




এই বছরের মধ্য জুনে উনিশ দিনের ট্রিপের প্রায় শেষ লগ্নে এসে পৌঁছেছি। হিমাচলে আর মাত্র পাঁচ দিন। এযাবৎ আমাদের ভ্রমণ-গাড়ি চলছিল গড়গড়িয়েই। সুন্দর তাল ও ছন্দে। ছোটোখাটো পরিবার আমাদের। দু সেট স্বামী-স্ত্রী। দু-দু’বার হিমাচল ট্রিপ ক্যান্সেল হবার পর এবার ওপরওয়ালার আশীর্বাদে ছুঁতে পেরেছি হিমাচলের মাটি। হাওড়া থেকে কালকা। সেখান থেকে টয় ট্রেনে শিমলা। জীবনে প্রথম বার টয় ট্রেনে চড়ার রোমাঞ্চে মশগুল ছিলাম। শিমলায় দু’দিন কাটিয়ে শুরু হল আমাদের প্রকৃত হিমাচল ভ্রমণ। বেশ চলছিল। আগে থেকে হোটেল বুক না করেও কোথাও কোনো অসুবিধায় পড়িনি। নিজেদের পছন্দ ও বাজেট অনুযায়ী হোটেল পেয়ে গিয়েছি অল্প আয়াসে। আমাদের আইটিনারি অনুযায়ী শেষ তিন দিনের জন্য ছিল মানালি। এখানে একটু আয়েশ-আরাম করে কাটাবার উদ্দেশ্যে তিন দিনের জন্য একটি সুন্দর, আরামদায়ক হোটেল আগে থেকেই আমরা বুক করে রেখেছিলাম। কিন্তু আগের দিন শিশু গ্রামে থাকতে না পারায় আমাদের পরবর্তী বাকি দিনগুলি আমরা মানালির হোটেলেই আশ্রয় নেব বলে ঠিক করলাম। আর ঠিক হল সেখান থেকেই বাকি দ্রষ্টব্যগুলি দেখে নেব। অতএব, সোলাং ভ্যালিতে কষ্ট করে রাত কাটিয়ে পরদিনের গন্তব্য মানালি। থাকব সেখানে পাঁচ দিন।
মানালি রওনা হবার আগে সোলাং ভ্যালির অন্যতম এক আকর্ষণ আনজানি বাবার মন্দির দর্শন করতে গেলাম। শীতকালে নাকি পাহাড়ি জলধারায় এখানে অমরনাথের মতোই শিবলিঙ্গের সৃষ্টি হয়। তাই ইনি দ্বিতীয় অমরনাথ। যাতায়াতের পথটি ভারি রোমাঞ্চকর। একটি এটিভি (All Terrain Vehicle) তে দু’জন করে সওয়ার হন। দুজনের সঙ্গে থাকে চালক। চার চাকার মোটর সাইকেলের সামনের সারথির আসনে। পাহাড়ি পাথরের রাস্তা দিয়ে ঝকরপকর করতে করতে এগোলাম মন্দিরের দিকে। শেষ রাস্তাটুকুর ভরসা পয়দল। মন্দির দর্শন করে, প্রসাদ গ্রহণ করে এবার আমরা মানালির পথে। মানালিতে সুন্দর, পরিচ্ছন্ন আরামদায়ক হোটেলের আশ্রয়ে এসে আগের দিনের সব ক্লান্তি দূর হল। সারাদিন রেস্ট নিয়ে আমরা সবাই এখন চাঙ্গা।
মানালির দ্বিতীয় দিন সকালে রওনা হলাম ত্রিলোকিনাথ ও উদয়পুরের উদ্দেশ্যে। সেই রাতেই ফিরব আবার মানালিতেই। আজ আমাদের চারজনের সঙ্গে মানালির হোটেলের সুদীপ্তাও সঙ্গী। পথের সৌন্দর্যে আমরা বিভোর। এসে পৌঁছলাম তান্ডিতে। চন্দ্রতাল থেকে উৎপত্তি হওয়া সেই ছিপছিপে, তন্বী জলধারা, যা নাকি চন্দ্র নদী, তার ব্যাপ্তি এখানে বিশাল। ভাগার সঙ্গে মিলিত হয়ে চন্দ্রভাগা নাম নিয়ে তান্ডি থেকে এগিয়ে চলেছে কাশ্মীরের পথে। ইনিই কাশ্মীরের চেনাব নদী। একটু চা খাওয়া, একটু রেস্ট, একটু ফটো সেশন। আবার এগিয়ে চলা ত্রিলোকিনাথের পথে। শিশু টপকেই আমাদের যাওয়া। বুঝতে পারি কেন শিশুতে স-অ-অ-ব সোল্ড আউট হয়। সৌন্দর্য মনকে তৃপ্ত করে না, উচ্ছ্বল করে। বারংবারই শুধু মনে হচ্ছিল, ‘এই কি আমার দেশ?’


ইতিমধ্যে পুলিশ ও প্রশাসনের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করেছি। তাঁরা আশ্বস্ত করেছেন, পরের দিন সকালে তাঁরা আমাদের নালা পার করেই দেবেন। একে আমরা ভিন রাজ্যের পর্যটক, তায় সিনিয়র সিটিজেন। অতএব, বিশাল দায়িত্ব তাঁদের।
বিকেলবেলা উদয়পুরের হাঁটা পথে এক দারুন সুন্দর জায়গা বেড়িয়ে এলাম। নদীর ধারে অনেকটা এলাকা জুড়ে ঝাউবন। গাছের ফাঁক দিয়ে দিয়ে নদীর জল দেখা যাচ্ছে। কেমন যেন দীঘার কথা মনে হচ্ছিল। অত্যন্ত মনোরম পরিবেশ। মনে হচ্ছে এক সুন্দর পিকনিক স্পট।
আমার এই প্রথমবার হিমাচল দর্শন। শিমলা থেকে শুরু করে নারকান্ডা, সারাহান, সাংলা, ছিটকুল, নাকো, তাবো, কল্পা এত জায়গায় ঘুরলাম। প্রতি মুহূর্তে প্রকৃতির আশ্চর্য রূপ দেখে মুগ্ধ, মোহিত আমি। দুই এক বছরের মধ্যেই আমার সৌভাগ্য হয়েছিল কাশ্মীর ও লাদাখ ভ্রমণের। আজ হিমাচলে এসে মাঝে মাঝেই মনে হচ্ছিল বুঝি বা কাশ্মীরে চলে এসেছি। আর লাহুল-স্পিতি তো লাদাখেরই অংশবিশেষ। বারংবার মনে হচ্ছিল লাদাখের সেই রুক্ষ সৌন্দর্যের মাঝেই আছি আমি। সন্ধে হতে ফিরে এলাম হোটেলে। এবার অপেক্ষা শুধু রাত পোহাবার।
পরের দিন সকালে উঠে একটু তৈরি হয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। গাড়ি নিয়ে প্রথম পৌঁছোলাম উদয়পুর থানাতে। এখানে ডিউটি অফিসার আমাদের খুব তৎপরতার সঙ্গে সব বুঝিয়ে দিলেন। যেখানে রাস্তা ভেঙেছে সেখানে যাঁরা কর্তব্যরত আছেন, তাঁদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে আমাদের রওনা হবার পরামর্শ দিলেন।

ঈশ্বর আপাতত আমাদের ওপর সদয় হলেন বটে। এদিকে প্রতি মুহূর্তে কতো মানুষের ওপর নির্দয় হচ্ছেন! দায় কার ভাবতে বসলে আঙুল ঘুরে সেই নিজের দিকেই আসে।
রাস্তায় উঠে একটা সব্জি বহনকারী গাড়িতে উঠলাম। ঠিক হল মানালির হোটেল পর্যন্ত পৌঁছে দেবে। এর মধ্যে ভিকি ফোন করে জানালো গাড়ি বন্ধুর জিম্মায় রেখে সে আমাদের সঙ্গেই ফিরবে। পেলাম এক বড়ো স্বস্তি। এতদিন একসঙ্গে ঘুরে আজ ওপারে ভিকিকে রেখে চলে আসতে বড়ই অস্বস্তি লাগছিল। অতএব, ভিকির জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা। চলে আসতেই জয় মা মৃকুলা দেবী বলে রওনা হলাম। এতক্ষণের শ্বাসরুদ্ধ করা অবস্থার শেষে অবশেষে স্বস্তি। এরই মধ্যে আবার ফোন আসতে শুরু করেছে। বাংলার সবচেয়ে বিখ্যাত সংবাদপত্রে আমাদের এই আটকে পড়ার বিবরণ নামসহ বেরিয়েছে। ব্যাস আর কী! নিজেদের কেষ্টবিষ্টু মনে হতে লাগল। ১৯ দিনের হিমাচল ট্রিপের সব থেকে স্মরণীয় হয়ে রইল ত্রিলোকিনাথ-উদয়পুর দর্শনের এই তিনদিন।
