




“খাবারদাবার সব টেবিলে ক্যাসারোল করে গুছিয়ে রেখেছিস?”
রবি নীরবে সায় দিল। ছেলেটাকে এইজন্যই এত পছন্দ করি আমি। যেটুকু না হলে নয়, তার বেশি কথা বলে না মোটে। কাজকর্মও করে মন দিয়ে।
“বরফ?”
“জমানো আছে।”
“খাবার জলের বোতলগুলো সব ভরে রেখে যাবি। আগের বারের মতো মাঝপথে ফুরিয়ে না যায়!”
রবি ঘাড় নেড়ে রান্নাঘরে চলে যায় জল ভরতে। আমি বিশাল ছড়ানো ড্রয়িং স্পেসের চারদিকে দ্রুত চোখ চালাই। আর কিছু কাজ বাকি থাকলে যাওয়ার আগেই রবিকে করতে বলতে হবে।
এল শেপের ঘর সুন্দর পরিপাটি সাজানো। সাদা সোফা, পিঠে বাদামি রঙের লেসের ঢাকা। পান্না-সবুজ কভারে মোড়া কুশন। সোফার বনেদি গড়নের হাতলের কাঠের পালিশ, মাঝে আটকোনা সেন্টার টেবিলের কাচ সব একদম তকতক করছে, আজ সকালেই রবি ফার্নিচার স্প্রে দিয়ে মুছেছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জেল্লা দিচ্ছে ঘরের দামি মার্বেলের মেঝে। সাটিনের ফুলছাপ পর্দাগুলো নিখুঁতভাবে টেনে দড়ি দিয়ে বাঁধা, পেতলের পাত্রে বসানো পাতাবাহারে উজ্জ্বল সবুজ-সাদা ছিট। ঝিনুকের বর্ডার দেওয়া আয়নায় নিজেকেও দেখে নিই এক ঝলক – চওড়া কপাল, কাঁচাপাকা চুল পরিপাটি আঁচড়ানো, তামাটে চামড়ায় কিছু বলিরেখা। লম্বা দোহারা চেহারা পুরোটা এই আয়নায় দেখা যাচ্ছে না। মাথা কাত করি, নাহ… নতুন চশমার স্টিলের ফ্রেমটা গ্রে কালারের সাফারি স্যুটের সঙ্গে ভালোই লাগছে। উপরে চোখ তুলি, সিলিং-এ ছাই রংটা প্রসাদের সঙ্গে প্রায় ঝগড়া করে করানো। ও সমানে বলছিল সাদা করুন, ঘর উজ্জ্বল লাগবে। পাত্তা দিইনি।
আমার আর উজ্জ্বল ঘর ভালো লাগে না।
নইলে, এরকম ন্যাড়া ছাদ ছিল নাকি আমাদের! বিশাল পদ্ম-কাটা ঝাড়বাতিটা ঘরের মধ্যমণি হয়ে থাকত। খুব শখ করে হ্যারল্ড থেকে নিয়েছিল দেবযানী। বাংলোটা কেনার পর টুকটুক করে কত কিছুই যে এমন কিনেছিল, সাজিয়েছিল একটু একটু করে! জেডপাথরের সিংহ, ডোকরার পুতুল, পলকাটা কাচের মোমবাতিদান, চন্দনকাঠের নর্তকী। আছে সব, ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বাড়ি জুড়ে। দেবযানীর চিহ্ন। ওগুলো নিয়েই তো আছি!
শেষ কয়েক মাস ক্ষীণ হয়ে আসা দৃষ্টিতে আলো সহ্য হত না দেবযানীর। মিটমিটে মোম জ্বালিয়ে রাখতাম। বিছানায় মিশে গেছিল শরীরটা। আমি ওর পাশেই বসে থাকতাম বেশির ভাগ। নার্স খাবার এনে খাওয়াতে চেষ্টা করত। বিশেষ পারত না। দেবযানী আমার দিকে ফিরেও দেখত না। একভাবে ঠায় দরজার দিকে চেয়ে থাকত। আমি জানতাম, কেন। রাগ হত না, হতাশ লাগত না। বোবাধরা একটা ব্যথা হত খালি বুকে। নিজেই নিজের বুক ডলতাম। অসুস্থ হলে তো চলবে না আমার!
নার্স এক সময়ে হাল ছেড়ে দেওয়ার পর্যায়ে চলে যেত। আমি তখন মুখ ফুটে বলতাম, “ঠিক আছে, থাক। আর জোর করতে হবে না। তুমি গিয়ে খেয়ে নাও, আমি আছি।”
নার্স চলে গেলে আমি চেয়ারটা টেনে আনতাম খাটের কাছে। আস্তে আস্তে দেবযানীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতাম। এত ক্রিম, এত যত্নের পরও চামড়া কর্কশ ঠেকত। চুল উঠে যাচ্ছে খুব, সামনেটা ফাঁকা লাগত হাতে। অচেনা লাগত।
দেবযানী একইভাবে দরজার দিকে চেয়ে থাকত। অপেক্ষা করত। মরার আগের মুহূর্ত অবধি অপেক্ষাই করে গেছে সে।
আমি হাত বোলাতে বোলাতে দেখতাম, আলো-আঁধারির নকশা পড়ছে দেওয়ালে, আমার হাত দেবযানীর কপাল বেয়ে যাচ্ছে যেন গুঁড়িমারা নেকড়ে একটা…
“স্যার, হয়ে গেছে।”
রবি সামনে এসে দাঁড়াতে আমার চিন্তার খেই ভাঙল। ওকে যেতে বলে সোফায় বসলাম আলগোছে। অতিথিদের আসতে আর দেরি নেই।
***
“ওহ… কত বছর বাদে দেখা হল, রূপক!”
“এসো এসো! ডলি, তুমি তো একই রকম সুন্দর আছ!”
“এই তো আপনি আসামাত্র ফ্ল্যাটার করতে শুরু করে দিলেন…”
দ্বিতীয় গাড়িটাও এই সময়ে এসে থামে। দু পক্ষের আলাপ করিয়ে দিই। কেরিয়ারের মাঝামাঝি সময়ে কুয়ালালামপুরে ছিলাম বছর তিনেক। তখন বিনোদ আহুজা-রা ছিল আমাদের পড়শি। ডলির সঙ্গে দেবযানীর বেশ ভাব হয়ে গেছিল, খুব আসা যাওয়া চলত। কুয়ালালামপুর ছাড়ার পর অবশ্য আর খুব বেশি দেখাসাক্ষাৎ হয়নি, তবে নিয়মিত যোগাযোগ আছে। ওরা বহুকাল পর মুম্বইতে এসেছে পারিবারিক একটা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। পরশু ফোন করেছিল, তখনই ওদের চলে আসতে বললাম আজ সন্ধ্যায়। আর রাজীবকে তো অনেকদিন ধরেই ডাকার প্ল্যান ছিল, একসঙ্গেই বলে দিলাম। আমাদের ‘সামর্থ্য হসপিটাল’এর মুম্বই ব্রাঞ্চের সবচেয়ে প্রমিসিং জুনিয়র ম্যানেজার, তরতর করে উঠছে ছোকরা। আমি বেঁচে থাকতেই সম্ভবত ওকে বোর্ডের মেম্বার হয়ে যেতে দেখে যেতে পারব।
আসলে আজকের দিনটা একা থাকতে পারি না।
আজ অপুর জন্মদিন। অপর্ণা। আমাদের একমাত্র মেয়ে।
বেঁচে থাকলে পঁচিশ হত এ বছর।
জোর করে ভাবনাটা মাথা থেকে তাড়াই।
গ্লাস আর বোতল নিয়ে জমিয়ে বসার খানিক পরেই বুঝলাম, আজকের অতিথি খুব ভালো বাছাই হয়েছে। বিনোদের সঙ্গে রাজীবের একেবারে যাকে বলে খাপে খাপে ফ্রিকোয়েন্সি মিলে যাচ্ছে। অবশ্য সেজন্যই ওকে ডাকা। রাজীবের যা যা ফিডব্যাক পেয়েছি, তাতে আমি নিশ্চিত যে ও ছেলে একা হাতে হাসপাতালের প্রফিট মার্জিন ডাবল করে দেবে। সেসবে অবশ্য আমার আর কিছু যায় আসে না…সাত বছর আগেই স্বেচ্ছা অবসর নিয়ে নিয়েছি। তবে যোগাযোগ তো আছেই, খবরও পাই।
গল্প জমে উঠেছে। ডলি হেসে লুটিয়ে পড়ছে এক একবার। রাজীবকে বেশ হ্যান্ডসাম দেখতে, বলেছি কি? বিনোদ গ্লাস পেলে আর কিছু চেয়ে দেখে না, এ ওর বরাবরের স্বভাব। মুচকি হেসে ইন্সুলিন ইঞ্জেকশন নেওয়ার কথা বলে উঠে যাই। যা বুঝছি, আমি উপস্থিত না থাকলেও অতিথিরা নিজেদের মধ্যে গল্প চালিয়ে যেতে পারবে।
***
“আপনি আগে এসেছেন এ বাংলোয়?” ডলি প্রশ্ন করেন রাজীবকে।
“না ম্যাডাম!”
“আমরাও অনেক বছর বাদে এলাম। খুব একটা পালটায়নি, দেবযানী যেমন সাজিয়ে রাখত তেমনই আছে।”
বিনোদ নাক দিয়ে একটা শব্দ করেন।
“কী বা পালটাবে, কেই বা পালটাবে! আপনি তাহলে রূপকের খুব ক্লোজ?”
রাজীব দুহাত নাড়িয়ে প্রতিবাদ করে, “না, না! সেরকম কিছু না! আমার মতো জুনিয়রকে স্যার বাড়িতে ডেকেছেন, এটাই তো চমক ছিল আমার কাছে! এত সিনিয়র একজন ডাক্তার, অমন বিশ্বজোড়া নামডাক…!”
“সব ছেড়ে দিল। অত নাম, অমন পসার… সব ছেড়ে এই গর্তে ঢুকে বসে আছে সেই কবে থেকে…”
“আহ বিনোদ! দেবযানীর দেখাশোনা করাও তো দরকার ছিল…”
“স্যাড! কী থেকে কী যে হয়ে গেল…”
আহুজা দম্পতির কথার পিঠে কথার মধ্যে রাজীব মুখ খোলে, “সত্যি বলতে, আমি পুরোটা জানিও না স্যার কেন সব ছেড়ে রিটায়ার করে গেলেন… হসপিটালের ক্লায়েন্ট-বেসও খানিকটা ধাক্কা খেয়েছিল ওঁর এই সিদ্ধান্তে!”
উত্তরটা ডলিই দেন, “সে এক বিরাট দুঃখের কথা রাজীব! ওদের একমাত্র মেয়ে অপর্ণা খুব বাজেভাবে মারা যায়। একদম আচমকা।”
“এটা শুনেছিলাম। অ্যাক্সিডেন্ট।”
ডলির গলা তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে, “অ্যাক্সিডেন্ট মাই ফুট! খুন করা হয়েছিল মেয়েটাকে। তার ওয়ার্কপ্লেসেই।”
“কী বলছেন!” রাজীব আঁতকে ওঠে।
“কিন্তু প্রমাণ করা যায়নি। মেয়েটা আসলে একটু জেদি ছিল। দেবযানীর যেমন একটা আইডিয়ালিস্টিক ইন্টেলেকচুয়াল ব্যাপার ছিল না – অপর্ণাও একদম তেমন ছিল। এক তো বাবার কথা না শুনেই মেডিক্যাল ছেড়ে ইকোনমিক্স নিয়ে পড়ল, তারপর কারো পরামর্শ কানে না তুলে গেল সরকারি অফিসে চাকরি করতে। কী, না, দেশের সেবা করবে!”
“ফুল!” বিনোদ চাপা গলায় বলেন।
“তারপর?”
“তারপর, এক ক্ষমতাশালী ব্যবসায়ীর কিছু কুকর্ম ধরে ফেলে। সেটা মিটিয়ে ফেলতে বলা হয়েছিল, পলিটিক্যাল পাওয়ারও ইনভলভ ছিল ব্যাপারটায়… বোঝোই তো এগুলো কেমন হয়…”
“অফ কোর্স, অফ কোর্স। সেটিং করে নিতে হয় এক্ষেত্রে।”
“রাইট! তুমি স্মার্ট আছো। এ মেয়ে ঘাড়ট্যারা ছিল। সেটিং-এর প্রস্তাবে রাজি হয়নি। এত জিদ্দি… এত জিদ্দি…”
“লিফটের খোপে সাততলা থেকে আছড়ে পড়েছিল। মাথা পুরো থেঁতো হয়ে গেছিল। মেকানিক্যাল ফল্ট, লিফট ফ্লোরে আসার আগেই দরজা খুলে গেছিল সামহাউ, আর অপর্ণা তাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেছিল… এমনই বলা হয়েছিল শেষমেশ।”
“বাড়িতে ফোন করে বলছিস, থ্রেট আসছে। প্রাণের ঝুঁকি আছে। তারপরও একা একা সন্ধ্যা আটটা অবধি অফিসে বসে কাজ করতে গেছিলি কেন? নিজের ভালো নিজে না বুঝলে দুনিয়া ঘাড় ধরে বুঝিয়ে দেয় হে!”
“ইশ! স্যাড!” রাজীব চুকচুক আওয়াজ করে মুখে।
“শোনো ভাই। ব্যবসা ছেলেখেলা না। সব কিছু অমন সাদাভাবে করা যায় না, করতে গেলে ঠকতে হয়। কে না করে এদিক-ওদিক? আর কিরণ এন্টারপ্রাইজ কত প্রফিট করত, তার থেকে কে কে কত কাটমানি খেত সব জানি… হিউজ, রাজীব! সেখানে হুট করে একটা সেদিনের মেয়ে বাঁশ দিতে এলে লোকে ছেড়ে দেবে? যত নামী বাপই হোক না কেন, টাকার সামনে নাম টেকে না ভাই!”
“সে তো ঠিকই স্যার। তবে একদম মেরে না ফেলে আর কিছু শাস্তিও দিতে পারত। কিছু উলটো কেস খাইয়ে জেলে পাঠিয়ে দেওয়া… বা জোয়ান মেয়ে… অন্য কিছু, যাতে সমাজে আর মুখ দেখাতে না পারে…”
বিনোদ জোর গলায় হেসে ফেলেন শুনে, “তোমার মত ম্যানেজার দরকার ছিল কিরণ এন্টারপ্রাইজের! সুইচ করতে চাইলে জানিও আমায়।”
ডলি হঠাৎ বলেন, “আস্তে। রূপক শুনতে পেয়ে যাবে।”
“আরে না না। নেই তো নিচে। তাছাড়া, এগুলো কি আর ও নিজেও বোঝে না!”
“তবু। থাক না। শুনলে মন খারাপ করবে… আমাদের আড্ডাটাই মাটি হবে!”
“তা বটে। আচ্ছা ইয়ং ম্যান, বলো তোমার হবি কী? ওয়াটার স্পোর্টস ভালোবাসো?”
সুইচ অফ করে হেডফোনটা মাথা থেকে খুলি। যথেষ্ট শোনা হয়ে গেছে।
রাজীবের হবি কী জানি না, তবে এটা আমার আজকালকার হবি। বাড়িতে যদি কাউকে ডাকি, তো তাদের কিছুটা সময় নিরিবিলিতে কথা বলার সুযোগ দিয়ে সরে আসি। মাইকগুলো খুব সুন্দর করে লুকিয়ে ফিট করা আছে – সোফার গায়ে, ডাইনিং-এর আশপাশে।
আর কী আশ্চর্য, যাদেরই ডাকি না কেন… তারা একসময়ে না একসময়ে অপুর প্রসঙ্গ তুলবেই। এমনিতে আমার কাছে এখন আর কেউই এ নিয়ে কথা বলে না।
কিন্তু আমি ঠিকই শুনে ফেলি। নেশার মতো শুনি। না শুনলে আমার চলবে না।
হাসিমুখেই আবার নিচে নেমে আসি। কাবাব, ফ্রুট স্যালাড, চিজ সহযোগে দ্বিতীয় প্রস্থ মদ ও আড্ডা চালু হয় আমাদের।
***
রান্নাটা রবি তুখোড় করে প্রতিবারই। আঙ্গুল চেটে খাওয়ার মত।
রাত হয়েছে বেশ। তবু, খেয়ে উঠে আরেকবার আমার স্বাস্থ্য পান না করে কি অতিথিরা চলে যাবে? সেটা মোটেই ভালো কাজ নয়!
হাসতে হাসতেই বিশেষভাবে ঠাণ্ডা করে রাখা ওয়াইনের বোতল বার করি। কেউই আপত্তি করে না। গ্লাসে গ্লাসে লাল তরল ঝিকিয়ে ওঠে।
খুনখারাপি লাল।
রাজীবের বলা একটা জোকে সবাই হেসে ওঠে। হাসতে হাসতেই ডলি থেমে যায়, “আপনি নিচ্ছেন না যে?”
“আরে, অভ্যাসবশে খাবার পরের ওষুধ খেয়ে নিয়েছি ভুল করে। ওটার সঙ্গে আর অ্যালকোহল নেব না ডলি, নইলে কাল সকালে মাথা তুলতে পারব না!”
“হ্যাঁ, নিজের খেয়াল রাখা দরকার রূপক! একা থাকো!”
ডলি বিনোদকে কনুইয়ের গুঁতো মারে, দেখতে পাই। হাসি পায়।
কে একা থাকে?
আমি তো না।
দেবযানী আমায় ছেড়ে চলে গেল। অভিমানে চলে গেল। ও কিছুতেই বুঝল না, যত নামী সার্জনই হোক, অমন চুরমার হয়ে যাওয়া মাথা কেউ আর রিপেয়ার করতে পারে না! পারে না ক্লিনিক্যাল ডেথ হয়ে যাওয়া মানুষকে বাঁচাতে।
কিন্তু অপু আমায় ছেড়ে যায়নি। আমি টের পাই ওর রেশম চুল, নরম গাল। হাওয়ার মধ্যে হাওয়ার মতো সেসব ছুঁয়ে যায় আমায় এক এক সময়ে। ওর প্রিয় ডিওর গন্ধ পাই বাতাসে।
আর এরকম সময়ে, অপুর মিহি গলার হাসিও শুনতে পাই।
দ্বিতীয় বোতলটা খুলি।
“আর এক রাউন্ড। ফর দ্য রোড! প্লিজ!”
ডলি আগের বারের মতোই অন্যদিকে চেয়ে থাকে, তারপর অভিযোগ করে আমি বেশি ঢেলে দিয়েছি। রাজীব জিভ চেটে বলে, “স্যার একটা কুকুর পুষলে পারেন। একা লাগবে না।”
ওর গ্লাস ভরে দিয়ে হেসে উঠি, “কুকুর? রক্ষে করো! এই বয়সে আর লাফঝাঁপ পোষাবে না আমার!”
বিনোদ প্রতিবাদ করে, “আরে সব কুকুর থোড়াই লাফঝাঁপ করে! শান্ত দেখে একটা নিয়ে এসো, তোমার সঙ্গী হয়ে যাবে। বাকি কাজ তোমার ম্যান ফ্রাইডেই করে দেবে, নইলে আরেকটা লোক রেখে নেবে। টাকার তো অভাব নেই তোমার!”
“তা নেই। বলছ যখন, ভেবে দেখব নাহয়! তোমাদের কুয়ালালামপুরে ছিল না একটা? কী যেন ব্রিড?”
বিনোদ শুনতে পায় বলে মনে হয় না। ডলি উত্তর দেয়, “শিৎজু। আপনি ল্যাব্রাডর নিন, এত জায়গা আছে।”
আমি ডলির দিক থেকে চোখ না সরিয়েই বিনোদের মুহূর্তের মধ্যে খালি হওয়া গ্লাস আবার ভরে দিই। রাজীবকে নিয়ে চিন্তা নেই, ওর পাশেই বসিয়ে দিয়েছি অন্য বোতলটা। ও যে আবার ঢেলে নিচ্ছে সেটা না তাকিয়েও জানি আমি।
ডলির মুখ লালচে হয়ে উঠেছে। শিফনের শাড়ির আঁচল আধখানা খসে এসেছে। বিনোদের সেদিকে হুঁশ নেই অবশ্য। এক চুমুকে শেষ করে আবার গ্লাস তুলে ধরলেন আমার দিকে।
ঢালি। পুরোটা খেতে পারবে না জেনেও ভর্তি করে দিই। তারপর ধীরপায়ে ঘর পেরিয়ে ডলির কাছে গিয়ে দাঁড়াই। পরিপূর্ণ চোখ তুলে আমার দিকে তাকায় সে। খুবই অলস হাতে আঁচলটা কাঁধ থেকে খসিয়ে দেয়। আঁটো ব্লাউজের সামনেটা গভীর কাটা হওয়ায় কিছুই প্রায় কল্পনার অবকাশ রাখে না। টেনে টেনে হাসে। জড়ানো গলায় ‘নটি!’ বলে এক হাত বাড়িয়ে আমার হাত ধরার চেষ্টা করে।
সরে যাই পাশে। হাতটা হাওয়া কেটে গিয়ে থপ করে নিজের উরুর উপর পড়ে।
অন্য দুজনের দিকে তাকাই। যা ভেবেছিলাম। বিনোদের মাথা সামনে ঢলে পড়েছে। হাতের গ্লাস কাত হয়ে রুবি-লাল পানীয় কোলের উপর দিয়ে বয়ে গেছে।
রাজীব এখনো চেয়ে আছে। আমার দিকে না। ডলির ব্লাউজ ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাওয়া বুকের দিকে। মুখটা অবিকল বাস ডিপোর সামনে ল্যাংড়া ভিখিরিটার মতো দেখাচ্ছে – হাভাতে, লোলুপ।
গলা দিয়ে আওয়াজটাও বের হল ওই ভিখিরির মতোই।
“ম্যাহডাম…”
আমি কিছু বলার আগেই সে উঠে এগিয়ে আসে এদিকে। মনে মনে প্রমাদ গনি, কিন্তু এখন আটকানোও মুশকিল… আড়চোখে দেখি, ডলির মাথা ইতিমধ্যে হেলে গেছে পিছনে। মুখের বোকাটে হাসিটা আরো চওড়া হয়েছে, দু হাত এলিয়ে পড়েছে। রাজীব সামনে এসে দাঁড়িয়েই কেমন হোঁচট খায়, তারপর লুটিয়ে পড়ে একদম ডলির কোলের মধ্যে। আপদ! যাক, মহিলার চোখ বন্ধ হয়ে গেছে। কিছু টের পাওয়ার অবস্থায় নেই আর।
ঝড়ের গতিতে পরের কাজগুলো সেরে নিই। তারপর ছোকরাকে টেনে তুলে ওপাশের সোফায় নিয়ে গিয়ে বসাই। ডলির আঁচলটা তুলে গায়ের উপর ফেলে দিই।
সব গুছিয়ে রেখে যখন ঘরে ফিরে এলাম, ওদের ঘুম ভেঙে আসছে। বিনোদকে একটা আলতো চাপড় মেরে বলি, “আরে, কুয়ালালামপুরের দিনগুলোর কথা ভাবতে ভাবতে তুমি কি ঘুমিয়েই পড়লে নাকি?”
বিনোদ ধড়মড় করে উঠে প্রতিবাদ করে। ডলিকে ডাকে, বাড়ি যাবার কথা বলে। রাজীব কখন জেগে উঠল টের পাইনি, তবে এখন দেখি গুম হয়ে আড়চোখে ডলির দিকে চাইছে বার বার। আরো খানিকক্ষণ খেজুরে আলাপের পর ওরা যে যার গাড়ি ডাকে, বিদায় নেয়।
***
উপরের ঘরে এসে বিছানায় গা এলিয়ে দিই। বড্ড ক্লান্ত লাগছে এবার।
প্রতিবারই এমন হয়। একে তো অমন তীব্র মনোযোগের কাজ, তায় সময়ে শেষ করার টেনশন।
অপর্ণা এবছরও জন্মদিনের উপহার পেল তাহলে। ও খুশি হবে।
হবে না, হয়েছে। ওই যে, শুনতে পাচ্ছি ও হাসছে। শুনুন হাসিটা! মিষ্টি রিনরিনে গলা, যেন ঝর্ণা বয়ে যাচ্ছে পাথরের উপর দিয়ে।
ওইটুকু শোনার জন্য আমি জ্বলন্ত কয়লার উপর দিয়ে খালি পায়ে হেঁটে যেতে পারি। ওইটুকু শোনার জন্যই না বছরের পর বছর ঘাড় গুঁজে বাংলোর তিনতলায় আমার ল্যাবে পড়ে ছিলাম! ভুলে যাবেন না, অবসর নেওয়ার আগে অবধি সারা পৃথিবীর সেরা ব্রেন সার্জনদের মধ্যে একজন ছিলাম আমি। ব্রেনের ঠিক কোথায় সমস্যা তা নিখুঁত বুঝে নিয়ে আমার মতো মসৃণভাবে অপারেশন করতে পারত খুব কম মানুষ। চার্জও করতাম তেমনই। ধনকুবেরদের কাছে আমি, মানে ডক্টর রূপক চক্রবর্তী ছিলাম এক নম্বর পছন্দ।
তবে হ্যাঁ, তখন অপারেশন থিয়েটারে, বেডে শুইয়ে, অ্যানেস্থেশিয়া দিয়ে-টিয়ে কাজগুলো করতাম। এই আট বছরে ক্রমাগত রিসার্চ করে করে এই মিনিয়েচার হ্যান্ডহেল্ড ডিভাইসটা বানিয়ে নিতে পেরেছি। এটা দিয়েই আমি লোকাল অ্যানেস্থেশিয়া করে, সূক্ষ্ম শলাকা দিয়ে মাথা ভেদ করে ব্রেনের বিশেষ অংশে যা দরকার সব করতে পারি এখন। একটা জেলও বানিয়ে নিয়েছি যা আনুবীক্ষণিক ফুটোটা সঙ্গে সঙ্গে জুড়েও দেয়। সবটাই এত অল্প সময়ে – ভাবা যায় না!
বাকিটা ওই ওয়াইনে মেশানো ঘুমের ওষুধের কামাল। সেও আরেক আবিষ্কার আমার, মিনিট কুড়ির চটকা একটা, কেটে যাবার পর কেউ টেরও পায় না যে ঘুমিয়ে ছিল।
অবশ্য মাতালদের এমনিতেও হুঁশ বুদ্ধি কমে যায়।
অমন ভুরু কুঁচকে দেখছেন কেন? এমন কি খারাপ করেছি ভাই? মানুষগুলো আস্ত সুস্থ শরীরে হেঁটে চলে বেরিয়ে গেল দেখলেন তো। মুখে হাসি ফুটিয়ে বিদায় নিল, আবার আসবেও বলল।
তাও আপনার মনে হচ্ছে আমি খুব অন্যায় কিছু করেছি?
হয়তো করেছি। না জানিয়ে, লুকিয়ে ওদের ব্রেনের ভিতর থেকে একটা ছোট্ট, এই এতটুকু একটা অংশ বার করে নিয়েছি। সেই টুকরোটা যেখানে বেপরোয়া আনন্দ থাকে। ফুর্তিতে ভেসে যাওয়ার লাগামবিহীন ইচ্ছা থাকে। ওটা না থাকায় কিছুই আসবে যাবে না ওদের, শুধু…
শুধু আর কখনোই প্রাণ খুলে নির্ভার হাসি হাসতে পারবে না। নিজেদের আর সব আইনের, সব ঔচিত্যবোধের উপরে ভাবতে পারবে না। সৎ মানুষদের বোকা বলতে গিয়ে গলায় কিছু আটকাবে, নিজেদের ভাবনাচিন্তা নিয়ে নিজেদেরই অপরাধবোধ হবে।
এটুকুই তো করেছি? ওরা টের অবধি পায়নি কিছু। পাবে না। কোনো মেডিক্যাল চেক আপেও ধরা পড়বে না। তাও, আপনি বলছেন যখন, তখন অন্যায় করেছি নাহয়।
আচ্ছা বলুন তো কোনটা বেশি অন্যায়? এটা?
নাকি যুদ্ধ, অপরাধ, ধর্ষণ, নিরপরাধ সৎ মানুষ, অসহায় শিশুদের খুন করা পৃথিবীতে বাস করেও সেসব সম্পূর্ণ এড়িয়ে, টাকা রোজগারের দোহাই দিয়ে সেগুলোকেই সমর্থন করে দামি গাড়ি, দামি পোশাক আর দামি মদের উচ্ছ্বাসে নির্বিকার ডুবে থেকে জীবন কাটানো?
কোনটা?