্ষের এক ক্লাসিক দৃষ্টান্ত এই ঘটনা — গ্যালিলেওর গবেষণা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক হলেও তা চার্চের মতাদর্শিক কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছিল বলেই তার মূল্য দিতে হয়েছিল তাঁকে। তাঁরই সমসাময়িক জিওর্দানো ব্রুনো মহাবিশ্বকে অসীম বলে ব্যাখ্যা করেছিলেন, বহু গ্রহে জীবনের সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। এই ধারণা তৎকালীন ধর্মতত্ত্বের বিরুদ্ধে ছিল। ১৫৯৩ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়, আর দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার পর ১৬০০ সালে রোমে তাঁকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয় (Rowland, 2008)। ব্রুনোর মৃত্যুদণ্ড কেবল ধর্মীয় মতাদর্শের কঠোরতা নয়, বরং নতুন বৈজ্ঞানিক সত্যের ওপর ক্ষমতার অভিভাবকত্ব।
ফরাসি বিপ্লবের উত্তাল দিনগুলোয় আধুনিক রসায়নের জনক আঁতোয়ান লাভোয়াজিয়েকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয়। তিনি কর সংগ্রহকারী এক সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে বিপ্লবীদের কাছে ঘৃণিত ছিলেন। ১৭৯৪ সালে বিপ্লবী ট্রাইব্যুনাল তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়, গিলোটিনে তাঁর মাথা কাটা যায়। গণিতবিদ লাগ্রাঞ্জ তখন আক্ষেপ করে বলেছিলেন — এক মুহূর্তেই যে মাথা কেটে ফেলা হলো, তেমন একটি মাথা আবার তৈরি হতে শত বছর লাগতে পারে (McClellan & Dorn, 2015)। রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় জ্ঞান ও বিজ্ঞানের মূল্যও যে ক্ষমতার রাজনীতির কাছে তুচ্ছ, এই ঘটনা তারই প্রমাণ।
এই প্রতিটি ঘটনায় একই প্যাটার্ন ফিরে ফিরে আসে — বৈজ্ঞানিক সত্য যখনই প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতা বা ধর্মীয় কর্তৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, শাসকেরা যুক্তির বদলে বেছে নিয়েছে বলপ্রয়োগের পথ। ফুকোর ‘নলেজ-পাওয়ার’ তত্ত্বের সঙ্গে এই বাস্তবতা পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ — ক্ষমতা প্রায়ই জ্ঞানকে নিয়ন্ত্রণ ও দমনের মধ্য দিয়েই নিজেকে টিকিয়ে রাখে (Foucault, 1980)।
দর্শনের অপরাধঃ
দর্শন সমাজের নৈতিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলে বলেই দার্শনিকেরা প্রায়ই ক্ষমতার চক্ষুশূল হয়ে ওঠেন। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস তাঁর প্রশ্নভিত্তিক শিক্ষাপদ্ধতিতে এথেন্সের সমাজ ও রাজনীতিকে প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ করতেন। খ্রিস্টপূর্ব ৩৯৯ সালে ‘যুবসমাজকে বিভ্রান্ত করা’ আর ‘নতুন দেবতা প্রচারের’ অভিযোগে তাঁকে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়। আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়, হেমলক বিষ পান করতে বাধ্য করা হয় (Plato, trans. 2002)। গণতান্ত্রিক এথেন্সেও যে মুক্তচিন্তা সহনীয় হয়নি, সক্রেটিসের মৃত্যু তারই এক নির্মম প্রমাণ।
জিওর্দানো ব্রুনোও কেবল বিজ্ঞানী ছিলেন না, ছিলেন একজন গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিকও, যিনি ধর্মীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বৌদ্ধিক স্বাধীনতার পক্ষে অবিচল ছিলেন। তাঁর দার্শনিক ধারণাগুলো চার্চের কাছে বিপজ্জনক মনে হয়েছিল বলেই তাঁকে এমন নির্মমভাবে মূল্য দিতে হয়েছিল। দার্শনিক চিন্তা প্রায়ই ক্ষমতার নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, আর তখনই শাসকশ্রেণি চিন্তার স্বাধীনতাকে দমন করে নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করে। গ্রামশির ভাষায় বলা যায়, শাসকেরা সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে সমাজের চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় (Gramsci, 1971) — আর যে চিন্তা সেই আধিপত্যের বাইরে যায়, তাকে থামিয়ে দেওয়াই হয়ে ওঠে ক্ষমতার প্রথম প্রতিক্রিয়া।
কারাগারে শব্দঃ
সাহিত্য মানুষের আবেগ আর রাজনৈতিক চেতনা জাগিয়ে তুলতে পারে বলেই শাসকেরা বারবার কবি-লেখকদের দমনের চেষ্টা করেছে। রুশ কবি ওসিপ মান্দেলস্তাম ১৯৩৩ সালে স্তালিনকে ব্যঙ্গ করে একটি কবিতা লেখেন। এই কবিতার মূল্য তাঁকে চোকাতে হয় গ্রেপ্তার, নির্বাসন আর শেষ পর্যন্ত এক শ্রমশিবিরে মৃত্যু দিয়ে (Mandelstam, 1970)। স্পেনীয় কবি ও নাট্যকার ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময় ফ্যাসিবাদী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন, ১৯৩৬ সালে তাঁকে হত্যা করা হয়। তাঁর প্রগতিশীল রাজনৈতিক অবস্থান আর ব্যাপক জনপ্রিয়তাই ফ্রাঙ্কোর সমর্থকদের কাছে হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল (Gibson, 1989)। আর আমাদের নিজেদের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর কবিতা ও প্রবন্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান। তাঁর পত্রিকা 'ধূমকেতু'-র মধ্য দিয়ে ব্রিটিশবিরোধী বলিষ্ঠ বক্তব্য প্রকাশের কারণে ১৯২২ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়, রাজদ্রোহের অভিযোগে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সাহিত্য যে গণমানুষের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা তৈরি করতে পারে, নজরুলের জীবন তারই প্রমাণ — আর সেই কারণেই শাসকেরা লেখকদের দমন করে সামাজিক আন্দোলনকে দুর্বল করার চেষ্টা করে।
সলমন রুশদি (Salman Rushdie)-র The Satanic Verses (1988) প্রকাশের পর তাঁর বিরুদ্ধে ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ রুহোল্লাহ খোমেনি ১৯৮৯ সালে ফতোয়া জারি করেন; এরপর রুশদিকে দীর্ঘদিন গোপন ও নিরাপত্তাবেষ্টিত জীবনে থাকতে হয়, যা রাষ্ট্রীয়-ধর্মীয় ক্ষমতার দ্বারা সাহিত্যিক স্বাধীনতা দমনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। ফতোয়ার কয়েক দশক পর, ২০২২ সালে হাদি মাতার রুশদিকে ছুরিকাঘাত করেন; রুশদি তাঁর ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি হারান। আরও তাৎপর্যপূর্ণ, মাতার স্বীকার করেন যে তিনি বইটি পুরো পড়েননি—মাত্র কয়েক পৃষ্ঠা পড়েছিলেন। রুশদির ঘটনা দেখায়, একটি সাহিত্যকর্মের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ক্ষমতার প্রতিক্রিয়া কেবল বই নিষিদ্ধ বা লেখককে নিন্দার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না—তা একজন লেখকের জীবন ও নিরাপত্তাকেও দীর্ঘমেয়াদে বিপন্ন করে (Ruthven, 1991; Appignanesi & Maitland, 1990).
বুদ্ধিজীবী নিধন, মতাদর্শের রাজত্ব ও প্রচারযন্ত্রঃ
কখনও কখনও দমননীতি ব্যক্তি-লক্ষ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, হয়ে ওঠে সামগ্রিক নিধনযজ্ঞ। কম্বোডিয়ায় ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত পল পটের খমের রুজ শাসন শিক্ষিত মানুষদের লক্ষ্য করে ব্যাপক গণহত্যা চালায়। শিক্ষক, লেখক, এমনকি যাঁরা কেবল চশমা পরতেন তাঁদেরও ‘বুদ্ধিজীবী’ সন্দেহে হত্যা করা হয় (Kiernan, 2008)। একনায়কতান্ত্রিক শাসন যে কখনও কখনও জ্ঞানচর্চাকেই তার প্রধান শত্রু বলে বিবেচনা করে, এই ঘটনা তারই ভয়াবহ দৃষ্টান্ত। ১৯৩৩ সালে জার্মানিতে নাৎসি শাসন প্রতিষ্ঠার পরপরই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আর নাৎসি সংগঠনগুলো প্রকাশ্যে হাজার হাজার বই আগুনে পুড়িয়ে দেয়। ইহুদি, সমাজতান্ত্রিক ও উদারপন্থী লেখকদের বই নিষিদ্ধ করা হয় (Rose, 2001)। মতাদর্শগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এক নির্লজ্জতম উদাহরণ এই বই পোড়ানো।
তবে শাসকেরা সবসময় জ্ঞানকে শুধু দমনই করেনি — অনেক সময় নিজেদের প্রচারের জন্য ব্যবহারও করেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নে ‘সোশ্যালিস্ট রিয়ালিজম’ নীতির মাধ্যমে সাহিত্যকে রাষ্ট্রীয় মতাদর্শ প্রচারের হাতিয়ারে পরিণত করা হয়েছিল (Clark, 2011)। আধুনিক যুগে গণমাধ্যম, শিক্ষাব্যবস্থা আর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে জনমত নিয়ন্ত্রণের প্রবণতাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয় — জ্ঞান উৎপাদন ও প্রচারের প্রক্রিয়া কীভাবে রাজনৈতিক মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে, তা নিয়ে হারম্যান আর চমস্কির বিশ্লেষণও উল্লেখযোগ্য (Herman & Chomsky, 2002)। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পারমাণবিক বোমা তৈরির পেছনে যে বিজ্ঞানীরা কাজ করেছিলেন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তাঁদেরই অনেকে — আইনস্টাইন কিংবা ওপেনহাইমারের মতো মানুষেরা — এই আবিষ্কারের নৈতিক পরিণতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন (Rhodes, 1986)। তাঁদের আশঙ্কাকে রুজভেল্ট এবং ট্রুম্যান- কেউই গুরুত্ব দেননি। এখানে এক বৈপরীত্য স্পষ্ট — রাষ্ট্র বিজ্ঞানীদের গবেষণা ব্যবহার করে নিজের শক্তি বাড়ায়, কিন্তু সেই বিজ্ঞানীদেরই নৈতিক উদ্বেগ বা মতামতকে গুরুত্ব দেয় না। জ্ঞান তাই কেবল ক্ষমতার প্রতিপক্ষ নয়, প্রায়ই তার নীরব হাতিয়ারও বটে — আর এই দ্বৈত সম্পর্কই বুদ্ধিজীবীদের অবস্থানকে করে তোলে চিরকালীন দ্বিধাগ্রস্ত।
বুদ্ধিজীবীর সংকটঃ
এই সমস্ত ঘটনার মধ্যে একটি মিল আছে — বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা চিরকালই দ্বিমুখী, চিরকালই ঝুঁকিপূর্ণ। এডওয়ার্ড সাঈদ যখন বলেন, প্রকৃত বুদ্ধিজীবীর কাজ হলো ক্ষমতার কাছে আপস না করে সত্য বলা, তখন তিনি আসলে একটি কঠিন বাস্তবতার দিকেই ইঙ্গিত করেন। বুদ্ধিজীবীরা প্রায়ই রাষ্ট্র বা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর চাপের মুখে পড়েন — কখনও তাঁদের প্ররোচিত করা হয় ক্ষমতার প্রচারযন্ত্রের অংশ হয়ে যেতে, আবার কখনও সমালোচনামূলক অবস্থান নেওয়ার কারণে তাঁদের নিপীড়নের শিকার হতে হয় (Said, 1994)। সক্রেটিস, নজরুল ইসলাম, মান্দেলস্তাম কিংবা লোরকার মতো মানুষদের জীবন এই নৈতিক দ্বন্দ্বেরই জীবন্ত উদাহরণ — একদিকে তাঁরা সমাজে জ্ঞানের বিস্তার ঘটান, অন্যদিকে ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে নৈতিক প্রতিবাদের ভাষা তৈরি করেন। ফলে বুদ্ধিজীবীর কাজ প্রায়ই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ সত্য উচ্চারণ প্রায়ই ক্ষমতাসীনদের জন্য অস্বস্তিকর।
এই দ্বন্দ্ব কোনো নির্দিষ্ট যুগ, রাষ্ট্র বা সভ্যতার একচেটিয়া বৈশিষ্ট্য নয়। প্রাচীন এথেন্স থেকে স্তালিনীয় সোভিয়েত ইউনিয়ন, ফ্যাসিবাদী স্পেন থেকে ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষ—প্রায় প্রতিটি সমাজেই বুদ্ধিজীবীদের এক কঠিন নৈতিক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছে: নীরব থেকে নিরাপদ থাকা, ক্ষমতার সঙ্গে আপস করে স্বাচ্ছন্দ্য ও বিত্ত অর্জন করা, নাকি সত্য উচ্চারণ করে নিজেকেই বিপন্ন করা। ইতিহাসের নির্মম সাক্ষ্য হলো, যাঁরা তৃতীয় পথটি বেছে নিয়েছেন, তাঁদের অনেকেই জীবদ্দশায় নিগৃহীত, নির্বাসিত, কারারুদ্ধ কিংবা নিহত হয়েছেন। কিন্তু সময়ের বিচারে তাঁদের কণ্ঠই শেষ পর্যন্ত মানবসভ্যতার বিবেকের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে—যদিও সেই স্বীকৃতি পেতে কখনও কখনও পেরিয়ে গেছে কয়েক শতাব্দী।
ইতিহাস কার কথা বলেঃ
এখানেই এসে দাঁড়ায় এক গভীরতর প্রশ্ন — আমরা যে ইতিহাস পড়ি, তা আসলে কার লেখা? ইতিহাসবিদ ই. এইচ. কার বলেছিলেন, ইতিহাসের তথ্য নিজে থেকে কথা বলে না; ইতিহাসবিদের নির্বাচন, ব্যাখ্যা আর ক্ষমতার কাঠামোর মধ্য দিয়েই তা অর্থ পায় (Carr, 1961)। হাওয়ার্ড জিন দেখিয়েছেন, প্রচলিত ইতিহাস প্রায়শই শাসকশ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গিকে কেন্দ্র করেই লেখা হয়, যেখানে সাধারণ মানুষ আর ভিন্নমতাবলম্বীর কণ্ঠস্বর থেকে যায় প্রান্তে (Zinn, 2003)। তাই পাঠ্যপুস্তকে রোমান সাম্রাজ্যের সামরিক বিজয় নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা পাওয়া যায়, কিন্তু সেই একই যুদ্ধে আর্কিমিডিসের মতো এক বিজ্ঞানীর মৃত্যু থেকে যায় এক ক্ষুদ্র পাদটীকা হয়ে। মধ্যযুগীয় ইউরোপের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ইতিহাসে গ্যালিলেও বা ব্রুনোর মতো চিন্তাবিদদের নিপীড়ন প্রায়ই থেকে যায় মূলধারার বাইরে, যেখানে রাজা-সম্রাটের বীরত্বগাথাই পায় কেন্দ্রীয় স্থান। ‘ইতিহাস লেখে বিজয়ীরাই’ — এই পুরনো প্রবাদটি তাই নেহাত কথার কথা নয়। গ্রামশির ভাষায় বলা যায়, এই প্রবণতা আসলে সাংস্কৃতিক আধিপত্যেরই এক রূপ — শিক্ষা, সাহিত্য আর ইতিহাসচর্চার মধ্য দিয়ে একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শকে ‘স্বাভাবিক সত্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয় (Gramsci, 1971), যার ফলে যাঁরা সেই ক্ষমতাকে প্রশ্ন করেছিলেন, ইতিহাসের মূলধারায় তাঁদের অনেকেরই ঠাঁই হয় না।
তরবারি-কলম- কোনো চূড়ান্ত বিজয়ী নেইঃ
কলম ও তরবারির দ্বন্দ্বকে যদি কেবল ‘কে জয়ী?’—এই সরল প্রশ্নে বিচার করা হয়, তবে ইতিহাসের জটিল বাস্তবতাকে আমরা অতি সহজ করে ফেলি। তরবারি বা রাষ্ট্রশক্তি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর—তা যুদ্ধ শুরু করতে পারে, ভূখণ্ড দখল করতে পারে, শহর ধ্বংস করতে পারে, মানুষকে কারারুদ্ধ বা হত্যা করতে পারে এবং একটি সমাজের উপর মুহূর্তে ভয় ও আনুগত্য চাপিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে কলম—অর্থাৎ জ্ঞান, বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য ও সমালোচনামূলক চিন্তা—ধীরে কাজ করে; তার প্রভাব প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে শেষ পর্যন্ত কলমই তরবারিকে পরাজিত করে। ইতিহাস বরং দেখায়, কলম ও তরবারির সংঘাতের কোনো চূড়ান্ত বিজয়ী নেই; ক্ষমতা ও জ্ঞান উভয়ই নতুন রূপে পুনর্গঠিত হয়ে ইতিহাসে ফিরে আসে।
জানি তারও পথ দিয়ে বয়ে যাবে কাল,
কোথায় ভাসায়ে দেবে সাম্রাজ্যের দেশ-বেড়া জাল। —রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সত্যি কি ‘সাম্রাজ্যের দেশ-বেড়া জাল’ ভেসে চলে যায়? থেকে কি যায় শুধু বিশুদ্ধ জ্ঞান? আলেকজান্ডার, চেঙ্গিস খান বা নেপোলিয়নের সাম্রাজ্য ভেঙে গেছে—কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতার ধারণা বিলুপ্ত হয়নি। রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদ এসেছে; ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যের অবসানের পর জাতিরাষ্ট্র, অর্থনৈতিক আধিপত্য, সামরিক জোট, ভূরাজনৈতিক প্রভাববলয় এবং বৈশ্বিক কর্পোরেট ক্ষমতা নতুন ধরনের সাম্রাজ্যিক কাঠামো তৈরি করেছে। তাই ‘সাম্রাজ্য শেষ হয়ে যাবে’—এই ধারণা ইতিহাসের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সাম্রাজ্য হয়তো তার পুরোনো ভূগোল ও পতাকা হারায়, কিন্তু আধিপত্যের যুক্তি নতুন প্রতিষ্ঠান, নতুন প্রযুক্তি ও নতুন রাজনৈতিক ভাষায় পুনর্জন্ম লাভ করে। এই কারণেই ‘জানি তারও পথ দিয়ে বয়ে যাবে কাল, কোথায় ভাসায়ে দেবে সাম্রাজ্যের দেশ-বেড়া জাল’—এই আশাবাদী চিত্রকল্পকে সরল ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। কাল সাম্রাজ্যের নির্দিষ্ট রূপকে ভাসিয়ে দিতে পারে, কিন্তু সাম্রাজ্যিক প্রবণতা, আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষা এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণকে নিশ্চিহ্ন করে না। ইতিহাসে ক্ষমতা কখনও অদৃশ্য হয় না; ক্ষমতা তার পোশাক বদলায়। তরবারি কখনও বন্দুক হয়, বন্দুক ক্ষেপণাস্ত্র হয়, আর আধুনিক যুগে সামরিক শক্তির সঙ্গে যুক্ত হয় অর্থনীতি, প্রযুক্তি, তথ্য, নজরদারি, অ্যালগরিদম ও মতাদর্শ।
একইভাবে কলমও অপরিবর্তিত থাকে না। সক্রেটিস, গ্যালিলেও, ব্রুনো বা নজরুলের কলম যে ধরনের ক্ষমতার মুখোমুখি হয়েছিল, আজকের লেখক, সাংবাদিক বা বিজ্ঞানীর সামনে ক্ষমতার রূপ ভিন্ন। এখন সেন্সরশিপের পাশাপাশি তথ্য-নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল নজরদারি, প্রোপাগান্ডা, তথ্যবিভ্রান্তি এবং জ্ঞান উৎপাদনের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ কাজ করে। ফলে কলম ও তরবারির দ্বন্দ্ব শেষ হয়নি; বরং তা আরও সূক্ষ্ম হয়েছে।
ফুকোর power/knowledge ধারণা এই বাস্তবতাকে বোঝার একটি শক্তিশালী তাত্ত্বিক ভিত্তি দেয়। জ্ঞান ক্ষমতার বাইরে কোনো নিরপেক্ষ দ্বীপ নয়; জ্ঞান উৎপাদন, প্রচার ও বৈধতার সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক গভীরভাবে যুক্ত (Foucault, 1980)। গ্রামশির সাংস্কৃতিক আধিপত্যের ধারণাও দেখায় যে শাসন শুধু বলপ্রয়োগের মাধ্যমে টিকে থাকে না; মানুষের চিন্তা, সম্মতি ও সাংস্কৃতিক বোধের মধ্য দিয়েও আধিপত্য পুনরুৎপাদিত হয় (Gramsci, 1971)। অর্থাৎ তরবারি যখন কলমকে হত্যা করে, তখনও কলমের ধারণাকে পুরোপুরি হত্যা করতে পারে না; আবার কলম যখন ক্ষমতার সমালোচনা করে, তখনও ক্ষমতার প্রতিষ্ঠানকে একবারে বিলুপ্ত করতে পারে না।
এই দ্বন্দ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল পারস্পরিক নির্ভরতা। বিজ্ঞানীর জ্ঞান ব্যবহার করে রাষ্ট্র অস্ত্র তৈরি করে, কিন্তু সেই বিজ্ঞানীই অস্ত্রের নৈতিক পরিণতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। রাষ্ট্র লেখকের ভাষা ব্যবহার করে প্রচার চালায়, আবার সেই লেখকই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা সৃষ্টি করেন। ফলে কলম শুধু ক্ষমতার বিরোধী নয়; কলম ক্ষমতার অনুগামীও। অতএব, ‘কলম দীর্ঘমেয়াদে জয়ী এবং তরবারি স্বল্পমেয়াদে জয়ী’—এই সিদ্ধান্তও যথেষ্ট নয়। কারণ ইতিহাসে কখনও তরবারি কলমকে হত্যা করেছে, আবার কখনও কলম তরবারির বৈধতাকে প্রশ্ন করেছে; কিন্তু কোনো পক্ষই অপর পক্ষকে সম্পূর্ণ নির্মূল করতে পারেনি। ক্ষমতা ফিরে আসে, প্রতিরোধও ফিরে আসে। আধিপত্য নতুন রূপ পায়, সমালোচনাও নতুন ভাষা খুঁজে নেয়।
এই কারণেই ‘কলম বনাম তরবারি’কে একটি শেষ হয়ে যাওয়া যুদ্ধ নয়, বরং একটি চলমান ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিসঙ্গত। প্রতিটি যুগে নতুন সাম্রাজ্য জন্ম নেবে, নতুন ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরি হবে, এবং তার পাশাপাশি নতুন বিজ্ঞানী, দার্শনিক, কবি ও লেখক সেই ক্ষমতাকে প্রশ্ন করবেন। কোনো চূড়ান্ত বিজয় ঘোষণা করার সুযোগ নেই। শেষ পর্যন্ত সত্যটি হয়তো আরও কঠিন: তরবারি কখনও সম্পূর্ণ জয়ী নয়, কলমও নয়। ক্ষমতা টিকে থাকে তার রূপান্তরের মাধ্যমে, আর চিন্তা টিকে থাকে তার পুনর্জন্মের মাধ্যমে। তাই মানবসভ্যতার ইতিহাস কোনো বিজয়ীর ইতিহাস নয়; এটি আধিপত্য ও প্রতিরোধ, ক্ষমতা ও জ্ঞান, তরবারি ও কলমের অবিরাম সহাবস্থান ও সংঘাতের ইতিহাস। এই লড়াইয়ের শেষ নেই—কারণ সাম্রাজ্য নতুন রূপে ফিরে আসে, এবং তার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার কলমও প্রতিটি প্রজন্মে নতুন করে জন্ম নেয়।
তথ্যসূত্রঃ
Applebaum, A. (2003). Gulag: A history. Anchor Books.
Bulwer-Lytton, E. (1839). Richelieu; or the conspiracy. Saunders and Otley.
Carr, E. H. (1961). What is history? Macmillan.
Clark, K. (2011). Moscow, the fourth Rome: Stalinism, cosmopolitanism, and the evolution of Soviet culture, 1931–1941. Harvard University Press.
Finocchiaro, M. A. (1989). The Galileo affair: A documentary history. University of California Press.
Foucault, M. (1980). Power/knowledge: Selected interviews and other writings 1972–1977 (C. Gordon, Ed.). Pantheon Books.
Gibson, I. (1989). Federico García Lorca: A life. Faber and Faber.
Gramsci, A. (1971). Selections from the prison notebooks. International Publishers.
Harari, Y. N. (2015). Sapiens: A brief history of humankind. Harper.
Herman, E. S., & Chomsky, N. (2002). Manufacturing consent: The political economy of the mass media. Pantheon Books.
Jasanoff, S. (2004). States of knowledge: The co-production of science and social order. Routledge.
Kiernan, B. (2008). The Pol Pot regime: Race, power, and genocide in Cambodia under the Khmer Rouge, 1975–79. Yale University Press.
Mandelstam, N. (1970). Hope against hope: A memoir. Atheneum.
McClellan, J. E., & Dorn, H. (2015). Science and technology in world history (3rd ed.). Johns Hopkins University Press.
Plato. (2002). The trial and death of Socrates (G. M. A. Grube, Trans.). Hackett Publishing. (Original work published c. 399 BCE)
Plutarch. (2001). Lives of the noble Greeks and Romans (J. Dryden, Trans.). Modern Library. (Original work published c. 100 CE)
Rhodes, R. (1986). The making of the atomic bomb. Simon & Schuster.
Rose, J. (2001). The Holocaust and the book: Destruction and preservation. University of Massachusetts Press.
Rowland, I. D. (2008). Giordano Bruno: Philosopher/heretic. Farrar, Straus and Giroux.
Russell, B. (1945). A history of western philosophy. Simon & Schuster.
Said, E. W. (1994). Representations of the intellectual. Vintage Books.
Sen, A. (2005). The argumentative Indian: Writings on Indian history, culture and identity. Farrar, Straus and Giroux.
Watts, E. J. (2017). Hypatia: The life and legend of an ancient philosopher. Oxford University Press.
Zinn, H. (2003). A people's history of the United States. HarperCollins.